কাঙ্গপোকপি (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
ভটকাই এর আশায় ছাই পড়ল। কে কে যাবে, সে বিষয়ে ঋজুদা মুখ খুলল না।
আমরা কেউই আর কোনও কথা বললাম না।
মিনিট পাঁচেক পর সকলে একসঙ্গেই বেরোলাম।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভটকাই বলল, তিতির তোর গাড়িতে একটা ছোট্ট লিফট দিবি?
ছোট্ট লিফট মানে? তুই তো থাকিস বাগবাজারে আর রুদ্র…।
আরে না না। অতদূরে যেতে হবে না। আমি আর রুদ্র একটু ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের পাশে ডাকাতে কালীর কাছে নেমে যাব।
কেন?
পুজো দেব, পাঁচসিকে, পাঁচসিকের।
কীসের পুজো?
ঋজুদার মন গলানোর পুজো! ভীরাপ্পানের কাছে ঋজুদাকে একলা ছেড়ে দেওয়াটা কি তোদের উচিত? আমি না-হয় রংরুট, অনভিজ্ঞ; আফ্রিকার অ্যাডভেঞ্চারে কোয়ালিফাই করিনি। কিন্তু তোরা? তোরা কি মানুষ? ঋজুদা যদি আর না ফেরে? ভাবিস না যে, সেন্টু দিচ্ছি। আমার সত্যিই চিন্তা হচ্ছে। ঋজুদার মন গললে, তবে না…
তিতির বলল, আমি পুজো-ফুজো জীবনে দিইনি। মূর্তি-পুজোতে আমার বিশ্বাস নেই। তবে, আমি গাড়িতে বসে থাকব, তোরা আমার নামেও পাঁচ সিকের পুজো চড়িয়ে দিস। সত্যি! ব্যাপারটা বেশ চিন্তারই হয়ে দাঁড়াল।
.
আমরা, মানে আমি আর তিতির, সাড়ে ছ’টার পরই পৌঁছে গেছিলাম বিশপ লেফ্রয় রোডে। ঋজুদা নেই। গধাধরদা বলল, কোতা গেচে কী করে জাইনব। গতরাতেও তো ঘুমটুম নেই। অনেক বইপত্তর মেলে বসচেলো আর টেলিফোনের পর টেলিফোন কইরতেচেল। রাত জেগে কারা টেলিফোনে কতা কয়, কে জানেরে বাবা। তাপ্পর সেই ভোরবেলা বেইরে গেচে চান করে শুধু এক কাপ চা খেইয়ে, আর দ্যাকো দিকি, একনও ফেরার নাম নেই।
তিতির বলল, পৌনে সাতটার মধ্যে ঠিক ফিরে আসবে। দেখো তুমি।
আমি বললাম, ঋজুদা বলে, কথা দিলে, আমার ডেডবডি আমার কথা রাখবে। আমি যদি নিজে নাও রাখতে পারি। কোনওদিনও তিরিশ সেকেন্ডও দেরি করতে দেখিনি ঋজুদাকে জাপানের ট্রেনগুলোর মতো।
সাতটা বেজে সাঁয়ত্রিশ। এমন সময়ে দরজার বেলটা বাজল। গদাধরদা বসবার ঘরেই ছিল। তাই, গদাধরদাই দরজা খুলতে গেল। দরজা খুললও। মনে হল, কার সঙ্গে কী কথা বলল। পরক্ষণেই প্রায় দৌড়ে ফিরে এসে বলল, একটা তিলক-পরা মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ কী সব দুর্বোদ্দ ভাষায় কতা কইচে গো। তোমরা যেয়ে দ্যাকো দিকি। আমি চনু কিচিনে।
তিতির আর আমি, দুজনেই গেলাম। দেখি সারা কপালে পাথালি করে মোটা সাদা আর লাল চন্দনের তিলক কাটা, সাদা ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরা, পায়ে একসাইজ বড় একটি চটি পরে, হাতের বোতাম খোলা সাদা টুইলের শার্ট পরে, কাঁধে পাট করে সাদা-খোলের নীল-পাড়ের চাদর ফেলে, এক দক্ষিণ ভারতীয় ভদ্রলোক, দুহাত জড়ো করে নমস্কার করে বললেন, নমস্কার।
তিতির বলল, মিস্টার বোস ইজ নট ইন। প্লিজ কাম ইন। হি উইল বি হিয়ার এনি মোমেন্ট।
সেই ভদ্রলোক বললেন, ইয়ানি ওরু পেরেয়া মেরুগাম।
আমি বললাম, সরি। উই ডোনট স্পিক তামিল।
এই কথা বলতে বলতেই আমি চিনে ফেললাম অ-ভদ্রলোককে। এবং তাঁর গলার স্বরকে। তিতির তখনও চিনতে পারেনি। ইতিমধ্যে ঋজুদাও এসে পৌঁছে গেল। এবং কিছু বলবার আগেই ভদ্রলোক ঋজুদাকে বললেন, ভান্নামে নানপারাএ নেনাইডু এরুক্কেরাথা?
ঋজুদা আমাদের অবাক করে দিয়ে বললে, আপ্নে হেথু ভান্থেরকাল?
তারপর আমরা সকলে ভিতরে ঢুকলাম একই সঙ্গে। ভিতরে ঢুকেই অ-ভদ্রলোক আবার বললেন, ইয়ানি ওরু পেরেয়া মেরুগাম।
বলেই, যেন পরিত্রাণ পেয়ে পরিষ্কার বাংলাতে বললেন, রাত জেগে শিখেছিলাম অনেকই। কিন্তু এই একটা সেনটেনসই যে কেন ঘুরে ফিরে আসছে। অন্যগুলো যে কোথায় হাপিস হয়ে গেল।
ঋজুদা হেসে উঠে বলল, মানেটা বলে দে ওদের, ভটকাই।
ভটকাই বলল, মানে হচ্ছে, হাতি খুব বড় জানোয়ার।
তিতির শুনেই হেসে একেবারে গড়িয়ে পড়ল। বলল, শুধু হাতি খুব বড় জানোয়ার এই বাক্যটাই মনে থাকল কেন তোমার?
তা কী করব! হাতি-শিকারি নিয়ে কারবার এবারে, হাতিকে প্রিডমিন্যান্স না দিলে কি চলে?
পরক্ষণেই ঋজুদার দিকে ঘুরে বলল, দেখো ঋজুদা! তোমার জন্যে ন্যাড়া হলাম ম্যাড্রাসি সাজলাম, এর পরেও নেবে না আমাকে?
ঋজুদা হো হো করে হেসে ফেলল, অনেকক্ষণ ধরে হাসতেই থাকল, এমন করে হাসতে দেখিনি বহুদিন ঋজুদাকে।
হাসল বটে, কিন্তু উত্তর দিল না ভটকাই-এর কাকুতি-মাখা প্রশ্নর। সেও বড় শক্ত ঠাঁই।
ভটকাই চুপসে গিয়ে, ন্যাড়া মাথায় হাত বোলাতে লাগল।
ভেকটা কিন্তু ভালই ধরেছে। প্রথমে তো আমরাই চিনতে পারিনি। ঋজুদাও হয়তো পারেনি প্রথমে।
ঋজুদা বলল, তোর ঘড়ি-পরার রকমটা শুধু ঠিক হয়নি। হয় একটা ট্যাঁক ঘড়ি জোগাড় কর, নয়, ঘড়িটার ডায়ালটা ভিতর দিকে করে পর। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী যেমন করে ঘড়ি পরতেন। অধিকাংশ টামিলিয়ানরাই, কেন জানি না, ওরকম করে ঘড়ি পরতেই পছন্দ করেন।
বলেই বলল, তা তুই হাতি খুব বড় জানোয়ার-এ এসে আটকে গেলি কেন?
কী করব! আমার স্মৃতিশক্তি হচ্ছে বেগ-বেগা।
সেটা আবার কী?
তিতিরই শুধোল।
তাও জানিস না? কতরকমের মেমারি হয় জানিস?
স্মৃতিশক্তির আবার রকম কী?
তিতির বলল, অবাক হওয়া গলায়।
আছে আছে। শোন তবে। চাররকমের মেমারি হয়। (১) চির-চিরা (২) চির-বেগা (৩) বেগ-চিরা (৪) বেগ-বেগা। আমার মস্তিষ্কে সবকিছুই বেগে প্রবেশ করে এবং তা মুহূর্তের মধ্যে আবার সমান বেগে বেরিয়ে যায়। মুখস্থ করতেও সময় লাগে না, ভুলে যেতেও নয়। তাই আমার স্মৃতি শক্তি, বেগ-বেগা।
চির-চিরা মানে কী? সেটার কী বিশেষত্ব?
চিরচিরা মানে হল, মাথায় ঢুকতে বহুতই সময় নেয়, কিন্তু মগজে একবার যদি ঢুকে গেল, তো সেখানেই পাথর হয়ে রয়ে গেল। হোল লাইফ। নট নড়ননট চড়ন, নট কিছু।
আর চির-বেগা?
সেটিই হল, সবচেয়ে খারাপ। মগজে ঢোকাতে ঢোকাতে জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু, যদি বা অবশেষে ঢুকল; তাও ঢোকামাত্রই সুড়ুৎ করে বেরিয়ে গেল।
তিতির মুখস্থ করে নিল। চির-চিরা, বেগ-বেগা, বেগ-চিরা, চির-বেগা।
আজ বৃষ্টি নেমেছে। বছরের প্রথম বৃষ্টি। খিচুড়িটা জমবে ভাল। কিন্তু এক কাপ করে চা তো খাবি?
ঋজুদা বলল।
মন্দ হয় না। আমি বললাম।
তিতির বলল, আমি কিন্তু কিছু না।
ভটকাই বলল, আমি গিয়ে গদাধরদাকে আরও একটু ভড়কে দিয়ে কড়কে আসি। আমাকে দেখেই তো পালিয়েছে, রান্নাঘরে। তাই না?
তিতির হেসে বলল, হার্ট-ফেল করে মারাই যাচ্ছিল প্রায়। কী যে করোনা তুমি!
ভটকাই ভিতরে চলে গেল এবং পরমুহূর্তেই ভয়ঙ্কর ভীত গদাধরদা দৌড়ে বসবার ঘরে ঢুকে বলল, ওই মাদ্রাজিটাকে কিচিনে কে পাইটে দেল? সেখানে গে আমাকে আন্ড্রে-পান্ড্রে কী সব বলতিচে, আবার ধমকও মারতিচে
ঋজুদা হেসে বলল, তোমার এতখানি বয়স হল, গাঁয়ের মানুষ তুমি। সং চিনতে পারলে না গো গদাধর? কেমন ধারা লোক? ভাল করে চেয়ে দ্যাখো দেখি। একে কি তুমি চেনো না?
পূর্ণ দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকার পর সান্দাকফুতে সূর্যোদয়ের মতো আস্তে আস্তে, গদাধরদার মুখে আলো ফুটতে লাগল। তারপর, স্বস্তির হাসিতে তার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে এল মুখ থেকে একটি মাত্র শব্দ। বিচ্ছু! হায়! হায়! কী বিচ্ছু ছেলে গো! বলার সঙ্গে সঙ্গেই, হাতে-ধরা পেতলের হাতাখানি দিয়ে মারল ভটকাই-এর ন্যাড়া মাথাতে, আলতো এক ঠোক্কর।
মেরেই, ঋজুদাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আজ এই বইলে দিনু। তোমার ভবিষ্যৎ বহুতই খারাপ দাদাবাবু।
কেন? হঠাৎ এমন অলুক্ষণে কথা কেন?
কেন আবার! তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।
বলেই, গদাধরদা অন্তর্হিত হল।
গদাধরদার বলার ভঙ্গি শুনে, হেসে ফেলল, ঋজুদা।
উরি বাবারে! কী গরম রে। চাঁদি ফেটে গেল গো। বলে, চেঁচিয়ে উঠল ভটকাই, হাতার বাড়ি খেয়ে। পেতলের হাতাটা ভারীও কম নয়।
ঋজুদা বলল, তিতির তুই গিয়ে চায়ের কথাটা বলে আয়।
সত্যি! ভটকাইটা সবকিছু গুবলেট করে দিল। যা-তা একটা।
আমি বললাম।
ঋজুদা বলল, যাই বলিস, ভটকাই-এর কিন্তু খুব রেডি-উইট আছে। জীবনে মানুষের এই গুণটি খুবই কাজে লাগে।
ঋজুদার মুড গুড দেখে বললাম, আমরা সকলেই কি যাচ্ছি আগামী রবিবারে? ঋজুদা? আজ তো বুধবার হয়ে গেল।…গোছগাছ…।
ঋজুদা বলল, এখনও মনস্থির করে উঠতে পারিনি। আমার একেবারেই ইচ্ছে ছিল না, এই ডেঞ্জারাস মিশনে তোদের নিয়ে যাবার। তবে এটাও ঠিক যে, এবারে আমরা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে থাকব না কিন্তু, রণকৌশলটা আমাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যদি পারি, তবে বাতলে দেব ওঁদের। আমাদের ভূমিকা এবার গোয়েন্দা এবং স্ট্রাটেজিস্ট-এর। তবে, একেবারে ফ্রন্টে তোমাদের যেতে দেব না–প্রয়োজন যদি পড়ে, আমি একাই যাব। এ নিয়ে যদি কোনওরকম গাঁইগুঁই করো, তা হলে, তোমাদের ওখানেই ছেড়ে রেখে আমি ফিরে আসব।
ঠি আচে।
ভটকাই বলল।
খুব উত্তেজিত হয়ে যখন তাড়াতাড়ি কথা বলে ভটকাই, তখন এমনি করেই শেষের অক্ষরটা ফেলে দৌড়য়। ঠিককে বলে, ঠি।
তা হলে। আমরা যাচ্ছি?
তিতির বলল।
ভটকাই থাম্বস-আপ করল।
.
রুদ্র, তুমি!
তিতিরই এসে দরজা খুলল। কোনওদিনই খোলে না। সম্ভবত বাড়িতে এখন কেউই নেই।
কী ব্যাপার? হঠাৎ না বলে কয়ে?
তুমি যে এমন ভি. আই. পি. যে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট না করে তোমার কাছে আসা যাবে না?
তোমার মতো সকলেই যদি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া যখন তখন আসে, তবে সুদূর ভবিষ্যতে কোনওদিনও ভি. আই. পি. হবার সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও তা আর হওয়া হবে না। তাই আর কী। বুঝলে রুদ্র! প্রত্যেকেরই জীবনে পার্সোনাল-টাইম ম্যানেজমেন্টটাই হচ্ছে আসল জিনিস। ওটি যিনি করতে না পারেন, তাঁর পক্ষে কিছুই হয়ে-ওঠা আদৌ সম্ভব নয়। সময় নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আমি রাজি নই।
তিতিরের জ্ঞান’-এর কোনও জবাব না দিয়ে বললাম, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। ঋজুদাকে দেখতে যাব। উডল্যান্ডস-এ।
উডল্যান্ডস-এ! কেন? ঋজুদার কী হয়েছে? আমি তো কিছু জানি না। হার্ট অ্যাটাক?
মধ্যপ্রদেশে অতগুলো দিন ভটকাই-এর সঙ্গদোষে কাটাবার সময়েও যদি হার্ট-অ্যাটাক না হয়ে থাকে, তবে ঋজুদার তা হবার সম্ভাবনা আছে বলে তো মনে হয় না। ক্যালকাটা-ফিভার। খুব মাথার যন্ত্রণা, একশো পাঁচ জ্বর। কষ্ট পাচ্ছে খুবই।
তা বলে নার্সিংহোমে! আমাকে ফোন করল না কেন? আমরা এতজনে আছি কী করতে তা হলে? বাড়িতেই তো রাখা যেত।
আরে আমিও কি আর আগে জানতাম। গদাধরদা নাকি আমাদের খবর দেওয়ার কথা বলেও ছিল। ঋজুদাই নাকি বারণ করেছিল। বলেছিল, আমার পরীক্ষা, পড়াশোনার ক্ষতি হবে। দু। পড়াশোনা করে যেন উল্টে দিচ্ছি একেবারে।
‘উডল্যান্ডস’-এ নিয়ে গেল কে, বিশপ লেফ্রয় রোড থেকে?
প্রতিবেশীরাই! আবার কে? অরামাসি নিজেও নাকি গেছিলেন। মন্টু কাকাদের ফ্ল্যাটও তো পাশের ব্লকেই।
ও হ্যাঁ! তাই তো। কিন্তু এখন আছে কেমন? ঋজুদা?
তাই দেখতেই তো যাওয়া! নাও, এখন আর কথা বাড়িও না। আমি বসছি। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। তোমার এখান থেকে ভটকাইকে কি একটা ফোন করতে পারি? আসার আগেও করেছিলাম। বাড়ি ছিল না। টিকিট কাটতে গেছে নাকি রবীন্দ্রসদনে। ওর মা বললেন।
সেখানে কী? কীসের টিকিট? ‘দক্ষিণী’র প্রাক্তনী থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘অরূপরতন’ করছে। এর আগে নাকি বিদ্যাভবনেও দেখেছে ও একবার, কবিপক্ষে। কী দেখেছে, তা ওই জানে! একেবারে উচ্ছ্বসিত! বিশেষ করে অর্পিতা বলে একটি মেয়ের অভিনয়ের– সে সুদক্ষিণার চরিত্রে নাকি দারুণ অভিনয় করেছে।
আমাদের দেখাবে না? সত্যি, অরূপরতন-এর মতো নাটক আজকাল দেখাই যায় না।
না দেখিয়ে কি সে ছাড়বে? কান ঝালপালা করে দিল। ওর অর্পিতাদির মতো অভিনয় নাকি স্মিতা পাটিলও করতে পারত না। সম্ভবত আমাদের জন্যেই কাটতে গেছে টিকিট। দেবাশিস রায়চৌধুরীর পরিচালনা।
তুমি বোসো রুদ্র। আমি এক মিনিটে আসছি। দাঁড়াও, মাকে একটা ফোন করে দিই। মা অবশ্য, অরামাসিদের বাড়িতেই গেছেন। এখন বাড়িতে কেউই নেই।
তিতির ফোনটা করেই, ভিতরে চলে যেতেই, ফোনটা বেজে উঠল। তিনবার বাজবার পরও যখন তিতির ধরতে এল না, তখন আমি তুললাম, ফোনটা।
হ্যালো।
কী রে! আমি ঠিক জানতাম, তুই এখন তিতিরের সঙ্গে ঝিং-চ্যাক সাদা মারুতিতে করে নগর-পরিক্রমাতে বেরোবি। তাই আন্দাজিফাই করেই তোকে ধরলাম।
দ্যাখ ভটকাই, সবসময় ইয়ার্কি ভাল লাগে না। ঋজুদার ক্যালকাটা-ফিভার হয়েছে। উডল্যান্ডস-এ আছে। তোকে বাড়িতে ফোন করেছিলাম। তোরও কি আমাদের সঙ্গে যাওয়াটা কর্তব্য নয়? কর্তব্যজ্ঞান বলে তো কোনও কিছুই…
আমিও এগজ্যাক্টলি সেই কথাটাই ভাবছিলাম, মানে তোর কোনও কর্তব্যজ্ঞান নেই, সেই কথা। ভিজিটিং-আওয়ার্স প্রায় শেষ হতে চলল, আর ঋজু বোসের ওরিজিনাল এবং ফেভারিট চামচেদের কারও দেখা পর্যন্ত নেই! তোরা কি মানুষ? অকৃতজ্ঞের দল সব! ছিঃ ছিঃ!
মানে?
হতভম্ব হয়ে বললাম।
মানে, আমি উডল্যান্ডস থেকেই বলছি। তাড়াতাড়ি আয়। আমার পক্ষে দুজন রোগীকে একা সামলানো অসম্ভব। একজন অনর্গল অক্সোনিয়ান অ্যাকসেন্টে ইংরেজিতে আবৃত্তি করে চলেছেন, ধুম জ্বরের মধ্যে ঘোরে, হয় ওয়াল্ট হুইটম্যান নইলে রবার্ট ফ্রস্ট। মধ্যে মধ্যে সুকুমার রায়ও অবশ্য আওড়াচ্ছেন: হলদে সবুজ ওরাংওটাং/ ইট পাটকেল চিৎ- পটাং। আর আরেকজন বিশুদ্ধ দোকনো বাংলায় কুঁই পেড়ে, কন্টিনিউয়াসলি কেঁদে চলেছেন, কী হবে গো আমার? ও ভটকেদাদা। তিনি চইলে যেতিচেন গো! হায়! হায়! আমার কী হবে গো! দাদাবাবু গোওওও!
কে?
আবার কে! তোমাকে খিচুড়ি খাইয়ে যিনি গোবর বাইনেচেন।
গদাধরদা?
আজ্ঞে। তেনার জন্যেও একগাচি নার্স ঠিক কইরতে হবে। সঙ্গে মালকড়ি নে এস। চঞ্চল করি। আমি বাবা গরিবের ঘরের মেইলে! শরীর দে যেটুকু করার নিশ্চয় কইর্যে দেবোকন। কিন্তু পয়সা কুয়াড়ে মিলিব?
গদাধরা আবার সেখানে গিয়ে নাটক করছে কেন?
সেটা তোমার পেয়ারের গদাধরদাকেই নিজে এসে জিজ্ঞেস করো। নার্সরা দুজনকে নিয়েই একেবারে নাজেহাল। নেহাত বিশ্ববিখ্যাত ঋজু বোস। অন্য কেউ হলে, দুজনকেই বের করে দিত, নার্সিংহোম থেকে। ঋজুদা অত্যন্ত খারাপ পেশেন্ট। মা বাবার একমাত্র সন্তান তো। ছেলেবেলাতে বোধহয় স্পয়েল্ট-চাইল্ড ছিল।
তুই থাম। আমি আর তিতির আসছি এখনই। কোনও ভয় নেই তো রে ভটকাই?
না। তবে অসুখ মানেই তো সুখের অভাব। জ্বর ভাল ঠিকই হবে, তবে ভোগান্তি আছে। ভয় নেই কিন্তু ভয় আছেও। আজকাল কোনও রোগীই রোগে মরে না, ওষুধে মরে। আরও একটা ভয় আছে। সেটা শুধু ঋজুদারই নয়, আমাদেরও। ভীরাপ্পানের ভয়।
কোন ভীরাপ্পান?
যার কথা তুমি ভাবছ চাঁদু। দাক্ষিণাত্যের কোল্লেগাল-এর জঙ্গলের, হাতির দাঁতের, চন্দনকাঠের চোরাচালানকারী। চন্দনকাঠেই এবার চিতা সাজছে আমাদের সকলের। একেবারে রাজা-রাজড়ার মতো মারা যাবে। খাসা! এবার দেখব তোমার আর নেকু-পুষু-মুনু তিতিরের বাহাদুরি। গুগুনোগুম্বারের দেশে আর রুআহার ভুষুণ্ডা, কোল্লেগালের ভীরাপ্পানের কাছে, যাকে তোদের ভাষায় পোলাপান বলে; তাই। কিন্তু সেখানে হয়তো যাওয়াই হবে না। অলরেডি অন্য এক নেমন্তন্ন পৌঁছে গেছে ঋজুদার কাছে। এবং…
এবং কী?
অধীর আগ্রহের সঙ্গে আমি, রুদ্ধশ্বাসে শুধোলাম।
পিচিক করে, পুব-আফ্রিকার মাসাই উপজাতিদের থুতু ফেলার মতো একটা শব্দ করে একটু হাসল ভটকাই। তারপর বলল, শনৈঃ শনৈঃ বৎস। শনৈঃ শনৈঃ। ক্রমশ প্রকাশ্য। অত তাড়াহুড়ো কীসের?
রিসিভারটা নামিয়ে রেখে ভাবছিলাম যে, খাল কেটে কুমির তো আমিই এনেছি। এখন ভটকাই-ই হচ্ছে আমার আর তিতিরের সবচেয়ে বড় প্রবলেম। নিনিকুমারীর বাঘ মারতে ওকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াতে ওড়িয়াটাও শিখে গেছে একটু একটু। গদাধরদার কাছ থেকে দক্ষিণ বাংলার ভাষার টান-টোনও রপ্ত করেছে। তার সঙ্গে আবার সংস্কৃত মিশিয়ে দিচ্ছে মাঝেমাঝে। ঋজুদার হাতে-পায়ে ধরে, কত চেষ্টা চরিত্তির করে ওকে আমাদের দলে ঢুকিয়েছিলাম, আর এখন ওই আমাদের ওপর হরওয়াক্ত ছড়ি ঘোরাচ্ছে। ঋজুদার প্রশ্রয়েই এটা ঘটেছে। খুবই অভিমান হয় মাঝে মাঝে, ঋজুদার ওপরে, এই জন্যে। এইরকম আলটস্কা সিনিয়রদের সুপারসিড করার দৃষ্টান্ত সরকারি চাকরিতেও বেশি দেখা যায় না।
সাধে কি ছোটঠাকুমা বলেন, রুদদুররে, ভুলেও কক্কনও বাঙালির উপগার করিসনি দাদু। তোর ছোটদাদুকেও তো চোকের উপরে দেকলি! কি পায়শ্চেত্তটা করলে!
কী যে বাদলা চলেছে কলকাতায় প্রায় একমাস হল যে, মনই ভাল লাগে না। মা শান্তিনিকেতনে গেছিলেন। বলছিলেন, এমন খরা সেখানে বহুদিন হয়নি। বাগানের গাছগাছালি বাঁচিয়ে রাখাই দায়। ম্যাগনোলিয়া গ্র্যান্ডিফ্লোরা গাছটা, নতুন মালীর গাফিলতিতে মরে গেছে। তবে এই খরারই কারণে আবার জ্যাকারান্ডা আর বোগেনভেলিয়াদের ডালে ডালে রঙের মারদাঙ্গা লেগে গেছে।
ভটকাই বলে, এমনটিই তো হবার কতা। একটা ডেবিট হলেই একটা ক্রেডিট হতেই হবে। একেই বলে ডাবল-এন্ট্রি।
শান্তিনিকেতন এবারে নাকি বৃষ্টির ব্যাপারে একেবারে একটা দ্বীপের মতো হয়ে রয়েছে। ঊষর দ্বীপ। বীরভূমে শেষের দিকে বন্যা হয়ে গেল, কিন্তু শান্তিনিকেতন খটখট করছে।
মা গত সাতদিন কলকাতাতে না-থাকাতে বাড়ি আগলাতে হয়েছে, ফোন ধরতে হয়েছে। বাবা দিল্লিতে গেছেন মাসের গোড়াতে। সেখান থেকে বম্বে হয়ে ফিরবেন। সে কারণেই ঋজুদার কাছে একদিনও যেতে পারিনি। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার পরও উডল্যান্ডস থেকে ছাড়া পেয়ে ঋজুদা নয়নামাসির বাড়িতে গিয়ে ছিল আরও সাতদিন। সেখানে নয়নামাসি অফিস থেকে সাতদিন ছুটি নিয়ে ঋজুদাকে খাইয়ে-দাইয়ে, ক্লাসিকাল, রবীন্দ্র সংগীত আর পুরাতনী গানের রেকর্ড আর ক্যাসেট শুনিয়ে, শরীরে মনে একেবারে ফিট করে, বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে।
ফোনে, ঋজুদা বলছিল, এখন জগিং-ফিট হয়েছে, ফাইটিং-ফিট হতে এখনও আর দিন সাতেক লাগবে।
কোল্লেগাল বা মালে মহাদেশ্বর বা সত্যমঙ্গলম-এর পাহাড় জঙ্গলে আমাদের যাওয়া যে হবে না, সে খবরটা ঋজুদা অসুস্থ হবার আগেই পেয়ে গেছিল। ভটকাই তো জানতই। আমি আর তিতিরই জানতাম না। তবে মনমরা হবারও কিছু নেই। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই।
তামিলনাড়ু আর কর্ণাটকের পুলিশের বড়কর্তারা আর বি. এস. এফ.-এর বড়কর্তারাও প্রথমে ঋজুদাকে আকুল আহ্বান জানিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ঘটনাপরম্পরা তাঁদের আয়ত্তে এসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরাই প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রবিভাগে, ঋজুদার যাওয়া নিয়ে। তাঁদের বক্তব্য এতজনের প্রাণহানির পরে, এত কাণ্ডের পরে, মিডিয়ার হাতে এত অপমান নিন্দামন্দ সহ্য করার পর যখন তাঁরা ভীরাপ্পান এবং তার দলবলকে প্রায় নিজেদের কজার মধ্যে এনেই ফেলেছেন, তখন কলকাতার ঋজু বোস এসে তাঁদের ওপর ছড়ি ঘোরাবেন এটা ওঁদের পক্ষে লজ্জাকর তো বটেই, একেবারেই দৃষ্টিকটু। আগে ডাকলেও না-হয় হতো। ইটস টু লেট ইন দ্য ডে।
ওদের যুক্তিটা অবশ্যই গ্রাহ্য। অন্যায় কিছু বলেননি ওঁরা। তা ছাড়া, সাফল্য যখন প্রায় হাতের মুঠোতে এসেছে তখন ওঁদের চটানো বা ওঁদের মনে আঘাত দেওয়ার মতো কিছু করা, উপরওয়ালারা ন্যায্য কারণেই ভাল বলে মনে করেননি। ঋজুদার সঙ্গে নাকি দুই রাজ্যের চিফ-সেক্রেটারিরাই কথা বলেছেন, ব্যাপারটা বুঝিয়ে। ঋজুদা যাতে কিছু মনে না করে। সে সম্বন্ধেও চেষ্টার ত্রুটি করেননি ওঁরা। অবশ্য ঋজুদা তো আর সেখানে যাওয়ার জন্য লালায়িত ছিল না। তাঁদের অনুরোধেই যাচ্ছিল। তাই মনে করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
.
নীলগিরির পাঁচ কে. জি সবচেয়ে ভাল চা এসেছে। মহীশূরের চন্দনকাঠের একটি চমৎকার কার্ড-টেবিলও পাঠিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু, ঋজুদা যে শুধু তাস খেলে না তাই নয়, তাস খেলা আদৌ পছন্দও করে না; তা না জেনেই। চমৎকার টেবিলটা নয়নামাসির বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে ঋজুদা। ওঁরা সবাই তাস-পাগল। চাও পাঠিয়েছে সকলকেই। আমাদের বাড়িতেও এসেছে এক প্যাকেট। তা ছাড়া, ঋজুদার কাছে তো খাওয়াই যায় যখন তখন। তবে, ঋজুদা নিজে নীলগিরি বা আসামের চা পছন্দ করে না। মকাইবাড়ির চা খায়। নয়তো লপচু–দার্জিলিং-এর। পাঙ্খবাড়ির খাড়াপথের পাশের মকাইবাড়ির চা-বাগানের মালিক, রসিক, শিকারি এবং ঋজুদার বন্ধু ব্যানার্জি-জেঠুরা প্রতি দুমাস অন্তর ঋজুদার জন্য চা পাঠান।
যেদিন দক্ষিণ ভারত থেকে যেতে হবে না খবরটি আসে, ঠিক সেদিনই অন্য একটি খবরও এসে যায়, মণিপুর থেকে। আসলে, মণিপুর রাজ্যের মোরে’ থেকে। যেখান থেকে ডাক এসেছে সেই জায়গাটার নামই মোরে। ইংরেজি বানান MOREH! মোরে আর মরে উচ্চারণটা এক বলে প্রথমটায় আমরা খুব হাসাহাসি করেছিলাম, মরে যেতে হবে বলে। মোরে’ মণিপুর আর বার্মার সীমান্তবর্তী গ্রাম। গ্রামই নাকি ছিল আগে। এখন মস্ত জায়গা। মোরের পরেই একফালি নো-ম্যানস ল্যান্ড। তারপরই বার্মার একটি নদীর একটি সরু শাখা নদী। তার ওপরে একটি ব্রিজ। লোহার। তারও পরে আবার কিছুটা নো-ম্যানস ল্যান্ড। তারপরেই বার্মা, এখন মায়নমার সীমান্তর গ্রাম, নাম তামু।
এই মোরেতেই খুন হয়েছেন দিন পনেরো আগে মণিপুর রাজ পরিবারের একজন রাজপুরুষ, অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে। এবং সেই খুনের তিনদিন আগেই তাঁর মোরের বাড়ি থেকেই খোয়া গেছে একটি পারিবারিক, সেরিমনিয়াল তরোয়াল, যা সেই ভদ্রলোকের পূর্বপুরুষেরা বংশপরম্পরায় ব্যবহার করতেন, বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে। সেই তরোয়ালটি আবার দুদিন পরে পাওয়া গেছে সে বাড়িরই বাগানের একটি নীলফুলফোঁটা বড় কেসিয়া গাছের তলাতে। কেউ মাটি খুঁড়ে পুঁতে রেখেছিল সেটাকে। কিন্তু রহস্যের সেখানেই শেষ নয়। সেই তরোয়ালের হাতলের ঠিক নীচেই বসান ছিল, একটা প্রকাণ্ড চুনী। মানে, রুবি। যার দাম, আজকের দিনে, কম করে কোটি টাকারও বেশি।
এই মৃত্যুরই কিনারা করার অনুরোধ জানিয়ে মণিপুরের রাজ পরিবারের এক দূর সম্পর্কের শরিক, পাঠিয়েছেন, মিস্টার তম্বি সিংকে। মিস্টার তম্বি সিং কলকাতাতে ঋজুদার সাহায্য চাইতেই ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছেন এবং হোটেলে ঋজুদার ডাকের অপেক্ষাতেই কাল থেকে বসে আছেন। মণিপুরে বসে ঋজুদার কথা জানা সম্ভব ছিল না। কিন্তু, অন্য সূত্রে তম্বি সিংরা শুনেছিলেন, ঋজুদার কথা। আসলে, তিনিও ঋজুদাকে চেনেন না। কলকাতা থেকে ঋজুদার পরিচিত এক মণিপুরি ভদ্রলোক মিস্টার পিশাক সিং যখন অল্পদিন আগেই ওই ঘটনার সময়ে মণিপুরে গেছিলেন, তখন তিনিই শিকারি, অ্যাডভেঞ্চারার এবং প্রাইভেট ডিটেকটিভ ঋজুদার কথা জানান ওঁদের। এবং তাঁর কথা শুনেই তম্বি সিং ফাস্ট অ্যাভেইলেবল ফ্লাইট ধরে ইম্ফল থেকে কলকাতা চলে আসেন।
টেলিফোনে মি. তম্বি সিং-এর সঙ্গে ঋজুদার কথাবার্তা আগেই হয়ে গেছে। কিন্তু ঋজুদা অসুস্থ হয়ে পড়াতে সব গুবলেট হয়ে গেল। নিজের বাড়িতে না-ফেরা অবধি দেখা করা সম্ভব নয় বলেই জানিয়েছিল, ঋজুদা। তাই ফিরে গিয়ে আবার এসেছেন উনি। গতকাল। আজকে রাতেই মিস্টার সিং আসবেন ঋজুদার ফ্ল্যাটে। ঋজুদা মণিপুরে যেতে রাজি হয়েছে এবং আমাদের সকলকেই যে ঋজুদা নিয়ে যেতে রাজি হয়েছে এই আনন্দে আমরা সকলেই ডগমগ। বিশেষ করে, ভটকাই। তবে ঋজুদা বলেছে, মণিপুর চমৎকার জায়গা, তোদের দেখা হবে বলেই নিয়ে যাচ্ছি। গোয়েন্দাগিরি করার জন্যে নয়।
ঋজুদার কথামতো আমরা সকলেই সোমবারে বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বিশপ লেফ্রয় রোডে পৌঁছে গেছি। মিস্টার তম্বি সিং আসবেন ছটার সময়ে। উনি ডিনার খাবেন না। ঋজুদা যদিও বলেছিলেন খেতে। ওঁর নাকি ইন্দোনেশিয়ার কনসাল মি. ডি. কে. নাগের সঙ্গে কী কাজ আছে। ডিনারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে কি নেই তা অবশ্য বলেননি, ঋজুদার সঙ্গে ডিনার খেতে পারবেন না তাই শুধু জানিয়েছেন।
আমাদের চা খাওয়া হয়ে গেছে। আজকে সস্তার ওপর দিয়ে সেরেছে গদাধরদা। পেঁয়াজি, পাতলা পাতলা করে কাটা বেগুনের বেগুনি–বেসন দিয়ে কড়া করে ভাজা। কুমড়োর ফুল ভাজা। আর চা।
ঘড়িতে যখন ছ’টা বাজতে পাঁচ মিনিট তখন ভটকাই একবার দোতলার বারান্দা থেকে ঝুঁকে দেখে এল। নিনিকুমারীর বাঘ মারতে গেছিল আমার আর ঋজুদার সঙ্গে সেটা অন্য ব্যাপার ছিল, তা বলে খুনের কিনারা করতে যাওয়া! ন্যাচারলি অত্যন্ত উত্তেজিত এবং উন্মুখ হয়ে আছে সে।
ঋজুদা বলল, তুই দেখি আমাদের ম্যাডার মতন।
কে ম্যাডা? যার নামে ম্যাডাক্স স্কোয়ার? যেখানে জমজমাট পুজো হয়?
তিতির বলল, নামটা ম্যাডাক্স স্কোয়ার নয়, ম্যাডক্স স্কোয়ার।
নারে, না। আমাদের একটি আইরিশ ফক্স-টেরিআর কুকুর ছিল। সাদাতে কালোতে মেশানো রং। কী বুদ্ধি যে ছিল তার, আর কী চঞ্চল, তা কী বলব। জেঠুমণি যখনই অফিস থেকে আসতেন তখনই ম্যাডা পথের সব গাড়ির হর্ন-এর মধ্যে জ্যেঠুমণির গাড়ির হর্ন ঠিক চিনে নিতে পারত আর উত্তেজিত হয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে ঘর বারান্দা করত বার বার এবং তারপরই এক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গারাজে চলে যেত। বাড়ির ভেতর দিক থেকে গারাজে ঢোকার একটি দরজা ছিল।–সেই দরজা দিয়েই জেঠুমণি গাড়ি গারাজ করে, দোতলাতে উঠে আসতেন। গারাজ খোলা মাত্রই ম্যাডা গারাজে ঢুকে গাড়ির সামনে লাফাতে থাকত। এমনি করেই তো একদিন গাড়ির তলাতে পরে ডান পাটা ভেঙেই গেল।
তিতির বলল, আচ্ছা ঋজুদা, তুমি বুঝি কুকুর ভালবাস না?
আমি বললাম, তোমরা আর কতদিন চেন ঋজুদাকে? বহুদিন আগে ঋজুদা যখন ওড়িশার জঙ্গলে ক্যাম্প করে থাকত, কাঠের ঠিকাদারি করত, তখন ঋজুদার সাত সাতটি কুকুর ছিল। আর তাদের নাম কী ছিল, জানো?
ভটকাই শুধোল, কী?
সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি।
তিতির হেসে উঠল। বলল, শুদ্ধ না কোমল?
আমি বললাম, সাত স্বরেই তো কোমল পর্দা লাগে না। শুদ্ধ স্বরগুলি ছিল পুরুষ আর কোমল স্বরগুলি মেয়ে।
ঋজুদাও হেসে উঠল, পুরনো কথা হঠাৎ মনে পড়িয়ে দেওয়াতে।
আমি অনেকদিন পরে একহাত নিলাম ভটকাইকে, তিতিরকেই বা নয় কেন! দুজনকেই।
তারপরই জ্যাঠার মতো বললাম, সে কি আজকের কথারে? ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’তে লিখেছি সেসব কথা। ঋজুদাকে নিয়ে সেই তো আমার প্রথম বই। তখন আমার কতই বা বয়স!
তিতির হেসে বলল, হ্যাঁ, তুমি তো এখন বুড়োই হয়ে গেছ রুদ্র। তোমার বয়সের কি আর গাছ-পাথর আছে?
বুড়ো নই, বুড়ো নই; অভিজ্ঞ! এক্সপিরিয়েন্সড।
রাইট।
বলল, ঋজুদা! পাইপে দেশলাই ঠুকে।
একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল, রুদ্রকে তোরা মাঝেমাঝে যে হেনস্থা করিস এবং ও সবসময় হাসিমুখে তোদের সহ্যও করে, সেটা ওর মহত্ত্বই বলতে হবে। সত্যিই, আমার আর রুদ্রর পার্টনারশিপ তো কমদিনের হল না! আর ঋজুদা কাহিনী লিখে, বলতে গেলে রুদ্রই তো আমাকে ফেমাস করল। যদিও ফেমাস হতে চাইনি আমি। এ এক বিড়ম্বনা!
ঘড়ির দিকে একবার চেয়েই ভটকাই আবার এক দৌড়ে বারান্দাতে গেল, ঋজুদার জ্যেঠুমণির ম্যাডার মতন। গিয়েই রানিং কমেন্টারি দিতে লাগল কন্টেসা ক্লাসিক সাদা রং। এক্ষুনি পৌঁছল। মিস্টার তম্বি সিং নামলেন। ড্রাইভার দরজা খুলে দিল।
বাবা! এ যে দেখি পুরো সাহেব।
বলেই, ঘরে এল। বলল, ওঁর বড় ভাইকে সঙ্গে আনলেন না?
বড় ভাই?
ঋজুদা একটু তাকাল অবাক হয়ে, ভটকাই-এর দিকে।
হ্যাঁ। হম্বির তো তম্বির বড় ভাইই হওয়ার কথা। হম্বিতম্বি বলেই তো জানি কথাটা আমরা।
আমরা সকলেই হো হো করে হেসে উঠলাম। এবং গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটাতে ছ’টা বাজার শব্দ আরম্ভ হতে না হতেই কলিং বেলটা বাজল।
আমিই খুলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ঋজুদা হাত দিয়ে ইশারাতে মানা করে, নিজেই গিয়ে দরজাটা খুলল, বলল, গুড ইভনিং মিস্টার তম্বি। কাম অন ইন।
ভারতীয়দের সঙ্গে সচরাচর ইংরেজি বলে না ঋজুদা। কারণ, সে, মানে দূরদর্শনের খবরের হিন্দি নয়; হিন্দুস্তানি, মারাঠি, ওড়িয়া, হো, সাঁওতালি, মুণ্ডারি, নেপালি, ইত্যাদি অনেক ভাষাই ভাল বলতে পারে। কিন্তু যে-সব ভারতীয়, বাঙালিদের মধ্যেও তাদের সংখ্যা বড় কম নয়, দেশ স্বাধীন হবার চল্লিশ বছর পরও ইংরিজি বলে শ্লাঘা বোধ করেন, তাদের সঙ্গে ইংরেজিই বলে। সেইসব মানুষেরা ইংরেজি না-জানা মানুষের কাছে, নীচ প্রবৃত্তিতে, আপার-হ্যান্ড নিতে চান ইংরেজি বলে। কিন্তু অপাত্রকে আপার-হ্যান্ড দেবে, এমন পাত্রই ঋজুদা নয়।
মিস্টার তম্বি বললেন, অ্যাম আই অন টাইম, মিস্টার বোস?
রাইট অন টাইম। ইওর হাইনেস।
হেসে বলল, ঋজুদা। রাজা রাজড়াদের দিন শেষ হয়ে গেছে তা ভাল করে জেনেও। এবং এই মানুষটি শুধুমাত্র দূতই! তাও সত্যি সত্যিই কোনও রাজার দূত কিনা, সে সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ না হয়েও। ঋজুদার মতো খুশি করতে, কম মানুষই পারে। আবার দুখী করার বেলাতেও এই কথাটাই সমান ভাবে খাটে।
তারপর আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে মিস্টার সিং-এর আলাপ করিয়ে দিল। সিনিয়ারিটি অনুযায়ী। আগে আমার সঙ্গে, তারপর তিতিরের সঙ্গে এবং সবশেষে ভটকাই-এর সঙ্গে।
চোখ দিয়ে ইশারা করে ভটকাইকে বললাম, একেই বলে প্রোটোকল। তোর মতো অভব্যদের ঋজুদাকে দেখে শেখা উচিত।
ও! আগের কাজ আগে।
বলেই, তম্বি সিং ওঁর জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে এক গোছা প্লেনের টিকিট বার করে ঋজুদাকে দিলেন। বললেন, আগামী রোববারের। সকালের ফ্লাইট। রিটার্ন ওপেন আছে। তারপর একটা মোটা খাম।
ঋজুদা অবাক হয়ে বলল, এতে কী আছে?
পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। অন অ্যাকাউন্ট। পাঁচশো টাকার নোট।
তা ক্যাশ কেন? আপনি জানেন তো যে, দশহাজারের চেয়ে বেশি টাকা ক্যাশ-এ পেমেন্ট করলে, ইনকাম ট্যাক্সে বাদ পাওয়া যায় না খরচ হিসাবে?
সেসব আমার, বলেই, একটু বিব্রত হয়ে বললেন, রসিদ দিতে হবে না।
রসিদ আমি দেবই, তা আপনি রাখুন আর ছিঁড়েই ফেলুন।
বলে, ঋজুদা ড্রয়ার খুলে প্যাড বের করে রসিদ লিখে দিল। রেভেন্যু স্ট্যাম্প লাগানোই ছিল।
মিস্টার তম্বি সিং আমাদের দিকে একে একে চেয়ে বললেন, এঁরাই তা হলে ফেমাস ঋজু বোসের ফেমাস অ্যাসিস্ট্যান্টস–ঋজু বোস অ্যান্ড কোম্পানি।
ঋজুদা হাসল। বলল, রাইট য়ু আর। আমাকে ইনফেমাস এমনকী নটোরিয়াসও বলতে পারেন, কিন্তু এঁদের প্রত্যেককেই ফেমাস বলেই জানবেন। ইন দেয়ার ওওন রাইটস।
এবারে বলুন, কী খাবেন? হোয়াট ক্যান আই অফার ঝু? বাট আই অ্যাম সরি আই ডু নট হ্যাভ এনি হার্ড ড্রিঙ্কস।
না, না। কিছু না। কাজের কথা সেরে নিই তাড়াতাড়ি।
ঠিক আছে।
ওঁকে মধ্যের সিঙ্গল সোফাটাতে আরাম করে বসতে দিল, ঋজুদা। আসলে, এই সোফাটার মুখোমুখি ঋজুদার রিক্লাইনিং চেয়ারটার বাঁ পাশের সাইড টেবিলের ওপরেই রাখা থাকে টেবিল লাইটটা। আলোটা এই চেয়ারে যে-ই বসবেন, তাঁরই মুখের ওপরে পড়বে। তা ছাড়া, রাতের বেলা ঘরের অন্য অনেক আলো তো থাকেই। ওই আলোটা দিনের বেলাতেও পড়াশোনার জন্য ব্যবহার করে ঋজুদা। মাথার পেছনে, বাঁ পাশে থাকে। কোনও নবাগন্তুক এলে এই উপরি আলো কাজে লাগে। মনস্তত্ববিদেরা, পুলিশ অফিসারদের মধ্যে যাঁরা জেরা করেন, তাঁরা সকলেই এমন আলোর ব্যবহার জানেন।
মাথার টুপিটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন মিস্টার সিং। সঙ্গে সঙ্গে আমি সেটা খুলে নিয়ে, হ্যাট-স্ট্যান্ডে রেখে এলাম।
উনি বললেন, থ্যাঙ্ক য়ু। তারপর একটি পলমল সিগারেটের প্যাকেট বের করে আমাদের অফার করে, নিজে ধরালেন একটি। নিজের লাইটার দিয়েই। বললেন, এইই আমার দোষ। এই অ্যাডিকশনটাকে ছাড়তে পারলাম না। অবশ্য অ্যাডিকশান বলতে এই একটিই।
ঋজুদা হেসে বলল, ছোটখাটো অ্যাডিকশন দু একটি থাকা ভাল।নইলে তা এড়াতে গিয়ে অনেকগুলি বড়র খপ্পরে পড়তে হয়।
তা ঠিক।
বলেই, মি. সিং হাসলেন।
হাসিটা আমাদের মতন না। অনভ্যস্ত কানে, হঃ, হঃ হঃ শোনায়। নেপালি বা দার্জিলিং বা গ্যাঙটকের মানুষেরা কিন্তু এরকম হাসেন না। মেঘালয়ের খাসিরাও এমন করে হাসেন না। হয়তো মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশের মানুষদের হাসির ধরনটা একটু অন্য ধরনের। হতেই পারে। এত বড় দেশ আমাদের। কত বৈচিত্র্য!
বলুন এবার, আপনার যা বলার।
ঋজুদা বলল, ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট গলাতে।
হ্যাঁ।
শুরু করলেন তম্বি সিং।
ইংরিজি মোটামুটি বলেন। উচ্চারণটাও মোটামুটি। তবে মাঝেমাঝেই কিছু কিছু শব্দের উচ্চারণে বোঝা যায় যে, ইনি কোন অঞ্চলের মানুষ। যেমন, পশ্চিমবাংলার, হরিয়ানার, পাঞ্জাবের, বিহারের, ওড়িশার এবং তামিলনাড়ুর মানুষদের ইংরেজি শুনলেই বোঝা যায়।
মণিপুরের রাজপরিবারের একজন রাজা, লাইহারোবা সিং ছিলেন নিঃসন্তান। ইবোহাল সিং তাঁরই ভাইপো। তিনি প্রায় আমারই সমবয়সী। আমরা অত্যন্ত বন্ধু ছিলাম। তাঁকেই কে বা কারা খুন করে, তাঁর মোরে’র বাংলোতে, আগস্টের…।
ঋজুদা বলল, তারিখটা তো আমাকে জানিয়েছেনই!
কী ভাবে খুনটা হয়?
গলায় ফাঁস দিয়ে।
দিনে না রাতে?
রাতে। গভীর রাতে।
সন্ধেরাতে যে নয়, সে সম্বন্ধে আপনি নিশ্চিত হলেন কী করে?
না, না, আমি নিশ্চিত নই। পুলিশের তাই ধারণা।
আই সি!
কোথায় হয় খুনটা?
ওঁর স্টাডিতে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতেন, ওঁর স্টাডিতেই থাকতেন বেশির ভাগ সময়।
স্টাডিতে কী করতেন?
পড়াশুনা করতেন। ভিডিও ক্যাসেট দেখতেন। মিউজিক সিস্টেমে গান বাজনা শুনতেন, বই পড়তেন, পুরনো অ্যালবাম দেখতেন। ওঁর সখের শেষ ছিল না। ভাল হুইস্কি খেতেন। রাতে হুইস্কি, দিনে জিন।
কতখানি খেতেন?
আধ বোতল করে।
দুপুরে এবং রাতে?
ইয়েস। কেন? বেশি মনে হচ্ছে?
না, না। রাজারাজড়াদের ব্যাপার-স্যাপার তো একটু আলাদা হবেই। আমার ইনকুইজিটিভনেস ক্ষমা করবেন।
ওঁর পরিবারে কে কে ছিলেন?
কেউই নয়। উনিও ব্যাচেলরই ছিলেন। ওঁর কাকারই মতো।
আই সি। তা উনি কোনও উইল করে গেছিলেন? ওঁর সম্পত্তি ওঁর অবর্তমানে কে পাবে?
উইল করে গেছিলেন বলে তো জানা নেই! তবে আচ্চাও হয়তো কিছু জানে এ বিষয়ে।
আচ্চাও কে?
ওই আচ্চাওই দেখাশোনা করত, ইবোহালের। প্রাইভেট সেক্রেটারির মতো ছিল। সবসময়ের সঙ্গী ছিল। আমাদের সঙ্গে শিকারেও যেত। আচ্চাও গান-বেয়ারারকে গান-বেয়ারার, ড্রাইভারকে ড্রাইভার, শেফকে শেফ ছিল। হ্যাঁ, মি. বোস, আচ্চাও দারুণ ভাল রান্নাও করে। সে সবই ছিল ইবোহালের-নয়নের মণি।
তার মানে, মিস্টার ইবোহাল সিং ডায়েড ইন্টেস্টেড।
ইয়েস মি. বোস। আমরা যতটুকু জানি, তাতে ইবোহাল কোনও উইল রেখে যাননি। আর উইল করলে তো এক্সিকুটার করত আমাকেই।
সে-সম্বন্ধে আপনি নিঃসন্দেহ হলেন কী করে?
তার কোনও প্রমাণ দিতে হয়তো পারব না, তবে আমিই তো ছিলাম ওঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ। ওঁর বাড়িতেই থাকতাম মাসের মধ্যে প্রায় পনেরো দিন। কিন্তু, যেদিন খুনটা হয় সেদিন আমি ইম্ফলে ছিলাম।
ঋজুদা চুপ করে একটুক্ষণ কী ভাবল। তারপর বলল, এক কাপ চা কি আপনি…।
না, না। মেনি থ্যাঙ্কস।
তারপর ঋজুদা বলল, মি. ইবোহাল সিং-এর পরিবার কি মণিপুরের রাজ পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত, না কি যোগসুত্রটা তেমন নিকট নয়?
না না, ঠিক তেমন নিকট নয়। বলছি।
ভদ্রলোক একটু থেমে থেমে প্রম্পটারের প্রম্পট শুনে, পার্ট-ভুলে যাওয়া
অভিনেতা যেমন করে কথা বলেন, তেমনি করে কথা বলছিলেন।
ইবোহালের ঠাকুর্দার অবস্থা খুব ভাল ছিল। রাজ পরিবারের লোকেদের সঙ্গে দহরম-মহরম ছিল। ওঁদের পুরুষদের সঙ্গে পোলো খেলতেন। একটু থেমে বললেন, আপনি কি জানেন মিস্টার বোস, যে, ‘পোলো’ খেলাটা মণিপুর রাজ্যেই প্রথম হত? আজকালকার সাইকেল পোলো-ফোলোর মতো ইন্নোভেটিভ ব্যাপার নয়–আসল পোলো৷ ঘোড়ায় চড়ে।
সে কী? ইটস আ নিউজ। আমার তো ধারণা ছিল যে, জয়পুর, যোধপুর, গোয়ালিয়র ইত্যাদি উত্তর ভারতের সব রাজা-রাজড়াই ভারতে পোলো খেলার পত্তনকারী।
তিতির বলল, অবাক হওয়া গলাতে।
ঋজুদা বলল, আমিও তাই জানতাম।
না, তা নয়। দেশ স্বাধীন হবার পর উত্তর ভারতীয়রাই বলতে গেলে এদেশের রাজা–এবং মাঝে মাঝে দক্ষিণ ভারতীয়রাও, এমনকী ফর আ চেঞ্জ কখনও কখনও পশ্চিম ভারতীয়রাও; কিন্তু আমরা পূর্বাঞ্চলের হতভাগা মানুষেরা তো আজও প্ৰজাই রয়ে গেলাম। আমরা আর স্বাধীন হলাম না। পোলোর মতো আরও অনেক কিছুই আছে যা অন্য প্রদেশীয়রা আমাদের কাছ থেকেই শিখেছিল, সে কথা অনেকেই জানেন না। জানলেও স্বীকার করেন না। দেখলেন তো, আপনার মতো পৃথিবী-ঘোরা উচ্চশিক্ষিত মানুষও জানতেন না, এই পোলোর ব্যাপারটা।
ঋজুদা ইতিবাচক ঘাড় নাড়ল।
তারপরই বলল, পুলিশ কী বলছে?
কী সম্বন্ধে?
যেন চমকে উঠে বললেন, মিস্টার তম্বি সিং।
ও না। পুলিশ আবার কী বলবে? আমাদের সব জায়গার পুলিশ যা বলে, তাই। বলেছে। যে বা যারা খুন করেছে, তারা নিশ্চয়ই আগে থাকতেই ম্যানেজ করেছে পুলিশকে। এ কি আর ইংল্যান্ডের পুলিশ?
না। তা নয়। ভারতেও অনেক সৎ ও দক্ষ পুলিশ অফিসার আছেন। সব বিভাগেই আছেন। তবে এটা ঠিক যে, সতোর সঙ্গে ভারতের মাটির যোগ ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে। কিন্তু তবু বলব, আপনার কি ধারণা, ইংল্যান্ডের সব পুলিশেরাই সৎ? সাদা চামড়াদের মধ্যে কালো চামড়াদের দোষ সংক্রামিত হয়? আমি তো বলব, সব দোষই হয়তো আমরা পেয়েছি ওদেরই কাছ থেকে।
জানি না। বাট আই বেগ টু ডিফার।
তম্বি সিং বললেন।
আপনি কি ইংল্যান্ডেই পড়াশুনো করেছেন?
হ্যাঁ।
কোথায়?
অক্সফোর্ডে।
কোন কলেজে?
বললাম তো, অক্সফোর্ডে।
আই সি।
বলেই, ঋজুদা প্রসঙ্গান্তরে চলে গেল।
তারপর বলুন, পুলিশ কী বলছে? আপনার কি মনে হয়? আর মোটিভ? এই খুনের উদ্দেশ্য কী হতে পারে? ওঁকে খুন করে কে বা কারা লাভবান হতে পারেন? ওঁর শত্ৰু কি ছিল কেউ? অন্যান্যদের মধ্যে ওঁর কাছের লোকজন কারা ছিলেন? ইম্ফলে বাড়ি থাকা সত্ত্বেও উনি মোরেতে কেন থাকতেন? ‘মোরে’ ইম্ফল থেকে একশো কিমির চেয়েও দূর হবে। বিশেষ করে, এখন মণিপুরের মধ্যে যা সন্ত্রাসবাদী ক্রিয়াকলাপ চলছে এবং তার বেশিটাই তো জানি মোরেরই দিকে– মানে, প্যালেল আর মোরের মাঝামাঝি–তবুও উনি এই সময়ে মোরেতেই পড়ে রইলেন কেন? ইম্ফলেও যদি থাকার জায়গা থেকে থাকে।
আমরা তো বটেই, মনে হল মিস্টার তম্বি সিং-ও যেন একটু অবাক হলেন, ঋজুদার কথা শুনে।
তম্বি সিং বললেন, আপনি কি গেছেন কখনও, মণিপুরে?
ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, বহুবার। প্রথমবার যাই, উনিশশো ছাপ্পান্নতে। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। তারপরেও, বহুবার গেছি। মণিপুরের ইম্ফল, নাগাল্যান্ডের কোহিমা, ডিমাপুর, মোককচুঙ, মাও, বার্মার তামু, ত্রিপুরার আগরতলা, গারো পাহাড়ের তুরা, মেঘালয়ের শিলং, জয়ন্তী এবং..
বাস। বাস। ওরে বাস।
বললেন মিস্টার তম্বি সিং।
বলেই বললেন, তবে তো একেবারে ঠিক লোকের কাছেই এসেছি। আমার বরাত খুব ভাল বলতে হবে। অন্ধের মতো কিছুই হাতড়ে বেড়াতে হবে না আপনাকে, মণিপুরে গিয়ে। আই মাস্ট থ্যাঙ্ক পিশাক সিং। আপনার কথা আমাদের বলেছেন বলে।
বলেই, আরেকটি সিগারেট ধরালেন। পুরনোটি অনেকক্ষণ আগেই অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়েছিলেন।
তারপর বললেন, আপনি আমাকে যেসব প্রশ্ন করলেন, ইনফ্যাক্ট, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্যই তো আপনাকে যাওয়ার নেমন্তন্ন নিয়ে এসেছি। আসলে…আমরা একেবারেই পিরপ্লেক্সড। আমার মেয়ে সানাহানবি তো কেঁদে কেঁদে রোগা হয়ে গেল। ইবোহাল ওজ ভেরি ফন্ড অব হার।
হ্যাঁ, সেটাও আমি জানতে চাই। ওঁর সম্বন্ধে যা কিছু জানেন, সবই জানতে চাই।
ইবোহাল ওজ আ হি-ম্যান। আ লেডিজ ম্যান। সব বয়সী মহিলারাই ইবোহালকে এক বিশেষ চোখে দেখত। পাঁচ বছর থেকে পঁচাশি বছর অবধি।
মি. সিং, একটা প্রশ্ন করব? আপনার নিজের কী ইন্টারেস্ট, এই রহস্যভেদ করে? ইবোহাল সিং-এর মৃত্যুতে তাঁর প্রিয় বন্ধু হিসেবে আপনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছেন এবং সেইজন্যই কি আপনি চান যে, প্রকৃত খুনি বা খুনিরা ধরা পড়ুক? না, অন্য কোনও কারণও আছে?
তম্বি সিং অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে একবার মুখ ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে আমার, তিতিরের ও ভটকাই-এর মুখের দিকে দেখলেন।
ঋজুদা পাইপের ছাইটা ঝেড়ে ফেলে বলল, এরা প্রত্যেকেই আমার সম্পূর্ণ আস্থাভাজন। এবং এরাই আমার সহকারী। আপনি নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে বলুন, যা বলতে চান।
ব্যাপারটা কি জানেন?
বলেই সিগারেট একটি বড় টান লাগালেন তম্বি সিং।
ব্যাপারটা হচ্ছে, অ্যাজ ব্যাড লাক উড হ্যাভ ইট, পুলিশে কিনারা করতে–পারাতে, জানাশোনা এবং স্থানীয় মানুষের সন্দেহটা আমার ওপরেই এসে পড়েছে। শুধু বন্ধুত্বের টানেতেই নয়, নিজেকে মিথ্যে দুর্নাম থেকে বাঁচাতেও আপনার কাছে ছুটে আসতে হয়েছে। এ ছাড়া, সত্যি কথা বলতে কী আমার আর কোনও…।
হঠাৎ মনে হল যে, তিনি ভেঙে পড়বেন–উনি বললেন, আমি গরিব মানুষ…।
ঋজুদা বলল, ভেরি স্ট্রেঞ্জ। অথচ আপনিই…
হ্যাঁ। অফ অল পার্সনস, আমিই। কারণ, আমার মতো ভাল আর কেউই জানে না যে, আমি আমার প্রিয়তম বন্ধু ইবোহালকে খুন করিনি। আমরা কত শিকার করেছি ছেলেবেলা থেকে দুজনে, একসঙ্গে, লকটাক লেকে–পাখি, নাচুনে-হরিণ। থেংনোপালের, কাঙ্গপোকপির, তাদুবীর জঙ্গলে বাঘ, হরিণ, চিতা। কত পোলো খেলেছি প্রথম যৌবন থেকে। ইবোহাল, আমার স্ত্রীর আর একমাত্র মেয়ে সানাহানবির এমনই প্রিয় ছিল যে, নিন্দুকেরা বলত, যে আমার স্ত্রীর দুই স্বামী।
কিন্তু আমিও যদি খুনের কিনারা না করতে পারি? তাহলে তো আপনার ওপর যারা সন্দেহ করছে, সেই সন্দেহ থেকেই যাবে। এমনকী তা হয়তো বেড়েও যাবে। তখন তো বিপদ আপনারই বাড়বে।
না না, আমি জানি যে, আপনি ঠিকই পারবেন কিনারা করতে। আপনিই পারেন, আমার মান বাঁচাতে। আপনি ছাড়া আর কেউই পারবেন না।
আপনার কি খুনি বলে কাউকে সন্দেহ হয়?
ঋজুদা বলল।
কী করে বলি, নিশ্চিত না হয়ে। তবে আমার ফেইন্ট সন্দেহ হয় যে, ইবোহালের সম্পত্তি ও অন্য কাউকে দেবে বলে ভাবছিল এবং কথাটা হয়তো আচ্চাও জেনে যায়। আচ্চাও হয়তো, হয়তো কেন, নিশ্চয়ই ভেবেছিল যে, ইবোহাল যেহেতু নিঃসন্তান এবং আচ্চাওকে পুত্রসম ভালবাসে, তাই ওর যা কিছু আছে, সবই সে আচ্চাওকে দিয়ে যাবে। কিছুদিন হল হাঁপানিতে কষ্ট পাচ্ছিল খুব। শরীর ভাল যাচ্ছিল না। একদিন ইবোহাল আচ্চাওর সামনেই আমার মেয়ে সানাহানবিকে বলে যে, শিগগিরই সে উইল করবে। সেটা শোনার পর থেকেই আচ্চাও-এর খুব রাগ জন্মেছিল ইবোহালের ওপরে। তাই মনে হয়, সেই রাগেই…
যখন এই কথা ইবোহাল সিং বলেন তখন কি আপনি সামনে ছিলেন?
না। আমি সামনে ছিলাম না।
তবে আপনি একথা জানলেন কী করে? আপনার মেয়ে সানাহানবি কি আপনাকে বলেছিল?
না, সানাহানবি কিছুই বলেনি। সে অন্য ধরনের মেয়ে। তাকে দেখলেই আপনিই বুঝতে পারবেন সে কী! আমাকে দেখে মেয়ে সম্বন্ধে ধারণা করবেন না কোনও।
তবে কে বলল আপনাকে? আচ্চাও সিং?
না। সেও বলেনি। সেও খুব চাপা ছেলে। আত্মসম্মানজ্ঞানী।
তবে আপনি জানলেন কী করে?
ইবোহালের খাস-বেয়ারা বার্মিজ উ-মঙ্গ বলেছিল।
সে কি তখন সামনে ছিল?
সামনে ছিল কি না জানি না। তবে না থাকলে…
ওর সামনে এমন একটা ডেলিকেট ও গোপনীয় কথা মিস্টার ইবোহাল সিং বলবেন বলে আপনার বিশ্বাস হয়?
আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কী এসে যায়? আসলে, আমাকে আপনি জেরা করবেন না। করলে, এ কেস-এর সমাধান আপনি করতে পারবেন না। আমি দূত হয়ে এসেছি আপনার যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে। ইম্ফলে গিয়ে, মোরেতে গিয়ে, কাঙ্গপোকপিতে গিয়ে, আপনি যত খুশি প্রশ্ন করবেন, যত লোককে ইচ্ছে। আমি এখনও ইবোহালের মৃত্যুর শকটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমাকে মাপ করবেন।
ঠিক আছে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করব না। আপনার নিজের যা খুশি, তাই বলুন।
ও হ্যাঁ। কিছুদিন হল, শুনেছি, একজন খুব বড়লোক ব্যবসায়ী আচ্চাওকে তাঁর ব্যবসার কাজে লাগাবেন বলে খুব ভাল মাইনে-পাতির লোভ দেখাচ্ছিলেন। হয়তো, আচ্চাওকে, ওঁকে ছেড়ে যেতে নিরস্ত করার জন্যই ইবোহাল ওইরকম বলেছিল। সম্পত্তি দেবে না, এই ভয় দেখিয়েছিল। অবশ্য দেবে যে, একথাও কখনও কাউকে বলেনি। আচ্চাওকেও বলেছিল বলে মনে হয় না আমার। হয়তো ইবোহাল আচ্চাওকে প্রেসারইজ করছিল যাতে ব্যবসা করতে গিয়ে নিজের পায়ে কুড়ল না মারে। এখন মরা মানুষের কাছ থেকে তো আর নতুন করে কথা বের করা যাবে না।
না। তা যাবে না। এই ব্যবসায়ীটি কোথায় থাকেন?
ইম্ফলেই। মস্ত বড়লোক। নাম, থাঙ্গজম সিং লংজু।
ঋজুদা বলল, আচ্চাও ওরিজিনালি কোন চাকরিতে ঢুকেছিল? ড্রাইভার হিসেবে? গান-বেয়ারার হিসেবে? না, ইবোহাল সিং-এর ভ্যালে হিসেবে?
না, না। আচ্চাও তো শিক্ষিত। পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও ভাল। ছেলেবেলায় ওর মা বাবা একই সঙ্গে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেলে কাকারা সম্পত্তি ঠকিয়ে নেয়। এক মাসি দেখাশোনা করতেন ওকে। তবে তাঁর অবস্থা ভাল ছিল না। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেছিল ও। ইবোহাল ওকে প্রথমে এস্টেট ম্যানেজার হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করেছিল। ধীরে ধীরে ও হয়ে উঠল ইবোহালের, যাকে বলে, হিন্দিতে দোস্ত!-ইয়ার!–একেবারে মাথায় চড়িয়েছিল ইবোহাল তাকে।
এখন আচ্চাও সিং কোথায়?
সে পালিয়ে গেছে। তাকে পাওয়া গেলে তো অনেক কিছুই জানা যেত।
সে পালিয়ে গেলে তো পুলিশ তাকেই সন্দেহ করবে প্রথমে এবং সে সন্দেহ তো অমূলক নয়!
শুধু সন্দেহ করলে তো হবে না। প্রমাণ সাবুদ তো চাই। আর অন্য প্রমাণের মধ্যে রুবিটাও পড়বে। সেটা যার কাছে পাওয়া যাবে, যদি যায়, নব্বইভাগ সন্দেহ তার উপরই পড়বে খুনি বলে।
তাই?
ঋজুদা বলল। কিছু মনে করবেন না মিস্টার সিং। আপনার মেয়ে, আচ্চাওকে কী চোখে দেখত?
মেয়েদের দেখার কথা কে বলতে পারে মিস্টার বোস?
ঋজুদা বলল, আমি তো পারিই না। আমি তো ব্যাচেলার।
হেসে ফেললেন, মিস্টার সিং।
আচ্চাও, ওর ঘনিষ্ঠদের নাকি বলেছে, পালাবার আগে, যে তার এত ভালমানুষ মালিককে কে বা কারা খুন করল তা সে খুঁজে বের করবেই। নইলে ওর শান্তি নেই।
আমি বলে উঠলাম, সম্পত্তিই যদি না পায়, তবে তা করে আচ্চাও সিং-এর লাভ?
লাভ?
বলেই, তম্বি সিং থেমে গেলেন।
বললেন, ফিনান্সিয়াল লাভ তো কিছু দেখছি না। টাকাটা সকলের কাছে বড় নাও হতে পারে। হয়তো অন্য কোনও মোটিভ থাকতে পারে এর পেছনে। আপনি গোয়েন্দা, আপনিই ভাল বুঝবেন, আমার চেয়ে।
হাতঘড়ির দিকে চাইলেন একবার তম্বি সিং। ঘড়িটা–সোনার। ইতিমধ্যে গ্র্যান্ড ফাদার ক্লকে সাড়ে ছ’টা বাজল।
বাঃ। আপনার ঘড়িটা কিন্তু দারুণ।
ঋজুদা বলল।
হ্যাঁ। ইবোহালই আমাকে কিনে দিয়েছিল। দুজনে একসঙ্গে যখন সুইজারল্যান্ডে গেছিলাম। ইবোহালের এক সুইস বন্ধু প্রায় জোর করেই ওকে কিনতে বলল। ওতো একটা কিনলই, আমাকেও একটা আইডেনটিকাল পিস কিনে দিল।
ভটকাই হঠাৎ বলল, কী বললেন? মিস্টার ইবোহাল সিং-এর সুইস বন্ধু?
ইয়েস। দ্যাটস রাইট।
ভটকাই তার দুটি চোখ তম্বি সিং-এর দুচোখে ফোকাস করে রেখে শুধোল, সেই বন্ধু স্যুইস-ফ্রেঞ্চ না সুইস-জার্মান? না স্যুইস-ইটালিয়ান?
আই বেগ ইওর পাৰ্ডন?
ঘাবড়ে গিয়ে শুধোলেন তম্বি সিং।
তারপরই বললেন, সুইস ফ্রেন্ড। মানে, সুইজারল্যান্ডের লোক।
বুঝেছি, সরি স্যার, ফর দ্য ইনটারাপশন।
ভটকাই বলল।
আমি এবার উঠতে পারি? আমি কাল চলে যাচ্ছি। রবিবার সকালে আমি এয়ারপোর্টে থাকব, আপনাদের রিসিভ করতে।
থাকার বন্দোবস্ত কোথায় করেছেন?
সার্কিট হাউসেই। আমার বাড়িতেও থাকতে পারতেন। কিন্তু আপনাদের দেখাশোনা করবে কে? আমার বাড়িতে তো অন্য কেউই থাকেন না। আমার স্ত্রী তো গত হয়েছেন, চারবছর হল। আর সানাহানবিও রয়েছে এখন কাঙ্গপোকপিতে, তার এগ্রিকালচারাল ফার্মে। ফার্মিং করে, ঘোড়ায় চড়ে, শিকার করে। সানাহাবি ভাল পোলোও খেলে। আসল ব্যবসা হয়েছে এখন কুকুর-ব্রিড করানো। ছেলেবেলা থেকেই কুকুর ভালবাসত খুব। এখন কুকুরেরই ব্যবসা হয়েছে।
কাঙ্গপোকপি!
কী দারুণ নামটা! তাই না?
তিতির বলল।
ভটকাই বলল, জায়গার নাম? কাঙ্গপোকপি?
তম্বি সিং কিছু বলার আগেই ঋজুদা বলল, হ্যাঁ। মণিপুর থেকে যে পথটা পাহাড় আর গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেছে নাগাল্যান্ডের দিকে, সেই পথেই কাঙ্গপোকপি পড়ে। তাদূবী, মাও, জুকুমা, খুজামা এই সব নামের জায়গা আছে না আশেপাশে? মাওতেই বোধহয় বর্ডার, নাগাল্যান্ডের? আর কী চমৎকার সে নৈসর্গিক সৌন্দর্য! অনেকেই বলেন, ওই পথের দৃশ্য, জম্মু থেকে শ্রীনগরে যাওয়ার দৃশ্যের মতোই সুন্দর। এখন তো কাশ্মীর যাবার উপায় নেই, ওখানে গিয়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিতে পারবি।
তম্বি সিং আমাদের দিকে ফিরে বললেন, আসুন। আসুন। আপনাদের সব দেখাব! কিন্তু আপনারা এমন সময়েই যাচ্ছেন। এখন তো মণিপুরে গোলমাল, সাংঘাতিক।
ঋজুদা বলল, তা ঠিক। গোলমাল তো মোরের দিকেই বেশি। চূড়াচান্দপুর বা কাঙ্গপোকপির দিকেও কি তেমন গোলমাল আছে? তা ছাড়া আপনার বন্ধুর হত্যা-রহস্যের সমাধান তো গোলমালের জন্যে বসে থাকবে না।
না। তা নয়। ওদিকে এখনও গোলমাল নেই, কিন্তু না থাকলেও লাগতে কতক্ষণ?
তম্বি সিং, ঋজুদা মণিপুর সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে দেখেই যেন মনমরা হয়ে বললেন।
আপনার মেয়ের বিয়ে দেননি, মিস্টার সিং?
আমি কি দেব? আজকালকার মেয়েরা কি আর বাবা মায়ের ইচ্ছেতে বিয়ে করে? তা ছাড়া, আমাদের সমাজও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। মেয়েরাই মালিক সেখানকার। কাজেকর্মেও তারা এগিয়ে। মেয়েরাই তো সর্বেসর্বা মণিপুরে। মণিপুরে কেন, সব পূর্বী-পাহাড়েই।
তিতির বলল, চলুন। আগে তো গিয়ে পৌঁছই। তারপর যদি আপনার মেয়ের সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ পাই, তবে সেখানেই থেকে যেতে পারি।
বলেই, ভটকাই আর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই মেল-ডমিনেটেড পৃথিবী আর ভাল লাগে না।
কাঙ্গপোকপির ফার্মহাউসে সানাহানবি একা থাকেন?
তিতির শুধোল। উৎসুক হয়ে।
হ্যাঁ। সানাহানবি একাই একশো পুরুষের সমান। তা ছাড়া, ওর কুকুরেরাও থাকে। ফার্মের দেখাশোনা, কুকুর ও ঘোড়ার দেখাশোনা করার লোকেরাও থাকে। কুকুরের খুব শখ ওর। পৃথিবীর সব ভাল কুকুর আছে ওর কাছে। কুকুরের বাচ্চা বিক্রি করে। ঘোড়াও আছে। তবে, বেড়াল ওর ভারী অপছন্দের।
কী কী কুকুর আছে?
ঋজুদা শুধোল। কুকুর সম্বন্ধে আপনি কি কিছু জানেন? জানলে নাম বলুন না। কোন কুকুর নেই? আমি তো অত জানি না।
কথাটা খুব কনফিডেন্টলি বললেন তম্বি সিং। ভেবেছিলেন, এবার জব্দ করতে পারবেন ঋজুদাকে।
ঋজুদা পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে হাতে ধরে বলল, সালুকি আছে?
সালুকি?
তম্বি সিং অবাক হয়ে বললেন।
সালুকি আবার কী কুকুর, আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম। মানে, আমরা সকলেই।
তম্বি সিং বললেন, হ্যাঁ। সালুকিও আছে।
ঋজুদা উত্তেজিত হয়ে বলল, বলেন কী সিং সাহেব। যিনি সালুকি ব্রিড করান তিনি যে সে ডগ লাভার নন। কলকাতাতেই আমার জানাশোনার মধ্যে একজোড়া সালুকি ছিল একমাত্র সনৎদার–সনৎ দত্ত, চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের– আর কারও কাছেই সালুকি দেখিনি। সে তো কোটিপতিদের কুকুর। যাই হোক, কাঙ্গপোকপিতে যেতেই হবে, আপনার মেয়ের ফার্মে। শুধু এদের সালুকি দেখাতেই।
সে তো আমার সৌভাগ্য। সানাহানবিরও সৌভাগ্য। তা হলে আজকে আমি উঠি। রবিবার সকালে দেখা হবে এয়ারপোর্টে। তখন দিনের পর দিন আপনাদের প্রশ্নেরই জবাব দেব, সকলে মিলে।
ওকে। বলল, ঋজুদা।
আমরা সকলে মিস্টার তম্বি সিংকে পৌঁছে দিলাম, সিঁড়ির মুখ অবধি। তারপর আমি আর ভটকাই ওঁকে গাড়ি অবধি পৌঁছে দিলাম। ভটকাই-এর অতি উৎসাহ দেখে মনে হল, সানাহানবির কথা শুনেই ও নানা কল্পনার জাল বুনতে শুরু করেছে। যাকে বলে, ইমাজিনিং থিংগস।
বললাম, কী রে?
ভটকাই বলল, মাকাল ফল যাবে এবার, ইম ফল।
বসার ঘরে ঢুকে ভটকাই বলল, কেস খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে হচ্ছে।
এখন থেকেই ভাব ভাল করে। প্রতিদিন রাতে ইম্ফলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে হবে, কার কী মনে হচ্ছে তা নিয়ে। অনেক মাথা একসঙ্গে হলে সুবিধে হবে।
আমি বললাম, নাও হতে পারে। অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।
তারপর বললাম, ইন্দোনেশিয়ার কনসাল মিস্টার ডি. কে. নাগকে আমি চিনি। ইলে যেন কীসের ব্যবসা ছিল। সেগুন কাঠ না, কীসের যেন। সম্ভবত, ওই মোরেতেই। দ্বিজেন মেসোমশাই খুব ভাল বার্মিজ বলতে পারেন। ইন্দোনেশিয়ান তো পারেনই। আসলে ওঁরা রেঙ্গুনেই মানুষ–চলে এসেছিলেন নাকি পঞ্চাশের দশকে।
তাই? ফোন নাম্বার মনে আছে?
মনে নেই। তবে, মায়ের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছি এখুনি।
জান তবে।
পুশ-বাটন ফোনের ডায়াল টিপে আমি মায়ের কাছ থেকে দ্বিজেন মেসোর নাম্বার নিয়ে সেই নাম্বার ডায়াল করলাম। একজন মহিলা ধরলেন। বললেন, উনি বাড়ি নেই। ঋজুদার বাড়ির ফোন নাম্বারটা দিয়ে আমি রিং-ব্যাক করতে বললাম।
তোর মেসো কীরকম লোক?
আপন মেসো নয়। মায়ের বন্ধুর স্বামী। তবে বিজলি মাসি মারা গেছেন বেশ কয়েকবছর আগে।
প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে ঋজুদা বলল, আগামীকাল সকালে উঠেই তিতির আর রুদ্র কোনচৌকির খামারে যাবি, ভটকাইকে নিয়ে। পিস্তলে ওর হাতটা ঠিক করাবি। প্রয়োজন হোক আর না হোক। তোমার লাইসেন্সেই গুলি তুলবে ইস্ট-ইন্ডিয়া আর্মস থেকে, তিতির। আমার আর রুদ্রর ওভারড্রন অ্যাকাউন্ট। অন্তত একশো-দেড়শো গুলি ছোঁড়াবে। আর যা যা প্যাক করার তা নিয়ে নেবে। তোমরা তো সবাই ভেটারান। তবে মানুষখেকো বাঘ শিকারের আয়োজন একরকম, আর খুনের গোয়েন্দাগিরি আরেকরকম।
বলেই বলল, রুদ্র, আমাদের বাক্সটা নিতে ভুলবি না।
সেই অ্যালবিনোর সময়ের বাক্সটা তো?
হ্যাঁ। তবে, মাইনাস ট্রানজিস্টার।
ইতিমধ্যেই ফোনটা বাজল।
ঋজুদা খপ করে রিসিভার তুলে বলল, এক সেকেন্ড ধরুন। বলেই বলল, রুদ্র, তোর ফোন।
হ্যাঁ। দ্বিজেন মেসোমশাই? আপনার সঙ্গে ঋজুদা একটু কথা বলবেন।
কে?
ঋজুদা। ঋজু বোস।
কী ব্যাপার রে? তিনি তো বিখ্যাত লোক।
নমস্কার।
ঋজুদা ফোনটা ধরে বলল।
মানে, একটা প্রশ্ন করার জন্য একটু বিরক্ত করছি। আপনি কি ইম্ফলের মিস্টার তম্বি সিংকে চেনেন? হ্যাঁ…হ্যাঁ…তাই তো বললেন। …না, আমার সঙ্গে একটু আগেই আলাপ হল। আপনার কাছে যাচ্ছেন বললেন, আর রুদ্র বলল, আপনি ওর মেসোমশাই।
তারপর হাসল, ঋজুদা। কী কারণে, কে জানে!
আমি পরশু, তরশু একবার রুদ্রকে পাঠাব আপনার কাছে। যা বলার ওই গিয়ে বলবে। একটা অনুরোধ। আমি যে আপনাকে ফোন করেছিলাম বা রুদ্র বা আমি যে আপনাকে চিনি, সেকথাও ওঁকে বলবার দরকার নেই। হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনার বন্ধু যখন নন…। ফাইন।… খুব ভাল লাগল, আপনার সঙ্গে কথা বলে। নমস্কার।
ঋজুদা ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর বলল, তাহলে আজকের মতো এই থাক। আবার দেখা হবে শুক্রবার রাতে। ছ’টার সময়। সেদিন এখানেই খেয়ে যেও। বাঙালি পাঁঠার কালিয়া আর গদাধরদার হলুদ-রঙা কিসমিস বাদাম দেওয়া মিষ্টি পোলাও।
ভটকাই বলল, খুনের তদন্ত করতে যাব শুক্রবারের একরাত পরেই, নেপালচন্দ্রর রাবড়ি হবে না? মাথা খুলবে কী করে? ওরা দুজন তো পড়াশোনাতে ভাল–আমারই শুধু মাথা-মোটা। অন্তত আমার জন্য গদাধরদাকে বন্দোবস্ত করে রাখতে বোলো।
কোথাকার রাবড়ি বললি? শর্মার?
ছিঃ ছিঃ। ও রাবড়ি হিন্দুস্থানিদের খাদ্য। নেপালচন্দ্রর। মেফেয়ার রোডের নেপালচন্দ্রর। ছোট্ট দোকান হলে কী হয়। নেপালে গোপাল করে।
শুক্রবার ছ’টার মধ্যেই জমায়েত হয়েছিলাম আমরা, বিশপ লেফ্রয় রোডে। কিন্তু, তখন ঋজুদাই ছিল না। গদাধরদাকে পটিয়ে-পাটিয়ে চায়ের বন্দোবস্ত করেছিল ভটকাই, এমন সময় ঋজুদা ঢুকল। পাক্কা বারো মিনিট লেট। এমনটি হয় না কখনওই।
বলল, সরি। তোরা ক্ষমা করে দিস।
চিন্তান্বিত দেখাচ্ছিল ঋজুদাকে।
ভটকাই বলল, দিলাম। কিন্তু তোমার হম্বিতম্বি সিং, জালি লোক হচ্ছে।
হম্বি কোথায় পেলি? তম্বি বল।
হ্যাঁ। জালি-তম্বি।
শোন। এখন আমার অনেক কাজ আছে। এখন মিটিং ডিসমিসড। রবিবারে তিতির আর রুদ্র চাইলে এখানে আসতে পারিস। কিন্তু, সময়মতো। এলে আমার সঙ্গেই যেতে পারিস। ভটকাই, তুই কী করে যাবি? এয়ারপোর্টে?
শ্যামবাজারের মাথা মুড়িয়ে যশোর রোড ধরে নেব। আমার যাওয়ার জন্য তুমি চিন্তা করো না। আমি তো অন্য গ্রহের বাসিন্দা।
তা তো ধরবি। কিন্তু যাবি কীসে?
কেন? বাসে। আমার সঙ্গে মাল বলতে আর কী?
আমি বললাম, তুমি নিজেই তো যথেষ্ট।
তা ঠিক। তুইও মাল। তবে ‘মা’ আর ‘ল’ এর মধ্যে কিছু একটা মিসিং। এই যা।
কী? মিসিং মানে?
কেন? ‘কা। কা’ মিসিং ইন-বিটুইন’। তোদের ইংরেজি কায়দাতে বললে।
এখন ইয়ার্কি করার সময় নেই ভটকাই। শোন, একটা ট্যাক্সি নিয়ে আসবি এয়ারপোর্টে। প্লেন ছাড়ার সময়ের অন্তত পঞ্চাশ মিনিট আগে দমদমে পৌঁছবি।
পিস্তল ইত্যাদি কী করে নেবে, ঋজুদা?
সে সর তোদের চিন্তা করতে হবে না। এয়ারপোর্টের ম্যানেজারকে বলা আছে। আমার সাইলেন্সারওয়ালাটা আর রুদ্ররটা নিলেই চলবে। পাইলটের কাছে জমা দিতে হবে। তোদের আর নিতে লাগবে না। রহস্যের জট ছড়াতে বুদ্ধি যতটা লাগে, গুলিগোলা ততটা লাগে না। বলেই বলল, আচ্ছা রুদ্র, তোর কনসাল মেসো মিঃ নাগ কী বললেন, তা তো বললি না।
আমি খুব লজ্জিত হয়ে বললাম, ইস ঋজুদা। তোমাকে বলতেই ভুলে গেছি। বিচ্ছিরি ব্যাপার। দ্বিজেন মেসোমশাই মারা গেছেন।
মারা গেছেন!
বলিস কী রে!
ঋজুদা বলল, দুঃখিত গলাতে।
মার্ডার?
লাফিয়ে উঠল রংরুট গোয়েন্দা, ভটকাই। গুলি করেছিল? নাকি ইবোহাল সিং-এরই মতো গলায় ফাঁস?
হার্ট-অ্যাটাকে মারা গেছেন। ভটকাই-এর গোয়েন্দাগিরির উদ্দীপনাতে জল ঢেলে দিয়ে আমি বললাম।
তম্বি সিং-এর সঙ্গে দেখা হয়নি ওঁর? সেদিন রাতে?
ঋজুদা শুধোল।
তা তো বলতে পারলেন না ওঁর ভাইঝি। দ্বিজেন মেসোমশাইয়ের তো ছেলেমেয়ে ছিল না। শুনলাম ওঁর ভাইঝিই সব দেখাশোনা করেন। উনি ঠিক বলতে পারলেন না।
আই সি। খবরটা জানতে পারিস না। কোনওক্রমেই?
আমি ঋজুদার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, পারি না তা নয়, পারি। তবে বোঝ তো। কাজের বাড়ি।
একটা কাজ করতে পারবি যাবার আগে?
ঋজুদা বলল।
কী কাজ? বলো?
মি. নাগের কীসের ব্যবসা ছিল মণিপুরে আর ওঁর ব্যবসার অ্যাসোসিয়েটস কেউ আছেন কি না ওখানে? এবং থাকলে, তার নাম, ঠিকানা ফোন নাম্বার যদি জোগাড় করে আনতে পারিস তো খুব কাজে লাগবে। পারবি? প্লেনে দিলেও হবে। আমাদের ব্যাড লাক বলতে হবে। কবে ঘটল এই অঘটন?
তম্বি সিং যেদিন এসেছিলেন তোমার কাছে, তার পরের পরের দিন। ভুল আমারই। পরদিনই যাওয়া উচিত ছিল ওঁর কাছে, আমার।
.
প্লেনটা যখন উচ্চতা কমিয়ে দিয়েছে, যদিও ল্যান্ডিং-এর এখনও দেরি আছে একটু, হঠাৎ দুটি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সেটা যখন হঠাৎ মণিপুর উপত্যকার উপর থেকে নীচে উঁকি মারে, তখন একেবারে চমকে উঠতে হয়। মনে হয়, এই বুঝি, ছোটবেলা থেকে কল্পনা করা সাংগ্রিলা! কী সুন্দর পাহাড়-ঘেরা একটি উপত্যকা।
ঋজুদা জানলা দিয়ে নীচে চেয়ে বলল, শরতের শেষে হেমন্তে এলে দেখতে হয় মণিপুরের সৌন্দর্য। মাইলের পর মাইল নিয়ে সোনালি ধানের শিষ দুলছে হৈমন্তী হাওয়ায়। কী যেন সেই গানটা রে, তিতির? সেই লক্ষ্মী বন্দনার গানটা?
কিছু মনে থাকে না আমার, আজকাল।
ও? তিতির বলল। সেটা তো রুদ্র তোমাকে শুনিয়েছিল।
রাইট। গা’ত রুদ্র, গানটা।
এ কী! প্লেনের মধ্যে!
বিব্রত হয়ে আমি বললাম।
না গাইবি তো, কথাগুলো মনে করিয়ে দে অন্তত।
হ্যাঁ। তা পারি।
এসো সোনার বরণ রানী গো, এসো শঙ্খমল করে,
এসো মা লক্ষ্মী, বোস মা লক্ষ্মী, থাকো মা লক্ষ্মী ঘরে।
তারপর আরও অনেক আছে।
হ্যাঁ জানি। অন্যমনস্ক গলাতে ঋজুদা বলল।
আমি বুঝলাম যে, ভাবনাতে পেয়েছে।
প্লেনটা নামছে, নামছে, নামছে, নামছে, ওই নেমে গেল। ছোট এয়ারপোর্ট। তারপর যখন ট্যাক্সিং করে গিয়ে পার্কিংস্নটে দাঁড়াল, তখন তিতিরই প্রথম দেখতে পেয়ে বলল, ওই যে মিস্টার তম্বি সিং।
পাশে কে দাঁড়িয়ে রে? প্যারাগন অফ বিউটিযে! হুবহু লেডি ডায়না।
তিতিরই বলল।
আরে সাব্বাস! জীবন সার্থক। আহা! কি হেরিনু জীবননাথ! এযে মাধুরী দীক্ষিত, পূজা ভাট আর পল্লব যোশীকে এক শিলনোড়াতে মিহি করে বেটে চৈত্রমাসের রোদে বড়ি বানিয়ে শুকোতে দিলে যা হতো, তাই। হে প্রভু, গোবিন্দজী, তোমার এ কী লীলা!
ঋজুদা বলল, কী যাত্রা শুরু করলি ভটকাই, নামতে না নামতেই?
বেঁটে জালি-তম্বির এমন কিউট মেয়ে। ভাবা যায় না। চিন্তা করো একবার। সলিলকি করে চলল ভটকাই।
আঃ। কী হচ্ছে ভটকাই। থার্ড ক্লাস হিন্দি ছবি দেখা বন্ধ কর এবারে একটু। তোর রুচি আর ভোকাবুলিরি দিনে দিনে যা হচ্ছে।
আমি বললাম।
নাও। এবার বক্তৃতা থামিয়ে নামো প্লেন থেকে। নইলে তম্বি সিং আমাদের না দেখে সত্যি সত্যিই হম্বি করবেন। অতগুলো টাকা দিয়ে টিকিট কেনা!
তিতির বলল।
প্লেন থেকে বেরোতেই মেয়েটির দিকে চোখ পড়তেই চোখ জুড়িয়ে গেল। সৌন্দর্যের নিজেরও আলাদা একটা দাম আছে। এমনকী কোনও গুণরহিত সৌন্দর্যেরও। পহিলে দর্শনধারী, পিছলে গুণবিচারী, কথাতেই বলে। সত্যি! এই মেয়েটি কে, এখনও তা জানা নেই, কিন্তু সত্যিই অবিশ্বাস্যরকম সুন্দরী। আর এমন এলিগেন্ট।–এলিগেটের বাংলা প্রতিশব্দ জানি না। ভটকাই জানলেও জানতে পারে। পরনে সবুজ আর নীলে মেশানো একটা স্কার্ট। ভারী সুন্দর দুটি পা।
সমারসেট মম-এর কেকস অ্যান্ড এল উপন্যাসে পড়েছিলাম, য়ু অলওয়েজ ওয়্যার আ পেয়ার অফ বিউটিফুল লেগস। মনে পড়ে গেল।
বাক্যিটা মনে গেঁথে ছিল। আজ এই সকালবেলাতেই মন ভাল করা আলোর মধ্যে, সেই অবচেতনে গেঁথে-থাকা বাক্যিটা, হঠাৎই ফুলের মতো ফুটে উঠল।
একটি ফিকে-হলুদ ব্লাউজের টপ। মাথায় একটি হলুদ-সবুজ-ফুল-ফুল প্রিন্টেড কটনের টুপি। হাওয়ায় কাঁপছে। চোখে সানগ্লাস ক্যাঁটক্যাটে কালো না–ওই যে নতুন বেরিয়েছে যেগুলো কী যেন নাম? আলোর তীব্রতার সঙ্গে সঙ্গে রং বদলায়–সেই কাঁচের। কাঁচ তো নয়, প্লাস্টিকের। তিতির বলতে পারবে। আজকাল আমিও সব ভুলে যাচ্ছি।
ঋজুদা আগে নামল। তার পেছনেই মিস্টার ভটকাই। যেন ওই সেকেন্ড ইন কম্যান্ড–সেলফ-অ্যাপয়েন্টেড। তার পেছনে শাড়ি পরা, ডেইনটি, তিতির সেন। এবং সবচেয়ে পেছনে, বদখত্ রুদ্র রায়। ঋজুদার ওরিজিনাল সাকরেদ, অথচ ভটকাই-এর ভাষাতে: একসময়ের ঝাঁ-চকচক, দিল-ধড়কান, নতুন মডেলের অবসলিট হয়ে যাওয়া নিষ্প্রভ, রংচটা আজকের ছ্যাকরা গাড়ি। ছিঃ।
পরিচয়পর্ব শেষ হবার পরে আমরা টারমিনাস-এর বাইরে এলাম। ইয়েস। ভটকাইয়ের কথাই ঠিক। ইনিই জালি-তম্বির কন্যা, সানাহানবি দেবী।
ছোট্ট বাড়িটা। মানে টারমিনাস বিল্ডিং। ইন্দোর, বাগডোগরা বা শিলচরের চেয়েও ছোট। তম্বি সিং সাহেব একটি টাটা-সিয়েরা গাড়ি নিয়ে এসেছেন আর তার মেয়ে নিজে চালিয়ে এসেছেন একটি নীল-রঙা পুরনো মডেলের অ্যামবাসাডর।
তম্বি সিং বললেন, সার্কিট হাউসেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন উনি। কিন্তু, কন্যা বলেছেন মান্যগণ্য অতিথিদের ওখানে ওঠানো যাবে না। মাতৃতান্ত্রিক মণিপুরে যে মেয়েদের কথাই শেষ কথা।
সানাহানবি বললেন, কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-টন্ত্রী এলে যেমন সার্কিট হাউস রাতারাতি ভোল পাল্টে দিয়ে ঢেলে সাজান হয়, চক্ষুলজ্জাহীন ভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে; তেমন হলেও কথা ছিল। তার চেয়ে, মৈরাঙ্গের পথে ওঁদের, আংকল ইবোহাল সিংএরই একটি নিভৃত বাগানবাড়ি আছে। অনেকবছর আগে ওঁদের পূর্বপুরুষেরা শুটিং লজ হিসাবে ব্যবহার করতেন, যখন এইসব জায়গাতে জঙ্গল ছিল। সেখানেই আপনাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। একটি বাবুর্চি আছে। বদরপুরী মুসলমান। তার হাতের রান্না যা…
উনি বললেন যা, তাতে মনে হল, তার হাতের রান্না একবার খেলেই হয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গে। গুলি বা ডাণ্ডা কিছুই খেতে হবে না।
ওই বাংলার ঘরগুলিও সুন্দরভাবে ফার্নিশড। ওয়েলস্টকড বার…কোনওরকম কষ্টই হবে না আপনাদের।
ঋজুদা বলল, আমি কালেভদ্রে খাই ওসব। অকেশান, টকেশানে! আর এরা তো সব ছেলেমানুষ। ওসব না থাকলেও কোনওই ক্ষতি ছিল না।
