ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(১৯)

 

শনিবার মে ২৮, ২০১১

 

শনিবার সকাল সকাল কলেজে গেলাম। পেপারটা নিয়ে কাজ করা ছাড়াও কিছু অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ জমে আছে। যতটা পারি সেগুলো শেষ করতে হবে। তবে বেশ কিছুটা সময় গেল অকাজ করতে। আমার দুটো ইমেল অ্যাকাউন্ট আছে। একটা কলেজের অ্যাকাউন্ট, আরেকটা আমার পার্সোনাল হটমেল আকাউন্ট। দিন সাতেক আমি আমার হটমেল খুলিনি। বেশি ইমেল ওখানে আমি পাই না। কিন্তু আজকে হটমেল-এ ঢুকে দেখি, এক গুচ্ছের ইমেল সেখানে জড় হয়েছে। যার বেশির ভাগই আমার নয়। ভুল করে আমার ইমেল অ্যাড্রেস কোনও ই-গ্রুপে ঢুকে গেছে, তাদের নানান ই-মেলে আমার মেলবক্স ভারাক্রান্ত। সেগুলো ডিলিট করার পর সেই ই-গ্রুপ থেকে কী করে মুক্তি পাওয়া যায়, সেটা উদ্ধার করতেও কিছুটা সময় গেল। এর মধ্যেই এক সিনিয়র কলিগ ঘর খোলা দেখে ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ ডিপার্টমেন্ট হেড-এর শ্রাদ্ধ করে গেলেন। যতটা কাজ করতে পারব ভেবেছিলাম, তা আর হল না। রবিবারেও আবার আসতে হবে। একেনবাবু এরমধ্যে ফোন করলেন। প্রমথ ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে উইক-এন্ড কাটাচ্ছে, সুতরাং বাড়িতে কুকিং ফ্রন্ট সামলানোর কেউ নেই, নিজেদের চরে খেতে হবে। একেনবাবু একটা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের খোঁজ পেয়েছেন লেক্সিংটন অ্যাভেনিউয়ে। মাছের ঝোল আর ভাত পাওয়া যায়। খাঁটি বাঙালি স্টাইল, খুব রিজনেবল প্রাইসে। শুধু আগে থেকে জানিয়ে রাখতে হয়। সেটা জানিয়ে রেখেছেন আপত্তি করব না ধরে নিয়ে। আমার বাঙালি বা ইন্ডিয়ান খাবার না হলেও চলে, কিন্তু একেনবাবু সবসময়েই হা-হুঁতাশ করেন ওগুলো জুটছে না বলে।

 

.

 

খাবার দোকানটা যথেষ্ট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমাদের জন্য স্পেশাল অর্ডার, সর্ষে দিয়ে ইলিশ মাছ, যা দেখলাম মেনুতে নেই। অনেকটা ঝোল ভাতে মেখে এক গ্রাস মুখে তুলে একেনবাবু বললেন, “আঃ! যাই বলুন স্যার, সর্ষে-ইলিশের বিকল্প নেই, পৃথিবীর বেস্ট খাবার।”

 

‘সায়েবদের খাওয়ানোর চেষ্টা করে দেখুন না, ঝাঁঝের চোটে চোখের জলে নাকের জলে হবে।”

 

“ওঁদের স্যার, টেস্ট ডেভলপ করেনি।”

 

“বুঝলাম, তা এই কথাটা আপনার বন্ধু ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে কখনো বলেছেন?”

 

“কী যে বলেন স্যার, এটা কি বলা যায়!”

 

ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের প্রসঙ্গে আরও অনেক কথা এসে গেল। একেনবাবু ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের সঙ্গে আজ দেখা করেছেন বব ক্যাসেলের ব্যাপারে। পুলিশ খুন হবার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়নি, কিন্তু এখন পর্যন্ত সুইসাইড বলেই ভাবছে। এটা ভাবার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। একটা কারণ তো আমরা জানি, মায়ের চিকিৎসার জন্য অর্থ জোগাড় করার দুশ্চিন্তা। যেটা জানতাম না, সেটা হল, মানসিক ভাবে বব এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে কয়েক সপ্তাহ আগে ডাক্তার দেখিয়ে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট খাচ্ছিলেন। এটা পুলিশের কাছে একটা ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন। অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট খেলে প্রথম দিকে সুইসাইডের টেন্ডেন্সি দেখা দিতে পারে, এদেশের ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এটাই সাবধানবাণী। মিশেল ক্যাসেলের অ্যানসারিং মেশিনে ববের ফোন মেসেজের সঙ্গে যদি এই তথ্যটা যোগ করা যায় তাহলে সুইসাইড থিওরির পাল্লাই ভারী হয়।

 

এগুলো শুনে খারাপ লাগল। ভেবেছিলাম পুলিশি অনুসন্ধানে হয়তো কোনও ফাঁক থাকবে। বললাম, “আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে ক্যাথি ক্যাসেলের কেসটা একেবারেই হোপলেস।”

 

“তাই তো দাঁড়াচ্ছে স্যার। শুধু একটা ইন্টারেস্টিং খবর, মিস্টার ক্যাসেল আর অশোকবাবু ভালো বন্ধু ছিলেন।”

 

“কিন্তু সেটা তো ইন্দ্র আর সতীশ দুজনেই বলেছিলেন?”

 

“হ্যাঁ, সেটাই ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট কনফার্ম করলেন। “শুধু তাই নয় স্যার, অশোকবাবু মারা যাবার দিন বিকেল পাঁচটা নাগাদ শুধু দু’জনকে ফোন করেছিলেন, মিস সীমা আর মিস্টার ক্যাসেলকে।”

 

“সেটা তো আগেই শুনেছেন সীমা আর সতীশ কুমারের কাছ থেকে। পুলিশ কী করে জানল, মোবাইল ফোনের রেকর্ড দেখে?”

 

“রাইট স্যার।”

 

“কী বলেছিলেন ফোনে?”

 

“মিসেস সীমাকে কী বলেছিলেন সেটা তো আমরা জানি। মিস্টার ক্যাসেলকে কী বলেছিলেন পুলিশ এখনও বার করতে পারেনি।”

 

“দ্যাট ইজ ইন্টারেস্টিং! পুলিশ তাহলে ববকে কী জেরা করল?”

 

“তা তো বলতে পারব না স্যার। পুলিশ তখন হয়তো এই ফোনের কথাটা জানত না।”

 

“কিন্তু বব তো জানত?”

 

“দ্যাট ইজ পাজলিং স্যার। এক হতে পারে মিস্টার ক্যাসেল তখনও জানতেন না মেসেজটা কী। সতীশবাবু বললেন না, ওঁর ভয়েস মেল রিট্রিভ করতে পারছিলেন না।”

 

“হয়তো মেসেজটা রিট্রিভ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি, অথবা ইচ্ছে করেই জানাননি।”

 

“তাও সম্ভব স্যার।”

 

“আপনি কী সন্দেহ করছেন, অশোক আর ববের মৃত্যুর মধ্যে কোনও যোগ আছে?”

 

“না স্যার, তা বলছি না। মিস্টার ক্যাসেল হয়তো সুইসাইউহ করেছেন। তবে খবরটা জানতে পেলে অশোকবাবুর মৃত্যুর কারণ হয়তো কিছুটা আঁচ করা যেত। যাক সে কথা, আপনি কী করলেন স্যার সারাদিন?”

 

“কোনও এক্সাইটিং কাজ নয়, ইমেল ডিলিট করেই কাটল।”

 

“কেন স্যার, আপনি সব ইমেল জমিয়ে রাখেন?”

 

ব্যাপারটা একেনবাবুকে বোঝাতে হল। একেনবাবু আজকাল ইন্টারনেট, ইমেল ব্যবহার করেন ঠিকই, কিন্তু কোনও ই-গ্রুপ বা লিস্টসার্ভ-এ ঢোকেননি। কিছু কিছু ই-গ্রুপে কী অজস্র ই-মেল প্রতিদিন চালাচালি হয়, সে ধারণা ওঁর নেই। তবে এসব বিষয়ে জানার আগ্রহ ওঁর প্রচুর।

 

জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা স্যার, প্রমথবাবু সেদিন একটা অটোম্যাটিক ফরোয়ার্ডিং সিস্টেমের কথা বলছিলেন। সেটা করলে নাকি আমার জি-মেল-এর অ্যাকাউন্টে কেউ ইমেল পাঠালে অটোম্যাটিক্যালি সেটা আমার হটমেল অ্যাকাউন্টে চলে যাবে!”

 

“তা যাবে, যদি আপনার অ্যাকাউন্ট সেটিং সেভাবে করেন।”

 

“তাহলে স্যার, আপনি কলেজের অ্যাকাউন্টটা সে ভাবে সেট করলেন না কেন? সেখানকার সব ইমেল অটোমেটিক্যালি আপনার হটমেল অ্যাকাউন্টে চলে যেত। হটমেল এ ঢুকলেই আপনি সব ইমেল পেয়ে যেতেন, এদিক ওদিক করতে হত না।”

 

“আমাদের ইউনিভার্সিটিতে সেটা করা যায় না। আমার ধারণা বড় বড় কোনও কোম্পানিতেই সেটা করতে দেওয়া হয় না।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *