মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

দশ

পকেট থেকে দেশলাই বার করে ফের হ্যারিকেনটা জ্বাললুম। তারপর ভাল করে একবার দেখে নিলুম ঘরখানা। পাশাপাশি দুটি খাট। ঘরের দু’দিকে দুটি টেবিল আর চেয়ার। টেবিলের উপরে এক প্যাকেট করে সিগারেট, একটা ছাইদান, এক বাক্স দেশলাই, লেখার প্যাড আর ডট পেন। দুটি টেবিলেরই পাশে একটা করে ইজিচেয়ার

 

খাটের উপরে টান করে বিছানা পাতা। ইংলিশ নেটের মশারি খাটিয়ে বিছানায় বেশ যত্ন করে গুঁজে রাখা হয়েছে। পায়ের কাছে একটি করে লাইসাম্পি। খাটের দু’দিকে দুটি টিপাই। তাতে জলের জাগ আর কাচের গেলাশ। গেলাশের উপরে চিনেমাটির রেকাবি।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যত্নের ত্রুটি নেই দেখছি। প্রয়োজন আর স্বাচ্ছন্দ্য, দু’দিকেই নজর রাখা হয়েছে।”

 

বললুম, “তা যা বলেছেন।”

 

জাগ্ থেকে গেলাশে জল ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “বড্ড তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল। নিন, আর কথা নয়, এবারে শুয়ে পড়ুন। আলোটা বরং ওদিকের টেবিলে নিয়ে যাচ্ছি, আমি একটু পরে শোব।”

 

শুয়ে তো পড়লুম। কিন্তু তক্ষুনি-তক্ষুনি যে ঘুম এসে গেল, তা নয়। সায়েবরা এই অবস্থায় ভেড়া শুনতে বলে। আমার ঠাকুমা শিখিয়েছিলেন পাখি গুনতে। ‘মনে-মনে ভাববি যে, মস্ত একটা খাঁচার মধ্যে হাজার খানেক পাখিকে আটকে রাখা হয়েছে। মনে-মনেই তুই সেই খাঁচার দরজাটা খুলে দিবি, তারপর দেখবি যে, একটার পর একটা পাখি সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তুইও অমনি গুনে যাবি এক….দুই…তিন…চার…।’

 

গুনতে গুনতে ঘুম এসে যায়। আজ কিন্তু এই ওষুধটা একেবারেই কাজ দিচ্ছিল না। যতবার পাখি শুনবার চেষ্টা করি, ততবারই সেই মনসামূর্তি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গ্রামদেশে আমি মনসাদেবীর যে মাটির প্রতিমা দেখেছি, তাতে তাঁর গায়ের রং হলুদ। কোথাও-কোথাও সেই হলুদের মধ্যে একটু লালের আভাস পাওয়া যায়। এ-মূর্তি সে-ক্ষেত্রে মাটির নয়, পাথরের। তাও কষ্টিপাথরের গাত্রবর্ণ তাই নিকষ কালো। কিন্তু সেই কালো কী আশ্চর্য কালো! কী উজ্জ্বল, কী লাবণ্যময়! চোখ আর ঠোঁটের হাসিটাই বা কী অসামান্য! স্নেহের সঙ্গে মিশেছে প্রশ্রয়; প্রশ্রয়ের সঙ্গে মিশেছে কৌতুক। চাপা সেই হাসির কথাটাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার।

 

ঘুম আসছিল না। পাশ ফিরে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই তখনও শুয়ে পড়েননি। ওদিকের টেলিসে চুপচাপ কিছু পড়ছেন। পিঠ আমার দিকে, তাই কী পড়ছেন, ঠিক বুঝতে পারলুম না। সম্ভবত মহেশ্বর চৌধুরির সেই ডায়েরি।

 

আমি যে ঘুমোইনি, ভাদুড়িমশাই সে-কথা বুঝতে পেরেছিলেন। পড়তে-পড়তেই জিজ্ঞেস করলেন, “ঘুম আসছে না বুঝি কিরণবাবু?”

 

বললুম, “না।”

 

“কী ভাবছেন এত?”

 

“মূর্তিটির কথা। মন থেকে যেন মনসাদেবী কিছুতেই বিদায় দিতে চাইছেন না। ফলে ঘুমও আসছে না।”

 

“খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।” চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে বসলেন ভাদুড়িমশাই। মশারির জালির মধ্যে দিয়ে তাঁকে আবছা-আবছা দেখতে পাচ্ছিলুম। আলোটা এখন তাঁর পিছনে, তাই তাঁকে একটা সিলুয়েট ছবির মতো লাগছিল। মুখ-চোখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। মনে হল তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সেইভাবেই বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “কশ্যপ মুনির যিনি মানসী কন্যা, তাঁর ‘মনসা’ নামের তাৎপর্য কী, সেটা জানেন তো?”

