মউলির রাত (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
মউলির রাত
পাকদণ্ডীটা সামনে বড় খাড়া।
দুপুরে ঝরনার পাশে খিচুড়ি ফুটিয়ে খাওয়ার পর থেকে প্রায় পাঁচ মাইল হেঁটেছি আমি আর জুডু; তাও প্রায় বেশির ভাগই চড়াইয়ে-চড়াইয়ে। উত্রাই প্রায় পাইনি বলতে গেলে।
এদিকে বেলা যেতে আর বেশি দেরি নেই। পশ্চিমের দরের পাহাড় দুটোর মাঝখানে যে একটা ত্রিকোণ ফাঁক, সূর্যটা সেই ফাঁকের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্যে একটা পাঁচনম্বরী লাল ফুটবলের মতো স্থির হয়ে রয়েছে। বলটা গড়িয়ে পাহাড়ের ঢালে নামলেই ঝুপ করে আলো কমে যাবে।
কিন্তু রাতের মতো তাঁবু খাটাবার জায়গার হদিস এখনও পর্যন্ত পাওয়া গেল না।
হঠাৎ জুডু বলল, এখানেই থাকব। আর যাব না।
এখনও যা আলো আছে, তাতে মিনিট পনেরো-কুড়ি যাওয়া যেত, কিন্তু হঠাৎ জুডুর এমন জোর গলায় এখানেই থাকব– কথাটার মানে বুঝলাম না।
এতক্ষণ ও আমাদের পাতলা তাঁবু, আমার স্লিপিং ব্যাগ, ওর কম্বল ও রসদের ঝুলিটা কাঁধে নিয়ে আমার পেছন-পেছন আসছিল।
হঠাৎ যেখানে ছিল ও সেখানেই থেমে গেল।
দাঁড়িয়ে পড়ে, জায়গাটা ভাল করে দেখলাম।
তাঁবু যে ফেলা যায় না, তা নয়; তবে এর চেয়েও ভাল জায়গা নিশ্চয়ই পাওয়া যেত। জায়গাটা একটা পাহাড়ের একেবারে গায়ে। পুবে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রীতে উঠে গেছে ঘন জঙ্গলাবৃত পাহাড়টা। পশ্চিমে সোজা গড়িয়ে গিয়ে নীচে মিশেছে একটা উপত্যকায়। উপত্যকায় গভীর জঙ্গল। কত রকম যে গাছগাছালি তার লেখাজোখা নেই। সেই উপত্যকার গভীরে-গভীরে বয়ে গেছে একটা পাহাড়ী নদী। জুডু তার নাম জানে না।
আসলে ওড়িশার দশপাল্লা রাজ্যের বিড়িগড় পাহাড়ের এই অঞ্চলটা জুড়ুরও যে ভাল জানা নেই, তা আমি জানতাম। আমার তো নেই-ই।
আমি আর জুড় কাল বিকেল থেকে সেই বিরাট শম্বরটার খুরের দাগ দেখে দেখে পেছন-পেছন যাচ্ছি, কিন্তু এরকম অভিজ্ঞতা আমার কখনও হয়নি।
আমারও জেদ চেপে গেছে।
এরকম অতিকায় শম্বর আমার জীবনে দেখিনি আমি। দশ বছর বয়স থেকে জঙ্গলে ঘুরছি, তবুও। আমি তো কোন ছার, জুডু বলেছিল, সেও দেখেনি। এমন দাড়িগোঁফওয়ালা ও জটাজুট-সংবলিত শম্বর যে এই বিংশ শতাব্দীতেও কোনও জঙ্গলে থাকতে পারে, একথা বিশ্বাস করা শক্ত। আমার এবং আমার বন্ধু জর্জ ট্রব ও কেন্ ম্যাকার্থির পারমিটে একটা বাইসন, একটা শম্বর, একটা ভালুক ও একটা চিতা মারার অনুমতি ছিল। কিন্তু আজ সকালে একটা পাহাড়ী নদীর নালায় বসে যখন রোদ পোহাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ তিনশ গজ দূরে পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শম্বরটাকে দেখে আমার মাথা ঘুরে গেছিল। তখন আমার সঙ্গে রাইফেল ছিল না, থাকলে তক্ষুনি গুলি করতাম। তাই, জর্জ আর কেকে বলে, জুডুকে সঙ্গে নিয়ে পনেরো মিনিটের মধ্যে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম– শম্বরটাকে তার খুরের দাগ দেখে দেখে অনুসরণ করে।
আমার সঙ্গে থ্রি-সিক্সটিসিক্স বোরের একটি ম্যানলিকার রাইফেল ছিল। আজ বিকেলে শম্বরটাকে আর একবার পাল্লার মধ্যে পেয়েছিলাম। এক মুহূর্তের জন্যে। কিন্তু মুহর্তের মধ্যেই উচিত ছিল প্রথম দর্শনেই তাকে ভূপাতিত করা। রাইফেলটা আমার হাতের রাইফেল এবং নিখুঁত মার মারত। তখন কেন যে মারলাম না, এ-কথা ভাবলেই নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল।
শম্বরটাও অদ্ভুত। এ পর্যন্ত অনেক জানোয়ারকে ট্র্যাকিং করেছি, আহত ও অনাহত, কিন্তু এমনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গভীর থেকে গভীরতর, দুর্গম থেকে দুর্গমতর জঙ্গলে কোনও জানোয়ারই এরকম গা-ছমছম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে যায়নি। এমনভাবে বরাবর রাইফেলের পাল্লার বাইরেও কেউ থাকেনি। ট্র্যাকিং আরম্ভ করার পর বিকেলে সেই প্রথমবার যে তার চেহারা দেখেছিলাম, তারপর থেকে তার চেহারা সে আর একবারও দেখায়নি। দ্বিতীয়বার দেখা গেলে, সে যত দূরেই হোক না কেন, গুলি আমি নিশ্চয়ই করতাম।
হঠাৎ জুডু মালপত্রগুলো মাটিতে নামিয়ে রেখে নাক উঁচু করে বাতাসে কিসের যেন গন্ধ শুঁকতে লাগল কুকুরের মতো।
পরক্ষণেই দেখলাম, তার মুখটা ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেছে।
আমি কাঁধে-ঝোলানো রাইফেলটাকে তাড়াতাড়ি রেডি-পজিশনে ধরে ওর মুখের দিকে তাকালাম।
ও কথা না বলে বাঁ হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে রাইফেলের নলটাকে সরিয়ে দিল।
আমি অবাক হয়ে শুধোলাম, কী রে জুড়?
