ল্যাংড়া পাহান (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
চার
যখন ঘুম ভাঙল, তখন অনেক বেলা। বিছানা ছেড়ে উঠে দেখি জুতো-মোজা পরেই শুয়েছিলাম। জামা-কাপড়ও ছাড়িনি। উঠেই, বন্দুকটা থেকে গুলি খুলে, মুখ হাত ধুয়ে, চান করে, পেয়ারাতলিতে এসে বসলাম।
মালী চা দিয়ে গেল।
ওকে বললাম, বুধন, সামসের, নিয়ামত এবং মংলু শিকারিদের একই সঙ্গে খবর দাও। তারা যেন এক্ষুনি সব কাজ ফেলে এখানে চলে আসে। আমার সঙ্গে নাস্তাও করবে এবং সারাদিন থাকবে। সাতদিনের রোজ আমি দেব। সাতদিন আমার কাজ আছে খুবই ওদের সঙ্গে। সব কাজ ফেলে যেন আসে। বুঝিয়ে বলবে, আমার নাম করে। আর যুগলপ্রসাদের কাছ থেকে আমার বন্দুকটাকেও নিয়ে আসতে হবে।
এই শিকারিদের ডেকে পাঠালাম, কারণ, এরা খুবই সাহসী এবং এক সময়ে আমার সঙ্গে অনেক শিকার-টিকার করেছে। এ অঞ্চলের সব জঙ্গল এদের নখদর্পণে। কিন্তু সকলেরই মাঝবয়েস হয়ে গেছে। ঘরসংসার কাজকর্ম নিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে চুরি করে হরিণ-শুয়োর-খরগোশ যে মারে না তা নয়, তবে বিপদের শিকারে আর যায় না। আমি জানি, এদের মধ্যে দুজনের লাইসেন্সড আর অন্য দুজনের আন-লাইসেন্সড গাদা বন্দুকও আছে।
আমার প্রথম কাপ চা খাওয়া শেষ হতে না হতে মালীর বউ গরম-গরম পরোটা আর মেটের চচ্চড়ি করে নিয়ে এল। কাল সারাদিনই প্রায় কিছু খাওয়া হয়নি, তা ও জানে। শিকারিদের সকলের জন্যেও নাস্তা তৈরি করতে বলে বললাম, পুরো এক পট চা দিয়ে যেতে। চা আর পাইপ খেয়ে বুদ্ধি আর সাহসের গোড়ায় ভালমতো ধোঁয়া না দিলে কালকের কোনও রহস্যই পরিষ্কার হবে না।
এখানে খবরের কাগজ-টাগজের ঝামেলা নেই। পুরো মার্কিগঞ্জে তিনজন কাগজ রাখেন। অন্যরা চেয়ে-চিন্তে পড়েন। তবে কাগজ আসেও পুরো দু দিন পর। রাঁচি থেকে অনেক ঘোরা পথে।
এক পট চা আর দু-ফিল পাইপ শেষ করার পরও যখন মালী এল না, তখন আবার ঘুমিয়ে পড়লাম পেয়ারাতলির ইজিচেয়ারে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে মালীর বউ ঘুম ভাঙিয়ে বলল, সাহাব, রেঞ্জার সাহাব আয়া।
চেয়ে দেখি, রেঞ্জার ভূপতনারায়ণ মিশ্র সামনে দাঁড়িয়ে। ওঁকে বসতে বলে, ওঁর জন্যে চা-নাস্তা আনতে বলে সোজা হয়ে বসলাম।
যুগলপ্রসাদ কেমন আছে রেঞ্জার সাহাব।
ভাল। মানে ওরকমই আছে। ওর চেয়ে খারাপ কিছু হয়নি। আমি আসলে একটা কথা বলার জন্যে এলাম। পথে, মালীর কাছে সব শুনেছি আমি। এ বাঘ আপনি মারতে পারবেন না। সকলের কপালে যা আছে, তাই-ই হবে। আপনি এখানে থাকেন না, কেন মিছিমিছি হয় পাগল হবেন, নয় মারা যাবেন? আমাদের জন্যে?
আমিও পিঠটা যথাসম্ভব চেয়ারের পেছনে করে সোজা হয়ে বসে বললাম, ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন।
রেঞ্জার মিশ্রসাহেব বললেন, এটা বনদেওতার বাঘ। একে কেউই মারতে পারবে না বোধহয়। কাছ থেকে রাইফেলের গুলি খেলেও ওর কিছু হয় না। গুলিতে বুক এ-ফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়। রক্তে বনের পথ ভেসে যায়। তারপর সিতাওন নদীতে আর একবার চান করে নেয় ও। ব্যস! সঙ্গে-সঙ্গে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। শরীরের আর কোনওই কষ্ট থাকে না। হুডকুর বাবা গুলি করেছিল একেবারে মাথায়, মাত্র পাঁচ গজ দূর থেকে।
তবু গাছে লাফিয়ে উঠে ওকে মুখে করে নিয়ে চলে গিয়েছিল সে। হুডকু’র মামা সেই গাছের উঁচু মগ ডালে বসে ছিল। তার নিজের চোখে দেখা। সেও পরদিন নিজের গ্রামে চলে গেছে। খবর এসেছে যে, সেও নাকি পাগল হয়ে গেছে।
কী যে সব গাঁজাখুরি গল্প বলেন আপনারা! এ-সব জেনে-শুনেও হুকু বা যুগলপ্রসাদ কেন গেল তাহলে ওই বাঘের কাছে? আমার সঙ্গেই বা যুগলপ্রসাদ কোন সাহসে গেল?
ওদের সাহস! যুগলপ্রসাদ একা হাতে একবার দশজন ডাকাত ঠেকিয়েছিল। তা ছাড়া ও ভূত-ভগবান মানে না। আর হুডকু গিয়েছিল তার বাবার মৃত্যুর বদলা নিতে। লাভ কী হল? একজন বোবা কালা আর একজন পাগল হয়ে গেল। এবার আপনি কলকাতা ফিরে যান বোস সাহেব। নইলে এবার কিন্তু আপনার পালা!
আমি মানি না। কিন্তু বনদেওতার বাঘ হলে এই বাঘ এমন করে মানুষ ধরে খেত না। বনদেওতার বাঘের কথা আমি নানা জায়গা থেকে শুনেছি। নিজেও একবার গুলি করেছিলাম, কিন্তু আশ্চর্যভাবে সেই ওড়িশার জঙ্গলের বাঘ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই বাঘ কখনও মানুষের কোনও ক্ষতি করেনি। কোনওদিনও না।
তা আপনি কী করবেন ঠিক করলেন? আপনাকে আমিই কাল এই বাঘ মারতে অনুরোধ করেছিলাম। আজ আমিই এসে বারণ করছি।
শিকারিদের খবর দিয়েছি। তারা আসুক। পরামর্শ করব। আচ্ছা আমাকে বলুন। তো মিশ্রসাহেব, সিতাওনের উপত্যকাতে আর কতগুলো বাঘ-বাঘিনী আছে?
রেঞ্জার সাহেব বললেন, এক এলাকায় তো একটার বেশি বাঘ সচরাচর থাকে না। তবে কখনও-সখনও খেলা করতে আসে, সংসার পাততে, অল্পদিনের জন্যে, বাঘের কাছে বাঘিনী, বাঘিনীর কাছে বাঘ। কিন্তু এখন এ জঙ্গলে পাহান ছাড়া দ্বিতীয় বাঘ নেই কোনও। কুড়ি-পঁচিশ মাইল এলাকার মধ্যেই নেই। আমার ফরেস্ট গার্ডরা তা হলে আমায় জানাত। কোনও বাঘিনী থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
বাঘিনী নেই?
গত তিন বছরে কোনও বাঘিনী আসেনি। পাহান এ জঙ্গল ছেড়ে অন্য জঙ্গলে দেখা করতে গেছে তাঁদের সঙ্গে হয়তো, কিন্তু তারা কেউ আসেনি।
আমার চোখের সামনে নীল জংলা ফুলের পাতা আর রোদের সোনালি টুকরো-টাকরায় মোড়া বাঘিনীটির চেহারা কালো পাথরের উপর আবার ভেসে উঠল। তারপর মহুয়া গাছে হেলান-দেওয়ানো আমার রাইফেলের সামনে হাসি-হাসি মুখে বাঘিনীটার চেয়ে থাকার কথাও।
না, আমিও বোধহয় পাগল হয়ে যাব, যদি এখনও না হয়ে থাকি।
কিছুক্ষণ পরে মালী ফিরল। সঙ্গে কেবল মংলু একা।
কী ব্যাপার?
ওরা কেউ এল না। বলল, ওদের প্রাণের ভয় আছে। আণ্ডাবাচ্চা নিয়ে ঘর করে। ওদের পক্ষে এই ভূতুড়ে বাঘ মারতে আপনাকে সাহায্য করা সম্ভব নয়।
আর মংলু কী বলে?
বলেই, মংলুর দিকে তাকালাম আমি।
মংলু নমস্কার করে বলল, পরনাম সাহাব। আমি আপনার সঙ্গে অনেক শিকার করেছি। সাহস আমার কমতি নেই। সাহাবেরও নেই। আমি জানি। কিন্তু এই বাঘ মারতে আপনি যাতে না যান, তাই-ই আপনাকে বারণ করতে পাঠিয়েছে ওরা সবাই আমাকে। ওরা সকলেই আপনাকে ইজ্জত দেয়। আপনার ভাল চায়।
আশ্চর্য তো! তোমরা সবাই কুসংস্কারের বশে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে, আর পাহান মানুষের পর মানুষ মেরেই যাবে।
এ যে এমনি বাঘ নয় সাহাব। বড় টাইগার, মানুষ-খেকো হলে দিনেই যখন সহজে মানুষ ধরতে পারে তখন রাতে মানুষ নেয় শুনেছেন কখনও? তাও মানুষ নেয়, বাংলোতে-বাংলোতে ঘুরে বেড়িয়ে?
নেবে না কেন? তোমরা আর কতটুকু জানো। জিম করবেট সাহেবের লেখা পড়লে জানতে।
তবে ওর মৃত্যুর বন্দোবস্ত হচ্ছে।
মংলু বলল।
কী ভাবে? হাড্ডিতোড়িতে আমরা এই পূর্ণিমার দিনই জোর পুজো চড়াচ্ছি বনদেওতার থানে। পাঁচটা পাঁঠা বলি দেব। দেওতাকে পাহানের সব হরকতের কথা জানালে, তাকে শাস্তি দিতেন উনি এতদিনে। আমরা পুজো চড়িয়ে সব কথা বলে দেব তাঁকে। দেওতাই ওর ঘাড় মটকাবেন। দেওতা আমাদের উপর চটতে পারেন। শাস্তিও দিয়েছেন সেই জন্যে। কিন্তু এতদিনেও কি শাস্তি পুরো হল না?
বললাম, শোনো, আমি এক্ষুনি সিতাওন উপত্যকার দিকে আবার যাব। আমার সঙ্গে যাবে মংলু?
না সাহাব।
শক্ত অথচ বিনয়ী গলার মংলু বলল।
আমার জীবনের ভয় আছে। পাগল হয়ে গেলেই বা আমার বাল বাচ্চা কে দেখবে? আমরা তো বড়লোক নই!
যাবেন না বোস সাহাব।
রেঞ্জার মিশ্র আমার হাত ধরে বললেন।
আমি বললাম, কী! টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরিতে বাস করেও আপনারা লেখাপড়া শিখে এমন আশ্চর্য সব দেবতা-ভূতের কথা বলেন কী করে, ভাবতেও পারি না। ওরা বলে বলুক, আপনিও?
রেঞ্জারসাহেব চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়লেন।
বললেন, শুনুন সাহাব, আপনারা ভারী শহরে থাকেন, ইংল্যান্ড, আমেরিকা চষে বেড়ান, আর মাঝে-মাঝে শখ করে জঙ্গলে আসেন। আমরা, যারা, সারা জীবন জঙ্গলে-জঙ্গলেই কাটিয়ে দিলাম, আমরা যা বিশ্বাস করি, তা না করে উপায় নেই বলেই করি। ভূত বা দেওতা যেমন ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে ছিল, তেমনি টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরিতেও আছে। এই জঙ্গলে-পাহাড়ে আছে। ফ্লুরোসেন্ট, হ্যালোজেন আর মাকারি-ভেপারের আলোতে তারা থাকে না। আপনি অনেক জানতে পারেন, সব জানেন না।
ভূপতনারায়ণ মিশ্র রেঞ্জারসাহেব চলে যেতেই আমি উঠে চান করতে গেলাম। মালীর বউকে ফ্লাস্কে করে চা দিতে বললাম। সঙ্গে নিয়ে যাব। ফোর-সেভেন্টি ডাবল ব্যারেল রাইফেলটা বইতে বড়ই অসুবিধে। রাইফেলটা কিন্তু যুগলপ্রসাদ মালীকে দিয়ে গেছিল। থ্রি-সিক্সটি-সিক্স ম্যানলিকার শুনার রাইফেলটা পুল-থু দিয়ে পরিষ্কার করে ছ’টি নতুন সফট-নোজড গুলি বেছে রেখে, খাঁকি শর্টস আর ফুলশার্ট পরে বেরিয়ে পড়লাম।
মালী আর মালীর বউ এসে হাত জোড় করে দাঁড়াল। বলল, হামলোঁগোকো কেয়া হোগা হুজৌর?
কুছ নেহি হোগা। ম্যায় রাতমে লওটেঙ্গে, খানা কামরামে শো যনা তুম দোনো। খিচুড়ি বনাকে রাখনা হামারা লিয়ে। বন্দুকভি বগলমে রাখনা। ম্যায় গ্যায়া, ঔর আয়া।
ওরা দু’জনে, জী মালিক! হাঁ মালিক! বলে উঠল।
গেট পেরিয়ে, কাল যে পথে গিয়েছিলাম সেই পথেই গিয়ে পাকদণ্ডী ধরলাম। জায়গাটা চিনে গেছি। যুগলপ্রসাদ ভেবেছিল, আমার অতখানি হাঁটতে কষ্ট হবে, তাই সাইকেল করে নিয়ে গেছিল যতটা পারে। কিন্তু সে পথে অনেকই ঘোরা হয়ে ছিল।
আজকে আমি একা। রাইফেলটা সঙ্গে আছে বটে, কিন্তু এটা কি কাজে লাগবে? অনেক জঙ্গলেই অনেক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটতে দেখেছি কিন্তু আমার নিজেরই বন-বাংলোর পাশে, এমন গোছানো, সাহেবসুবো-ভরা মার্কিগঞ্জের মতন জায়গাতেও এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে, তা অভাবনীয়। মার্কিগঞ্জে এতগুলো বন্দুক থাকা সত্ত্বেও এবং এত ভাল-ভাল শিকারি থাকা সত্ত্বেও কেন পাহানকে মারতে গেলেন না কেউ! অথবা গেলেও, কেন পারলেন না মারতে এখন একটু-একটু বুঝতে পারছি।
প্রথমেই বাঘিনী-রহস্যটা ভেদ করতে হবে। তারপর ডগলাস-রহস্য।
ভাবছিলাম যে, যে-ডগলাসকে, মানে তার অবশিষ্টাংশকে, আমরা তিনজনে মিলে কবর দিলাম, সে কিনা ডগলাস নয়! ডগলাস কিনা, তার শোওয়ার ঘরের স্কাইলাইটের সঙ্গে ঝুলে মরেছে। তবে যাকে কবর দিলাম সে কে? হাওয়া? কী করে হয়?
যে-বাঘিনীর পেট কালকে ওঠা-নামা করতে দেখলাম পর্যন্ত গুহামতো জায়গাটায়, যে আমার রাইফেল পাহারা দিয়ে শুয়ে-শুয়ে আমার দিকে চেয়ে হাসছিল, সেই-ই বা কে? সেও কি হাওয়া? চোখের ভুল?
আর বনদেবতার ভাঙা দেউলের মধ্যে ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠা আমাদের সকলেরই এক সময়কার প্রিয় ল্যাংড়া পাহান? যাকে যেতে দেখলাম নিজের চোখে, যাকে হুডকু চোখে দেখেই গাদা বন্দুক দিয়ে গুলি করল, যার রক্তের ও পায়ের দাগ সিতাওন নদী অবধি এসেই মুছে গেছিল আশ্চর্যভাবে, সেই-ই বা কে? সেও কি বাঘ নয়? এত সব ভাবতে-ভাবতে মোহগ্রস্তর মতে সিতাওন নদীর দিকে চলতে লাগলাম। ডগলাসকে যেখানে খেয়েছিল সে-জায়গাটাও ঘুরে যাব, মন বলল।
এপ্রিলের সকালবেলা আমাদের এদিককার বন-পাহাড় বড় সুন্দর দেখায়। পলাশ শিমুলের লাল পতাকা এখন দিগন্তে-দিগন্তে ওড়ে। মহুয়াও শেষ হয়নি এখনও। ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা একটা হাওয়া বইতে থাকে। বাতাসে মিষ্টি গন্ধ। ঘুম পেয়ে যায়।
পাকদণ্ডী দিয়ে আসতে খুব তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেলাম ডগলাসের লাশটা যেখানে পড়েছিল সেই জায়গাতে। সেখানে পৌঁছে, খুব সাবধানে এগোতে লাগলাম, রাইফেল হাতে। ওই নরখাদক বাঘের এতই কুখ্যাতি হয়েছে যে, এদিককার বনে বহুদিন হল কেউই আসে না। বহুদিন হল। তাই বাঘের সঙ্গে ফাঁকা জায়গাতে দিনের বেলাতেই হয়তো মোলাকাত হয়ে যেতে পারে। তবে, যে-জায়গাতে ডগলাসকে খেয়েছিল, সে জায়গাটা ফাঁকা আদৌ নয়। তাছাড়া ওই জায়গাটা দেখা দরকার। কিছুই যে বুঝতে পারছি না! ধাঁধার পরে ধাঁধা!
সাবধানে আড়াল নিয়ে-নিয়ে নিঃশব্দে এগোতে লাগলাম।
সেই জায়গাটার কাছাকাছি এসে, মনে হলো একটা আওয়াজ পেলাম। আমার নিশ্বাস দ্রুত পড়তে লাগল। পাথর ও গাছের আড়ালে আড়ালে ওই দিকেই এগোতে লাগলাম রাইফেল হাতে নিয়ে।
কোনও জানোয়ার কড়মড়িয়ে কিছু খাচ্ছে। শব্দটির কাছাকাছি গিয়েই আড়াল নিয়ে বসে পড়লাম। একটা ময়ূর আমাকে দেখতে পেয়েই কেঁয়া-কেঁয়া-আ-আ করে ডেকে উঠল। ডাকতেই, দেখলাম একটা প্রকাণ্ড চিতাবাঘ মাথা উঁচু করে আমার দিকে তাকাল। রক্তে তার বুক, মুখ, গোঁফ, নাক সব লাল হয়ে গিয়েছিল। সে আমাকে দেখামাত্র এক লাফে ডানপাশে জঙ্গলে উধাও হল। তাকে মারারও কোনও ইচ্ছা আমার ছিল না। চিতাটা উধাও হতেই দু-পাশের গাছে এতক্ষণ অদৃশ্য ও নিথর হয়ে বসে থাকা শকুনগুলো একে-একে উড়ে এসে বসতে লাগল নীচে। চিতাটা কী খাচ্ছিল, তা দেখার জন্যে এগোতেই দেখি একটা বড় শিঙাল চিতল হরিণ। ভোরবেলার দিকে মেরেছে। কিন্তু দিনের বেলায় এরকম অপেক্ষাকৃত অগভীর জঙ্গলের জায়গায় মড়ির উপরে খোশমেজাজে বসে থাকবে চিতা, এটাও অভাবনীয়।
এই জঙ্গলে এখন যা কিছুই ঘটেছে, সবই অভাবনীয় ব্যাপার-স্যাপার।
পড়ে-থাকা এবং পেট-চেরা চিতলটার কাছে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কাল যে-পথে পাহানকে অনুসরণ করেছিলাম, সে পথেই নেমে গেলাম তাড়াতাড়ি।
যখন সিতাওন নদীর পারে পৌঁছলাম, তখন প্রায় একটা বাজে। ক্লান্তও হয়ে গেছিলাম। সকালে যে বেরিয়েছি নাস্তা করে তারপর চলছি তো চলছিই। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা ভাবটা চলে গেছে। তবে এসময়ে জঙ্গলে পথ চলতে তেমন কষ্ট হয় না। এত রঙের বাহার, চারদিকে এত ফুল, এত পাখির ডাকাডাকি, এত হরজাই বনগন্ধ যে, পথ যেন উড়িয়ে নিয়ে যায় এখন পথিককে।
নদীর পারে একটা বড় অর্জুন গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে চা খেলাম। কালকের হ্যাঁভারস্যাকে স্যান্ডউইচ আর জলের বোতল কালকের জায়গাতেই পড়ে আছে দেখলাম। মানুষের কথা আলাদা, ও জিনিস কোনও জানোয়ারই ছোঁবে না, এক বাঁদর আর ভালুক ছাড়া। তাদের বিষমই কৌতূহল।
কুলকুল করে জল বয়ে যাচ্ছে সিতাওন নদী দিয়ে। ওপাশের গভীর জঙ্গলের মধ্যে থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে এই দুপুর বেলাতেও।
চা খেতে-খেতে এর পরে কী করা যায়, তাই-ই ভাবছিলাম। পাইপ ধরিয়ে, বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়াও দিয়ে নিলাম। কালকের রক্তের দাগ এবং থাবার দাগ আজও পেলাম। পুরনো হয়েছে, এই-ই যা।
এমন সময় জঙ্গলের গভীর থেকে প্রচণ্ড জোরে বাঘ ডাকতে লাগল। মনে হল, যেন নদীর জলও সেই ডাকে ভয় পেয়ে আরও জোরে দৌড়তে লাগল। থার্মোফ্লাক্সটার মুখ বন্ধ করে ধীরেসুস্থে আমি আওয়াজের দিকে এগোলাম নদী পেরিয়ে। জুতো মোজা পরেই পেরোলাম। গরমের দিনে জুতো মোজা শুকোতে সময় লাগে না। বিশেষ করে গলফ-শু বা অন্য কাপড়ের জুতো। যতক্ষণ ভিজে থাকে, পায়ে আরামই লাগে। শব্দও কম হয়। জঙ্গলে ঢুকেই বুঝলাম কালকের ওই পাথরগুলোর দিক থেকেই আসছে আওয়াজটা। বাঘ একটা কি দুটো, তাও অজানা। কাল যেখানে বাঘ-বাঘিনীকে খেলা করতে দেখেছিলাম, সেখানে আজ গিয়ে পায়ের দাগ আছে কি নেই, তা দেখা হয়নি।
অত্যন্ত সাবধানেই এগোতে লাগলাম। আধমাইল পথ, এ-ভাবে এক-পা এক-পা করে এগোতে কম সময় লাগল না এ-গাছের আড়াল থেকে ও-গাছের আড়ালে আড়ালে চলে। তারপর পাথরগুলোর কাছাকাছি আসতেই মস্ত একটা শালগাছের গুঁড়ির পেছনে একেবারে থিতু হয়ে বসলাম। ভাবলাম, জঙ্গলের কী বলার আছে শুনি।
ঘন জঙ্গলের মধ্যে এ-গাছ থেকে ও-গাছে হাওয়ার দোলনায় দুলে সবুজ টুই, হলুদ বসন্ত এবং ব্রেইন-ফিভার পাখি আসছে-যাচ্ছে। অদূরেই একটা কাঠঠোকরা কাঠ ঠুকতে লাগল। বাঘের গর্জনে ভয় পেয়ে বোধহয় চুপ করে ছিল এতক্ষণ। কিন্তু বাঘ কোথায় আছে, বোঝা যাচ্ছে না। অথচ আছে, কাছেই। হাওয়ায় গন্ধ আসছে বাঘের গায়ের। দু-পাশের অনেক গাছে বাঘের নখ-আঁচড়ানোর দাগ স্পষ্ট। বাঘের শরীর থেকে যে, তীব্র-গন্ধী তরল মার্কার পিচকিরির মতো বাঘ ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলে, তার এলাকা নির্দেশ করে, তারও গন্ধ আসছে, তীব্র।
এমন সময়ে হঠাৎ একটা চাকুম-চাকুম আওয়াজ শোনা গেল। বাঘ কিছু খাচ্ছে।
কিন্তু বাঘ একটা, না দুটো?
নিশ্বাস বন্ধ করে প্রায় বুকে হেঁটে-হেঁটে আবার এগোলাম। একটা ঝোপের আড়ালে পৌঁছে, রোদ আর ছায়ার ডোরাকাটা শতরঞ্জির মধ্যে একেবারেই মিশে যাওয়া বাঘের ডোরাকাটা শরীরটা চোখে পড়ল। বাঘটা আমার দিকে পিছন ফিরে ছিল। তার ডান কাঁধের একটু নীচে একটা মস্ত ঘা। রক্ত জমে কালো হয়ে আছে। অথচ জিভ পৌঁছয় না বলে, জায়গাটা চাটতেও পারেনি। পোকাও বসছে উড়ে-উড়ে। আমার হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে গেল। এই যে মানুষখেকো পাহান, সে বিষয়ে সন্দেহ রইল না।
কিন্তু খাচ্ছেটা কী সে?
মানুষ?
আবারও?
এবার কোন মানুষ?
ঠিক সেই সময়েই বাঘের মুখোমুখি মস্ত ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটা থেকে অসংখ্য ধাড়ি-বাচ্চা, মাদি-মদ্দা বাঁদর একসঙ্গে ডেকে উঠল। আমার সঙ্গে বাঁদরের সর্দারের হঠাৎই চোখাচোখি হয়েছিল। ডেকে উঠল ওরা আসলে আমাকে দেখেই, কিন্তু বাঘ বিরক্ত হল, ভাবল ওকে দেখেই অমন করছে, কারণ ল্যাংড়া পাহানের মুখটা ওদের দিকেই ছিল। বাঘ উঠে দাঁড়িয়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে, আবার প্রচণ্ড গর্জন করে উঠল। মনে হল কানের কাছে বাজ পড়ল। চ্যাঁ-চ্যাঁ-চ্যাঁ করতে করতে দু-তিনটে ছোট বাঁদর বাঘের বোমা-ফাটা গর্জনে ভয় পেয়ে হাত-আলগা হয়ে নীচে পড়ে গেল পাকা ফলের মতো, আর বাঘটা এক লাফে এগিয়ে গিয়ে দু-হাতে দু-থাপ্পড় মেরে দুটি বাঁদরকে সঙ্গে-সঙ্গে মেরে ফেলল। তৃতীয়টি চ্যাঁ-চ্যাঁ করতে করতে দৌড়ে গিয়ে আবার গাছে উঠল। উঠতে গিয়েও, তার হাত পা ভয়ে পিছলে-পিছলে যাচ্ছিল। সদ্য-মরা বাঁদর দুটোর শরীর তখনও থরথর করে কাঁপছিল।
লাংড়া পাহান যখন উঠে দাঁড়াল, তখনই তার পায়ের ফাঁক দিয়ে দেখলাম, তার পায়ের কাছে একটা ময়ূর লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে। ভীষণ রোগা হয়ে গেছে পাহান।
মনে হল, ওর স্বাভাবিক শিকার ধরতে পারে না বোধহয় অনেকদিন থেকেই ভাল করে। নইলে কি বেচারির শুধু মানুষ বা ময়ূর ধরেই খেতে হয়!
এবার পাহান আমার দিকে ফিরবে। ময়ূর শেষ করে বাঁদর দুটোকে খাবে হয়তো। আমাকে দেখতে পেলে আর রক্ষে নেই। ছিঁড়ে-খুঁড়ে ছ্যাদরা-ভ্যাদরা করে দেবে। থ্রি-সিক্সটি-সিক্স রাইফেলটা না এনে, কেন যে, হেভি-বোরেরটা আনলাম না, তা মনে করে নিজের ওপর ভীষণ রাগ হতে লাগল। কিন্তু পাহান আমার দিকে ফেরবার আগেই আমি ঝোপের মধ্যে মড়ার মতো শুয়ে পড়লাম রাইফেলটাকে সামনে করে।
পাহান ফিরে এসে, আবার ময়ুরটাকে খেতে লাগল। চাকুম-চাকুম শব্দ শুনে বুঝলাম, সে আবার পিছনে ফিরেছে। অত কাছ থেকে, একেবারে নিরুপায় না হলে, খুব হেভি রাইফেল দিয়েও বাঘের মুখোমুখি গুলি করতে নেই। করলে, বিশেষ করে বাঘ যদি শিকারিকে দেখে ফেলে, তবে মরবার আগেও তাকে একেবারে মণ্ড করে দিয়েই মরবে। কিছুক্ষণ সময় যেতে দিয়ে এবার আবার আস্তে-আস্তে মাথা তুললাম। পেছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসে সে ময়ূর খাচ্ছিল।
ময়ূরের মতো সুস্বাদু হোয়াইট-মিট পৃথিবীতে নেই। কী চমৎকার কাবাব হত ময়ুরটার! আর পাহান তাকে কীভাবে খাচ্ছে!
নষ্ট করার মতো সময় নেই আর। পাহান আমার কাছ থেকে খুব বেশি হলে, পনেরো গজ দূরে বসে আছে। রাইফেল তুলে, খুব ভাল করে তার ঘাড়ে এইম করলাম।
এই রাইফেলটা আমার বড় প্রিয় রাইফেল। এ দিয়ে ওড়িশাতে আমি রোগ-বাইসনও মেরেছি।
বুকের ওঠা-নামা একটু কমলে, নিশ্বাস বন্ধ করে ট্রিগারে চাপ দিলাম। রাইফেলের আওয়াজ গভীর বনে গমগম করে উঠল। এবং সঙ্গে-সঙ্গে, বাঁদরের দল এবং ভয়-পেয়ে-ওঠা নানা পাখির ডাকের আওয়াজের মধ্যে এক লাফ মেরে, পাহান সামনের জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল। বসা-অবস্থা থেকেই আহত এবং দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বড় বাঘ যে কত বড় লাফ দিতে পারে, তা যারা নিজের চোখে না দেখেছেন, তাঁরা কল্পনাও করতে পারবেন না।
ভেবেছিলাম, লাফ দিয়ে যেখানে পড়বে, সেখানেই মরবে। কিন্তু সে অবলীলায় আরও একটি লাফ দিয়ে ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে জঙ্গলের আরও গভীরে অনেক দূরে চলে গেল।
আমি হতবাক হয়ে বসে রইলাম। ব্যাপারটা সম্পূর্ণই অভাবনীয়। কিছুক্ষণ আমি ওখানেই বসে থাকলাম। তারপর মনে ও গায়ে জোর করার জন্যে আবার ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে চা খেলাম একটু। পাইপও টানলাম কিছুক্ষণ। সফট-নোজড গুলিতে ওর শ্বাসনালি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবার কথা ছিল। ঘাড়ও। মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল। অত শর্ট-রেঞ্জে মারা! কী করে যে লাফের পর লাফ মেরে সে এত দূরে চলে গেল, সত্যিই তা ভেবে আমার বুদ্ধি আরও ঘোলা হয়ে গেল।
মিনিট-পনেরো পর, সদ্য-আহত বাঘের রক্ত-ঝরিয়ে দুর্বল হয়ে যাবার সময় দিয়ে, ফ্লাস্কটা একটা ডালে ঝুলিয়ে রেখে, রাইফেল রেডি-পজিশনে ধরে আবার এগোলাম আমি।
প্রথম লাফে যেখানে গিয়ে পড়েছিল পাহান, সেখানে এসে পৌঁছলাম। প্রথম লাফেই প্রায় পঁচিশ গজ এসেছে। রক্ত ছিটকে পড়েছে সেখানে পিচকিরির রঙের মতো। সেখান থেকে আরও সাবধানে এগোলাম। কিছুটা এগোতেই সেই পাথরের স্তূপ। সেখানে গিয়েই আশ্রয় নিয়েছে কি? খুবই সাবধানে সেখানে পৌঁছে দেখলাম, নাঃ। রক্তের দাগ নেই কোনও। আরও আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, সেই স্কুপের মাথার উপর কিছুটা টাটকা রক্ত পড়ে আছে। তার মানে, এক লাফে বাঘ ওই আহত অবস্থাতেও সেই পাথরের স্তূপটি পেরিয়ে গেছে। স্তূপটি কম করে দু-মানুষ উঁচু হবে।
আস্তে-আস্তে খুবই সাবধানে ওই পাথরের স্তূপের উপর গিয়ে উঠলাম। উঠেই শুয়ে পড়লাম। নীচের সেই জংলি লতার নীল ফুলগুলি আমার দিকে অবাক চোখে নীরবে চেয়ে রইল।
দম ফিরে পেয়ে, রাইফেলের নল সামনে করে, খুবই সাবধানে এবং অত্যন্ত আস্তে-আস্তে মাথা তুললাম। মাথা তোলবার সময়ে আমার রাইফেলের নলের সঙ্গে পাথরের ঘষা লেগে টং করে শব্দ হল একটা। সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, পাহান! আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল, সামনে যেখানে সে বসেছিল, সেখান থেকে বিদ্যুৎচমকের মতন উঠে বসে। ঘুরে দাঁড়িয়েই, লাফাবার জন্যে তৈরি হল। এ সমস্তই ঘটে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। ওর সারা ঘাড় ও পিঠ রক্তে লাল হয়ে গেছিল। আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে গুলি করলাম আমি একেবারে ওর বুক লক্ষ্য করে। পর পর দুটি গুলি করলাম। যাতে এবার আর কোনওরকর্ম ভেলকি না দেখাতে পারে ও। একবার ওঠার চেষ্টা করেই ল্যাংড়া পাহান পড়ে গেল। তারপর সামনের পা-দুটো জড়ো করে দু-থাবার উপরে মাথাটা রেখে যেন ঘুমিয়ে পড়ল।
অনেক বছর আগে কোনও গুহার মধ্যে তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল। তখনও তার চোখ ফোটেনি। গুহার অন্ধকারে সে বোধ হয় এমনি করেই সামনের দু-পায়ের থাবার উপর মাথা রেখে তার জীবনের প্রথম ঘুম ঘুমিয়েছিল। তারপরও বন-দেওতার ভাঙা দেউলের চাতালে আর গভীরে সে এমনি করে কতবারই না ঘুমিয়েছিল! আর, আজ ঘুমোল শেষ ঘুম।
মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তার সব কীর্তিকলাপ মনে পড়ে যাওয়ায় আনন্দও হল খুব।
আমি পাহাড়ের স্তূপ থেকে নেমে এসে, যেখানে ফ্লাক্সটা রেখেছিলাম সেখানে ফিরে এলাম। ওখানেই বসে আবার চা খেলাম। তারপর একটা শালগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে অনেকক্ষণ শুয়ে-শুয়ে পাইপ খেলাম। কাল থেকে মনের মধ্যে যে টেনশান, টানটান শরীরের মধ্যে যে ক্লান্তি জমে উঠেছিল, সে সমস্ত সরে গেলে, শরীরের পেশী সব আবার ঢিলেঢালা বোধ করলে, ধীরেসুস্থে রাইফেলটা কাঁধের স্লিং-এ ঝুলিয়ে পাহানের কাছে ফিরে গেলাম। স্তূপটাকে বাঁ পাশে রেখে আন্দাজ-আন্দাজে জায়গাটাতে গিয়ে পৌঁছলাম। কিন্তু পাহান ঠিক কোথায় যে আছে, তা ঘন আগাছার জন্যে দূর থেকে ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না।
পাথরের স্তূপের উপর থেকে সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। নীচের ঘন আন্ডারগ্রোথের জন্যে নীচে থেকে জায়গাটা ঠাহর করতে পারছিলাম না কিছুতেই। তাই আবার ফিরে গিয়ে পাথরের স্তূপটার উপরে উঠলাম। এবং উঠেই, প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
পাহান নেই। না, পাহান যেখানে পড়েছিল, সেখানে তার চিহ্নমাত্র, নেই। তার রক্তে যেখানে মাটি ভিজে লাল হয়ে ছিল, ঠিক সেইখানে একটি লাল ফুলদাওয়াই-এর ঝাড় কে যেন পুঁতে দিয়ে গেছে। অজস্র লাল ফুলদাওয়াই ফুটে আছে তাতে, যেন, ঝাড়টি চিরদিন ওখানেই ছিল। সকালের হাওয়ায় ফুলগুলো দোলাদুলি করছে। সিতাওনের ওই উপত্যকাতে কোথাও ফুলদাওয়াই নেই। ফুলদাওয়াই ফোটে আলো যেখানে বেশি পড়ে, সেই সব জায়গায়। এখানে ফুলদাওয়াই-এর ঝাড় কোথা থেকে এল, কে জানে!
আমার সমস্ত বুদ্ধি জড়ো করেও ব্যাপারটার কোনও কূল-কিনারা পেলাম না। হঠাৎ চারিদিকের গাছ থেকে নানা রকম পাখি, ময়ূর, বাঁদর, কাঠঠোকরার মিলিত আওয়াজ উঠল। এবং সেইরকম হঠাৎই ভীষণ জোরে হাওয়া বইতে লাগল জঙ্গলের মধ্যে শ্রাবণের ঝড়ের মতো, এই বৈশাখের ভোরে। অথচ আকাশে খটখটে রোদ। হাওয়াটা যে মিথ্যে নয়, বুঝলাম গাছগাছালি থেকে মরা কুটো, ফুল, পাতা সব উড়ে এসে যখন আমার গায়ে মাথায় পড়তে লাগল।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ আমার ভীষণ ভয় করতে লাগল। এত মানুষের নিজেদের পাওয়া ভয় এবং আমাকে দেখানো ভয় সবই যেন একসঙ্গে আমার বুকে ফিরে এল। মনে হল, অজ্ঞান হয়ে যাব আমি।
দৌড়ে পাথরের স্তূপ থেকে নেমে যে পথে এসেছিলাম, সেই পথেই দৌড়ে ফিরতে লাগলাম। যেখানে ময়ূরের পালক ও লেজ পড়ে ছিল এবং মরা বাঁদরদুটো, সেখানে এসেও আরেকবার অবাক হলাম। কোনও চিহ্ন নেই তাদের। না রক্তের, না ছিন্নভিন্ন পালকের। না, কোনও কিছুরই চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। একঝাঁক লাল-কালো বন-মুরগি সেখানে চড়ে বেড়াচ্ছিল। আমাকে আসতে দেখেই কঁক কঁক করে উড়ে ছড়িয়ে গেল ঝুমকো-জবার মতো চারপাশে। ফুটে উঠল লাল কালো তারার মতো ফুল হয়ে আলোছায়ার ডোরাকাটা শূন্যে।
আমি দৌড়তে লাগলাম। দৌড়ে নদী পার হলাম। তারপরও দৌড়তে লাগলাম। স্কুল কলেজের স্পোর্টস এবং ক্রিকেটের ফিল্ডিং করার পরে, এত জোরে এবং এতক্ষণ ধরে আমি কখনওই দৌড়ইনি। আমার পিছনে পিছনে আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে ভয়টা তাড়া করে আসতে লাগল। আমার মনে পড়ল, কোথায় যেন পড়েছিলাম বক্সার জো-লুই-এর কথা: You can run but you can not hide।
ঘোরের মধ্যে দৌড়তে-দৌড়তে আমি বাংলোতে ফিরে এলাম। মালী হাওয়ায়-ঝরা মরা-পাতা ঝাঁট দিচ্ছিল বাংলোর সামনের হাতাতে। আমাকে ওইভাবে আসতে দেখেই চেঁচিয়ে সে তার বউকে ডাকল। ওর বউ দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে দেখেই কঁকিয়ে কেঁদে উঠল। কী দেখল, আমার মধ্যে তা ওই-ই জানে। ওরাই জানে। নিজে তো আমার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। সে মুখ দেখার কোনও ইচ্ছাও ছিল না আমার।
সোজা গিয়ে ঘরে ঢুকলাম। বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে শুয়ে পড়লাম।
.
কতক্ষণ বা কতদিন যে ঘুমিয়ে ছিলাম মনে নেই। ঘুম যখন ভাঙল তখন অনেকই বেলা। বালিশের তলা থেকে রিস্টওয়াচ টেনে বের করে দেখলাম, দুটো বাজে।
বাইরে এসে দেখি, অনেকই লোক বসবার ঘরে, পেয়ারাতলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গোমড়া মুখে বসে নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি করছে। রেঞ্জার মিশ্রসাহেব, আমার পেয়ারের সব শিকারিরা, সকলেই আছেন ও আছে।
মংলু বলল, আমার জন্যে চিন্তিত হয়ে ফিলফিলা থেকে হেকিমসাহেবকে আনবার জন্যে টাটুঘোড়া এবং বন্দুক সঙ্গে দিয়ে পাঁচজন লোক পাঠিয়েছেন রেঞ্জার সাহেব, যাতে মারিজের ইলাজের কোনও রকম ত্রুটি না হয়।
কেমন আছেন? তবিয়ৎ ঠিকে না হ্যায় হুজৌর?
ইত্যাদি সব প্রশ্নের জবাবে ভাল ভাল বললাম বটে সকলকেই, কিন্তু শরীর ভাল মোটেই ছিল না। মাথা ভার। কেউ যেন ঝিকা-গাছের ডাল দিয়ে আমাকে খুব পিটিয়েছে। বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। অথচ হাড়গোড়, মাংস যেন সব আলাদা হয়ে গেছে। তবু বনদেওতার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ ছিলাম আমি। যা-কিছুই ঘটে গেল আমার জীবনে গত দু’দিনে, তার অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা হয় না বুদ্ধি দিয়ে।
মালী এসে বলল, কালকে আমরা সকলে পুজো চড়াতে যাব বনদেওতার থানে। মার্কিগঞ্জ এবং আশেপাশের বস্তির সমস্ত ঘর থেকে একজন করে যাবে।
কোন থানে? উদাসীন গলায় আমি শুধোলাম।
সিতাওনের উপত্যকার গভীরে যে থান আছে, সেই থানে। আপনি যাবেন তো? আমরা চাঁদা তুলছি সকলের কাছ থেকে।
সিতাওনের উপত্যকার নাম শুনেই আমার গা ছমছম করে উঠল।
বললাম, না। আমার যাওয়া হবে না। আজই বিকেলে আমি সিজুয়াবাগ থেকে বাস ধরে রাঁচী যাব। কাল কলকাতা চলে যাব। জরুরি কাজ আছে।
আমি যে ভয় পেয়েছি, সেটা ওরা সকলেই বুঝল। আমিও ভয়টা গোপন করলাম না। গোপন করার প্রয়োজনও বোধ করলাম না।
রেঞ্জারসাহেব পান-জর্দা খাওয়া ঘোরতর লাল ও কর্কশ একটা জিভ বের করে চুকচুক করে একটা শব্দ করলেন। সমবেদনা। বললেন, আপনি যে প্রাণে বেঁচে, পাগল-না-হয়ে, বোবা-কালা না হয়ে ফিরেছেন এইই ঢের।
নিয়ামত অত্যন্ত নিষ্ঠুরের মতো বলল, পাগল বা বোবা কালা হয়ে যাওয়ার এখনও সময় যায়নি। যুগলপ্রসাদ তো কত পরে…।
মংলু ওকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল।
রেঞ্জার সাহেব বললেন, আপনি কলকাতায় ফিরে, কোনও ম্যাগাজিনে এই আশ্চর্য ঘটনা নিয়ে লিখুন। খবরের কাগজের লেটার্স ট্যু দ্য এডিটর কলামে চিঠি লিখুন।
চুপ করে থাকলাম আমি।
ভাবছিলাম, শহরের লোকে কতটুকু বোঝে বনকে? কতটুকু জানে বন সম্বন্ধে? কোথাওই এ গল্প ছাপা হবে না। উলটে আমাকেই পাগল বলবে, টিটকিরি দেবে। বলবে, মশাই, মানুষ যখন চাঁদে পা দেব-দেব করছে বিজ্ঞানের দৌলতে, তখন আপনি যত গাঁজাখুরি ভূতের গল্প চালাচ্ছেন?
মিশ্রসাহেব যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বললেন, ওঁরা ভগবান বা ভূত মানেন না বলেই কি ভূত-ভগবান নেই? মানুষের বড়ই গর্ব হয়েছে।
মংলু খৈনি টিপতে টিপতে বলল, উও সব শহরবাঁলোকো লে আইয়ে না সাহাব হিয়েপর ইক মরতবা। ছোড় দিজিয়ে ল্যাংড়া পাহানকা হরকতকা সামনা। সামনা করনে দিজিয়ে। হুঃ সামনা! লম্বে-লম্বে বাঁতিয়া সব্বে বিত যায়েগা। ঘামণ্ড বিলকুল লুটা যায়েগা। বড়া হিম্মতদার ঔর পড়েলিখে শোচতা না উনলোগোঁনে খুদলোগোঁকো!
নিয়ামত বলল, খুদা হাফিজ। কে জানে কী হবে? বনদেওতার অভিশাপ শহরের লোকের উপরও পড়বে। খরা হবে, ভূমিকম্প হবে, বন্যা হবে। বন, বনের প্রাণী নষ্ট করার অপরাধ বনদেওতা কখনও ক্ষমা করবেন না। আমাকেও না, আপনাকেও না, শহরের ওঁদেরও না।
খুশি হয়ে-দেওয়া আমার মোটা চাঁদা নিয়ে ওরা সকলে চলে গেলেও, পেয়ারাতলিতে বসে ছিলাম একা। ভাবছিলাম, আমার বিদ্যা, শিক্ষা, আধুনিকতা, পৃথিবী-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, সব কিছুরই গর্বকে সিতাওনের উপত্যকাতে পুঁতে দিয়ে কলকাতার দিকে রওয়ানা হব আজ বিকেলে। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, জঙ্গল সম্বন্ধে জ্ঞান, নিজের সাহস এবং রাইফেলের উপর সম্পূর্ণ আস্থাবান এই ঋজু বোস নামের মানুষটা এইখানেই মরে রয়ে গেল। এখন থেকে যুগলপ্রসাদ, হুডকু, বা মংলুর সঙ্গে আমার কোনওই তফাত রইল না। এক গভীর প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল আমার নিজের সম্বন্ধে। দেওয়াল ও মেঝে-জোড়া এইসব সার-সার ট্রফি…।
ঘামণ্ড শব্দটার মানে, আমি যতটুকু জানি, তা হচ্ছে গর্ব, অহঙ্কার। ভাবছিলাম, মানুষখেকো ল্যাংড়া পাহানকে মারতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু আমার বুকের মধ্যের আলো-ছায়ায়, পাহাড়নদীতে সযতনে যে ঘামণ্ড শব্দটিকে এতদিন পুষে বড় করেছিলাম নিজের অজানিতে, সেই ভয়ঙ্কর মানুষখেকো শব্দটি যে বিনা-গুলিতে, বুকের মধ্যেই মরে গেল, এইটেই মস্ত বড় লাভ। পুরোপুরি ব্যক্তিগত লাভ।
ডগলাস বলত, হোয়াটেভার হ্যাপেনস, হ্যাপেনস ফর গুড!
হয়তো ও ঠিকই বলত।
আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
.
ঋজুদা পাইপটাকে আবার ভরল, কথা না বলে।
ভটকাই হঠাৎ বলল, “There are many things in heaven and Earth, Horatio??…”
আমি বললাম, চুপ কর। বেশি শেকসপিয়ার ফুটোস না।
তিতির বলল, আমি চানে যাব।
ঋজুদা বলল, আমিও। ব্রেকফাস্ট অ্যাট এইট-থার্টি। ডাইনিং রুমে।
তিতির আর ভটকাই উঠে গেল। তিতির তিতিরের ঘরে আর ভটকাই আমার ঘরে।
ঋজুদা পাইপটাতে আগুন দিয়ে বলল, ভটকাই কিন্তু শেকসপিয়ার আউড়ে খুব একটা অন্যায় করেনি। সত্যিই! কত কিছু থাকে এই ভূলোক দ্যুলোকে বুদ্ধিতে যার সত্যিই কোনও ব্যাখ্যা চলে না।
আমি বললাম তুষারকান্তি ঘোষ মশায়ের বই ছিল না? বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না এই নামে?
ছিল বুঝি? আমি তো পড়িনি। পড়াস তো আমাকে কলকাতা ফিরে।
বলেই, ঋজুদা উঠে পড়ে তার নিজের ঘরের দিকে এগোল।
