কাঙ্গপোকপি (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
বড় জাতের কুকুর মানে? অ্যালসেশিয়ান?
আমি বললাম।
তার চেয়েও বড় জাতের কুকুর আরও অনেক আছে।
যেমন?
কুকুরদের সাধারণত ছটি ভাগে ভাগ করা হয়। ধর, স্পোর্টিং ডগস, হাউন্ডস… দ্য হাউন্ডস অফ দ্য বাস্কারভিল, শালর্ক হোমস।
ভটকাই বলে উঠল।
আঃ। শোন না।
তিতির ধমকাল, ভটকাইকে।
হাউন্ড, ওয়ার্কিং–ডগস…
মানে? চাকরি করে, ওয়ার্কিং-গার্লসদের মতো?
আঃ ভটকাই, আমি বললাম।
ওয়ার্কিং ডগস, টেরিয়ারস, টয়েজ…
টয়েজ? খেলনা? খেলনা কুকুর?
হ্যাঁরে বাবা। শোন না। এবং নন-স্পোর্টিং ডগস। এই ছয় ভাগ, ব্রডলি।
তা বড় কুকুর বলতে তুমি কী বলছ?
সবই বলছি। ধর, সেইন্ট বার্নাডস, জার্মান শেফার্ড ডগস, জায়ান্ট শ্লোজার নাম শুনেই বুঝছিস জার্মান, গ্রেট-ডেন, কুলি (রাফ), মাস্টিফ; কত কুকুর আছে! একটু নজর করবি। বুঝলি।
কেন বলছ?
সে পরে বলব।
কাঙ্গপোকপি পৌঁছে পথের উপরেই সত্যিই চমৎকার একটি ধাবা কাম দোকান পাওয়া গেল। আস্তে গাড়ি চালিয়ে আসাতে এখন সাড়ে সাতটা বেজেছে। অবশ্য ঘাটের রাস্তা, তা ছাড়া পুরোটাই জঙ্গলের মধ্যে মধ্যেও। এমনিতেও ইচ্ছে করলেও খুব একটা জোরে চালানো যেত না। তার ওপরে ইচ্ছে করেই আস্তে চালিয়েছি। বালুসাই আর বড় বড় লুচি আর বেদম ঝাল-আলুর তরকারি খাওয়া হল। ভটকাই-এর ভাষায়, জমিয়ে। তিতির খেল একগ্লাস দুধ আর একটি বালুসাই। অ্যাজ ইউজুয়াল।
আমরা যখন গাড়িতে বসেই চা খাচ্ছি, বেশি-দুধে ফোঁটানো বেশি চিনি দেওয়া চা, হঠাৎ একটি সাদা মারুতি গাড়ি উল্টোদিক থেকে এসে খুব জোরে আমাদের পাশকাটিয়ে বেরিয়ে গেল, ইম্ফলের দিকে। ছেলেদের মতো ছোট করে ছাঁটা চুলের এক মহিলা একাই ছিলেন গাড়িতে। মনে তো হল, মহিলাই।
ভটকাই বলল, কী দিনকাল পড়ল। খিটক্যাল! না পোশাকে চেনার জো আছে, না চুলে। হাবেভাবে তো নয়ই! ভারতবর্ষও ইউনিসেক্সের দেশ হয়ে গেল র্যা! আমাদের সময়ের, বলেই, ঋজুদার দিকে তাকিয়ে বলল; মেয়েরা কত বিনয়ী, নম্র-সভ্য, ছিল। মেয়েদের মেয়ে বলে চিনতে পুরুষদেরও কোনও অসুবিধে ছিল না।
ঋজুদা হঠাৎ বলল, যে গাড়িটা গেল, সে গাড়ির নম্বরটা পড়তে পারলি?
না। ভটকাই বলল।
তা পারবি কেন? সবসময় এত কথা বললে কি কনসেন্ট্রেশান থাকে কোনও কিছুতেই? তুই দিনে দিনে অপদার্থ হয়ে উঠছিস। তোকে নিয়ে আর কোথাও আসব না।
ভটকাই উত্তর না দিয়ে মুখ নামিয়ে চুপ করে চা খেতে লাগল।
আমি নেমে গিয়ে পয়সা দিয়ে এলাম দোকানে। ছেলেটাকে বকশিসও দিলাম পাঁচটাকা।
ও অবাক হয়ে চেয়ে বলল, ক্যা করেগা?
তুম লেগা। হাসিতে মুখ ভরে গেল ওর।
মণিপুর আর নাগাল্যান্ডের মাঝের কাঙ্গপোকপির আশ্চর্য সুন্দর সকালের আলোও স্নান হয়ে গেল; সেই সুন্দর হাসিতে।
মনে মনে নিজেই বললাম, আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। নিঃস্বার্থভাবে মানুষের ভাল করলে, ভাল হয়ই। ওর সুন্দর হাসি আর আমার সুন্দর ভাবনাটা অন্য কেউই দেখতে বা জানতে পারল না।
ঋজুদা বলল, চল। আটটা পনেরো। এখন যাওয়া যাক আস্তে আস্তে।
দোকানেই জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলাম সানাহানবি দেবীর ফার্মের কথা। তা দোকানদার এবং আরও দু একজন ট্রাক ড্রাইভার বলল, সানাহানবি হানাহানবি নামকি কোই বাংলা হিয়া নেই হ্যায়। ফার্মভি নেই হ্যায়। মগর হাচিনসান সাবকো বাংলো ওর বাগিচ্যা হ্যায়। কুত্তে পালতি হ্যায় মেমসাব, বহত কিসিমকি। সাব তো গুজর গ্যায়া। মেমসাব হ্যায়।
কত আগে পড়বে বাংলো? এখান থেকে?
জাদা সে জাদা আধা-মিল। ডায়নে পড়েগা। রাস্তা ছোড়কর থোরাসা উতারনা পড়েগা উত্রাইমে। থোরা সা। মগর, রাস্তামে সাবকো নাম লিখা হুয়া বোর্ড মিলেগি আপকো।
বহত সুক্রিয়া।
পৌঁছে বোঝা গেল, সত্যিই দেখবার মতো বাড়িটা, মানে বাংলোটা–আর তেমনই বাগান। ইবোহাল সিং খুন না হলেও এবং সেই খুনের রহস্যের কিনারা ঋজুদা করতে না পারলেও, শুধু এই বাংলোটি দেখবার জন্যেই কাঙ্গপোকপিতে আসা সার্থক। ছাদের উপরে একটি টেরাস–তাতেও যে কতরকমের লতা ও ঝাড়, পনসাটিয়া, ফার্ন, ক্রোটন, অর্কিড; কতরকমের যে ফুল আছে এখনও অর্কিডে, গরম পেরিয়ে গেলেও! সাকুলেন্টস ও অন্য জায়গা থেকে ক্যাকটাই; টবে রাখা।
সানাহানবি দেবী পথের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। দেবী তো কতজনারই নামে থাকে! তাকে সত্যিই দেবীর মতোই দেখতে। সকালের সূর্যের আলো এসে পড়েছিল তার কোমর-ছাপানো চুলে। সুপুরুষ ইংরেজ সাহেব আর পরমা সুন্দরী নাগা মহিলার কন্যার রূপ যে কতখানি সুন্দর হতে পারে, তা যাঁরা না দেখেছেন সানাহানবিকে তা তাঁরা অনুমানও করতে পারবেন না। শুধু সানাহানবিকেও দেখার জন্যে কাঙ্গপোকপিতে যাওয়া যেতে পারে কলকাতা থেকে। তার বাংলো না দেখতে পেলেও।
সানাহানবি গাড়ি দেখেই উপর থেকে নেমে এসে পর্চ-এ রিসিভ করলেন। বললেন, আপনারা একেবারে ব্রেকফাস্টের সময়েই এসেছেন। তবে আমি খেয়ে নিয়েছি আজ তাড়াতাড়ি। একটা মিসহ্যাপ হয়ে গেছে।
কী?
ঋজুদা শুধোল।
আমার এক বান্ধবী, বান্ধবী বলব না, বলব ওল্ড অ্যাকোয়েন্টে–ইম্ফল থেকে কাল দুপুরে এসে পৌঁছেছিল এখানে। থাকবে বলে, তিনচার দিন। কিন্তু খুব ভোরে ফোন এল ইম্ফল থেকে–ওর বাবার কাছ থেকে, যে ওর দাদাকে কেউ মার্ডার করেছে, গত রাতে।
মাই গুডনেস! কোথায়? কী ভাবে?
কীভাবে হয়েছে তা তো এখনও ডিটেইলস-এ জানা যায়নি। তবে, হয়েছে মোরেতে নয়, থেংনোপালে। উঁচু পাহাড়ের জংলি রাস্তাতে। বেচারি! পাগলের মতো অবস্থা। জোর করে কিছু খাইয়ে দিলাম। সারা দিনে খাওয়া হয় না হয়। খেয়েই, ঝড়ের মতো গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।
ওঁর বাবা কী করেন? তিতির শুধোল।
ওঁর বাবার নানারকম ব্যবসা আছে। নাম থাঙ্গজম সিং। ভেরি ওয়েল-অফ। ইম্ফলে সকলেই এক ডাকে চেনেন।
ওঁর টাটা-সিয়েরা গাড়িটা নিয়েই কি আপনারা আমাদের রিসিভ করতে ইম্ফল এয়ারপোর্টে এসেছিলেন?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।
অপ্রতিভ হয়ে গেল, অত্যন্ত সপ্রতিভ সানাহানবি। ঢোঁক গিলে বলল, হ্যাঁ।
বলেই বলল, আপনি কী করে জানলেন? খুবই আশ্চর্য তো! তা ছাড়া আপনাদের আসার ব্যাপারে আমার কোনও ভূমিকা নেই। নেহাত আমার সৎবাবার সম্মানার্থে…। গাড়িটা বাবাই চেয়েছিলেন থাঙ্গজম সিং সাহেবের কাছ থেকে। তা ছাড়া বাবাকে কেউ পাঠিয়েছিল আপনাকে আনতে। সে যে কে, তা বাবা আমাকে কিছুতেই বললেন না। আপনাদের একহাজার টাকাও ফিস দিতে পারবেন না উনি, সে সামর্থ্য ওঁর নেই। তাই, আপনাদের থাকা-খাওয়ার ব্যাপারটা বাবার সম্মানরক্ষার্থেই আমি আমার দায়িত্ব বলে কাঁধে তুলে নিয়েছি।
আমি তো গোয়েন্দা। আমাকে অনেক কিছুই জানতে হয়, যা অন্যে জানে না। এটা আমার এক্সপার্টিস-এর অঙ্গ।
আপনার বন্ধু না অ্যাকোয়েন্টেসের নাম নিশ্চয়ই থৈবী দেবী। তাই না?
ভেরী স্ট্রেঞ্জ! আপনি তাও জানেন?
আরও অপ্রতিভ হয়ে বলল, সানাহানবি।
সাদা মারুতি-ডিলাক্স এখুনি চালিয়ে গেলেন। উনিই তো! কিন্তু আপনার বন্ধু, সরি অ্যাকোয়েন্টেসের সঙ্গে একজন কাউকে দিয়ে দিলেন না কেন? এই রকম মানসিক অবস্থাতে এতখানি পাহাড় জঙ্গলের পথে একা গাড়ি চালিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে?
ঠিক বলেছেন আপনি, মিস্টার বোস। আমি অনেক করে বলেওছিলাম। কিছুতেই রাজি হলো না থৈবী। দ্যাট ওজ ভেরি স্ট্রেঞ্জ। কেন যে অত জেদ করল। আমার মাইনে করা ড্রাইভার নেই বটে, কিন্তু আমার লোকজনের মধ্যে দুজন আছে, যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে এবং আমার বাবার আমল থেকেই গাড়ি চালায়, ভালই চালায়।
থৈবীর দাদার নাম কী?
ইবোবা সিং।
উনি কি থাঙ্গজম সিং-এর ব্যবসার পার্টনার?
হ্যাঁ। একই ছেলে তো।
আর থৈবী দেবী?
হ্যাঁ, থৈবীও পার্টনার। যদিও থৈবী একবছরের ছোট ইবোবা সিং-এর থেকে। তবু থৈবীই আগে পার্টনার হয়েছে। তবে ইবোবা পার্টনার হওয়ার পর থৈবীর অংশ থেকেই অর্ধেক ইবোকাকে দিয়েছেন, ওঁর বাবা। থাঙ্গজম সিং মানুষটি একটু অদ্ভুত প্রকৃতির। মণিপুরের মাতৃতান্ত্রিক পরিবেশে উনি একা হাতেই পিতৃতন্ত্র কায়েম করার চেষ্টাতে আছেন। মানুষটির সঙ্গে আমার অনেক ব্যাপারে অমিল থাকলেও ভদ্রলোক যে সেলফ-মেড ও ভাবনা চিন্তাতে ওরিজিনাল এ জন্যে আমি ওঁকে এক ধরনের শ্রদ্ধাও করি। জানি না, শব্দটা শ্রদ্ধাই কিনা। আমার ভোকাবুলারি খুব পুওর। ভদ্রলোকের বন্ধুবান্ধবও বিশেষ নেই। একাই সময় কাটান। শুধু কাজ নিয়েই থাকেন। টাকা আরও টাকা। এই তাঁর সাধনা।
ভদ্রলোকের মধ্যে একটি মাফিয়া-মাফিয়া ভাব আছে বলে হয় না আপনার?
ঋজুদা বলল।
এগজ্যাক্টলি। আশ্চর্য! আপনি কী করে জানলেন? এই শব্দটা আমার মনে এসেছে বহুবার, কিন্তু প্রকাশ করার সাহস হয়নি। আমার কেন জানি না, একটু শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা ভাব থাকলেও ভয়ও করে ভদ্রলোককে। এড়িয়ে চলি। যতদূর পারা যায়।
ইবোবা সিং-এর বিয়ে তো হয়েছে! ওর স্ত্রী যমুনা, মেয়ে কী রকম?
যমুনা? আপনি তাকেও চেনেন? মাই গুডনেস! ও, শি ইজ আ ভেরি সুইট গার্ল। পুওর গার্ল।
হোয়াই পুওর?
বেচারি ওই পরিবারের পরিবেশে একেবারেই বেমানান। ও তো মিজো। শিক্ষিত মেয়ে। ওর মা মারা যান, ওর খুবই ছেলেবেলাতে। ও মামার বাড়িতেই মানুষ-গৌহাটিতে– কটন কলেজে পড়ত। কিন্তু বাবা মিজোরামেই থাকতেন। আর্মির কর্নেল ছিলেন। হি টুক টু ড্রিংকস। মদে খেল তাঁকে। এখন প্যারালিসিস হয়ে পড়ে আছেন। যমুনার এক মামা ছিলেন ইনকামট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে। বলতে গেলে সেই মামাই গার্জেন। এবং, মানুষ হিসেবে তিনি অত্যন্ত সৎ ছিলেন। যমুনার ওপর তার মামার বাড়ির প্রভাব পড়েছিল। আর, সেজন্যই মনে হয় যমুনা এত ভাল মেয়ে হয়েছিল। যমুনার সেই মামা যখন কিছুদিনের জন্যে ইম্ফলে পোস্টেড হন, তখন থাঙ্গজম সিং প্রায় জবরদস্তি করেই এই বিয়েটা দেন। ইবোবা ছেলে খারাপ নয়। ও ওর মায়ের মতো হয়েছে। উদার মনের। দয়ালু। কর্মচারীদের বেশি মাইনে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিল। এই সব কারণেই বাবার সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকত বেচারির। যমুনার সবসময়েই মনে অশান্তি ছিল, এই কারণে। এখন তা আরও বাড়ল।
ঋজুদা চওড়া বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে পাইপ ধরাল।
আপনাদের জন্যে ব্রেকফাস্টে কী বানাতে বলব, বলুন।
সানাহানবি বলল।
ভটকাই বলল, ব্রেকফাস্ট আমরা খেয়ে এসেছি।
তা বললে কি হয়! আমার ডিপ ফ্রিজে খুব ভাল সসেজ, সালামি, বেকন এবং হ্যাম আছে। কাঙ্গপোকপির রোড আইল্যান্ড মুরগির ডিমের সঙ্গে খেয়ে দেখুন। সারা দিনে আর লাঞ্চ করতে হবে না।
ঋজুদা বলল, দ্যাটস নট আ ব্যাড আইডিয়া। আমার অন্তত, লাঞ্চ করার সময়ও আজ হবে না হয়তো।
ফাইন। সানাহানবি বলল।
তারপর বলল, ডিম, কার কীরকম হবে বলুন, প্লিজ
। বলেই, কাকে যেন ডাকল, কুলা সিং।
সুন্দর সাদা উর্দিপরা বাবুর্চি এসে দাঁড়াল। সাদা চুল, কিন্তু দাড়ি গোঁফ নেই। বোঝা গেল, হাচিনসন সাহেবের আমলের লোক।
ঋজুদা বলল, আমার ওয়াটার-পোচ।
আমি বললাম, বয়েলড; আন্ডারডান।
ভটকাই বলল, মামলেট, বলেই বলল, সরি, ওমলেট।
তিতির বলল, আমার জন্যে স্ক্র্যাম্বলড।
একটা বড় ওমলেটও করতে বলি। কুলা সিং দারুণ ওমলেট করে, টোম্যাটো, পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, আনারস, বাতাবি লেবু, চিজ আর মাশরুম মিশিয়ে। নাগাল্যান্ডের মাশরুম। আমি মাশরুমের চাষও শুরু করেছি। নিও-রিচদের মধ্যে ভাল কুকুরের চাহিদা নেই। আর এখন অধিকাংশ বড়লোকই তো তাই। সালুকি অথবা হুইপেট বা কুভাজস বা ড্যান্ডি ডিনমন্ট টেরিয়ার বা ভিজলা বা বরজোই-এর নামই শোনেনি এরা কেউ। টয়ের মধ্যেও খালি পিকিঙ্গিজ, বা শিউয়াহুয়ার বা পমেনারিয়ানের নাম জানে, কিন্তু, মালটিজ, জ্যাপানিজ, চিন, বা আফেনস্পিনসারের নাম শুনলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এখন যদি কাউকে চাওচাও বা লাসা-আপসোর কথা বলি, তো ভাবে, মঙ্গল গ্রহের জীবের নাম বলছি। না; সব ব্যবসারই একটা টার্নিং-পয়েন্ট থাকে। আমি ফুলের, অর্কিডের আর মাশরুমের ব্যবসাতেই চলে যাব। কুকুরের ব্যবসা আর চলবে না। সালুকির দাম এরা কী বুঝবে, বলুন?
ওরে বাবা! নাম শুনেই তো খিদে বেড়ে গেল। বানাতে বলুন ওমলেট। আর আমার বেকনটা একেবারে ক্রিসপ হবে। কুড়মুড়ে।
ভটকাই বলল।
হাউ নাইস অফ য়ু। য়ু আর আ ডার্লিং। প্লিজ ট্রিট মাই হাউজ অ্যাজ ইওর ওন।
সানাহানবি বলল।
তিতির আর আমি ভর্ৎসনার চোখে তাকালাম ভটকাই-এর দিকে। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।
সানাহানবি বলল, কুকুরের ব্যবসা আর করব না ঠিক করেছি, কারণ, আমার টাইগারই মরে গেল! কিছুতেই বাঁচাতে পারলাম না। ইম্ফল থেকে ভেটকে এনেছিলাম। তার আগে কোহিমাতেও দেখিয়ে ছিলাম। এক্স-রে টা করা গেল না, এইটেই দুঃখ রয়ে গেল।
কেন করা গেল না?
যেদিন নিয়ে যাই, সেদিন ইম্ফলের ভেট-এর মেশিনটা কাজ করছিল না। ভেবেছিলাম, পরের রবিবার নিয়ে যাব কিন্তু পরের রবিবারের আগেই যে সে মরে যাবে, জানব কী করে?
অসুবিধে কী ছিল?
খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল। গিলতেই পারছিল না কিছু প্রথম কদিন। তারপর গিলতে পারলেও খেতে চাইছিল না। পনেরো দিনের মধ্যে যে কুকুরটা মারা যাবে, কী করে জানব। ও ছিল আমার সঙ্গী। আমার ভাঙ্গা পুরনো অ্যামবাসাডার গাড়িতে করে যে পাহাড়ে-জঙ্গলে হুট হাট করে ইম্ফল মোরে কোহিমা বা ডিমাপুরে বা মোকচুং চলে যেতাম, সে তো ওদেরই ভরসাতে। পেছনে ওরা থাকলে কেউ ভয়ে আমার দিকে তাকাতই না। গাড়ির কাছেই আসত না।
কী কুকুর? তিতির শুধোল।
গ্রেট-ডেন।
ছবি দেখবেন? আসুন ড্রইংরুমে।
ওরা ড্রইং রুমে ঢুকে দেখল সত্যিই! টাইগার যেমন নাম, তেমনি বাঘই! তার পাশে সানাহানবি দাঁড়িয়ে। ফেডেড জিনস আর হলুদ ফ্রেড-পেরি গেঞ্জি গায়ে। বয়স আরও অনেক কম ছিল।
আসুন! দেখাই, কোথায় কবর দিয়েছি ওকে।
সবাই মিলে কয়েকটি করে সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের গায়ে গায়ে নামলাম আমরা কিছুটা। অন্যান্য পাহাড়েরই মতো এখানে টেরাসিং কালটিভেশান বা গার্ডেনিং হয়। দেখলাম, একটা মস্ত বটলব্রাশ গাছের গোড়াতে মাটি তখনও আলগা আছে। তার পাশে একটা ঝাঁকড়া চেরি গাছ, অন্য পাশে একটা মস্ত কদম।
সানাহানবি বললেন, মাৰ্বল-ট্যাব বানাতে দিয়েছি। এলেই, বাঁধিয়ে লাগাব। মাই টাইগার স্লিপস হিয়ার। আসলে ট্যাবটা আজই এসে যাবে কোহিমা থেকে। আনিয়েই বাঁধাব ভেবেছিলাম কবরটা, কিন্তু থৈবী চলে যাবার আগে বারবার মানা করে গেল। বলল, ওও থাকতে চায় ট্যাব বসাবার সময়ে। ও ফিরে আসা অবধি যেন না বাঁধাই গ্রেভটা বা ট্যাবটা না বসাই।
কেন?
ঋজুদা অন্যমনস্ক গলাতে বলল, পাইপ কামড়াতে কামড়াতে। ঠিক বুঝলাম না। ওও টাইগারকে খুবই ভালবাসত। আঙ্কল ইবোহালের মৃত্যুর দুদিন আগে, আমি ওঁর বাড়িতে গেছিলাম, মোরেতে। থৈবী গেছিল আমার সঙ্গে। টাইগারও গেছিল সঙ্গে। আমি কাউকেই খাওয়াতে দিই না টাইগারকে। নিজে হাতেই খাওয়াই কিন্তু বার্মার তামু থেকে ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গেল
সেদিন…
থৈবী যায়নি আপনার সঙ্গে? বার্মার মুতে?
না। আচ্চাও সিং-এর সঙ্গে গেছিলাম। আপনি আচ্চাও সিং-এর কথা কী জানেন? আঙ্কল ইবোহাল-এর মৃত্যুর পর থেকে সেও নিখোঁজ, কেউ মার্ডার করল নাতো! বড় চিন্তা হয় আমার, ওর জন্যে।
আচ্চাও সিং-এর কথা শুনেছি। আপনার দুর্ভাবনা অমূলক নয়।
থৈবী বলেছিল, টেক-ইওর টাইম। হাঞ্জো আছে, আমি আছি, আমরা টাইগারকে খাওয়াব।
হাঞ্জো কে?
হাঞ্জো সিং। মাসলম্যান। থৈবীর বাবার বডি-গার্ড। অনেকসময় থৈবীর সঙ্গেও থাকে। কোমরে রিভলভার নিয়ে। বড়লোকদের সঙ্গে অনেকসময়েই মোটা টাকা থাকে তো ব্যবসার জন্যে। ব্যবসার তো নানারকম হয়!
মোরে থেকে আমি ফিরে আসার পরই লক্ষ করলাম যে টাইগার যেন কেমন করছে। নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। কিছু খেতে চাইছে না। ক্রমশ দুর্বল
কে খাইয়েছিল, টাইগারকে?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল। হাঞ্জো কোথাও গেছিল কাজে। থৈবীও আঙ্কল ইবোহালের কাছে আটকে পড়েছিল। তবে খাওয়ানো হয়েছিল, ঠিক সময়েই।
কেউ বিষটিষ খাওয়ায়নি তো!
তিতির বলল।
নানা। সে সব টেস্ট তো করিয়েছি। কোহিমাতে গেছিলাম। কিন্তু ভেট সে দিন ডিমপুরে গেছিলেন। যেদিন রাতে মারা গেল সেদিনই সন্ধেবেলা ইম্ফল থেকে অন্য ভেটকে নিয়ে থৈবী নিজে এল। ভেট, দেখে বললেন, আর কিছু করার সময় নেই। আমিও বুঝতে পারিনি, যে সবকিছু, দিন-পনেরোর মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
ভেট কী বললেন? রোগটা কী?
উনি তো বললেন, দুটি রোগে একসঙ্গে আক্রান্ত হয়েছে, টাইগার।
কী? কী?
আপনি কি বললে বুঝবেন?
সানাহানবি বলল, ঋজুদাকে।
ভেট-এর মতো নয়, কিন্তু আপনি যেমন কুকুর ভালবাসেন আমিও একসময়ে–এই রুদ্র জানে সে কথা। তখন কুকুরদের অসুখ-বিসুখ নিয়ে কিছু পড়াশুনো করতে হয়েছিল। কারণ, আমি থাকতাম ওড়িশার গভীর জঙ্গলের মধ্যে, যেখানে ভেটারানারি ডাক্তার পাওয়া দুঃসাধ্য ছিল। বড় শহরের দূরত্ব ছিল অনেকই।
ও আই সি! তা ভেট বললেন, ইনফেকশাস পাপিলোমাটোসিস-এ আক্রান্ত হয়েছে টাইগার। তা ছাড়া উনি সন্দেহ করেছিলেন, টাইগারের গলাতে একটা টিউমার হয়েছে। সম্ভবত, ম্যালিগনান্ট। এবং মোরেতে খাওয়ার পর থেকেই যে অস্বস্তি, সেটা নেহাতই কো-ইনসিডেন্টাল। রোগটা আগেই হয়েছিল। সেইদিন দুপুর থেকেই অ্যাগ্রাভেটেড হয়েছিল। এরকম হয়, অনেকসময়।
বায়োপসি কি করা হয়েছিল?
না, সেও আর হল কই!
ডাক্তারের নাম ঠিকানাটা আমাকে দেবেন?
হ্যাঁ। কার্ডটাই দিয়ে দিচ্ছি। তাঁর চেম্বার, ইম্ফলের পাওনা বাজারে। থাকেন মইরাঙ্গখম-এ।
আমি বরাবর কোহিমার ভেটকেই দেখাই। কিন্তু অ্যাজ ব্যাডলাক উড হ্যাভ ইট, ডিমাপুরে গিয়ে তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়। এখনও উনি ওখানের নার্সিংহোমেই আছেন। ফোনেও কথা বলতে পারেন ইচ্ছে করলে। ইম্ফলের ভেট-এর সঙ্গে।
টাইগারকে তো আর পাওয়া যাবে না। মিছিমিছি এখন ব্রেকফাস্টটা নষ্ট কেন করি! ব্রেকফাস্টের পরে তো আমি চলেই যাব। আজকালের মধ্যে দেখাই করে নেব, ওঁর সঙ্গে। ডিটেইলস-এ আলোচনা করে নেব। টাইগার যখন এতই প্রিয় ছিল আপনার।
এই কথাতে সানাহানবির দুচোখ জলে ভরে এল।
কুকুর পোষা ছেড়ে দিয়েছি এইজন্যেই। ঈশ্বরের উচিত ছিল কুকুরকে হাতি অথবা তিমি মাছের আয়ু দেওয়া, যাতে একাধিক মালিককে রওয়ানা করিয়ে দিয়ে তবেই নিজেরা যায়, পরপারে।
ঋজুদা বলল।
ফিরে এসে, ডাইনিং রুমের দারুণ ঝকঝকে বাদামি-লালচে রঙা মেহগিনি কাঠের ডাইনিং-টেবিলে বসে মণিপুরি ম্যাটের উপরে বোন-চায়নার প্লেটে স্বাদু ডিম এবং ওমলেট, হ্যাম আর বেকন দিয়ে কড়া টোস্টের সঙ্গে খেতে খেতে, আমরা আরও অনেক কথা বলছিলাম।
ঋজুদা আমাদের বলল, তিতির আর রুদ্র এখানেই থেকে যা বরং, দু একদিন। সানাহানবিকে কম্পানি দে। আমি আর ভটকাই ফিরে আসব, কাল পরশুর মধ্যেই।
আমি বুঝলাম, আমাদের থাকাটা নিছক বেড়াবার বা সানাহানবিকে কম্পানি দেবার জন্যেই নয়, এর পেছনে গূঢ় কারণ আছে।
দুবার করে ব্রেকফাস্টের পরে, আমরা যখন চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়েছি, তখন সানাহানবি বলল, আপনারা আমার কেনেল দেখলেন না? যা দেখতে আসা।
ঋজুদা বলল, আমার একটু তাড়া আছে। আমি ফিরে এসে দেখব। তিতির আর রুদ্রকে রেখে গেলাম। আপনার স্পেয়ার বেডরুম আছে তো?
স্পেয়ার বেডরুম? আমার বাড়িতে ছ’টি বেডরুম। আগেই তো বলেছি। বাবার বন্ধুরা আসতেন শিকারে, কত কত জায়গা থেকে। আসামের চা বাগানের প্ল্যান্টার্সরা, কলকাতার ও ব্যাঙ্গালোরের রেসিং-ক্রাউড, কোহিমা ও ইম্ফল, আইজল, তুরার; শিলঙের বন্ধুরা। তখন কুড়িটি ল্যাব্রাডর গান-ডগ ছিল আমাদের। দশটি গোন্ডেন-রিট্টিভার। শিকার কুড়িয়ে আনার জন্যে। এই সেদিনও, কাঙ্গপোকপির বড় রাস্তার উপরে নাগা ও কুকিরা বসে ভেনিসন বিক্রি করত। বাঁশের উপর পেছনের দু পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখত। যে যেখান থেকে চাইত, কেটে দিত। পৃথিবীটাই অন্যরকম ছিল ক’বছর আগেও। চোখের সামনে সব কেমন বদলে গেল। ভাবা যায় না। জঙ্গলই সাফ হয়ে গেল।
আমরা ফিরে আসি, জমিয়ে আড্ডা দেব আর তখনই শুনব হাচিনসন সাহেবের পুরনো দিনের সেইসব কথা।
আমি আর তিতির ঋজুদা আর ভটকাইকে মারুতি ভ্যান অবধি পৌঁছে দিতে এগিয়ে গেলাম। সানাহানবি গেল তার ফার্মের তদারকিতে। বলে গেল যে, টাইগারের গ্রেভ-ইয়ার্ডের পাশ দিয়ে আরও উৎরাইতে নেমে গেলেও ওকে খুঁজে পাব আমরা।
ঋজুদা বলল, সাবধানে থাকিস। আর মেয়েটার উপরে নজর রাখিস।
নজর রাখিস মানে?
মানে, ও কী করে না করে। ওর কাছে কে আসে না আসে। ফোনেও ও কারও সঙ্গে কথা বলে কি না বলে। তা ছাড়া…
তা ছাড়া কী ঋজুদা? তিতির শুধোল।
তা ছাড়া মেয়েটাকে পাহারাও দিস। ওরও বিপদ হতে পারে। আরেকটা কথা। সারা রাত টাইগারের কবরের দিকে নজর রাখবি। ওখানে কোনও ঘটনা ঘটতে পারে। ওই কবরের কাছে যেই আসুক তাকে আটকাবি–। কিন্তু সানাহানবি নিজে গেলে না আটকে, ও কী করে তা দেখবি। অন্য কেউ গেলে, সানাহানবিকে জাগিয়ে দিয়ে, সকলে মিলে সেখানে যাবি।
কে আসবে টাইগারের কবরে? কেন আসবে?
আরেঃ। যা বলছি শোন না! কেউ নাও আসতে পারে আদৌ। কেন আসবে, তা আমি নিজেও জানি না। এখন আমাকে দেরি না করিয়ে, যা বলছি; তা করিস।
গাড়িতে উঠে এবারে ঋজুদা ড্রাইভিং-সিটে বসল। বলল, ভটকাই এবারে ফিরে গিয়ে গাড়ি চালানোটা ভাল করে শিখে নিতে হবে কিন্তু। সাইকেল চালাতে ও সাঁতার কাটতে জানিস তো?
জানি না? ডুব সাঁতার, চিৎ সাঁতার, বাটারফ্লাই-স্ট্রোক, ফ্রি-স্টাইল যা বলবে।
তারপরই বলল, ঋজুদা, ভেনিসন কী? ওই সানাহানবি যা বলল?
ওঃ, তুই জানিস না বুঝি? ভেনিসন মানে হচ্ছে, হরিণ জাতীয় প্রাণীর মাংস। আগে ভেনিসন বলতে শিকার করা মাংসকেই বোঝাত। এখনও ভেনিসন, ইংল্যান্ডের ও আমেরিকার সব বড় বড় হোটেল রেস্তোরাঁতেই পাওয়া যায়।
দশ কিমির মতোও যায়নি ওরা, এমন সময় দেখা গেল, সেই টাটা-সিয়েরাটা আসছে। তবে গাড়ি চালাচ্ছে অন্য একজন ড্রাইভার। পাশে বসে আছে, যোগেন
পাশ কাটিয়ে চলে যাবার সময়ে, যোগেন ড্রাইভার হাত-পা ছুঁড়ে একটা আর্তনাদ করে উঠল এবং ওদের গাড়িও জোরে ব্রেক করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঋজুদাও দাঁড় করাল মারুতি ভ্যান। টাটা-সিয়েরাটা ব্যাক করে এল এ-গাড়ির পাশে।
যোগেন বলল, বড়বাবু, মানে আমার সাহেব আপনেরে ধইর্যা লইয়া যাইতে পাঠাইলেন। ও বাংলোয় না পাইয়া আপনাগো খুঁজে বাইরাইছি। আপনারা আইতেছেন কোথনে?
যোগেনের কথার জবাব না দিয়ে ঋজুদা বলল, বড়বাবু মানে?
বড়বাবু মানে, থাঙ্গজম সিং সাহেব।
সেকী! তোমার মালিক তো থম্বি সিং বলেই জানতাম।
নানা। তিনি ফস-স-স-স। তিনি মালিক হইতে যাইবেন কীসের লইগ্যা? বড়বাবুর একমাত্র ছাওয়াল ইবোবা সিং, কাল রাতে মার্ডার হইয়া গ্যাছে গিয়া। সেই খুনের তদন্তর ভার দ্যাওনের লইগ্যা বড়বাবু পাঠাইছেন আমারে। নইলে আমার আর কি আসার অবস্থা আছে বাবু? হায়। হায়। ভটকাবাবু যা খাওয়া কাল খাওয়াইলেন! পেরাণে যে বাঁইচ্যা আছি, তাই ঢের। আমার বউডায়তে গড়াগড়ি দিতাছে। এই ড্রাইভার আপনাগো চিনে না বইল্যাই কুনোক্রমে পাশে বইস্যা আইছি। তা ছাড়া, মার্ডার বইল্যা কথা। হায় হায়। এ কী হইল কন দেহি? আমরা গাড়ি ঘুরাইয়া লইয়া আগে আগে যাইতাছি, আপনে আসেন আমাগো পিছে পিছে।
শোনো ভাই যোগেন। আমি সোজা যাচ্ছি থেংনোপালের দিকে। তুমি গিয়ে তোমার বড়বাবুকে সেখানেই আসতে বলল।
বডি তো পোস্টমর্টেমের লইগ্যা ইম্ফলেই লইয়া আইছে পুলিশে।
যোগেন বলল।
মর্গটা কোথায়?
আসেন না পিছে পিছে, চিনাইয়া দিতাছি। আমরাও তো যাইতাছি মর্গেই।
আমরা পরে আসব। এখন আমার একবার মোরেতে যেতেই হবে। থেংনোপাল হয়েই তো যাব। যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরেই, তোমার বাবুর বাড়িতে পৌঁছব সোজা। আর যদি দেরি হয়ে যায় তো কাল সকালে যাব।
বাড়ি কি আপনি চিনেন? আজই আইয়্যা যান। দাহটাহ হইতে সময়তো লাগব। তার শ্বশুর আইব না আইজল থিক্যা। তার তো আবার প্যারালিছিস। আইব ক্যামনে? পোস্ট মর্টেমও কত সময় লাগব, কে জানে!
হ্যাঁ। বাড়ি আমি চিনি। তোমাদের দিদিমণি ফিরেছেন?
দিদিমণিরেও চিনেন না কি আপনি? ইতো ম্যাজিক দেখতাছি। সানাহানবি দেবী নন কিন্তুক…
হ্যাঁ হ্যাঁ জানি। থৈবী দেবী। তিনি কোথায়?
তিনি তো সোজা থেংনোপালেই চইল্যা যাইতেছিলেন। ইম্ফলের পেট্রল পাম্প থিকা বড়বাবুরে একখান ফোন কইর্যা দিয়া।
বড়বাবু কোথায়?
উনি আছেন বাড়িতেই। পাথর হইয়া গেছেন গিয়া বাবু। এক্কেরে পাথর। হায়। হায়। একখান মাত্র পোলা আছিল।
ঠিক আছে। আমরা ঘুরে আসছি।
ঋজুদা জোরে একসিলেটরে চাপ দিল এবারে। যেখানে রাতে থাকা হয়েছিল সেই দ্য রিট্রিট বাংলোটার একদিকে কাঙ্গপোকপি, কোহিমা; আর অন্য দিকে মোরে। মধ্যে ইম্ফল। তবে মোরে যেতে হলে ইম্ফল পেরিয়ে প্রায় তিরিশ কিমি গিয়া লাংথাবাল পড়বে। লাংথাবালের পরে ওয়াইথু। তারপর থৌবল, প্যালেল। প্যালেল ইন্ডিয়ান আর্মির শেষ চেকপোস্ট। প্যালেলের পরে থেংনোপাল। ছ’ হাজার ফিটের বেশি উঁচু। থেংনোপালের পরে লোকাচো আর লোকাচোর পরেই মোরে। মোরের ওপাশে নো-ম্যানস ল্যান্ড আর তামুরও এপাশে। দুই দেশের মধ্যে পাঁচ কি.মি. নো-ম্যান্স ল্যান্ড। মধ্যে দিয়ে একটি ছিপছিপে নদী বইছে ঘন সেগুনবনের মধ্যে দিয়ে। চিউইন নদীর একটি শাখা নদী। ওই অঞ্চলের মানুষেরা বলে বার্মা নদী। বার্মার তামু থেকে মান্দালয় দেড়শো কিমি মতন।
অনেকক্ষণ একটানা বলে থামল ঋজুদা।
থেংনোপাল জায়গাটা ভারী সুন্দর। কিন্তু খুন হওয়া লাশ দেখতে গেলে সৌন্দর্য দেখার মন আর থাকে না। রাস্তার উপরে আরও কয়েকজন উৎসাহী ভ্যাগাবন্ড দাঁড়িয়ে বসে কাল রাতের খুন নিয়ে আলোচনা করছে। গাড়িটা রাখা আছে রাস্তার পাশে। লক করা। লাশ নিয়ে গেছে মর্গ-এ। গাড়িটার পাশে চারজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের হাতে লাঠি। দুজনের হাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের ম্যাগাজিন রাইফেল।
ওরা যেন কিছু জানে না এমনি করে, কীসের ভিড় হে? বলে, গাড়ি থামিয়ে নামল।
ভিড় হয়েছে, ও হচ্ছে বলে, পথপাশের বড় বড় দুটি গাছতলাতে পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান ও আনারস আর বাতাবি লেবু নিয়ে বসে গেছে। দুটি মেয়ে। পথচারী মানুষ ও গাড়ির যাত্রীদের জন্যে।
গাড়িটার চারদিকে একবার ঘুরে এসে ঋজুদা বলল, চল ভটকাই, মোরে যাই।
কাঙ্গপোকপি থেকে লোকাচো হয়ে, মোরে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা দুটো হয়ে গেল। খুব জোরে চালালেও প্রায় অচেনা জায়গার পাহাড়ি পথ ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সময় লাগেই। তা ছাড়া, শেষ সেই কবে এসেছে!
সোজা থানাতে গিয়েই উঠল ঋজুদা। থানায় ঢুকে নিজের আইডেনটিটি কার্ডটা দেখাল। থানার ও. সি হাসলেন। বললেন, এ সব এখানে মান্য নয়। তখন ঋজুদা বলল, হোম সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলব। লাইন লাগিয়ে দিন।
প্রথমে বিশ্বাস করলেন না অফিসার।
ঋজুদা তখন বললেন, ডি. জি’র সঙ্গে কথা বলব।
তাতে অফিসার নরম হয়ে বললেন, কী চান আপনি?
আমি ইবোহাল সিং-এর বাংলোটা ঘুরে দেখতে চাই। কোন ঘরে খুন হয়েছিলেন? আপনাদের ডিটেকটিভ ডির্পাটমেন্টের ফাইন্ডিংস কী? কাউকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে কি?
চলুন দেখিয়ে আনছি। যা জানি, বলছিও।
থানার ও.সি. এবং ছ’জন পুলিশ চললেন, ওদের জিপ নিয়ে।
মোরের বাংলোটা দ্যা রিট্রিট-এর চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু কমপ্যাক্ট। ছোট বাগান। চওড়া বারান্দা তিনদিকে। বাংলোটা একটা টিলার উপরে। বাড়ি বলতে স্টাডিটাই আসল। প্রায় হাজার স্কোয়ার ফিটের মতন–ডুপ্লে-উপরেও আরও হাজার ফিট। এরকম বাড়ি দেখেনি ঋজুদাও আগে। আর মেজেনিন ফ্লোরে বেডরুম। একটাই বেডরুম। স্টাডির একতলাতে থ্রি-টিয়ার-স্লিপারের মতন দুটি বাঙ্ক করা আছে। অতিথি এলে বোধহয় শোন রাতে। ব্যবস্থা দেখে, কোনও অপরিচিত অতিথি এখানে আসতেন বলে মনে হয় না। এককোণে ডানলোপিলোর গদি থাক করে রাখা আছে। ওই বাঙ্কের উপর গদি বিছিয়ে দেওয়া হয়। ডাইনিংরুমটা, মেজিনিন ফ্লোরের অন্য দিকে, তার সঙ্গেই কিচেন। কিচেনেরই পেছনে একটা স্পাইরাল সিঁড়ি, যা দিয়ে বেয়ারাবাবুর্চিরা যাতায়াত করে বাংলোতে, তাদের কোয়ার্টার থেকে। তাদের কোয়ার্টার, মেইন গেট-এর দুপাশে। যে খুন করেছে ইবোহাল সিংকে সে সম্ভবত ওই স্পাইরাল সিঁড়ি দিয়েই উঠে এসেছে। তখন বাবুর্চি বেয়ারারা হয়তো ছিলও না কেউ। ওই ঢোকার পথটি সম্ভবত বাবুর্চি বেয়ারারা বাইরে থেকেই বন্ধ করত। চাবি হয়তো তাদের কারও কাছেই থাকত। খুনি, তার মানে, এই বাংলার সবকিছুই জানত। আঁটঘাট। এখানে যাতায়াত ছিল নিয়মিত। বাবুর্চি বেয়ারাদের সঙ্গে সাঁটও হতে পারে। পাছে তার জুতোর বা পায়ের ছাপ পড়ে মেঝেতে, সেইজন্য ইবোহাল সিং সাহেবেরই ডাকব্যাকের ওভার-শ্যটি গলিয়ে নিয়েছিল, নিজের জুতোর উপরে। তার মানে, সে এও জানত যে, শু-র্যাকটি কোথায়? রাবারের ওভার-শুটি কোথায় রাখা থাকত? রাত তখন বারোটা হবে। ইবোহাল সিং তখন টেবিলে বসে পড়ছিলেন। নয়তো, চিঠি লিখছিলেন। তাঁর টেবিলের পেছনেই ছিল বিরাট খোলা জানালা। এবং ওইদিকে বারান্দা ছিল না। জানালার প্রায় পনেরো ফিট নীচে বাগান এবং লন। খুনি, সাহেবের পেছনে, যে টিল্টিং চেয়ারটা আছে; সেটা পুরো হেলানোর পরও যে তিনচার ফিট জায়গা ছিল জানালা আর চেয়ারের মধ্যে, সেখানে দাঁড়িয়েই সিং সাহেবের গলাতে নাইলনের দড়ির ফাঁস পরিয়ে দিয়ে, নিজে সেই দড়ির অন্যপ্রান্ত ধরে গরাদহীন জানালা দিয়ে ঝুলে পড়ে। তারপর লাফিয়ে নামে বাগানে। দড়ির উপরে নিজের শরীরের ভার পুরোটাই ততক্ষণই দিয়ে রাখে যতক্ষণ না ইবোহাল সিং-এর প্রাণ নিশ্চিতই না বেরোয়। প্রাণ বেরোবার আগে তিনি দমবন্ধ হওয়াতে হাত-পা ছোঁড়েন। কিন্তু দুটি পাই টেবিলের তলাতে থাকাতে বের করতে পারেননি। হাতের ঝটকানিতে বাঁ পাশে রাখা লাইটটা শব্দ করে মাটিতে পড়ে যায়। তাঁর বেডরুমের বারান্দাতে শুয়ে-থাকা চল্লিশ বছরের পুরনো বার্মিজ বেয়ারা, সেই শব্দ শুনে প্রথমটা হকচকিয়ে যায়। বুঝতে পারে না কী হল! পরক্ষণেই, যখন দৌড়ে আসে স্টাডিতে, ততক্ষণে উনি মারা গেছেন। গলার ফাঁসটা পরানোই ছিল। দড়ির অপরপ্রান্ত ঝুলছিল জানালা দিয়ে। বাগানে লুটিয়েছিল। একটা বাঁশের মই, কাঁচা-বাঁশ কেটে বানানো, লাগানো ছিল বাগানের দেওয়ালে। সেই মই বেয়েই শর্টেস্ট ডিসস্ট্যান্সের মধ্যে বাংলোর কম্পাউন্ডের ওপারে পৌঁছে যায় খুনি। স্টাডি থেকে তার বাগানে লাফিয়ে পড়া, মই দিয়ে ওঠা এবং ওপাশে রাস্তাতে লাফিয়ে পড়ার চিহ্ন স্পষ্ট ছিল ভেজা মাটিতে। কারণ, বছরে এই সময়ে এ-অঞ্চলে প্রায় রোজই বৃষ্টি হয়।
নাইটওয়াচম্যান আলাদা কেউই ছিল না কোনওদিনই।
দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরেই দারোয়ান ও বেয়ারা বাবুর্চিরা, জোরে একটা গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পায়। খাস-বেয়ারা গাড়িটাকে দেখেও, কিন্তু গাড়ির মডেল বলতে পারে না, মেকও বলতে পারে না। সে ও সব জানেও না। শুধু নাকি বলে, বড় বড় লাল আলো ছিল পেছনে। উঁচু উঁচু। এমন আলো কোনও গাড়ির; ও আগে দেখেনি। কী রঙের গাড়ি? জিজ্ঞেস করাতে সে সঠিক বলতে পারেনি। বয়সও অনেক। রাতে ভাল দেখেও না।
পুলিশ অফিসারকে ঋজুদা জিজ্ঞাসা করলেন অন্য সকলকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে, এই খাস-বেয়ারা কেন করা হয়নি?
ও চল্লিশ বছরের লোক। স্থানীয় সব মানুষই চেনে একে বহুদিন থেকে। এর সততা নিয়ে কারোই কোনও সন্দেহ নেই। বুড়োর সংসারে কেউ নেই, মানে স্ত্রী গত হয়েছে বহুদিন আগে। ও বার্মিজ। তামু আর মান্দালয়ের মাঝের এক গ্রামে বাড়ি। একটিই মাত্র মেয়ে। বিবাহিত। সেও খুবই স্বচ্ছল। বুড়ো, সিং-সাহেবকে ছেড়ে যায় না কোনওদিনই। মেয়েই আসে প্রতি বছর, বার্মিজ নববর্ষের সময়ে। নানা উপহার দিয়ে যায় বাবাকে। মেয়েও নিঃসন্তান। খাস বেয়ারা সব সন্দেহের অতীত এবং বৃদ্ধ বলেই একে অ্যারেস্ট করা হয়নি।
ঋজুদা বলল, ওকে আমি একটু আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই। আপনারা ফিরে যান আমরা যাচ্ছি এখুনি। চা খাওয়াবেন তো? আপনাদের আই.জির কাছে আমার কথা জানতে পাবেনই। আপনার আতিথেয়তার কথাও, মানে, চা খাইয়েছেন যে, তখন আমিও ওঁকে জানাব।
জিপটা চলে গেল, ঋজুদা ভটকাইকে পেছনে বসতে বলে, বুড়োকে সামনে বসাল মারুতি ভ্যানের। বুড়োর বয়সের গাছ-পাথর নেই। কিন্তু এক ধরনের জ্ঞানী বুড়ো থাকে, সব জাতেই, চৈনিক কনফুসিয়াসের মতো, যাদের বয়স চল্লিশও হতে পারে, একশো দশও হতে পারে। যাদের চেহারাতে বয়সজনিত কোনও পার্থক্যই হয় না।
ভটকাই ভাবছিল, এ বুড়ো সেই জাতের বুড়ো।
তোমার নাম কী?
ঋজুদা শুধোল।
উ-মঙ্গ।
তুমি ইবোহাল সিং সাহেবকে কত দিন জানো?
আজকে পঞ্চাশ বছরের বেশি আছি ওঁর সঙ্গে। তখন আমার তিরিশ বছর বয়স। জওয়ান। উনি ছাড়া তো আমার কেউই ছিল না। আমি ছাড়াও ওর কেউ ছিল না। ছিল, একজন ছিল। সে তো পালিয়ে গেছে।
সে কে? আচ্চাও সিং?
উ-মঙ্গ-এর ঘুমন্ত চোখে যেন ঝিলিক লাগল আচ্চাও-এর নামে।
বলল, চেনেন আপনি তাঁকে?
নামে জানি। সানাহানবিকেও জানি। আচ্চাও সিং মানুষ কেমন?
মানুষ তো ভালই সাহেব। কিন্তু রক্ত বড় গরম।
যথা?
ওই। এমনিই বললাম।
খোলসা করে বলো?
আচ্চাও সিং নাগাদের ভালবাসত।
আর তোমার সাহেব?
তিনিও। সানাহানবিকে তো তিনি মেয়ের মতোই ভালবাসতেন।
আচ্চাও-এর কিন্তু খুব বিপদ, উ-মঙ্গ।
আমাকে বলছেন আপনি? জানি আমি।
আচ্চাওকে খবর পাঠাতে হবে ও যেন এখন ভুলেও এদিকে না আসে। এলে সারাজীবন গারদে কাটাতে হবে।
ঋজুদা বলল।
বুড়ো উ-মঙ্গ কী বলতে যাচ্ছিল, থেমে গিয়ে বলল, তাকে আমি কি খবর পাঠাব? কোথায় পাঠাব? আমি কি জানি, সে কোথায় গেছে?
তুমি ছাড়া আর কেউ যে জানে না উ-মঙ্গ, সে কথা আমি জানি। তোমার ভয় নেই, আমিও তোমারই মতো আচ্চাও এর বন্ধু। সানাহানবির বন্ধু। আমি শত্রু নই। ইবোহাল সিংকে যে খুন করেছে, তাকে আমি খুঁজে বের করবই। তুমি নিশ্চিত থেকো। এই খুনটা কে করতে পারে বলে তোমার মনে হয়, উ-মঙ্গ?
আপনার কী মনে হয়?
উ-মঙ্গ প্রশ্ন করল উলটে। বলল, আমি সহায়-সম্বলহীন গরিব লোক। এখন প্রায় জরাগ্রস্তও। আমার বিপদ হলে কে দেখবে সাহেব?
আচ্চাওই দেখবে। আচ্চাও না দেখলে সানাহানবি দেখবে। সেও না দেখলে আমি দেখব উ-মঙ্গ।
আপনি? বিশ্বাস করব কী করে?
তোমার অভিজ্ঞতা দিয়েই বিশ্বাস করতে হবে উ-মঙ্গ। বিশ্বাস করার যখন অন্য কিছুই থাকে না তখন নিজের বুদ্ধি দিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিশ্বাসযোগ্যতার অন্য কোনও আমানত আমার কাছে নেই। আমারও মনে হয় যে, আমি জানি কে খুন করেছে, কিন্তু সে নিজের জন্যে খুন করেনি। তাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছে।
চমকে গেল উ-মঙ্গ। পিচুটি-পড়া চোখ দুখানি যেন চকচক করে উঠল। বুড়ো মাথা নাড়ল। বলল, শুনলাম আজ সকালে তো ইবোবা সিং, থাঙ্গজম সিংয়ের ছেলেটাও খুন হয়েছে থেংনোপালে। কী যে দিনকাল হল!
ঋজুদা বলল, তুমি আর চিন্তা করে কী করবে? এই টাকাটা রাখো। এটা পাঁচশো টাকার নোট। তোমার জন্যে নয়। তুমি আজই কাউকে দিয়ে আচ্চাওকে খবর পাঠাও। আমার মনে হয় যে, তোমার মেয়ের বাড়িতেই সে আছে। তাকে খবর পাঠাও আমার পরিচয় দিয়ে। এই নাও একটা কার্ড। বোলো যে, আমি ইবোহাল সিং-এর খুনি যে কে, তা খুঁজে বার করবই। খবর না দিলে, সে যেন
এদিকে একেবারেই না আসে।
আমার মেয়ে আসছে কাল।
কেন?
আমার অবস্থা শুনে আমাকে নিয়ে যেতে আসছে। কার কাছে থাকব আমি এখানে? চলবে কী করে?
তুমি এখন গেলে খুনি ধরা যাবে না উ-মঙ্গ। আচ্চাও-এর উপকারও হবে না। ওদের বিয়েটাও তোমার খাওয়া হবে না। মেয়ে আসছে, ভাল হয়েছে। মেয়ের মুখেই সব খবর পাঠাও।
আরও একটা কথা।
কী?
তম্বি সিং মানুষটা কেমন?
মানুষ ভাল। কিন্তু, একটা ছাগল। চিরদিনের ছাগল। ওর ছাগলামির জন্যে ওও না খুন হয়ে যায় যে-কোনওদিন। চিন্তা হয় ওর জন্যেও। কত বছরের জানাশোনা আমার, এদের সকলের সঙ্গেই। যাবে তো একদিন সকলেই। কিন্তু যাওয়ার তো একটা রকম আছে।
উ-মঙ্গ, থাঙ্গজম সিং-এর মেয়ে থৈবী সম্বন্ধে তোমার কী ধারণা?
ওটা একটা ডাইনি।
যে রুবিটা ইবোহাল সিং-এর তরোয়ালে লাগানো ছিল তা কতবড় ছিল?
ও বাবা! এত্ত বড়। বছরের একদিনই তো বের হত। আমিই তো পালিশ করতাম তরোয়াল।
তরোয়ালটাকে সরাল কে? আর, ওই রুবির কথা জানত কি সকলেই?
রুবির কথা? না। সকলে জানত না। আচ্চাও জানত, সানাহানবি জানত, তম্বি জানত, আর জানত থৈবী।
থৈবী জানল কী করে?
গত মাস ছয়েক হল, ও খুব ঘনঘনই আসত।
সানাহানবির সঙ্গে?
কখনও কখনও কখনও একাও আসত। আচ্চাও-এর সঙ্গে দহরম-মহরম এর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আচ্চাও আর সানাহানবি ছেলেবেলার সঙ্গী। হাচিনসন সাহেবও আচ্চাওকে খুবই ভালবাসতেন। বড় আত্মসম্মানজ্ঞানী ছেলে আচ্চাও। থৈবীকে পাত্তা দিত না। আপনি দেখেছেন আচ্চাও সিংকে?
না।
ওরকম সুপুরুষ মণিপুরে কমই আছে।
ঋজুদা বলল, উ-মঙ্গ আর দুটো কথা তোমাকে বলতে হবে, আমাকে। সত্যি করে। আচ্চাও আর সানহানবির ভালর জন্যেই। প্রথমত, তোমাকে পুলিশে যদি ডাকে অথবা আদালতে, তুমি জবানবন্দি ও সাক্ষী দিতে অবশ্যই যাবে। জানবে, আমারই নির্দেশে তোমাকে ডাকা হচ্ছে। কোনও ভয় কোরো না। এখানে ডি. জি. এবং হোম-সেক্রেটারিকেও আমি চিনি। তা ছাড়া তুমি তো নির্দোষ। তুমি জানো।
আমিতো নিজেই যেতাম। কিন্তু ওই থৈবী! প্রথমে ও আমাকে টাকার লোভ দেখিয়েছিল। পঁচিশ হাজার টাকা। সাহেব, সারাজীবন তামু আর মোরে করলাম। হেরাফেরি করে টাকা কামালে কি সারাজীবন এই খাস-বেয়ারা হয়ে পড়ে থাকি? টাকার লোভ আমার নেই। ছিল না এক সময়ে, তা বলব না। কিন্তু টাকার লোভ করতে গিয়ে আমার স্ত্রীকে হারাই আমি। টাকা মানুষকে কিছুই দিতে পারে না। সারাজীবন টাকার মধ্যে বাস করে এই কথাই বুঝেছি, বুঝেছি জীবনের শেষে এসে।…
তোমার মালিক হেরাফেরি করতেন না কি একেবারে?নইলে মোরেতে এসে…
মিথ্যে কথা বলব না। করতেন হয়তো, তবে একটা বয়স পর্যন্ত। তারপর বহু টাকা করার পর সব ছেড়ে দিলেন। মানুষটার যে শিক্ষা ছিল সাহেব। টাকা, শিক্ষিত মানুষের হাতে এলে তার নানা ভাল ব্যবহার হয়, অশিক্ষিত মানুষের হাতে টাকা গেলে তারা রাবণ হয়ে ওঠে। শিক্ষা বলতে, ছাপের শিক্ষা বলছি না। আজকাল তো ছাপে ছাপে অস্থির। কিন্তু ছাপছাড়া হাচিনসন সাহেব, ছাপওয়ালা আমার সাহেব বা আচ্চাও-এর মতো মানুষ আজকাল দেখি কোথায়? সানাহানবির মতো মেয়ে? থৈবী নাম হওয়া উচিত ওরই, রাজ কুমারী থৈবী। যেমন চেহারা, তেমন ব্যবহার; সত্যিই রাজকুমারী! তা, থাঙ্গজম সিং-এর ডাইনি মেয়ের নাম হল থৈবী। আরও একটা কথা। আমার সাহেব ইবোহাল সিং মোরেতে পড়েছিলেন, অন্য কারণে। টাকার জন্যে নয়। উনি একজন বার্মিজ মেয়েকে ভালবেসেছিলেন, খুব অল্প বয়স থেকেই। কিন্তু মেয়েটি তাকে বিয়ে করেনি। তার নাম, উবাথিন। এখন মান্দালয়ে মস্ত বড় ব্যবসায়ীর বউ সে। সে প্রতিবছর বুদ্ধ-পূর্ণিমার দিনে তামুর প্যাগোডাতে পুজো দিতে আসে। যখন আসে, তখন মোরেতে এসে সাহেবের সঙ্গে একটা দিন কাটিয়ে যায়। গল্প করে, খায়-দায়। তার চার ছেলে মেয়ে। বড় বড় হয়ে গেছে সব। তারাও সকলে আসে। তার স্বামীও আসেন।
উ-মঙ্গ একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার বয়স হল আশির ওপর। কম তো দেখলাম না। এই পৃথিবীতে কে যে কীসের জন্যে কী করে, কে যে কী চায়, কেন চায়; এ সব আজও বুঝে উঠতে পারলাম না। যে কোনও মানুষকে ভাল অথবা মন্দ বলার আগে দশবার বিচার করা উচিত। নিজের ভুলের কথা ভাবা উচিত।
ঠিক।
ঋজুদা বলল।
তারপর বলল, চলি উ-মঙ্গ।
বলে, ঋজুদা নমস্কার করল বুড়োকে। ভটকাইকে বলল, প্রণাম কর।
ভটকাই মনে মনে বিরক্ত হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।
উ-মঙ্গ অভিভূত হয়ে গেল, মনে হল। চোখ মুখ আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল। বলল, আমার সাহেবের খুনিকে ধরিয়ে দাও। তারপর আমি তোমাকে ইরোম্বা খাওয়াব একদিন। নিজে বেঁধে।
ঋজুদার জিভে যেন জল এল। বলল, ইরোম্বা! আঃ। কতদিন খাইনি। উ-মঙ্গ, জব্বর করে ঝাল দিয়ো কিন্তু।
উ-মঙ্গকে নামিয়ে দিয়ে ভটকাইরা এসে পুলিশ স্টেশনে চা খেল।
ঋজুদা বলল অফিসারকে, আমি নিজে হয়তো আসতে পারব না। একে পাঠাব, সঙ্গে আরও দুজনকে। ওদের একটু বার্মার মুটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবেন স্যার– প্যাগোডা, বাজার, যদি টুকটাক কিছু শপিং করে। স্যুভেনির হিসেবে।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমাদের যাওয়া-আসার উপরে কোনও বিধি-নিষেধ নেই। দুপক্ষেরই। ঝগড়া যা, নিউ দিল্লি আর রেঙ্গুনের মধ্যে। আমাদের মধ্যে ঝগড়া নেই। বলেই বললেন, স্যার ডি.জি. সাহেবের পি.এ. দুবার ফোন করেছিলেন আপনাকে। আমি এক্ষুনি জিপ পাঠাচ্ছিলাম, আপনার কাছে।
আমাকে? আমি তো এখনও যোগাযোগ করিনি।
না। উনি বললেন কলকাতা থেকে চিফ-সেক্রেটারি কারও ফোন পেয়ে হোম-সেক্রেটারিকে বলেছেন, উনি ডি. জি. সাহেবকে বলেছেন। মণিপুর পুলিশ এখন ইবোহাল সিং আর ইবোবা সিং-এর খুনিকে ছেড়ে আপনাকেই গোরু-খোঁজা করে বেড়াচ্ছে।
লাগান ফোন। নাম কী, ডি. জি. সাহেবের?
স্যার আমরা আদার ব্যাপারী। জাহাজের খবর কি রাখি? ডি. আই. জি-ই আমাদের ভগবান। তার উপরে আই. জি. তারও উপরে ডি. জি.। তবে শুনেছি। যে, তিনি অন্য ক্যাডারের। মানে, মণিপুরের নন।
লাইন মেলাতে প্রথমেই পি. এ. কথা বললেন, তারপর ডি.জি. নিজে।
ঋজুদা বলল, গুড আফটারনুন। তারপরই হাসি।
তারপর ইংরেজিতে বলল, ইওর অফিসার হিয়ার হ্যাঁজ এক্সটেনডেড অল হেলপ টু মি। থ্যাঙ্ক য়ু ভেরি মাচ। আই শ্যাল সি য়ু দিস ইভনিং অ্যাট ইওর রেসিডেন্স। হোয়াট টাইম ডু ঝু গো টু বেড? নো, নো, বিকজ আই মে বি লেট।
থ্যাঙ্ক য়ু ভেরি মাচ। নো নো, নট টু নাইট। উই উইল হ্যাভ ডিনার আফটারওয়ার্ডস। বাট নট টু নাইট। থ্যাঙ্ক য়ু।
থ্যাঙ্ক য়ু।
ফেরার পথে, যেখানে মারুতি ওয়ান থাউজ্যান্ডটা ছিল পথের উপরে, খুনের জায়গাতে, সেখানেই মারুতি ভ্যানটা রেখে, ঋজুদা একা ডানদিকের একটা সঁড়িপথ দিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে গেল, ভটকাইকে একা বসিয়ে রেখে। এদিকে সন্ধে প্রায় হয়ে এল। ভয় করতে লাগল ভটকাই-এর।
ঋজুদা ফিরে এল যখন, তখন সঙ্গে একজন স্থানীয়, বয়স্ক মানুষ এগিয়ে দিয়ে গেল। ভ্যানটা স্টার্ট করে নিজেই বলল, একজন পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে এলাম। এঁর নাম রঘুমণি সিং। জোতদার। থেংনোপালে একবার একটা ম্যান-ইটিং টাইগার বেরিয়েছিল। তখন সেই বাঘ মারতে এসে রঘুমণি সিং-এর বাড়িতেই ছিলাম। এখানেই। সেই থেকেই বন্ধুত্ব।
একটু চুপ করে থেকে ভটকাই বলল, ঋজুদা ইরোম্বা কী জিনিস?
ওঃ। ইরোম্বা? শুঁটকি মাছের এক দারুণ মণিপুরি প্রিপারেশান। ভাল কথা, আমরা কলকাতা ফেরার আগে মনে করিয়ে দিস আমাকে, তিতিরকে একটা পারিজাত-পারিং কিনে দেব।
সেটা কী বস্তু?
মণিপুরি মেয়েদের গলার গয়না। এখানে এসেও ওকে একটা পারিজাত-পারিং কিনে না-দেওয়াটা অন্যায় হবে।
.
ডি. জি. সাহেবের বাড়ির সামনে গাড়ির মেলা লেগে গেছিল। আই. জি. ক্রাইম, আই. জি. বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সেস, আরও কে কে।
যখন ওদের নীল মারুতি ভ্যানটা বেরোল, তার পেছনে পেছনে একটা সাদা-রঙা মারুতি জিপসিও বেরোল। তার পেছনে পেছনে একটা পুলিশের জিপ।
পুলিশের জিপটাকে মোড়ে দাঁড় করিয়ে রেখে ঋজুদা থংগলবাজারে পৌঁছেই পবন টাঁইওয়ালাদের দোকানের সামনে পি পি করে হর্ন বাজাতে লাগল। তখন রাত এগারোটা বাজে। ওরা শুয়ে পড়েছিল। দোতলার বারান্দাতে পবন এসে দাঁড়াতেই ঋজুদা বলল, এত রাতে বিরক্ত করার জন্যে মাপ করে দাও, পবন। তোমার সাড়ভাই-এর গাড়ি অক্ষত অবস্থাতে ফেরত দিয়ে দিলাম। পেট্রল ট্যাঙ্ক ফুল করা আছে, যেমন ছিল। পরে যখন আসব তখন কথা হবে। তাড়াতাড়ি কাউকে পাঠাও। চাবিটা দেব।
পবন নিজেই নেমে এল। ধুতির উপরে হাতকাটা গেঞ্জি পরে ছিল। ডানহাতের চারখানা আঙুল নেড়ে পবন বলল, হুয়া কা সাব, বলিয়ে না? ফিন খুন হুয়া থাঙ্গজম সিংকো নেক লেড়কা, ইবোবা সিং। ই ক্যা হো গ্যায়া ইম্ফল কা?
ঋজুদা বলল, সব বাতায় গা। আইস্তা, আইস্তা। আভিতক ম্যায়ভি অন্ধাই হুঁ।
ঋজুদা আর ভটকাই সাদা মারুতি জিপসিতে এসে বসল। সার্জেন্ট এসে ঋজুদাকে বলল, মে উই গো ব্যাক স্যার?
প্লিজ। থ্যাঙ্ক য়ু ভেরি মাচ।
জিপসিটা বড় রাস্তায় পড়তেই ঋজুদা বলল, এই গাড়িগুলো দারুণ। শুধু সামনের সিটগুলো যদি একটু বেশি বড় করত। লম্বা-চওড়া মানুষের পক্ষে দূরের পথ ড্রাইভ করে যেতে একটু কষ্ট হয়।
ভটকাই অধৈর্য হয়ে গেছিল। বলল, কী হল বলো না ঋজুদা। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
শনৈঃ শনৈঃ।
ভটকাই-এর কথাই ভটকাইকে গিলিয়ে দিল ঋজুদা। তোকে এখন সব বললে আবার তিতির আর রুদ্রকে দুবার করে বলতে হবে। তা ছাড়া বলার সময় এখনও আসেনি।
সানাহানবিই মেইন কালপ্রিট। অত সুন্দরী যে মেয়ে, তার মন কখনও সুন্দর হয়? কী মিষ্টি মিষ্টি কথা। কী কায়দা দাঁড়ানোর, হাসির; লেডি ডাই। তবে এ কথা ঠিক যে প্রিন্সেস ডায়ানার ডাবল বলে পৃথিবীর যে কোনও জায়গাতে গিয়েই ও দু নম্বরী করতে পারে। রূপও ওরকম আবার মানুষও ভাল হবে, তা কী হয়?
আচ্ছা ঋজুদা, ডায়নাকে প্রিন্সেস ডাই বলে কেন সকলে? এতই ভালবাসে তো মরতে বলে কেন?
গাধারে! ডায়ানা শব্দটির ইংরিজি উচ্চারণ ডাইআনা। তাই, নামের প্রথমটুকু ওরা বলে, ভালবেসে বলে, প্রিন্সেস ডাই।
ও। তাই বলো। অনেকদিন পরে এ একটা হল স্টক। বাগবাজারে রকে গিয়ে মন্টেদের তাক লাগিয়ে দেব।
আচ্ছা, তোমার যোগেন ড্রাইভারকে কেমন মনে হয়? ওতো পাই।
স্পাই কি না জানি না। কিন্তু আগে পেটটা পুরো ঠিক হোক বেচারার, তারপর ওর কথা। ওকে যা শাস্তি তুই দিয়েছিস, তাতো গারদবাসের চেয়েও বেশি।
আচ্ছা, একটা কথা অন্তত বলো? রুবিটা কোথায় আছে এখন? বার্মাতে পাচার হয়ে গেছে? আমার তো মনে হচ্ছে উ-মঙ্গ-এর মেয়ের বাড়িতে আছে।
তা হবে হয়তো। তুই যখন বলছিস। তার আগে বল যে, হিরে দামি না রুবি। দামি?
হিরে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামি এ কথা আর কে না জানে!
ভুল কথা। বড় রুবির মতন দামি আর কোনও পাথরই নেই এই গ্রহে। তবে বড় রুবি পাওয়া ভারী দুষ্কর। ভাল রুবির রং কী রকম হয় জানিস?
কীরকম?
ঠিক পায়রার রক্তের মতন লাল।
পায়রার রক্তের লাল আবার অন্যরকম লাল না কি?
হ্যাঁ। লালের কতরকম হয়! চোখ খুলে দেখলেই দেখতে পাবি। কত রকমের সবুজ, কতরকমের হলুদও হয়।
এই সব পাথর কোথায় পাওয়া যায় ঋজুদা?
গাছে তো পাথর ফলে না। মাটির নীচে পাওয়া যায়, নানারকম প্রস্তরীভূত স্তরের ফাঁকে ফাঁকে। সোনা, রুপা, প্লাটিনাম, কয়লা, মানে, ব্ল্যাক-ডায়মন্ড, গ্রাফাইট, ব্রিসস্টোন, হিরে, এইসব হচ্ছে কার্বন মিনারেলস। আবার বেরিল, এমারাল্ড, অ্যাকুয়ামেরিন এ সব হচ্ছে বেরিলিয়াম মিনারেলস। ইউরেনিয়াম মিনারালস-এর মধ্যে আবার আছে পিচব্লেড, টর্বেনাইট। রুবি, স্যাফায়ার, করাম এ সব হচ্ছে অ্যালুমিনা মিনারেলস। ওপাল-ওনিক্স, ক্রাইসোপ্রেস, কার্নেশিয়ান, আগাটে এই সব আবার হচ্ছে চালসেডনি ভ্যারাইটির। আমার টোপাজ, গার্নেট আর কারনেশিয়ানের রং সবচেয়ে সুন্দর লাগে। এমারেল্ড, অ্যাকুয়ামেরিন এবং জারকন-এর হালকা ও গাঢ় সবজে রংও খুব ভাল লাগে।
আরও পাথর আছে?
আরও কতরকম আছে? আমি আর কতটুকু জানি। তোর সঙ্গে কলকাতায় গিয়ে অরুণবাবুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। জিওলজিস্ট। কত কী জানতে পারবি। তবে বার্মা কিন্তু রুবির জন্যে বিখ্যাত। বার্মাতে মোগক বলে একটা জায়গা আছে, সেখানকার রুবি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে দামি। যে রুবি নিয়ে এ কাণ্ড সেটা হয়তো খুব সম্ভব মোগক-রুবি। কলকাতা পি. সি. চন্দ্রর বড়বাবু শ্রীজওহরলাল চন্দ্র দেখলেই বলতে পারবেন। বার্মার রুবির মতন শ্রীলঙ্কার স্যাফায়ার, দক্ষিণ আফ্রিকার কিম্বারলির হিরে, ট্রানসভাল-এর কোরান্ডাম, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস-এর ওপাল, ব্রাজিলের কোয়ার্টজ এ সব বিখ্যাত। এত কি আর মনে রাখা যায়, না আমি জিওলজির ছাত্র?
এগুলোর বাংলা নাম কী?
এই রে! এ সব দামি দামি জিনিসের খবর বড়লোকেরাই জানে। আমার মায়ের দুকানে দুটি মুক্তো, তাও ঝুটো ছিল কিনা জানি না, ছাড়া আর কিছুই তো নিজে চোখে দেখিনি। মুক্তো মাটির নীচে হয় না, জলে, সমুদ্রে হয়, ঝিনুকের মধ্যে। গরিবের ছেলেকে এ সব এমব্যারাসিং কথা জিজ্ঞেস করিস কীসের জন্যে?
আচ্ছা, তা হলে ইবোহাল সিং-এর সব সম্পত্তি কে পাবে? উইলের কোনও হদিস কি পেলে?
নাছোড়বান্দা ভটকাই বলল।
ঋজুদা বলল, না।
ভটকাই বুঝল যে চেপে যাচ্ছে।
আচ্ছা ঋজুদা উ-মঙ্গ মানে কী?
বর্মী ভাষায় বড়দের বলে উ, ছোটদের বলে মাও আর সমবয়সিদের বলে কো। বুঝেছিস।
বুঝেছি। মানে উ-ঋজু, কো-তিতির, আর মাও-পটলা।
পটলাটা কে?
আমার পিসতুতো ভাই। চার বছরের ছোট।
ও। বর্মি ভাষায় র অক্ষরটা নেই–মানে ‘R’-এর উচ্চারণ করতে পারে না ওরা। রুদ্রকে বলবে উদ্র, রামকে বলবে ইয়াম। সাহেবরা যেমন অ বলতে পারে না।
পারে না? ভটকাই অবাক হয়ে শুধোল।
পারে কি? তা হলে তো ইংরেজরা বর্ধমানকে বর্ধমানই বলত, বার্ডোয়ান বলত কি? অনিতা বা অমিতাভ বলতে পারে কোনও ইংরেজ?
পাঞ্জাবিরাও পারে না। ভটকাই বলল।
অনিতাকে সাহেবরা বলবে অ্যানিটা, অমিতাভকে অ্যামিটাভ।
ভটকাই বলল, আর পাঞ্জাবিরা বলবে, আনিতা, আমিতাভ।
ঠিক।
তারপরই পেটে হাত দিয়ে বলল, ঋজুদা বারোটা বাজে। পেটটা পিঠের সঙ্গে লেগে গেছে। যা খিদে পেয়েছে না। এখন গিয়ে কাঙ্গপোকপিতে সানাহানবিদের বিরক্ত করবে? তার চেয়ে চলো দ্যা রিট্রিট-এ থেকে যাই রাতটা।
বিরক্ত কাউকেই করা ঠিক নয়।
তবে রাতটা কাটাবে কোথায়?
চল, কাঙ্গলোটোংবীর কোনও ধাবাতে চৌপায়াতে শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দিই। রুটি আর আন্ডা তড়কা খেয়ে। কাল সকালে যাব কাঙ্গপোকপিতে।
যা বলবে তুমি। কিন্তু আবার আন্ডা? পেটে মুরগি ডাকবে যে।
তোর যা খুশি খাস।
পালক-পনির খাব।
একটা জিনিস ভাল হল যে, গাড়িটা নতুন। চিনবে না সহজে। মারুতি ভ্যানটা হয়তো চিনে গেছিল।
কারা? কাদের কথা বলছ?
যারা আমাদের চিনতে চায়। খাওয়া দাওয়ার পর দড়ির খাঁটিয়াতে শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে ভটকাই একটা বড় হাই তুলল।
কীরে। কী হল?
নাঃ। ভাবছিলাম, দ্যা রিট্রিট-এর ডানলোপিলো লাগানো বিছানাগুলো কী আরামের। গিজারও ছিল। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে চান করলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যেত।
কী হল? এরই মধ্যে ক্লান্তি? রুদ্র আর তিতির তো তিনদিন তিনরাত কিছু না খেয়ে একটুও না ঘুমিয়ে লড়ে গেছে, রুআহাতে, আর তুই..
ছারপোকা।
ছারপোকা, মাছি, মশা এইসব বাহ্যিক অসুবিধাই যে মানিয়ে নিতে না পারে সে কি সাধক হতে পারে? গোয়েন্দাগিরি হচ্ছে একটা বিশেষ সাধনা। বুঝেছিস?
ভটকাই পাশ ফিরে শুতে শুতে দেখল যে, ঋজুদা চৌপায়ার উপরে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে পাইপ খাচ্ছে আর পথের পাশের মস্ত কদম গাছটার দিকে চেয়ে কী সব ভাবছে। একমনে।
ভটকাই ঋজুদাকে পুরোপুরি চেনে না। চিনলে জানত যে, ঋজুদা আজকের রাতটা চিন্তা করেই কাটিয়ে দেবে। জ্যামিতি, অ্যালজাবরা, এরিথমেটিক, স্ট্যাটিসটিকস, সব মস্তিষ্কের কম্পিউটারে জ্বলবে আর নিভবে। নিভবে আর জ্বলবে।
ভটকাই-এর খুবই ইচ্ছে করে যে, ঋজুদার শাগরেদ হয়। কিন্তু ঘুমে চোখ জড়িয়ে গেল। আর চিন্তা করা গেল না।
.
আগামীকাল দ্বিজেন মেসোর শ্রাদ্ধ। রাসবিহারী অ্যাভিনিউতেই হবে। থাকলে যেতাম। আমাকে কেন জানি না, উনি বিশেষ ভালবাসতেন। ওঁর একটা ডজ কিংগসওয়ে গাড়ি ছিল, হালকা হলুদ রঙা। গাড়িটা আমাকে চালাতে দিতেন, যখন আমি বেশ ছোট, তখনই।
আজ পূর্ণিমা। বালিশের তলা থেকে হাতঘড়িটা বার করে দেখলাম। রাত সাড়ে বারোটা। বাইরে ফুটফুট করছে জ্যোৎস্না। হাচিনসন সাহেবের ফার্ম হাউসের যেখানে যেখানে ফাঁকা জায়গা আছে, গাছ গাছালির ছায়া নেই, সেই সব জায়গা রুপোঝুরি। ছায়া বসে আছে এখানে ওখানে, ঘাপটি মেরে, বাঘের বা চিতার মতো। আর আলো-ছায়ার সাদা কালো ছড়িয়ে গেছে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া উপত্যকায়। বাঁদিকে, নাগাল্যান্ডের দিকে।
প্রকৃতির কোনও ভাগ নেই, দাগ নেই, চেকপোস্ট নেই, সে আদিগন্ত, বিস্তৃত, উদাত্ত। মানুষই তার ভাষা, তার গায়ের রং, তার আচার ব্যবহারের পার্থক্য দিয়ে প্রকৃতির চোখে গড়ে তুলেছে নানা বিভেদ। চেকপোস্ট বসিয়ে রাজ্যকে ভাগ করেছে, প্রকৃতির মধ্যে। সীমানা চিহ্ন দিয়ে দেশকে ভাগ করেছে, দেশের সঙ্গে।
কিছুদূরেই মাও’। যেখান থেকে নাগাল্যান্ড আরম্ভ। জানলা খুলে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, সানাহানবির প্রিয় কুকুর টাইগারের কবরের দিকে চেয়ে। তিতির শুয়েছে সানাহানবির লাগোয়া ঘরে। আমার ঘরটা দূরে।
অল্প অল্প হাওয়াতে আন্দোলিত হচ্ছে গাছগাছালির হাত, হাতের আঙুল। নানা গড়নের ছায়ারা কালোতে আলপনা আঁকছে আলোর চাদরে। না, সন্দেহজনক কিছুই এ পর্যন্ত দেখা যায়নি কবরের কাছে।
জানলাটা খোলা রেখেই শুয়ে পড়লাম আবার। ঘুমের মধ্যেও কান সজাগ থাকে আমার। ঋজুদার কল্যাণে নানা জায়গার জঙ্গল পাহাড়ে তৃণভূমিতে রাতের পর রাত কাটিয়ে, আমার ইন্দ্রিয়গুলোর ধার বেড়ে গেছে অনেক। চোখ, কান, নাকের ক্ষমতা তো বহুগুণান্বিত হয়েছেই, অসাধারণ হয়েছে ষষ্ঠবোধের ক্ষমতা। এ বারবার অনুভব করে পরীক্ষিত সত্য হয়ে গেছে। তাই আবার ঘুমিয়ে পড়লেও আমি জানি, সামান্যতম শব্দতেও আমার ঘুম ভেঙে যাবে। এমনকী কবরের দিকে শব্দহীন পায়ে কেউ এগোলেও আমি জেগে যাব। অনেক মানুষখেকো বাঘের মোকাবিলা করে আমি নিজেও মানুষখেকো বাঘের মতো সাবধানি ও সজাগ হয়ে গেছি।
বেচারি ভটকাই এখন কোথায় কে জানে! ঋজুদার খপ্পরে আমরা এখন অভ্যস্ত। ওর সময় লাগবে অনেক।
***
ভটকাই অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎ পেটের পাশে আচমকা খোঁচা খেয়ে চোখ মেলল। দেখল, ঋজুদা তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঋজুদা বলল, উঠে পড়। এখুনি ভোর হবে। চোখমুখ ধুয়ে, চা খেয়ে তৈরি হয়ে নে। এখুনি তোকে বাস ধরে যেতে হবে ইম্ফলে।
ইম্ফলে?
হ্যাঁ।
কেন?
এত প্রশ্ন করিস কেন? যা বলছি শোন। এই নে, চা খেয়ে এই চিঠিটা নিয়ে যাবি পুলিশের ডি. জি-র বাড়িতে। আমার একটা কার্ডও রইল। এই কার্ডটা দেখাবি, যদি কেউ ছেলেমানুষ বলে ঢুকতে না দেয়। তারপ জি. ডি-এর হাতে এই চিঠিটা দিবি। সিল করা আছে।
ইম্ফল যাব আবার? পথে দ্যা রিট্রিট-এ নেমে পড়ে একটা ফোন করে দিলে হত না।
না। হত না। যা বলছি তাই কর। চিঠি দিয়ে আবার বাসে করেই ফিরে আসবি হাচিনসন-এর বাংলোতে। গাড়িটা যদি চালাতে পারতিস তবে জিপসিটা নিয়েই যেতে পারতিস। যতদিন না ভাল গাড়ি চালাতে শিখছিস, ভাল হিন্দি আর ইংরিজি বলতে শিখছিস তোকে নিয়ে আর কোথাও আসব না। তিতিরকে দেখতে? কতগুলো ভাষা জানে। ওই সব ভাষা কি স্কুলে শিখেছে? রামকৃষ্ণ মিশনে শিখেছে, তারপর ওই ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ভাষাগুলো রপ্ত করেছে। ইচ্ছা থাকা চাই। তা তো নয়। খালি সমানে লোকের পেছনে লাগবি, ভাঁড়ামো করবি আর ভাববি সেইটেই সবচেয়ে বাহাদুরির। এই নে, একশো টাকা রাখ। খিদে তো পাবেই। ইম্ফলে কোনও দোকানে ভাল করে করে খেয়ে নিয়ে তারপর বাসে উঠিস। কোহিমার বাসে উঠবি। টিকিট কাটবি ‘মোরাং’-এর, কিন্তু নেমে যাবি কাঙ্গপোকপিতে।
টাকা তো আমার কাছে আছে। মোরাং’-এর টিকিট কাটব কেন?
কেউ যাতে আগে থেকে বুঝতে না পারে তুই কাঙ্গপোকপিতে আসছিস সেই বাসে তো আমাদের ভাল চায় না এমন কেউও থাকতে পারে। মাথা দিয়েছেন ঈশ্বর, মাথাটাকে খাটা। যত খাটাবি মাথা তত খাটবে। এই একটিই যন্ত্র আছে দুনিয়াতে, যা খাটনিতে তেজি হয়, ঝিমিয়ে পড়ে না।
ঋজুদা, তুমি রাতে কোথায় গেছিলে? আমি দুটো নাগাদ একবার ঘুম ভেঙে উঠেছিলাম। দেখলাম তুমি নেই। মারুতি জিপসিটাও নেই।
আর বলিস না। গেছিলাম ‘দ্য রিট্রিট’-এর কাছেই। দেখলি না, পথের উপরে একটা এস. টি. ডি, আই.এস.ডি-র দোকান ছিল। সেখানে গেছিলাম কলকাতায় ফোন করতে।
কাকে?
সনৎদাকে। গ্রেড ডেন কুকুর এবং তাদের অসুখ বিসুখ সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল।
জিজ্ঞেস? রাত আড়াইটায়?
কী আর করা যাবে! রেগে একেবারে কাঁই। তারপর যখন বললাম, ইম্ফল থেকে বলছি, তখন রাগ পড়ল। তবে যা জানার, জানা হল। এই বড় কথা।
আর? আর কাকে করলে ফোন?
গদাধরটার কথা মনে হচ্ছিল খুব। তাকেও করলাম একটা।
রাত আড়াইটাতে? সেও তো হার্টফেল করে মরতে পারত।
না, না, তার অভ্যেস আছে। কিন্তু মনে যা হয়েছিল, তাই।
কী?
জ্বর হয়েছে গদাধরের। বেশ ভাল জ্বর। আমাদের তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে এখান থেকে। আমি ছাড়া গদাধরের কে আছে বল আর? সারাটা জীবন, বিয়ে-থা করল না। আমার সেবাতেই কাটিয়ে দিল। তাকে আমি না দেখলে অত্যন্ত অন্যায় কাজ হবে।
তা ঠিকই বলেছ।
বলল বটে ভটকাই, কিন্তু মনে মনে মোটেই খুশি হল না। সাঙ্গাই, অর্থাৎ নাচুনে হরিণ দেখা হয়নি এখনও, লাকটাক লেক-এ যাওয়া হয়নি, সেই হ্রদের উপরে উদ্ভিদের ভাসমান গালচে, ফুমডি দেখা হয়নি। বার্মার মুও দেখা হল না। আরও কত কী। মনে হচ্ছে যাত্রাটা একবারেই ভাল হয়নি।
তারপর বলল, ওই যে বাস আসছে। আমি তবে যাই।
চা খেলি না?
না এখনও তো অন্ধকার আছে। ইম্ফলে গিয়েই খাব এখন, কাজ সেরে।
.
ভটকাই ফিরে এল সকাল দশটা নাগাদ। আমার আর তিতিরের কোনও কথার উত্তর না দিয়ে সোজা ঘরে গিয়ে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল।
ঋজুদা ফিরল তার ঘণ্টা দুয়েক পরে, সাদা মারুতি জিপসি নিয়ে। তবে সেদিন নয়। তার পরদিন। চিন্তাতে ফেলেছিল আমাদের। গাড়ি বদল কখন হয়েছে জানি না। ভটকাই হয়তো জানত। কিন্তু পাকা গোয়েন্দার মতো সব কিছুই চেপে গেছে, আমাদের কাছে।
হর্ন বাজিয়ে গাড়ি নিয়ে বাংলোর ভিতরে ঢুকতেই, আমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলাম, ঋজুদার দিকে।
বললাম, কী ব্যাপার ঋজুদা? কী হল? ভটকাই কোথায় গেছিল, তুমিই বা কোথা থেকে এলে? ছিলে কোথায়?
ভটকাই ফিরে এসেছে?
হ্যাঁ। গতকাল, দশটা নাগাদ, সকালে। আর ফিরে থেকে এমন হাবভাব করছে, যেন রাজ্য জয় করে এসেছে। আর, কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলছে, শনৈঃ শনৈঃ।
ঋজুদা হাসল। তারপর, গাড়ি থেকে নেমে বাংলোর দিকে যেতে যেতে বলল, বলব পরে সব। এখনও আসলে বলার মতো কিছুই হয়নি। এখানে কি কিছু ঘটেছে, কাল এবং পরশু রাতে?
আমি মাথা নাড়লাম।
চল। ঘরে গিয়ে চানটান করে রেস্ট করি। খুব ক্লান্ত লাগছে। বিকেলে আবার বেরোব।
.
বিকেল থাকতেই আমি আর ঋজুদা বেরোলাম–সাদা মারুতি জিপসিতে।
ঋজুদা বলল, তুইই চালা রুদ্র। আমি একটু পাইপ খাই আর ভাবি।
কোথায় যাব এখন?
অনেক জায়গাতে। প্রথমে যাব থাঙ্গজম সিং-এর বাড়ি, পাওনা বাজারে। বেচারার একমাত্র ছেলেটা খুন হয়ে গেল। ভদ্রতার খাতিরেও যাওয়া দরকার। তা ছাড়া গোয়েন্দাগিরি করার জন্যে তো পরশু সকালেই যোগেনকে পাঠিয়েছিল।
ইম্ফলের পাওনা বাজারের কাছে পৌঁছতে, ঋজুদার নির্দেশে ডাইনে বাঁয়ে করতে করতে বিরাট কম্পাউন্ডওয়ালা আর উঁচু দেওয়াল দেওয়া একটা বিরাট বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। ইম্ফল শহরে যে এতরকম গাড়ি আছে, তা ওখানে না এলে জানতাম না। কত লোকই গেছেন, সমবেদনা জানাতে। জিপসিটা দূরে পার্ক করিয়ে রেখে আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখলাম, বিরাট লম্বা চওড়া একজন গুণ্ডামতো মানুষ, প্রকাণ্ড ড্রয়িংরুমের মধ্যের মস্ত একটি সোফাতে বসে আছেন, আর অগণ্য মানুষ তাঁর চারদিকে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
এই আপনার আসার সময় হল, বোস সাহেব?
কী করব। হাতের যে কাজ নিয়েছি সেটা শেষ না করে যে আসতে পারছিলাম না।
সেই কাজ শেষ হয়ে গেছে?
পুরো নয়। প্রায়।
বলেন কী?
হ্যাঁ।
কনগ্রাচুলেশানস। আমার এই অবস্থাতেও…
ঋজুদা বলল, আপনার পুত্রবধূ কোথায়?
তারপরই বলল, সমবেদনা জানাবার ভাষা আমার নেই সিং সাহেব।
অন্যমনস্ক গলায় মিস্টার সিং বললেন, হ্যাঁ ডাকছি। বলে, কাকে যেন কী বললেন, মণিপুরিতে। সম্ভবত কোনও আত্মীয়কে।
