কুড়ি
একটা মোটর-সাইকেলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। অওাজটা ক্রমেই উঁচু থেকে আরও উঁচু পর্দায় উঠতে-উঠতে তারপর আমাদের ঘরের পুবদিকের দরজার বাইরে এসে থেমে গেল। খানিক বাদেই টোকা পড়ল দরজায়।
দরজা খুলে যাঁকে দেখলুম, তাঁকে আগে কখনও দেখিনি। তবে হাতের ব্যাগটা দেখে আন্দাজ করলুম যে, ইনিই ডাক্তার সরকার। ভদ্রলোকের বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি হবে। মাথায় মস্ত টাক। কানের পাশে কিছু চুল রয়েছে বটে, কিন্তু তাও প্রায় না-থাকার মতন। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। পরণে ঢোলা ট্রাউজার্স আর মোটা কাপড়ের হাওয়াই শার্ট। শার্টের পকেটে গোটা চারেক কলম। মুখ দেখে মনে হয় কোনও কূট-কাপট্য নেই। দিলদরিয়া হাসিখুশি মানুষ।
পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে রামদাস। ভদ্রলোক তাকে বললেন, “তুমি গিয়ে আয়াকে সব রেডি করতে বলো। আমি আগে মিঃ ভাদুডিকে দেখি, তারপর তোমার নাতনির ব্যান্ডেজ পালটে দেব।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসতে পারি?”
বললুম, “আসুন, আসুন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বসুন ডাক্তার সরকার। আমার অসুখের কথা তো সত্যপ্রকাশবাবুর কাছেই শুনেছেন।”
“হ্যাঁ, শুনেছি যে, আপনার কিসসুই হয়নি, তবু নাকি আপনাকে খুব ‘লি করে দেখে আমাকে ওষুধ দিতে হবে। কী ব্যাপার বলুন তো?”
“বলছি। কিন্তু ডাক্তারবু, তার আগে বরং আর-একটা কথা বলি।”
“বেশ তো, বলুন।”
“সবাইকে কি অবিশ্বাস করা চলে : তা হলে কাজ করব কাকে নিয়ে? অন্তত এক-আধজনকে তো বিশ্বাস করা চাই। ঠিক কি না?”
ডাক্তার সরকারকে তাঁর চিকিৎসক-জীবনে সম্ভবত আর-কখনও এমন কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়নি। মনে হল, ভদ্রলোক একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিহ্বল গলায় বললেন, “মানে….আমি তো বুঝে উঠতে পারছি না যে….”
ভাদুড়িমশাই হাসতে-হাসতে বললেন, “ঠিক আছে, অতশত আপনাকে বুঝতে হবে না। শুধু বলুন যে, আপনাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি কি না, বাস।”
“একশোবার পারেন, হাজারবার পারেন। আরে, বিশ্বাস তো আমাকে করতেই হবে। আপনি হচ্ছেন রোগী, আর আমি হচ্ছি ডাগের। আমাকে বিশ্বাস না করে আপনার উপায় কী। কিন্তু এ-কথা উঠছে কেন?”
“উঠছে এইজন্যে যে, আপনাকে আমি বিশ্বাস করে কয়েকটা কথা বলব। না না, রোগের কথা নয়। সত্যপ্রকাশ তো আপনাকে বলেই দিয়েছেন যে, আমার কিছু হয়নি। আমার কথা অন্য ব্যাপারে, যার আঁচ সত্যপ্রকাশ আপনাকে হয়তো দিয়ে থাকতে পারেন।”
“কই না, আর কিছু তো তিনি বলেননি আমাকে। শুধু বললেন যে, আপনারা ইনভেস্টিগেশানে এসেছেন। আর হ্যাঁ, যদিও আপনার জ্বরজারি হয়নি, তবু আজ এই বাড়িতে এসে প্রথমেই যেন এই ঘরে ঢুকে আপনার শরীরটা খুব ভাল করে পরীক্ষা করি।….কী যে ব্যাপার, কিছুই তো মশাই বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বলুন তো।”
“বলছি। একটা ব্যাপারে আমি আপনার সাহায্য চাই।”
“কী ব্যাপার?”
“রঙ্গিলার ব্যাপার। ডাক্তারবাবু, ওর অবস্থাটা এখন ঠিক কেমন?”
“আগের চেয়ে অনেক ভাল। আজ তো এখনও দেখিনি। তবে কাল যা দেখেছিলুম, তাতে বলতে পারি যে, প্রাণের আশঙ্কা আর নেই। কাউকে অবশ্য চিনতে পারছে না, কথাও বলতে পারছে না। তবে আমার মনে হয়, দি ওয়র্স্ট ইজ ওভার, দু-এক দিনের মধ্যে সবাইকে চিনতে পারবে, কথাও বলতে পারবে।”
“ঠিক এই কথাটাই কাউকে আপনার বলা চলবে না, ডাক্তারবাবু।” ভাদুড়িমশাই অনুনয়ের গলায় ডাক্তার সরকারকে বললেন, “অন্তত আজ কিছুতেই বলা চলবে না।”
ডাক্তার সরকার অবাক হয়ে বললেন, “কেন?”
“এইজন্যে বলা চলবে না যে, রঙ্গিলার বিপদ তাতে বাড়বে। ডাক্তারবাবু, এই সহজ কথাটা আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন যে, একমাত্র রঙ্গিলাই চোরকে দেখেছিল, ভাল হয়ে উঠলে একমাত্র রঙ্গিলাই তাকে শনাক্ত করতে পারবে। আর তাই, রঙ্গিলা যে শিগগিরই ভাল হয়ে যেতে পারে, এই কথাটা যদি চাউর হয়ে যায়,তা হলে রঙ্গিলাকে সে-ই ভাল হয়ে উঠতে দেবে না। ভাল হয়ে উঠবার আগেই রঙ্গিলাকে সে খতম করে দেবার চেষ্টা করবে।”
“বলেন কী?”
“একটুও বাড়িয়ে বলছি না, ডাক্তারবাবু।”
“ঠিক আছে।” ডাক্তার সরকার বললেন, “ব্যাপারটা আমাদের প্রফেশানের দিক থেকে একটু আনএথিক্যাল ঠিকই, কিন্তু আপনি যা বললেন, তাতে মনে হচ্ছে, সত্যিকথাটা আপাতত না-বলাই ভাল। আফটার অল, রোগীর ভালমন্দটাই প্রথমে ভেবে দেখা দরকার।…..নিন, এবারে একটু শুয়ে পড়ুন দেখি, আপনার প্রেশারটা একবার দেখব।”
ডাক্তারবাবু প্রেশার দেখলেন, টেম্পারেচার নিলেন, বুকে আর পিঠে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনলেন, জিভ বার করতে বললেন, চোখের পাতা টেনে দেখলেন, অর্থাৎ যা-যা করা দরকার, সবই করলেন; তারপর হেসে বললেন, “সব নর্মাল। তবে কিনা আপনি যখন অসুখের ভান করে পড়ে আছেন, তখন গোটাকয় ট্যাবলেট দিয়ে যাচ্ছি। খাবার দরকার নেই। তবে খেলেও কিছু ক্ষতি হবে না। ভিটামিন ট্যাবলেট।”
ব্যাগ খুলে একটা শিশি থেকে গোটা চারেক ট্যাবলেট বার করে নিলেন ডাক্তার সরকার। তারপর একখন্ড কাগজে সেগুলো মুড়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেশ উঁচু গলায় বললেন, “নিয়ম করে খাবেন মশাই। একটু জ্বর হয়েছে, তবে ভয়ের কিছু নেই, কাল সকালেই টেম্পারেচার সাতানব্বইয়ে নেমে যাবে।”
ডাক্তার সরকার উঠে পড়লেন। ভাদুড়িমশাই ওঠার উপক্রম করছিলেন। আমি বললুম, “থাক থাক, আপনি আর উঠবেন না, আমি বরং ডাক্তারবাবুকে এগিয়ে দিচ্ছি।”
উঠোন পেরিয়ে আমরা রঙ্গিলাদের ঘরের দরজায় গিয়ে উঠলুম। এটা যে বাইরের উঠোনের পুবদিকের ঘর, সে-কথা আগেই বলেছি। একতলা ঘরগুলো সব একই রকমের। এ-ঘরটারও সামনে টানা-বারান্দা, তাতে কাঠের রেলিং বসানো। ঘরের ভিতরটা দেখলুম পার্টিশান করা। কাঠের পার্টিশান, তার একধারে একটা এক-পাল্লার সরু দরজা। ওই দরজা দিয়েই পার্টিশানের এ-দিক থেকে ও-দিকে যাওয়া-আসা করতে হয়। ঘরটাকে একেবারে সমান মাপে দু’ভাগ করা হয়নি, পার্টিশানের দক্ষিণ-দিকের ভাগটা একটু ছোট। সে-দিকটায় সরু একটা তক্তাপোশ পাতা, তার উল্টোদিকে একটা ইজিচেয়ার। ঘরের এককোণে রয়েছে একটা মিটসেফ। তার উপরে গোটাকয় ওষুধের শিশি, কয়েক
পাতা ট্যাবলেট আর ক্যাপসুল, তা ছাড়া দু’বাণ্ডিল ব্যান্ডেজ আর লিউকোপ্লাস্ট।
তক্তাপোশে যে মেয়েটি শুয়ে আছে, সে-ই যে রঙ্গিলা, সেটা বুঝে নেওয়া গেল। মেয়েটির গায়ের রং একেবারে কুচকুচে কালো, তার উপরে ভীষণ রোগা। সম্ভবত অসুস্থ বলেই আরও রোগা দেখাচ্ছে। মাথা আর কপাল জুড়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। বলতে গেলে বিছানার সঙ্গে একেবারে মিশে রয়েছে মেয়েটি। চোখ দুটি খোলা, কিন্তু তাতে কোনও অভিব্যক্তির চিহ্নমাত্র দেখা গেল না। শূন্য, ভাবলেশহীন চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল; আমরা গিয়ে ঘরে ঢুকবার পরেও চোখ ফেরাল না, সিলিংয়ের দিকেই তাকিয়ে রইল।
নার্স কাম আয়াটি মাঝবয়সী। শিলিগুড়ির এক নার্সিংহোমে কাজ করে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সত্যপ্রকাশই একে সঙ্গে নিয়ে শিলিগুড়ি থেকে মুকুন্দপুরে চলে এসেছিলেন। ডাক্তারবাবু যে এসেছেন, এই খবর পেয়েই সে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিল। জিজ্ঞাসু চোখে ডাক্তার সরকার তার দিকে তাকাতেই সে বলল, “কাল রাত্তিরে আবার জ্বর এসেছিল।”
“টেম্পারেচার নিয়েছিলে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“কত?”
“একশো দুই পয়েন্ট চার। সকালেই অবশ্য ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যায়।”
“এখন কত?”
“সাড়ে সাতানব্বই।”
“ঠিক আছে। কাল তো ক্যাপসুলটা পড়েনি। ওটা আবার আজ থেকে দাও। আজ াত্তিরে একটা, কাল দুবেলা দুটো। যেমন আগে দিচ্ছিলে। জল গরম করেছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি এসেছেন শুনেই গরম করে রেখেছি।”
“ঠিক আছে। জলটা তা হলে গামলায় ঢেলে দাও।”
গামলায় গরম জল ঢালা হল। ডাক্তার সরকার তাতে খানিকটা ডেটল ঢাললেন। তারপর আয়াকে বললেন, “নাও, এবারে ব্যান্ডেজটা খোলো। তারপর গরম জলে তুলো ভিজিয়ে ইনজুরির জায়গাগুলো বেশ ভাল করে পরিষ্কার করে দাও। ব্যান্ডেজটা আজ আবার নতুন করে বেঁধে দিয়ে যাব।”
ড্রেসিংয়ের কাজ শেষ হতে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ মিনিট লাগল। লক্ষ করলুম যে, ক্ষতস্থানগুলি এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি; অন্তত দু-একটি জায়গা থেকে অল্প-স্বল্প রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। রঙ্গিলা যে সারাক্ষণই একেবারে স্থির হয়ে শুয়ে আছে, তার দৃষ্টিও যে এক লহমার জন্যেও সে অন্যদিকে ফেরায়নি, তাও আমার চোখ এড়াল না। তবে তার ঠোঁট দুটি একটু-একটু নড়ছিল। ডাক্তারবাবু সেটা লক্ষ করেছেন কি না, কে জানে।
কাজ শেষ করে, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ডাক্তার সরকার ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়লেন। তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে রামদাস জিজ্ঞেস করল, “কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু?”
“একই রকম।”
রামদাস কেঁদে ফেলল। বলল, “মেয়েটা বাঁচবে তো?”
“কিছুই বলা যাচ্ছে না।” ডাক্তার সরকার বললেন, “ফের জ্বরটা এসেই মুশকিল হল। আর দু-একটা দিন দেখি।”
আয়াও ইতিমধ্যে বাইরে চলে এসেছিল। একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি আর এখানে কাজ করব না ডাক্তারবাবু।”
“কেন?”
“কাল রাত্তিরে কে যেন জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি মেরেছিল।”
“বটে?” ডাক্তার সরকার বললেন, “সেইজন্যে কাজ ছেড়ে দেবে তুমি?”
“হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু, আমার ভয় করছে।”
রামদাসের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার সরকার বললেন, “কী ব্যাপার রামদাস?”
“কিছু না, ডাক্তারবাবু।” রামদাস বলল, “মিছিমিছি ভয় পাচ্ছে। পাড়ারই কেউ হয়তো উঁকি মেরেছিল। তা মারুক না। আমি তো রয়েছি। ভয় কীসের?”
আয়া তবু গোঁ ধরে রইল। সে যাবেই।
ডাক্তারবাবু বললেন, “বেশ তো, যেতে হয় তোমার কিন্তু সত্যপ্রকাশবাবু শিলিগুড়ি গেছেন, তাঁকে ফিরে আসতে দাও, তিনি অন্য-কোনও লোক দিয়েছেন, তারপর যেও। হুট বললেই কি আর যাওয়া হয় রে বাবা, দুটো দিন সবুর করো।”
আয়া ফিরে গেল রঙ্গিলার কাছে। মুখ দেশে বোঝা গেল, সে খুশি নয়।
ডাক্তারবাবু তাঁর মোটর-সাইকেলে উঠে বললেন, “কাল আবার এই সময়ে আমি আসব। তার মধ্যে যদি দরকার হয় তো রামদাসকে দিনে আমাকে একটা খবর পাঠাবেন।….আরে, তুমি কখন এলে?”
শেষ কথাটা যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, এতক্ষণ সে উঠোনের দক্ষিণ দিকের কাচারি ঘরের বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সকালবেলা রামদাসের ঘরের সামনে যাকে দেখেছিলুম, সেই চটকদার চেহারার বউটি। তখন তার সঙ্গে একজন জোয়ান পুরুষ ছিল। এখন সে একা। কুন্ঠিত ভঙ্গিতে সে ডাক্তারবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করল, “রঙ্গিলা কেমন আছে?”
একটু ইতস্তত করে ডাক্তার সরকার বললেন, “খুব একটা ভাল নয়। যাও, ভিতরে গিয়ে একবার দেখে এসো।”
কথাটা বলে ডাক্তারবাবু আর দাঁড়ালেন না। মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
বউটির কিন্তু ভিতরে ঢোকা হল না। ঢুকতে বাচ্ছিল, কিন্তু রামদাস এবারেও সেই সকালবেলার মতোই তার মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দিল।
