মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বারো
মুকুন্দপুর গ্রামটা দেখলুম বড় নয়। বাড়ির সংখ্যা ষাট-সত্তরের বেশি হবে না। কিছু কমও ত পারে। বাসিন্দাদের পনেরো-আনাই কৃষিজীবী। কারও বা নিজের দু-পাঁচ বিঘে জমি আছে, কেউ বা অন্যের জমিতে চাষ করে, ফসলের একটা ভাগ পায়। গ্রামে অবশ্য ছোট একটা ডাকঘর আছে। একটা মাইনর স্কুলও থাকতে পারত। নেই। থাকবার মধ্যে আছে একটা পাঠশালা।
পাঠশালা এখন বন্ধ। পুজোর ছুটি চলছে। টিনের চালওয়ালা লম্বাটে একটা ঘরের সামনে চৌকোনা একখানা ফলক আঁটা। কাঠের ফ্রেমে টিনের ফলক। তাতে লেখা রয়েছে অন্নপূর্ণা বিদ্যালয়’। শুনলুম, মহেশ্বর চৌধুরির স্ত্রীর নামে বছর পনেরো আগে এটি খোলা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রের অভাবে দু-তিন বছর পরেই বন্ধ হয়ে যায়। বছর পাঁচেক আগে সত্যপ্রকাশ এটিকে আবার নতুন করে চালু করছেন। মাস্টারমশাইটিও তখন থেকে এই মুকুন্দপুরে বাসিন্দা।
ভদ্রলোকের নাম রঙ্গনাথ মজুমদার। এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের চোখ দেখলেই মনে হয় যে, ইনি একেবারে স্বচ্ছ চরিত্রের মানুষ, এঁর মনে কোনও কূটকাপট্য নেই। রঙ্গনাথকে দেখেও ঠিক সেইরকমেরই একজন মানুষ বলে মনে হয়। বর্ষার দিনে পুকুরে যেমন কালো মেঘের ছায়া পড়ে, রঙ্গনাথের চোখেও তেমনি একটা বিষাদের ছায়া আমি প্রথম থেকেই দেখতে পেয়েছিলুম। ভদ্রলোক যে হাসেন না, তা নয়, কিন্তু যখন হাসেন তখনও দেখলুম যে, সেই ছায়াটা পুরোপুরি সরে যায় না। পাঠশালা এখন কেমন চলছে; ভাদুড়িমশাইয়ের এই প্রশ্নের উত্তরে রঙ্গনাথ বললেন, “কই আর চলছে। সত্যপ্রকাশ তো নতুন করে আবার পাঠশালা চালু করল, সেই বাবদে খরচও করল নেহাত কম নয়। চাল ছিল খড়ের, সেখানে টিনের চাল হয়েছে, মেঝেটাও বেশ পোক্ত করে বাঁধিয়ে দিয়েছে, বইপত্তর কি খাতা-পেনসিলও কাউকে কিনতে হয় না, যার যা-কিছু দরকার, সত্যই সব কিনে দেয়, কিন্তু সবই আসলে ভস্মে ঘি ঢালার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
“এ-কথা বলছেন কেন?”
“বড় দুঃখে বলছি। গ্রামের ছেলেপুলেরা এসে ভর্তি হয় ঠিকই, কিন্তু দু’চার দিন বাদে তাদের বেশির ভাগই পালিয়ে যায়। একে তো মাইনে দিতে হয় না, ফ্রি ইস্কুল, তায় তাদের বইপত্রের খরচও অন্যে জোগাচ্ছে, তবু থাকে না।”
“থাকে না কেন?”
“কী করে থাকবে?” ক্লিষ্ট হেসে রঙ্গনাথ বললেন, “পাঠশালার নামটা কী, সেটা দেখেছেন তো? অন্নপূর্ণা বিদ্যালয়। অর্থাৎ কিনা আগে অন্ন, তারপর বিদ্যা। তা মশাই, অন্নচিন্তা চমৎকারা। সেই চিন্তাতেই যারা অস্থির হয়ে রয়েছে, সেই পরিবারের ছেলেপুলেরা আর বিদ্যার পিছনে ব্যয় করবার শতো সময় কোথায় পাবে
“বাচ্চারাও সময় পায় না?”
“তারাও পায় না। পাঠশালা তো বসে সকালবেলায়। বড়রা তখন মাঠে। সেখানে তারা মুগুর দিয়ে পিটিয়ে শক্ত ঢেলামাটি গুঁড়ো করছে, কি লাঙল টানছে, কি বীজ বুনছে, কি ফসল কাটছে। সেইখানে তাদের সকালের ভাতটা পৌঁছে দেওয়া চাই তো। কে আর দেবে? আমার ছাত্রদেরই তাই নামতার ক্লাসে না-এসে বাবা-কাকার ভাত নিয়ে মাঠে দৌড়োতে হয়।”
হাঁটতে-হাঁটতে কথা বলছিলেন রঙ্গনাথ। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ফের সেই একই রকমের ক্লিষ্ট গলায় বললেন, “তার উপরে আছে ভাগ-রাখালি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা আবার কী বস্তু?”
রঙ্গনাথ বললেন, “আপনারা শহরে থাকেন তো, তাই শুধু ভাগচাষের কথাটাই আপনাদের কানে গিয়ে পৌঁছয়। তাও পৌঁছত না, যদি না আজকাল ভাগচাষ নিয়ে এত ফৈজত লেগে থাকত। আসলে ভাগ-রাখালিও ভাগেরই ব্যাপার। তফাত শুধু এই যে, এটা ফসলের ভাগ নয়, দুধের ভাগ।”
“তার মানে?”
“মানে আর কী, ধরুন আপনার গোরু কিনবার পয়সা আছে, কিন্তু গোরু চরাবার কি তার পরিচর্যা করবার সময় নেই। তখন আপনি কী করবেন? না গোরুটা আপনি এমন-কাউকে রাখতে দেবেন, যার গোরু কেনবার পয়সা নেই, কিন্তু গোরু চরাবার সময় আছে। সে আপনার গোরু চরাবে, তার পরিচর্যা করবে, তারপর সকালবেলায় গোরু দুইয়ে যে দুধ পাবে, তার অর্ধেকটা নিজে রেখে বাকি অর্ধেকটা আপনাকে দিয়ে আসবে। ওই যে অর্ধেকটা নিজে রাখল, তাও যে তার পেটে যাবে, তা নয়, সেটুকুও সে আর-কাউকে বেচে দেবে। তা নইলে সে চাল কিনবে কী দিয়ে? কিন্তু সে-কথা থাক। যা বলছিলাম, সেই কথা বলি। গ্রামদেশে এই ভাগ-রাখালির কাজটা সাধারণত সাত-আট বছরের বাচ্চারাই করে। তা এত সব খাটা াটনি করে আর লেখাপড়া করবার সময় তারা কোত্থেকে পাবে?”
হাসিমারার কাছে হাইওয়ে থেকে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে যে সরু রাস্তা ধরে কাল রাত্তিরে আমরা মুকুন্দপুরে এসে পৌঁছেছিলুম, সরু হলেও সেটা পিচ দিয়ে বাঁধানো। রাত্তিরে ঠিক ঠাহর হয়নি, এখন সকালবেলায় বোঝা গেল যে, মুকুন্দপুরকে পুব আর পশ্চিম, এই দুটো পাড়ায় ভাগ করে দিয়ে সেই রাস্তাটা সোজা উত্তরে চলে গিয়েছে।
উত্তরে কোন পর্যন্ত গিয়েছে, জিজ্ঞেস করতে রঙ্গনাথ বললেন, “কথা তো ছিল যে, দমনপুর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যে-পথটা ভুটানের দিকে চলে গিয়েছে, এটাকে টেনে নিয়ে তার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সে তো এখানে আসবার পর থেকেই শুনছি, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। খানিকটা এগোলেই দেখবেন যে, পিচ নেই, থাকবার মধ্যে আছে খোয়া, তারপরে সেই খোয়াও নেই। স্রেফ কাঁচা রাস্তা। কে যেন একটা মামলা ঠুকে দিয়েছিল। ব্যস্, বছরের পর বছর সেই মামলা চলছে, রাস্তার কাজ বন্ধ।”
বললুম, “মাঝে-মাঝে তো ট্রাক চলতে দেখছি। ওগুলো আসছে কোত্থেকে? এদিকে যাচ্ছেই বা কোথায়?”
রঙ্গনাথ বললেন, “ওগুলো দূরপাল্লার ট্রাক নয়। কাছেই একটা শালজঙ্গলের ইজারা নিয়ে ঠিকেদাররা গাছ কাটছে, তারপর ট্রাক বোঝাই করে কাঠ চালান দিচ্ছে শিলিগুড়িতে। জঙ্গল তো প্রায় সাফ হয়ে গেল, শুনছি ডিসেম্বর নাগাদ ঠিকেদারদের কাজ ফুরোবে। তারপর যতদিন না আবার নতুন করে কাছেপিঠে কোনও জঙ্গল সাফ করা হয়, ততদিন আর এই রাস্তায় ট্রাক দেখা যাবে না।”
গল্প করতে করতে আমরা রঙ্গনা নবাবুর বাড়িতে চলে এসেছিলুম। বাড়ির দাওয়ার একটা বাদুর বিছিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “বসুন। একটু চা করি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, চায়ের জন্য ব্যস্ত হবেন না।”
রঙ্গনাথ হেসে বললেন, “আরে মশাই, চা আমিও খাব। আপনারা বসে গল্প করুন, শামি এক্ষুনি আসছি।” বলে তিনি উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন।
বাড়িটি ছোট, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। ঘর মাত্র দুটি। একটি শোবার, একটি রান্নার। দুই ঘরের মধ্যে উঠোন। উঠোনের একদিকে লাউমাচা। মাচার পাশে দুটি পেঁপেগাছ। অন্যদিকে ফুলবাগান। বেশির ভাগই গোলাপ। কিছু বেলফুলের চারাও রয়েছে। আর রয়েছে লতানে জুঁই। রান্নাঘরের চালে একটি চালকুমড়োও দেখা গেল।
রঙ্গনাথ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। হাতে কাঁসার থালা। তার উপরে কাচের গেলাসে চা। আমরা দুটো গেলাস তুলে নিলুম। রঙ্গনাথ বললেন, “আমার গিন্নিকে চা দিয়ে এক্ষুনি আসছি।” ঘরে ঢুকে চা দিয়ে বেরিয়ে এসে আমাদের পাশে বসে নিজের গেলাসটা তুলে নিয়ে বললেন, “চায়ের সঙ্গে কিছু দিতে পারলুম না। কী করেই বা দেব। ভদ্রমহিলা বাতের ব্যথায় শয্যাশায়ী। আজ একাদশী তো, ব্যথাটা বেড়েছে। নড়তে পারছেন না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি, কিছু মনে করবেন না তো?”
রঙ্গনাথ হেসে বললেন, “কিন্তু-কিন্তু করছেন কেন? আমরা গ্রামের মানুষ, অত মনে-করাকরির ব্যামোতে ভুগি না। কী জিজ্ঞেস করবেন করুন, উত্তরটা দিতে পারলে দেব, না দিতে পারলে দেব না, ব্যস্।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশবাবুদের মনসামূর্তি যে চুরি হয়ে গিয়েছে, তা আমরা জানতুম না, এখানে এসে শুনছি। শুনে অবধি ভাবছি যে, এ-কাজ কে করতে পারে। তা আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?”
“কাউকে মানে এই গ্রামের কাউকে?
“হ্যাঁ।”
“গাঁয়ের লোক এ-কাজ করবে কেন?”
“টাকার জন্যে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানেন তো, এখানে-ওখানে বিস্তর মূর্তি চুরি করে আজকাল বিদেশিদের কাছে বেচে দেওয়া হচ্ছে, আর তার জন্যে টাকাও পাওয়া যাচ্ছে বিস্তর।”
চায়ের গেলাসে শেষ চুমুক দিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রাখলেন রঙ্গনাথ। তারপর বললেন, “কাগজে এইরকম খবর দেখেছি বটে। কিন্তু এ-গাঁয়ের লোকদের তো দেখছেন, খবরের কাগজ পড়বার মতন বিদ্যে এদের নেই। সুতরাং মূর্তিও যে বিক্রি করা যায়, আর দামও পাওয়া যায় প্রচুর, তা এদের জানবার কথা নয়।”
“বাইরের লোক এসে এদের জানাতে পারে।”
“তেমন কোনও লোক এলে নিশ্চয় দেখতে পেতুম। কিন্তু কই, দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”
“সত্যপ্রকাশবাবুর খুড়োমশাইটি তো এক হিসেবে বাইরের লোক।”
“খুড়োমশাই?” অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন রঙ্গনাথ। তারপর বললেন, “মানে ওই সাধুবাবা?”
“হ্যাঁ। তা ‘খুড়োমশাই’ শুনে অবাক হয়ে গেলেন কেন?” ভাদুড়িমশাই লিলেন, “উনি যে সত্যপ্রকাশের সেই হারিয়ে-যাওয়া কাকা চিত্তপ্রকাশ, তা নিয়ে আপনার সন্দেহ আছে নাকি?”
আচমকা এই রকমের একটা প্রশ্ন করা হবে তাঁকে, বঙ্গনাথ সম্ভবত তা আঁচ করতে পারেননি। অন্তত আমার মনে হল, ধীরস্থির ঠান্ডা স্বভাবের মানুষটি যেন হঠাৎ একটু সংকুচিত হয়ে পড়েছেন। কুণ্ঠিত গলায় বললেন, “না না, আমার কেন সন্দেহ থাকবে? আমি তো ওঁর ছেলেবেলায় ওঁকে দেখিইনি, তাই সন্দেহ থাকা না-একার কোনও প্রশ্নই আমার ক্ষেত্রে, উঠছে না। আর তা ছাড়া সত্যপ্রকাশের আমি আশ্রিত, সে যখন তার কাকা বলে সাধুবাবাকে মেনে নিয়েছে, তখন সেটাই তো আমার পক্ষে যথেষ্ট।”
ব্যাপারটা এখানেই মিটে যেতে পারত। ভাদুড়িমশাই কিন্তু মিটে যেতে দিলেন না। বললেন, “চিত্তপ্রকাশের ছেলেবেলায় আপনি তাঁকে না-দেখে থাকতে পারেন, কিন্তু এই গ্রামের বেউ-কেউ দেখেছেন নিশ্চয়? মানে যারা বুড়োমানুষ, তাদের কথা বলছি। তাদের কারও মনে সন্দেহ নেই?”
“এ-সব কথা না উঠলেই ভাল ছিল।” রঙ্গনাথ বললেন, “কিন্তু যখন উঠেছেই, আর আপনারা যখন সত্যপ্রকাশের বন্ধু, তার ভালই চান, তখন বোধহয় বলা-ই ভাল। হ্যাঁ, সন্দেহ তো আছেই, রাগও আছে। রাগ অবশ্য শুধু বুড়োদের নয়, বলতে গেলে প্রায় সকলেরই।”
“রাগ কেন?”
“বাঃ, রাগ হবে না? আপনি যাঁকে দেবতা বলে মানেন, যাঁকে পুজো করেন, যিনি আপনাকে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচাচ্ছেন বলে আপনি বিশ্বাস করেন, কেউ তাঁর নিন্দেমন্দ করলে আপনার রাগ হবে না?”
“সাধুবাবা আপনাদের মনসাদেবীর খুব নিন্দেমন্দ করছেন বুঝি?”
“অতি বিচ্ছিরি ভাষায় করছেন,” রঙ্গনাথ বললেন, “তার উপরে আবার সেটা করছেন একেবারে প্রকাশ্যে। ত্রিশূল উঁচিয়ে গাঁয়ের এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো পর্যন্ত চেঁচিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন যে, ব্যাঙখেকো কানিটা বিদেয় হয়েছে, বাঁচা গেছে। ফের যদি ফিরে আসে তো ত্রিশূল দিয়ে তিনি ওটাকে গেঁথে ফেলবেন।”
“ওরেব্বাবা,” আমি বললুম, “এ তো খুবই ভয়ঙ্কর ব্যাপার!”
“তা তো বটেই, কিন্তু আসল ভয় তো সেখানে নয়,” রঙ্গনাথ বললেন, “ভয়টা এইখানে যে, ব্যাপারটা এখন গ্রামের লোকদেরও সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন রঙ্গনাথ। তারপর নিচু গলায় বললেন, “যা বুঝতে পারছি, একটা খুনোখুনি হয়ে যাওয়াও কিছু বিচিত্র নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বটে? তা সত্যপ্রকাশবাবুকে কথাটা আপনি বলছেন না কেন? ব্যাপারটা যে এতদূর গড়িয়েছে, এটা জানলে তিনি হয়তো তাঁর খুড়োমশাইকে একটু সাবধান করে দিতে পারেন।”
রঙ্গনাথ আবার সেই কুণ্ঠিত গলায় বললেন, “সত্য আমাকে শ্রদ্ধাভক্তি করে ঠিকই, কিন্তু আমি তো ওর মাইনে খাই, সেদিক থেকে আমি ওর কর্মচারী। বুঝতেই পারছেন, কর্মচারী হয়ে মনিবকে তার কাকার বিরুদ্ধে কিছু বলা আমার শোভা পায় না।”
কথা আর এগোল না, কেননা বছর চল্লিশেক বয়সের একটি বউ এই সময়ে রঙ্গনাথের বাড়িতে এসে ঢুকল। ঢুকে আমাদের দেখে হকচকিয়ে গেল একটু। তারপর ঘোমটা টেনে রঙ্গনাথকে বলল, “ঠানদি’র সঙ্গে একটা কথা ছিল। তিনি কোথায়?”
রঙ্গনাথ বললেন, “ঠানদি আজ আর উঠতে পারছেন না, শুয়ে আছেন।”
বউটি গিয়ে ঘরে ঢুকল। কিছু একটা কথা বলল রঙ্গনাথের স্ত্রীকে। তারপর ঘোমটা টানা অবস্থাতেই ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে এসে রঙ্গনাথকে বলল, “ঠানদি আপনাকে ডাকছেন।”
রঙ্গনাথ আমাদের বললেন, “গাঁয়ের লোকেরা আপদে-বিপদে আমাদের কাছে পরামর্শ চাইতে আসে। এরও কোনও সমস্যা হয়েছে নিশ্চয়। আপনারা একটু বসুন। আমি এখুনি আসছি।”
রঙ্গনাথ ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন।
ঘরের মধ্যে নিচু গলায় কথা হচ্ছিল। কিন্তু এতটা নিচু গলায় নয় যে, একেবারেই শোনা যাবে না।
মিনিট তিন-চার বাদেই রঙ্গনাথ বেরিয়ে এলেন। বললেন, “অনর্থক আপনাদের বসিয়ে রাখলুম। বউটির সঙ্গে আমাকে একবার ওদের বাড়িতে যেতে হবে।”
আমরাও উঠে পড়েছিলুম। ভাদুড়িমশাই বলঢ়োন, “অনেক বেলা হল। ত্যপ্রকাশবাবু হয়তো আমাদের অপেক্ষায় রয়েছেন। আমরাও চাল রঙ্গনাথবাবু। পরে আবার কথা হবে।”
বাড়ির বাইরে এসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঘরের মধ্যে কী কথা হচ্ছিল, শুনলেন কিছু?”
বললুম, “সবটা শুনিনি। তবে শেষের দিকে রঙ্গনাথ যা বললেন, সেটা শুনেছি।”
“কী বললেন?”
“বললেন, ‘যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো।’ তারপরেই উনি মর থেকে বেরিয়ে এলেন।”
“কথাটার মানে কিছু বুঝতে পারছেন?”
বললুম, “ঠিক যে বুঝতে পারছি তা নয়, তবে আন্দাজ করতে পারছি।”
ভাদুড়িমশাই তাঁর তালুতে জিভ ঠেকিয়ে আক্ষেপের শব্দ করে বললেন, “সবটাই শোনার দরকার ছিল। তা হলে আর আন্দাজ করতে হত না, স্পষ্ট বুঝতে পারতেন।”
