মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

আঠাশ

লাল রঙের মোটা কাপড় দিয়ে মোড়া শক্ত-করে বাঁধানো খাতাখানার উপরে চোখ বুলিয়ে বোঝা গেল যে, জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছে মহেশ্বর চৌধুরি এই ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। তাও যে রোজ লিখতেন, তা নয়। মেরেকেটে মাত্রই পঞ্চাশ-ষাট দিন লিখেছিলেন। তবে অনেক লেখাই বেশ বড় মাপের। তার মধ্যে প্রথম লেখার তারিখ দেখছি ‘পহেলা বৈশাখ, সন ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ’ আর শেষ লেখার তারিখ ‘চৌঠা আষাঢ়, সন ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ’। অর্থাৎ ১৯৩০ সালের এপ্রিলে যার সূচনা, ১৯৩২ সালের জুনের পরে তা আর এগোয়নি।

 

লেখার ধাঁচটা যে ঠিক রোজনামচার, তাও নয়। যে-দিনের লেখা, খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলে সে-দিনের কোনও ঘটনার কথা সাধারণত আসেনি; যেখানে এসেছে, সেখানেও দেখছি মহেশ্বর চৌধুরি সেই ঘটনার সূত্র ধরে চলে গিয়েছেন তাঁর অতীত জীবনের প্রসঙ্গে। পড়তে-পড়তে আমার মনে হল যে, বর্ধমানের যে গ্রামকে একদিন তিনি ছেড়ে চলে এসেছিলেন, সেই গ্রামের কথা তিনি কোনও দিনই ভুলতে পারেননি, যেন সেই গ্রাম, যেখানে তিনি তাঁর শৈশব, বাল্য, কৈশোর, এমনকী তাঁর যৌবনেরও উন্মেষ পর্ব কাটিয়ে এসেছিলেন, সেই গ্রামের স্মৃতিই তাঁর উত্তর-জীবনেও এক প্রকান্ড প্রচ্ছায়া বিস্তার করে রেখেছে।

 

মাত্রই দু’বছর এই ডায়েরি লিখেছিলেন মহেশ্বর চৌধুরি। কিন্তু তারই ভিতর থেকে যে মানুষটির মুখ বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, সেই মানুষটি বড় দুঃখী, বড় বিধ্বস্ত। এমন নয় যে, ভাগ্য তাঁকে সাচ্ছল্য দেয়নি। হয়তো যা তশা করেছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি পরিমাণেই দিয়েছিল। কিন্তু শান্তি দেয়নি কণামাত্র। ভাগ্য তাঁকে বিত্ত দিয়েছিল, কিন্তু বেদনা দিয়েছিল তার চতুর্গুণ। ডায়েরির প্রথম লেখাতেই পড়েছে সেই বেদনার ছাপ।

 

“জলপাইগুড়ি হইতে গত ২৭ চৈত্র যে দুঃখের খবর আসিয়া পঁহুছিয়াছে, তেমন মর্মান্তিক দুঃখ যেন কাহাকেও কখনও পাইতে না হয়। সুরেন্দ্রনাথ মারা গিয়াছে, কলিকাতার মেডিক্যাল কলেজ হইতে বড় ডাক্তার আনানো হইয়াছিল, কিন্তু যাহার যকৃৎ নষ্ট হইয়া গিয়াছে, কে তাহাকে বাঁচাইবে।

 

“বড় আশা করিয়া মাত্রই বারো বৎসর বয়সে আমার প্রাণাধিক প্রিয় কন্যা সতীর বিবাহ দিয়াছিলাম। এত অল্প বয়সে আজিকালি বড় কেহ কন্যাকে পাত্রস্থ করে না। আমিই বা করিয়াছিলাম কেন? হেতু আর কিছুই নহে, পাত্রটিকে সতীর মাতাঠাকুরানির তো বটেই, আমারও বড় পছন্দ হইয়াছিল। একে তো পাত্রের পিতা ভূধরবাবু সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি, উপরন্তু ধনাঢ্য ভূস্বামীও বটেন, তায় পাত্রটিও সাতিশয় কান্তিমান ও অল্পবয়স্ক। ভাবিয়াছিলাম, সতী সুখী হইবে।

 

“হায়, যে-যুবক এত রূপবান, তাহার অন্তর যে এত অন্ধকারময় এবং আচরণ এত কদর্য, তাহা কে জানিত! তাও আশা করিয়াছিলাম যে, বিবাহের পরে সুবেন্দ্রনাথের চরিত্র ধীরে-ধীরে সংশোধিত হইবে। কিন্তু বিধাতা বিরূপ, তাহা হইল না। কৈশোর হতেই সে অমিতাচারী, ক্রমে ক্রমে সেই অমিতাচার আরও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।

 

“সতী কখনও ঘুণাক্ষরেও আমাকে ইহার আভাস দেয় নাই। সমস্ত গ্লানি ও অপমান সে নীরবে সহ্য করিত। কিন্তু এ-সব কথা কাকের মুখে ছড়ায়। ভাল খবর কেহ দিক আর না-ই দিক, বাড়ি বহিয়া মন্দ খবর পঁহুছিয়া দিবার লোকের কখনও অভাব হয় না। সবই তাই আমার কানে আসিত। যাহা শুনিতাম, তাহাতেই বুঝিয়া গিয়াছিলাম যে, অল্প বয়স হইতেই এত যাহার সুরাসক্তি, দীর্ঘায়ু হওয়া তাহার পক্ষে সম্ভব হইবে না। কিন্তু তাই বলিয়া যে মাত্র সাতাইশ বৎসর বয়সেই তাহার আয়ু ফুরাইবে, এমন ভাবি নাই।

 

“সতী সবেমাত্র কুড়ি বৎসর অতিক্রম করিয়া একুশে পড়িয়াছে। এই বয়সেই তাহার সিঁথির সিঁদুর মুছিয়া গেল। আমি তো পাষাণ নহি, তাই তাহাকে দেখিতে যাই নাই, ভয় ছিল তাহার বৈধব্যবেশ আমি সহ্য করিতে পারিব না। সতীর মাতৃদেবীকে ভাগ্যবতী বলিব, একমাত্র কন্যার বৈধব্যদশা তাঁহাকে দেখিতে হইল না, গত বৎসরই তিনি স্বর্গারোহণ করিয়াছেন।

 

“রামদাসকে সঙ্গে দিয়া নিত্যপ্রকাশকে জলপাইগুড়ি পাঠাইয়াছিলাম। গত পরশ্ব তাহারা ফিরিয়া আসিয়াছে। তাহাদেরই মুখে শুনিলাম, মদ্যপ পুত্রের মৃত্যুর জন্য বৈবাহিকা মহাশয়া এখন পুত্রবধূকে অহোরাত্র গালি পাড়িতেছেন ও বলিতেছেন যে, সতীর নিশ্চিত বৈধব্যযোগ ছিল, নহিলে এত অল্প বয়সে সুরেন্দ্রনাথের মৃত্যু হইত না। বলিবার কিছু নাই। আমরা তো কার্যকারণে বিশ্বাস করি না। হয় সমস্ত কিছুর জন্য ভাগ্যকে দোষ দিই, অথবা একের অপরাধ চাপা দিবার জন্য অন্যকে দোষী সাজাই।

 

“কিন্তু ওই বাড়িতে সতী এখন থাকিবে কীভাবে? একটি সন্তান যদি থাকিত, তবে অন্তত তাহাকে বুকে চাপিয়া সে তাহার দুঃখভার ত্ন করিতে পারিত। কিন্তু তাহাও তো তাহার নাই। নিত্যকে বলিয়াছি, শ্রাদ্ধশান্তি চুকিয়া যাউক, তাহাার পরেই সে যেন সতীকে এখানে লইয়া আসে।”

 

পরের এন্ট্রির তারিখ ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৭। মহেশ্বর সেখানে লিখছেন :

 

