ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(২)

ইন্টারনেট একটা অ্যামেজিং জিনিস। এরমধ্যেই প্রমথ গুগল সার্চ করে বিপাশা মিত্রের কুষ্ঠি-ঠিকুজি আবিষ্কার করে ফেলেছে। ঠাকুরদা ছিলেন কলকাতার এক মিত্তির। এক জার্মান মহিলাকে বিয়ে করে মার্কিন মুলুকে আসেন। ছেলে সুজয় মিত্রের জন্ম এদেশে। সুজয় বিয়ে করেন এক আইরিশ মহিলাকে। ওঁদেরই একমাত্র কন্যা বিপাশা মিত্র। বিপাশা নামটা ঠাকুরদার দেওয়া। বাঙালিত্ব বলতে ওইটুকুই, বাংলার ব-ও জানেন না। ঠাকুরদা ট্রান্সপোর্ট বিজনেসে প্রচুর টাকা কামিয়েছিলেন। ছেলে সুজয় মিত্র সেই টাকা নিয়েই রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায়ে নামেন। বছর দশেকের মধ্যেই হি বিকেইম এ রিয়েল এস্টেট কিং। তবে টাকা বানালেও বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি। বছর তিনেক আগে স্ত্রীকে (ওঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, বিপাশা মিত্রের আইরিশ মা-র মৃত্যু ঘটেছিল বহু বছর আগে) নিয়ে থিয়েটার দেখে ফেরার পথে গাড়ির অ্যাকসিডেন্টে দুজনেই মারা যান। দ্বিতীয় স্ত্রীর কোনও সন্তান ছিল না। তাই বিপাশা মিত্র একাই এখন ব্যবসাটা চালাচ্ছেন। এছাড়া ওঁর বাবার একটা বড় ফাউন্ডেশন আছে, বিভিন্ন সকাজে টাকা দেয়। সেটার দেখাশোনাও করেন বিপাশা মিত্র নিজে। সেই সূত্রেই এশিয়া ইনস্টিটুটের উনি একজন বড় পেট্রন। তথ্য বলতে এইটুকুই। বাদবাকি হল সস্তা ম্যাগাজিনের এক্সক্লসিভ খবর। মুখরোচক, কিন্তু সত্যি হবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কার সঙ্গে বিপাশা মিত্রকে কোথায় দেখা গেছে, কার সন্তানকে বিপাশা মিত্র অ্যাবরশন করেছেন, কে বিপাশা মিত্রের জন্যে বউকে ডিভোর্স করেছে, ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে একটা খবরেই কিঞ্চিৎ সত্যতা থাকতে পারে, সেটা হল হলিউডের এক বিখ্যাত প্রডিউসারের সঙ্গে বিপাশার অন্তরঙ্গতা। নিউ ইয়র্ক টাইমসে একসঙ্গে ওঁদের দুজনের ছবি বেশ কয়েকবার দেখেছি।

 

নিউ ইয়র্কে প্রায় সাত বছর থাকলেও সত্যিকারের বড়লোকদের বাড়িতে যাবার সুযোগ আমার কখনো হয়নি। বিপাশা থাকেন সেন্ট্রাল পার্কের উল্টোদিকে ফি অ্যাভিনিউয়ে। বিল্ডিংটা পঁচিশ-তলা, মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম থেকে বড়জোর মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। ভারী কাঁচ দিয়ে তৈরি বিশাল সদর দরজা। সেটা ঠেলে ঢুকলেই মাঝারি সাইজের লবি। এক পাশে সিকিউরিটি স্টেশন, কয়েকজন গার্ড সেখানে বসা। অন্য দিকের দেয়ালে আটকানো একটা বিশাল বোর্ড। সেখানে বিভিন্ন তলায় কী কী অফিস আছে, সুইট নম্বর দিয়ে তাদের লিস্ট। সামনে এগোলেই একটা হলওয়ে যার দু-দিকে পাশাপাশি বেশ কয়েকটা লিফট। একদম শেষে ছেলেদের আর মেয়েদের জন্য আলাদা দুটো ওয়াশরুম।

 

বিপাশা মিত্রের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি শুনে সিকিউরিটির একজন বাঁকা বাঁকা প্রশ্ন করছিল। তখন প্রমথই একটু গরম হয়ে বলল, “উনিই আমাদের ডেকেছেন, তোমাদের এত সমস্যা হলে আমরা চললাম।”

 

তখন সুপারভাইজার গোছের লোকটি ফোন করল বিপাশা মিত্রের অফিসে। সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি মিলল।

 

সুপারভাইজারটিই আমাদের একটা স্পেশাল লিফটের সামনে নিয়ে গিয়ে লিফট অ্যাটেন্ডেন্টকে বলল চব্বিশ তলায় পৌঁছে দিতে। লিফটটা কুড়ি তলার আগে কোথাও থামে না, সেখান থেকে ওঠে পঁচিশ তলা পর্যন্ত। অ্যাটেন্ডেন্টকে প্রশ্ন করে জানলাম, একুশ থেকে তেইশ তলা পর্যন্ত শুধু রেসেডিনশিয়াল অ্যাপার্টমেন্ট। ওগুলো যে সুপার-রিচদের জন্যে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। চব্বিশ আর পঁচিশ তলা বিপাশা মিত্র রেখেছেন নিজের ব্যবহারের জন্য। ওঁর অফিস হচ্ছে চব্বিশ তলায়।

 

লিফটের দরজা খুলতেই যিনি অভ্যর্থনা করলেন, নিজের পরিচয় দিলেন বব ক্যাসেল বলে। বব বিপাশা মিত্রের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্টেন্ট, অর্থাৎ পার্সোনাল সেক্রেটারি। দেখে মনে হয় বয়স বছর পঁয়ত্রিশেক। পাতলা চেহারা, কোঁকড়ানো সোনালি চুল, চোখে গোল্ড রিমের চশমা। ক্যাজুয়াল পোশাক– জিনস আর পোলো সার্ট। আমাদের নিয়ে নিজের অফিসে বসালেন। বিপাশা মিত্র কারোর সঙ্গে কথা বলছেন, একটু বাদেই তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে।

 

বব মনে হল ভালো ভাবেই জানেন, বিপাশা মিত্র কেন একেনবাবুকে ডেকেছেন।

 

“মূর্তিটা অদৃশ্য হওয়া নিয়ে ও খুবই চিন্তিত। ফ্যামিলি মিউজিয়ামের কালেকশনে অনেক জিনিস আছে যেগুলো টাকা দিয়েও কেনা যাবে না। এরকম চুরি আর যেন না ঘটে, তারজন্যে বিপাশা পুরো ব্যাপারটা ভালো করে অনুসন্ধান করাতে চায়।”

 

“বিষ্ণুমূর্তিটা কবে চুরি হল স্যার?”

 

“ওটা এশিয়া ইনস্টিটুট থেকে আসার পথেই খোয়া যায়। একটা কাঠের ক্রেটে বার র‍্যাপ দিয়ে প্যাক করা ছিল। ভ্যানে চাপিয়ে নিয়ে এসেছিল আমাদেরই সিকিউরিটির দু’জন লোক। কিন্তু এখানে আসার পর ক্রেটটা যখন খোলা হল, দেখা গেল শুধু বার র‍্যাপগুলোই আছে, মূর্তিটা নেই।”

 

“স্ট্রেঞ্জ! মূর্তিটা স্যার প্যাক করেছিল কারা?”

 

“এশিয়া ইনস্টিট্যুটের মিস্টার আকাহাশির লোকেরা। কিন্তু আমাদের সিকিউরিটির লোকেরাও সেখানে ছিল।”

 

“তারা দেখেছিল স্যার, মূর্তিটা বাক্সে ঢোকানো হয়েছে?”

 

“সেটাই তো তারা বলছে।”

 

“পথে গাড়ি কোথাও থামেনি?”

 

“না। এইটুকু তো পথ, সোজা চলে এসেছে।”

 

“এখানে যখন ক্রেটটা খোলা হয়, তখন সেখানে কে কে ছিলেন স্যার?”

 

“আমি ছিলাম, আর আমাদের মিউজিয়ামের কিউরেটর সতীশ কুমার, সেও ছিল।”

 

“তারপর স্যার?”

 

“সতীশ সঙ্গে সঙ্গে আকাহাশিকে ফোন করে। আকাহাশি তো শুনে অবাক! সে নিজে অবশ্য প্যাক করার সময়ে ছিল না। কিন্তু যারা করেছে, তারা বিশ্বস্ত লোক। তাছাড়া আমাদের সিকিউরিটির সামনে মূর্তিটা প্যাক করা হয়েছে। আকাহাশির কথায় যে কোনও ভুল নেই, সেটা আমরা জানি।”

 

বব আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ইতিমধ্যে ওঁর ফোনটা বাজল। বিপাশা মিত্রের ঘরে আমাদের ডাক পড়েছে। বব মৃদু হেসে বললেন, “ইউ আর লাকি, মাত্র পনেরো মিনিট বসতে হল।”

 

ঘড়িতে দেখলাম চারটে বেজে ঠিক পনেরো মিনিট।

 

বিপাশা মিত্রের ঘরে ঢুকে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে বব বিদায় নিলেন। বিশাল অফিস। বড়সড় একটা এক্সিকিউটিভ ডেস্কের পিছনে বিপাশা বসে আছেন। নিঃসন্দেহে স্টানিং বিউটি। টানটান করে কালো চুল পোনিটেল করে বাঁধা। বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। চোখে ফ্যাশানেবল গোল চশমা–তারই ভেতর থেকে চোখদুটো যেন কথা বলছে। গায়ের রঙ ফ্যাটফ্যাটে সাদা নয়, বাদামি ঘেঁষা– একটা ঔজ্জ্বল্য ফুটে বেরোচ্ছে। গায়ে হালকা সবুজ রঙের সিল্ক-টপ। কানে লাল রঙের দুটো বড় বড় রিং, গলায় ম্যাচিং হার। কীসের তৈরি কে জানে!

 

বিপাশা টেবিলের কয়েকটা কাগজপত্র পাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, “হঠাৎ একটা কাজ এসে পড়ায়, আপনাদের কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখতে হল। রিয়েলি সরি… থ্যাঙ্ক ইউ ফর কামিং।”

 

“কী যে বলেন ম্যাডাম, এত আমাদের প্লেজার।”

 

“আমাকে বিপাশা বলেই ডাকবেন।”

 

“ইয়েস, ম্যাডাম।”

 

“আপনারা দুজনে মিস্টার সেন-এর সঙ্গে কাজ করেন?” বিপাশা আমার আর প্রমথর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন।

 

“ওঁরা ছাড়া আমি অচল, ম্যাডাম।” উত্তরটা আমাদের হয়ে একেনবাবুই দিলেন।

 

“অত্যন্ত খাঁটি কথা,” প্রমথ এবার মুখ খুলল, “বাপি গাড়িতে রাইড দিলেই উনি একমাত্র সচল হন।”

 

প্রমথর জোকটা বোধহয় মাঠে মারা গেল।

 

“আই সি” বলে বিপাশা চেয়ার থেকে উঠে অফিসের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে এসে বসলেন। তারপর দু-আঙ্গুল দিয়ে কম্পিউটারের মাউসটা ঘোরাতে ঘোরাতে আমাদের তিনজনকে যেন একটু যাচাই করলেন।

 

“আমি যেটা বলতে যাচ্ছি, এই ঘরের বাইরে আর কারোর কানে যেন সেটা না যায়।” ব্যাপারটা যে বেশ গুরুতর বিপাশার গলার স্বরে সেটা স্পষ্ট।

 

“আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ম্যাডাম, আমরা তিনজনের কেউই এ নিয়ে কোথাও আলোচনা করব না।”

 

আমার আর প্রমথর দিকে সপ্রশ্নে তাকালেন বিপাশা।

 

আমি বললাম, “আপনার কথা গোপন থাকবে।”

 

প্রমথও আমার কথায় সায় দিল।

 

“থ্যাঙ্ক ইউ। আসলে ব্যাপারটা একটু ডেলিকেট।” কথাটা বলে বিপাশা একটু চুপ করলেন। বুঝলাম কথাটা ভাঙতে এখনো অসুবিধা বোধ করছেন।

 

‘মানে বিষ্ণুমূর্তি চুরি যাওয়ার ব্যাপারটা ম্যাডাম?”

 

“আমি বিষ্ণুমূর্তির ব্যাপারে আপনাকে ডাকিনি।”

 

“কিন্তু টেলিফোনে যে বললেন ম্যাডাম…!”

 

একেনবাবুকে থামিয়ে বিপাশা বললেন, “বিষ্ণুমূর্তিটা চুরি যায়নি, হারিয়ে গিয়েছিল। সেটা এখন কোথায় আমি জানি।”

 

“আমি একটু কনফিউসড ম্যাডাম, আপনি বলছেন ওটা পাওয়া গেছে, অথচ মিস্টার ক্যাসেল একটু আগে বললেন ওটা অদৃশ্য হয়েছে।”

 

“তার কারণ আমি চাই না আর কেউ জানুক, কীসের জন্যে আপনাকে ডেকেছি।” আমরা চুপ।

 

একটা অস্বস্তিকর নীরবতার পর বিপাশা মিত্র বললেন, “একটা পুরানো ছবি ক’দিন হল খুঁজে পাচ্ছি না।”

 

ছবি? এটা এত ডেলিকেট ব্যাপার কি করে হয়? বিপাশার কি মাথা খারাপ হয়েছে?

 

“বড় কোনও আর্টিস্টের?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

 

“না, ক্যামেরায় তোলা একটা ফটোগ্রাফ।”

 

একেনবাবু বোধহয় আর পারলেন না। বললেন, “এ নিয়ে এত সিক্রেসির কী আছে ম্যাডাম?”

 

কী জানি দেখে বিপাশার ভুরুটা একটু কুঁচকালো। ড্রয়ার খুলে টিস্যু-পেপার বার করে সেটা দিয়ে টেবিলের একটা কোনা পরিষ্কার করে বললেন, “সেলিব্রেটি হবার সমস্যা কি জানেন? এভরিথিং ইন মাই লাইফ বিকামস নিউজ। আমার একটা ফটো চুরি হয়েছে, তার জন্য আপনার মতো একজন বিখ্যাত গোয়েন্দাকে কাজে লাগিয়েছি। সেই চোর সম্ভবত আমারই পরিচিত, হয়তো একটু মজা করার জন্যেই সে ফটোটা চুরি করেছে.. আই ডোন্ট ওয়ান্ট দ্য হোল ওয়ার্ল্ড টু নো অ্যাবাউট ইট!”

 

“ইয়েস ম্যাডাম। তবে মনে হচ্ছে ফটোটা একটা অর্ডিনারি ফটো নয়।”

 

“ইউ আর রাইট। ওটার একটা হিস্ট্রি আছে।”

 

“ব্যাপারটা যদি একটু খুলে বলেন ম্যাডাম– মানে হিস্ট্রিটা, কী ধরণের ফটো, কোথায় সেটা ছিল, কবে হারাল…।”

 

“নিশ্চয়, বিপাশা শুরু করলেন। “আমার ঠাকুরদার বাবা বিজয় মিত্র, ত্রিপুরার মহারাজের, নামটা এখন মনে পড়ছে না, খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন। ওঁরা দুজনে একসঙ্গে একবার আমেরিকাতে বেড়াতে এসেছিলেন। এই নিউ ইয়র্কেই কোনও একটা লেকের ধারে দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাউকে দিয়ে একটা ফটো তুলিয়েছিলেন। মহারাজ মৃত্যুর আগে ফটোটা একটা খামে পুরে বিজয় মিত্রকে পাঠিয়ে দেন। সেই সঙ্গে একটা চিঠি। চিঠিটা ঠাকুরদা আমাকে পড়ে শুনিয়েছিলেন–পরে নিজেও আমি পড়েছি।

 

বন্ধু,

আমার শেষ উপহার– একটি অমূল্য ধন পাঠাইলাম।

 

নীচের সইটা অস্পষ্ট, তবে শেষে মাণিক্য কথাটা পড়া যাচ্ছিল। বিজয় মিত্র চিঠি আর ছবি-শুদ্ধ সেই খামটি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে আমার ঠাকুরদাকে দিয়ে যান। বিশেষ করে বলে যান, ওটা যেন কখনো হাত-ছাড়া না হয়। ঠাকুরদার কাছ থেকেই ফটোটা আমি পাই। মারা যাবার কিছুদিন আগে আমাকে ওটা দিয়ে যান। ঠিক ওই একই কথা বলে, ‘এটা কখনো হাতছাড়া করিস না।”

 

“আপনার ঠাকুরদার নাম ম্যাডাম?”

 

“অজয় মিত্র।”

 

“আপনার কি কোনও ধারণা আছে, কেন আপনার ঠাকুরদা ওই কথাটা বলেছিলেন?”

 

“না, কিন্তু অনুমান করতে পারি।”

 

“কী অনুমান করতে পারেন ম্যাডাম?”

 

“আমার ঠাকুরদার ধারণা ছিল আমাদের যে এত ধন-সম্পত্তি হয়েছে সেটা ওই ফটোর জন্যে। ইট হ্যাঁজ ব্ৰট আস লাক।”

 

“আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন ম্যাডাম?”

 

“না। কিন্তু ওই ফটোতে একটা কিছু ছিল, যেটা খুব আন-ইউয়াল। ফটোতে নয়, ফটোর পেছনে। লাল কালিতে আঁকা কতগুলো সিম্বল, যার মাথামুণ্ডু আমি খুঁজে পাইনি।”

 

“আপনার মনে আছে সিম্বলগুলো কী?”

 

“না, কয়েকটা সার্কল আর ট্র্যাঙ্গেলের মধ্যে চাইনিজ জাতীয় কিছু ক্যারেক্টার –লিটল টু কমপ্লিকেটেড।”

 

“আপনার ঠাকুরদা এ নিয়ে কিছু বলেননি?” এবার আমি প্রশ্ন করলাম।

 

“পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। শুধু বলেছিলেন, ওটা স্বয়ং মহারাজের আঁকা, আর ওতে একটা সিক্রেট মেসেজ আছে। ঠাকুরদা যখন মারা যান, আমার বয়স মাত্র বারো। এর বেশি আর কিছু মনে নেই।”

 

“ভেরি ইন্টারেস্টিং। একটা প্রশ্ন ম্যাডাম, আপনার ঠাকুরদা আপনার বাবাকে না দিয়ে ওটা আপনাকে দিয়ে গেলেন কেন?”

 

“আই ওয়াজ ভেরি ক্লোজ টু হিম। বাবা আর ঠাকুরদার সম্পর্ক শেষের দিকে ভালো ছিল না। যাই হোক, যেটা বলতে চাচ্ছি– আমি ওসব সিক্রেট মেসেজ-টেসেজে বিশ্বাস করি না। আমার কাছে ছবিটার ভ্যালু হচ্ছে পিওরলি সেন্টিমেন্টাল। ঠাকুরদার কাছ থেকে পাওয়া একটি মাত্র জিনিস, তাই খুবই প্রেশাস।”

 

“অবশ্যই ম্যাডাম। এবার বলুন, কবে ওটা অদৃশ্য হল?”

 

“কবে ঠিক বলতে পারব না। আমার ফ্যামিলি অ্যালবামে খামশুদু ওটা ছিল। কয়েকদিন আগে হঠাৎ ইচ্ছে হল পুরোনো ফটোগুলো দেখি, তখনই খেয়াল করলাম খামটা অ্যালবামে নেই। প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো অ্যালবামটা তুলতে গিয়ে কোথাও পড়ে গিয়েছে। কিন্তু আলমারির মধ্যে কোথাও ওটাকে পেলাম না। আমার হাউসহেল্পকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনও খাম দেখেছে কিনা। দেখেনি।” বিপাশা মিত্র একটু থামলেন।

 

“ম্যাডাম, এটা যে আপনার বিশেষ স্মৃতিচিহ্ন, সেটা আর কি কেউ জানতেন?”

 

“কথা প্রসঙ্গে এই ফটোর কথা কয়েকজনকে বলেছি, ফটোটা দেখিয়েছি।”

 

“ওর আর কোনও কপি আছে আপনার কাছে?”

 

“না।”

 

“ফটোটা কি রঙিন না ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট?”

 

“রঙিনই, কিন্তু এখনকার কালার ফটোর মতো ব্রাইট নয়। রঙিন ফটো ছিল বোঝা যায়, কিন্তু রঙগুলো সব ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।”

 

“কত দিনের পুরোনো ফটো ম্যাডাম?”

 

“তা তো বলতে পারব না। আমার ঠাকুরদা বেঁচে থাকলে এখন ওঁর বয়স একশো বছর হত। তাঁর বাবার যৌবনকালের ফটো। মনে হয় একশো বছরের মতোই পুরোনো হবে।”

 

ভাবছিলাম, একশো বছর আগে কালার ফটো ছিল কি না! অজ্ঞতাটা প্রকাশ করলাম না।

 

“শেষবার এই ফটোটা কবে দেখেছিলেন ম্যাডাম?”

 

“প্রায় সপ্তাহ তিনেক আগে। আমার এক বন্ধু মায়ের ছবি দেখতে চেয়েছিল। সেটা দেখাতে অ্যালবামটা বার করেছিলাম। খামটা তার মধ্যেই থাকত।”

 

“আর অ্যালবামটা ম্যাডাম?”

 

“ফ্যামিলি রুমের আলমারিতে।”

 

“তালাচাবি দেওয়া আলমারি?”

 

“না, আলমারিতে কোনও তালা নেই।”

 

“তারমানে ম্যাডাম যে-কেউ আলমারি খুলে অ্যালবামটা দেখতে পেত?”

 

“যে-কেউ না।”

 

“যে-কেউ” কথাটা-র ওপর জোর দিয়ে বিপাশা মিত্র বললেন, “বিশেষ পরিচিত লোক ছাড়া কাউকে আমি বাড়িতে ঢুকতে দিই না। খুব পরিচিত দুয়েকজন ছাড়া অন্য যারা ঢোকে তাদের নীচে সিকিউরিটির লগবুকে সই করে ঢুকতে হয়।”

 

“তারমানে ম্যাডাম এই তিন সপ্তাহে যাঁরা বাড়িতে ঢুকেছেন, তাঁদের সবার নামই জানা যাবে, শুধু আপনার বিশেষ পরিচিত দুয়েকজন ছাড়া।”

 

“তা যাবে। বিশেষ পরিচিতরা রেস্পেক্টের লোক, ফটো-চোর নন।”

 

“না না ম্যাডাম, তা বলছি না। কিন্তু ধরুন তাঁদের মধ্যে কেউ ওই অ্যালবামটা নিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসেছিলেন, সেখানে হঠাৎ ফটোটা পড়ে গেল। মানে আমি বলতে চাচ্ছি ম্যাডাম, আপনার ফ্যামিলি রুম ছাড়া অন্য কোনও জায়গাতেও ফটোটা পড়ে গিয়ে থাকতে পারে।”

 

“তা পারে, বিপাশা মিত্র একটু চিন্তান্বিত ভাবে বললেন। “তবে ফটোটা তো আলাদা ছিল না, একটা খামের মধ্যে চিঠি শুন্ধু ওটা ছিল। আর ফটোটাও খুব ছোটো নয় ৬ ইঞ্চি বাই ৪ ইঞ্চি। সেটা পড়ে থাকবে, কেউ দেখবে না বিশ্বাস করা কঠিন।”

 

“যাঁরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, তাঁদের কারোর সঙ্গে আপনার কোনও গোলমাল বা মনোমালিন্য চলছিল কি?”

 

বিপাশা মিত্র একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “লেট মি বি ফ্র্যাঙ্ক মিস্টার সেন, এটাই আমার প্রব্লেম। আমার বিশ্বাস চুরিটা যে করেছে সে জানে ফটোটা আমার কাছে খুব প্রেশাস। এটা হারিয়ে গেলে আমি খুবই কষ্ট পাব।”

 

“আই সি, ম্যাডাম। আপনি কাউকে সন্দেহ করছেন?”

 

“গত তিন সপ্তাহে আমার বাড়িতে এসেছে, তাদের মধ্যে তিন জনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কিছু সমস্যা চলছে। এরা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি তাদের কেউ এটা নিয়ে থাকলে, কী ভাবে জিনিসটা উদ্ধার করব জানি না। সেজন্যেই আপনার সাহায্য দরকার।”

 

“এই তিনজন কারা ম্যাডাম?”

 

“দেবরাজ সিং, এডওয়ার্ড রীড আর হ্যারি রেডব্যাঙ্ক। এদের পরিচয়টাও দিয়ে দিই। দেবরাজ নিউ-হেরিটেজ হোটেলগুলোর মালিক, এডওয়ার্ড নিউ ইয়র্ক সিম্ফনির কনডাক্টর, আর হ্যারি হলিউডের প্রডিউসার। তিনজনই আমার বিশেষ বন্ধু, মনোমালিন্যের ব্যাপারটা খুবই ব্যক্তিগত।”

 

মনে পড়ল, এই হ্যারি রেডব্যাঙ্ক আর বিপাশা মিত্রকে নিয়েই কিছুদিন আগে পত্রপত্রিকায় খুব হইচই হচ্ছিল। দেবরাজ সিং বা এডওয়ার্ড রীডকে জড়িয়ে বিপাশা মিত্রের কোনও খবর অবশ্য পড়িনি। কিন্তু ওঁরাও বিখ্যাত লোক।

 

“এঁরা তিনজনই ফটোটার কথা জানতেন?”

 

“আই থিঙ্ক সো। জোর করে বলতে পারব না, তবে মনে হয় ওদের ফটোটা দেখিয়েছি।”

 

“এঁরা তিনজনই গত তিন সপ্তাহের মধ্যে আপনার কাছে এসেছিলেন?”

 

“হ্যাঁ।”

 

আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম, একেনবাবু এবার একটু প্যাঁচে পড়েছেন। এঁরা সবাই সেলিব্রেটি– এঁদের সাক্ষাৎ পাওয়াই কঠিন ব্যাপার। সাক্ষাৎ না হয় মিলল, কিন্তু তারপর? এঁদের কাছ থেকে চুরি করা জিনিস উদ্ধার হবে কী করে?

 

“যেখানে আপনার অ্যালবামটা ছিল সেই জায়গাটা কি একবার দেখতে পারি?”

 

“নিশ্চয়, চলুন।”

 

আমাদের নিয়ে বিপাশা উপরে পঁচিশ তলায় পেন্টহাউসে গেলেন। ড্রয়িং রুমের পাশে ফ্যামিলি রুম। কী তার সাইজ! আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের মতো বেশ কয়েকটা তার ভিতরে এঁটে যাবে। এক দিকটা পুরো কাঁচের সেখান থেকে সেন্ট্রাল পার্ক দেখা যাচ্ছে। বাকি দেয়ালগুলোতে দামি উড-প্যানেলিং। বড় বড় যে-সব পেন্টিং ঝুলছে, সেগুলো নিশ্চয় অরিজিনাল। ফার্নিচারগুলোও মনে হয় ঘরের জন্যে স্পেশালি তৈরি করা হয়েছে। দেয়ালের বেশ খানিকটা জুড়ে একটা বিল্ট-ইন বুক-শেলফ। সেখান থেকে তিনি একটা মোটা অ্যালবাম বার করলেন।

 

“এটাই আমার ফ্যামিলি অ্যালবাম, এইখানে ছিল।”

 

একেনবাবু অ্যালবামটা একটু উলটে পালটে বুক-শেলফের ভিতরে যখন উঁকিঝুঁকি মারছেন, বিপাশা তখন বললেন, “এর প্রত্যেকটা বই নামিয়ে আমি আর মারিয়া, আমার যে হাউস-হেল্প– দুজনে মিলে খুঁজেছি, কোথাও কিছু নেই।”

 

“একটা কথা ম্যাডাম, আপনার হাউস-হেল্প কি জানে যে এটা আপনার কাছে খুব মূল্যবান?”

 

“আমার যখন আট বছর বয়স, তখন থেকে মারিয়া এখানে আছে– ওল্ড পর্তুগীজ লেডী, আমাকে মেয়ের মতো দেখে। তাকে সন্দেহ করার কোনও কারণই নেই।”

 

“আই সি।”

 

“আর কিছু দেখতে চান?” বিপাশা ওঁর ঘড়ির দিকে তাকালেন। “আমার আরেকটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। এখন না হলেও পরে দেখাতে পারি।”

 

“না ম্যাডাম, আপাতত আর কিছু লাগবে না। তবে যে তিনজনের কথা বললেন, তাঁদের ফোন নম্বরগুলো কি দিতে পারেন?”

 

“আমি আপনাকে কাল ফোনে জানিয়ে দেব। তবে ঘুণাক্ষরেও আমার কাছ থেকে নম্বর পেয়েছেন জানাবেন না।”

 

এতো আচ্ছা ফ্যাসাদ! মনে মনে ভাবছিলাম, আমাদের মতো অজানা অচেনার সঙ্গে এঁরা ফোনে কথা বলবেন কেন?

 

বিপাশা মিত্র বললেন, “আমি জানি, আপনাদের একটা কঠিন কাজ দিচ্ছি, কিন্তু আমি তার জন্য যে কোনও রকম পারিশ্রমিক দিতে রাজি আছি। জাস্ট নেইম ইওর প্রাইস।”

 

“আগে দেখি ম্যাডাম, কদুর কী করতে পারি।”

 

সুন্দরীর উপরোধ ফেলা কঠিন, তবে মনে হল একেনবাবু একটু পাশ কাটাবার চেষ্টা করছেন।

 

“না, না, দেখি নয়, এটা কিন্তু আপনাকে করতেই হবে। ঠিক তো?” আচমকা ভাঙা ভাঙা বাংলায় বিপাশা মিত্র কথাগুলো বললেন।

 

হতচকিত একেনবাবু বললেন, “কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, আমি কল্পনা করিনি আপনি এত চমৎকার বাঙলা বলতে পারেন!”

 

“আমার সম্পর্কে আপনাদের কী ধারণা আমি জানি না, তবে পত্রপত্রিকায় যেসব কথা পড়েন, সেগুলো বিশ্বাস করবেন না– ওগুলো বেশির ভাগই বানানো।”

 

একেনবাবু লজ্জা পেয়ে বললেন, “হ্যাঁ, ম্যাডাম।”

 

এবার বেশ গর্ব গর্ব মুখ করে বিপাশা বললেন, “আমি সিকি ভাগ বাঙালি হলেও বাংলা বেশ ভালোই বলতে পারি। ঠাকুরদা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার নামটা ওঁরই দেওয়া। ঠাকুরদার কোলে বসে আমি ঠাকুরমার ঝুলি থেকে সুরু করে টুনটুনির গল্প, রামায়ণ, মহাভারত– সব শুনেছি। এক সময়ে বাংলায় লিখতেও পারতাম, এখন তেমন পারি না।”

 

আমাদের বিদায় দেবার আগে, বিপাশা মিত্র একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার একটা কার্ড আছে?”

 

ভাগ্যিস কয়েকদিন আগে একেনবাবুকে বকেঝকে একটা ভিজিটিং কার্ড করানো হয়েছে। মাত্র কুড়ি ডলার লাগে পাঁচশোটা করাতে– সেটা খরচ করতেও একেনবাবুর দারুণ আপত্তি। শুধু শুধু এতগুলো টাকা নষ্ট করা স্যার। যাক, এবার সেটা কাজে লাগল। বিপাশার কাছে মুখ রক্ষা হল।

 

লিফট আসার জন্যে যখন অপেক্ষা করছি, তখন একেনবাবু বললেন, “যে প্রশ্নটা আমার প্রথম করা উচিত ছিল, সেটাই করিনি ম্যাডাম যে খামটার মধ্যে ছবিটা ছিল, সেটা কী রকম দেখতে?”

 

“খুবই পুরোনো ছাই-রঙা চিঠির খাম। খামের উপরের ঠিকানাটা এত অস্পষ্ট, ভালো করে পড়াও যায় না।”

 

“খামের ওপর স্ট্যাম্প লাগানো ছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“তা একটা ছিল। কিন্তু কী রকম স্ট্যাম্প বলতে পারব না, ভালো করে দেখিওনি।” তারপর এক মুহূর্ত চুপ করে বললেন, “জানি আপনি কী ভাবছেন… তেমন দামি হতে পারে না, যার জন্যে আমার কোনও বন্ধু চুরি করবে।”

 

আমার মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিলো, হাউ ডু ইউ নো? কিন্তু সেটা ভালো শোনাত, নিজেকে সামলালাম।

 

বিপাশা বোধহয় আমার মনের কথাটা বুঝলেন। বললেন, “দেবরাজ স্ট্যাম্প চেনে, খুব দামি হলে আমাকে বলত।”

 

“দাঁড়ান ম্যাডাম, দেবরাজ মানে দেবরাজ সিং? কিন্তু আপনি তো বললেন উনি একজন সাসপেক্ট!”

 

“ইয়েস, কিন্তু তার কারণটা অন্য কয়েক হাজার ডলারের স্ট্যাম্প নয়। ফ্র্যাঙ্কলি ওই কটা টাকা ওর কাছে কিছুই নয়, আমার কাছেও নয়।”

 

মনে মনে বললাম, কয়েক হাজার হলে কথাটা হয়তো ভুল নয়, কিন্তু মিলিয়ন ডলারের স্ট্যাম্পও হয়, যেমন, সুইডেনের ‘ট্রেসকিলিং ইয়েলো’। এটা একেনবাবুকে পরে জানাতে হবে।

 

লিফটের দরজাটা খুলল, সবাই উঠলাম। বিপাশা অফিসে যাবেন, আমরা একেবারে নীচে। একেনবাবু বললেন, “আপনার মিউজিয়ামটা আজ দেখা হল না ম্যাডাম।”

 

“কেন হবে না? আমি মিস্টার কুমারকে বলে দিচ্ছি। উনি আমার মিউজিয়ামের কিউরেটর, দেখিয়ে দেবেন।” বলেই বিপাশা মোবাইলে কাকে জানি ফোন করলেন।

 

অফিসে এসে লিফটের দরজা খুলতেই বিপাশা বললেন, “আসুন।” অফিসের সামনেই একজন গার্ড টাইপের কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। বিপাশা তাকে বললেন, “এঁদের মিস্টার কুমারের কাছে নিয়ে যাও। আমি ওঁকে ফোন করে দিচ্ছি।”

 

মিউজিয়ামটা অফিস যে তলায় সেই তলাতেই। তবে একেবারে অন্যদিকে, লিফট থেকে একটু হাঁটতে হয়। মিস্টার কুমার অফিসেই ছিলেন। মনে হল বিপাশার সঙ্গে কথা শেষ করছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়ে উঠে এসে অভ্যর্থনা করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী আমরা দেখতে চাই?

 

“না স্যার, বিশেষ কোনও কিছু নয়। শুধু ঘুরে ঘুরে একটু আইডিয়া করব, অবশ্য যদি আপনার সময় থাকে স্যার।”

 

“কী আশ্চর্য, নিশ্চয় সময় আছে। আসুন সবাই,” বলে মিউজিয়ামে যা-আছে সবই আমাদের দেখালেন। মিউজিয়ামটা ছোটো, কিন্তু ইন্টারেস্টিং।

 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এটা খোলা থাকে কতক্ষণ?”

 

উত্তরে মিস্টার কুমার জানালেন, “এটা প্রাইভেট কালেকশন, পাবলিকদের ঢুকতে দেওয়া হয় না।”

 

“তার মানে এগুলো বাইরের কেউই দেখতে পাবে না?” বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

 

“ঠিক তা নয়। কোনও স্পেশাল এক্সিবিশন হলে, বড় বড় মিউজিয়াম এখান থেকে এক্সিবিট ধার নিয়ে যায়।”

 

সুজয় মিত্র, মানে বিপাশার বাবার ইন্টারেস্ট ছিল পাথরের মূর্তি আর রেনেসাঁস পিরিয়ডের পেন্টিং-এ। সারা দেয়াল জুড়ে অজস্র পেন্টিং টানানো। পাথরের মূর্তিগুলোর বেশির ভাগই ইজিপ্ট আর গ্রীস থেকে আনা। কিছু চীন, তিব্বত এবং থাইল্যন্ডের। কম্বোডিয়ার শুধু ওই বিষ্ণুমূর্তিটাই ছিল।

 

এদিক ওদিক থেকে প্রচুর জিনিস সংগ্রহ করেছেন সুজয় মিত্র, বাদ শুধু ইন্ডিয়া। আমার একটু অবাকই লাগলো। বিপাশার ঠাকুরদা ইন্ডিয়াকে ভালোবাসতেন বলেই বোধহয় ছেলের এই অহেতুক বীতরাগ। এরকম অনেক সময় ঘটে শুনেছি। কথায় কথায় জানলাম, সুজয় মিত্রের মৃত্যুর পর নতুন কিছুই মিউজিয়ামে যোগ করা হয়নি। বিপাশা মিত্রের মিউজিয়ামের ব্যাপারে কোনও উৎসাহই নেই। একটু ক্ষোভের সঙ্গেই মিস্টার কুমার কথাটা বললেন।

 

“তাহলে আপনার এখানে কাজটা কী স্যার?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

 

“যক্ষের ধন পাহারা দেওয়া,” মজা করেই কথাটা বলার চেষ্টা করলেন। তারপর একটু থেমে বললেন, “অনেক পুরনো দুষ্প্রাপ্য জিনিস আছে এখানে, সেগুলো নিয়ে একটু আধটু রিসার্চ করি।”

 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে এত কনট্রোভার্সি হল কেন?”

 

উত্তর যেটা পেলাম, সেটা অস্পষ্ট। পুরোনো জিনিসের ইতিহাস সব সময় সঠিক জানা যায় না, নানা মুনির নানা মত থাকে।

 

আমরা যখন বিল্ডিং-এর নীচে নেমে এসেছি, তখন দেখলাম বব ক্যাসেল লিফটে ওঠার জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা বেরোচ্ছি, উনি ঢুকছেন। তারমধ্যেই একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “কাজটা পেলেন?”

 

প্রশ্নটা এত আকস্মিক। একেনবাবু একটু আমতা আমতা করলেন, “মানে স্যার…।”

 

“অ্যাডভান্স না নিয়ে কিছু করবেন না, মাই অ্যাডভাইস।” লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

 

ভেরি স্ট্রেঞ্জ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *