ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(৭)
সোমবার, মে ১৬, ২০১১
এই সময়টা আমাদের গ্রীষ্মের ছুটি। ক্লাস থাকে না ঠিকই, তবে কাজ থাকে–
সেমিনার, ছাত্রদের অ্যাডভাইস দেওয়া, নিজের রিসার্চ, এছাড়া ডিপার্টমেন্টের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কিছু কাজ। আজ একটা সেমিনার ছিল, তার ওপর কয়েকটা ছাত্রের সঙ্গে মিটিং। কোনও মতে কফি খেয়ে কলেজ চলে এসেছি। পত্রিকাটাও ভালো করে পড়তে পারিনি। তবে বব ক্যাসেলের মৃত্যুর খবরটা দেখেছি বেরিয়েছে। ছোট্ট করেই দিয়েছে, তবে নতুন কিছু তথ্য পেলাম। যে হাই রাইজ বিল্ডিং থেকে উনি পড়ে যান সেটা বিপাশা মিত্রেরই প্রপার্টি। ওখানে কিছু কনস্ট্রাকশন চলছে, সেই সূত্রেই বব ওখানে মাঝে মাঝে যেতেন। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ উনি যখন বাইশ তলায় উঠেছিলেন, তখন সেই তলায় সম্ভবত আর কেউ ছিল না, কারণ রবিবারে ওখানে কোনও কাজ হয় না। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এখানে খবরের সঙ্গে বয়সটাও থাকে। ববের বয়স হয়েছিল ৩৫। এটা যে সুইসাইড, তার কোনও উল্লেখ অবশ্য দেখলাম না। তবে যে ভাবে তথ্যগুলো দেওয়া হয়েছে, তাতে সেটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এ নিয়ে একেনবাবু বা প্রমথ কারো সঙ্গেই কথা বলার ফুরসত পাইনি।
.
সকালের কাজগুলো সেরে লাঞ্চ খেতে গিয়ে ক্যাফেটেরিয়াতে ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে এক ঝলক দেখা। আজ সন্ধ্যায় যে একেনবাবু আমাদের সবাইকে খাওয়াচ্ছেন ইতিমধ্যেই ও জানে। এমন কি একেনবাবুকে যে একটা ব্লু সাফায়ার কিনে দিতে হবে, সেটাও প্রমথ ওকে বলেছে। আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি রাজু চুগানিকে চেন?”
“না।”
“শি নোজ ইউ!” এমন ভাবে আমায় কথাটা বলল, যেন আমি ইচ্ছে করে পরিচয়টা চেপে যাচ্ছি।
আমাকে একজন মেয়ে চেনেন, আর আমি তাঁকে চিনি না! হঠাৎ মনে পড়ল লাইব্রেরিতে একজন নতুন ভারতীয় মেয়ে কাজ করছেন, তাঁর ডেস্কে বোধহয় ওই নামেরই একটা নেমপ্লেট দেখেছি।
“লাইব্রেরিতে যিনি কাজ করছেন?”
“ইয়েস। ওর বর হেমন্ত একজন বড় ডায়মন্ড মার্চেন্ট। ইস্ট ফর্টিফিফথ স্ট্রিটে তার একটা দোকান আছে। রাজু প্রমথ আর আমাকে একবার নিয়েও গেছে ওখানে। ওখানেই ডিনারের আগে সবাই মিলে যাব।”
সকালের মধ্যে যে এতগুলো প্ল্যান হয়ে গেছে আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। কিন্তু প্রমথ ফ্রান্সিস্কাকে নিয়ে ডায়মন্ডের দোকানে গেছে, ব্যাপারটা কি? ব্যাটা নিশ্চয় ফ্রান্সিস্কাকে এনেগেজমেন্ট রিং দেবার কথা ভাবছে? রাস্কেলটা তো একবারও আমাকে বলেনি! আমি একটু চোখ টিপে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “শুড আই এক্সপেক্ট সাম গুড নিউজ সুন?”
“মে বি,” বলে মুচকি হেসে ফ্রান্সিস্কা চলে গেল।
চারটে বাজতে না বাজতেই ওরা সবাই আমার অফিসে এসে হাজির। মেয়েদের গয়নার প্রতি আকর্ষণ একেবারে ইউনিভার্সাল। ফ্রান্সিস্কারই এ ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহ। একেনবাবুকে বলল, “ডিটেকটিভ (ওই নামেই ফ্রান্সিস্কা একেনবাবুকে সম্বোধন করে), যখন জুয়েলরি শপ-এ যাচ্ছ, তখন তোমার বৌয়ের জন্যেও একটা আংটি কেন। দশ বছর একটা বড় মাইলস্টোন।”
বেচারা একেনবাবু। প্রমথই বাঁচাল। “একে শনির দশা চলছে, তার ওপর আমাদের খাওয়াতে হবে, নীলা কিনতে হবে। এর ওপর যদি আর একটা আংটি কেনার চাপ দাও, উনি হার্টফেল করবেন– শনির দশা একেবারে ষোলকলায় পূর্ণ হবে।”
“ডোন্ট বি সিলি!” প্রমথকে একটা ধমক দিল ফ্রান্সিস্কা। তারপর একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ডিটেকটিভ, এই স্যাটার্নের ব্যাপারটা কি?”
“ব্যাপারটা খুব গোলমেলে, ম্যাডাম। কুষ্ঠি মানে বার্থ চার্টের একটা বাজে গ্রহ হল শনি। সময়ের সাথে সাথে চার্টে শনির পজিশন বদলায়। এক একটা পজিশনে শনি তার কুদৃষ্টি ফেলে, সেটাই ডেঞ্জারাস সময়। কঠিন কঠিন অসুখ–শ্বাসরোগ, যক্ষ্মা, হাড়ের রোগ… এগুলো তো আছেই, এমন কি মৃত্যুও এই শনির হাতে।”
“মাই গড!”
“কিছু বুঝলে?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।
“নট রিয়েলি।”
“বোঝার কিছু নেই, পুরো জিনিসটাই ধাপ্পাবাজি।”
ফ্রান্সিস্কা প্রমথর কথা কানে তুলল না। বলল, “সত্যি ডিটেকটিভ! ব্লু স্যাফায়ার সঙ্গে থাকলে শনি কিছু করতে পারবে না? তাহলে তোমার সঙ্গে আমিও একটা ব্লু স্যাফায়ার কিনব।”
নিশ্চয় মজা করেই বলল। কিন্তু একেনবাবু খুব সিরিয়াস হয়ে গেলেন। “না, না ম্যাডাম, নীলা সবার স্যুট করে না, আপনি অন্য কিছু পরবেন।”
বোঝা যায় রাজুর বর হেমন্ত চুগানি বেশ পয়সা-অলা ডায়মন্ড মার্চেন্ট। কুড়ি তলার ওপর একটা পেন্ট হাউসে ওঁর দোকান। ছোটো ছোটো অনেকগুলো ঘর, সেখানে প্রাইভেটলি কাস্টমারদের ডায়মন্ড দেখানো হয়। কিছু ডায়মন্ড ডিসপ্লেতে দেখলাম। ডায়মন্ডের দাম সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। তবে ম্যানহাটানে এত বড় জায়গা জুড়ে যার দোকান, তার ভাড়া মেটাতে গেলে বেশ ভালো রকমের রোজগার দরকার, ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে বৌয়ের চাকরির ওপর ভরসা করা চলে না। লাকিলি আমরা যখন গেছি, দোকানে কেউই ছিল না। ফ্রান্সিস্কাকে দেখে হেমন্ত ওঁর নিজের ঘরে আমাদের নিয়ে বসালেন। কথায় কথায় জানলাম যে, ওঁর স্ত্রী রাজু কিছুদিন এখানে সেলস-এ ছিলেন, কিন্তু কাজটা তেমন ভালো না লাগায়, হেমন্তই রাজুকে লাইব্রেরিয়ানশিপ পড়ান। একটু গর্বভরেই হেমন্ত জানালেন রাজুর ভালো নাম রাজশ্রী, এক কালে নাকি বলিউডের দুয়েকটা ছবিতে হিরোইন হিসেবে নেমেছিলেন। আমি অবশ্য মনে করতে পারলাম না। একজন রাজশ্রীর নাম আমি বাবা-মার কাছে শুনেছি। ষাটের দশকে খ্যাতির তুঙ্গে একজন আমেরিকানকে বিয়ে করে লস এঞ্জেলেস না কোথায় চলে এসেছিলেন। এই রাজশ্রীর বয়স বড় জোর তিরিশ হবে। তবে কিনা বলিউড থেকে অজস্র ছবি রিলিজ করে, অল্প কটিই হিট হয়। আমাদের এইসব কথাবার্তার মধ্যেই রাজু এসে হাজির। ফ্রান্সিস্কাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন, আমাদেরও হায়’ বললেন। বলিউডের কি ম্যাজিক! আমি এতদিন রাজুকে দেখে তেমন সুন্দরী ভাবিনি। এখন মনে হল, না, একটা আকর্ষণীয়তা ওঁর মধ্যে আছে।
আমাদের দোকানে আসার কারণ দেখলাম হেমন্ত আগে থেকেই জানেন। ফ্রান্সিস্কা নিশ্চয় রাজুকে বলেছে, রাজু হেমন্তকে। হেমন্ত বললেন, “ব্ল স্যাফায়ার আমার কাছে আছে, কিন্তু আমি ওগুলো চেনাজানা লোককে দিতে একটু দ্বিধা বোধ করি।”
এই প্রথম একেনবাবু মুখ খুললেন, “কেন স্যার?”
“এটা সবার ঠিক স্যুট করে না। কিনে নেবার পর নানান সমস্যা হয়।”
“এটা কি কোনও সায়েন্টিফিক স্টাডি থেকে বলছেন, না আপনার ধারণা?” প্রশ্নটা প্রমথর।
“সায়েন্টিফিক স্টাডি আমরা কী করব বলুন, বাপ-ঠাকুরদার কাছে যা শুনেছি সেই থেকে বলছি।”
“আপনার নিজের কোনও অভিজ্ঞতা আছে?”
“তেমন নেই, তবে কিছুদিন আগে আমার পরিচিত এক সাহেব আমার দোকান থেকে একটা ব্র-স্যাফায়ারের আঙটি কিনে নিয়ে গেলেন। আমি তাকেও বিক্রি করার আগে একই কথা বলেছিলাম। উনি হেসে উড়িয়ে দিলেন কথাটা। সেদিন শুনলাম ইন্ডিয়াতে গিয়ে খুন হয়েছেন।”
“সেটা কি ব্লু-স্যাফায়ারের জন্যে না ভাগ্যের দোষে?”
“হু নোজ। কিন্তু আপনারা রাজুর বন্ধু, তাই সতর্ক করছি। আপনারা কিনলে তো আমারই লাভ।”
“ভদ্রলোকের নামটা কী স্যার– যিনি মারা গেলেন?”
“জন হেক্টার। এক সময়ে ইন্ডিয়াতে প্রায়েই যেতেন। তখনই আমার বাবার সঙ্গে ওঁর পরিচয় হয়। বেশ নামকরা লোক, পত্রিকাতেও খবরটা বেরিয়েছিল।”
“ইনিই কি বিখ্যাত আর্ট ক্রিটিক?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“ঠিক। ওই আর্ট নিয়েই বাবার সঙ্গে ওঁর আলাপ। বাবারও আর্ট, স্কাল্পচার, ইত্যাদিতে নেশা ছিল। আমি তখন খুব ছোটো ত্রিচি-তে থাকতাম। উনি এসেছিলেন তামিলনাড়ুর মন্দিরগুলোর উপরে একটা বই লিখবেন বলে। এনিওয়ে এসব আমার মনেও ছিল না। হঠাৎ করে একটা পার্টিতে ওঁর সঙ্গে দেখা হয়। আমার পদবী শুনে আমার বাবার নাম জানতে চান, তখনই পুরোনো সূত্রটা বেরিয়ে পড়ে। তারপর আমাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছেন। এই দোকানেও।”
কথাগুলো বলতে বলতে হেমন্ত ড্রয়ার থেকে কয়েকটা জুয়েলারি বাক্স বার করলেন। তার একটা খুলে বড়সড় নীলার একটা আংটি দেখালেন।
“কী রকম দাম এটার?”
“তিন হাজার।”
“তিন হাজার… মানে ডলার!” একেনবাবু প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন।
আমি বললাম, “এর থেকে সস্তা কিছু নেই?”
“এটা আছে– দু’হাজারের মধ্যে।” আরেকটা বাক্স খুলে দেখালেন হেমন্ত।
“দু-তিনশোর মধ্যে কিছু নেই?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
“আসল নীলা ওই দামে পাবেন না। খুব ছোটো সাইজের নীলা একসঙ্গে সেট করা অবস্থায় যদি পান। আমি সে সব জিনিস রাখি না। আর্টিফিশিয়াল নীলায় যদি চলে, তাহলে একশো ডলারের কমেও পাবেন। অন-লাইনেই কিনতে পাবেন।”
“আর্টিফিশিয়াল নীলা কি স্যার ইকুয়ালি এফেক্টিভ?”
“আপনাকে কি কেউ এটা পরতে বলেছেন?” হেমন্ত জিজ্ঞেস করলেন।
“হ্যাঁ স্যার।”
“তা হলে মনে হয় জেনুইন জিনিসই ব্যবহার করা উচিত।”
বেচারা একেনবাবু, মুখটা দেখলাম কাঁচুমাচু। শনির দশা কাটাবেন, না দু’হাজার ডলার গচ্চা দেবেন! প্রমথ একেনবাবুকে অনবরত বাক্যবাণে বিদ্ধ করলেও, সত্যিকারের বিপদের সময় ঠিকই এগিয়ে আসে। বলল, “আপনি শুধুই দুশ্চিন্তা করছেন। ন্যাচারাল নীলা আর আর্টিফিশিয়াল নীলার কেমিস্ট্রির কোনও তফাৎ নেই –দুটোই আসলে কার্বন। দুটোই তৈরি হয়েছে প্রবল চাপের ফলে। খনিতে পাওয়া যায় ন্যাচারাল নীলা, আর্টিফিশিয়াল নীলা বানানো হয় ফ্যাক্টরিতে, কার্বনকে কৃত্রিম ভাবে চাপ দিয়ে। দুটোর এফেক্টই এক হওয়া উচিত।”
কথাটা একেনবাবুর মনে ধরল। “এটা ভালো বলেছেন স্যার একেবারে ফান্ডামেন্টাল প্রিন্সিপল থেকে। তাহলে তাই করি।” তারপর হেমন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম স্যার।”
“এতটুকু নয়। আপনারা রাজুর বন্ধু এটুকু সময় আপনাদের দিতে পারব না!”
ফেরার পথে আমিই প্রশ্নটা তুললাম। “আচ্ছা, জন হেক্টার হঠাৎ নীলা কিনতে গেলেন কেন?”
“প্রশ্নটা আমাদের না করে হেমন্তকে করলেই পারতিস, প্রমথ বলল।
“হেমন্ত উত্তরটা জানে সেটা কেন ভাবছিস?”
“কারণ জানার তবু একটা সম্ভাবনা আছে, যা আমাদের একেবারেই নেই।”