জুড়ু মুখে কথা না বলে শুধু দু পাশে মাথা নাড়তে লাগল জোরে জোরে। মাথা নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর দু চোখে ভয় ঠিকরোতে লাগল।
পরক্ষণেই মালপত্র কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, বাবু, এখুনি চলো এখান থেকে পালাই। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়।
আমি তেমনি অবাক হয়ে আবারও শুধোলাম, কী রে? একলা গুণ্ডা-হাতি? কিসের ভয় পেলি?
জুডু ফ্যাকাশে মুখে বিড়বিড় করে বলল, মউলি।
আবারও বিড়বিড় করে বলল, মউলি, মউলি, মউলি।
বলেই, পেছন দিকে দৌড় লাগাল।
আমি দৌড়ে গিয়ে ওর হাত ধরলাম।
ধমকে বললাম, কী, হলো কী তোর? আমার সঙ্গে তুই কি এই-ই প্রথম এলি জঙ্গলে? আমি সঙ্গে থাকতে তোর কোন জানোয়ারের ভয়?
ওড়িশার জঙ্গলে মউলি বলে কোনও জানোয়ার আছে বলে শুনিনি। প্রায় সব জানোয়ারেরই ওড়িয়া নাম আমি জানি, যেমন শজারুকে ওরা বলে ঝিংক, নীল গাইকে বলে ঘড়িং, মাউস-ডিয়ারকে বলে খুরান্টি। কিন্তু মউলি? নাঃ মউলি বলে তো কোনও কিছুর নাম শুনিনি!
ততক্ষণে জুডু থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। ওর বুকে একটা জানোয়ারের সাদা হাড় ঝোলানো ছিল লকেটের মতো, কালো কারের সঙ্গে, সেটাকে মুঠো করে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ঋজুবাবু, এক্ষুনি পালিয়ে চলো। আমরা মউলির এলাকায় এসে পড়েছি। এখানে থাকলে আমাদের দুজনের মৃত্যু অনিবার্য। ঐটা শম্বর নয়; মউলির দৃত। ও আমাদের ওর পেছনে-পেছনে দৌড় করিয়ে মউলির রাজত্বে এনে ফেলেছে। এর মানে আমাদের মরণ। এতে কোনও ভুল নেই।
আমি ওকে ধমকে বললাম, মউলি কী? আর তোর ব্যাপারটাই বা কী?
জুড় বলল, মউলি জঙ্গলের দেবতা, জানোয়ারদের দেবতা। জানোয়ারদের রক্ষা করেন মউলি। ওঁর রাজত্বে যে শিকারী ঢোকে, তাকে আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে হয় না।
আমি এবার খুব জোরে ধমক দিয়ে বললাম, থামবি তুই? তোর মউলির নিকুচি করেছি আমি।
তারপর বললাম, শীগগিরি আগুন কর, কফির জল চড়া; তারপর রান্নার ব্যবস্থা কর। ততক্ষণে আমি তাঁবু খাঁটিয়ে নিচ্ছি।
মনে মনে বললাম, যত সব অশিক্ষিত কুসংস্কারাবদ্ধ জংলী লোক। জঙ্গলের দেবতা না মাথা। কত জঙ্গলে রাতের পর রাত কত অচেনা অজানা ভয়াবহ পরিবেশে কাটালাম, আর ও আমাকে মউলির ভয় দেখাচ্ছে!
জুডু হঠাৎ আমার দিকে একবার চকিতে চেয়েই, মালপত্র ফেলে রেখে সটান দৌড় লাগাল। পেছন দিকে।
রাইফেলটা হাতেই ছিল। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ওকে ভয় পাওয়ানোর জন্যে বললাম, জুডু, তোকে আমি গুলি করব, যদি পালাস।
কিন্তু জুডু তবুও শুনল না।
তখন মুহূর্তের মধ্যে জুড়ুকে সত্যি ভয় পাওয়াবার জন্যে আমি আকাশের। দিকে ব্যারেল তুলে একটা গুলি ছুঁড়লাম।
গুলির শব্দে জুডু থমকে দাঁড়াল। ভাবল, ওর দিকে নিশানা করেই বুঝি বা গুলি ছুঁড়েছিলাম।
আমি বললাম, এক্ষুনি ফিরে আয়, নইলে তোকে এই জঙ্গলেই মারব আমি, তোর মউলি তোকে মারবার আগে।
জুডু কাঁপতে কাঁপতে, মউলির ভয়ে না আমার ভয়ে জানি না, ফিরে এল।
ওকে ভয় দেখানো ছাড়া আমার কোনও উপায় ছিল না। কারণ, জঙ্গল-পাহাড়ের এদিকটা আমার একেবারেই অচেনা। আমি একা-একা কিছুতেই আমাদের ক্যাম্পে ফিরতে পারতাম না। সেখান থেকে বহু দূরে চলে এসেছিলাম আমরা। সঙ্গের রসদও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। শুধু এক রাতের মতো তৈরি হয়ে এসেছিলাম। জুড়ু চলে গেলে আমার সত্যিই বিপদ হবে।
বাধ্য হয়ে জুড়ু এবার আগুন করল, কফির জল চাপাল, তারপর তাঁবুটা খাটাতে ও আমাকে সাহায্য করল।
ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে। প্রথম রাতেই চাঁদ ওঠার কথা ছিল, কিন্তু আমরা মাথা-উঁচু পাহাড় ঘেরা এমন একটা খোলের মধ্যে এসে পৌঁছেছি যে, এখান থেকে চন্দ্র-সূর্য কিছুই সহজে দেখা যাবার কথা নয়।
গরমের দিন হলেও, এ জায়গাটা বেশ ভিজে স্যাঁতসেঁতে, বোধ হয় অনেক নদী-নালা আছে বলে। নইলে শম্বরটাকে পায়ের দাগ দেখে ট্রাক করা সম্ভব হত না আমাদের পক্ষে।
এদিকটা ভিজে ভিজে হলেও, পশ্চিমের পাহাড়গুলোতে দাবানল লেগেছে। একটা বড় পাথরে বসে কফি খেতে খেতে, পাইপটাতে তামাক ভরতে ভরতে আমি সেই আগুনের মালার দিকে চেয়ে ছিলাম। ভারী চমৎকার লাগছিল এক পাহাড়ের গায়ে বসে, উপত্যকা-পেরুনো দূরের অন্য পাহাড়ের গায়ের আগুনের মালা দেখতে। ঐদিকে আগুন জ্বলাতে চারদিক দিয়ে গরম হাওয়া ছুটে আসছিল এদিকে।
হঠাৎ লক্ষ করলাম যে, জুডু কফি খাচ্ছে না, হাঁটু গেড়ে বসে সেই পশ্চিমের আগুনের দিকে চেয়ে কী সব মন্ত্র-টন্ত্র পড়ছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে যে, ও এ-জগতে নেই। ওর চোখের ভাব এমন হয়ে গেছে যে, মনে হচ্ছে ও আমাকে চেনে না।
ওর ঐসব প্রক্রিয়া শেষ করে জুডু আবারও আমাকে অনুনয়-বিনয় করে বলল, তোমার পায়ে পড়ি, এখনও পালিয়ে চলল।
আমি নিঃশব্দে ওকে পাশে রাখা আমার রাইফেলটিকে ইশারা করে দেখালাম।
ও চুপ করে গেল। রান্নার বন্দোবস্ত করতে লাগল। রান্না মানে চাল, ডাল আর তার সঙ্গে দু একটা আলু, পেঁয়াজ ও কাঁচালঙ্কা ছেড়ে সেদ্ধ করে নেওয়া।
খিচুড়িটা চাপানো হয়ে গেলে, পাইপটা ধরিয়ে, জুডুকে ডাকলাম আমি। ব্যাগ থেকে একটা বিড়ির বাণ্ডিল বের করে ওকে দিয়ে বললাম, এবার বল দেখি তুই, এই মউলির ব্যাপারটা কী? সব ভাল করে বল, খুলে বল।
জুডু একটা বিড়ি ধরিয়ে, পশ্চিমের দিকে পেছন ফিরে উবু হয়ে জানোয়ারের মতো বসে, বিড়বিড় করে বলতে লাগল।
জুডু উপজাতীয় মানুষ। ওরা খন্দ। ওদের মধ্যে অনেক সব বিশ্বাস, সংস্কার আছে; কিন্তু জুডুকে ভীতু আমি কখনোই বলতে পারব না। বরং বলব যে, আমার দীর্ঘ শিকারী জীবনে এমন সাহসী ও অভিজ্ঞ ট্র্যাকার আমি খুব কমই দেখেছি। ওর সাহস আমার চেয়ে কম তো নয়ই, বরং বেশিই।
তাই পাইপ টানতে টানতে জুডুর এই মউলি বৃত্তান্ত আমি খুব মনোযোগের সঙ্গে শুনতে লাগলাম।
জুডু চোখ বড় বড় করে, কিন্তু ফিসফিস করে বলছিল। যেন ওর কথা অন্য কেউ শুনে ফেলবে।
বলছিল– ঋজুবাবু, আমাদের অনেক দেবতা। টানা পেনু, ডারেনী পেনু, টাকেরী পেনু, খ্রিভি পেনু, কাটি পেনু, এসু পেনু, সারু পেনু।
টানা পেনু আর ডারেনী পেনু একই দেবী। তিনি হচ্ছেন গ্রামের দেবী। গ্রামকে বাঁচান। প্রতি গ্রামের পাশে এই দেবীর পাথরের ঠাঁই থাকে। ডারেনী পেনুর বন্ধু টাকেরী পেনু এবং ডারেনী পেনুর ভাই স্রিভি পেনু। স্রিভি পেনুর মারফতই যত পুজো, আরজি, আবদার করতে হয় আমাদের।
কিন্তু মউলি?
নামটা উচ্চারণ করেই জুড়ু একবার এদিক-ওদিক দেখে নিল, তারপর গলা আরও নামিয়ে বলল, মউলি জঙ্গলের দেবতা। আমরা তাকে বড় ভয় পাই। তাকে পুজো দেওয়া তো দূরের কথা, মউলি যেখানে থাকে আমরা তার ধার-কাছ পর্যন্ত মাড়াই না।
জুড়ু এই অবধি বলে, থেমে গিয়ে বলল, ঐ শম্বরটা আসলে শম্বর নয়। ওটা মউলির চর। আজ রাতেই মউলি আমাদের মারবে।
আমি বললাম, চুপ কর তো। তোর মতো সাহসী, জবরদস্তু শিকারী– তুইও কি না ভয় পাস? সঙ্গে রাইফেল নেই? তোর মউলি-ফউলি সকলের পেট ফাঁসিয়ে দেব হার্ড-নোজড় বুলেট মেরে।
জুডু ইলেকট্রিক শক্ খাওয়ার মতো চমকে উঠল। দু কানে দু হাত দিয়ে বলল, অমন বলতে নেই বাবু। পাপ হবে, পাপ হবে। ঐ রাইফেলটা সঙ্গে থেকেই যত বিপদ। আজ রাত কাটলে হয়!
আমি আবার ওকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, তোর কোনও ভয় নেই, ভাল করে খিচুড়িটা রাঁধ দেখি, খিদে পেয়ে গেছে। আর আগুনটা জোর কর। অজানা-অচেনা জায়গা, হাতি থাকতে পারে, বাঘ থাকতে পারে, আগুনে আরও কাঠকুটো এনে ফেল যাতে সারা রাত আগুনটা জ্বলে। একেবারে অচেনা জায়গায় তাঁবু ফেলে নিশ্চিন্ত থাকা ঠিক নয়। হয়তো এর ধারেকাছেই জানোয়ার-চলা সঁড়িপথ থাকবে।
জুডুকে বললাম বটে আগুনটা জোর করতে, কিন্তু মনে হল না, ও এই তাঁবুর সামনে থেকে এক পা-ও নড়বে।
তাই পাইপের ছাই ঝেড়ে উঠে আমিই এদিক ওদিক গিয়ে শুকনো ডাল, খড়কুটো কুড়িয়ে আনতে গেলাম।
যখন নিচু হয়ে ওগুলো কুড়োচ্ছি, তখন হঠাৎ আমার মনে হল, আমার চারপাশে যেন কাদের সব ছায়া সরে সরে যাচ্ছে। কারা যেন ফিফিস্ করে কথা বলছে।
একটা ডাল কুড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানো মাত্রই আমার মনে হল, আমি যেন আমার সামনের অন্ধকার থেকে সেই অন্ধকারতর অতিকায় শম্বরটাকে সরে যেতে দেখলাম। শম্বরটা সরে গেল, কিন্তু কোনও শব্দ হল না।
আমি স্তব্ধ হয়ে রইলাম এক মুহূর্ত।
পরক্ষণেই আমার হাসি পেল। নিজেকে মনে মনে আমি খুব বকলাম। লেখাপড়া শিখেছি, বিজ্ঞানের যুগে এসব কী যুক্তিহীন ভাবনা? তা ছাড়া, এরকম অচেনা পরিবেশে গভীর জঙ্গলে এই-ই তো আমার প্রথম রাত কাটানো নয়। ছোটবেলা থেকে আমি এই জীবনে অভ্যস্ত। এতে কোনও বাহাদুরি আছে বলে ভাবিনি কখনও। বরং চিরদিনই এই জীবনকে ভালবেসেছি। উপরে তারা-ভরা আকাশ, রাত-চরা পাখির ডাক, দূরের বনে বাঘের ডাক আর হরিণের টাউটাউ, এ সমস্ত তো চিরদিনই ঘুমপাড়ানী গানের মতোই মনে হয়েছে। এসবের মধ্যে কখনই কোনও ভয় বা অসঙ্গতি তো দেখিনি!
অথচ আজ কেন এমন হচ্ছে?
ফিরে এসে আগুনটা জোর করে দিয়ে পাথরটার উপরে বসে আমি পশ্চিমের পাহাড়গুলোর দিকে চেয়ে রইলাম। দাবানলের মালা পাহাড় দুটোকে যেন ঘিরে ফেলেছে। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে, তা বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই। নীচের খাদ থেকে একটা নাইট-জার পাখি সমানে ডেকে চলেছে– খাপু-খাপু-খাপু-খাপু-খাপু।
মাঝে-মাঝে বিরতি দিচ্ছে, আবার একটানা ডেকে চলেছে অনেকক্ষণ।
আগুনে ফুটফাট শব্দ করে কাঠ পুড়ছে। আগুনের ফুলঝুরি উঠছে। তারপর ফুলঝুরির মাথায় উঠে গিয়ে কাঠের কালো ছাইয়ের গুঁড়ো গোলমরিচের গুঁড়োর মতো নীচে এসে পড়ছে।
ঐদিকে তাকিয়ে বসে থাকতে-থাকতে হঠাৎই আমার খেয়াল হল যে, আজ চারিদিকের পাহাড় বনে একক নাইট-জারটার খাপু-খাপু-খাপু-খাপু আওয়াজ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই। আমাদের পাশেই তিরতির করে একটা ঝরনা বইছে, সেটা গিয়ে মিশেছে উপত্যকার নালায়, যেখানে ভাল জল আছে। এই গরমের দিনে সাধারণত এমন জায়গায় বসে থাকলে নীচের উপত্যকায় নানারকম জানোয়ারের চলাফেরার বিভিন্ন আওয়াজ শোনা যেত। হায়েনা হেঁকে উঠল হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ করে বুক কাঁপিয়ে। হয় উইয়ের ঢিবির কাছে, নয় মহুয়াতলায় ভাল্লুক নানারকম বিশ্রী আওয়াজ করে উই খেত বা মহুয়া খেত। আমলকীতলায় কোটরা হরিণের ব্রাক ব্বা ডাক শোনা যেত। অ্যালসেশিয়ান কুকুরের ডাকের মতো।
কিন্তু আজ রাতের সমস্ত প্রকৃতি যেন নিথর, নিস্তব্ধ। এমন কী, পেঁচার ডাক পর্যন্ত নেই। চতুর চিতার তাড়া-খাওয়া হনুমান দলের হু-হুঁ-হুঁ-হুঁপ ডাকে রাতের বনকে মুখরিত করা নেই। আজ কিছুই নেই।
বসে থাকতে-থাকতে হঠাৎ আমার মনে হল, আমি যে পাথরটায় বসেছিলাম, ঠিক তার পেছনে আমার গা-ঘেঁষে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। কোনও মানুষ! আমি যেন আমার খাকি বুশ-শার্টের কলারের কাছে তার নিশ্বাসের আভাস পেলাম।
চমকে পেছন ফিরেই দেখি, না, কেউ নেই তো!
একটা একশো বছরের পুরোনো জংলী আমগাছ থেকে ঝুপ করে শুকনো পাতার উপর হাওয়ায় একটা আম ঝরে পড়ল। সেই নিস্তব্ধ রাতে সেই আওয়াজটুকুকেই যেন বোমা পড়ার আওয়াজ বলে মনে হল।
ওখানে বসে বসে আমি লক্ষ করছিলাম যে, জুডু রান্না করতে করতে মাঝে মাঝেই বাঁ হাত দিয়ে ওর গলার হাড়ের লকেটটাকে মুঠি করে ধরছিল।
আমি উৎসুক হয়ে শুধোলাম, ওটা কিসের হাড় রে জুডু?
জুডু আমার কথায় চমকে গিয়ে কেঁপে উঠল।
তারপর সামলে নিয়ে বলল, এটা অজগরের হাড়, মন্ত্ৰপড়া। আজ আমাকে বাঁচালে এই হাড়টাই বাঁচাবে মউলির হাত থেকে। আমার দিদিমা আমার ছোটবেলায় মন্ত্র পড়ে এই হাড়টা আমায় দিয়েছিল।
আমি হাড়টার দিকে অপলকে চেয়ে রইলাম। অজগরের হাড় আমি কখনই দেখিনি। আগুনের আলোকে সেই হাড়টা রঙ বদলাচ্ছে বলে মনে হল।
খাওয়া-দাওয়ার পর আমি আবার পাইপ ধরিয়ে বাইরে বসেছি পাথরটার উপর, এমন সময় জুডু যা কখনও করেনি তাই করল।
আমার কাছে এসে বলল, বাবু, আজ আমি কিন্তু তাঁবুর মধ্যে তোমার কাছে। শুয়ে থাকব।
আমি অবাক হলাম।
তারপর বললাম, তাই-ই শুস।
যাকে মানুষখেকো বাঘের জঙ্গলে কখনও গালাগালি করেও তাঁবুর মধ্যে শোয়াতে পারিনি, সে বরাবর বলেছে, আমার দম বন্ধ লাগে তাঁবুর মধ্যে সেই জুড়ু আজ স্বেচ্ছায় তাঁবুর মধ্যে শুতে চাইছে!
আমি পশ্চিমের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জুডু আগুনের পাশেই বসে সেই তিরতিরে ঝরনায় আমাদের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িটা, এনামেলের থালা দুটো ও কফির কাপ দুটো ধুচ্ছিল।
এমন সময় হঠাৎ দেখলাম, যেন কোনও মন্ত্রবলে পশ্চিমের পাহাড়ের দাবানলগুলো সব একই সঙ্গে নিভে গেল। মনে হল, কে যেন পা দিয়ে মাড়িয়ে জঙ্গল-পোড়ানো শত সহস্র হস্ত প্রসারিত লেলিহান আগুনগুলোকে একসঙ্গে নিভিয়ে দিল।
আগুনগুলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমের দিক থেকে একটা জোর ঝড়ের মতো হঠাৎ হাওয়া উঠল।
অথচ পূর্ব মুহূর্তে সব কিছু শান্ত ছিল।
হাওয়াটা জঙ্গলের গাছগাছালিতে ঝর ঝর করে সমুদ্রের আছড়ে-পড়া ঢেউয়ের মতো শব্দ করে আমাদের দিকে ধেয়ে এল। এত জোরে এল হাওয়াটা যে, তাঁবুটাকে প্রায় উড়িয়েই নিয়ে যাচ্ছিল। আমাকেও পাথর থেকে ফেলে দেওয়ার মতো জোর ছিল হাওয়াটার।
কিন্তু আশ্চর্য! হাওয়াটা আমাদের তাঁবু অতিক্রম করে গিয়েই একেবারে মরে গেল।
কী ব্যাপার বোঝার চেষ্টা করছি, এমন সময় নীচের উপত্যকা থেকে, ক্ষেতে লাঙ্গল দেওয়ার সময় চাষারা বলদের লেজ-মুচড়ে যেরকম সব অদ্ভুত ভাষা বলে, তেমন ভাষায় কারা যেন কথা বলতে লাগল। মনে হল, কারা যেন এই এক রাতে পুরো উপত্যকাটা চষে ফেলবে বলে ঠিক করেছে।
সেই আওয়াজটাও দু মিনিট পর একেবারে বন্ধ হয়ে গেল।
একটু পরে চাঁদ উঠল।
জুডু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, বাবু, শুয়ে পড়ো। আজ আর বাইরে বেশি বসে কাজ নেই। চলো, শুয়ে পড়বে।
সত্যি কথা বলতে কী, আমার একটু যে ভয় করছিল না তা নয়। কিন্তু ভয়ের চেয়েও বড় কথা, পুরো জায়গাটা, এই রাতের বেলার জঙ্গলের অদ্ভুত শব্দ ও কাণ্ড দেখে আমার দারুণ এক ঔৎসুক্য জেগেছিল। ভূত-প্রেতে আমি কখনও বিশ্বাস করিনি। হাতে একটা রাইফেল থাকলে পৃথিবীর যে কোনও বিপদসঙ্কুল জায়গায় আমি হেঁটে যেতে পারি, রাতে ও দিনে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মানুষখেকো বাঘের থাবায় নিহত মানুষের অধভুক্ত শবের কাছেও কাটিয়েছি। একবার শুধু একটা মরামানুষের পা সটান সোজা হয়ে উঠেছিল। তখনও ভয় পাইনি, কারণ তারও একটা বুদ্ধিগ্রাহ্য কারণ ছিল। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন আমি কখনও হইনি এর আগে। ঠিক কী ভাবে এই অনুভূতিকে গ্রহণ করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
এই খন্দমালে আমার এই-ই প্রথম আসা নয়। আগেও বহুবার আমি এই অঞ্চলে এসেছি। খন্দুদের নিয়ে যতটুকু পড়াশুনা করা যায় করেছি। তাদের রীতি-নীতি দেব-দেবতা, সংস্কার-কুসংস্কার সম্বন্ধে আমি ওয়াকিবহাল।
কিন্তু জঙ্গল-জীবনের সমস্ত বিদ্যা, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এইসব কাণ্ডের কোনও ব্যাখ্যাতেই আমার পক্ষে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছিল না।
খন্দরা ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশের সীমানার গঞ্জাম জেলার একটি জায়গায় বাস করত বহু-বহু বছর আগে। জায়গাটা ছিল খুব উঁচু-উঁচু পাহাড়শ্রেণী আর জঙ্গলে ঘেরা। জায়গাটার নাম ছিল শ্ৰাম্বুলি-ডিম্বলি। সেখান থেকে এসে এরা এইখানে বাসা বাঁধে অন্যদের তাড়া খেয়ে।
ওরা মনে করত যে, এইসব মাথা-উঁচু পাহাড়ের পরই পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। ওদের রাজ্য থেকে সামনে যতদূর চোখ যায়, ততদূর আদিগন্ত এমন গভীর জঙ্গলাবৃত পাহাড় ও জমি দেখা যেত যে, তাতে মানুষ কখনও বসবাস করতে পারে একথা কেউই ভাবেনি। ওদের মধ্যে একটা জনশ্রুতি আছে যে, যখন খা এইসব পাহাড়ে এসে উপস্থিত হয়েছিল, তখন তৎকালীন পাহাড়ী আদিবাসী কুমুরা তাদের সমস্ত জমি-জমা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি খদের হাতে দিয়ে এইসব পাহাড়ের উপরের সমতল মালভূমি থেকে মেঘের ভেলায় চেপে চিরদিনের মতো অন্তর্ধান করেছিল।
খন্দরা মনে করত যে, পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা জামো পেনুর বড় ছেলের থেকে কুমুরা উদ্ভূত হয়েছে এবং খা উদ্ভূত হয়েছে জামো পেনুর সবচেয়ে ছোট ছেলের থেকে।
কিন্তু মউলি সম্বন্ধে আমি কখনও কিছু পড়িনি বা শুনিনি।
জুড়ু আবারও বলল, বাবু, শুয়ে পড়ো। বাইরে থেকো না আর।
তাঁবুর দৃপাশের পদা তোলা ছিল। গরমে এমন করেই আমরা শুই। জঙ্গলে গরমের দিনেও শেষ রাতে ভারী হিম পড়ে। তাই মাথার উপর তাঁবু থাকলেই যথেষ্ট। প্রথম রাতে গরম লাগে, তাই যাতে হাওয়া চলাচল করতে পারে তার জন্যে পদা খোলা থাকে।
তাঁবুর মধ্যে ঢুকেই জুডু বলল, বাবু, আজ পদা খুলে শুয়ো না। ওকে আমি ধমকে বললাম, চুপ কর তো তুই। গরমে কি মারা যাব নাকি?
তারপর প্রসঙ্গ বদলাবার জন্যে বললাম, শম্বরটা কোনদিকে গেছে বল তো? আমার মনে হয়, ও ধারেকাছেই আছে। হয় নীচের নালার পাশে, নয়তো সামনের মালভূমির উপরে। কাল ভোরেই ওর সঙ্গে আমাদের মোলাকাত হবে।
জুডু তাঁবুর মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে সেই অজগরের হাড়টা ছুঁয়ে কী সব বিড়বিড় করে বলল। একটা আশ্চর্য হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। ও বলল, বাবু, তুমি বিশ্বাস করছ না.যে ওটা শম্বর নয়? অতবড় শম্বর যে হয় না এ কথা আমার ও তোমার দুজনেরই বোঝা উচিত ছিল। তোমাকে বলছি আমি যে ওটা মউলির চর।
আমি যত না জুডুকে সাহস দেবার জন্যে বললাম, তার চেয়েও বেশি নিজেকে সাহস যোগাবার জন্যে আবারও বললাম, তোর মউলির নিকুচি করেছি।
বলেই, রাইফেলের বোল্ট খুলে, আরও দুটি গুলি ভরে নিয়ে ম্যাগাজিনে পাঁচটা ও ব্যারেলে একটা রেখে, সেফটি ক্যাচটা দেখে নিয়ে জুতোটা খুলে ফেলে স্লিপিং ব্যাগের উপরে শুয়ে পড়লাম।
জুডু আমার পাশ ঘেঁষে শুলো।
সারাদিনে প্রায় দশ-বারো মাইল হাঁটা হয়েছে চড়াইয়ে-উৎরাইয়ে, বেশির ভাগই জানোয়ার-চলা সঁড়িপথ দিয়ে। পথ বলতে এখানে কিছুই নেই। তারপর পেটে খাবার পড়েছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল।
বাইরে এখন কোনও শব্দ নেই। শব্দহীন জগতে জঙ্গল-পাহাড় উদ্ভাসিত করে চাঁদ উঠেছে। তাঁবুর পদার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে লুটিয়ে পড়েছে। নীচের উপত্যকার সাদা-সাদা পত্রশূন্য গেণ্ডলী গাছগুলোর ডালগুলোতে চাঁদের আলো পড়ে চকচক করছে।
মাঝে-মাঝে এই নিস্তব্ধ শব্দহীন পরিবেশকে চমকে দিয়ে একলা রাত-জাগা নাইট-জার পাখিটা খাপু-খাপু-খাপু-খাপু করে ডেকে উঠছে শুধু।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।
হঠাৎ জোর ঝড়ের মতো হাওয়ার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল।
চোখ খুলেই, জঙ্গলে অস্বস্তি লাগলে যে-কোনও শিকারী যা করে, আমি তাই-ই করলাম। ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলাম, তাঁবুর গায়ে হেলান দিয়ে যেখানে লোডেড রাইফেলটা রেখেছিলাম সেদিকে।
কিন্তু রাইফেলটা পেলাম না।
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখি রাইফেলটা লোপাট।
জুডুও নেই।
কোথায় গেল জুডু?
বাইরে তাকিয়ে দেখি, চাঁদ ডুবে গেছে পাহাড়ের আড়ালে। আর সেই অন্ধকারে শুধু সবুজ তারাগুলো নরম আলো ছড়াচ্ছে গ্রীষ্মের বাদামী জঙ্গলের উপর।
বালিশের তলা থেকে টর্চটা বের করে তাঁবুর বাইরে বেরোলাম। টর্চ জ্বেলে এদিক-ওদিক দেখলাম। বার বার ডাকলাম, জুড়ু, জুড়ু, জুডু।
সেই ঝড়ের মতো হাওয়াটা শুকনো ফুলের মতো আমার ডাককে উড়িয়ে নিয়ে গেল। পাহাড়ে-পাহাড়ে যেন চতুর্দিক থেকে ডাক উঠল। জুড়ু-জুড়ু-জুডু।
কিন্তু জুডুকে কোথাও দেখা গেল না। তাঁবুর ভিতরে ফেরার চেষ্টা করলাম। আমার টর্চের আলোয় তাঁবুর মধ্যে কী একটা সাদা জিনিস পড়ে থাকতে দেখলাম। কাছে গিয়ে দেখি জুডুর গলার সেই অজগরের হাড়টা।
কে যেন আমাকে বলল, হাড়টা কুড়িয়ে নাও। এক্ষুনি কুড়িয়ে নাও হাড়টা।
আমি দৌড়ে গিয়ে হাড়টা কুড়িয়ে নিয়ে আমার বুক-পকেটে রাখলাম।
ততক্ষণে হাওয়াটা এত জোর হয়েছে যে, তাঁবুর মধ্যে থাকাটা নিরাপদ বলে মনে হল না আমার। যে-কোনও মুহূর্তে তাঁবু চাপা পড়তে হতে পারে।
আমি তাড়াতাড়ি বাইরে এসে সেই পাথরটার উপরে বসলাম। নিজেকে স্বাভাবিক করার জন্যে পাইপটা ধরাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঐ হাওয়াতে কিছুতেই দেশলাই জ্বলল না।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হাওয়ার তোড়ে তাঁবুটাকে উল্টে ফেলল। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িটা হাওয়ার তোড়ে গড়িয়ে গিয়ে একটা পাথরে গিয়ে ধাক্কা খেল। টং করে আওয়াজ হল।
ধাতব আওয়াজটা শুনে ভাল লাগল। এটার মধ্যে অন্তত কোনও অস্বাভাবিকতা নেই।
হাওয়াটা যত জোর হতে লাগল, আমার মনে হতে লাগল নীচের উপত্যকা থেকে সবগুলো গাছ মাটি ছেড়ে উঠে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি, পাহাড়ের গা থেকেও যেন গাছগুলো নেমে আমার দিকে হেঁটে আসছে। তাদের যেন পা গজিয়েছে। হাওয়াতে ডালপালাগুলো এমন আন্দোলিত হচ্ছিল যে, আমার মনে হল ওরা যেন ওদের হাত নেড়ে নেড়ে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে।
জঙ্গলে কখনও রাইফেল-বন্দুক ছাড়া থাকিনি। নিদেনপক্ষে কোমরে পিস্তলটা গোঁজা থাকেই। অস্ত্র থাকলেও করার আমার কিছুই ছিল না, কিন্তু তবুও হয়তো এতটা অসহায়, নিরাশ্রয় লাগত না নিজেকে।
ভয়ে আমার কপাল ঘেমে উঠল।
আর একবার জুডুকে ডাকবার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বার হল না।
হঠাৎ দেখলাম, দক্ষিণ দিকে গাছের গুঁড়িতে আটকে থাকা ভুলুণ্ঠিত তাঁবুটার ঠিক সামনে সেই শম্বরটা দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পিঠের উপরে ভীষণ লম্বা রোগা একজন ঝাঁকড়া চুলওয়ালা নগ্ন লোক বসে আছে।
হঠাৎ আমার চতুর্দিকে গাছেদের সঙ্গে সঙ্গে যেন নানা জানোয়ারও আমাকে ঘিরে ফেলতে লাগল। শম্বর, হরিণ, কোরা, নীলগাই, শুয়োর, শজারু–যেসব জানোয়ার আমি ছোটবেলা থেকে সহজে শিকার করেছি। আমার মনে হল, ঐ মহীরুহগুলো আর জানোয়ারগুলো সবাই মিলে আমাকে পায়ে মাড়িয়ে আজ পিষে ফেলবে।
আমি দাঁড়িয়ে উঠে বলবার চেষ্টা করলাম, আর করব না। আর শিকার করব না। আমাকে ক্ষমা করো।
কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বের হল না।
আমি পেছন ফিরে দৌড়ে পালাতে গেলাম। কিন্তু আমার চারিদিকে ঐ শম্বরটা ঐ লোকটাকে পিঠে নিয়ে ঘুরতে লাগল। আমার পালাবার পথ বন্ধ করে দিল। আমি পাগলের মতো এদিক ওদিক দৌড়তে লাগলাম। পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে লাগলাম বারে বারে।
ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে এল। আমি কাঁদতে গেলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে তবু স্বর বেরোল না।
আমি আরকেবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না, পড়ে গেলাম।
তারপর আর কিছু মনে নেই আমার।
অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে আমার চোখের সামনে সেই প্রাগৈতিহাসিক ধূসর-রঙা জটাজুট-সম্বলিত শম্বরটার বড় বড় সবুজ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করতে লাগল।
কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছিল।
যেন অনেক দূর থেকে ডাকছিল, যেন স্বপ্নের মধ্যে ডাকছিল। যেন আমার মা ছোটবেলা স্কুল থেকে ফেরার পর আমার খাবার দিয়ে আমাকে ডাকছিলেন।
কে যেন বড় আদর করে, আনন্দে আমাকে ডাকছিল।
আস্তে আস্তে আমি চোখ খুললাম।
দেখি, আমার মুখের দিকে ঝুঁকে তিন-চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। প্রবল জ্বরে যেমন ঘোর থাকে, তেমনই ঘোরে ছিলাম আমি।
চোখ খুলতে আমার ভারী কষ্ট হল।
অনেক কষ্টে চোখ খুলতেই রোদে আমার চোখ ঝলসে গেল। কে যেন আমার মাথাটাকে তুলে ধরে নিজের কোলে নিয়ে বসল।
আবার আমি তাকালাম, এবার দেখলাম, আমার মাথাটাকে কোলে নিয়ে বসে জুডু আমার মুখের উপর মুখ ঝুঁকিয়ে বসে আছে।
ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, আমার দুই বন্ধু জর্জ আর কোন্ আমার দুপাশে বসে আছে।
জর্জ বলল, হাই ঋজু! হাউ ডু ইউ ফিল?
জর্জ মাটিতে পড়ে-থাকা আমার পাইপটা তুলে নিয়ে নিজের টোব্যাকো-পাউচ থেকে বের করে থ্রী-নান টোব্যাকো ভরে দিতে লাগল।
আমি উঠে বসলাম।
আমার কফি খাওয়া শেষ হলে, জর্জ পাইপটা ধরিয়ে দিল ওর লাইটার দিয়ে।
ওরা দুজনে হাসছিল।
কেন হাসতে হাসতে আমাকে বলল, হোয়াট ডিড ইউ সী লাস্ট নাইট। ঘোসট?
আমি উত্তর দেবার আগেই জর্জ হাসতে হাসতে বলল, মাই ফুট।
আমি উত্তর দিলাম না।
শুধু জর্জ বা কে বলে কথা নেই, আমার সভ্য শিক্ষিত, শহুরে বন্ধুদের কেউই যে আমার কথা বিশ্বাস করবে না, তা আমি বুঝতে পারছিলাম।
কফি খেয়ে আস্তে আস্তে উঠে পড়লাম। মাথাটা ভার। চোখে ব্যথা।
জর্জ বলল, ইউ আর এ সীলি গোট। কেন্ শট আ টাইগার দিস্ মর্নিং ইন দি ফারস্ট বীট। অ্যান্ড ইউ কে হিয়ার টু শুট আ ঘোস্ট!
জুডু ইংরেজী বোঝে না।
ও মালপত্র কাঁধে তুলে নিয়ে রওয়ানা হবার জন্যে তৈরি হল।
জর্জ আর কেন আগে-আগে হাঁটতে লাগল।
জুডু ফিসফিস করে বলল, বাবু, আমাকে মাপ করো, আমি না পালিয়ে পারিনি। আমার কিছু হত না। অজগরের মন্ত্রপড়া হাড় শুধু আমার কাছেই ছিল। তুমি আমার কথা শুনলে না– তাই তোমাকে ওটা দিয়ে আমি পালাতে বাধ্য হলাম।
জর্জ পিছন ফিরে শুধোলো, আর য়ু ডিসকাসিং বাউট দ্য ফিচারস্ অফ দ্য ঘোষ্ট? ইউ সিলি কাওয়ার্ড!
আমি জবাব দিলাম না।
যেই ওরা আবার অন্যদিকে মুখ ফেরাল, আমি তাড়াতাড়ি বুক-পকেটে হাত ঢুকিয়ে অজগরের হাড়টাকে জুডুর হাতের মুঠোয় লুকিয়ে দিয়ে দিলাম।
কে বলল, ইউ হ্যাভ সীন সাম পি-ফাউলস্ অন আওয়ার ওয়ে আপ হিয়ার। লেটুস শুট আ কাপ। জর্জ হ্যাঁজ হিজ শটগান উইথ হিম।
আমি বললাম, আই অ্যাম গোয়িং টু গিভ আ শুটিং ফর গুড়। জর্জ আর কেন্ দুজনে একই সঙ্গে কল্ক করে হেসে উঠল। বলল, ওঃ ডিয়ার; ডিয়ার। দ্যাটস্ দ্য জোক অফ দ্য ইয়ার।
আমি আর জুডু পাশাপাশি হেঁটে চললাম। আমার বন্ধুদের কথার কোনও জবাব দিলাম না। কারণ, জবাব দিয়ে লাভ ছিল না কোনও।