 

কন্ঠস্বরে যেন কিছুটা কৌতুক মেশানো রয়েছে। বললুম, “না।”

 

“শাস্ত্রে বলেছে, মনুষ্যমনে তিনি ক্রীড়া করেন, তাই তাঁর নাম ‘মনসা’। আপাতত আপনার মনের উপরে তাঁর খেলা চলছে। খেলাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনার ঘুম আসবে না।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে আমি আবার পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে পাখি গুনতে লাগলুম।

 

ঘুম এসেছিল একেবারে শেষ রাত্তিরে। তাও অতি গোলমেলে ঘুম। খুবই বিচ্ছিরি রকমের স্বপ্ন দেখেছিলুম। এমন স্বপ্ন, যার কোনও মাথামুন্ডু হয় না। স্বপ্নের মধ্যেই আমি ফিরে গিয়েছিলুম আমার ছেলেবেলায়। ‘লতা’ শব্দের তুর্থীর বহুবচন কী, সেটা বলতে পারিনি, তাই পন্ডিতমশাই একটা মস্ত বড় খাঁচার মধ্যে আমারে আটকে রেখেছেন, আর বেত উঁচিয়ে তাঁর নস্যিতে জড়ানো গলায় বললেন, ‘নর থেকে সাধু পর্যন্ত সকটা শব্দরূপ মুখস্থ বলা চাই, নইলে তোকে ছাড়ছি না।’ বলতে না বলতে এসে গেল কুচকুচে কানের এক মুশকো জোয়ান। হাতিবাগন বাজারের পাখিওয়ালা কালীচরণ। সে এসে এক ধাক্কা মেরে পন্ডিতমশাইকে হটিয়ে দিয়ে বলল, “না না, ওকে আটকে রাখা চলবে না। এতক্ষণ ও পাখি গুনছিল, এবার ও খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসুক, আমরাই ওকে গুনে ফেলব।’ বলেই সে খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে গুনতে শুরু করল, ‘থ্রি… সিকস… নাইন… টুয়েলভ… ফিফটিন…. এইট্রিন… টুয়েন্টি!’ আমিও ততক্ষণে খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসেছি। বেরিয়ে দেখি, কোথায় কালীচরণ, এ তো আমার ইস্কুলের বন্ধু পশুপতি, যার ডাকনাম বিল্টু। বিল্টু বলল, “পন্ডিতমশাই মারা গেছেন, তাই আজ ইস্কুল ছুটি, এখন আমরা মার্বল খেলব। আমি গিয়ে ভবানী আর বিষ্টুচরণকে ডেকে আনছি, তুই বরং গাব্বু খুঁড়ে রাখ।’ কিন্তু গাব্বুর জন্য যেই মাটি খুঁড়তে শুরু করেছি অমনি সেই গর্তের ভিতর থেকে একটা সাপ বেরিয়ে পড়ল। সাপটার মাথার উপরে কী যেন ঝকমক করছিল। পিছন থেকে কে যেন বলল, “ওটা সাতরাজার ধন মাণিক্য। আমি তো আছি, তবে আর তোর ভয় কী, ওটা তুলে নে।’ কিন্তু যেই না মণিটা তুলে নিয়ে আমার পকেটে পুরেছি, অমনি সামনের বাড়ির দরজা খুলে সত্যপ্রকাশবাবু বেরিয়ে এসে বললেন, “এই কী হচ্ছে, ওটা সাপের মাথার মণি নয়, আমার আংটির হিরে; দিয়ে দে বলছি. এক্ষুনি দিয়ে দে!’ আমি তো সত্যপ্রকাশবাবুকে দেখে অবাক। পাজামা পাঞ্জাবির বদলে তিনি একটা গেরুয়া আলখাল্লা পরেছেন, মাথার চুল জট পাকানো, হাতে একটা মস্ত ত্রিশূল। ‘কী হল, দিবি না? তবে দ্যাখ মজা!’ বলেই সেই ত্রিশূলটা আমার বুকের দিকে তাগ করে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘জয় শঙ্কর।’

 

‘জয় শঙ্কর!’

 

বিকট একটা চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। মড় করে বিছানার উপরে উঠে বসলুম আমি। প্রথমটায় কিছুই ঠাহর হল না। এমন কী, কোথায় এসে কার বিছানায় শুয়ে আছি, তাও না। একটু বাদেই মনে পড়ে গেল যে, এটা কলকাতা নয়, মুকুন্দপুর।

 

ভাদুড়িমশাইয়ের টেবিলে তখনও আলো জ্বলছে। কিন্তু তাঁকে সেখানে দেখলুম না। কোথায় গেলেন তিনি? চাপা গলায় ডাকলুম, “ভাদুড়িমশাই।”

 

ঘরের লাগোয়া বাথরুম। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল?”

 

“কিছু না। আপনি ঘুমোননি?”

 

“ডায়েরি পড়ছিলুম। এমন চমৎকার লেখা যে, শোবার কথা মনেই ছিল না। এইমাত্র শেষ হয়েছে। বাথরুমে গিয়ে চোখমুখে একটু জলের ঝাপটা দিয়ে এলুম। কিন্তু আপনি উঠে পড়লেন কেন?”

 

“একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল। বিচ্ছিরি স্বপ্ন। যেন সত্যপ্রকাশবাবু আমার বুকের উপরে ত্রিশূল উঁচিয়ে ধরে ‘জয় শঙ্কর’ বলে চেঁচাচ্ছেন।”

 

ভাদুড়ি মশাই হেসে বললেন, “স্বপ্ন দেখেছেন ঠিকই, তাতে সত্যবাবুকে ত্রিশূল ধারণ করতেও হয়তো দেখে থাকতে পারেন, তবে চিৎকারটা স্বপ্নের ব্যাপার নয়।”

 

“তার মানে?”

 

“মানে এই যে ‘জয় শঙ্কর’ চিৎকারটা আমিও শুনেছি।”

 

“কে চেঁচাল?”

 

“সম্ভবত সত্যবাবুর সেই খুড়োমশাই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শেষ রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে দেবাদিদেব মহাদেবের জয়ধ্বনি দিচ্ছেন।”

 

বলতে না বলতে আবার সেই পিলে কাঁপানো চিৎকার শোনা গেল: ‘জয় শঙ্কর, জয় শিবশম্ভু।’

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাত পুইয়ে এসেছে। চলুন, একটু হেঁটে আসা যাক।”

 

ঘড়ি দেখে বললুম, “তা প্রায় পাঁচটা বাজে। আপনি একটু ঘুমিয়ে নেবেন না? আমি তবু ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়েছি, আপনার তো একটুও ঘুম হয়নি। একটু ঘুমিয়ে নিন মশাই, নইলে নির্ঘাত অসুস্থ হয়ে পড়বেন।”

 

“পড়লেই হল?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শরীরকে অত আশকরা দিতে নেই। একটা রাত্তির ঘুমোইনি তো কী হয়েছে। দুপুরে ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিলেই হবে। আপনিও তখন বাকি ঘুমটা পুষিয়ে নেবেন। চলুন এখন বেরিয়ে পড়ি।”

 

অগত্যা উঠতেই হল। ঘরের সঙ্গেই অ্যাটাচ্‌ড্ বাথ। তাতে বিশাল বিশাল দুই ড্রাম জল ধরে রাখা হয়েছে। জলের কল নেই বটে, তবে বেসিন রয়েছে একটা। চটপট মুখহাত ধুয়ে, দাড়ি কামিয়ে গায়ে জাম্পার চড়িয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে চারদিকটা একটু ঘুরে দেখবার জন্যে বেরিয়ে পড়লুম।

 

বাইরে তখনও আবছা অন্ধকার, ভাল করে আলো ফোটেনি, বাতাসে হালকা কুয়াশা। গাছের পাতা আর টিনের চাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় হিম গড়িয়ে পড়ছে। শিশিরে ভিজে রয়েছে পায়ের তলার মাটি আর ঘাস। পাখি ডাকছে, তবে মানুষজনের গলা কোথাও শোনা যাচ্ছে না। সাধুবাবা জেগেছেন ঠিকই, কিন্তু গোটা গ্রাম এখনও ঘুমে অচৈতন্য।

 

যে-ঘরটায় আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে, তার একদিকে ভিতরের উঠোন, আর অন্যদিকে বাইরের উঠোন। আমরা বাইরের দিকের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছি। উত্তরে মন্দির। উঠোন পেরিয়ে আমরা মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম।

 

আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু অস্বস্তিটা যে কীসের তা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলুম না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *