লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৯)

কাজের মেয়েটি ড্রয়িং রুমে ঢুকে চায়ের কাপডিশগুলো গুছিয়ে তুলে নিয়ে ফের বেরিয়ে গেল। তার একটু বাদেই ঘরে ঢুকল মালতী। ভাদুড়িমশাই তাঁর বোনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কীরে, দুপুরে কি আমাদের উপোস করিয়ে রাখবি? বারোটা বাজে, কিছু খেতে-টেতে দিবি না?”

 

মালতী বলল, “সেই কথাই বলতে এলুম। আপনাদের আর এখন বাড়ি ফিরবার দরকার নেই, এখানেই দুটি ডালভাত খেয়ে নিন। এক-টুকরো করে মাছও হয়তো দিতে পারব, তবে আগে থেকে দাদা কিছু বলেনি তো, তাই জোগাড়যন্তরও করে উঠতে পারিনি, সুতরাং বেশি-কিছু আশা করবেন না।”

 

বললুম, “আমার আর সদানন্দবাবুর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, আমরা আদৌ কিছু আশা করছি না, বাড়ি থেকে ডালভাত আমরা খেয়েই বেরিয়েছি।”

 

“বাঃ, আপনাদের নিয়ে তা হলে তো কোনও সমস্যাই নেই।” মালতী বলল, “অন্য সবাই তা হলে উঠে আসুন, খেয়ে নিয়ে তারপর আবার কাজে বসবেন।”

 

সবাই বেরিয়ে গেলেন। ঘরে রইলুম শুধু আমি আর সদানন্দবাবু। সদানন্দবাবু বললেন, “একটা কথা তো বলি-বলি করেও বলতে পারচি না, মশাই। যখনই বলতে যাচ্চি, একটা-না-একটা বাধা এসে যাচ্চে।”

 

বললুম, “খুব জরুরি কোনও কথা?”

 

“সে আমি কী করে বলব। জরুরি কি না, সে তো ভাদুড়িমশাই বুঝবেন।”

 

“ঠিক আছে, খাওয়া শেষ করে ওঁরা তা হলে ফিরে আসুন, তখনই বলবেন অখন।”

 

ওঁরা সাড়ে বারোটায় ফিরলেন। ভাদুড়িমশাই সিগারেট ধরালেন একটা। অন্যেরা টুকিটাকি কথা বলছিলেন, কিন্তু তিনি তাতে যোগ দিচ্ছিলেন না। মনে হল, তিনি একটু অন্যমনস্ক। কিছু-একটা ব্যাপার নিয়ে ভাবছেন, কিন্তু সেটা যে ঠিক কী, তা বুঝতে পারছি না।

 

কৌশিক বলল, “মামাবাবু, মিঃ চৌধুরি চলে যেতে চাইছেন। বলছেন যে, লালবাজারে ওঁর কী কাজ রয়েছে, না-গেলেই নয়।”

 

শোভন চৌধুরির দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাই নাকি শোভন?”

 

“কাজ মানে অন্য-কিছু নয়,”

 

“শোভন চৌধুরি বললেন, “সুইস ব্যাঙ্কের এই চাবিটা পেয়ে যাওয়ায় ব্যাপারটা একটু ঘুরে গেল তো, এখন এটা পুরোপুরি আমরাই হ্যান্ডল করব, নাকি সেন্টারের কোনও এজেন্সির সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে হবে, তাও তো পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারছি না। তাই ভাবছিলুম যে, চিফকে পুরো পিকচারটা এবারে দেওয়া দরকার।”

 

“পুরো পিকচার যে দেবে, নিজে সেটা ভিশুয়ালাইজ করতে পারছ?”

 

“তা আর পারছি কোথায়! টুকরো-টুকরো কয়েকটা অংশ দেখছি মাত্র, তাও সেগুলি যে কীভাবে কো-রিলেটেড, সেটা ধরা যাচ্ছে না।”

 

“এদিকে তিন-তিনজন লোককে ইতিমধ্যেই অ্যারেস্ট করে বসে আছ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাদের মধ্যে দু’জন আবার দুদে বিজনেসম্যান। তো শুধু অ্যারেস্ট করলেই তো হবে না, তাদের বিরুদ্ধে একটা কেস সাজাতে হবে, তাতে স্পেসিফিক কিছু চার্জ আনতে হবে। পুরো ছবিটা যদি ধরতে না পারো, তো সে-সব করবে কী করে?”

 

শোভন চৌধুরি চুপ করে রইলেন। অরুণ সান্যাল বললেন, “পুরো ছবি কি আপনি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছেন, দাদা?”

 

“কিছুটা কেন, পনরো আনা পেরেছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এর খানিক-খানিক আমরা সবাই জানি, বাকিটা আমার গেসওয়র্ক, বাট ওয়েল উইদিন দ্য এরিয়া অব পসিবিলিটি।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝিয়ে বলবার তো কিছু নেই। ঘটনাগুলো পরপর দেখে যাওয়া যাক, তারপর যেখানে-যেখানে দুটো ঘটনার মধ্যে কার্যকারণের সম্পর্ক খানিকটা আবছা থেকে যাচ্ছে, সেখানে-সেখানে লেট আস ড্র আওয়ার ওন্ কনক্লুশন অ্যাজ টু হোয়াট মে হ্যাভ হ্যাপেন্ড। তা হলেই দেখবে যে, গোটা ছবিটা আস্তে-আস্তে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। …একেবারে শুরুর থেকেই শুরু করি, কেমন?”

 

কৌশিক বলল, “তার মানে শনিবার সকালের সেই অ্যাক্সিডেন্ট থেকে?”

 

“না না, আরও আগে থেকে। টু বি প্রিসাইজ, প্রসাদ গুপ্তের কলকাতায় এসে দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সেস কোম্পানিতে চাকরি পাওয়া থেকে। চাকরিটা তিনি কীভাবে পেলেন? না জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে। অথচ আমরা জানি যে, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তিনি একজন জেনুইন ডিগ্রি-হোল্ডার। সুতরাং প্রশ্ন উঠবে যে, তা-ই যদি তিনি হন, তা হলে তাঁকে জাল সার্টিফিকেট দাখিল করতে হল কেন?”

 

মিস রবিনসন বললেন, “সে তো আমি কাল রাত্তিরেই আপনাকে বলেছি। যে অ্যাটাশিতে প্রসাদের সার্টিফিকেট ছিল, হাওড়া স্টেশন থেকে আমার ফ্ল্যাটে আসবার পরে গাড়ি থেকে সেটা নামানো হয়নি।”

 

“কিন্তু সেই গাড়িটা তো মিঃ প্রকাশ চৌহানের। সুতরাং, সে-রাত্তিরে অ্যাটাশিটা যদি না-ও নামানো হয়ে থাকে, পরদিনই সেটা পেয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তাও পাওয়া যায়নি। কেন? না আগের রাত্তিরে মিঃ চৌহানের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির ফলে ড্রাইভারটির চাকরি যায়, আর চাকরি ছেড়ে চলে যাবার সময় সে নাকি অ্যাটাশিটা হাতিয়ে নিয়ে সরে পড়ে। মিঃ চৌহান অন্তত এই কথাই মিস রবিনসনকে বলেছেন।”

 

মিস রবিনসন বললেন, “হ্যাঁ, মিঃ চৌহান এই কথাই পরদিন আমাকে বলেন। একই সঙ্গে এটাও বলেন যে, অ্যাটাশির সঙ্গে সার্টিফিকেটটাও গেল বটে, কিন্তু তাতে কোনও ক্ষতি হবে না। হি ওয়জ রিয়েলি ভেরি কাইন্ড! ‘

 

“দ্যাট্স হোয়াট ইউ থিংক, মিস রবিনসন।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এবারে আমার কথাটা শুনুন। আমার ধারণা, অ্যাটাশিটা যদি কেউ হাতিয়ে থাকে, তো মিঃ চৌহানই হাতিয়েছেন। …ওহে শোভন, তুমি যদি মিঃ চৌহানের আপিস আর বাড়ি ভাল করে সার্চ করো, তো জেনুইন সার্টিফিকেট সমেত অ্যাটাশিটা সম্ভবত সেখানেই পেয়ে যাবে। তা এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কাজ মিঃ চৌহান করলেন কেন? উত্তরে আপনারা কে কী বলবেন জানি না, তবে আমার বিশ্বাস, এর পিছনে তাঁর একটা মতলব ছিল। তিনি চাইছিলেন যে, প্রসাদ গুপ্ত একটা জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরিতে ঢুকুক। … মিস রবিনসন, জাল সার্টিফিকেটের পরামর্শটা তো তাঁরই, তাই না?”

 

“হ্যাঁ তাঁরই। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য মোটেই খারাপ ছিল না। হি ওয়াজ জাস্ট ট্রায়িং টু হেলপ্ প্রসাদ আউট।”

 

“আবার সেই একই কথা বলি, দ্যাটস হোয়াট ইউ থিংক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণাটা কিন্তু অন্যরকম। আমি বলব, হি ওয়াজ নট হেলপিং প্রসাদ, হি ওয়াজ জাস্ট ট্রাইং টু গেট দ্যাট পুয়োর ফেলো হোয়ার হি ওয়ান্টেড হিম টু বি। প্রসাদকে তিনি নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছিলেন। যাতে কিনা প্রসাদকে তিনি ইচ্ছেমতো ব্ল্যাকমেল করতে পারেন। সার্টিফিকেটটা যে জাল, সেটা ফাঁস করবার ভয় দেখিয়ে তাকে দিয়ে এমন সমস্ত বে-আইনি কাজ করিয়ে নিতে পারবেন, যা কিনা আন্ডার নর্মাল সার্কামস্ট্যান্সেস প্রসাদ গুপ্তকে দিয়ে — কিংবা ফর দ্যাট ম্যাটার অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যেত না।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “এ-ক্ষেত্রে তিনি একটা কাজের ভার দিয়ে তাঁরই পাসপোর্টে প্রসাদ গুপ্তকে বিদেশে যেতে বাধ্য করলেন। প্রথমত, এইভাবে যাওয়াটাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দ্বিতীয়ত, যে-কাজের ভার দিয়ে প্রসাদ গুপ্তকে পাঠানো হচ্ছিল, সেটাও যে আইন-মোতাবেক কাজ নয়, তা তো এই চাবিটা সম্পর্কে আপনি যা বললেন, তার থেকেই বুঝতে পারছি।”

 

কৌশিক বলল, “একটা কথা বুঝতে পারছি না, মামাবাবু। বে-আইনি কাজ করবার জন্যে যাকে পাঠানো হচ্ছে, তাকে তো জেনুইন পাসপোর্টেও পাঠানো যেত। প্রসাদ গুপ্তের ক্ষেত্রে জাল পাসপোর্ট দরকার হল কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দুটো কারণে দরকার হয়ে থাকতে পারে। প্রথমত, পাসপোর্ট আপিস থেকে একটা পাসপোর্ট বার করতে যে সময় লাগে, প্রসাদ গুপ্তের ক্ষেত্রে ততটা সময় দেবার উপায়ই হয়তো মিঃ চৌহানের ছিল না। হয়তো তাঁর এমন কথা মনে হবার কারণ ঘটেছিল যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লন্ডন থেকে টাকাটা নিয়ে সুইস ব্যাঙ্কে জমা রাখা দরকার, নয়তো ব্যাপারটা ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটাও সম্ভব যে, লন্ডনের যে পার্টির কাছে টাকাটা পাওয়া যাবে, খোদ মিঃ চৌহান ছাড়া অন্য-কারও কাছে অত টাকা হ্যান্ড ওভার করতে তারা রাজি ছিল না। ফলে, চটপট আর-কাউকে চৌহান সাজিয়ে লন্ডনে পাঠাবার দরকার হয়।”

 

কৌশিক বলল, “কিন্তু মিঃ চৌহান নিজেই তো লন্ডনে যেতে পারতেন। তা কেন যাননি?”

 

“বাঃ, তাতে ঝুঁকি ছিল না? বে-আইনিভাবে পাউন্ড কি ডলার নিয়ে সুইস ব্যাঙ্কে রাখা হচ্ছে, এটা জানাজানি হয়ে যাবার ভয় নেই? সরকার জানলে ধরা পড়বার ঝুঁকি, আর ব্যাবসার পার্টনার জানলে মারা পড়বার ঝুঁকি। আমার ধারণা, চৌহান তাঁর পার্টনারকে ফাঁকি দিয়ে টাকাটা নিচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর সন্দেহ হয় যে, পার্টনার তার আঁচ পেয়েছে। ফলে তিনি নিজে না-গিয়ে প্রসাদ গুপ্তকেই চৌহান সাজিয়ে বিলেতে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন। অর্থাৎ অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজের মতলব হাসিল করতে চান।”

 

মিস রবিনসন বললেন, “ওহ্ নো, আপনি যা বলছেন, তা ঠিক নয়। প্রসাদকে যে-ভাবে বিদেশে পাঠানো হচ্ছিল, সেটা বে-আইনি হতে পারে, কিন্তু মিঃ চৌহানের মতলব মোটেই খারাপ ছিল না। আমার সঙ্গে প্রসাদের সম্পর্কের কারণেই হোক, কিংবা তার কথাবার্তায় খুশি হয়েই হোক, হি হ্যাড ইনডিড টেক্ন আ ফ্যানসি ফর প্রসাদ। এমন কথাও তিনি প্রসাদকে বলেছিলেন যে, ফরেন থেকে যাতে ও একটা কোর্স করে আসতে পারে, তার জন্যে বছর দুয়েকের জন্য প্রসাদকে তিনি বিলেতে পাঠাবেন। অ্যান্ড অল এক্সপেন্সেস উড মি বোর্ন বাই হিম। শুধু তার আগে দিন সাতেকের জন্যে বিদেশে গিয়ে মিঃ চৌহানের একটা কাজ সে করে দিয়ে আসুক।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজটা কী, তা আপনি জানতেন?”

 

“আমি জানতুম, সে একটা এগ্রিমেন্ট সই করতে যাচ্ছে। এখন যা শুনছি, মানে ওই বে-আইনি সুইস ব্যাঙ্কে টাকা রাখা, না না, সে-সব আমি জানতুম না।”

 

“অথচ সেটা না-জেনেও প্রসাদকে আপনি চিঠি লিখে চাপ দিচ্ছিলেন যে, পিসির কথামতো সে যেন বিলেতে যায়। অর্থাৎ প্রকাশ চৌহান যেখানে সব জেনেশুনে প্রসাদ গুপ্তকে একটা বিশাল ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিলেন, আপনিও সেখানে আনউইটিংলি সেই একই কাজ করেছেন। না, মিস রবিনসন, প্রসাদ গুপ্তের মৃত্যুর দায় কিন্তু আপনিও এড়াতে পারেন না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “পিসি মানে চিঠিতে যে পিসির কথা লেখা হয়েছিল, তিনি?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ, তিনিই। তবে তিনি মহিলা নন, পুরুষ। পিসি মানে পি. সি. অর্থাৎ প্রকাশ চৌহান।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *