(১১)
মঙ্গলবার। আপিসে বসে কাজ করছি, এই সময়ে ভাদুড়িমশাইয়ের ফোন এল। “একটার সময় লালবাজারে শোভন চৌধুরির কাছে যাচ্ছি। আপনি ওখানে চলে আসতে পারবেন?”
“অসম্ভব।”
“কেন, খুব কাজ বুঝি?”
ঢোক গিলে বললুম, “না না, কাজের কথা হচ্ছে না।”
“তা হলে?”
“আসলে ব্যাপারটা কী জানেন, অন্য একটা অসুবিধে রয়েছে। …মানে অসুবিধেটা আমাদের নয়, ওই তরফের।”
“সেটা আবার কী কথা হল?”
“ভিতরের কয়েকটা খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পুলিশ একটু অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। হুটহাট ওখানে গিয়ে এই যে আমরা এর-ওর-তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করি, এটা আর তাই ওখানকার কর্তাদের বিশেষ পছন্দ নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদের সোর্সগুলি কি এই করে ওরা প্লাগ করে দিতে পেরেছে?” বললুম, “তাই কখনও পারে?”
ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “ঠিক আছে, তা হলে আর ওখানে আপনাকে যেতে বলছি না। দুটোর সময় স্টিভন হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকুন। লালবাজার থেকে বেরিয়ে ওখানে আপনার সঙ্গে মিট করব।”
হাতে বেশ কিছুটা সময় নিয়েই আপিস থেকে বেরোলুম বটে, কিন্তু পথে একটা মিছিল বেরিয়েছিল, ফলে স্টিভন হাউসের সামনে পৌঁছতে পৌঁছতে মিনিট কয়েক দেরি হয়ে যায়। ভাদুড়িমশাই দেখলুম ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ঘন-ঘন ঘড়ি দেখছেন। বললুম, “একটু দেরি হয়ে গেল।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “একটু নয়, পুরো সাত মিনিট। গাড়ি নিয়ে বেরোননি নিশ্চয়?”
বললুম, “গাড়ি নিয়ে বেরুলে পার্ক করবার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে আরও দেরি হয়ে যেত। আপনার গাড়িটা কোথায় রাখলেন?”
“লালবাজারের ভিতরে। চলুন, কোথাও বসা যাক।”
রাস্তা পার হয়ে ব্রেবোর্ন রোডে ঢুকে খানিক এগিয়ে একটা মাদ্রাজি কফিখানা পাওয়া গেল। ছোট্ট একফালি দোকানঘর, খানিক আগে এলে এখানে নিশ্চয়, বসবার তো দূরের কথা, দাঁড়াবার জায়গাটুকুও পাওয়া যেত না। তবে এখন প্রায় আড়াইটে বাজে, টিফিন আওয়ার খানিক আগেই শেষ হয়ে গেছে, আপিসের বাবুদের সেই ভিড়ও তাই নেই। দু’পাত্র কফির অর্ডার দিয়ে আমরা পিছনের দিকের একটা টেবিলে গিয়ে বসলুম। বললুম, “কী ব্যাপার? কোনও খবর আছে?”
“তা তো আছেই। স্টেনলেস স্টিলের পেয়ালা থেকে কানা-উঁচু পিরিচে কফি ঢালতে ঢালতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রথম খবর, ইয়োর ফ্রেন্ড বিমল বরাট ইজ আ গ্রেট ফোটোগ্রাফার। ব্লো-আপ করার পরে সেই ছবিখানার একটা পার্টিকুলার পোরশন যা এসেছে, সে আপনি ভাবতেও পারবেন না।”
“পার্টিকুলার পোরশন মানে ওই যেখানে পার্ক-করা গাড়িগুলো পরপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই অংশটা তো?”
“রাইট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইউ হ্যাভ টু সি ইট টু বিলিভ ইট। ডিটেলগুলো একেবারে নিখুঁতভাবে এসে গেছে। …তো এটা হচ্ছে প্রথম খবর।”
“আর দ্বিতীয় খবর?”
“শোভন কাল যে ইলেকট্রিক্যাল গুডস কোম্পানির কথা বলল, মানে ওই যেখানে প্রসাদ গুপ্ত কাজ করত, তার নাম-ঠিকানা কিছুই তো কাল জেনে রাখা হয়নি। শুধু শুনেছিলুম যে, এই ব্রেবোর্ন রোডেই তাদের আপিস। তো সেখানে আজ একবার যাব।”
“নাম-ঠিকানা জেনে নিয়েছেন?”
“তা না-জানলে সেখানে যাব কী করে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোম্পানির নামটা হচ্ছে দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সেস প্রাইভেট লিমিটেড।”
“আর ঠিকানা?”
“সেটাও এনেছি, কিরণবাবু, তা নিয়ে চিন্তা করবেন না।” ভাদুড়িমশাই তাঁর পকেট থেকে এক চিলতে কাগজ বার করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। “নিন, এবারে কফিটা শেষ করে উঠে পড়ুন।”
টাইপ-করা ঠিকানা। নম্বর দেখে মনে হল, টি-বোর্ডের আপিসের কাছাকাছিই হবে। কার্যত দেখলুম, ঠিক তা-ই। আপিসটা যে এত বড়, সেটা অবশ্য ভাবিনি। শুধু বড় নয়, বেশ সাজানো-গোছানোও বটে। আমরা যে একটা তদন্তের কাজে এসেছি, এইটে শুনে ম্যানেজার মিঃ ভার্গবের ভুরু একটু কুঁচকে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্ত পরক্ষণেই ভাদুড়িমশাই যখন বললেন যে, আমরা ইনকাম ট্যাক্সের লোক নই, স্রেফ প্রসাদ গুপ্ত সম্পর্কে একটা রুটিন-তদন্তে এসেছি, তখন আবার তাঁর ভুরু দুটো চটপট সিধে হয়ে গেল। বললেন, “সে-বিষয়ে তো লালবাজারের মিঃ শোভন চৌধুরির সঙ্গে কালই আমার কথা হয়ে গেছে। আমি যা জানি সবই বলেছি। এখন আবার নতুন করে কী বলব?”
ভাদুড়িমশাই যে শোভন চৌধুরির কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে এসেছেন, তা জানতুম না। এবারে পকেট থেকে চিঠিটা বার করে মিঃ ভার্গবের দিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, “চিঠিটা দয়া করে পড়ে দেখুন।”
মিঃ ভার্গব চিঠিটা পড়ে বললেন, “এতে তো আপনার সঙ্গে কো-অপারেট করতে বলা হচ্ছে।”
ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “তা যদি করেন, তা হলে ইট মে সেভ ইউ আ লট অব ট্রাবল আফটারওয়ার্ডস।”
“কিন্তু কীভাবে কো-অপারেট করব, তা-ই তো বুঝতে পারছি না।”
“বিশেষ কিছুই করতে হবে না। আমি গোটাকয় প্রশ্ন করব, আর আপনি তার উত্তরে যা জানেন তা-ই বলবেন।”
“বেশ,” মিঃ ভার্গব তাঁর হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, “প্রশ্ন করুন।”
“প্রসাদ গুপ্ত কবে এখানে চাকরি করতে ঢোকেন?”
“সে তো আমি কালই মিঃ চৌধুরিকে বলেছি।”
“আর-একবার বললেও কোনও ক্ষতি নেই।”
“গত জানুয়ারি মাসে।”
“কী বলে চাকরিতে ঢুকেছিলেন।”
“বলেছিলেন যে, তিনি বেনারস থেকে পাস করা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সার্টিফিকেটও দেখিয়েছিলেন। চেকিংয়ে ধরা পড়ে যে, সেটা জাল। হি ওয়াজ নট ইভন অ্যান অর্ডিনারি সায়েন্স গ্রাজুয়েট। যা-কিছু টেস্টিমোনিয়াল দেখিয়েছিলেন, তাও ভুয়ো।”
“ফলে তাঁর চাকরি যায়। কেমন?”
“রাইট। এটা গত মাসের ঘটনা। এখানকার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের চাকরিতে মাত্র একটা মাসই তিনি কাজ করেছেন।”
“চাকরি থেকে বরখাস্ত হবার চিঠি পেয়ে তিনি আপনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?”
“করেছিলেন। আমার ঘরে ঢুকে আমাকে শাসিয়েছিলেন যে, এর ফল আমার পক্ষে ভাল হবে না।”
“উত্তরে আপনি বলেছিলেন কিছু?”
“ও ইয়েস। বলেছিলুম যে, তাঁকে যে পুলিশে হ্যান্ড ওভার করা হচ্ছে না, এটাই তাঁর চোদ্দো পুরুষের ভাগ্যি। তারপরেও যখন দেখলুম যে, তিনি নড়ছেন না, তখন আই জাস্ট টোল্ড হিম টু ক্লিয়ার আউট। এটাও বলেছিলুম যে, ঘর থেকে বেরিয়ে না গেলে দারোয়ান ডেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাঁকে বার করে দেওয়া হবে।”
ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন; “এখানে তিনি কোথায় বসে কাজ করতেন?”
“আমার পাশের ঘরে।”
“পাশের ঘরে এখন কে কাজ করছেন?”
“কেউ না।” মিঃ ভার্গব বললেন, “এটা তো গত মাসের ঘটনা। এর মধ্যে আর অ্যাসিস্টান্ট ম্যানেজারের পোস্টে নতুন কাউকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়নি। ঘরটা খালিই পড়ে আছে।”
“ও-ঘরে আপিসের কাগজপত্র ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত দু-চারটে জিনিসও ছিল নিশ্চয়?”
“তা ছিল, তবে সে-সব তিনি সেইদিনই সরিয়ে নিয়ে যান। …ও হ্যাঁ, টেবিলের একেবারে নীচের ড্রয়ারে গোটা তিন-চার চিঠি ছিল। পার্সোনাল চিঠি। তাড়াতাড়ি করে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন তো, তাই চিঠিগুলোর কথা সম্ভবত মনে ছিল না। এটা অবশ্য মিঃ চৌধুরিকে জানানো হয়নি।”
“কার চিঠি জানেন?”
“কী করে জানব?” মিঃ ভার্গব বললেন, “জমাদারকে ডেকে ঘরটা পরিষ্কার করে দিতে বলেছিলুম। সে এসে ঘর সাফ-সুতরো করে তারপর ওই চিঠিগুলো এনে আমাকে জিজ্ঞেস করে যে, চিঠিগুলো সে ফেলে দেবে কি না।”
“আপনি কি ফেলে দিতে বললেন?”
“না। প্রথমে অবশ্য ফেলে দেবার কথাই ভেবেছিলুম। পরে মনে হল, সেটা ঠিক হবে না। চিঠিগুলো আমি একটা খামে পুরে রেখে দিয়েছি। একটা মেয়ের লেখা।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেগুলো একবার দেখতে পারি?”
“তা কেন পারবেন না?” মিঃ ভার্গব তাঁর চেয়ার থেকে উঠে পিছনের আলমারি খুলে একটা প্যাকেট বার করে আনলেন। তারপর ফের চেয়ারে বসে প্যাকেটটা ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখুন।”
প্যাকেট থেকে চিঠিগুলো বার করলেন ভাদুড়িমশাই। প্রথম চিঠিখানার উপরে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর বাদবাকি চিঠি না পড়ে সবগুলি ফের খামে ঢুকিয়ে বললেন, “এগুলি আপনি পড়েছেন?”
“আমি পড়িনি।” মিঃ ভার্গব হেসে বললেন, “তবে আমার স্ত্রী পড়েছেন। তিনি বাঙালি। তাঁর কাছে শুনলুম যে, ওগুলো লঙ্-লেটার। নাম-ঠিকানা নেই। মেয়েটা নাকি বিয়ের জন্য ঝুলোঝুলি করছে। তবে এক পিসির জন্যে সেটা হচ্ছে না। জালিয়াতদেরও দেখছি দিব্যি প্রেমিকা জুটে যায়!”
মিঃ ভার্গব সম্ভবত আশা করেছিলেন যে, তাঁর কথা শুনে ভাদুড়িমশাই হাসবেন। কিন্তু না, তিনি হাসলেন না। বললেন, “চিঠিগুলো আমি নিয়ে যেতে পারি?”
“স্বচ্ছন্দে। যাকে লেখা, সে তো বেঁচে নেই, সুতরাং ফিরে এসে সে আর ওগুলো ক্লেম করতে পারবে না। শুধু দেখবেন, এই যে এগুলো আপনি নিয়ে যাচ্ছেন, এর জন্যে যেন আমি আবার কোনও বিপদে না পড়ি।”
এইবারে ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “না না, সে-ভয় করবেন না। সত্যি বলতে কী, এগুলো এখানে থাকলেই হয়তো আপনাকে বিপদে পড়তে হত।”
আমরা উঠে পড়লুম। দরজা পর্যন্ত মিঃ ভার্গব আমাদের সঙ্গে-সঙ্গে এলেন। ভদ্রলোককে একটু গম্ভীর দেখাচ্ছিল। মনে হল, ভাদুড়িমশাইয়ের শেষ কথাটা তাঁকে একটু চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
রাস্তায় নেমে জিজ্ঞেস করলুম, “এখন তা হলে কোথায় যাবেন?”
“লালবাজারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেখান থেকে গাড়িটা বার করে নিয়ে আপনাকে আপনার আপিসে পৌঁছে দিয়ে কাঁকুড়গাছি ফিরব।”
“চিঠির মধ্যে কোনও ক্লু পেয়েছেন মনে হচ্ছে।
“দূর মশাই, এত তাড়াতাড়ি কি আর ক্লু পাওয়া যায়?”
“মিঃ ভার্গবকে তা হলে বললেন কেন যে, চিঠিগুলো ওখানে থাকলে ওঁকে বিপদে পড়তে হত?”
“একটু ভয় পাইয়ে দেবার জন্যে বললুম।”
কথাটা আমার বিশ্বাস হল না। কিন্তু সেটা চেপে গিয়ে বললুম, “যাক, এখন তা হলে কয়েকটা দিন কলকাতাতেই থাকছেন, কেমন?”
“থাকতেই হচ্ছে। …ও হ্যাঁ, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, দিন তিনেক ছুটি নিতে পারবেন?”
হাঁটতে হাঁটতে লালবাজারের কাছাকাছি চলে এসেছিলুম। বললুম, “তা বোধহয় পারব।”
“তা হলে কাল সকালে কাঁকুড়গাছিতে চলে আসুন। এই ধরুন দশটা নাগাদ। দুপুরের খাওয়া ওখানেই খেয়ে নেবেন। বাসন্তী যদি আসতে পারে, তো তাকেও নিয়ে আসুন।”
“বাসন্তী বোধহয় যেতে পারবে না। তবে সদানন্দবাবু তো ছাড়বার পাত্র নন, তিনি যাবেনই।”
“বেশ তো, তাঁরে ও নিয়ে আসুন। আসবার পথে বিমল বরাটের খবরটাও যদি নিয়ে আসেন, তো ভাল হয়। ভদ্রলোকের জন্যে সত্যিই একটু চিন্তায় আছি।”
“ফোটো থেকে স্পষ্ট করে কিছু বোঝা গেল?”
“যা বুঝেছি, সেই অনুযায়ী নিজেও খোঁজ নিয়েছি, শোভনকেও খোঁজ নিতে বলেছি। আমার যা ধারণা, শোভন আশা করছি কাল সকালে সেটা করোবোরেট করবে।”
“তার মানে কাল সকালে শোভন চৌধুরিও ওখানে আসছেন?”
“তা তো আসছেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যান, এখন রাস্তা পেরিয়ে স্টিভন হাউসের তলায় গিয়ে দাঁড়ান। আমি গাড়ি নিয়ে আসছি, ওখান থেকে আপনাকে তুলে নেব।”