“কয়েক দিন হইল সতী মুকুন্দপুরে আসিয়াছে। নিত্যই লইয়া আসিয়াছে। নিত্যর উপরে আমার বড় আস্থা নাই। কিন্তু বধুমাতাটি খুবই বুদ্ধিমতী। সতী এই গৃহে আসিবামাত্র বধুমাতা তাঁহার নিজের সন্তানটিকে যেভাবে সতীর কোলে তুলিন দিলেন, তাহাতেই তাঁহার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আবার নূতন করিয়া পাইলাম। সতীও যেভাবে তাহার দুই বৎসর বয়স্ক দুগ্ধপোষ্য ভ্রাতুষ্পুত্রটিকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া অশ্রুমোচন করিতে লাগিল, তাহতে আশা হয়, এই শিশুটিই তাহার পিতৃষ্বসার বেদনাভার অনেকাংশে লাঘব করিতে পারিবে।

 

“কাল ঝড় উঠিয়াছিল। জ্যৈষ্ঠ মাস। সারাদিন খুব গরম গিয়াছিল। তাহার পর মধ্যরাতে উঠিল প্রবল ঝড়। ঝড়ের পর বৃষ্টি নামিল। ঘন্টা দুই-তিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাতের ফলে গরম অনেক কমিয়া গিয়াছে, সকালের বাতাসেও একটা ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব।

 

“তরঙ্গিণীর কথা মনে পড়িতেছে। রোজই পড়ে। তবে আজ একটু বেশি করিয়া মনে পড়িতেছে। সেই অভাগিনীও এমনই এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাত্রিকালে গৃহত্যাগ করিয়াছিল। সে যদি না গৃহত্যাগ করিত, আমার জীবন যে তবে সম্পূর্ণ অন্যখাতে বহিত, তাহাতে সন্দেহ নাই : তরঙ্গিণী এখন কোথায় আছে? সে কি আদৌ বাঁচিয়া আছে? কিছুই জানি না। …

 

“তরঙ্গিণীর কথা অদ্যাবধি কাহাকেও বলি নাই। না বলিয়াছি আমার স্ত্রীকে, না আমার পুত্রকন্যাকে। অন্য কাহাকেও বলিবার তো কোনও প্রশ্নই উঠে না। সকলেই জানে যে, আমার মাতাপিতার আমি একমাত্র সন্তান, বাল্যবয়সে অনাথ হইবা ভাগ্যান্বেষণে নানা স্থানে ঘুরিতে-ঘুরিতে এই উত্তরবঙ্গে আসিয়া নতুন করিয়া জীবনারম্ভ করিয়া। তরঙ্গিণী নামে যে আমার একটি বালবিধবা ভগ্নি ছিল, এবং সেই ভগ্নিটিকে যে আমি প্রাণাপেক্ষা ভালবাসিতাম, তাহা কেহ জানে না।…

 

“তাহার কথা কাহাকেও জানাই নাই কেন? জানাইবার উপায় ছিল না, তাই জানাই নাই। তরঙ্গিণী যেদিন আমাদের কর্মচারী দিবানাথের সঙ্গে গোপনে গৃহত্যাগ করে, জগৎ-সংসার আমার চক্ষে সেদিন শূন্য হইয়া গিয়াছিল। ভগিনী কুলত্যাগিনী, গ্রাণে তাই আমাকে একঘরে করা হয়। খুব অপমান যোগ করিয়াছিলাম। কেহ আমার সহিত কথা কহিত না, আমাকে উদ্দেশ করিয়া দূর হইতে ব্যঙ্গবিদ্রুপের বাণ নিক্ষেপ করা হইত। আরও কত যে লাঞ্ছনা সহিয়াছিলাম! মাঝে-মাঝে তরঙ্গিণীর উপরে রাগও হইত খুব। সে শুধু নিজের কথাই ভাবিয়াছে; কই, আমার কী দশা হইবে, তাহা তো ভাবিয়া দেখে নাই।

 

“আজ আর রাগ হয় না। আজ সতীকে দেখি, আর ভাবি, সতীই বা তাহার বৈধব্যযন্ত্রণা আমৃত্যু সহ্য করিবে কেন? তরঙ্গিণীর মতো সতীও যদি তাহার জীবনসঙ্গী হিসাবে দ্বিতীয় কাহাকেও বাছিয়া লয়, তবে লউক। না, তরঙ্গিণীর মতো কোনও ঝড়ের রাত্রে তাহাকে গৃহত্যাগ করিতে হইবে না, আমি পুরোহিত ডাকিয়া তাহার পুনর্বিবাহের ব্যবস্থা করিয়া দিব।”

 

মুকুন্দপুরে কেন বসতি স্থাপন করেছিলেন, তার উল্লেখ দেখলুম ১৩৩০ বঙ্গাব্দের ১৭ শ্রাবণের লেখায়। মহেশ্বর সেখানে জানাচ্ছেন:

 

“ঠিক ছিল যে কোচবিহারে যাইব। তথায় যাইয়া যদি মহারাজের দর্শন পাই, তবে আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইতে পারে। রাজকোষ হইতে কিছু সাহায্য পাইলে মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ সহজ হয়! তখন অন্তত তাহাই ভাবিয়াছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কোচবিহারে যাওয়া হইল না। পথিমধ্যে এই মুকুন্দপুরের মায়াবন্ধনে আবদ্ধ হইয়া এখানেই রহিয়া গেলাম।

 

“সেই সন্ধ্যাটির কথা অদ্যাপি ভুলি নাই। চল্লিশ বৎসর অতিক্রান্ত হইল, অথচ তাহার স্মৃতি আজও চিত্তপটে জাগরূক রহিয়াছে। গ্রামের নাম কী, তখনও তাহা জানিতাম না। এক চাষিগৃহস্থের বাড়ির দাওয়ায় বসিয়া আছি। ভাবিতেছি, পরদিবস প্রত্যুষে আবার কোচবিহারের পথে রওয়ানা হইব। হঠাৎ

 

এক ঝলক বাতাস বহিল, আর তখনই চতুর্দিক আমোদিত হইয়া উঠিল এক চিত্তহারী সৌরভে।

 

“এই গন্ধ আমার পরিচিত। গৃহস্থকে জিজ্ঞাসা করিতে সে জানাইল যে, এই গ্রামে চাপাগাছ রহিয়াছে অজস্র, গাছে ফুল আসিয়াছে, তাই কয়েকটা মাস এখন চাপাফুলের গন্ধে বাতাস একেবারে ভরপুর হইয়া থাকিবে।

 

“ঠিক কথা। চাঁপাই বটে। তবে মুচুকুন্দ চাঁপা। মুচুকুন্দ চাঁপার গাছ খুবই দীর্ঘ হয়। ফুলগুলিও হয় বেশ বড় মাপের। পুরু, লম্বাটে পাপড়ি। আমাদের বর্ধমানের গ্রামেও এ-গাছ অনেক ছিল!

 

“যে গ্রাম ছাড়িয়া আসিয়াছি, যেখানে আমার লাঞ্ছনা-অপমানের সীমা ছিল না, সহসা যেন তাহারই জন্য আমার মনের মধ্যে কেমন আকুলিবিকুলি করিতে লাগিল। সে-রাত্রে আমার ঘুম হইল না। স্থির করিলাম, কোচবিহারে যাইব না, এইখানেই থাকিব।

 

“এই গ্রামের নাম অবশ্য মুকুন্দপুর নহে, প্রকৃত নাম মুচুকুন্দপুর। সে-কথা পরে জানিয়াছি।” পাতাগুলি দ্রুত উল্টে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। তারিখ দেওয়া রয়েছে ২৩ ভাদ্র, ১৩৩৮। মহেশ্বর সেই তারিখের নীচে লিখছেন:

 

“ভাদ্রমাস শেষ হইতে চলিল। উত্তরবঙ্গ এমনিতেই বড় শ্যামল জায়গা। বৃষ্টিধারায় স্নাত হইবার ফলে তাহার নিবিড় অরণ্যানীর শ্যামশোভা যেন আরও উজ্জ্বলতা প্রাপ্ত হইয়াছে। আকাশে আজ মেঘ নাই। গোটা আকাশ যেন নীলকান্তমণির ন্যায় ঝকমক করিতেছে। শারদীয় মহাপূজার লগ্নও প্রায় আসিয়া পড়িল।

 

“প্রতি বৎসরই এই সময়ে বড় বেদনা বোধ করি। চিত্তপ্রকাশ যে সংসার-আশ্রম পরিত্যাগ করিয়াছে, এই বেদনা যেন এই সময়েই আরও বেশি করিয়া বাজে। কেন যে তাহার সন্ন্যাসে মতি হইল, কে জানে। ছাত্রাবাস হইতে নিরুদ্দেশ হইবার অনেক দিন পরে হরিদ্বার হইতে সে একখানি চিঠি লিখিয়াছিল। তাহাতে কোনও ঠিকানা দেয় নাই। শুধু জানাইয়াছিল যে, ঈশ্বর-সাধনাকেই সে তাহার একমাত্র ব্রত হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে। ঘরে থাকিয়া কি সেই ব্রতের উদ্যাপন করা যাইত না? মাতাপিতার বুকে বেদনার শেল বিদ্ধ না করিয়া যাহার উদযাপন হয় না, সে কেমন ব্রত?

 

“নিত্যপ্রকাশ আর চিত্তপ্রকাশ, আমার দুই পুত্রের অবস্থান যেন পরস্পরের একেবারে বিপরীত দুই বিন্দুতে। বাল্যবয়স হইতেই নিত্যপ্রকাশ ভোজনবিলাসী, পোশাক-পরিচ্ছদেও অতিমাত্রায় শৌখিন। চিত্তপ্রকাশ তো তাহারই ভ্রাতা। অথচ আহার্যের ব্যাপারে চিত্ত কখনও কোনও বায়না করিয়াছে বলিয়া মনে পড়ে না, তাহার পরিধানেও কোনও বাবুয়ানা কখনও লক্ষিত হয় নাই। বুদ্ধি কিংবা মেধা যে নিত্যর কিছু কম, এমন বলি না, তবে লেখাপড়ায় সে কখনও মনোনিবেশই করিল না। চিত্ত সে-ক্ষেত্রে অধ্যয়নকেই তাহার তপস্যা বলিয়া জানিয়াছিল। সে ছিল সংসারে একেবারেই অনাসক্ত; আর এদিকে নিত্যর বিষয়াসক্তি দিনে-দিনে বাড়িতেছে বই কমিতেছে না।”

 

সত্যপ্রকাশের কাছে শুনেছিলুম যে, এই পরিবারে ব্যাবসার পত্তন হয়েছিল তাঁর বাবার আমলে। ঠাকুর্দা নাকি জমিজমা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, ব্যাবসার জনে: যে সময় দেওয়া চাই, তা তাঁর ছিল না। আগ্রহও যে ছিল না, মহেশ্বর চৌধুরির ডায়েরি পড়তে-পড়তে সেটা বোঝা গেল। ৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩৮ তারিখে তিনি লিখছেন :

 

“চিত্তপ্রকাশকে হারাইয়াছি। এখন নিত্যপ্রকাশকে লইয়াও বড় আশঙ্কা হয়। এই আশঙ্কার প্রকৃতি অবশ্য একেবারেই ভিন্ন। সে ব্যবসায় করিতে চাহে। সেই কারণে আমার কাছে টাকা চাহিয়াছিল। অঙ্কটা ছোট নহে। দশ হাজার। বলিলাম, অত টাকা কোথায় পাইব, নগদ যাহা ছিল তাহা তো মন্দির নির্মাণ করিতেই ব্যয়িত হইয়া গিয়াছে। নিত্য এ-কথা শুনিয়া কহিল, চাষবাস করিয়া আমাদের কী-ই বা লাভ হয়, জমি বিক্রয় করিয়া টাকা দিন, ব্যবসায়ে খাটাইলে ও-টাকা দ্বি, হইয়া ফিরিবে। কথাটা শুনিয়া আমি স্তম্ভিত। াণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ, ইহা কে না জানে। ব্যবসায়ে-বাণিজ্যে অবশ্যই বিস্তর লাভ। কিন্তু বিস্তরে আমার দরকার নাই, কৃষিকর্মে তদর্থং পাইয়াই আমি পরিতৃপ্ত। আর তা ছাড়া, জমি বিক্রয় করাকে আমরা মাতৃবিক্রয়ের সমতুল্য পাপকর্ম বলিয়া গণ্য করিয়া থাকি।

 

“হায়, নিত্যকে সে-কথা কে বুঝাইবে! অর্থই তাহার একমাত্র উপাস্য, অর্থই তাহার ধ্যানজ্ঞান। তাহাপেক্ষাও আশঙ্কার কথা এই যে, যে-ব্যক্তির অর্থসম্পদ নাই, নিত্য তাহাকে মনুষ্যপদবাচ্য বলিয়াই মনে করে না। তাহার মাতুলেরা অতি সজ্জন। কিন্তু তাহাদের সহস্র অনুরোধ সত্ত্বেও নিত্য যে কখনও মাতুলালয়ে যাইতে চাহে না, তাহার কারণ শহারা দরিদ্র। কী আর বালন, ঈশ্বর নিত্যকে সুমতি দিন।”

 

মহেশ্বরের লেখার মধ্যে এতই ডুবে গিয়েছিলুম যে, ঘরের মধ্যে আর-একজনের উপস্থিতির ব্যাপারটা প্রথমে টেরই পাইনি।

 

“খেতে আসুন। জামাইবাবু আপনার জন্যে বসে আছেন।”

 

চমকে উঠে দেখলুম, নিরু দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “স্নান হয়ে গেছে তো?”

 

বললুম, “সে তো সাত-সকালেই সেরে নিয়েছি।”

 

“তা হলে আর দেরি করবেন না। আসুন।”

 

বখাওয়ার টেবিলে গল্প বিশেষ জমল না। সত্যপ্রকাশ দু-একটা প্রশ্ন করেছিলেন। মামুলি প্রশ্ন। সংক্ষেপে তার জবাব দিয়ে চটপট খেয়ে নিলুম। খাওয়ায় যে বিশেষ মন ছিল, তাও নয়। তবে তারই মধ্যে লক্ষ করলুম যে, পাতে আজ নানারকমের শাকভাজা। তার সঙ্গে অন্য সব পদও অবশ্য ছিল। খাওয়া শেষ করে সত্যপ্রকাশ তাঁর নিজের ঘরে চলে গেলেন। যাবার আগে আমাকে বললেন, “আপনিও একটু গড়িয়ে নিন।” ঘরে ফিরে আমি আবার ডুবে গেলুম সেই ডায়েরির মধ্যে।

 

১৬ই মাঘ ১৩৩৮ তারিখে মহেশ্বর লিখছেন :

 

“আজ সতীর জন্মদিন। বড় আশা করিয়া আমার এই একমাত্র কন্যার নাম রাখিয়াছিলাম সত্যভামা। ভাবিয়াছিলাম, স্বামী পাইবে কৃষ্ণের মতো। যেমন প্রেমিক, তেমনই বিচক্ষণ। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কয়েক দিন ধরিয়া একটা কথা চিন্তা করিতেছি। নিদ্রাভঙ্গের পর প্রত্যুষেই সতী আমাকে প্রণাম করিতে আসিয়াছিল। তখন কথাটা তাহাকে জানাইলাম। বলিলাম, আজিকালি তো আকছার বিধবাবিবাহ হইতেছে, সুতরাং উদার চরিত্রের একটি পাত্র দেখিয়া পুনরায় আমি তাহার বিবাহ দিতে চাই। এমনও বলিলাম যে, সতীর কোলে যদি একটি সন্তানও থাকিত, তবে হয়তো পুনর্বিবাহে তাহার সংকোচ হইতে পারিত, কিন্তু তাহা যখন নাই, তখন তাহার সংকুচিত বোধ করিবার কোনও কারণ থাকিতে পারে না।

 

“আমার কথা শুনিয়া সতী যেন চমকিয়া উঠিল। পরক্ষণে সংযত শান্ত স্বরে কহিল, ‘কে বলিল আমার সন্তান নাই? সতু কি শুধু বৌদির ছেলে? ও আমারও ছেলে। আমরা দুইজনে মিলিয়া উহাকে মানুষ করিয়া তুলিব। বৌদি আমাকে বলিয়াছে যে, আমরা দুইজনেই উহার মা। না বাবা, সতুকে লইয়া আমি দিব্য আছি। আর তুমি আমাকে পরের ঘরে পাঠাইয়ো না।’ বুঝিলাম, কপালগুণে এমন পুত্রবধূ পাইয়াছি, যে শুধুই বুদ্ধিমতী নহে, হৃদয়বতীও বটে। হৃদয় আছে বলিয়াই সতীর দুঃখ সে বুঝিয়াছে, এবং দুঃখ যাহাতে দূরীভূত হয়, তজ্জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা লইতেও তাহার ভূল হয় নাই।

 

“সতুও দেখিতেছি তাহার পিতৃম্বসার কোল হইতে বড় একটা নামিতে চাহে না। পিসি স্নান না-করাইলে সে স্নান করে না, পিসি খাওয়াইয়া না-দিলে খায় না, ঘুমাইবার সময়েও পিসিকে তাহার কাছে থাকিতে হইবে।”

 

সতু যে সত্যপ্রকাশ, সেটা সহজেই বুঝলুম। সোমবার রাত্রি থেকে মা আর পিসিমা, দু’জনের মুখেই সত্যপ্রকাশের এই ডাক-নাম আমরা শুনছি। মা আর পিসিমার পারস্পরিক ভাব-ভালবাসার কথা সত্যপ্রকাশের কাছেই জেনেছিলুম, এবারে মহেশ্বর চৌধুরির ডায়েরি পড়েও সে-কথা জানা গেল। ডায়েরিতে সত্যপ্রকাশের সম্পর্কেও কিছু প্রশংসা দেখতে পাচ্ছি। ১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৯ তারিখে মহেশ্বর লিখছেন:

 

“সতুর বয়স এখনও চারি বৎসর পূর্ণ হয় নাই। কিন্তু ইতিমধ্যে তাহার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার নানা প্রমাণ পাইয়াছি। সেদিন একটা বাঘের গল্প বলিয়াছিলাম। আজ সেই গল্পটা সে আমাকে আদ্যন্ত শুনাইয়া দিল। এখনও হাতেখড়ি হয় নাই, অথচ অন্যের ‘বর্ণপরিচয়’ দেখিয়া একটি লোহার শিকের সাহায্যে মাটির উপরে দিব্য অ-আ-ক-খ লিখিতে আরম্ভ করিয়াছে। স্মৃতিশক্তিও দেখিলাম কম নয়। যেমন বাংলায়, তেমনি ইংরাজিতেও এক হইতে একশত পর্যন্ত নির্ভুল বলিয়া যায়।

 

“সেদিন কোথা হইতে একটা সাপের খোলস কুড়াইয়া আনিয়াছিল। আমার সন্মুখে ফেলিয়া দিয়া বলিল, ‘দাদু, তুমি তো বলো যে, আমাদের গ্রামে সাপ নাই, তবে এই সাপের খোলস কোথা হইতে আসিয়াছে?’ হাসিয়া বলিলাম, ‘সাপ নাই, এমন কথা তো বলি না। বলিয়াছি যে মনসা দেবীর আশীর্বদে এই গ্রামে কাহাকেও সাপে কাটে না। কথাটা মিথ্যা নহে। এককালে এদিকে সত্যই সাপের বড় উৎপাত ছিল। আশপাশের গ্রামে এখনও সাপের কাড়ে লোক মারা যায়। অথচ যেদিন মনসাদেবীর প্রতিষ্ঠা হইয়াছে, সেদিন হইতে অদ্যাবধি এই মুকুন্দপুর গ্রামে কাহাকেও সাপে কাটে নাই।”

 

পাতার পর পাতা দ্রুত পড়ে যাচ্ছিলুম, তবু শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে ওঠা গেল না। বাইরের উঠোনের উপরে একটা গাড়ি এসে থামল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, ছ’টা বাজে। ডায়েরি বন্ধ করে জানালা খুলে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই ফিরে এসেছেন।

 

ঘরে এসে ঢুকতেই জিজ্ঞেস করলুম, “খবর কী?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন নয়, পরে বলব।”

 

জামা-কাপড় পালটে তিনি বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন।

 

তার আধ-ঘন্টাটাক বাদে মোটর-সাইকেলের ভট্-ভট্ আওয়াজ শুনে বুঝলুম যে, ডাক্তার সরকারও এসে গিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *