লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১২)

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইলেকট্রিক্যাল গুডসের কোম্পানিতে প্রসাদ গুপ্ত যে মাত্র মাসখানেক কাজ করেছিল, মিঃ ভার্গব তা তোমাকে বলেছেন, শোভন। লোকটা গত জানুয়ারিতে ওখানে কাজে ঢোকে, আর ফেব্রুয়ারিতে…মানে গত মাসে তার চাকরি যায়। কেন যে তাকে বরখাস্ত করা হয়, তাও তুমি জানো।”

 

“জানি, মানে মিঃ ভার্গব যা বলেছেন, তা-ই জানি।” শোভন চৌধুরি বললেন, “লোকটা নাকি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নয়, জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরি করতে ঢুকেছিল। অন্যান্য যে-সব কাগজপত্র…মানে টেস্টিমোনিয়াল ইত্যাদি দেখিয়েছিল, তাও জাল।”

 

“কোনও চিঠিপত্রের কথা মিঃ ভার্গব তোমাকে বলেননি, কেমন?”

 

“চিঠিপত্র? কই, না তো।”

 

“প্রসাদ গুপ্তকে তাড়িয়ে দেবার পর তার টেবিলের টানায় গোটাকয় চিঠি পাওয়া যায়। লভ-লেটার। মিঃ ভার্গবের কাছ থেকে সেগুলি আমি নিয়ে এসেছি। কোনও মেয়ের লেখা, তবে নাম-ঠিকানা নেই।”

 

“ভূতুড়ে ফোন এ-ই করছে না তো?”

 

“তা আমি কী করে বলব।” চিঠির প্যাকেটটা শোভন চৌধুরির হাতে তুলে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “পড়ে দ্যাখো। আমার বয়েস হয়েছে, এ-সব প্রেমপত্রের ভাষা বোঝা আমার কর্ম নয়। তুমি হয়তো বুঝতে পারবে।”

 

আজ বুধবার। সকাল দশটার মধ্যেই আমরা সবাই কাঁকুড়গাছির আকাশ-বিহারে এসে জমায়েত হয়েছি। বাসন্তী প্রথমটায় আসতে চাইছিল না, পরে মালতী তাকে ফোন করায় সে মত পালটায়। আর সদানন্দবাবু যে এসেছেন, তা না-বললেও চলে। ভদ্রলোকের এই একটা ব্যাপার দেখছি। এমনিতে একটু ভিতু প্রকৃতির মানুষ, ঝুট-ঝামেলা থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকেন, কিন্তু অন্য দিকে আবার এ-সব ব্যাপারে বেজায় কৌতূহল, তাই না-এসেও পারেন না।

 

আসবার সময় বিমল বরাটের খোঁজটাও করে এসেছি। বিমল তার বাড়ি থেকে কাল সকালে যাও-বা বাজার করতে বেরিয়েছিল, দুপুর থেকে রাত বারোটার মধ্যে পাঁচ-ছ’টা উড়ো ফোন পেয়ে সে আর তার সদর দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে রাস্তায় নামছে না। ফোনে তাকে শাসানো হচ্ছে যে, প্রিন্টগুলো সে বিক্রি করেছে, এই খবর তাদের অজানা নয়, তবে নেগেটিভগুলো যেন সে কিছুতেই হাতছাড়া না করে। করলে নাকি তার মৃত্যু একেবারে অবধারিত।

 

“কিন্তু প্রিন্টের সঙ্গে নেগেটিভও তো তুমি ভাদুড়িমশাইকে দিয়ে দিয়েছ।”

 

বিমল রাস্তায় বেরোয়নি, বৈঠকখানা ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। বলল, “তা দিয়েছি বটে, তবে স্বীকার করিনি।”

 

বললুম, “বুদ্ধির কাজ করেছ। ওটা স্বীকার কোরো না।”

 

“কিন্তু নেগেটিভগুলো তো ওরা কিনতে চাইছে। ওদের ঠেকাব কী করে?”

 

“বলবে যে, ওগুলো পুড়িয়ে ফেলেছ। …আর হ্যাঁ, ভাদুড়িমশাইয়ের কথাটা মনে রেখো। বাড়ি থেকে এখন কয়েকটা দিন না বেরুনোই নিরাপদ।”

 

কথাটা বিমলকে বলবার দরকার ছিল না। আমার কথা শেষ হতে-না-হতেই সে জানলা বন্ধ করে দেয়।

 

গাড়িতে ফিরে এসে সদানন্দবাবু বললেন, “নেগেটিভগুলোর জন্যে ওরা এত ঝুলোঝুলি করচে কেন?”

 

ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে বললুম, “করাই তো স্বাভাবিক। আদালতে প্রিন্টগুলোকে এভিডেন্স হিসেবে দাখিল করা হবে, শুনলেন না? তা সত্যিই যদি ওর মধ্যে ওদের ক্রাইমের কোনও প্রমাণ থাকে, তো ওরা বলবে যে, ফোটোগ্রাফগুলো জাল। কিন্তু প্রিন্টের সঙ্গে নেগেটিভও যদি প্রোডিউস করা হয়, তা হলে সেটা বলা শক্ত হবে।”

 

শোভন চৌধুরির পত্র-পাঠ শেষ হয়েছিল। চিঠি থেকে চোখ তুলে তিনি যখন ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন, তখন তাঁর মুখেচোখে কোনও ভাবান্তর দেখলুম না। বললেন, “একটা মেয়ে একটা ছেলের প্রেমে পড়েছে। ফলে তার মনে হচ্ছে যে, এমন ছেলে ভূ-ভারতে আর দ্বিতীয়টি জন্মায়নি। বিয়েটা হয়ে গেলে অবশ্য বুঝতে পারত যে, যাকে সে ভগবানের বাচ্চা বলে ভাবছে, আসলে সে একটি পাক্কা জালিয়াত। কিন্তু চিঠিটা যখন লেখে, তখন সে জানত না। তাই বিয়ে করবার জন্যে খেপে গিয়েছিল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুধু এইটুকুই বুঝলে? আর-কিছু না?”

 

“আর কী বুঝব?”

 

“বিয়েটা হচ্ছিল না কেন, অন্তত সেটা তো বোঝা উচিত।”

 

শোভন চৌধুরি হেসে বললেন, “হচ্ছিল না মেয়েটার দজ্জাল পিসির জন্য। পিসি শুনেছে যে, পাত্র ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু শুধু এইটুকুতে তাঁর মন ওঠেনি। ভাইঝির জন্যে তিনি বিলেত-ফেরত পাত্র চান। চিঠিগুলো পড়ে অন্তত সেইরকমই আমার মনে হল।”

 

“ঠিকই মনে হয়েছে।” শোভন চৌধুরির কাছ থেকে প্যাকেট ফেরত নিয়ে এবারে সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন কিরণবাবু, এবারে আপনি এগুলো পড়ে দেখুন।”

 

মিঃ ভার্গব বলেছিলেন খান তিন-চার চিঠি। প্যাকেট খুলে দেখলুম মোট পাঁচখানা। কোনওটার দৈর্ঘ্যই দশ-বারো লাইনের বেশি নয়। প্রতিটি চিঠিই উচ্ছ্বাসে ভরা, শুধু শেষের চিঠিটা বাদে। সেটা এখানে তুলে দিচ্ছি :

 

“পিজি, পরশু রাত্তিরটা তোমার সঙ্গে কাটিয়ে ওই যে বাড়ি ফিরলুম, তখন থেকে মাত্র একটা চিন্তাই ভর করেছে আমার মাথায়। আমি বুঝতে পেরে গেছি যে, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। পিসিকে সে-কথা আমি বলেওছি। সে যে তা বোঝে না, তাও নয়। কিন্তু তার ওই এক ধনুর্ভঙ্গ পণ, তোমাকে বিলেত যেতে হবে। নাকি এখানকার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির কোনও দাম নেই, যত দাম বিলিতি ডিগ্রির। কী করব বলো, মা আছেন বটে, তবে বাবার মৃত্যুর পর থেকে পিসিই আমার গার্জেন। আমি বলি কী, এত করে যখন বলছে, আর খরচও যখন ও-ই দেবে, তখন আর আপত্তি কোরো না। তার আগে অবশ্য বিয়েটা আমরা গোপনে সেরে ফেলব। কিচ্ছু ভেবো না, তুমি রওনা হবার মাস তিন-চার বাদে আমি ঠিকই লন্ডনে গিয়ে জয়েন করব তোমার সঙ্গে। … ডিয়ার।”

 

চিঠি পড়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি কী বুঝলেন কিরণবাবু?”

 

বললুম, “শোভনবাবু যা বুঝেছেন, তার বেশি কিছু বুঝিনি। মেয়েটা বিয়ের জন্য খেপে উঠেছিল, কিন্তু পিসির জন্যে বিয়েটা করতে পারছিল না। বিয়েতে যে পিসির পুরোপুরি অমত ছিল, তা অবশ্য মনে হয় না। তবে হ্যাঁ, পিসি চাইছিল যে, পাত্র ইতিমধ্যে বিলেত থেকে একটা ডিগ্রি কি নিদেন একটা ডিপ্লোমা নিয়ে আসুক; তা, সেটা তো অস্বাভাবিক কোনও ব্যাপার নয়। এমন তো কত লোকেই চায়। তা ছাড়া, বিলেত গিয়ে পড়াশুনো করবার খরচটা যে পিসিই দিয়ে দিত, চিঠিতে তো তাও স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে।”

 

অরুশ সান্যাল বললেন, “দেখুন দাদা, চিঠিগুলো তো আমিও পড়েছি, তা সত্যি কথাটা বলি, এই পিসির মতলব আমার মোটেই সুবিধের ঠেকছে না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন?”

 

“কী জানেন, পিসিটি বোধহয় আ বিটার ওল্ড মেড। নিজে হয়তো প্রেম-ট্রেম করে দাগা খেয়েছিল, সেই থেকে পুরুষ-জাতটার ওপরে খেপে আছে, কেউ যে বিয়ে করে সুখী হতে পারে, তা আর ভাবতেই পারছে না।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “বিচিত্র নয়। আমিও এই রকমের বিটার ওল্ড মাসি-পিসি দু’চারটে দেখেছি। বিয়ের নাম শুনলেই তারা খেপে যায়।”

 

চিঠিগুলো ভাদুড়িমশাইকে ফিরিয়ে দিয়েছিলুম, শোভন চৌধুরির কথা শুনতে-শুনতে তিনি সেগুলো আবার প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঢোকানো আর হল না, সদানন্দবাবু প্রায় ডুকরে উঠে বললেন, “বাঃ, আমি একবার দেকব না?”

 

“তাই তো,” ভাদুড়িমশাই চিঠিগুলোকে সদানন্দবাবুর দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, “ছি ছি, বড্ড ভুল হয়ে যাচ্ছিল। আপনারই তো দেখা হয়নি। নিন্, ভাল করে দেখুন। দেখে বলুন, আপনার কী মনে হয়। বন্ধু ঘোষের ছেলের ব্যাপারটায় আপনি যা বলেছিলেন, দ্যাট পুট মি অন দ্য রাইট ট্র্যাক। দেখুন এবারেও যদি সেইরকমের কিছু বলতে পারেন।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের এই একটা মস্ত গুণ। সদানন্দবাবুর ব্যাপারে এমনভাবে কথা বলেন যে, তাঁর মনে হয়, যে-সব মতামত তিনি দেন, রহস্য সমাধানে সত্যিই যেন সেগুলো খুব কাজে লাগছে। কিন্তু তার ফল হয়েছে এই যে, সদানন্দবাবু আর আজকাল আমাকেও বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না। চিঠিগুলোর উপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে তিনি বললেন, “একটা কথা আপনারা বোধহয় বুঝতে পারেননি।”

 

কৌশিক বলল, “কী বুঝতে পারিনি বলুন।”

 

“এই পিজির ব্যাপারটা। আমার মনে হয়, এই পিজি হচ্ছে প্রসাদ গুপ্ত। প্রসাদের পি, আর গুপ্তের জি। মানে সংক্ষেপে ওটাই দাঁড়াচ্ছে।”

 

হাসি চেপে বললুম, “আরে মশাই, সেটা আমরা সবাই বুঝেছি। কিন্তু প্রসাদ গুপ্তের এই ডিয়ারটি কে?”

 

প্রশ্ন শুনে সদানন্দবাবু খানিকক্ষণ একেবারে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর বললেন, “প্রসাদ গুপ্তের ডিয়ার কে, তা আমি কী করে বলব? আমি যদি প্রসাদ গুপ্ত হতুম, তা হলে বলতে পারতুম।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “যদি বলি, ওটা ডিয়ার নয়, নাম আর পদবির আদ্যক্ষর ডি. আর. তা হলে পারবেন?”

 

এটা অবশ্য আমার মাথায় খেলেনি। শোভন চৌধুরি, অরুণ সান্যাল আর কৌশিকের মাথাতেও খেলেছে বলে মনে হল না। কৌশিক বলল, “ডি. আর. তো কত কিছুই হতে পারে। দেবশ্রী রায় হতে পারে, দীপালি রাউথ হতে পারে, দময়ন্তী রাজগুরু হতে পারে, দীপান্বিতা রুদ্র হতে পারে, দোলনচাঁপা রক্ষিত হতে পারে, দাক্ষায়ণী রাহা হতে পারে…”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “থাম্ থাম্, আমার মাথা ঘুরছে!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী সদানন্দবাবু, ডি. আর. থেকে আপনার কী মনে হয়?

 

সদানন্দবাবু বললেন, “পিজির প্রবলেমটা তো আমি সল্ভ করে দিয়েচি, এখন ডি. আর. নিয়ে যে প্রবলেম, সেটা এঁয়ারা পাঁচজনে মিলে সল্ভ করুন।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “সল্ভ করবার কিছু নেই। ওর থেকে কোথাও পৌঁছনো যাবে না। ঠিকানা থাকলে এক্ষুনি গিয়ে ধরতুম। কিন্তু তা তো নেই। স্রেফ হ্যান্ডরাইটিং মিলিয়ে এখন কাকে গিয়ে ধরব?”

 

চা এসে গিয়েছিল। সেইসঙ্গে এই নোটিস যে, যতই চেঁচামেচি করি না, থার্ড রাউন্ড চা পাওয়া যাবে না, রান্নাবান্না মোটামুটি হয়ে গেছে, ঠিক বারোটায় খাবার ডাক পড়বে।

 

অরুণ সান্যালের দিকে তাকিয়ে কৌশিক বলল, “ব্যাপার কী বলো তো বাবা, মায়ের মেজাজ এত মিলিটারি হয়ে গেল কেন? আগে তো এত অর্ডার ঝাড়তে দেখিনি।”

 

অরুণ সান্যাল হেসে বললেন, “অর্ডারটা তোদের জন্যে নয়, আমার জন্যে। তোরা চা খেলে যদি আমিও এক কাপ চেয়ে বসি, তাই ব্ল্যাঙ্কেট ব্যান জারি হয়ে গেল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মালতী যা করেছে, ঠিকই করেছে। কদিন ধরে সত্যিই তো দেখছি যে, চা তুমি একটু বেশিই খাচ্ছ। সিগারেট ছেড়েছ, আর চায়ের মাত্রা একটু কমিয়ে আনতে পারছ না?”

 

“সবই যদি ছেড়ে দিই তো কী নিয়ে থাকব বলুন? বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই তা হলে চলে যাবে!” কথাটা অরুণ এতই দুঃখিত গলায় বললেন যে, শুনে মনে হল, অরুণ সান্যালের নাম করুণ সান্যাল হলেও সেটা মোটেই বেমানান হত না।

 

সদানন্দবাবু বললেন, “মানুষ কি শুধু চা খাবার জন্যেই বেঁচে থাকে নাকি? লুক অ্যাট মি, আমি তো এখানে এসে সেকেন্ড রাউন্ডের চা’ও খাইনি। বাড়ি থেকে বেরুবার আগে এক কাপ খেয়েচি আর এখানে এসে এক কাপ খেলুম। বাস্, এ-বেলার মতো আমার চা খাওয়া হয়ে গেল। থার্ড কাপ খাব বিকেলে বাড়ি ফিরে। দিনে তিন কাপ, ওই হচ্চে আমার লিমিট, এর নড়চড় হবার জো নেই।”

 

অরুণ সেই আগের মতোই দুঃখিত গলায় বললেন, “আপনার কথা আলাদা। ওই রকমের মনোবল কি সকলের থাকে?”

 

“না, থাকে না।” সদানন্দবাবু বললেন, “এই কিরণবাবুর কথাই ধরুন না কেন, দিনে বোধহয় তা অন্তত পঁচিশ-তিরিশ কাপ চা খান। ছি ছি, একদম মনোবল নেই।”

 

বললুম, “মোটেই আমি পঁচিশ-তিরিশ কাপ খাই না। মেরেকেটে পনেরো-কুড়ি কাপ হয়তো হবে। তাও দুধ-চিনি না দিয়ে।”

 

“দুধ-চিনি যে খান না, সেটা ভালই করেন। কিন্তু লিকারই বা পনেরো-কুড়ি কাপ খাবেন কেন? একটু ডেটারমিনেশানের পরিচয় দিন তো। ঘুম থেকে উঠে নিজেকে বলুন, কিছুতেই নয়, মরে গেলেও নয়, কভি নেহি!”

 

কৌশিক বলল, “ঘুম থেকে উঠে লোকে কত ভাল-ভাল প্রতিজ্ঞা করে, আর কিরণমামা, আপনি কিনা পনেরো-কাপ চা খাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করবেন?”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “আর তা ছাড়া, বছরের যে-কোনও সময়ে কি হুট করে ওই রকমের প্রতিজ্ঞা করতে হয়? প্রতিজ্ঞা করবার একটা সময় আছে না? ওটা নিউ ইয়ার’স ডে-তে করতে হয়। এখন তো মার্চ চলছে, আর মাত্তর ন’টা মাস। তারপরেই নতুন বছর এসে যাবে। আমি বলি কী, ওটা ফার্স্ট জানুয়ারির জন্যে তোলা থাক।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তার মানে আপনাদের ডেটারমিনেশান নেই। এই করেই তো বাঙালি জাতটা মরতে বসেচে!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাচ্চলে, কাজের কথাই তো চাপা পড়ে গেল।”

 

মালতী এসে বলল, “উঠে পড়ুন, আপনাদের খাবার দেওয়া হয়েছে।”

 

সদানন্দবাবু মনে হল এই ডাকটার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। পাঞ্জাবির আস্তিন গুটিয়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বললেন, “কাজের কথা খাওয়ার পরে হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *