কুয়াশার রঙ নীল (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
তিন
শ্রীলেখা ব্যানার্জির বাড়ি সার্কাস অ্যাভেনিউয়ে একটা সংকীর্ণ গলিরাস্তার ভেতর দিকে। সাবেক আমলের দোতলা বাড়ি। সামনের প্রাঙ্গণে উঁচু-নিচু কিছু গাছ-লতা-গুল্মের সজ্জা আছে। পোর্টিকোর মাথায় উজ্জ্বল আলো জ্বলছিল। সেই আলোয় প্রাঙ্গণে আলো-ছায়া মিলেমিশে কেমন গা-ছমছমকরা রহস্য অবশ্য এটা আমারই অনুভূতি। তাছাড়া পরিবেশ সুনসান স্তব্ধ। গলিরাস্তাটায় আলো নেই বললেই চলে। লোকজনেরও আনাগোনা কম। একটা রিকশা ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে চলে গেল।
গেটের কাছে হর্ন দিতেই একটা লোক দৌড়ে এসে গেট খুলে দিয়েছিল এবং হালদারমশাইয়ের সাড়া পেয়েছিলাম। প্লিজ কাম ইন কর্নেলস্যার! ম্যাডাম ইজ অ্যাংশাসলি ওয়েটিং ফর ইউ। সেইসময় কুকুরের গর্জন শুনলাম। হালদারমশাই পাল্টা গর্জে বললেন, বদ্রীনাথ! কুত্তা সামাল দাও। কাম নাই, খালি চেঁচায়।
নিচের তলায় বনেদি ধরনে সাজানো বসার ঘর। হালদারমশাই আমাদের দোতলায় নিয়ে গেলেন। বারান্দায় শ্রীলেখা দাঁড়িয়েছিলেন। নমস্কার করে আমাদের একটা ঘরে ঢোকালেন। এই ঘরটা আধুনিক রীতিতে সাজানো। ছোট্ট একটি টি ভি আছে কোণের দিকে। আমাদের বসতে বলে শ্রীলেখা সম্ভবত আপ্যায়নের জন্য ভেতরের ঘরে যাচ্ছিলেন। কর্নেল বললেন, মিসেস ব্যানার্জি, প্লিজ বসুন। আগে কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিই।
শ্রীলেখাকে সকালের চেয়ে নিষ্প্রভ দেখাচ্ছিল। পুতুলের মতো বসলেন। আস্তে বললেন, আমাকে আজ দুপুরে অফিসে সেই লোকটা টেলিফোনে হুমকি দিয়েছে। কেন আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ লাগিয়েছি বলে ধমক দিল। তারপর মিঃ হালদারের কাছে শুনলাম, ওঁকেও হুমকি দিয়েছে।
হালদারমশাই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল ইশারায় তাকে থামিয়ে বললেন, প্রথমে আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন।
বলুন।
আপনার এ বাড়িতে কে কে থাকে?
ফ্যামিলির ওল্ড সারভ্যান্ট সুরেন, দারোয়ান বদ্রীনাথ আর মালতী। মালতী রান্নাবান্না ইত্যাদি করে। এরা বাড়িতেই নিচের তলায় থাকে। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর মালতী আমার পাশের ঘরে থাকে। তবে মর্নিংয়ে আমার পি এ সুদেষ্ণা আসে। কোম্পানির কিছু প্রাইভেট অ্যান্ড কনফিডেন্সিয়াল কাজকর্ম আছে। সব সেরে সে এখানেই খেয়ে নেয় এবং আমার সঙ্গে অফিসে যায়। বিকেল পাঁচটায় তাকে ছেড়ে দিই। অবশ্য আর্জেন্ট কিছু কাজ থাকলে তাকে আমার সঙ্গে এ বাড়িতে আসতে হয়। শি ইজ স্মার্ট, এফিসিয়্যান্ট অ্যান্ড রিলায়েবল।
সুরেন, বদ্রীনাথ, মালতী আপনার বিশ্বস্ত?
ও! দে আর রিলায়ে। আমার শ্বশুরমশাইয়ের আমল থেকে ওরা ফ্যামিলির লোক হিসেবে গণ্য।
কর্নেল শ্রীলেখার চোখে চোখ রেখে বললেন, আপনার স্বামী কি প্রতিদিন জগিং করতে যেতেন?
হ্যাঁ। বিয়ের পর থেকেই জয়ের এ অভ্যাস দেখে আসছি।
আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন আগে?
শ্রীলেখা আস্তে শ্বাস ফেলে বললেন, প্রায় দু বছর। আমাদের দুজনের মধ্যে তার আগে থেকেই একটা এমোশনাল সম্পর্ক ছিল। দুজনে একই কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারের স্টুডেন্ট ছিলাম। সেই সূত্রে আলাপ।
আপনার শ্বশুরমশাইয়ের নাম কী?
সুশোভন ব্যানার্জি। জয়ের মাকে অবশ্য আমি দেখিনি। জয়ের ছেলেবেলায় তিনি মারা যান।
সুশোভনবাবু সম্ভবত ব্যবসা করতেন। বলে কর্নেল একটু হাসলেন। কারণ চাকরি করে আগের দিনে এমন বাড়ি করা সম্ভব ছিল না।
হ্যাঁ। আমার শ্বশুরমশাইয়ের ঘড়ির বিজনেস ছিল।
ঘড়ি?
সুদক্ষিণা ওয়াচ কোম্পানি। আমার বিয়ের আগেই তার কোম্পানি উঠে যায়। জয়ের কাছে শুনেছি, এবং নিজেও দেখেছি খুব রাগী মানুষ ছিলেন। ব্যবসাবুদ্ধি ততকিছু ছিল না। কর্মচারীদের বড্ড বেশি বিশ্বাস করতেন। তারা তাকে ঠকাত। আসলে তার পূর্বপুরুষ ছিলেন জমিদার। সেই আভিজাত্য বজায় রেখে চলতেন।
মিসেস ব্যানার্জি, আপনার জগিংয়ের অভ্যাস নেই?
এই অতর্কিত প্রশ্নে শ্রীলেখা হকচকিয়ে উঠবেন ভেবেছিলাম। কিন্তু তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম না। শ্রীলেখা নিষ্পলক দৃষ্টিতে বললেন, খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন, কর্নেল সরকার! না, আমি জয়ের সঙ্গে জগিং করতে যেতাম না। কারণ জগিং কেন, জোরে হাঁটাচলাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বছর সাতেক। আগে কলেজ থেকে ফেরার সময় রাস্তার একটা ম্যানহোলে আমার ডান পা। ঢুকে যায়। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় জল জমেছিল। ম্যানহোলটা ছিল খোলা। শ্রীলেখা চাপা শ্বাস ফেলে বললেন, হিপজয়েন্টে ক্র্যাক হয়েছিল। প্রায় ছমাস প্লাস্টার বাঁধা অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলাম। দ্যাটস এ লং স্টোরি! আমার। অ্যাকাডেমিক কেরিয়ারের সেখানেই শেষ। যখন হাঁটাচলা সম্ভব হলো, তখন। বাবা আমাকে অগত্যা কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি করে দিলেন।
আপনার বাবা বেঁচে আছেন?
না। মা-ও বেঁচে নেই। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। একটা চুপ করে থাকার পর শ্রীলেখা ঠোঁটের কোণে কেমন একটু হেসে বললেন, প্রশ্নটা আপনি তুলবেন আমি জানতাম। তাই সেই পুরনো দুর্ঘটনার মেডিক্যাল রিপোর্ট খুঁজে বের করে রেখেছি। যদি দেখতে চান–
কর্নেল দ্রুত বললেন, আপনি ইনটেলিজেন্ট। তবে না–কোনও মেডিক্যাল রিপোর্ট দেখার প্রয়োজন আমার নেই। আপনাকে প্রশ্ন করতে এসেছি। শুধু উত্তর দেওয়াই যথেষ্ট। আচ্ছা মিসেস ব্যানার্জি, কোনও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুবককে কি আপনি চেনেন–মাথায় লম্বা চুল এবং পেছন দিকে হর্সটেলের মতো বাঁধা?
না তো! তবে শ্রীলেখা হঠাৎ থেমে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।
বলুন!
জয় তার মৃত্যুর আগের দিন রাত্রে কথায় কথায় বলছিল, ময়দানে একজন হিপি টাইপের যুবক তাকে জগিংয়ের সময় টিজ করে। আবার টিজ করলে সে পুলিশকে জানাবে। শ্রীলেখা চশমার ভেতর থেকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকালেন কর্নেলের দিকে। ডু ইউ নো দ্যাট গাই?
নাহ। চিনি না। তবে জানতে পেরেছি, সে একজন পাগল।
একজ্যাক্টলি! জয় বলছিল, পাগল ছাড়া ওভাবে কেউ টিজ করে না। জগিংয়ের সময় বারবার নাকি সে জয়ের পাশ ঘেঁষে আসত। কখনও পেছন থেকে জয়ের পিঠে খোঁচা মেরে দূরে সরে যেত। আপনাকে বলা উচিত, জয় নিরীহ ভীতু মানুষ ছিল।
আচ্ছা মিসেস ব্যানার্জি, জগিং করতে যাওয়ার সময় মিঃ ব্যানার্জির হাতে নিশ্চয় ঘড়ি থাকত।
লক্ষ্য করিনি। সে উঠত খুব ভোরে। তখন আমি ঘুমিয়ে থাকতাম। বেডরুমে ইয়েল লক আছে। ভেতরে থেকে খোলা যায়। বাইরে থেকে খুলতে হলে চাবি লাগে। জয় এসে আমার ঘুম ভাঙাত।
আপনার স্বামীর কতগুলো রিস্টওয়াচ ছিল?
গুনে দেখিনি। আমার শ্বশুরমশাই ওয়াচ কোম্পানির মালিক ছিলেন। কাজেই জয়ের ঘড়ির সংখ্যা অনেক। ওই দেখুন, শো-কেসে কত রিস্টওয়াচ সাজানো। অনেকগুলোই অচল এবং পুরনো। আপনি নীলডায়াল রোমার ঘড়ির কথা বলছিলেন। তেমন কোনও ঘড়ি কখনও দেখিনি। কোথাও খুঁজে পাইনি। বিলিভ মি!
কিন্তু তার একটা নীলডায়াল রোমার রিস্টওয়াচ অবশ্যই ছিল।
ছিল তো, গেল কোথায়?
দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর সময় ওটা ছিনতাই হয়ে গেছে।
শ্রীলেখা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, আপনি কি ভাবে জানলেন?
হালদারমশাই বলে উঠলেন, কর্নেলস্যারের কিছু অজানা থাকে না। আপনারে কইছিলাম না?
কর্নেল হাসলেন। বরং খুলে বলুন হালদারমশাই, তদন্ত করেই জানতে পেরেছি।
হঃ!
শ্রীলেখা বললেন, এবার কফি বলি। আপনি কফির ভক্ত।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। এবার কফি খাওয়া যাক।
শ্রীলেখা বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল ঘরের ভেতরটা দেখতে দেখতে কোণের সেই ছোট্ট টি ভির দিকে আঙুল তুলে চাপা স্বরে বললেন, হালদারমশাই, বলুন তো ওটা কী?
হালদারমশাই বললেন, ক্যান? টিভি।
কর্নেল হাসলেন। এতক্ষণে যন্ত্রটা খুঁটিয়ে দেখলাম। বললাম, কম্পিউটার। তবে ঘরে ঢুকেই মনে হচ্ছিল টিভি।
হালদারমশাই উঠে গিয়ে কম্পিউটারটা দেখে এলেন। বললেন, ঠিক কইছেন। কিন্তু কম্পিউটার অফিসের কামে লাগে। বাড়িতে কম্পিউটার কী কামে লাগব?
কর্নেল বললেন, এটা কম্পিউটারের যুগ হালদারমশাই! অদূর ভবিষ্যতে ঘরে ঘরে এই যন্ত্র কেনা হবে। বিশেষ করে ওটা পার্সোনাল কম্পিউটার। মিসেস ব্যানার্জির কোম্পানিরই তৈরি সম্ভবত।
কর্নেল কম্পিউটার নিয়ে বকবক শুরু করলেন। একটু পরে শ্রীলেখা এবং তার পিছনে পরিচারিকা মালতী ঘরে ঢুকল। মালতীর হাতে বিশাল ট্রে। বয়সে প্রৌঢ়া এবং শক্ত-সমর্থ গড়ন। বোঝা যায়, শ্রীলেখাকে গার্ড দেওয়ার উপযুক্ত সে। ট্রে রেখে সে চলে গেল।
শ্রীলেখা কফি তৈরি করতে করতে বললেন, আপনারা কম্পিউটার নিয়ে আলোচনা করছেন কানে এল। ওটা জয়ের নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি। পার্সোনাল কম্পিউটারই বটে। তবে একটু স্পেশালিটি আছে।
কর্নেল বললেন, জানতে আগ্রহ হচ্ছে। বলুন!
ওতে জয়ের ফ্যামিলির অনেক তথ্য কোডিফায়েড করা আছে। তার জন্য বিশেষ বিশেষ কোড আগে জেনে রাখা দরকার। না জানলে ওটা ব্যবহার করা যাবে না। অবশ্য সাধারণ কম্পিউটারের মতোও ওটা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেই বিশেষ কোড জানলে তথ্যগুলো পেপারশিটে টাইল্ড হয়ে বেরিয়ে আসবে।
কর্নেল বলে উঠলেন, আপনি জানেন না?
শ্রীলেখা কর্নেলের হাতে কফির পেয়ালা দিয়ে আস্তে বললেন, না। জয় বলেছিল, পাঁচটা লেটার অব্দি ডেটা ফিড করাতে পেরেছে। ওই লেটার গুলোকে বলা চলে কি ওয়ার্ড। আরও কয়েকটা কি ওয়ার্ড দিয়ে ডেটা ফিড করাতে পারলে সংশ্লিষ্ট পুরো তথ্য কোডিফায়েড হবে। আমি ওর সমস্যা বুঝতাম। কম্পিউটার ব্রেন বলে একটা কথা শুনে থাকবেন। সেই ব্রেনের নিজস্ব নার্ভ আছেনা, নার্ভ বলছি উপযুক্ত শব্দের অভাবেবরং চ্যানেল অব এ সার্টেন সিস্টেম বললে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে। কতকটা যেন নির্দিষ্ট রাগের সরগমের মতো। আপনি বাজাবেন পূরৰী। হয়তো একটা কড়ি বা কোমল স্বরের হেরফেরে সেটা হয়ে গেল পুরিয়া। শ্রীলেখা হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন যেন। উপমা দিয়ে এসব বোঝানো যায় না। প্রাইমারি নলেজ ইজ নেসেসারি।
কর্নেল বললেন, সেই পাঁচটা লেটারের কি ওয়ার্ড মিঃ ব্যানার্জি আপনাকে বলেননি?
না জয় বলেছিল সেই কী ওয়ার্ড অসম্পূর্ণ। আমি জানলেও কোনও লাভ হতো না।
কম্পিউটারটা কি ঘরে বসেই তৈরি করেছিলেন মিঃ ব্যানার্জি?
হ্যাঁ। তবে ফ্যাক্টরি থেকে মেটারিয়াল নিয়ে এসেছিল।
আপনি ওটা কি ব্যবহার করেছেন সাধারণ কাজকর্মে?
করার সাহস পাইনি। খুব সেনসিটিভ কম্পিউটার। অটোমেটিক এয়ারকুলার ফিট করা আছে। সবসময় এয়ারকুলার চালু রাখতে হয়। লোডশেডিং হলে অটোমেটিক চার্জারের সাহায্যে এয়ারকুলার চালু থাকে।
একটু চুপ করে থাকার পর কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। আপনি যে ফোন নাম্বারটা দিয়েছেন, সেটা ফস্ নাম্বার।
কইয়া দিছি ওনারে। হালদারমশাই বলে উঠলেন। জোক করছে হা– বলে থেমে গেলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ম্যাডামের সামনে শব্দটা উচ্চারণ করতে বাধল।
আমি হেসে ফেললাম। কর্নেল বললেন, এ ঘরে টেলিফোন আছে?
শ্রীলেখা বললেন, আছে। ওই তো।
কর্নেল চোখ বুজে কিছু ভেবে নিলেন। তারপর বললেন, মিসেস ব্যানার্জি! তবু পরীক্ষা করে দেখা যাক। নাম্বারটা আপনি ডায়াল করুন। দা নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়ালড ডাজ নট একজিস্ট শুনলেও ফোন ছাড়বেন না। ক্রমাগত আপনিও বলে যাবেন আমি শ্রীলেখা ব্যানার্জি বলছি। এই নিন সেই নাম্বার। আগে দেখে নিন আমি ঠিক টুকেছি কি না।
এক মিনিট বলে শ্রীলখো পাশের ঘরে গেলেন। একটা স্লিপ নিয়ে এসে মিলিয়ে দেখে বললেন, ঠিক আছে। তারপর হাত বাড়িয়ে টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন।
শ্রীলেখা কর্নেলের কথামতো আমি শ্রীলেখা ব্যানার্জি বলছি আওড়াতে শুরু করলেন। বার দশেক বলার পর লক্ষ্য করলাম ওঁর মুখে চমক খেলে গেল। হ্যাঁ, আমি শ্রীলেখা ব্যানার্জি বলছি। রোমার ঘড়িটা….শুনুন! হিপিটাইপ একটা লোক আজ আমার অফিসে দেখা করেছে। সে বলছিল, আমার স্বামীর অ্যাকসিডেন্টের জায়গায় সে ঘড়িটা কুড়িয়ে পেয়েছে।….পাঁচ হাজার টাকা চাইছিল। দিস ইজ অ্যাবসার্ড! আমি অত টাকা…কী আশ্চর্য! আপনি অকারণ আমাকে….ওকে! ওকে! মেনে নিচ্ছি আপনারই রিস্টওয়াচ। তো আপনি খুঁজে বের করুন।…ডিটেকটিভ? প্লিজ লি! মিঃ হালদার আমার শ্বশুরের বন্ধু। তাই ন্যাচারালি…কর্নেল নীলাদ্রি সরকার–ডু ইউ নো হিম?…খুলে বলি শুনুন! কর্নেল সায়েবের কাছে গিয়েছিলাম অন্য একটা ব্যাপারে!….না, না। আপনার ব্যাপারে মোটেই নয়।…হ্যাঁ, উনি এখন নিচের ঘরে আছেন। বাট হোয়াই আর ইউ শ্যাডোয়িং মি, ম্যান? এ সব আমার বিজনেস সংক্রান্ত ব্যাপার।…দেন ইউ গো টু হেল!
ফোন রেখে দিলেন শ্রীলখো। নাসারন্ধ্র স্ফীত। মুখে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম, যতটা নিষ্প্রভ মনে হয়েছিল ভদ্রমহিলাকে, ততটা মোটেই নন। প্রয়োজনে রণরঙ্গিনী মূর্তি ধরতে পারেন।
কর্নেল গম্ভীর। হালদারমশাই হতবাক হয়ে নস্যি নিচ্ছিলেন। এবার বললেন, কী কাণ্ড!
কর্নেল কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, এ ঘরে নো স্মোকিং লেখা আছে। কম্পিউটারের প্রাণরক্ষার জন্য। যাই হোক, চুরুট খাওয়ার জন্য বাইরে যাব বরং!
শ্রীলেখা বললেন, আপনি যে এ বাড়িতে এসেছেন লোকটা তা জানে। তার মানে ওর চরেরা নজর রেখেছে।
শোনামাত্র হালদারমশাই সবেগে বেরিয়ে গেলেন। ওঁকে বাধা দেওয়ার সুযোগই দিলেন না কাউকে। কর্নেল হাসলেন। আমার ধারণা ঠিকই ছিল দেখা যাচ্ছে। ধড়িবাজ লোক। কিন্তু হালদারমশাই আবার অকারণ ঝামেলা না বাধান। মিসেস ব্যানার্জি, আপনি প্লিজ আপনার দারোয়ান বা সারভ্যান্টকে হালদারমশাইয়ের খোঁজে বেরুতে বলুন! উনি সম্ভবত গলির ভেতরই কোথাও ওত পাততে গেলেন।
শ্রীলেখা বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে মালতী এসে ট্রে গুছিয়ে নিয়ে গেল। তার মুখ কেন যেন এখন বেজায় গম্ভীর।
কর্নেল চোখ বুজে আওড়ালেন, ম্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন। বাট ক্যান এনি ম্যান লিভ উইদাউট ব্রেড?
বললাম, সাবধান কর্নেল! আপনি কিন্তু সত্যি পাগল হয়ে যাবেন। আজ সকাল থেকে ব্রেড আপনাকে ভূতে পাওয়ার মতো পেয়ে বসেছে।
কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। কী বললে? কী বললে?
বলছি ব্রেড আপনাকে—
ব্রেড! বি আর ই এ ডি। ফাইভ লেটারস! মাই গুডনেস! বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সোজা কম্পিউটারের দিকে এগিয়ে গেলেন।
চাপা গলায় বললাম, আপনি কম্পিউটারটার বারোটা বাজাবেন কিন্তু! আপনি কখনও কম্পিউটার ট্রেনিং নিয়েছেন বলে শুনিনি।
কর্নেল কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকেছেন, এমন সময় শ্রীলেখা ঘরে ঢুকে বলে উঠলেন, কর্নেল সরকার! প্লিজ ডোন্ট টাচ। ভেরি সেনসিটিভ কম্পিউটার।
মিসেস ব্যানার্জি! আপনার স্বামীর ফাইভ লেটারস কি ওয়ার্ড আমি জানি। প্লিজ লেট মি সি হোয়াট দা মেশিন স্পিকস টু মি।
শ্রীলেখা আবার বললেন, প্লিজ ডোন্ট টাচ দা মেশিন কর্নেল সরকার!
কর্নেল গ্রাহ্য করলেন না। খটাখট শব্দ শুনলাম। ভিসন স্ক্রিনে নিমেষে নীল রঙ এবং সেই রঙের ওপর সারবদ্ধ কালো বর্ণমালা ফুটে উঠল। তারপর কর্নেল পাশ থেকে একটা কাগজ ছিঁড়ে দিয়ে বোতাম টিপে যন্ত্রটা বন্ধ করলেন।
শ্রীলেখা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কর্নেল কাগজটা পড়ে নিয়ে বললেন, মিঃ ব্যানার্জির নীলডায়াল ঘড়িটা পেলে অসম্পূর্ণ তথ্য সম্পূর্ণ হবে। ঘড়িটার। ডায়ালের উল্টোদিকে কিছু সংখ্যা আছে। তবে আই অ্যাম ভেরি সরি মিসেস ব্যানার্জি–সত্যের খাতিরে বলছি, আপনার স্বামী আপনাকে ইদানীং বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কেন পারছিলেন না, তা আপনারই জানার কথা।
শ্রীলেখা সোফায় বসে পড়লেন। ভাঙা গলায় বললেন, পেপার শিটটা দেখতে পারি?
আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। কেন আপনি আপনার স্বামীর আস্থা হারিয়েছিলেন?
জয় একথা লিখেছে? কঁপা-কঁপা গলায় কথাটা বলে শ্রীলেখা ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।
হ্যাঁ। বলে কর্নেল কাগজটা ভাঁজ করে জ্যাকেটের ভেতরপকেটে চালান করে দিলেন। তারপর এগিয়ে এসে আগের জায়গায় বসলেন। কোনও মহিলার ব্যক্তিগত গোপনীয় ব্যাপার জানার একটুও আগ্রহ আমার নেই মিসেস ব্যানার্জি! আপনি অন্তত আভাসে জানাতে পারেন। আমার জানা দরকার। কারণ আমি এই রহস্যের জট ছাড়াতে নেমেছি। আমার এই এক অভ্যাস। শেষ পর্যন্ত না পৌঁছতে পারলে নিজেকে ব্যর্থ মানুষ মনে হয়।
শ্রীলেখা ঈষৎ ঝুঁকে দু হাতে মুখ ঢাকলেন।
মিসেস ব্যানার্জি, আমি আপনার হিতৈষী।
আত্মসম্বরণ করে চোখের জল মুছে শ্রীলেখা বললেন, জয়কে আমি খুব লিবার্যাল অ্যান্ড মর্ডান ভাবতাম। জানতাম না, হি ওয়াজ সো জেলাস অ্যান্ড সো ফুলিশ, সো মিনমাইন্ডেড পার্সন।
আমার ধারণা আপনি এমন কারও সঙ্গে মেলামেশা করতেন, মিঃ ব্যানার্জি যাকে পছন্দ করতেন না। অথবা এমনও হতে পারে, তার সন্দেহ হয়েছিল আপনি তার সঙ্গে গোপন চক্রান্তে লিপ্ত?
শ্রীলেখা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে বললেন, কিসের চক্রান্ত?
কর্নেল আস্তে বললেন, ঘড়িটা পেলে তা খুঁজে বের করতে পারব। তবে মিঃ ব্যানার্জির সন্দেহ করার শক্ত কারণ থাকা সম্ভব। আপনি কি কারও সঙ্গে বেশি মেলামেশা করতেন বা এখনও করেন?
বাট হি ওয়াজ হিজ ডিয়ারেস্ট ফ্রেন্ড! শ্রীলেখা ক্ষুব্ধভাবে বললেন। তা ছাড়া সে তো এখন আমেরিকা চলে গেছে। আর মেলামেশার কথা যদি বলেন, জয়ই তার সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা ঠিক। কিন্তু তা বন্ধুতার সম্পর্ক মাত্র। তার এতটুকু বেশি নয়।
কে তিনি? কী করতেন?
অনীশ রায়। একটা বিজনেস কনসালট্যান্সি ফার্ম খুলেছিল। চলেনি। বন্ধ করে দিয়ে মাসখানেক আগে বোস্টনে গিয়ে একটা কাজ জুটিয়েছে। যাওয়ার পর আমাদের দুজনকে একই সঙ্গে একটা চিঠি লিখেছিল। দ্যাটস অল।
অনীশ ছাড়া আর কোনও
শ্রীলেখা শক্তমুখে বললেন, না।
একটু ভেবে বলুন।
না। অনীশ ছাড়া আমি কারও সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মিশিনি। এখনও মিশি না।
তাহলে মিঃ ব্যানার্জির এই গোপনীয়তার ব্যাপারটা অন্য দিক থেকে ভেবে দেখতে হবে।
বাট হোয়াট আর দোজ কি লেটারস?
আপনার নিরাপত্তার স্বার্থে এখন তা জানানো উচিত হবে না। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন হঠাৎ। আমার চুরুটের নেশা পেয়েছে। আর হালদারমশাই কোথায় গেলেন তাও দেখা দরকার। মিসেস ব্যানার্জি, কথা দিচ্ছি–শুধু কি ওয়ার্ডস কেন, সবকিছু আপনাকে জানাব। কিন্তু আমার অনুরোধ, এখন থেকে এই ঘরটা লক করে রাখুন। কেউ যেন এ ঘরে না ঢোকে। এমন কি, আপনার পি এ সুদেষ্ণাকেও এ ঘরে ঢুকতে দেবেন না। আপনি একা ঢুকতে পারেন। কিন্তু সাবধান! আপনার কথাতেই বলছি, ডোন্ট টাচ দা মেশিন।
শ্রীলেখা আগের মতো নিষ্প্রভ। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনাকে বলছি, ওই কম্পিউটার আমি ব্যবহার করার সাহস পাইনি। আমার ভয় ছিল, ভুল লেটারে আঙুল পড়লে সব কোডিফায়েড ডেটা নষ্ট হতে পারে।
একজ্যাক্টলি। যাই হোক, ওয়েট অ্যান্ড সি। চিন্তার কারণ নেই।
আমরা পোর্টিকোতে নেমে গিয়ে আবার কুকুরের গর্জন শুনলাম। শ্রীলেখা ডাকলেন, সুরেনদা!
গেটের কাছ থেকে সাড়া এল। আমি এখানে আছি দিদিভাই! বদ্রী আমাকে এখানে থাকতে বলে গেল, এদিকে মোড়ে কী গণ্ডগোল হচ্ছে শুনছি।
কর্নেল বললেন, কোনদিকের মোড়ে?
ডানদিকের মোড়ে স্যার!
কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! গাড়ির দরজা খোলো।
আমি লক খুলে স্টিয়ারিঙের সামনে বসলাম। কর্নেল বাঁদিকে বসলেন। স্টার্ট দিয়ে বেরুনোর সময় দেখলাম, শ্রীলেখা একটা প্রকাণ্ড অ্যালসেশিয়ানের গলার চেন ধরে গেটের দিকে আসছেন। সুরেন গেট খুলে দিল। শ্রীলেখা বললেন, সুরেনদা! তুমি গিয়ে বদ্রীকে ডেকে আনো। গেট বন্ধ করে যাও।
আমরা এসেছিলাম বাঁদিক থেকে। কর্নেলের নির্দেশে ডানদিকে চললাম। সুরেন আমাদের গাড়ির পেছনে আসছিল। তাগড়াই চেহারার লোক।
বড় রাস্তার মোড়ে গিয়ে দেখলাম একটা ছোটখাটো রকমের ভিড় জমেছে। একটা মোটরসাইকেল কাত হয়ে পড়ে আছে সেখানে। হালদারমশাই হাত-মুখ। নেড়ে ভিড়কে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আমাদের দেখেই বলে উঠলেন, বান্দরটা মোটসাইকেল ফ্যালাইয়া পলাইয়া গেল। সেই হিপি, কর্নেলস্যার!
কর্নেল নেমে গিয়ে মোটরসাইকেলটা দেখে নোট বইয়ে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার টুকে নিলেন। এই সময় একটা লোক কর্নেলকে সেলাম দিয়ে বলল, আমি বদ্রী আছে স্যার! আমি না এলে এই বাবুসায়েবের বহত মুশকিল হতো।
হালদারমশাই তেড়ে এলেন। শাট আপ! তুমি আমাকে আচমকা না ধরলে হালার ঠ্যাঙে গুলি করতাম!
কর্নেল বললেন, সেই হিপিকে দেখেই গুলি ছুঁড়তে যাচ্ছিলেন নাকি?
হালদারমশাই হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, না বান্দরটারে তো আমিই বাঁচাইয়া দিছি। এখানে মোটরসাইকেল টার্ন দিছে, আমিও আসতাছি, আচমকা একটা লোকে এই গাছের আড়াল থেকে অরে অ্যাটাক করতে ছুটল। তার হাতে ড্যাগার ছিল। আমি তখনই রিভলভার তুলছি। হঃ! একখান গুলি ছুঁড়ছি। জাস্ট টু গ্রেটন দা অ্যাসাসিন। বলে হালদারমশাই ভিড়ের দিকে তর্জনী তুললেন। দা ফুলিশ মব! আমারে গুণ্ডা ভাবছে! কয় কী, আমি মোটরসাইকেল ছিনতাই করছিলাম।
কে কোনদিকে পালাল বলুন?
দুইজনই গলি দিয়া গেছে। আমি ফলো করব কী–এই ফুলিশ মব আমারে আটকাইল। দেন দিস ফুলিশ ম্যান আমারে জাপটাইয়া ধরল। বলে গোয়েন্দাপ্রবর বদ্রীর দিকে তর্জনী তুললেন।
বদ্রীনাথ বলল, হাঁ, হাঁ। আমি কেমন করে জানব কী ঝামেলা হচ্ছে? তো দো আদমি আমার পাশ দিয়ে আগে পিছে ভেগে গেল।
হালদারমশাই এতক্ষণে সুযোগ পেলেন এবং গলিরাস্তায় সবেগে উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল বললেন, বদ্রী! তুমি আমার এই কার্ড নিয়ে থানায় চলে যাও। ও সি বা ডিউটি অফিসার যাকে পাও, কার্ড দেখিয়ে শীগগির আসতে বলল। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবে, আমি এখানে আছি। একটা ঝামেলা হয়েছে। ব্যস! আর কিছু বলবে না।
বদ্রী চলে গেল। ততক্ষণে আরও লোক এসে জড়ো হয়েছে। নানা জল্পনা চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা রঙ চড়িয়ে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে। কর্নেল পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে মোটরসাইকেলটা আবার খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন।
সুরেন বলল, স্যার! দিদিভাই ওয়েট করছেন! আমি গিয়ে খবরটা দিই।
কর্নেল চাপা গলায় বললেন, হ্যাঁ। তুমি যাও। তবে তোমার দিদিভাই যদি এখানে আসতে চান, বারণ করবে। ওঁকে বলবে, আমি বলেছি উনি যেন বাড়ি থেকে রাত্রে বের না হন।
সুরেন হন্তদন্ত চলে গেল।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, জয়ন্ত! গাড়িতে গিয়ে বসো।….
মিনিট দশের মধ্যেই পুলিশের জিপ এল। বুঝলাম থানা এখান থেকে দূরে নয়। জিপ থেকে একজন অফিসার নেমে সহাস্যে বললেন, আবার কী ঝামেলা বাধালেন কর্নেলসায়েব?
বিনয়! এই মোটরসাইকেলটা সিজ করে নিয়ে যাও! কালকের মধ্যে মোটরভেহিকেলস থেকে জেনে নেবে এর মালিক কে?
কিন্তু ব্যাপারটা কী?
কর্নেল হাসলেন। আমি ঘটনার পরে এসেছি। কাজেই প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে জেনে নাও। আমি চলি। থানায় ফিরে আমাকে রিং কোরো অথবা আমিও রিং করতে পারি। আচ্ছা, চলি!….
অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল অভ্যাসমতো কফি হাঁকলেন না। ইজিচেয়ারে বসে হেলান দিয়ে জ্বলন্ত চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর মিটিমিটি হেসে বললেন, তুমি বলছিলে আমি কম্পিউটার ট্রেনিং নিয়েছি কি না।
বললাম, নিয়েছেন বুঝতে পেরেছি। তবে বলেননি এই যা!
কম্পিউটারের যুগ। আমি পাখি প্রজাপতি ক্যাকটাস অর্কিড ইত্যাদি বিষয়ে এ যাবৎ যে সব তথ্য সংগ্রহ করেছি, তার পরিমাণ কম নয়। কিন্তু ক্ল্যাসিকিকেশন এবং অ্যানালিসিস করে সেগুলো সাজাতে পারলে প্রকৃতি এবং জীবজগৎ সম্পর্কে নতুন কথা জানা যাবে–এটা আমার বিশ্বাস। কিন্তু সেই পেপার ওয়ার্ক করা খুব পরিশ্রমসাধ্য। একটা কম্পিউটার থাকলে কাজটা খুব সহজ হয়। কাজেই সপ্তাহে চারদিন আমি কাছেই একটা ট্রেনিং সেন্টারে যাই। প্রাইমারি কোর্স শেষ করেছি। পরের কোর্স শেষ হলে একটা কম্পিউটার কিনে ফেলব। না–শ্রীলেখা এন্টারপ্রাইজ থেকে নয়। ওঁদের পার্সোনাল কম্পিউটার আমার কাজের উপযুক্ত নয়।
ষষ্ঠীচরণ পর্দার ফাঁকে উঁকি মেরে বলল, বাবামশাই, কফি খাবেন না?
আধঘণ্টা পরে।
ঘড়ি দেখে বললাম, প্রায় সাড়ে নটা বাজে। এত রাতে ইস্টার্ন বাইপাস হয়ে আমাকে ফিরতে হবে।
কর্নেল হাসলেন। তবু তোমার তাড়া দেখছি না। কারণ তুমি মিঃ ব্যানার্জির কম্পিউটারাইজড় স্টেটমেন্ট সম্পর্কে আগ্রহী।
ওঁর ভঙ্গি নকল করে বললাম, দ্যাটস রাইট।
কর্নেল জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে কাগজটা বের করে আমাকে দিলেন। তারপর চোখ বুজে হেলান দিলেন। কাগজের ভাজ খুলে দেখি, ইংরেজিতে টাইপ করা কিছু বাক্য–যার বাংলা করলে এই দাঁড়ায় :
কোনও মানুষ জানে না পরের মুহূর্তে কী ঘটতে পারে। তাই আমি আমাদের পারিবারিক গোপন তথ্য এই কম্পিউটারে কোডিফায়েড করে রাখলাম। ৭টা সংখ্যা এর সংকেত। সংখ্যাগুলো পাছে ভুলে যাই, তাই বাবার নীলডায়াল রোমার হাতঘড়ির পেছনে খোদাই করেছি। শ্রীলেখার কাছে আমার গোপন করা উচিত হচ্ছে না। কিন্তু তার প্রতি আস্থা রাখতে পারলাম, না। ইদানীং তার আচরণ-হাবভাব দেখে মনে হয়েছে, সে আগের শ্রীলেখা নয়। আমার সন্দেহ, সে আমার আড়ালে এমন কিছু করে, যা আমার পক্ষে ক্ষতিকর। আমি জানি শ্রীলেখা অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়ে বিপজ্জনকভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী (ডেঞ্জারাসলি অ্যাম্বিসাস)। তার অসাধ্য কিছু নেই।…
কাগজটা কর্নেলকে ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, হ্যাঁ। ভদ্রমহিলা সম্পর্কে আমারও ধারণা হয়েছে শি ইজ ডেঞ্জারাসলি অ্যাম্বিসাস।
কর্নেল বললেন, মহিলা অমন একটা কোম্পানি চালাচ্ছেন বলে? ডার্লিং! তোমার মধ্যে মেল শোভিনিজম লক্ষ্য করেছি। জগৎটা কী দ্রুত বদলাচ্ছে, তা তোমার চোখে পড়ে না।
শ্রীলেখার অফিসে খোঁজ নিন। দেখবেন কোনও পুরুষমানুষ ওঁর গার্জেন হয়ে উঠেছেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম! হালদারমশাই শেষ অব্দি কী করলেন, জানার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমি ভীষণ ক্লান্ত।
কর্নেল দরজা পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিয়ে অভ্যাসমতো বললেন, গুডনাইট! হ্যাভ এ নাইস স্লিপ।..
সল্ট লেকের ফ্ল্যাটে ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পর যখন বিছানায় শুয়েছি, তখন হঠাৎ মাথায় এল, হিপিটাইপ সেই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুবক কি ফাইভ লেটারস কি ওয়ার্ডের কথা জানে? কেন সে ওই কথাগুলো আওড়ায় এবং টেলিফোনেও শ্রীলেখা ব্যানার্জিকে কথাগুলো বলে উত্ত্যক্ত করে?
এই পয়েন্টটা আগে মাথায় এলে কর্নেলকে বলতাম। হালদারমশাই বলছিলেন রুটি রহস্য। সত্যিই তা-ই। রুটি–ব্রেড শব্দটাই শেষাবধি এই রহস্যের একটা চাবিকাঠি হয়ে উঠল!…
সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাচ্ছি, তখন টেলিফোন বাজল। বিরক্ত হয়ে ফোন তুলে অভ্যাসমতো বললাম রং নাম্বার!
রাইট নাম্বার, ডার্লিং!
সরি! মর্নিং, ওল্ড বস্!
মর্নিং জয়ন্ত! সাড়ে আটটা বাজে। এখনই চলে এস। আমার এখানে ব্রেকফাস্ট করবে।
কী ব্যাপার? হালদারমশাইয়ের–
না। গতরাতে তোমার ঘুম ভাঙাতে চাইনি। কিন্তু যে ভয় করেছিলাম, তা-ই হয়েছে। সেই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুবক গত রাতে খুন হয়েছে। আততায়ী তার পিঠে ছুরি মেরেছিল। সেই অবস্থায় সে পাঁচিল ডিঙিয়ে শ্রীলেখা ব্যানার্জির বাড়িতে ঢোকে। তারপর–না, ফোনে বলে বোঝাতে ওরিব না। তুমি এখনই চলে এস।….
