ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(১৪)

 

অফিসে ঘরে ঢুকে দেখি রামসুন্দর রেড্ডী আমার ঘরে বসে আছে।

 

“আরে তুমি, কী খবর?”

 

“হেলেন বলল একটার সময়ে তোমার একটা মিটিং আছে, হয়তো এখনই চলে আসবে। ভাবলাম একটু অপেক্ষা করেই যাই, দেখা হয়ে যাবে।”

 

আমি টেবিলে ব্যাগটা রাখতে রাখতে বললাম, “ভালো করেছ। আছ কেমন? অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই।”

 

.

 

রামসুন্দর আমার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে এসে বলল, “কিশোর রাও তো তোমার বন্ধু, তাই না?”

 

“একসঙ্গে পড়েছি, কেন বল তো?”

 

“ও সুইসাইড করতে চলেছে, তোমার ঠেকানো উচিত।”

 

“সুইসাইড?”

 

“হ্যাঁ, শুনলাম ও নাকি বেভকে প্রোপোজ করেছে।”

 

“ইট ইজ নিউজ টু মি, তুমি জানলে কী করে?”

 

“আই হ্যাভ মাই সোর্সেস, কিন্তু সেটা আন-ইম্পর্টেন্ট। ইট মাস্ট বি স্টপড।”

 

“তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? হোয়াই শুড ইট বি স্টড? একজন প্রেম করে যদি কাউকে বিয়ে করতে চায়, তাতে আমরা বাধা দেবার কে? আর দিলেও বা সে শুনবে কেন?”

 

“হি উইল বি রুইনড, সেইজন্যে।”

 

রামসুন্দরের মুখের অবস্থা দেখে আমার প্রায় হাসি পেয়ে গেল। আমি বললাম, “শোন, রামসুন্দর, তোমার সাবধানবাণী আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। যদিও কাল বেভের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, বাইরে থেকে যাই মনে হোক, আসলে বেশ সহজ আর খোলামেলা মনের মেয়ে।”

 

“ও, তার মানে তোমাকেও ও মজিয়েছে,” বেশ তিক্তভাবেই রামসুন্দর কথাটা বলল।

 

ওর বলার ধরণটা আমার ভীষণ বাজে লাগলো, আমিও একটা কড়া জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, তখন বাইরের থেকে দরজায় কেউ টোকা দিল।

 

দরজা খুলে দেখি বেভ। রামসুন্দর আর কোনও কথা না বলে প্রায় হন হন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

 

বেভ বলল, “আই অ্যাম সরি, জেরাল্ড তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান, দরকারটা জরুরি।”

 

টেড জেরাল্ড আমাদের ডিপার্টমেন্ট হেড। আমার কয়েকটা ঘর পরেই ওর ঘর। ঘরে যেতেই টেড বলল, “সরি, তোমায় তাড়া দিয়ে নিয়ে এলাম। নেক্সট ইয়ারের মাস্টার রুটিন দু’দিন বাদে পাঠানোর কথা ছিল, এখন বলছে আজকেই তিনটের মধ্যে পাঠাতে হবে। তোমার জন্যে এই ক্লাসগুলো আছে। সই করে দাও, নইলে অনেক ঝামেলা পোয়াতে হবে।”

 

চোখ বুলিয়ে দেখলাম, এমন কিছু অসুবিধার নেই, একটু আধটু সময়ের হেরফের করলে হয়তো সুবিধা হত, কিন্তু তারজন্যে টেডকে ক্ষিপ্ত করার কোনও মানে হয় না।

 

“ফাইন, আর কিছু?”

 

“নাথিং, থ্যাঙ্কস।”

 

.

 

ঘরে ঢুকতে যাব দেখি বেভ নিজের ডেস্ক থেকে উঠে আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

আমি ঘুরে বললাম, “আমার কিন্তু একটার সময় মিটিং আছে।”

 

“আই নো দ্যাট, আমি তোমার অফিস অ্যাসিস্টেন্ট না?”

 

“ইয়েস,” একটু হেসে ওকে নিয়ে ঘরে ঢুকলাম।

 

“এবার বলো যা বলতে চাও।”

 

বেভ প্রথমে দরজাটা বন্ধ করল। তারপর বলল, “আমি জানি, রামসুন্দর নিশ্চয় আমার সম্পর্কে অনেক যা-তা তোমায় আগে বলেছে…।”

 

আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “তুমি কী করে জানলে?”

 

“ইভেন এ ডাম্ব অফিস অ্যাসিস্টেন্ট আন্ডারস্ট্যান্ডস, কেউ যদি চার মাস ধরে কাউকে অ্যাভয়েড করে!”

 

বেভের এই সোজাসাপ্টা অভিযোগের উত্তরে চট করে কোনও জবাব মুখে এল না। কিন্তু ধাক্কাটা কাটিয়ে বললাম, “দেখ, অফিসে তোমাদের প্রয়োজন আমার খুব অল্প, যেটুকু দরকার সেটা হেলেনই করে দেয়। তাই তোমায় অ্যাভয়েড করার প্রশ্ন উঠছে না।”

 

“ইউ আর ভেরি কাইন্ড,” বেভ নিচু গলায় বলল, “তোমাকে আমি রেস্পেক্ট করি, যদি কিছু শুনেও থাক কিশোরকে সেটা বলনি বলে।”

 

আমি আর বেভকে লুকোলাম না। রামসুন্দর শুধু বলেছিল, “তোমাকে এড়িয়ে চলতে, অন্য কিছু নয়।”

 

“কিন্তু ও অনেক কথা বলেছে অন্যদের, আমার রেপুটেশন ও রুইন করেছে। ইয়েস, আই অ্যাম প্লেফুল, মজা করতে ভালোবাসি, বাট আই অ্যাম নট চিপ, আই হ্যাভ ভ্যালুজ।” ক্ষোভে দুঃখে বেভের গলা প্রায় বুজে এল।

 

আমার মিটিং আরম্ভ হতে মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি, তাও জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার উপর ওর এত রাগ কেন?”

 

“বিকস, আই রিফিউস্ট টু স্লিপ উইথ হিম।” বেভের চোখটা জ্বলে উঠল। “ওর ধারণা আমরা সাদা মেয়েরা সব স্লাল্স, হি মেড মি ড্রাঙ্ক, যাতে বাধা না দিতে পারি। বাট আই স্ন্যাপড় হিম।”

 

‘মাই গড!” আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

 

“আজ লাঞ্চে একজন বলল, ও নাকি কাউকে দিয়ে কিশোরকে বলবে, আমায় বিয়ে করে দেশে বেড়াতে নিয়ে গেলে, হি উইল গেট বোথ অফ আস অ্যারেস্টেড… ওর বাবা নাকি ইন্ডিয়ার বিগ শট।”

 

“কীসের জন্য অ্যারেস্ট করবে?”

 

“তা জানি না। ওর বাবা পুলিশের একজন বিরাট অফিসার। একটা ফল্স চার্জ এনে জেলে পুরবে। আই নো তুমি বিজি, তোমার মিটিং আছে। এভাবে আমার পার্সোনাল প্রব্লেম বলে তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না।” ওর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।

 

ঘড়ির দিকে তাকালাম। আর দেরি করা যাবে না, আমাকে এবার যেতে হবে। “দ্যাটস ওকে,” বলে দরজার দিকে এগোলাম। ওই দরজাটা খুলে দিল। বেরিয়ে যাবার আগে, নিজের অজান্তেই বেভের কোনুইটা ছুঁয়ে বললাম, “আই অ্যাম সো সরি টু হিয়ার অল দিজ।”

 

.

 

মিটিং-এর পরেও আটকা পড়লাম। দুয়েকটা লোক মিটিং শেষ হয়ে গেলেও ঘোঁট পাকাতে ভালোবাসে। তাদের হাত থেকে উদ্ধার পেতে পেতে প্রায় তিনটে বাজল। ঘরে এসে দেখি একেনবাবু বসে আছেন।

 

“বুঝলেন, স্যার, প্রমথবাবুর সঙ্গে কথা বললাম। ভেবে দেখলাম নীলা-ফিলা না কেনাই ভালো।”

 

“এত উত্তম কথা।”

 

“আসলে কী জানেন স্যার, আমার ফ্যামিলি এগুলো ভীষণ মানে।”

 

“আপনি মানেন না?”

 

“আমি মানি না বলব না স্যার, তবে কিনা অতটা মানি না। আর ভাগ্যে কিছু থাকলে নীলা কি আর আটকাতে পারবে?”

 

“এটাও খাঁটি কথা। তা বউদিকে কী বলবেন?”

 

“সেটাই সমস্যা ছিল। কিন্তু প্রমথবাবু তার সমাধান করে দিয়েছেন।”

 

“কী সমাধান?”

 

“ওঁর ল্যাবে আর্টিফিশিয়াল নীলার একটা ছোট্ট টুকরো ছিল, সেটা আমায় মানিব্যাগে রেখে দিতে বললেন। সুতরাং ফ্যামিলিকে নিশ্চিন্ত করতে পারব।”

 

“বাঃ, প্রব্লেম মিটল আবার পয়সাও তো বাঁচল।”

 

“তা বাঁচল স্যার, আবার ঠিক বাঁচলও না।”

 

“তার মানে?”

 

“প্রমথবাবু একটা কন্ডিশনে নীলাটা দিয়েছেন। আমাকে মোবাইল ফোন কিনতে হবে। উনিই তার ব্যবস্থা করবেন। যাই হোক স্যার, নীলা নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না এতেই আমি খুশি। ওটার জন্যেই কিছুতে কনসেন্ট্রে করতে পারছিলাম না। এখন মনে হচ্ছে মাথাটা ক্লিয়ার হতে শুরু করেছে।”

 

“সেটা তো চমৎকার কথা, কী মনে হচ্ছে?”

 

“আপনাকে তো বলিনি স্যার, আজ সকালে যখন দেবরাজবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তখন ইন্দ্রবাবুর সঙ্গে আবার দেখা হল। ওঁর কাছ থেকে সীমা শ্রীমালী এখন কোথায় কাজ করেন জানলাম।”

 

“সীমা শ্রীমালী? সে আবার কে?”

 

“কী মুশকিল, এর মধ্যেই ভুলে গেলেন স্যার? অশোকবাবুর এক্স-গার্লফ্রেন্ড যাঁর কথা ইন্দ্রবাবু সেদিন বললেন। সেদিনই আমার ঠিকানাটা নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু বলছিলাম

 

স্যার, মাথাটা কাজ করছিল না। মিস সীমা নিউ হেরিটেজ হোটেল ছেড়ে এখন অ্যাম্বাসেডর হোটেলে কাজ করছেন।”

 

“অ্যাম্বাসেডর হোটেল তো কাছেই।”

 

“এক্সাক্টলি স্যার। তাই খানিকক্ষণ আগে ওখানে খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। আই ওয়াজ লাকি স্যার, মিস সীমা তখন ওখানেই ছিলেন। বেশিক্ষণ অবশ্য কথা বলতে পারিনি, ব্যস্ত ছিলেন। তারমধ্যে যা উদ্ধার করলাম, ওঁদের ছাড়াছাড়িটা হয়েছিল অশোকবাবুর জন্যেই। মাস পাঁচেক আগে মিস সীমার মা যখন এদেশে বেড়াতে এসেছিলেন, অশোকবাবুকে তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল। অশোকবাবুও ওয়াজ এ হ্যাপি এন্ড জলি পার্সন। কিন্তু মিস সীমার মা দেশে চলে যেতেই অশোকবাবুর ব্যবহার ভীষণ কোল্ড হয়ে গেল। ইট কুড ভেরি ওয়েল বি যে, ইন্দ্রবাবু আর তার ফ্রেন্ডস্রা এর জন্যে দায়ী। ইন্দ্রবাবু সেদিন পরিষ্কার বলেননি, কিন্তু ইন্দ্রবাবুর বাড়িতে যে পোকারের আসর বসত, সেটা এক-পয়সা দু-পয়সার ফ্রেন্ডলি পোকার গেম নয়, মোটা টাকার বাজি ধরে ওরা খেলত। মিস সীমা দুয়েকবার অশোকবাবুর অ্যাপার্টমেন্টে বেড়াতে গিয়ে এসব দেখে খুব আপসেট হয়েছিলেন। আরও আপসেট হয়েছিলেন যখন শুনলেন অশোককেও ওঁরা দলে ভেড়াবার চেষ্টা করছেন। অশোকবাবুকে মিস সীমা বলেছিলেন ইন্দ্রবাবুকে অন্য কোথাও চলে যেতে বলতে। কিন্তু অশোকবাবু রাজি হননি। মিস সীমার ধারণা অশোকবাবু মাঝে মাঝে ইন্দ্রবাবুকে টাকাও ধার দিয়েছেন পোকারের দেনা থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে। আরও বললেন, এড গুয়ান্সিয়াল লোকটা মোটেই সুবিধার নয়।”

 

“কেন?”

 

“কেন তা বুঝলাম না স্যার। তবে মিস সীমার লোকটাকে খুবই অপছন্দ। ওই নাকি পোকারের নেশা ধরিয়েছিল সবার। যাই হোক মিস সীমা ভয় পাচ্ছিলেন, অশোকবাবুও হয়তো ওদের খপ্পরে পড়বেন। তাই আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন মা চলে গেলেই ইন্দ্রবাবুকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর, নইলে অশোকবাবুর বাড়িতে উনি যাবেন না। হয়তো তাতেই অশোকবাবুকে বিগড়ে গিয়ে সীমাকে অ্যাভয়েড করতে শুরু করেন। মিস সীমা তাও সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, শেষে বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেন। অ্যাম্বাসেডর হোটেলে চলে আসার পর অশোকবাবুর ফোন মাঝে মধ্যে পেয়েছেন, কিন্তু মিস সীমা সাড়া দেননি। দায়সারা গোছের মামুলি কথাবার্তা হয়েছে, এইটুকুই।”

 

“ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ প্রথমে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন সীমা, পরে আবার সে চেষ্টাই করছিলেন অশোক।”

 

“আসলে ভালোবাসা যখন চলে যায় স্যার, তখন যেটা থেকে যায়, সেটা হল তিক্ততা। মিস সীমা বেশ কয়েকবার বললেন, “অশোক ওয়াজ ওয়ান্স এভরিথিং টু মি, বাট নট এনি মোর। এরপর স্যার, আর কিছু বলার থাকে না। তাও আমি একবার মিস সীমাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইন্দ্রবাবুকে তাড়াতে বলাই কি ওঁর পালটে যাবার একমাত্র কারণ, না আর কিছু থাকতে পারে?” ওঁর উত্তর, ‘অল আই ক্যান সে, সামথিং ওয়াজ নট রাইট উইথ হিম, নট শিওর হোয়াট ইট ওয়াজ।”

 

“এটা কতদিন আগের ব্যাপার?”

 

“ভেরি রিসেন্ট, স্যার। মিস সীমা অ্যাম্বাসেডর হোটেলে এসেছেন মাস দুই হল মাত্র।”

 

“আপনি একটু আগে বললেন, সীমার মা এসেছিলেন মাস পাঁচেক আগে। নিশ্চয় কিছুদিন ছিলেন মেয়ের কাছে। তখন পর্যন্ত অশোকবাবু যদি ফাইন থেকে থাকেন, তাহলে

 

তো পোকারের ব্যাপারটাই মনে হচ্ছে এই ব্রেক-আপটার মূলে।”

 

“তাই তো দাঁড়াচ্ছে স্যার, তবু শিওর হওয়া দরকার।”

 

“বুঝলাম, কিন্তু সেটা হবেন কী করে?”

 

“ইন্দ্রবাবু তো বটেই, কিন্তু আরও কিছু লোকের সঙ্গে কথা বলা দরকার স্যার, যাঁরা অশোকবাবুকে চিনতেন। এই দেখুন না, মিস সীমার সঙ্গে দেখা না হলে একটা ইম্পর্টেন্ট জিনিস মিস করে যেতাম। ও আরেকটা জিনিস মিস সীমা বললেন, যেটা ওঁর কাছে ভেরি কনফিউসিং।”

 

“কী?”

 

“অশোকবাবু যেদিন মারা যান, সেদিন বিকেলে উনি মিস সীমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন। সীমাকে পাননি, কিন্তু ভয়েস মেল-এ একটা মেসেজ রেখেছিলেন। মেসেজটা ছিল—‘তুমি বিশ্বাস করবে না, আজ কী হয়েছে! আই ‘হিট দ্য জ্যাকপট’! ফোন কোরো। মিস সীমা সেদিন মেসেজ চেক করেননি। যখন চেক করলেন, অশোকবাবু আর নেই। ইনফ্যাক্ট স্যার, মিস সীমা জানতেনও না যে অশোকবাবু টাকা নিয়ে সমস্যায় ভুগছিলেন।”

 

“ইন্টারেস্টিং,” আমি বললাম, “এখন তো মনে হচ্ছে স্ট্যাম্পটা অশোকই চুরি করেছিলেন। যখন স্ট্যাম্পটা সরিয়েছিলেন তখন তার আসল মূল্য বোঝেননি। যখন জানতে পারলেন, তখন ‘হিট দ্য জ্যাকপট’ই বটে।”

 

“সেটাই তো মনে হচ্ছে স্যার, অন্য কোনও এক্সপ্লানেশন যদি না থাকে।”

 

“আরেকটা এক্সপ্লানেশন থাকতে পারে। উনি পোকার খেলতে বসে বিগিনার্স লাকে বিরাট অঙ্ক জিতেছিলেন। ইন্দ্রবাবু ওঁর জেতার কথাটা বলেছিলেন, কিন্তু এক পয়সা দুপয়সার খেলা বলে কথাটায় কেউ আমল দিইনি।”

 

“কিন্তু ইন্দ্রবাবু তো বলেছিলেন সেটা দিন কুড়ি আগের ঘটনা!”

 

“ইন্দ্রবাবু যে সত্যবাদী যুধিষ্ঠির সেটা ধরছেন কেন? মনে নেই উত্তরটা দিতে ওঁর একটু ইতস্ততঃ ভাব ছিল।”

 

“না স্যার, ওটা এক্সপ্লানেশন হতে পারে না। জিতে থাকলেও সেটা অন্তত এক সপ্তাহ আগের ব্যাপার। বৃহস্পতিবার বিকেলে খবরটা মিস সীমাকে দেবেন কেন?”

 

“দ্যাটস ট্রু,” এই সিম্পল জিনিসটা খেয়াল করিনি ভেবে একটু লজ্জিতই হলাম।

 

“পুরো ব্যাপারটাই কনফিউসিং,” চোখটা বুজে অস্পষ্ট স্বরে একেনবাবু বললেন।

 

“আমার আরেকটা একটা জিনিস মনে হচ্ছে যার সঙ্গে পোকার বা গ্যাম্বলিং কোনো কিছুরই সম্পর্ক নেই।”

 

“কী স্যার?”

 

“মনে আছে ইন্দ্র বলেছিলেন, সীমা বিয়ে করতে চাপ দিচ্ছিলেন বলে অশোক পিছিয়ে গিয়েছিলেন?”

 

“নিশ্চয় আছে স্যার।”

 

“কেন পিছিয়ে গিয়েছিলেন?”

 

“কে জানে স্যার, হয়তো এত তাড়াতাড়ি বিয়ের ফাঁদে পা দিতে চাননি।”

 

“ফিজিক্যাল কোনও প্রব্লেম থাকতে পারে কি, যেমন ইম্পোটেন্সি?”

 

“বিচিত্র কিছুই নয় স্যার।”

 

“অন্য কারণও থাকতে পারে। দ্য প্রব্লেম কুড ভেরি ওয়েল বি হিজ সেক্সয়াল ওরিয়েন্টেশান। সম্ভবত ইন্দ্র আর অশোক শুধু বন্ধু ছিল না, ওদের সম্পর্ক ছিল আরও অনেক প্রাইভেট। সুতরাং ইন্দ্রকে তাড়ানো বা সীমাকে বিয়ে করা দুটোই আউট অফ কোয়েশ্চেন। কিন্তু এটা সীমাকে কী ভাবে জানাবে, সেটা অশোক বুঝতে পারছিল না।”

 

আমার এইসব কনকুশানের অবশ্য কোনো ভিত্তি নেই। বলার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলাম। একেনবাবু কিন্তু আপত্তি তুললেন না। “ইউ হ্যাভ এ পয়েন্ট স্যার, ভেরি গুড পয়েন্ট। অশোকবাবু সম্পর্কে আরও জানতে হবে। কার সঙ্গে কথা বলা যায় বলুন তো?”

 

“বেভের আন্ট মিশেলের কাছে একবার যেতে চান? আমি বেভকে অলরেডি একটা হিন্ট দিয়ে রেখেছি।”

 

“হ্যাঁ, স্যার, সে কথাই তো কাল হয়ে গেল।”

 

“তাহলে ওকে বলে একটা টাইম ঠিক করি। ভালোকথা, বেভ একটু আগে আপনার ইন্ডিয়ান কলিগদের খুব নিন্দা করছিল।”

 

“কোন কলিগ?”

 

আমি রামসুন্দর রেড়ীর গল্পটা করে, সে যে তার পুলিশ বাবাকে দিয়ে বেভকে অ্যারেস্ট করাবার ভয় দেখাচ্ছে সেটা বললাম।

 

“একজন আই.জি রেড্ডীকে আমি চিনতাম স্যার, অন্ধ্রপ্রদেশের। ঘুষখোর বলে বেশ দুর্নাম ছিল। কিন্তু যাই বলুন স্যার, ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের একজন প্রফেসরের কাছ থেকে এরকম ব্যবহার কল্পনা করা যায় না। অ্যাটেম্পটেড রেপ স্যার, মিস বেভ ফর্মালি কমপ্লেন করলে যাচ্ছেতাই কাণ্ড হবে।”

 

“নাও হতে পারে। এ বলবে এক কথা, ও বলবে আর এক কথা।”

 

“এদেশে এরকম অভিযোগ মিছিমিছি একজন লেডি করবেন কেন স্যার?”

 

“আপনিই তো বলেন, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি। চলুন, বেভের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।”

 

.

 

একেনবাবুকে নিয়ে বেভের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম।

 

“এঁর কথাই তোমাকে বলছিলাম। ইনিই অশোকবাবুর মার্ডার নিয়ে ইনভেস্টিগেট করছেন।”

 

বেভ হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “প্লিজ টু মিট ইউ।”

 

মেয়েদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে একেনবাবু গলদঘর্ম হন। “মি টু ম্যাডাম, মি টু ম্যাডাম’, বলে কোনও মতে সেটা সারলেন।

 

“তুমি তো আজ তোমার আন্টের কাছে যাচ্ছ, তাই না?” আমি বেভকে জিজ্ঞেস করলাম।

 

“ইয়েস, হাউ ডু ইউ নো?”

 

“কিশোর বলেছে। যাই হোক, ওঁকে কিন্তু একবার জিজ্ঞেস করে নেবে, আমরা যদি ওঁকে অশোক দুবে সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করি, ওঁর আপত্তি আছে কিনা?”

 

“আমার সঙ্গে একটু আগেই আন্টি মিশেলের কথা হয়ে গেছে। তোমরা কবে যাবে বল?”

 

“কালকে বিকেলে হবে না, পরশু বিকেল বা সন্ধ্যা হলে কেমন হয়? আপনি কি ফ্রি পরশু?” আমি একেনবাবুকে প্রশ্ন করলাম।

 

“আমি তো ফ্রি। কিন্তু প্রমথবাবু যদি না পারেন?”

 

“প্রমথকে আমি ম্যানেজ করব।”

 

বেভকে বললাম, “পরশু পাঁচটা নাগাদ আমরা যেতে পারি– যদি সেটা ওঁর পক্ষে কনভিনিয়েন্ট হয়।”

 

“বেশ আমি পরশুর কথাই বলব।”

 

বেভকে ধন্যবাদ জানিয়ে একেনবাবুকে বললাম, “এখন চলুন, ক্যাথি ক্যাসেলের কাছে যাওয়া যাক। আর দেরি করলে সময় মতো পৌঁছতে পারব না।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *