ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(২০)

 

সোমবার, মে ৩০, ২০১১

 

কিশোরের তামিলনাড়ুর ডিজি কাকা গতকাল নিউ ইয়র্কে এসেছেন। আজ বিকেলে কিশোরের কাছে আসবেন। কিশোর আমাকে ডিনারে ডেকেছে। আমাকে বুঝিয়েছে ওর কাকা ফিজিক্সের ছাত্র ছিলেন, আমার মতো একজন ফিজিক্সের অধ্যাপকের সঙ্গ ওঁর ভালো লাগবে। হোয়াট এ লেইম এক্সকিউজ! আসল কারণ বেভ যাচ্ছে, বেভের পরিবহন সমস্যা মিটবে। কিশোর থাকে নিউ জার্সির ক্লার্ক বলে একটা শহরে। গাড়ি না থাকলে বার দুই বাস চেঞ্জ করে যেতে হয়। নিঃসন্দেহে একটা হ্যাঁ। উইক-ডে বা কাজের দিনে এক ঘণ্টা ঠেঙিয়ে কোথাও ডিনার খেয়ে গভীর রাতে বাড়ি ফেরা আমার ধাতে পোষায় না। কিন্তু বন্ধুত্বের খাতিরে রাজি হতে হয়েছে। বিশেষ করে আমার যাওয়ার উপর যখন ওর ভাবি বধূর যাওয়া নির্ভর করছে।

 

.

 

আমার গাড়িটা ইউনিভার্সিটির কাছেই একটা গ্যারাজে থাকে। তাই ঠিক করলাম ইউনিভার্সিটি থেকে আর বাড়ি ফিরব না, সেখান থেকেই সোজা কিশোরের কাছে চলে যাব।

 

বেভ দেখলাম খুব এক্সাইটেড। এরমধ্যেই যাবার লজিস্টিক্স নিয়ে বার কয়েক আলোচনা করে গেছে, অথচ এটা কোনও ব্যাপারই নয়। বেভ ইউনিভার্সিটির কাছেই থাকে। এখান থেকে যদি নাও যায়, স্বচ্ছন্দে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যেতে পারি। দেখলাম ও মনঃস্থির করতে পারছে না। প্রথম বার বলল, বাড়ি থেকে যাবে। তারপর ঠিক করল বাড়ি না, অফিস থেকেই যাবে। তৃতীয় বার যখন আমার ঘরে ঢুকে বলল, “আমাকে তুমি বাড়ি থেকেই তুলে নিও, আমি আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব।” আমি ঠাট্টা করার লোভ সামলাতে পারলাম না। বললাম, “তুমি খেয়াল করেছ, এই চার মাসে তোমার সঙ্গে যা কথা হয়েছে তার থেকে বহুগুণ বেশি কথা হয়েছে, এই ক’দিনে।”

 

“ইয়েস, আই নোটিস্ট।”

 

“এত বেশি কথা হলে কিশোর রেগে যাবে।”

 

“ও, দ্যাট উইল বি ফান, লেট আস ডু সামথিং টু মেক হিম জেলাস, প্লিজ প্লিজ!” পাগলাকে বলেছি সাঁকো না নাড়তে! কী বিপদ!

 

.

 

বেভ যেখানে থাকে আমার গ্যারাজ থেকে সেখানে পৌঁছতে মিনিট পাঁচেকও লাগে না। বেভ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। দেখলাম বেশ সুন্দর লম্বা হাল্কা সবুজ রঙের ইভনিং ড্রেস পরেছে। কানে সবুজ পাথরের দুল, আর ম্যাচিং হার। হাতে কালো সেকুইনের ব্যাগ, কিশোরের দেওয়া উপহার।”

 

গাড়িতে উঠে বেভ আমায় জিজ্ঞেস করল, “ডু আই লুক রেস্পেক্টেবল?”

 

“খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে।”

 

“কিশোর বলেছে ওর আঙ্কল একটু কনসার্ভেটিভ।”

 

“আমি সিওর তুমি ওকে কুপোকাত করবে।”

 

“ইউ থিঙ্ক সো?”

 

“ইয়েস, শুধু তোমায় পার্সোনাল প্রশ্ন করতে চাইলে, আমায় প্রথম দিন যা বলেছিলে, সেটা যেন না বল।”

 

“হোয়াট ডিড আই সে টু ইউ?”

 

“ফরগেট ইট।”

 

“না সিরিয়াসলি, কী বলেছিলাম তোমাকে?”

 

“তোমার সেক্সলাইফ সম্পর্কে কোনও প্রশ্নের উত্তর আমায় দেবে না।”

 

“আই সি। তুমি বলছ, সেটা না বলে খোলাখুলি উত্তর দেওয়া উচিত।” বলেই এক ঝলক হেসে ঠিক সেদিনের মতো আমার হাতে আলতো করে একটা চাপ দিয়ে বলল, “জাস্ট কিডিং।”

 

.

 

কিশোরের আঙ্কল প্রভাকর রাওর হাবেভাবে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, উনি একজন বড় অফিসার। কিশোর দেখলাম ওঁকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। আমরা ঢাকার একটু আগেই বিয়ার অফার করে কিশোর ধমক খেয়েছ তারই জের চলছে। আমেরিকায় মুখে দেবার মতো নাকি কোনও বিয়ার তৈরি হয় না। সত্যিকারের বিয়ার শুধু জার্মানি আর অস্ট্রিয়াতেই মেলে। ইনফ্যাক্ট আমেরিকায় পাতে দেবার মতো কোনও স্পিরিটও তৈরি হয় না। তার জন্যে ইউরোপ যেতে হবে। বেচারা কিশোর! বিয়ার রেখে এসে ব্ল্যাক লেবেলের একটা বোতল নিয়ে আসতেই সেটার দিকে একটু হেলা ভরে তাকিয়ে বললেন, “ব্লেন্ডেড চলবে না, সিঙ্গল মল্ট কিছু আছে?”

 

.

 

প্রভাকর রাও গল্প করতে ভালোবাসেন, গল্পের মূল বক্তব্য সব সময়েই আমি আর আমি। পুলিশ মেডেল পাওয়া থেকে শুরু করে, রাজীব গান্ধীর সঙ্গে হ্যান্ডশেক, সন্ত্রাসবাদী এক নেতাকে (নামটা আর করলাম না) তার লুকোনো ডেরাতে গিয়ে অ্যারেস্ট করা, বলিউডের এক অভিনেত্রীকে কেচ্ছার হাত থেকে বাঁচানো, কুখ্যাত এক ডাকাতকে খালি হাতে ধরা– দীর্ঘ পুলিশ জীবনের নানান কীর্তিকাহিনি আমাদের শোনালেন। শুধু ফিজিক্স নিয়েই কোনও আলোচনা করলেন না। একেবারে প্রথমে বেভের পরিবারের একটু খবরাখবর করেছিলেন। বাবা প্লাম্বার শুনে মনে হল বেশ আশাহত। আমাদের দেশে কলের মিস্তিরিদের সামাজিক বা আর্থিক অবস্থা কোনওটাই উচ্চ নয়। এদেশে একজন প্লাম্বার আমার থেকে বেশি রোজগার করে সেটা আমি জানি। উনি জানেন কিনা জানি না। জানলেও মনোভাবের পরিবর্তন হত না হয়তো। এর পর থেকে বেভকে পুরো উপেক্ষা করে সারাক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে গল্প করে গেলেন। আমার একটু খারাপই লাগছিল। মাঝে মাঝে বেভকে ওঁর গল্পের সোশাল আর কালচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড দেবার চেষ্টা করছিলাম। খানিকক্ষণ পরে বেভ নিজেই ‘এক্সকিউজ মি’ বলে উঠে চলে গেল রান্নাঘরে কিশোরকে সাহায্য করতে।

 

.

 

আঙ্কলকে ইমপ্রেস করার জন্যেই বোধহয় কিশোর বহু পদ করেছে। সবগুলোই যে দারুণ হয়েছে দেখে মনে হচ্ছে না, কিন্তু যেহেতু অনেক চয়েস আছে, বাছবিচার করে খেলে উপাদেয় খাবারেই পেট ভরানো হয়তো যাবে। ঘড়িতে দেখলাম রাত প্রায় সাড়ে দশটা। আমি সাধারণত সাতটার মধ্যেই ডিনার খেয়েনি। আমার ধারণা কিশোরও তাড়াতাড়ি খায়। কিন্তু মিস্টার প্রভাকর রাও রাত দশটা এগারোটার আগে খেতে বসেন না। কিশোর দুয়েকবার খাবার প্রসঙ্গ তোলায় উনি একটু বিরক্ত হয়েই বলেছেন, এত তাড়াতাড়ি কেন?’ শেষে আমিই কিশোরকে বলেছি, আমায় এবার উঠতে হবে। নইলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা হয়ে যাবে। বেভের মুখ দেখে মনে হল ও-ও পালাতে পারলে বাঁচে। বলল, “ইয়েস, উই শুড লিভ সুন।”

 

এরপর কিশোর আর অপেক্ষা করেনি, টেবিলে খাবার নিয়ে এসেছে। মিস্টার রাওর বোধহয় আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু আমরা খেতে বসে যাচ্ছি দেখে উনিও এসে বসলেন।

 

খাওয়ার মাঝখানে প্রভাকর কিশোরকে জিজ্ঞেস করলেন, সকাল ন’টায় ম্যানহাটানে ওঁর একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। কতক্ষণ লাগবে ওখানে যেতে।

 

কিশোর উত্তর দিল, “ওই সময়টাতে লিঙ্কন টানেলে একটু জ্যাম হয়, ঘণ্টা দেড়েকের বেশিই লাগবে। ম্যানহাটানের কোথায় যাবেন?”

 

“নিউ হেরিটেজ হোটেলে। হোটেল মালিকের সঙ্গেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট।”

 

আমার মুখ দিয়ে ফস করে বেরিয়ে গেল, “আপনি দেবরাজ সিং-এর সঙ্গে দেখা করছেন?”

 

“ইয়েস, তুমি ওকে চেন?”

 

“একবার মিট করেছি। আমার এক ডিটেকটিভ বন্ধুর কাছে এসেছিলেন, ওঁর একজন স্টাফকে কে মার্ডার করেছে, সেটা তদন্ত করার জন্যে।”

 

“তুমি অশোক দুবের কথা বলছ?”

 

এবার আমার অবাক হবার পালা, “আপনি অশোককে চেনেন?”

 

“ওর বাবাকে খুব ভালো করে চিনি। প্রকাশ দুবে যখন ত্রিচি জেলের জেলার ছিলেন তখন ওখানে আমার পোস্টিং হয়। অশোককে দেখেছি ওর বাচ্চা বয়স থেকে। হোয়াট এ ট্র্যাজেডি!”

 

“দেবরাজ সিং-কেও কি অশোকের সূত্রেই চেনেন?”

 

“নট এক্সাক্টলি। কিছুদিন আগে এক আমেরিকান দেবরাজ সিং-এর ত্রিচি হোটেলে খুন হয়। আমার লোক ওখানে গিয়ে দেখে হোটেল সিকিউরিটিতে অনেক ফাঁক-ফোকর ছিল। ব্যাড পাবলিসিটি এড়াতে দেবরাজ পরের দিনই চলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে। সিকিউরিটি জোরদার করার ব্যাপারে আমার অনেক অ্যাডভাইসও নেয়। তখনই আমায় বলে নিউ ইয়র্কে এলে আমি যেন ওর হোটেলে উঠি। আমি অবশ্য ওর হোটেলে উঠিনি, কিন্তু প্রকাশ দুবে একটা কাজ দিয়েছিলেন, সেইজন্যে কাল ওকে ফোন করেছিলাম। তখনই আমাকে ধরল ওর হোটেলে একবার আসতেই হবে। আমাকে নিউ ইয়র্ক ঘুরিয়ে বিকেলে প্লেনে তুলে দেবে।”

 

এ ব্যাপারে আমার কোনও ঔৎসুক্য প্রকাশ করা উচিত নয়, কিন্তু অশোক দুবের প্রসঙ্গ এসে পাড়ায় জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু মনে করবেন না, কাজটা কি অশোক সংক্রান্ত?”

 

“রাইট। অশোক লাখ দুই টাকা জোগাড় করছিল একটা স্কুলের জন্যে। এইটুকুই মিস্টার দুবে জানতেন। কিন্তু কোন স্কুলের জন্যে এই টাকাটা তুলছিল, সেটা জানতেন না। উনি নিজে এখন ওই টাকাটা দান করে ছেলের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে চান। কিন্তু কাকে দেবেন সেটাই জানেন না। মনে হল, দেবরাজ যদি এ ব্যাপারে কোনও সাহায্য করতে পারে। বাই দ্য ওয়ে, তোমরা এ ব্যাপারে কিছু জানো?”

 

“না, কিছুই জানি না। এটুকু জানি যে, উনি হাজার দশেক ডলার তোলার চেষ্টা করছিলেন। একটু খোঁজ খবর করে দেখতে পারি।”

 

“দেখ তো। মিস্টার দুবে একজন চমৎকার লোক। বহুদিন অবশ্য ওঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না। জন হেক্টারের ব্যাপার নিয়ে হঠাৎ বহুদিন বাদে দেখা হয়।”

 

“জন হেক্টার!”

 

“হ্যাঁ, যে আমেরিকানটি খুন হয়।”

 

“উনিও কি মিস্টার দুবের বন্ধু ছিলেন?”

 

“তুমিও তো দেখি রিপোর্টারদের মতো প্রশ্ন শুরু করছ?” প্রভাকর রাও বললেন।

 

“আই অ্যাম সরি। ব্যাপারটা হল আমার বন্ধু একেনবাবু অশোকের মার্ডার নিয়ে তদন্ত করছেন। তাই অশোক সম্পর্কে কোনও খবর পেলে আমারও ইন্টারেস্ট লেগে যায়।”

 

প্রভাকর রাও বললেন, “এটা কিন্তু অশোকের ব্যাপার নয়, অশোকের বাবার। তদন্তে বের হয় যে, হেক্টার প্রকাশ দুবেদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল কল্পনা নামে একটি মেয়ের খোঁজখবর নিতে। ইন সেভেন্টিস শি গট কনভিক্টেড ইন এ মার্ডার কেস। কল্পনাকে নিয়ে একটা বই বা আর্টিকল লিখতে হেক্টার মালমশলা সংগ্রহ করছিল। কল্পনা মারা গেছে বহুদিন হল। মিসেস দুবেও মেয়েটিকে চিনতেন। মিসেস দুবে অবশ্য এ নিয়ে হেক্টারের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি, প্রকাশও দেখা করেননি।”

 

“হেক্টারের খুনি কি ধরা পড়েছে?”

 

“এখনও পড়েনি, তবে তদন্ত চলছে। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়বেই– পালাবে কোথায়?”

 

.

 

খাওয়া দাওয়ার পর আর বসলাম । ফেরার পথে বেভ বলল, “আই ডোন্ট থিঙ্ক হি লাইকড মি।”

 

আমি প্রভাকর রাওকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করলাম না। বললাম, “যেটা মোস্ট ইম্পর্টেন্ট, সেটা হল কিশোর তোমাকে ভালোবাসে।”

 

“কেন আমাকে ওঁর পছন্দ হল না বলতে পার?”

 

“পছন্দ হল না ভাবছ কেন, এক একজন লোক এক এক ভাবে রিয়্যাক্ট করে।”

 

“উনি তো আমার দিকে তাকাচ্ছিলেনও না!”

 

“আমিও তো তোমার দিকে বহুদিন ভালো করে তাকাইনি।”

 

“কারণ আমাকে তুমি হেট করতে।”

 

“দ্যাট্‌স নট ট্রু।”

 

বেভ হঠাৎ চুপ করে গেল।

 

“আর ইউ ওকে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“ইয়েস, আই অ্যাম।”

 

.

 

এক একটা সময় আসে, যখন কথা না বলাই ভালো। এটা সেরকম একটা সময়। যখন ওর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, হঠাৎ ঘুরে আমার গলা জড়িয়ে ধরে গালে প্রায় ঠোঁটের কাছে চুমু খেল। একটা আবছা সুগন্ধের ঝলকা নাকে এল। এত দ্রুত ঘটল ব্যাপারটা যে আমি একটু হতচকিত।

 

“থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য রাইড।”

 

“ইউ আর ওয়েলকাম।”

 

আমি নেমে ওর দরজা খুলে দেবার আগেই নিজেই দরজা খুলে ঝটিতি নেমে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *