ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(২৩)
শনিবার জুন ৪, ২০১১
সকালে বিপাশা মিত্রের ফোন এল। একেনবাবু ছিলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, ওঁর কাজটা কী রকম এগোচ্ছে?
“উত্তরটা একেনবাবু ভালো দিতে পারবেন,” আমি বললাম, “তবে কাজ চলছে আমি জানি।”
“ঠিক আছে, আমায় ফোন করতে বলবেন।” বলে ফোন ছেড়ে দিলেন।
একেনবাবু আধঘণ্টার মধ্যেই ফিরলেন। প্রমথ বলল, “কী মশাই, গায়ে হাওয়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন, আর বিপাশার হ্যাপা সামলাতে হচ্ছে বেচারা বাপিকে!”
“ম্যাডাম ফোন করেছিলেন বুঝি?”
“হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করলেন ফটো চুরির ব্যাপারটার ফয়সালা হয়েছে কিনা।”
একেনবাবু সোফায় বসে প্রমথকে বলল, “একটু কফি পেলে স্যার আলোচনা করা যেত।”
“বেশ তো বানিয়ে নিন না। জল আছে, কফি আছে, দুধ-চিনি সবই আছে।”
“তা বানানো যায় অবশ্যি।”
“আপনি বসুন, আমি বানাচ্ছি।” বলে আমি উঠতে যাচ্ছি, “থাক,” বলে প্রমথ আমায় থামিয়ে দিল। “তুই বানালে ওটা গেলা যাবে না।”
.
কফি খেতে খেতে একেনবাবু বললেন, “ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য দিলেন স্যার। ইন্দ্রবাবুদের পোকার টিমের এড গুয়ান্সিয়াল এক কালে আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাম্বলিং জয়েন্ট চালাতেন। ইল্লিগ্যাল গ্যাম্বলিং-এর কারবার চালাবার জন্যে কিছুদিন জেল খেটেছিলেন। তার মানে মিস সীমার অবসার্ভেশন খুব একটা ভুল নয়।”
“এরকম একটা লোককে দেবরাজ সিং চাকরি দিলেন! আই অ্যাম রিয়েলি সারপ্রাইজড,” প্রমথ বিস্ময় প্রকাশ করল।
“জেল-খাটা লোকদেরও তো কাজ করে খেতে হবে স্যার। উনি নাকি এখন খুব ভালো কুক। জেলে থাকতে থাকতেই ফ্রেঞ্চ রান্না শিখেছিলেন। এ দেশের জেলে তো এসব অনেক ট্রেনিং পোগ্রাম আছে।”
“গ্যাম্বলিং-এর হ্যাবিট তো লোকটা ছাড়েনি। সম্ভবত অশোককেও নেশাটা ধরিয়েছিল।”
“কিন্তু স্যার, অশোকবাবু তো এই পোকার খেলার দলে ছিলেন না?”
“এক দিন তো খেলেছিল আর জিতেও ছিল। তাছাড়া আপনি কেন ভাবছেন গুয়ান্সিয়ালের ওই একটাই ঠেক ছিল? জুয়ারিরা কি সপ্তাহে এক দিন খেলেই সন্তুষ্ট থাকে? আমি শিওর অন্য জায়গাতেও আসর বসাত। সেখানে অশোক থাকতে পারে না?”
এটা মন্দ বলেননি, স্যার। সেইজন্যেই ইন্দ্রবাবুর পোকার টিমের তিনজন –মিস্টার এড, শেখরবাবু আর মিস্টার জিমের সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।”
“কবে বলবেন?”
“আজ বিকেলে। আমি ইন্দ্রবাবুকে ফোন করে জেনেছি সবাইকে আজ বিকেলে হোটেলে পাব।”
“তা তো বুঝলাম, তারা কথা বলবে?”
“তা বলবেন, স্যার। দেবরাজবাবু সবাইকে কো-অপারেট করতে বলেছেন।”
“গুড,” আমি বললাম।” এবার বলুন, চুরির ব্যাপারে বিপাশাকে কী বলবেন?”
“সন্দেহের একটা তীর তো অশোকবাবুর দিকে থেকেই যাচ্ছে।”
“আপনার কথার সুরে কনভিকশনের একটু অভাব দেখছি।” প্রমথ টিপ্পনী কাটলো।
“কে জানে স্যার!”
“আমার তো এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহই নেই,” প্রমথ বলল, “দেখুন, অশোক ওর কাজের জন্য কিংবা সম্ভবত এই এড গুয়ান্সিয়াল বা দলের কারোর জুয়োর দেনা মেটাবার টাকা জোগাড় করে উঠতে পারছিল না। এই সময়ে ও বিপাশার একটা ফাংশন অর্গানাইজ করতে বিপাশার বাড়ি যায়। সেখানে গিয়ে নিশ্চয় একটা খাম ওর নজরে পড়ে, যার স্ট্যাম্পটা দামি ও জানত। খামটা পকেটে পুরে স্ট্যাম্পটা বিক্রি করতে প্রথমে গিয়েছিল ফিলাটেলিস্ট কর্নারে। সেখানে অবশ্য খদ্দের মেলে না। তবে আমার ধারণা পরে অন্য কাউকে ভালো দামেই বিক্রি করেছিল।”
“সেটা কী করে বুঝলি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সীমার কথা থেকে। অশোক সীমাকে ফোন করে জ্যাকপট হিট করার কথা বলেনি? তার মানে কি? হঠাৎ লাকি হয়ে যাওয়া না? আনফরচুনেটলি সেই টাকা পাওয়াটাই ওর কাল হল। কেউ জানত যে অনেক ক্যাশ নিয়ে ও বাড়ি যাচ্ছে। কে জানে, হয়তো এই এড গুয়ান্সিয়ালই জানত। সেই হয়তো ওকে বাড়িতে রাইড দেবার নাম করে মার্ডারড হিম ফর দ্য মানি। পরে নির্জন জায়গায় বডিটা ডাম্প করে ইন্দ্রর বাড়িতে পোকার খেলতে যায়।”
জাম্পিং টু কনকুশনে প্রমথর জুরি নেই। আমি বললাম, “কিন্তু টাইমিংটা তো মিলছে না। টাইম অফ ডেথ হল আটটা থেকে দশটা। তার আগেই তো ইন্দ্রবাবুর বাড়িতে এড চলে এসেছে।”
“আরে রাখ তোর টাইমিং। ফরেন্সিক সায়েন্স অতোটা প্রোগ্রেস করেনি যে, এক আধ ঘণ্টার এদিক ওদিক হবে না।”
“তাহলে আমি বলব, শুধু টাকার জন্যে কেন, এড যদি জানত অশোক পাঁচ হাজার ডলারের স্ট্যাম্প নিয়ে ঘুরছে, তাহলে স্ট্যাম্পের জন্যেও তো খুন করতে পারত।”
“আলবত পারত, ওটা হল আরেকটা সিনারিও।”
“তোর কথা ঠিক হলেও, বিপাশার সমস্যা মিটছে কিন্তু এতে না। ওর ফটো বা চিঠি কার কাছে তার কোনও হদিশ এতে নেই।”
“গুলি মার বিপাশার সমস্যা। এখন চিন্তা কর অশোকের মৃত্যু নিয়ে। দ্বিতীয় সিনারিওটা ঠিক হলে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের সাহায্য নিয়ে একেনবাবুকে বার করতে হবে, নিউ ইয়র্কে কে ওই স্ট্যাম্পটা রিসেন্টলি কিনেছে, যে কাজটা একেনবাবু ইতিমধ্যেই শুরু করেছেন। ঠিক কিনা?” প্রমথ একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করল।
একেনবাবুর কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, হঠাৎ যে মৌনীবাবা হয়ে গেলেন?”
প্রশ্নটা একেনবাবু এবার বোধহয় শুনলেন। “আমি একটু কনফিউসড স্যার।”
“কী নিয়ে?”
“হঠাৎ সুজয় মিত্র দেশে গেলেন কেন?”
“সেটা তো প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার কথা, তার সঙ্গে এই ছবির কী সম্পর্ক?”
“তা নেই স্যার। হঠাৎ মনে পড়ল, তাই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। তারপর মাথাটা চুলকোতে চুলকোতে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের মনে প্রশ্নটা জাগেনি স্যার?”
“না জাগেনি, আর জাগলেও উত্তর যিনি দিতে পারতেন তিনি তো আর নেই। তবে চিন্তায় ছটফট না করে বিপাশাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন না?” প্রমথর সুরে শ্লেষটা স্পষ্ট।
“কী যে বলেন স্যার, তিনি তো তখন বেবি ছিলেন।”
“আপনিও তো তখন বালক ছিলেন। খামোকা ওটা ভেবে আর শরীর খারাপ করবেন না।”
“ঠিকই বলেছেন স্যার। এটা আমার একটা বদভ্যাস, মাথায় কিছু ঢুকলে যেতে চায় না। দেখুন না স্যার, এই নীলা নিয়ে কী ভুগেছি!”
“সেটা আমরা সবাই হাড়ে হাড়ে জানি।” প্রমথ বলল।
“তবে একটা প্রশ্ন থেকে যায় অশোকবাবুর ব্যাপারে।”
“কী ব্যাপারে?”
“এই যে আপনি বললেন স্যার, অশোকবাবু স্ট্যাম্পটা বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন?”
“সে ব্যাপারে আপনার সন্দেহ আছে নাকি?”
“তা স্যার, একটু আছে।”
“কেন বলুন তো?” এবার আমি প্রশ্ন করলাম। “আপনি আমি দু’জনেই গিয়েছিলাম স্ট্যাম্পের দোকানটাতে। দোকানিই তো বলল অশোক দুবে যে স্ট্যাম্পটা বিক্রি করতে এসেছিল, তার খরিদ্দার পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, তার আগেও একজন আমাকে কফি কর্নারে অশোক ভেবে স্ট্যাম্পের খরিদ্দার পাওয়া গেছে বলেছিল।”
“তা ঠিক স্যার, কিন্তু অশোক দুবে স্ট্যাম্প বিক্রি করতে এসে ভুল ফোন নম্বর দিলেন কেন?”
“উনি হয়তো ঠিক নম্বর দিয়েছিলেন, দোকানদারই ভুল টুকেছিল। এটা কি অবভিয়াস নয়?”
একেনবাবু আর উচ্চবাচ্য করলেন না। মাথার পেছনটা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “ভাবছি স্যার, একবার ম্যাডাম প্যামেলা জোনসের সঙ্গে দেখা করলে মন্দ হয় না।”
এই নামটা আগে শুনিনি। জিজ্ঞেস করলাম, “প্যামেলা জোনস কে?”
“মিস্টার জন হেক্টারের সেক্রেটারি।”
“তার সঙ্গে স্ট্যাম্পের সম্পর্ক কি?”
“না স্যার, আমি একটু অন্য জিনিস ভাবছিলাম।”
“কী অন্য জিনিস?”
“মিস্টার ক্যাসেল কেন সেদিন বললেন, অ্যাডভান্স না নিয়ে কিছু করবেন না।”
“এর সঙ্গে আবার বব ক্যাসেলকে জড়াচ্ছেন কেন?”
“দিস ইজ ভেরি কনফিউইসিং স্যার, ভেরি কনফিউসিং।”
“ফ্র্যান্সিস্কা ঠিকই বলে, ইউ আর অলওয়েস কনফিউসড,” বলে প্রমথ আরেক প্রস্থ কফি বানাতে গেল।
