মণিমুকুট (শার্লক হোমস) – আর্থার কোনান ডয়েল
একদিন সকালবেলায় আমি আমাদের দোতলার বসবার ঘরের জানলার কাছে দাড়িয়ে রাস্তার দিকে দেখছিলাম।
“হোমস, দেখে যাও একজন পাগল রাস্তা দিয়ে কী রকম ভাবে এদিকে আসছে। আমি বুঝতে পারছি না যে কোন আক্কেলে এর আত্মীয়স্বজন একে একলা রাস্তায় বেরোতে দিয়েছে।”
আমার কথা শুনে হোমস গড়িমসি করে তার নিজের আরামকেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ড্রেসিং গাউনের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে আমার পেছন থেকে উঁকি মেরে দেখতে লাগল। ফেব্রুয়ারি মাসের ভারী সুন্দর ঝকঝকে সকাল। গতকাল রাত্রে তুষারপাত হয়েছিল। আজ সকালে সেই জমাট বরফের ওপর রোদ পড়ে চকচক করছে। বেকার স্ট্রিটের মাঝ বরাবর ক্রমাগত গাড়ি যাতায়াত করায় বরফের রং ঘোলাটে কাদা কাদা হয়ে গেছে। কিন্তু ফুটপাতের দু’ধারে জমে-থাকা বরফ ধপধপে সাদা, যাকে বলে দুগ্ধফেননিভ। ফুটপাতের ওপরের বরফ অবশ্য ঘষে ঘষে তুলে ফেলা হয়েছে। আর সেইজন্যে ফুটপাত এখন সাংঘাতিক রকমের পিছল হয়ে রয়েছে। তাই রাস্তায় লোকজনও বেশি চোখে পড়ছে না। মেট্রোপলিটান স্টেশনের দিক দিয়ে বেকার স্ট্রিট ধরে একটি লোকই আসছিল। আর তার খ্যাপাটে হাবভাব দেখে আমি ওই কথাগুলো বলে ফেলেছিলাম।
দেখে মনে হল লোকটির বয়স গোটা-পঞ্চাশেক তো হবেই। বেশ মোটাসোটা লম্বা চেহারা। শরীরের তুলনায় ভদ্রলোকের মুখটা খুবই বড়। দেখলে বেশ সমীহ হয়। ভদ্রলোকের জামাকাপড় বেশ দামি। আর একটু বেশি রকম কেতাদুরস্ত। ভদ্রলোক কালো ফ্ৰককোট আর সাদাটে ছাই রঙের ট্রাউজার্স পরেছিলেন। মাথার টুপিও বেশ চকচকে। তবে ভারিক্কি চেহারা আর দামি পোশাকের সঙ্গে তাঁর হাবভাব ও চলন কোনওটাই খাপ খাচ্ছিল না। তিনি রীতিমতো জোরেই দৌড়োচ্ছিলেন আর থেকে থেকে ছোটখাটো লাফ দিয়ে উঠছিলেন। ছুটতে ছুটতে তিনি কখনও হাত দুটো শূন্যে ছুড়ছিলেন, কখনও বা মাথা নাড়ছিলেন আর কখনও কখনও নানা রকম মুখভঙ্গি করছিলেন।
“এ লোকটির কী ব্যাপার বলো তো?” আমি হোমসকে জিজ্ঞেস করলাম। “মনে হচ্ছে। ও কোনও বাড়ির নম্বর খুঁজছে।”
হাতের তেলোদুটো ঘষতে ঘষতে হোমস বলল, “আমার মনে হচ্ছে ভদ্রলোক এখানেই আসছেন।”
“এখানে? মানে আমাদের কাছে?”
“হ্যাঁ। মনে হচ্ছে লোকটি কোনও ব্যাপারে আমার সঙ্গে পরামর্শ করতে আসছে। বন্ধু, এসব লক্ষণ আমি দেখলেই চিনতে পারি। কী হে, আমি বলিনি।”
হোমস যখন আমাকে এই কথাগুলো বলছিল তখনই ভদ্রলোকটি হাঁফাতে হাঁফাতে আমাদের বাড়ির দরজার সামনে এসে এত জোরে দরজার ঘণ্টাটা বাজালেন যে, মনে হল, সমস্ত বাড়িটাই যেন ঝনঝন করে উঠল।
আর একটু পরেই সেই রকম পাগলের মতো হাত নাড়তে নাড়তে আর হাঁফাতে হাঁফাতে ভদ্রলোক আমাদের ঘরে ঢুকলেন। দূর থেকে ভদ্রলোকের রকমসকম দেখে আমাদের হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু তাঁর চোখেমুখে এমন একটা কষ্টের আর হতাশার কালো ছোপ পড়েছিল যে, তা দেখে আমাদের মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে গেল। ভদ্রলোকের জন্যে দুঃখ হতে লাগল। বেশ খানিকক্ষণ তিনি কোনও কথাই বললেন না। শুধু অসহায়ের মতো নিজের চুলের মধ্যে হাত চালাতে লাগলেন, আর মাঝে মাঝে মুঠো করে চুল টানতে লাগলেন। দেখে মনে হচ্ছিল যে, ভদ্রলোক যেন তাঁর দুঃখ-কষ্টের চাপ আর সহ্য করতে পারছেন না। হঠাৎ এক সময় ভদ্রলোক চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে ছুটে গিয়ে দেওয়ালে সজোরে মাথা ঠুকতে লাগলেন। আমরা তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ফেলে জোর করে দেওয়ালের কাছ থেকে টেনে সরিয়ে আনলাম। হোমস তাঁকে জোর করে একটা আরামকেদারায় বসিয়ে দিল। তারপর তাঁর কাছে বসে তাঁর হাতে হাত রেখে অনেক দিনের পুরনো বন্ধুর মতো খুব অন্তরঙ্গ ভাবে ঘরোয়া কথা বলতে লাগল। হোমসের এ এক অদ্ভুত ক্ষমতা। সে যে-কোনও লোককে নিজের করে নিতে পারে।
“আপনার সব কথা আমাকে বলবেন বলেই তো আপনি আমার কাছে এসেছেন, ঠিক কিনা?” হোমস ভদ্রলোককে বলল। “তাড়াহুড়ো করে এসে আপনি বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আগে খানিক বিশ্রাম করে চাঙ্গা হয়ে নিন। তারপর আপনার সব কথা আমি শুনব।”
ভদ্রলোক মাথা হেঁট করে বসে রইলেন। তিনি যে রকম জোরে জোরে আর ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছিলেন তার থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে, তাঁর মনের মধ্যে একটা বেশ বড় রকমের টানাপোড়েন চলছে। এক সময় পকেট থেকে রুমাল বের করে বেশ ভাল করে ঘাড়-মুখ মুছে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন।
“আপনারা আমাকে নিশ্চয়ই পাগল ভাবছেন।” তিনি বললেন।
হোমস তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “বুঝতে পারছি যে বেশ বড় রকমের ঝড়ঝাপটা আপনার ওপর দিয়ে গেছে।”
“একমাত্র ভগবানই জানেন যে আমার কী হচ্ছে। কোথাও কিছু নেই, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এই সাংঘাতিক বিপদ আমার মাথা একদম খারাপ করে দেবার জোগাড় করেছে। বাইরে আজ পর্যন্ত আমার নামে কেউ কোনও বদনাম দিতে পারেনি। তবে সে রকম বদনামও আমি হয়তো সহ্য করতে পারি। জীবনে দুঃখকষ্ট তো অনেক লোকই পায়। কিন্তু ঘরে-বাইরে এই রকম মনের কষ্ট আর বদনামের ভয় আমাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছে। আর এ তো আমার একার বদনাম নয়। এর সঙ্গে আমাদের দেশের খুব শ্রদ্ধার খুব সম্মানের এক পাত্রের সুনাম জড়িয়ে আছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করতেই হবে।”
হোমস বলল, “আগে আপনি শান্ত হোন। তারপর আপনার পরিচয় দিয়ে আপনার সমস্যাটা কী আমাকে বলুন।”
আমাদের অতিথি বললেন, “আমার নাম আপনারা হয়তো শুনে থাকতে পারেন।… আমার নাম আলেকজান্ডার হোলডার। থ্রেডনিডল স্ট্রিটে ‘হোলডার অ্যান্ড স্টিভেনস’ নামে যে-ব্যাঙ্ক আছে আমি সেই ব্যাঙ্কের একজন অংশীদার।”
আলেকজান্ডার হোলডারের নাম আমাদের শোনা ছিল। লন্ডন শহরে যে-ক’টা বেসরকারি ব্যাঙ্ক আছে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আর নামকরা ব্যাঙ্ক হল এই হোলডার অ্যান্ড স্টিভেনস ব্যাঙ্ক। আর এই ব্যাঙ্কের প্রধান অংশীদার হচ্ছেন মিঃ আলেকজান্ডার হোলডার। কিন্তু এমন কী ঘটতে পারে যে, যার জন্যে লন্ডনের এত বিরাট এক ধনী আর মানী লোকের এই রকম অবস্থা? আমাদের মনে খুব কৌতূহল হল। তিনি কী বলেন তা শোনবার জন্যে আমরা অধীর আগ্রহে বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোক তার নিজের মনের সংকোচ কাটিয়ে উঠে কথা বলতে শুরু করলেন।
ভদ্রলোক বললেন, “বুঝতে পারছি যে নষ্ট করবার মতো এক মুহূর্ত সময়ও আর আমার নেই। সেই জন্যে পুলিশের ইন্সপেক্টর যখনই আমাকে আপনার সঙ্গে পরামর্শ করতে বললেন, আমি একটুও দেরি না করে সোজা এখানে চলে এলাম। আমি আন্ডারগ্রাউন্ডে বেকার স্ট্রিট পর্যন্ত এসে তারপর হেঁটেই আপনাদের এখানে চলে এলাম। রাস্তায় যে রকম বরফ পড়ছে, তাতে গাড়ি করে আপনার কাছে এলে অনেক বেশি সময় লাগত। আর এই পথটুকু হেঁটেই আমি হাঁফিয়ে পড়েছি। সত্যি কথা বলতে কী, হাঁটাহাঁটির অভ্যেস আমার একদম নেই। যাক, এখন অবশ্য অনেক ভাল বোধ করছি। তাই সব ব্যাপারটা যতটা পারি গুছিয়ে আর সংক্ষেপে আপনাদের বলতে চেষ্টা করছি।
“আপনারা নিশ্চয় জানেন যে, ব্যাঙ্কের ব্যবসায় বেশ নাম করতে গেলে দুটো জিনিসের খুব দরকার। এক নম্বর হল এমন ভাবে টাকা লগ্নি করতে হবে যাতে প্রচুর লাভ হয়। আর দু’নম্বর হল যে, যত বেশি আমানতকারী জোগাড় করতে পারা যায় তার চেষ্টা করা আর তাদের সঙ্গে বেশ ভাল সম্পর্ক গড়ে তোলা। ব্যাঙ্কের লাভ করবার একটা খুব ভাল রাস্তা হল বন্ধক রেখে টাকা ধার দেওয়া। গত কয়েক বছর ধরে আমরা এই বন্ধকি কারবার করে আসছি। অনেক অভিজাত বংশের নামী লোক তাঁদের লাইব্রেরি, ছবি বা ওই ধরনের শিল্পবস্তু বা দামি জিনিস আমাদের কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছেন।
“গতকাল সকালে আমি ব্যাঙ্কে আমার আপিসঘরে বসে কাজ করছি, এমন সময় আমার সেক্রেটারি একটা কার্ড আমাকে এনে দিল। কার্ডে নামটি দেখে আমি তো হতবাক। যার-তার নাম নয়, এ যে স্বয়ং..না, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন, সে নাম আপনাকে বলাও আমার পক্ষে উচিত হবে না। তবে এটুকু বললেই বোধহয় যথেষ্ট হবে যে, এঁর নাম শোনেনি এমন লোকের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব কম। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে মানী, সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত, সবচেয়ে অভিজাত একটি বংশের কর্তার নাম। ইনি যে কোনও দিন আমাদের ব্যাঙ্কে পা দেবেন তা আমার কল্পনারও বাইরে। এ যে আমাদের কত বড় সৌভাগ্য, তা বলে বোঝাতে পারব না। উনি আমার ঘরে পা দেওয়ামাত্র আমি চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে উঠে নমস্কার করে তাঁকে এই কথাগুলোই বলবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমাকে বিশেষ কিছু বলতে না দিয়ে তিনি সোজাসুজি কাজের কথা পাড়লেন। তাঁর হাবভাব দেখে আমার মনে হল যে, তিনি নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে একটা অত্যন্ত বাজে কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এখন যেমন-তেমন করে কাজটা সাঙ্গ করতে পারলেই বেঁচে যান।
“তিনি আমাকে বললেন, ‘মিঃ হোলডার, আমি শুনেছি যে আপনারা টাকা ধার দিয়ে থাকেন।
“আমি বললাম, “হ্যাঁ। উপযুক্ত সিকিউরিটি পেলে আমাদের কোম্পানি টাকা ধার দেয়।’
‘“আমার এখনই পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড চাই,’ উনি আমাকে বললেন। ‘এত সামান্য টাকা আমি আমার যে-কোনও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকেই পেতে পারতাম। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আমি টাকা নিতে চাই না। তা ছাড়া এই টাকা নেওয়ার ব্যাপারে যা কিছু করবার তা আমি নিজেই করতে চাই। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, আমার পক্ষে কোনও বন্ধুর অনুগ্রহ চাওয়া ঠিক নয়।’
‘“কত দিনের জন্যে টাকাটা আপনার চাই?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘“আসছে সোমবার আমার কিছু টাকা পাবার কথা। সেটা পেলেই আমি আপনার টাকা আর যা সুদ হয় সব শোধ করে দেব। তবে টাকাটা আমার এক্ষুনি চাই।’
‘“দেখুন, সম্ভব হলে আমি ওই টাকাটা আপনাকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকেই দিতাম। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। যদি কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে টাকাটা আপনাকে দিতে হয় তবে আমার অংশীদারের কথা মনে রেখে আমাকে আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আপনি যদি কোনও কিছু গচ্ছিত রাখেন তো তার বদলে টাকাটা আপনাকে দিতে পারি।’
‘“হ্যাঁ, আমিও সেই ভাবেই টাকা নিতে চাই,’ বলেই তিনি তার চেয়ারের পাশ থেকে কালো মরক্কো চামড়ার একটা চৌকো বাক্স তুলে নিলেন। তারপর আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি বেরিল করোনেটের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই?’
‘“হ্যাঁ শুনেছি। আমাদের সাম্রাজ্যের সব চাইতে দামি আর গর্বের জিনিস।’
‘“ঠিক বলেছেন।’ উনি চামড়ার বাক্সটা খুললেন। বাক্সের মধ্যে গোলাপি ভেলভেটের নরম আর পুরু আস্তরণের ওপরে বেরিল করোনেট রাখা আছে। ‘এতে উনচল্লিশটা বেরিল আছে। যে-সোনার পাতে পাথরগুলো বসানো আছে সেটার দামও কম নয়। খুব কম করে ধরলেও এই মুকুটটার দাম আমি যে-টাকা চেয়েছি তার দ্বিগুণ হবে। আমার সিকিউরিটি হিসেবে আমি এটাকে জমা রাখতে রাজি।’
“আমি বাক্সটা তুলে নিলাম। তারপর বোকার মতো আমার বহুমান্য অতিথির দিকে তাকিয়ে রইলাম।”
ঘটনার কথা বলতে বলতে মিঃ হোলডার একটু থেমে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি ভাবছিলেন যে, কথাগুলো ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারছেন কিনা। হোমস বলল, “তারপর কী হল?”
মিঃ হোলডার বললেন, “ও হ্যাঁ, বেরিল করোনেটের দামের কথা আমি ভাবছি কিনা, ভদ্রলোক আমাকে এই কথা জিজ্ঞেস করতে আমি বললাম, ‘না, না, তা নয়। আমি শুধু ভাবছিলাম যে…’
‘“এটা এ ভাবে বাঁধা রাখা ঠিক হবে কিনা? এ ব্যাপারে আপনি বিন্দুমাত্র ভাববেন না। চার দিনের মধ্যেই টাকা দিয়ে এটা ছাড়িয়ে নিতে পারব, এ ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে এ কাজ আমি করতাম না। এটা নিছক ব্যবসার খাতিরে বাঁধা রাখা। এখন বলুন এটা কি উপযুক্ত বিবেচনা করছেন?’
‘“যথেষ্ট।’
‘“দেখুন মিঃ হোলডার, লোকের মুখে আপনার কথা শুনে আপনার ওপর আমি বিশ্বাস করেছি। আমি আশা করি আপনি আমার এই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবেন। এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে কোনও রকম গালগল্প বা আলোচনা আপনি করবেন না। সবচেয়ে বড় কথা, জিনিসটা খুব সাবধানে যত্ন করে রাখবেন। কেন না এটার কোনও রকম ক্ষতি হলে রাজ্যময় সাংঘাতিক কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। এর একটু খুঁত হওয়া মানেই সমস্তটা বরবাদ হয়ে যাবে। এর সঙ্গে খাপ খাবে এমন বেরিল পৃথিবীতে আর একটিও নেই। যাই হোক, আমার এ বিশ্বাস আছে যে আপনার হেফাজতে থাকার সময়ে এর কোনও ক্ষতি হবে না। সোমবার দিন সকালে আমি নিজে টাকা নিয়ে এসে এটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাব।’
“ভদ্রলোকের যাবার তাড়া ছিল দেখে আমি আর কোনও কথা বললাম না। আমাদের ক্যাশিয়ারকে ডেকে ওঁকে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড দিতে বলে দিলাম। ভদ্রলোক চলে গেলেন। আমার টেবিলের ওপরে বসানো ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে, বিশেষ করে এর মধ্যে যে-দামি জিনিস রয়েছে তার কথা ভেবে, আমার মনে ভয় আর অস্বস্তি হতে শুরু করল। জিনিসটা যে কত দামি তা বোধহয় বলে বোঝানো যাবে না। বিশেষত এটা আমাদের একটা জাতীয় সম্পত্তি। এটার যদি কণামাত্র ক্ষতি হয় তো সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে যাবে। আর সে কথা কিছুতেই গোপন রাখা যাবে না। এ রকম একটা জিনিস বন্ধক রেখে যে ভীষণ ঝুঁকি নিয়েছি, সে কথা ভেবে আমি হাত কামড়াতে লাগলাম। যাই হোক, এখন আর আক্ষেপ করে কোনও লাভ নেই। তাই ব্যাগটা আমার নিজের ‘সেফে’ চাবিবন্ধ করে আমি হাতের কাজ সারতে লাগলাম।
“সন্ধেবেলায় আমার মনে হল যে, এটা ব্যাঙ্কে রেখে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ব্যাঙ্কের আয়রন সেফ ভেঙে চুরি যে হয়নি এমন তো নয়। আমার ব্যাঙ্কের সেফই যে কেউ ভাঙবে না তা কি বলা যায়? তা যদি হয় তা হলে আমার অবস্থাটা কী হবে? আমি সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেললাম যে, এ ক’দিন এই জিনিসটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে আসব আর নিয়ে যাব। তা হলে ওটা সব সময়েই আমার চোখে চোখে থাকবে। সব দিক ভেবেচিন্তে আমার মনে হল এই বুদ্ধিটাই ভাল। তখন আমি একটা গাড়ি ডাকতে বললাম। যতক্ষণ না জিনিসটা আমার দোতলার ঘরের সিন্দুকে পুরে চাবি দিতে পারলাম ততক্ষণ আমার শান্তি ছিল না।
“এখন আমার বাড়ির সম্বন্ধে আপনাকে দু’-চার কথা না বললে আপনি হয়তো সব ব্যাপারটা ঠিকমতো বুঝবেন না। কোচোয়ান আর সহিস আমার বাড়িতে থাকে না, তাই তাদের বাদ দেওয়াই উচিত। বাড়ির কাজের জন্যে যে মেয়েরা আছে তাদের তিন জন বহুদিন আমার কাছে কাজ করছে। তারা অত্যন্ত সৎ আর বিশ্বাসী। তাদের কোনও ভাবেই সন্দেহ করা যায় না। লুসি পার বলে একটি মেয়েকে মাস-কয়েক আগে কাজে বহাল করা হয়েছে। সে খুব ভাল লোকের কাছ থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছিল, আর তার কাজে বা ব্যবহারে সন্দেহজনক কিছু দেখিনি। মেয়েটির বয়স কম। তার বন্ধুবান্ধবরা মাঝে মাঝে আমার বাড়ির বাইরে ঘোরাফেরা করে। তবে মেয়েটির আচার-আচরণ, স্বভাব খুবই চমৎকার।
“এ তো গেল আমার লোকজনের ফিরিস্তি। আমার নিজের সংসার খুবই ছোট। আমি বিপত্নীক। আমার এক ছেলে, আর্থার। আমার ছেলেটি তেমন মানুষ হয়নি। মিঃ হোমস, ছেলেটির জন্যে আমার যা কিছু দুঃখকষ্ট। আমি স্বীকার করছি যে, হয়তো আমার দোষেই ছেলেটি এ রকম বিগড়ে গেছে। লোকে বলে আমি তাকে অতিরিক্ত আদর দিয়ে গোবর করে ফেলেছি। হয়তো কথা ঠিকই। আমার স্ত্রী যখন মারা যান, তখন ওই ছেলেটি ছাড়া নিজের বলতে আমার কেউ ছিল না। আমি ছেলেটির সব আবদার মেনে নিয়েছি। আমি চাইতাম সে যেন সব সময়েই বেশ ফুর্তিতে থাকে। এতটা না করলেই বোধহয় তার আর আমার দু’জনের পক্ষেই ভাল হত। তবে এ কথা বলতে পারি যে, যা করেছি তা ভাল হবে মনে করেই করেছি।
“আমার মনে মনে ইচ্ছে ছিল যে, আমার পরে সে যেন ব্যবসায় আমার জায়গায় বসে। কিন্তু ভাল ব্যবসা করতে গেলে যে যে গুণ থাকা দরকার তার মধ্যে তার একটাও নেই। সে বেহিসেবি, চঞ্চল স্বভাবের। সত্যি কথা বলতে কী, বেশি টাকা তার দায়িত্বে রাখতে আমি নিজেই রাজি নই। অল্প বয়সে সে একটা নামী অভিজাত ক্লাবের সদস্য হয়। তার অমায়িক ফুর্তিবাজ স্বভাবের জন্যে খুব তাড়াতাড়ি ক্লাবের কিছু পয়সাওলা লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব ফেঁদে বসে। ক্লাবেই সে তাস খেলতে শেখে। আর ঘোড়দৌড়ের পিছনে পয়সা ওড়াতে শুরু করে। সে প্রায়ই আমাকে বলে, তার হাতখরচার অঙ্কটা বাড়িয়ে দেবার জন্যে যাতে করে সে বাজারে তার যত ধার আছে মিটিয়ে ফেলতে পারে। দু’-চার বার এই কুসঙ্গ ছাড়বারও চেষ্টা সে করেছে। কিন্তু প্রত্যেক বারই তার বন্ধু সার জর্জ বার্নওয়েলের টানে সে আবার ক্লাবে ফিরে গেছে। সত্যি কথা বলতে কী, বার্নওয়েল যে আর্থারকে এত বশ করে ফেলেছে এতে আমি কিন্তু মোটেই আশ্চর্য হইনি। সে দু’-চার বার আমার বাড়িতে এসেছে। তার ব্যবহারে কথাবার্তায় আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে যাই। বার্নওয়েলের চেহারাটি যেমন সুন্দর, কথাবার্তাও তেমনই চমৎকার। হেন জায়গা নেই যেখানে সে যায়নি, হেন বিষয় নেই যার সম্বন্ধে সে জমিয়ে, রসিয়ে কথা বলতে না পারে। কিন্তু আড়ালে যখনই তার কথা ভাবি তখনই আমার মনে হয় লোকটা সুবিধের নয়। ওর সুন্দর চোখের চাউনি, মিষ্টি কথাবার্তার আড়ালে একটা ঘড়িয়াল লোক লুকিয়ে আছে। এটা আমার একার কথা নয়। মেরিরও তাই মত।
“ওহ, মেরির কথা আপনাকে বলা হয়নি। ও আমার ভাইঝি। বছর পাঁচেক আগে ওকে সম্পূর্ণ অনাথ অবস্থায় রেখে আমার ভাই মারা যায়। আমি তখন ওকে আমার কাছে এনে রাখি। আমার মেয়ের মতো মানুষ করি। ভারী সুন্দর দেখতে। স্বভাবটি তেমনই লক্ষ্মী। ওই আমার বাড়ির গিন্নি। আর শুধু সংসারের কর্ত্রী নয়, ও আমার ডান হাত।
“আমার ঘরসংসারের মোটামুটি একটা ছবি তো আপনাকে দিলাম। এবার আবার কাজের কথায় ফিরে আসি। সেদিন রাত্তিরে খাওয়ার পরে আমার বসবার ঘরে বসে কফি খেতে খেতে আমি আর্থার আর মেরিকে ওই দিন আপিসে যা-যা ঘটেছে সব বললাম। অবশ্য আমার দেনদারের পরিচয় ওদের কাছে দিইনি। কফি নিয়ে এসেছিল লুসি পার। কফি রেখেই ও ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তবে ঘরের দরজা বন্ধ ছিল কিনা সে কথা আমি হলফ করে বলতে পারব না। আমার কথা শুনে আর্থার আর মেরি তো ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। ওরা জিনিসটা দেখতে চাইছিল। কিন্তু আমার মনে হল যে ওটাকে বেশি খোলাখুলি করা ঠিক হবে না।
“আর্থার আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি ওটাকে রেখেছ কোথায় ?’
“কেন, আমার সিন্দুকে।’
“ও বলল, ‘হে ভগবান, আজ রাত্তিরে যেন আমাদের বাড়িতে চোর না আসে।’
“আমি বললাম, ‘সিন্দুকে চাবি দেওয়া আছে।’
“আর্থার বলল, ‘তোমার ওই সিন্দুক যে-কোনও চাবিতেই খুলে যায়। ছেলেবেলায় আমি ভাড়ারঘরের আলমারির চাবি দিয়ে কত বার তোমার ওই সিন্দুক খুলে দেখেছি ওর ভেতরে কী আছে।’
“আর্থারের স্বভাবের আর এক দোষ হচ্ছে এই রকম আবোলতাবোল বকা। আমি ওর কথায় কান দিলাম না। আর্থার আমার সঙ্গে আমার ঘর পর্যন্ত এল।
‘“বাবা,’ মেজের দিকে তাকিয়ে ও বলল, ‘তুমি কি আমাকে শ’দুই পাউন্ড দিতে পারো ?’
‘“না,’ আমি খুব কড়া ভাবে বললাম, ‘দিতে পারি না। আমি তোমাকে তোমার যা দরকার তার চাইতে অনেক বেশি টাকা দিই।’
‘“হ্যাঁ, সে কথা ঠিক। তবে এ টাকাটা আমার চাই, নইলে আমি আর ক্লাবে মুখ দেখাতে পারব না, আর্থার বলল।
“আমি চেঁচিয়ে উঠে বললাম, ‘সেটা তো খুবই ভাল কথা।’
‘“তা হতে পারে। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই এটা চাও না যে সেখান থেকে অপমানিত হয়ে আমি চলে আসি। অপমান হজম করতে পারব না আমি। যে করেই হোক এই টাকাটা আমাকে জোগাড় করতে হবে। তুমি যদি না দাও তো অন্য কী ভাবে টাকা সংগ্রহ করা যায় সে কথা ভাবতে হবে।’
“আর্থারের কথায় আমার রাগ আরও বেড়ে গেল। এ মাসে এ নিয়ে সে তিন-তিন বার আমার কাছে টাকা চেয়েছে। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘আমার কাছ থেকে তুমি আর একটি পয়সাও পাবে না।’ এই কথা শুনে সে আর কোনও কিছু না বলে মাথা দুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
“আর্থার চলে যাবার পর আমি সিন্দুক খুলে জিনিসটা ঠিকমতো আছে কিনা দেখে নিয়ে সিন্দুক আবার চাবি বন্ধ করে দিলাম। তারপর সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখবার জন্যে আমি গোটা বাড়িটা একবার চক্কর দিতে গেলাম। এ কাজটা রোজ মেরিই করে। তবে বুঝতেই পারছেন, কী জন্যে আজ আমি নিজেই তদারক করতে গেলাম। দোতলা থেকে নামবার সময় আমি সিঁড়ি থেকেই দেখতে পেলাম যে, মেরি হলের পাশের দিকের একটা জানলার কাছে দাড়িয়ে রয়েছে। আমি যখন তার কাছে গেলাম তখন সে জানলাটা বন্ধ করছিল।
‘“বাপি, তুমি কি আমাদের ওই লুসি বলে কাজের মেয়েটিকে আজ রাতে বাইরে বেড়াতে যেতে বলেছিলে ?’ মেরির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল সে যেন খুব ভাবনায় পড়ে গেছে।
‘“না তো।’
‘“আমি ওকে এইমাত্র খিড়কিদরজা দিয়ে ঢুকতে দেখলাম। আমার মনে হয় ওই পাশের দরজায় ও কারও সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ওকে বারণ করে দিতে হবে।’
‘“কাল সকালেই তুমি ওকে ডেকে বারণ করে দেবে। আর যদি তুমি বকাঝকা করতে না চাও তো আমিই ওকে বকে দেব।…যাই হোক, সব ঠিকমতো বন্ধটন্ধ আছে তো?’
‘“হ্যাঁ, বাপি, সব বন্ধ আছে।’
‘“তা হলে ঠিক আছে।’
“মেরিকে শুভরাত্রি জানিয়ে আমি শুতে গেলাম আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
“মিঃ হোমস, আমি আপনাকে সব কথা খুলে বলবার চেষ্টা করছি, যাতে করে এই মামলার কোনও সূত্র বাদ না যায়। তা সত্ত্বেও যদি কোনও ব্যাপারে আপনার মনে কোনও প্রশ্ন থাকে, তো আমাকে সে কথা বলবেন।”
“না না, আপনি সব কথাই বেশ সহজ করে গুছিয়ে বলছেন। খুঁটিনাটি তথ্য কিছুই বাদ যায়নি।”
মিঃ হোলডার আবার একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “এইবার আমি আমার কাহিনীর এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই জায়গাটা আমি বেশ ভাল করে বলছি। এমনিতেই আমার ঘুম খুব পাতলা। তার ওপর ওই জিনিসটা বাড়িতে এনে অবধি আমার মনটা চঞ্চল হয়ে ছিল। তাই ঘুমটা আরও পাতলা হয়ে পড়েছিল। দুটো নাগাদ আমার ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল বাড়ির ভেতরে কোথাও একটা কোনও শব্দ হল। ঘুমের ঘোর কাটতে-না-কাটতেই সেই আওয়াজটা থেমে গেল। আমার ধারণা হল কেউ যেন কোনও একটা জানলা খুব সন্তর্পণে বন্ধ করে দিল। আমি কান খাড়া করে শুয়ে রইলাম। হঠাৎ আমার আশঙ্কা সত্যি হয়ে উঠল। টের পেলাম পাশের ঘরে খুব সাবধানে কে যেন চলাফেরা করছে। আমি চুপিসারে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। ভয়ে আমার হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে ধকধক করছিল যে, সে শব্দটা আমার নিজেরই কানে এসে লাগছিল। আমি আস্তে আস্তে দরজাটা ফাঁক করে উঁকি মারলাম।
“আর্থার’, আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘চোর! বদমাশ ! কোন সাহসে তুমি ওই মুকুটটা বের করেছ?’
“আমার ঘরের গ্যাসের বাতিটা কমানো ছিল। শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থায় আর্থার বাতির সামনে মুকুটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার মনে হল আর্থার জোর করে মুকুটটা দুমড়ে বাঁকিয়ে একটা অংশ ছিঁড়ে নেবার চেষ্টা করছে। আমার চিৎকারে তার হাত থেকে মুকুটটা পড়ে গেল। ভয়ে তার মুখটা তখন কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। আমি ওটা মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম। তিনটে বেরিল সমেত সোনার একটা পাত নেই।
“রাগে কাণ্ডজ্ঞানশূন্য হয়ে আমি বললাম, ‘শয়তান! তুই এটাকে ভেঙে ফেলেছিস। তুই আমার মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিলি। বল কোথায় তুই বেরিলগুলো চুরি করে রেখেছিস।’
‘“চুরি করে!’ আর্থার বলে উঠল।
‘“হ্যাঁ, হ্যাঁ, চুরি করে।’ ওকে ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে আমি বললাম।
‘“না, এর থেকে একটাও খোয়া যায়নি। খোয়া যেতে পারে না।’
‘“না, তিনটে বেরিল নেই। আর তুই জানিস সেগুলো কোথায় আছে। তুই শুধু চোরই নোস, মিথ্যেবাদীও বটে। তুই কি ভেবেছিস যে, তুই যখন আর একটা কোণ ছিড়ে ফেলতে চেষ্টা করছিলি তা আমি দেখতে পাইনি?’
‘“তুমি আমাকে যা ইচ্ছে তাই বলেছ,’ আর্থার বলল, ‘আমি এটা চুপ করে মেনে নিতে পারি না। যে-হেতু এই জিনিসটার জন্যে তুমি আমাকে অনেক গালমন্দ করেছ, এ ব্যাপারে আমি কোনও কথাই বলব না। কাল সকালেই আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। আমি নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারি কিনা দেখব।’
“রাগে দুঃখে পাগলের মতো হয়ে আমি বললাম, ‘পুলিশের হেফাজতে তুমি এ বাড়ির বাইরে যাবে। এ ব্যাপারের নিষ্পত্তি না করে আমি ছাড়ব না।’
‘“এ ব্যাপারে তুমি আমার কাছ থেকে কিছুই জানতে পারবে না। যদি তুমি ঠিক করে থাকো পুলিশ খবর দেবে, দাও। দেখা যাক, তারা কতদূর কী করতে পারে!’
“ততক্ষণে আমার চিৎকারে বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙে গেছে। প্রথমে মেরি দৌড়োতে দৌড়োতে আমার ঘরে এল। আর্থারের মুখের দিকে তাকিয়ে আর ওই মুকুটটা দেখে এক লহমার মধ্যে ব্যাপার কী হয়েছে বুঝে নিয়ে বেচারি কেঁদে উঠে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। আমি ঘরের কাজের একটি মেয়েকে দিয়ে পুলিশে খবর পাঠালাম। আর্থার বুকের সামনে হাত জড়ো করে চুপচাপ বসে ছিল। মেয়েটি এসে যখন খবর দিল যে, পুলিশ এসেছে, আর্থার আমাকে বলল, ‘তুমি কি আমাকে চুরির দায়ে অভিযুক্ত করবে?’ আমি তাকে বলতে বাধ্য হলাম এটা এখন আর আমাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যাপার নেই। এটা পুলিশের আওতাও পড়ে। বিশেষত ওই মুকুটটা আমাদের, যাকে বলে জাতীয় সম্পত্তি। সুতরাং, দেশের আইন অনুসারে যে-ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সেই ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।
‘“শোনো, তুমি আমাকে এখনই পুলিশের হাতে দিয়ো না। আমাকে পাঁচ মিনিটের জন্যে বাড়ির বাইরে যেতে দাও। আমি বলছি এতে তোমার আমার দু’জনেরই ভাল হবে।’
‘“হ্যাঁ, আর সেই সুযোগে হয় তুমি গা-ঢাকা দেবে নয় তো ওই বেরিলগুলো সরিয়ে ফেলবে,’ আমি বললাম। আমি তাকে অনুনয় করে বললাম যে, সে শুধু আমারই মানসম্মান নষ্ট করেনি, আমার চাইতে ঢের বেশি এক মানী লোকের মর্যাদাও নষ্ট করেছে। এ ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে সারা দেশের লোক ছি-ছি করবে। তুমি বলো কোথায় ওই বেরিলগুলো রেখেছ তা হলে সব ব্যাপারটা এখনও ভালয় ভালয় মিটিয়ে নেওয়া যায়।
‘“দেখো আর্থার, সত্য গোপন করে লাভ নেই। তুমি ধরা পড়েছ। এখন অপরাধ স্বীকার করলে তোমার দোষ কমবে। বেরিলগুলো ফেরত দিয়ে দাও, তোমার সব অপরাধ আমি ক্ষমা করে দেব।’
‘“তোমার কাছে যারা করুণা চায় তোমার ক্ষমা তাদের জন্যে তুলে রাখো।’ আর্থার। আমাকে ব্যঙ্গ করে বলল।
‘“আমি বুঝতে পারলাম যে, আর্থার এত নীচে নেমে গেছে যে, শুধু কথায় তাকে আর শোধরানো যাবে না। আমার সামনে তখন একটা রাস্তাই খোলা রইল। বাধ্য হয়ে আমি সেই পথই বেছে নিলাম। ইন্সপেক্টরকে ডেকে পাঠিয়ে আমি আর্থারকে তার হাতে তুলে দিলাম। পুলিশ তাকে তখনই জেরা আর তল্লাশি করতে শুরু করে দিল। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে, তার দেহে তল্লাশি চালিয়ে বা তার ঘরে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে, এমনকী বাড়ির যে-সব জায়গায় তার পক্ষে ওই দামি পাথরগুলো লুকিয়ে রাখা সম্ভব সেই সমস্ত জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে পুলিশ একদম হদ্দ হয়ে গেল। কিন্তু জিনিসগুলো পাওয়া গেল না। আমরা তাকে অনেক বোঝালাম, অনুরোধ করলাম, ভয় দেখালাম। কিন্তু না, আর্থারকে দিয়ে একটা কথাও বলানো গেল না। শেষকালে আজ সকালে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে গেল। সেখানে আমার যা যা করবার ছিল তা সেরে আমি দৌড়োতে দৌড়োতে আপনার কাছে এসেছি। এখন আপনি যদি দয়া করে সব ব্যাপারটার একটা হদিস করে দেন তো আপনার কাছে চিরদিন ঋণী হয়ে থাকব। পুলিশ বলছে যে, তারা এ ঘটনার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে আমাকে এর ফয়সালা করতেই হবে। তার জন্যে যত টাকা লাগে লাগুক। আমি ইতিমধ্যেই বলেছি যে, পাথরগুলোর সন্ধান দিতে পারলে হাজার পাউন্ড পুরস্কার দেব।…হে ভগবান, এ আমার কী হল? এক রাত্তিরের মধ্যে পাথরগুলো চুরি গেল, আমার মানসম্মান গেল, বদনাম হল, সবচেয়ে বড় কথা নিজের ছেলেকেও হারাতে হল। ওহ, এখন আমি করি কী?’
কথা বলতে বলতে ভদ্রলোক কপাল চাপড়াতে লাগলেন।
হোমস অনেকক্ষণ কোনও কথা না বলে বসে রইল। তার কপালে কয়েকটা ভাজ পড়তেই বুঝলাম যে, ব্যাপারটা নিয়ে সে গভীর ভাবে চিন্তা করছে।
“আচ্ছা, আপনাদের বাড়িতে বন্ধুবান্ধব, পরিচিত লোকজনের আসা-যাওয়া কি খুব বেশি ?” হোমস মিঃ হোলডারকে প্রশ্ন করল।
“না। কখনওসখনও আমার অংশীদার তার আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে বেড়াতে আসেন। কালেভদ্রে আর্থারের দু’-একজন বন্ধু আসে। অবশ্য হালে সার জর্জ বার্নওয়েল বেশ কয়েক বার এসেছেন। এ ছাড়া আর বিশেষ কেউ আসেন না।”
“আপনারা কি প্রায়ই পার্টিটার্টিতে যান?”
“আর্থার যায়। আমি আর মেরি বাড়িতেই থাকি। আমরা বেশি মেলামেশা করা পছন্দ করি না।”
“একজন অল্পবয়সি মেয়ের পক্ষে খুবই অদ্ভুত বটে।”
“মেরির স্বভাবটাই চুপচাপ। তবে মেরিকে আপনি যত ছেলেমানুষ ভাবছেন ততটা ছেলেমানুষ ও নয়। ওর বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হল বই কী।”
“আপনি যা বললেন তার থেকে মনে হচ্ছে যে, এই ঘটনায় মেরি খুবই দুঃখ পেয়েছে।”
“হ্যাঁ, আমার চেয়ে মেরিই বেশি ভেঙে পড়েছে।”
“আপনার ছেলেই যে দোষী, সে বিষয়ে আপনাদের দু’জনের মনে কোনও সন্দেহ নেই?”
“কী করে থাকবে বলুন? আমি নিজের চোখে তাকে মুকুটটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।”
“আমি অবশ্য ওটাকে খুব বড় প্রমাণ বলে মনে করছি না। আচ্ছা, মুকুটের বাকি অংশটা কি ঠিক ছিল ?”
“না, গোটা মুকুটটাই দুমড়ে বেঁকে গিয়েছিল।”
“এটা কেন আপনি ভাবছেন না যে, আর্থার ও বেঁকে-যাওয়া মুকুটটা সোজা করবার চেষ্টা করছিল ?”
“ভগবান আপনার ভাল করুন। বুঝতে পারছি যে, আপনি আর্থারকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন। তবে কাজটা সোজা নয়, যদি ওর কোনও বদ মতলব না-ই থাকে, তবে সে কথা ও বলল না কেন?”
“ঠিক কথা। যদি ও দোষীই হবে তা হলে ও নিজেকে বাঁচাবার জন্যে মিথ্যে কথা বলল না কেন? আর্থারের এই ভাবে চুপ করে থাকার দু’ রকম মানেই হতে পারে। এই কেসটায় বেশ ভাববার মতো কয়েকটা সমস্যা আছে। যাকগে। আচ্ছা, যে-শব্দ শুনে আপনার ঘুম ভেঙে যায় সে সম্বন্ধে পুলিশ কী বলে ?”
“পুলিশের মত হচ্ছে যে, আর্থার যখন তার ঘরের দরজা বন্ধ করছিল, তখনই শব্দটা হয়েছে।”
“ভারী বুদ্ধিমান পুলিশ তো! চোর বুঝি বাড়িসুদ্ধ লোককে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে চুরি করতে যায় ? তা পাথরগুলো কোথায় গেল, এ সম্বন্ধে পুলিশের কী মত?”
“ওরা এখন বাড়ির দেওয়াল ঠুকে ঠুকে দেখছে আর ঘরের সব আসবাবপত্তর উলটেপালটে দেখছে।”
“বাড়ির বাইরে কি ওরা খোঁজাখুঁজি করেছে?”
“হ্যাঁ, বাইরের বাগানে ওরা জোর তল্লাশি চালিয়েছে।”
শার্লক হোমস বলল, “তা হলে মিঃ হোলডার, এখন বুঝতে পারছেন তো, এই ব্যাপারটা নিয়ে পুলিশ আর আপনি যা ভেবেছেন তা একদমই ঠিক নয়। আপনাদের কাছে সব ব্যাপারটা খুব সোজা বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে, ব্যাপারটা রীতিমতো ঘোরালো আর জটিল। আচ্ছা, আগে আপনার মতটা যাচাই করে দেখা যাক। আপনার বিশ্বাস যে আপনার ছেলে তার ঘর থেকে বেরিয়ে আপনার ঘরে আসে। তারপর সে আপনার সিন্দুক খুলে মুকুটটা বের করে আনে এবং গায়ের জোরে মুকুটের খানিকটা ছিঁড়ে নেয়। তারপর তিনটে বেরিল পাথর সমেত সেই টুকরোটা এমন এক জায়গায় লুকিয়ে রাখে যে, সেখান থেকে সেটাকে কেউই খুঁজে পাচ্ছে না। এসব করে সে বাকি মুকুটটা নিয়ে আবার আপনার ঘরে ফিরে আসে। ধরা পড়ে যেতে পারে জেনেও আর্থার ফের আপনার ঘরে মুকুটটা নিয়ে ফিরে আসছিল। আচ্ছা বলুন তো, এটা কি আপনার সম্ভব বলে মনে হয়?’
একটা খুব বড় রকমের নিশ্বাস ফেলে মিঃ হোলডার বললেন, “কিন্তু এ ছাড়া আর অন্য কী-ই বা হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, ওর যদি কোনও দোষ না থাকে তবে ও সব কথা খুলে বলছে না কেন?”
হোমস বলল, “সেই কারণটাই তো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। মিঃ হোলডার, এখন আপনি যদি বলেন তো আমরা স্ট্রেথামের দিকে রওনা হতে পারি। আমাদের অনুসন্ধানের কাজ শুরু হবে ওখানেই।”
আমার নিজের যাবার ইচ্ছে ছিল ষোলোআনা। তার ওপর হোমস আমাকে তার সঙ্গে যাবার জন্যে ভয়ানক রকম পেড়াপেড়ি করতে লাগল। মিঃ হোলডারের মুখে যতটুকু শুনেছি তাতেই আমার যথেষ্ট কৌতুহল হয়েছে। ব্যাপারটা কোন দিকে গড়ায় না-জানা অবধি আমার শান্তি হবে না। অবশ্য আর্থারই যে পাথরগুলো সরিয়েছে এ ব্যাপারে আমি মিঃ হোলডারের সঙ্গে একমত। আবার মুশকিল হয়েছে এই যে, হোমসের বিচার-বিশ্লেষণে আমার অগাধ আস্থা। তাই হোমস যখন এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না, তাতে আমার মনে হচ্ছে যে, সমস্ত ব্যাপারটা হয়তো অন্য রকম হলেও হতে পারে। সারা রাস্তা হোমস আর একটি কথাও বলল না। এক ভাবে মাথা হেঁট করে বসে রইল। তবে বুঝলাম, হোমসের কথায় আমাদের মক্কেল বোধহয় খানিকটা ভরসা পেয়েছেন। তাঁকে এখন বেশ চাঙ্গা দেখাচ্ছিল। ট্রেনে করে কয়েক মিনিট গিয়ে তারপর একটু হাঁটতেই আমরা ফেয়ারব্যাঙ্কে এসে গেলাম।
ফেয়ারব্যাঙ্ক চৌকো ধরনের সাদা পাথরের বেশ বড় বাড়ি। রাস্তা থেকে বাড়িটা বেশ খানিকটা ভেতরে। বাড়ির সামনে দুটো বড় গেট। গেটদুটো বন্ধ। গেট দিয়ে চওড়া একটা রাস্তা বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে এসেছে। রাস্তাটা এত চওড়া যে, পাশাপাশি দুটো গাড়ি যেতে পারে। বাড়ির সামনে মস্ত লন। বরফে একদম ঢেকে গেছে। বাড়িটার ডান দিকে একটা কুঞ্জের মতো। কুঞ্জের পাশ দিয়ে একটা পায়ে চলার সরু রাস্তা চলে গেছে রান্নাবাড়ি পর্যন্ত। বাড়িটার বাঁ পাশে একটা গলি। সেই গলি দিয়ে আস্তাবলে যেতে হয়। আস্তাবলটা মূল বাড়ির থেকে একদম আলাদা। আমাদের দরজার কাছে দাঁড় করিয়ে রেখে হোমস বাড়ির চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। হোমস রান্নাবাড়ি যাবার রাস্তাটা দিয়ে বাগান ঘুরে আস্তাবল হয়ে আবার ফিরে এল। হোমস এত দেরি করতে লাগল যে, মিঃ হোলডার আমাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এলেন। আমাকে তিনি ডাইনিং রুমের ফায়ারপ্লেসের ধারে বসতে দিলেন। আমরা চুপ করে বসে ছিলাম। খানিকক্ষণ পরে একটি মেয়ে ঘরে ঢুকল। মেয়েটি খুব লম্বা বা খুব মোটা নয়। বলা যায় সাধারণ মাঝারি গড়ন। তবে তার চুল আর চোখের তারা কুচকুচে কালো। মেয়েটির মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। এ রকম ফ্যাকাশে মুখ আমি কারও দেখেছি বলে মনে পড়ল না। তার ঠোঁটদুটো একদম সাদা। কেঁদে কেঁদে চোখদুটো ফুলে উঠেছে। মেয়েটি চুপচাপ ঘরে ঢুকল। সকালবেলায় মিঃ হোলডারকে দেখে আমার যত দুঃখ হয়েছিল, তার চাইতে ঢের বেশি দুঃখ হল এই মেয়েটির অবস্থা দেখে আমার দিকে না তাকিয়ে মেয়েটি সোজা তার কাকার কাছে গিয়ে তাঁর মাথায় সন্তর্পণে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
“বাপি, তুমি আর্থারকে হাজত থেকে ছাড়িয়ে আনবার ব্যবস্থা করে এসেছ তো?”
“না মেরি। এই ব্যাপারটার ফয়সালা আগে হওয়া দরকার।”
“কিন্তু আমি বলছি যে, এ ব্যাপারে ও সম্পূর্ণ নির্দোষ। আর জানো তো, এসব ব্যাপার ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা অনেক বেশি বুঝতে পারে। আমি জানি আর্থার কারও কোনও ক্ষতি করেনি। আমার মনে হচ্ছে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে তুমি সব গোলমাল করে ফেলেছ।”
“যদি ও নির্দোষই হবে তা হলে ও চুপ করে আছে কেন?”
“কে জানে! হয়তো তুমি ওকে সন্দেহ করেছ বলে ওর মনে কষ্ট হয়েছে।”
“কিন্তু ওকে সন্দেহ করব না-ই বা কেন? আমি যে মুকুটটা ওর হাতে দেখেছি।”
“ও হয়তো ওটা হাতে করে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছিল। বাপি, তুমি আমার কথা শোনো। আমি বলছি আর্থার নির্দোষ। ব্যাপারটা চেপে যাও। এ নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি কোরো না। আর্থার হাজতে রয়েছে, এ কথাটা ভাবতেই বড় খারাপ লাগছে।”
মেরি চেষ্টা করছে মিঃ হোলডারকে বোঝাতে যে, আর্থারের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু মিঃ হোলডার অচল অটল। তিনি বললেন, “না, যতক্ষণ না পাথরগুলো পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে লেগে থাকব। তুমি আর্থারকে স্নেহ করো, তাই আমার দিক দিয়ে যে কী ভীষণ ক্ষতি হল, তা বুঝতে পারছ না। ব্যাপারটা চেপে যাওয়া দূরে থাক, সমস্ত কিছু তলিয়ে দেখে ফয়সালা করবার জন্যে আমি লন্ডন থেকে এক ভদ্রলোককে সঙ্গে করে এনেছি।”
“এই ভদ্রলোকটি ?” আমার দিকে তাকিয়ে মেরি বলল।
“না। এঁর বন্ধু। উনি আমাদের ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে আস্তাবলের গলির ওই দিকটায় গেছেন।”
“আস্তাবলের গলিতে?” অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে মেরি বলল, “ওখানে কী করতে গেছেন উনি? ও, ইনিই বুঝি সেই ভদ্রলোক? আমি আশা করি আপনি নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে পারবেন যে, আমার ভাই নির্দোষ।”
“আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। আমার বিশ্বাস সেটা আমি প্রমাণও করতে পারব,” হোমস দরজার পাপোশে জুতো থেকে ঠুকে ঠুকে বরফ ছাড়াতে ছাড়াতে বলল।
“আপনিই নিশ্চয়ই মেরি হোলডার। আপনাকে আমি দু’-একটা প্রশ্ন করতে চাই।”
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। যদি এ রহস্যের সমাধানে আমি কিছু সাহায্য করতে পারি তো অবশ্যই করব।”
“গত রাত্রে আপনি নিজে কিছু শোনেননি?”
“না। বাপির চিৎকার-চেঁচামেচিতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসি।”
“রাত্তিরবেলায় আপনি দরজা-জানলা বন্ধ করেছিলেন। সব জানলাই কি ছিটকিনি দেওয়া ছিল ?”
“হ্যাঁ”
“আজ সকালে কি সব দরজাই ছিটকিনি বন্ধ ছিল ?”
“হ্যাঁ।”
“আপনাদের একটি কাজের মেয়ে আছে, যার সঙ্গে প্রায়ই তার বন্ধুবান্ধবেরা দেখা করতে আসে? আমি শুনেছি যে, কাল রাত্রে আপনি আপনার কাকাকে বলেছিলেন যে, সে কারও সঙ্গে দেখা করতে বাইরে গিয়েছিল।”
“হ্যাঁ। আর ওই মেয়েটি কাল বসবার ঘরে কফি দিতে গিয়েছিল। আমার মনে হয় বাপি যখন মুকুটের কথা বলল তখন ও সেই কথা চুপিসারে আড়ি পেতে শুনেছিল।”
“আচ্ছা। আপনি আন্দাজ করছেন যে, এই কথা সে তার সঙ্গে যে দেখা করতে এসেছিল তাকে বলে, আর তারপর ওরা দু’জনে মিলে চুরির মতলব করে?”
“কিন্তু এসব কথা বলে কী লাভ,” মিঃ হোলডার অধৈর্য হয়ে বললেন, “আমি তো আপনাদের বলেছি যে, আমি মুকুট হাতে করে আর্থারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।”
“একটু ধৈর্য ধরুন মিঃ হোলডার। ও কথায় আমি পরে আসছি। আচ্ছা মিস হোলডার, ওই কাজের মেয়েটিকে আপনি কি রান্নাবাড়ির দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখেছিলেন?”
“হ্যাঁ। আমি দরজাটা ঠিকমতো বন্ধ আছে কিনা দেখতে গিয়ে দেখলাম যে, ও টুক করে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল। যে দেখা করতে এসেছিল, তাকে আমি অন্ধকারের মধ্যেও দেখতে পেয়েছিলাম।”
“আপনি কি লোকটিকে চেনেন ?”
“চিনি বই কী! ও আমাদের শাকসবজি দিয়ে যায়। ওর নাম ফ্রান্সিস প্রসপার।”
হোমস বলল, “ও দরজার বাঁ দিকে একটু দূরে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“সে লোকটির একটা পা কাঠের, ঠিক কিনা?”
হোমসের কথায় মেরির চোখে-মুখে একটা বিস্ময় আর আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠল। “আপনি কি ম্যাজিক জানেন! তারপর একটু হেসে বলল, “আপনি কী করে জানলেন বলুন না?”
হোমসের গম্ভীর মুখে কিন্তু হাসি ফুটল না। সে বলল, “এবার আমি দোতলাটা একটু ঘুরে দেখব। আর বাড়িটার বাইরেটা আর একবার দেখব। তার আগে একবার একতলার জানলাগুলো পরীক্ষা করে দেখা দরকার।”
হোমস চটপট জানলাগুলো দেখে নিল। শুধু যে হলের জানলাটা দিয়ে আস্তাবলে যাবার গলিটা দেখা যায়, সেইটার সামনে সে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার জোরালো ম্যাগনিফায়িং গ্লাসটা দিয়ে জানলাটা খুলে ভাল করে দেখতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পরে হোমস বলল, “চলুন, এবার আমরা ওপরে যাই।”
মিঃ হোলডারের ঘরটা ছোট। ঘরটায় আসবাবপত্র বিশেষ নেই। ঘরে ঢুকতেই যেটা চোখে পড়ে, সেটা একটা বিরাট আরশি। আর বিরাট সেই সিন্দুক। হোমস ঘরে পা দিয়েই সোজা সেই সিন্দুকটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।”
“কোন চাবি দিয়ে এই সিন্দুকটা খোলা হয়েছিল ?” হোমস জিজ্ঞেস করল।
“ওই যে, সেই ভাঁড়ারঘরের যে আলমারিটার চাবির কথা আর্থার বলেছিল।”
“সে চাবিটা কি এখানে আছে?”
“হ্যাঁ, ওই ড্রেসিংটেবিলে রয়েছে।”
হোমস ড্রেসিংটেবিল থেকে চাবিটা নিয়ে এসে সিন্দুকটা খুলে ফেলল।
“তালাটায় কোনও শব্দ হয় না। সেইজন্যে আপনার ঘুম ভাঙেনি,” হোমস বলল। “এই বাক্সটাতেই বোধহয় সেই মুকুটটা আছে। এটা একবার দেখা দরকার।”
বাক্সটা খুলে হোমস সেই মুকুটটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। গয়না যদি শিল্পসামগ্রী হয় তো মানতেই হবে, এই মুকুটটা একটা অসাধারণ শিল্পবস্তু। ছত্রিশটা বেরিল সুন্দর করে সাজানো। বেরিল যে এত চমৎকার দেখতে হয় আমি জানতাম না। মুকুটের একটা কোণ এবড়োখেবড়ো দেখাচ্ছে। বুঝলাম ওই কোণটা থেকেই তিনটে পাথর ছিড়ে নেওয়া হয়েছে।
হোমস বলল, “মিঃ হোলডার, মুকুটের এই কোণের যে-অংশটা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে সেটা ঠিক এর মতন, তাই তো? আপনি দয়া করে এই দিকটা ছিড়ে ফেলবেন কি?”
মিঃ হোলডার ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, “না, না, এ আপনি কী বলছেন! আমি কিছুতেই এ কাজ করতে পারব না।”
“ঠিক আছে। তা হলে আমিই করছি।” হোমস তার গায়ে যত জোর আছে তত জোর দিয়েও ছিড়তে বা ভাঙতে পারল না। “না বিশেষ সুবিধে হল না” হোমস বলল, “আমার হাতের ক্ষমতা প্রচণ্ড, কিন্তু এটা ছিঁড়তে গেলে আমাকেও বহু কসরত করতে হবে। সাধারণ লোক এটা টেনে ছিঁড়তে পারবে না। আমি যদি এটা ছিঁড়ি তো কী হবে বলতে পারেন মিঃ হোলডার ? ঠিক পিস্তল ছোড়ার মতো শব্দ হবে। অথচ আপনি একথা বলছেন যে, আপনার খাটের কাছে এত জোরে শব্দ হয়েছিল আর আপনি কিছুই টের পাননি ?”
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে আমি ঘোর অন্ধকারে পড়ে গেছি।”
“দেখা যাক ব্যাপারটা ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হয় কিনা। আচ্ছা মিস হোলডার, আপনার কী মনে হয় ?”
“বাপির মতো আমিও মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“আচ্ছা মিঃ হোলডার, আর্থারের পায়ে চটি বা জুতো ছিল কিনা দেখেছিলেন?”
“না, খালি পায়ে ছিল।”
“ঠিক আছে। এই তদন্ত শুরু করবার থেকেই ভাগ্য আমাদের ওপর বেশ সুপ্রসন্ন। এখন আমরা যদি সব ব্যাপারটা গুছিয়ে ফয়সালা করতে না পারি, সেটা আমাদের দোষ। মিঃ হোলডার, এবার আমি আবার বাড়ির বাইরেটা ঘুরে দেখব।”
হোমস একলাই গেল। আমাদের যেতে দিল না। বলল, অনেক লোকের পায়ের ছাপ রাস্তায় পড়লে তার কাজের অসুবিধে হবে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে হোমস যখন ফিরে এল তখন তার জুতো বরফে একদম ঢেকে গেছে। অবশ্য তার মুখ দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।
“মিঃ হোলডার, এখানে আমার যা যা দেখবার ছিল, তা দেখা হয়ে গেছে। এবার আমি ফিরে গিয়ে আমার ঘরে বসে আপনার সমস্যার সমাধান করতে পারব।”
“কিন্তু, মিঃ হোমস, সেই পাথরগুলোর কী হল? সেগুলো কোথায়?”
“আমি বলতে পারছি না।”
অসহায় ভাবে হাত বাঁকাতে বাঁকাতে মিঃ হোলডার বললেন, “ওগুলো আর পাওয়া যাবে না! আর আমার ছেলের? সে ব্যাপারে কি আপনি কিছু ভরসা দিতে পারেন ?”
“আমার মত বদলাবার কোনও কারণ ঘটেনি, এইটুকু বলতে পারি।”
“তা হলে কাল রাত্তিরে আমার বাড়িতে যে-সাংঘাতিক ব্যাপারটা ঘটে গেল সেটা তবে কী?”
হোমস বলল, “কাল সকালে এই ধরুন ন’টা-দশটা নাগাদ আপনি যদি বেকার স্ট্রিটের বাসায় আসেন তো ব্যাপারটা হয়তো আপনাকে বুঝিয়ে দিতে পারব। ভাল কথা, ইতিমধ্যে যদি আমি ওই হারানো পাথরগুলো উদ্ধার করতে পারি তো তার জন্যে যা খরচা হবে তা করতে আপনি রাজি আছেন তো?”
“নিশ্চয়ই। ওই পাথরগুলোর জন্যে আমি আমার সঞ্চিত টাকাকড়ি, বিষয়সম্পত্তি সবই দিয়ে দিতে রাজি আছি।”
“বেশ। তা হলে আমি আমার কাজ পুরোদমে শুরু করে দিই। এখন চলি। সন্ধে নাগাদ আমাকে এ দিকে আর একবার আসতে হতে পারে। আচ্ছা এখন তবে চলি।”
আমি বুঝতে পারলাম যে, হোমস এই রহস্যের সমাধানের একটা সূত্র খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু বিস্তর মাথা খাটিয়েও সে সূত্রটা যে কী তা আমি আঁচ করতে পারলাম না। ফেরবার সময় আমি দু’-চারবার কথাটা তোলবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্রত্যেক বারই হোমস সেই কথাটা বাদ দিয়ে অন্য কথা বলতে লাগল। শেষকালে বাধ্য হয়ে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। তিনটে বাজার আগেই আমরা আমাদের বেকার স্ট্রিটের ডেরায় ফিরে এলাম। বাড়িতে ফিরেই হোমস সোজা তার ঘরে ঢুকে গেল। একটু পরেই সে একজন রাস্তার বেকার বকাটে ছেতোর ছদ্মবেশে বেরিয়ে এল। তার জামার কলারটা ঘাড়ের ওপর তুলে দেওয়া। গায়ের কোটটা যে কত পুরনো তা বলা শক্ত। তার টাইয়ের রং টকটকে লাল। জুতোর শুকতলাটা খসে যাবার মতো হয়েছে। হোমসের চেহারা হাবভাব জামাকাপড় দেখলে কে বলবে যে একটা রকবাজ বেকার লোক নয়।
ঘরের ফায়ারপ্লেসের ওপরে টাঙানো আয়নায় নিজের চেহারাটা আপাদমস্তক দেখে নিয়ে হোমস বলল, “এতেই মোটামুটি কাজ চলে যাবে। ওয়াটসন, তোমাকে সঙ্গে নিতে পারলে ভালই হত। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। আমি যা পাবার আশা করছি তার সন্ধান যদি না পাই তবে সবটাই পণ্ডশ্রম হবে। তবে আমি ভুল পথে যাচ্ছি কি ঠিক পথে যাচ্ছি সেটা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানতে পারব। মনে হয় আমার ফিরতে খুব বেশি দেরি হবে না।” কথা শেষ করেই হোমস দেওয়াল-আলমারি খুলে একটা মাংসের বড় টুকরো বার করে খানিকটা মাংস কেটে নিল। তারপর মাংসটা দু’-খণ্ড পাউরুটির মধ্যে পুরে সেটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল। তারপর কিছু না বলে হোমস বেরিয়ে গেল।
হোমস যখন ফিরে এল আমি তখন বিকেলের চায়ের পালা সাঙ্গ করেছি। হোমসের মুখ-চোখ দেখে মনে হল, সে খুব ফুর্তিতে রয়েছে। তার হাতে ইলাস্টিকের পট্টি দেওয়া এক জোড়া পুরনো জুতো।
জুতোজোড়া দোলাতে দোলাতে হোমস ঘরে ঢুকে প্রথমেই সেটাকে ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখল। তারপর একটা কাপে চা ঢেলে চুমুক দিতে দিতে বলল, “আমি যাতায়াতের পথে তোমাকে একবার দেখে গেলাম ওয়াটসন। আমি আবার এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ব।”
“এখন কোথায় যাবে?”
“এখন যাব ওয়েস্ট এন্ডের দিকে। আমি কখন ফিরব বলতে পারছি না। তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা কোরো না।”
“তা তোমার কাজ চলছে কেমন?”
“মোটামুটি। এখনও পর্যন্ত কোথাও কোনও গোলমাল হয়নি। এখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম স্ট্রেথাম। আমি মিঃ হোলডারের বাড়ি যাইনি। এটা বেশ মজাদার রহস্য বটে। যাই হোক, এখন গল্প করবার সময় নেই। আগে এই নোংরা কাপড়চোপড় ছেড়ে ফেলে ধোপদুরস্ত পোশাক পরা যাক।”
শার্লক হোমসের হাবভাব দেখে আমি বুঝলাম যে, মুখে না বললেও ব্যাপারটার সে সমাধান করে ফেলেছে। খুশিতে হোমসের চোখের তারাগুলো চকচক করছিল। হোমস আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে ওপরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সদর দরজা বন্ধ করার শব্দ থেকে বুঝলাম যে, হোমস বেরিয়ে গেল।
আমি রাত বারোটা অবধি বসে রইলাম। হোমসের পাত্তা নেই। শেষকালে আমি শুয়ে পড়লাম। হোমসের পক্ষে রাত্তিরে বাড়ি না-ফেরা কোনও অদ্ভুত বা আশ্চর্য ব্যাপার নয়। রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই সে দু’-চার দিনের জন্যে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। তাই হোমস না-ফেরায় আমার কোনও দুর্ভাবনা বা দুশ্চিন্তা হল না। হোমস কত রাত্তিরে ফিরেছিল জানতেই পারিনি। পরদিন সকালে চায়ের টেবিলে চা খেতে গিয়ে দেখি হোমস কফি খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছে। তাকে দেখে মনে হল যে, সে বেশ চাঙ্গাই রয়েছে।
“ওয়াটসন তুমি ওঠবার আগেই চা খেতে শুরু করে দিয়েছি বলে কিছু মনে কোরো না। তোমার মনে আছে বোধহয় আজ সকালে আমাদের মক্কেলের আসবার কথা আছে।”
“আরে তাই তো, নটা বেজে গেছে দেখছি,” আমি বললাম। “মনে হল ঘণ্টার শব্দ শুনলাম। ওই বোধহয় উনিই এলেন।”
একটু পরে আমাদের মক্কেল ঘরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। এক রাত্তিরের মধ্যে তার চেহারা এত পালটে গেছে যে, চেনা যায় না। চোখ বসে গেছে। মুখে একটা কালো ছোপ পড়ে গেছে। মাথার চুল যেন আরও বেশি পেকে গেছে। গতকাল সকালে তিনি যখন উত্তেজিত অবস্থায় প্রায় পাগলের মতো আমাদের ঘরে ঢুকে ছিলেন তখন ওঁকে দেখে আমার কষ্ট হয়নি। কিন্তু আজ সকালে উনি এমন ক্লান্ত আর হতাশ ভাবে আমাদের ঘরে ঢুকলেন যে, ওঁকে দেখে সত্যি সত্যি খুব কষ্ট হল। ওঁর দিকে আমি একটা আরামকেদারা এগিয়ে দিলাম। উনি সেটাতে ধপাস করে বসে পড়লেন।
“আমি জানি না কোন দোষে আমার এমন শাস্তি হল। দু’দিন আগে আমি ছিলাম সব দিক দিয়ে সুখী। ভাবনাচিন্তা বলতে কিছুই ছিল না। এখন আমার মানসম্মান তো গেলই আর আপনার লোক বলতেও কেউ রইল না। ওই যে বলে, দুর্ভাগ্য কখনও একা আসে না, এখন বুঝছি কথাটা কতটা সত্যি। আমার ভাইঝি মেরি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।”
মেরি যে মিঃ হোলডারকে ছেড়ে চলে গেছে, এই খবর শুনে আমি চমকে উঠলাম। কিন্তু হোমসের মুখে কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না। মিঃ হোলডার বললেন, “হলঘরের টেবিলে আমাকে চিঠি লিখে রেখে চলে গেছে। আমি পরে ওর ঘরে গিয়ে দেখলাম, ঘর খালি। বিছানাটা দেখে বুঝলাম যে, কাল রাত্তিরে মেরি বিছানায় শোয়নি। কালকে আমি কথায় কথায় ওকে দুঃখ করে বলেছিলাম যে, ও যদি আর্থারকে আরও একটু দেখাশোনা করত তা হলে হয়তো ছেলেটা এমন বিগড়ে যেত না। বিশ্বাস করুন, এর জন্যে আমি ওকে দোষও দিইনি বা বকাঝকাও করিনি। স্রেফ একটা কথার কথা বলেছিলাম। হয়তো কথাটা বলা আমারই অন্যায় হয়েছিল। আমার ওই কথাটার সম্বন্ধে মেরি তার চিঠিতেও লিখেছে। মেরির চিঠি পড়ছি শুনুন, ‘বাপি, আমার মনে হচ্ছে যে তোমার এই অবস্থার জন্যে আমিই দায়ী। আমি যদি আরও সচেতন হতাম তা হলে হয়তো এই বিশ্রী ব্যাপারটা ঘটত না। এ কথাটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না, আর সেইজন্যে আমার পক্ষে তোমার বাড়িতে থাকা আর সম্ভব নয়। আমার কী হবে ভেবে মন খারাপ কোরো না। আমার ঠিকই চলে যাবে। আমাকে খোঁজবার চেষ্টা কোরো না। খুঁজলেও পাবে না। যেখানেই থাকি, যেমনই থাকি, তোমার কথা আমি ভুলব না কোনও দিন। তোমার মেরি।’ আচ্ছা মিঃ হোমস, আপনার কি মনে হয় ও আত্মহত্যা করতে পারে? এ চিঠিরই বা কী মানে, আমি তো কিছু। বুঝতে পারছি না।”
“না না, আত্মহত্যার কথা ভেবে আপনি মন খারাপ করবেন না। আমার মনে হয় সব দিক দিয়ে ভেবে দেখলে এটাই সবচেয়ে ভাল সমাধান হয়েছে। মিঃ হোলডার, মনে হচ্ছে এবার আপনার সব ঝামেলা চুকে যাবে।”
“আপনি বলছেন মিঃ হোমস ? আপনি কি কিছু টের পেয়েছেন? মানে আসল ব্যাপারটা জানতে পেরেছেন? সে পাথরগুলোর সন্ধান পেয়েছেন।” “প্রত্যেকটা পাথরের জন্যে যদি হাজার পাউন্ড করে দিতে হয় আপনি দেবেন কি?”
“আমি দশ হাজার করে দিতে রাজি।”
“না অত টাকা খরচ করতে হবে না। তিন হাজার পাউন্ড হলেই হবে। এর সঙ্গে আপনি যে হাজার পাউন্ড পুরস্কার দেবেন বলেছিলেন সেটাও দেবেন। আপনার সঙ্গে চেকবই আছে। তো? বাঃ, তা হলে আপনি একটা চার হাজার পাউন্ডের চেক লিখে দিন।”
মিঃ হোলডারকে দেখে মনে হচ্ছিল যে, যা ঘটছিল তার কোনও কিছুই ওঁর মাথায় ঢুকছে না। একটা ঘোরের মধ্যে উনি চার হাজার পাউন্ডের একটা চেক কেটে দিলেন। হোমস উঠে তার দেরাজের কাছে গেল। সেখান থেকে একটা তিন-কোনা সোনার পাত নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখল। তাতে তিনটে বেরিল পাথর বসানো।
আনন্দে চিৎকার করে আমাদের মক্কেল সেটা হাতের মুঠোয় তুলে নিলেন।
“আপনি এটা পেয়েছেন?” ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে হোমসের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওহ্, আমি বেঁচে গেছি, বেঁচে গেছি।”
ঈষৎ কঠিন স্বরে হোমস ভদ্রলোককে বলল, “আপনার কাছ থেকে আমার আরও একটা পাওনা আছে।”
“পাওনা!” কলমটা তুলে নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “বলুন আপনাকে কত দিতে হবে ? আমি আনন্দের সঙ্গে দেব।”
“না, আমাকে কিছু দিতে হবে না। আপনাকে আপনার ছেলের কাছে ভুল স্বীকার করে নিতে হবে। আপনার ছেলে অত্যন্ত চরিত্রবান উঁচু দরের ছেলে। যদি আমার কোনওদিন ছেলে হয় আর এমন ছেলে হয় তো আমি তার জন্যে গর্ব বোধ করব।”
“তা হলে আর্থার এগুলো নেয়নি।”
“আমি তো আপনাকে গতকালই বলেছিলাম আর আজও বলছি যে, না, সে নেয়নি।”
“এ বিষয়ে কি আপনি নিশ্চিত ? তা হলে চলুন আমরা তাড়াতাড়ি তাকে গিয়ে সব কথা খুলে বলি। বলি যে ব্যাপারটার ভালয় ভালয় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।”
“সে সবই জানে। যখন গোটা জিনিসটার ফয়সালা হয়ে গেল, তখন আমি আর্থারের সঙ্গে জেলখানায় গিয়ে দেখা করি। প্রথমে তো ও কোনও কথাই বলতে চায়নি। তখন আমি ওকে আগাগোড়া যেমন যেমন ঘটেছে তেমন তেমন বলি, তখন অবশ্য ও সব কথা স্বীকার করে। দু’-একটা ছোটখাটো জিনিস খোলসা করতেই আমি আর্থারের কাছে যাই। তবে আপনি তার সঙ্গে দেখা করে সব কথা বললে সে হয়তো মুখ খুলতে পারে।”
“তা হলে ঈশ্বরের দোহাই, আপনি আমাকে এই আশ্চর্য রহস্যের মূল কথাটা খুলে বলুন।”
“নিশ্চয়ই আপনাকে বলব। আর আপনাকে দেখিয়ে দেব কী ভাবে ধাপে ধাপে আমি এই রহস্যের সমাধান করেছি। কিন্তু প্রথমেই যে-কথাটা আপনাকে বলব সেটা আমার বলতে খারাপ লাগবে আর আপনার শুনতে আরও খারাপ লাগবে। আপনার ভাইঝি মেরির সঙ্গে সার জর্জ বার্নওয়েলের ভেতরে ভেতরে একটা বোঝাপড়া ছিল। ওরা দু’জনেই গা-ঢাকা দিয়েছে।”
“আমার মেরি! অসম্ভব!”
“দুঃখের বিষয় ঠিকই। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি। বার্নওয়েল যে কী সাংঘাতিক চরিত্রের লোক তা আপনি বা আপনার ছেলে কেউই বুঝতে পারেননি। আর না বুঝেই তাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। ইংল্যান্ডে ওর মতন শয়তান প্রকৃতির লোক আর কেউ আছে বলে আমার জানা নেই। ওর অবস্থা পড়ে গেছে। লোকটা অসম্ভব জুয়াড়ি, এক নম্বরের শয়তান। ওর চরিত্রে ভাল বলতে কিছুই নেই। ওর না আছে বিবেক, না আছে হৃদয়। আমি জানি না আপনার ভাইঝিকে সে কী বুঝিয়েছিল। যে-কোনও ভাবেই হোক আপনার ভাইঝি তার খপ্পরে পড়ে যায়।”
“আমি এ কথা বিশ্বাস করি না, আর বিশ্বাস করব না!” মিঃ হোলডারের মুখটা একেবারে সাদা হয়ে গেছে।
“বেশ, তা হলে সেই রাত্তিরে আপনার বাড়িতে কী হয়েছিল বলি শুনুন। আপনার ভাইঝি আপনি আপনার ঘরে গেছেন মনে করে, নীচে নেমে এসে জানলা দিয়ে বার্নওয়েলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। অনেকক্ষণ ধরে বরফের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল বলে বার্নওয়েলের পায়ের ছাপ ওখানে বেশ ভালমতো বসে যায়। সেই সময়ে বোধহয় মেরি বার্নওয়েলকে ওই মুকুটের কথা বলে। আপনার ভাইঝি আপনাকে খুবই ভালবাসেন, তা সত্ত্বেও কী ভাবে বার্নওয়েল ওঁকে দিয়ে ওই কাজ করাল সেটাই আশ্চর্য। যখন মেরি জানলা দিয়ে বার্নওয়েলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল সেই সময়ে আপনি ওপর থেকে নামছিলেন। আপনার পায়ের শব্দ পেয়ে উনি তাড়াতাড়ি করে জানলা বন্ধ করে দেন। তারপর আপনাকে আপনাদের কাজ করার লোকের চুপি চুপি বাইরে গিয়ে অন্য লোকের সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন। অবশ্য মেরি ও ব্যাপারে আপনাকে সত্যি কথাই বলেছিলেন।
“আপনার সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর আর্থার তো ঘরে শুতে গেল। কিন্তু সে রাত্রে মোটেই ঘুম আসছিল না। তার মাথায় ক্লাবের দেনা শোধের ব্যাপারটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। মাঝরাত্রে হঠাৎ তার মনে হল কে যেন তার ঘরের সামনে দিয়ে পা টিপে টিপে চলে গেল। উঁকি মেরে কে গেল দেখতে গিয়ে আর্থার স্তম্ভিত হয়ে দেখল যে তার খুড়তুতো বোন খুব সাবধানে পা টিপে টিপে বারান্দা দিয়ে গিয়ে আপনার ঘরে ঢুকে গেল। কী হয় দেখবার জন্যে আর্থার ওইখানেই চুপ করে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল। একটু পরেই মেরি আপনার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বারান্দার ক্ষীণ আলোতে আর্থার অবাক হয়ে দেখল মেরির হাতে ওই মুকুটটা রয়েছে। মেরি সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নেমে যাবার পরই আর্থার নীচে নেমে এসে হলঘরের দরজায় যে বড় পরদা তার আড়ালে লুকিয়ে রইল, যাতে তারপরে কী ঘটছে সে ঠিকমতো দেখতে পায়। আর্থার লক্ষ করল যে মেরি খুব সন্তর্পণে জানলা খুলে বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা কারও হাতে মুকুটটা দিয়ে দিল। তারপর জানলা বন্ধ করে ফের নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। হলের দরজার পরদা সরিয়ে যাবার সময় আর একটু হলে তার সঙ্গে আর্থারের ধাক্কা লেগে যেত।
“যতক্ষণ মেরি ওই ঘরে ছিল, ততক্ষণ আর্থারের পক্ষে কোনও কিছু করা সম্ভব ছিল না। কে না তা হলে সব ব্যাপারটা জানাজানি হতই। আর্থার মেরিকে নিজের বোনের মতো ভালবাসত, তাই সে চায়নি যে এই চুরির সঙ্গে মেরির যে যোগ রয়েছে সে কথাটা বাড়ির লোকজনেরা জেনে ফেলুক। মেরি চলে যাবার পরই আর্থার জানলা খুলে বাইরে লাফিয়ে পড়ে। গলির একেবারে শেষ প্রান্তে চাঁদের আলোতে আর্থার দেখতে পায় যে, একজন লোক চলে যাচ্ছে। খালি পায়ে রাস্তায় জমে থাকা বরফের ওপর আর্থার ছুটতে শুরু করে। বার্নওয়েল পালাবার আগেই আর্থার ওকে ধরে ফেলে। তখন ওদের মধ্যে মারামারি ঝটাপটি লেগে যায়। আর্থারের এক ঘুসিতে বার্নওয়েলের চোখের ওপরে ভালমতন কেটে যায়। তা সত্ত্বেও বার্নওয়েল মুকুটটা ছাড়েনি, ধরে ছিল। আর্থারও মুকুটের আর একটা দিক ধরে টানতে থাকে। এই টানাটানির সময়ে ফটাস করে একটা শব্দ হয়। হঠাৎ আর্থার দেখল যে মুকুটটা তার হাতে এসে গেছে। আর তখনই সে সেটা নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করে। তারপর জানলা দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে জানলা বন্ধ করে জিনিসটা নিয়ে ওপরে আপনার ঘরে আসে। আপনার ঘরের মধ্যে এসে সে দেখতে পায় টানাটানিতে মুকুটটা বেঁকে গেছে। যখন সে মুকুটটাকে সোজা করবার চেষ্টা করছিল, তখন আপনি ঘটনাস্থলে এসে হাজির হন।”
“এ যে একেবারে অসম্ভব ব্যাপার,” মিঃ হোলডার বললেন।
“আর্থার আশা করেছিল যে, আপনি তার প্রশংসা করবেন, কিন্তু আপনি কিছু না বুঝেটুঝে তাকে যা-তা বলতে লাগলেন। ফলে তারও মেজাজ গেল চটে। অথচ তার পক্ষে চুপ করে থাকা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। সত্যি কথা বলতে হলে মেরির কথা বলতে হত।”
মিঃ হোলডার বললেন, “ও, এখন বুঝেছি কেন মেরি মুকুটটা দেখে চেঁচিয়ে উঠে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ওহ, আমি কী নিদারুণ নির্বোধ ! আর্থার বোধহয় ভেবেছিল যে টানাটানির সময় ওই টুকরোটা রাস্তায় ছিড়ে বা খুলে পড়ে গেছে। আর সেটা খুঁজে দেখতে সে মিনিটের জন্যে বাইরে যেতে চেয়েছিল। ওহ্, আমি না বুঝে আর্থারের ওপর কী অবিচারই না করেছি।”
হোমস বলতে লাগল, “ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথমেই আমি আপনার বাড়ির চারপাশটা খুব ভাল করে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। আমার উদ্দেশ্য বরফের ওপর কোনও দাগ বা ছাপ পাওয়া যায় কিনা দেখা। আমার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল যে কাল রাত্তিরের পর থেকে আর নতুন করে তুষার পড়েনি। আর কালকের তুষার জমে শক্ত বরফ হয়ে গেছে। যে রাস্তা দিয়ে পসারিরা যাতায়াত করে সেখানে অনেক লোকের পায়ের ছাপ পড়েছে। একজন আর একজনের পায়ের ছাপ মাড়িয়ে চলে গেছে। সেখানে কোনও সূত্র পাওয়া গেল না। আপনার রান্নাবাড়ির দরজার সামনে দু’ জোড়া পায়ের ছাপ দেখলাম। একজোড়া ছাপের মালিক আপনার কাজের মেয়েটি, আর একজনের একটা পা কাঠের। আমি দাগগুলো ভাল করে দেখে বুঝতে পারি যে, আপনাদের কাজের মেয়েটিকে হঠাৎ কোনও কারণে সেখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে হয়। মেয়েটি চলে যাবার পরে কাঠের পা-ওলা লোকটি সেখানে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিল। তারপর আমি বাগানের মধ্যে ঘোরাফেরা করলাম। সেখানে যা ছাপ এদিক-ওদিকে দেখলাম সেগুলো সবই পুলিশের লোকের পায়ের ছাপ বলে মনে হল। তারপর ঘুরতে ঘুরতে যখন আস্তাবলের গলিতে এলাম তখন দেখলাম যে বরফের ওপরে সব কথাই স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে।
“আমি দেখলাম যে রাস্তায় দু’সারি বুটজুতো পরা পায়ের ছাপ রয়েছে, আর দু’সারি খালি পায়ের ছাপ পড়েছে। আপনার কাছ থেকে যা শুনেছিলাম তার থেকে বুঝলাম যে, খালি পায়ের দাগের মালিক আপনার ছেলে। বুট-পরা লোকটি দু’বারই হেঁটেছে। কিন্তু খালি পায়ের লোকটি দৌড়েছে। আর কোথাও কোথাও খালি পায়ের ছাপ বুটজুতোর ছাপের ওপরে পড়েছে। তার থেকে বুঝতে পারলাম, খালি পায়ের লোকটি বুটজুতো-পরা লোকটির পরে গেছে। বুটজুতোর ছাপটা লক্ষ করে এগিয়ে দেখলাম, সেটা হলঘরের জানলার কাছে এসে থেমে গেছে। আর সেখানে অনেকক্ষণ লোকটি দাড়িয়ে ছিল বলে বরফের ওপরে গর্ত হয়ে গেছে। তারপর আমি ওই পায়ের ছাপ ধরে উলটো দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। প্রায় একশো গজ যাবার পর দেখলাম পায়ের ছাপ আবার উলটো দিকে পড়েছে। সেখানে বরফের ওপরে ধস্তাধস্তির চিহ্ন আর রক্তের দাগ দেখতে পাই। আর একটু এগিয়ে দেখি বুটজুতোর ছাপের পাশে রক্তের দাগ। তখন বুঝলাম যে, বুটজুতো-পরা লোকটি আহত হয়েছে। বড় রাস্তায় পৌছে দেখলাম ফুটপাত পরিষ্কার করা হয়েছে। তাই বুটজুতো পরা লোকটি কোন দিকে গেছে সেটার আর হদিস পেলাম না।
“তারপর আমি ফিরে এসে আপনার হলের জানলার ফ্রেমটা আমার ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে বুঝতে পারি যে, কেউ জানলা দিয়ে গলে গেছে আর এসেছে। জানলার ফ্রেমের নীচের কাঠে আমি ভিজে পায়ের ছাপ দেখতে পাই। তখনই ব্যাপারটা আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। বাইরের জানলার কাছে কেউ দাড়িয়ে ছিল, বাড়ির ভেতর থেকে কোনও এক জন ওই মুকুটটা তাকে পাচার করে। এ ব্যাপারটা আড়াল থেকে তৃতীয় কোনও একজন দেখতে পায়। তারপরে সে চোরের পেছনে ধাওয়া করে চোরকে ধরে ফেলে। মুকুটটা ছিনিয়ে নেবার জন্যে দু’জনের মধ্যে জোর টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আর প্রাণপণ টানাটানির মধ্যে মুকুটের একটা অংশ খুলে যায়। সেই অংশটা চোরের হাতে পড়ে। যে-লোকটি চোরকে তাড়া করেছিল তার হাতে বাকিটা থেকে যায়। এ পর্যন্ত ব্যাপারটা ঠিকই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল রাস্তায় যে-লোকটি অপেক্ষা করছিল সে কে? আর ঘর থেকে যে-লোকটি তার হাতে মুকুটটা পাচার করেছিল সে-ই বা কে?
“আমার একটা বহু পুরাতন সূত্র আছে। সেটা হল যে, সব রকম সম্ভাবনা ভুল প্রমাণ হলে যেটা বাকি থাকে সেটা যতই অসম্ভব বলে মনে হোক না কেন, সেটাই সত্যি। আর যে-হেতু আপনি সেটা নামিয়ে আনেননি তা হলে সেটা হয় আপনার ভাইঝি নয় তো কাজের লোকেরা ওপর থেকে নামিয়ে আনে। এখন কথা হল যদি কাজের লোকেরা মুকুটটা পাচার করত তা হলে আপনার ছেলে শুধু শুধু নিজের ঘাড়ে দোষটা নিতে যাবে কেন? এটা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু আর্থার তার খুড়তুতো বোনকে খুবই ভালবাসে, তাই তার খুড়তুতো বোনই যদি জিনিসটা পাচার করে থাকে তা হলে তার পক্ষে চুপ করে থাকাই স্বাভাবিক। কেন না ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে ভীষণ বিচ্ছিরি কাণ্ড হবে। তখন আপনার দুটো কথা আমার মনে পড়ল। এক, আপনি মেরিকে হলঘরের জানলার কাছে দেখেছিলেন। দুই, মুকুটটা দেখে মেরি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। এ দুটোর থেকে আমি বুঝে নিলাম যে আমার অনুমানটা নিছক অনুমান নয়, সেটাই সত্যি।
“এখন প্রশ্ন হল এই ব্যাপারে মেরির সঙ্গী কে? আপনার কাছ থেকে জেনেছিলাম, আপনারা মোটেই মেলামেশা করেন না। বাইরের লোকের মধ্যে সার জর্জ বার্নওয়েলই আপনাদের বাড়িতে প্রায়ই আসেন। বার্নওয়েল যে সুবিধের লোক নয় তা আমি আগেই শুনেছি। তাই আমি বার্নওয়েলকেই মেরির শাগরেদ বলে সন্দেহ করলাম। তা যদি হয়, ওই বুটজুতোর ছাপগুলো বার্নওয়েলের আর তা হলে পাথরগুলো নিশ্চয়ই ওর কাছে আছে। এই রকম আন্দাজ করে আমি ভবঘুরে বেকারের ছদ্মবেশ ধরে সার জর্জের বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। সার জর্জের খাস চাকরের সঙ্গে ভাব জমিয়ে নগদ ছ’ শিলিং খরচা করে সার জর্জের একজোড়া পুরনো জুতো কিনলাম। ওই চাকরের কাছেই খবর পেলাম যে, আগের রাত্তিরে একটা ছোটখাটো দুর্ঘটনায় সার জর্জের চোখের ওপরে বেশ খানিকটা কেটে গেছে। সেখান থেকে আমি চলে গেলাম ষ্ট্ৰেথ্যামে। সেখানে যেখানে যেখানে বরফের ওপর বুটের ছাপ ছিল সেখানে ওই ছাপের সঙ্গে সার জর্জের বুটজুতোর মাপ একদম মিলে গেল।”
“হ্যাঁ, কাল সন্ধেবেলায় আস্তাবলের গলিতে একজন নোংরা জামাকাপড় পরা লোককে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিলাম বটে,” মিঃ হোলডার বললেন।
“ঠিকই দেখেছেন। আমিই সেই লোক। যখন নিশ্চিত ভাবে বুঝলাম যে, ঠিক লোককেই ধরেছি তখন আমি বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়ি ফিরে পোশাক বদলে নিয়ে ফের বেরোলাম। এবারেই হল আসল মুশকিল। বার্নওয়েলকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করার মতো প্রমাণ আমার হাতে কিছুই নেই। তা ছাড়া কোর্টকাছারি পর্যন্ত ব্যাপারটা যদি গড়ায় তো কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা বার্নওয়েল মহা ধড়িবাজ। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সব দিক ভেবে আমি বার্নওয়েলের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।
“প্রথমটায় বার্নওয়েল তো আমাকে ফুঃ ফুঃ করে উড়িয়েই দিচ্ছিল। তখন আমি তাকে গোড়া থেকে যা-যা ঘটেছে, তা পর পর বলে গেলাম। আমার মুখে সব কথা শুনে ও তো আমাকে ডান্ডা নিয়ে মারতে এল। বার্নওয়েল যে এ রকম একটা কিছু করতে পারে তা আমি অনুমান করেছিলাম। আর তার জন্যে আমি মনে মনে তৈরি ছিলাম। ও ডান্ডাটা তোলবার আগেই আমি আমার পিস্তলটা ওর দিকে বাগিয়ে ধরলাম। এতক্ষণে বার্নওয়েল যেন ধাতস্থ হল। তখন আমি তাকে বললাম, সে যদি পাথরগুলো আমাকে ফিরিয়ে দেয় তা হলে আমি তাকে প্রত্যেকটি পাথরের জন্যে হাজার পাউন্ড করে দেব। আমার কথায় বার্নওয়েল যেন একেবারে চুপসে গেল। ‘সে কী! আমি যে মাত্র ছশো পাউন্ডে সব কটা বিক্রি করে ফেলেছি।
“বার্নওয়েল তো কিছুতেই বলতে চায় না যে কার কাছে ওই পাথরগুলো সে বিক্রি করেছে। আমি যখন তাকে কথা দিলাম যে, তার বিরুদ্ধে আমরা কোনও মামলা করব না। তখন সে সেই দোকানদারের নাম-ঠিকানা বলল।
“বার্নওয়েলের কাছ থেকে বেরিয়ে প্রথম গেলাম জেলখানায় আপনার ছেলে আর্থারের সঙ্গে দেখা করতে। আর্থারকে সব কথা বলে গেলাম সেই দোকানদারের সন্ধানে। সেখান থেকে আপনার জিনিস উদ্ধার করে যখন বাড়ি ফিরলাম রাত তখন আড়াইটে। …ওহ্, কাল সারা দিন বেজায় খাটাখাটনি গেছে।” শার্লক হোমস চুপ করল।
মিঃ হোলডার বললেন, “আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না। আপনি আমার একার নয়, সারা দেশের মুখ রক্ষা করেছেন। তবে আর একটা রহস্যের সমাধান এখনও হল না—”
মিঃ হোলডারকে বাধা দিয়ে হোমস বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন বুঝেছি। মেরির খোঁজ না করাই আপনার পক্ষে ভাল।”
