জুজুমারার বাঘ (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

চার

একটা টর্চ-এর কথা বলে রেখেছিলাম। পাঁচ ব্যাটারির টর্চ চেয়েছিলাম কিন্তু তিন ব্যাটারির চেয়ে বড় জোগাড় করতে পারেনি ওরা। তবে টর্চটা ভাল। মানে, দেখতে ভাল। অন্ধকার হলেই বোঝা যাবে সত্যি সত্যিই কতখানি ভাল। দুটি গুলি, দু’ব্যারেলে ভরে এবং দুটি গুলি প্যান্টের পকেটে পুরে নিয়ে যখন বেরিয়ে পড়লাম তখন সোয়া চারটে বাজে। অকুস্থলে পৌঁছতে কম করে মিনিট কুড়ি লাগবে। সূর্য ডুবতে ডুবতে প্রায় ছটা বাজবে কিন্তু গোরুটাকে বাঘ যেখানে লুকিয়ে রেখেছে সেই জায়গাটা একটা দোলামতো। তা ছাড়া পশ্চিমেই জঙ্গলাবৃত রেঙ্গানিকানি পাহাড়শ্রেণীর সমান লম্বা এবং বেশ উঁচু পিঠ থাকাতে সূর্য অস্তে যাবার অনেক আগেই এই রঙ্গমঞ্চ, মানে যেখানে নাটক মঞ্চস্থ হবে, পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে ডুবে যাবে তাই এই পাহাড়তলিতে অন্ধকার নেমে আসবে হয়তো পৌনে ছটা নাগাদ অথবা তারও আগে।

সূর্য অস্ত যাবার পরেও, আকাশে যদি মেঘ না থাকে তবে বনে-জঙ্গলে, প্রান্তরে অনেকক্ষণ অবধি আলোর আভাস থাকে। প্রথমে তার রং থাকে কমলা, তার পর বেগনে, তারও পর তার কোনও রং থাকে না কিন্তু তার আলোর আভাস বিলক্ষণই থাকে। অনেকক্ষণ। সেই আভাসই শটগান দিয়ে নিশানা নেবার পক্ষে অনেকই আলল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দুপুর থেকে পরতের পর পরত কালো মেঘ সাজছে আকাশে। মনে হচ্ছে যেন বর্ষাকাল। সারা পৃথিবীর আবহাওয়ার বদল হওয়া শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন হল। এখন, আমাদেরই নানা পাপের কারণে, বন-বিনাশের কারণে, গ্রীষ্মে বর্ষা, বর্ষায় গ্রীষ্ম, গ্রীষ্মে শীত এবং শীতে গ্রীষ্ম। ঈশ্বরই জানেন, ভবিষ্যতে আরও কী ঘটবে অঘটন।

জায়গাটাতে পৌঁছে সকালে দেখে যাওয়া তেঁতরা গাছটাতে না বসে একটা মিটকুনিয়া গাছে উঠে বসলাম। কারণ, সেই গাছটাতে কাণ্ডর ফিট পনেরো উপরে দুটো বেশ মোটা ডালের সঙ্গমস্থলে বসার সুবিধা হবে। কাণ্ডতে হেলান দিয়েও বসা যাবে। সারারাত বসে থাকতে হবে কি না তাও তো অজানা। তাই বসার জায়গাটা একটু সুবিধাজনক হওয়া দরকার।

বাঘ যেদিক দিয়েই আসুক, মড়ির কাছে এলে তাকে আসার পথে দেখা যাবেই, যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে, মানে মেঘে ঢাকা না থাকে। বাঘের যাওয়া-আসার শব্দ বড় একটা শোনা যায় না। বনের খবর জেনেই তার যাতায়াতের আন্দাজ করতে হয়। তবে জায়গাটা ঘাসবনের মধ্যে বলেই সুবিধা। তবে একবার গাছের ঘন ছায়াতে দোলার মধ্যে ফেলে-রাখা মড়িতে বাঘ পৌঁছে গেলে বাঘকে আর দেখা যাবে না। খাওয়া শুরু করলে অবশ্য তার মড়মড় আর কটাং কটাং করে হাড় কামড়ানোর এবং চপ চপ করে মাংস চিবোনোর আওয়াজ নিস্তব্ধ রাতে ঠিকই শোনা যাবে। দেখা যদি নাও যায়, তাহলে আমাদের রামায়ণ-মহাভারতের মহাপুরুষেরা যেরকম শব্দভেদী বাণ মারতেন, তেমনই শব্দভেদী গুলি করতে হবে। কী করতে হবে না হবে, তা এখন ভেবে লাভ নেই। অবস্থা বুঝেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

তার পরে? থামলে কেন ঋজুকাকা?

তিতির বলল।

দাঁড়া। গলা তো শুকিয়ে গেছে। যা তো ভটকাই গাড়ি থেকে জলের বোতলটা নিয়ে আয় তো। গলাটা ভিজিয়ে পাইপটা আরেকবার ফিল করে নিয়ে শুরু করি।

ভটকাই গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল, আর কতটুকু বাকি আছে গল্প শেষ হতে ঋজুদা? আর কি এক ‘ফিল’-এর?

ঋজুদা এবং আমরাও হেসে উঠলাম ওর কথাতে। পারেও বটে ভটকাই। এক গরাসের খাদ্য’, ‘এক ঘণ্টার পথ’, ‘এক ছিলিমের তামাক, এসব জানা ছিল কিন্তু পাইপের এক ফিল-এর গল্প’র কথাটা ভটকাই-এরই সৃষ্টি।

–ভটকাই দেখছি ফিলোলজিস্ট হয়ে উঠেছে রে!

ঋজুদা বলল।

–ফিলোলজিস্ট হবে কি না জানি না তবে ঋজুদা দিনমানেই এখানে যা মশা, ফাইলেরিয়া ভটকাই-এর হতেই পারে। এগুলো ফালসিফোরাম-বাহী মশা নয় তো! ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে মাথাতে যা যন্ত্রণা হয় তার চেয়ে মরে যাওয়াও ভাল।

ঋজুদা বলল, এখানকার মশার কামড়ে ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয় বলে শুনিনি। তবে সিমলিপাল, নেফার নামধাপা ইত্যাদি বনের মশারা ম্যালিগনান্ট ম্যালেরিয়ার জন্য কুখ্যাত। অঙ্গুল ডিভিশনের লবঙ্গীর জঙ্গল থেকে ফিরেও একবার ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে পড়েছিলাম।

–কতবার হয়েছে যেন তোমার? ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া ঋজুদা?

ভটকাই বলল, ফিরে এসে।

–কেন? তোরা শুনিসনি?

–তিনবার। ভটকাই জানবে কী করে! ও তো দু’দিনের বৈরাগী, ভাতকে বলে অন্ন। কতদিন হল ও চেনে তোমাকে!

তিতির ভটকাইকে এক গোল দিয়ে বলল।

ঋজুদার জল খাওয়া হলে ভটকাইও ঢক ঢক করে এক লিটার জলের বোতল থেকে জল খেয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে দিল। জল খেয়ে, ইতিমধ্যেই নতুন টোব্যাকোতে ফিলকরা পাইপটাতে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বেলে ঋজুদা অনেকখানি ধোঁয়া ছাড়ল।

ভটকাই বলল, চলো, ফিনসে শুরু করো ঋজুদা। এতক্ষণে বাঘ বোধহয় এসে গেল।

ঋজুদা শুরু করল।

–আমাদের দেশের পাহাড়বন সন্ধে নামার আগের অনেকক্ষণ সময় পাখিদের কলকাকলিতে এমন করে ভরে ওঠে যে, ইচ্ছে করে সূর্যকে ডেকে বলি, আপনার অন্য কোথাও কাজ আছে কি? তাহলে সেরে আসুন বরং। তার পরে ফিরে আসুন। যাবার এত তাড়া কীসের?

পাখিদের তখন কত যে হাঁকাহাকি, ডাকাডাকি, কত মিটিংকনফারেন্স তা ভাল করে মনোযোগ দিয়ে শুনলে বুক ভরে যায়। বিজ্ঞানীরা তো বটেই, আজকাল অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষই জোরের সঙ্গে বলেন যে, ভগবান-টগবান নেই। সব বোগাস। ঈশ্বরবাবু একসময়ে থেকে থাকলেও আমরা তাকে একেবারে ঝেটিয়ে বিদেয় করেছি। এখন কম্পিউটার আর ঈশ্বরবাবু সমার্থক। কিন্তু বনে-জঙ্গলে শিশুকাল থেকে ঘুরে ঘুরে আমিও বোধহয় গ্রাম্য, অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে গেছি। নইলে ঈশ্বর যে নেই, একথা জোরের সঙ্গে বলতে পারি না কেন বল? কে এমন রং লাগাল বনে বনে, কে এতরকম পাখি, ফুল, প্রজাপতি, পোকামাকড়, পশুর সৃষ্টি করল; করে, তাদের প্রত্যেকের চেহারা-ছবি আলাদা করে, তাদের গলাতে এত বিভিন্ন রকম স্বর দিল? অতটুকু-টুকু পোকা-মাকড়কেও আমাদের যা কিছু আছে তার সবই দিল, শুধু ধর্মবোধটুকু ছাড়া? কী করে মানি বল যে, এত কোটি কোটি গ্রহনক্ষত্র নিচয় যার মন্ত্রবলে আবর্তিত হচ্ছে, যার যার কক্ষপথে যুগ যুগান্ত ধরে ঘুরে চলেছে সে কেউই নয়? এই পৃথিবীর দাম এই ব্রহ্মাণ্ডর প্রেক্ষিতে কতটুকু? আর এই পৃথিবীর বাসিন্দা আমরা, এই সর্বজ্ঞজনেরা কি এই ব্রহ্মাণ্ডর সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার মাথাতে উড়ন-চাঁটি মেরে বেড়াবার মতো জ্ঞানী হয়ে গেছি বলে মনে করিস তোরাও, এই ইয়ং-বেঙ্গলের প্রতিনিধিরা?

আমরা সকলেই চুপ করে রইলাম। বুঝলাম যে, ঋজুদাকে এখন কথাতে পেয়েছে। সকলকেই পায় কখনও কখনও। এখন বাদী-বিবাদী কোনও পক্ষ সমর্থন করতে যাওয়াটাই মূখামি।

কিছুক্ষণ সকলেই চুপ করে রইলাম।

তিতির বলল, সূর্য কি ডুবল অবশেষে ঋজুকাকা?

বাঘ কি এল?

ভটকাই বলল।

–হ্যাঁ। সূর্য ডুবতে না ডুবতেই বৃষ্টি নামল। সঙ্গে দমক দমক হাওয়া। মে মাসের শেষেও রীতিমতো ঠাণ্ডা লাগতে লাগল। বন্দুকের নলটাকে নীচের দিকে করে যাতে বৃষ্টির জল নলের মধ্যে ঢুকে না যায় তাই, আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলাম। তখনও গাছের ছত্রছায়ায় আছি বলে জল মাথার উপরের দিক থেকে আসছিল না চারপাশ থেকে আসছিল কিন্তু গাছটা পুরো ভিজে গেলেই আসতে শুরু করবে।

-তারপর?

ভটকাই বলল।

মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ-এর আলোতে পাহাড়তলি আলোকিত হয়ে উঠছে। কিন্তু মুহূর্তের জন্যে। কিন্তু তারই কী রূপ। বৃষ্টিস্নাত গাছগাছালি যেন রুপোঝুরি হয়ে যাচ্ছে। গুহাগুলোর বাইরের কালো পাথরের স্তূপ ওই সাদা আলোতে ভারি রহস্যময় দেখাচ্ছে।

বাঘ তো বিড়াল পরিবারের সদস্য। ওরা এমনিতে জল পছন্দ করে না। শীতকালের রাতে যখন গাছের পাতা থেকে শিশির ঝরে টুপটুপিয়ে তখন দেখা যায় বাঘ জঙ্গল এড়িয়ে বনের পথের উপর দিয়ে হাঁটছে অথবা পথে বসে আছে। যতক্ষণ বৃষ্টি চলবে, ততক্ষণ বাঘ গুহাতেই সেঁধিয়ে থাকবে হয়তো। আধঘণ্টাটাক চলল বৃষ্টি। তারপরই আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। শুক্লপক্ষ, কিন্তু সপ্তমী বা অষ্টমী হবে। ছোট হলেও উঠল চাঁদ এবং বৃষ্টিশেষের মিশ্রগন্ধবাহী হাওয়াতে আন্দোলিত ডালে পাতায় বৃষ্টিভেজা বন প্রান্তরে পিছলে-যাওয়া চাঁদের আলো আর অন্ধকারের বাঘবন্দী খেলা শুরু হল।

এমন সময় একটা কোটরা হরিণ খুব ভয় পেয়ে ডাকতে ডাকতে পাহাড়তলিতে উত্তর থেকে দক্ষিণে দৌড়ে গেল পড়ি কি মরি করে। তার ধ্বাক্ ব্বাক্ ব্বা আওয়াজ বনে-পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলল। বৃষ্টির পরে বনের শব্দগ্রহণ ও শব্দপ্রেরণ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায় তাই সেই ডাক দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে গেল। তারপরই দুটো প্যাঁচা কিচি-কিচি-কিচর-কিচর-কিচি আওয়াজ করে পাহাড়তলির আকাশে ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে ঝগড়া করতে লাগল।

তিতির বলল, প্যাঁচা কয় প্যাঁচানি খাসা তোর চেঁচানি।

বাঃ। ম্যামসাহেবও দেহি বাংলা কইতাছে। ফাস্টোকিলাস। তুমারে একদিন শিদল শুঁটকি রান্না কইর‍্যা খাওইবার লাগব।

ভটকাই ফুট কাটল।

ঋজুদা বলল, সত্যিই যদি খাওয়াস তাহলে আমাকেও ডাকতে ভুলিস না ভটকাই।

আমি বললাম, তোরা ইন্টারাপট করার সময় পেলি না? বলল ঋজুদা।

–হ্যাঁ। প্যাঁচাঁদের ঝগড়া শেষ হতেই পাহাড়ের গা থেকে দুরগুম দুরগুম দুরগুম দুরগুম করে ডেকে উঠল সব প্যাঁচাঁদের ঠাকুরদা কালপ্যাঁচা। ওই প্যাঁচা যখন ডাকে তখন বুকের মধ্যে হাতুড়ি পড়তে থাকে। সে দেখতেও যেমন, তার ডাকও তেমন। সে ডাকের অনুরণন মিলিয়ে যেতে না যেতেই একজোড়া রেড-ওয়াটেলড ল্যাপউইঙ্গ টিটির-টি-টিটির-টি অথবা ডিড-উ-ডু-ইট ডিড-উ-ডু-ইট করে ডাকতে ডাকতে চাল-ধোয়া জলের মতো হালকা সাদা চাঁদের আলোর পাতলা আস্তরণ ভেদ করে তাদের লম্বা লম্বা পাগুলি ঝোলাতে ঝোলাতে দোলাতে দোলাতে ওই গুহাগুলোর দিক থেকে এদিকে আসতে লাগল। বুঝলাম, বাঘ এবারে গাত্রোত্থান করেছে। এবং যেমন ভেবেছিলাম, ওই গুহাগুলোরই একটার মধ্যে তার আস্তানা।

-তারপর?

আমরা সমস্বরে এবং রুদ্ধশ্বাসে বললাম।

–তার একটু পরই পাহাড়তলিতে ঘাসবনে আন্দোলন উঠল। বুঝলাম, বাঘ সোজা এদিকেই আসছে। এমন বীরদর্পে এবং throwing all caution to the winds কোনও বাঘকে তার মারা জানোয়ারের মড়িতে আসতে দেখিনি। এই বাঘ, তার মারা মড়িতে কখনও ফিরে আসে না বলে যে জনশ্রুতি আমাকে শোনানো হয়েছিল তা সর্বৈব মিথ্যা যে, সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ রইল না এবং এই জনশ্রুতি কে বা কাদের বানানো সে সম্বন্ধেও একটা অস্পষ্ট ধারণা গড়ে উঠেছিল আমার মনে।

তেঁতরা গাছটার নীচে এমনই অন্ধকার যে বাঘ সেখানে একবার ঢুকে পড়লে বাঘের উপরে চাঁদের আলো আর পড়বে না। বন্দুকে ক্ল্যাম্পও লাগানো নেই। থাকলে তিন ব্যাটারির টর্চটা ফিট করে নেওয়া যেত ব্যারেলের সঙ্গে। এই বোকা বাঘ যেভাবে আসছে সেই ভাবেই যদি এগিয়ে আসে একটুও সাবধানতা অবলম্বন করে, তবে সে গাছতলির অন্ধকারে সেঁধোবার আগেই তাকে গুলি করব বলে ঠিক করলাম। বাঘ যখন প্রায় একশো গজ মতো দূরে তখনও তার শরীর দেখা যাচ্ছিল না। ঘাসের মধ্যে ঘাসের মাথাগুলির নড়াচড়া দেখেই তার উচ্চতা এবং দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে একটা ধারণা করা যাচ্ছিল মাত্র। মস্ত বড় বাঘ এবং হয়তো বুড়োও। নইলে বন্যপ্রাণী শিকার না করে দুধেল গোরুদের তার নিয়মিত খাদ্য তালিকাতে ঢোকাবেই বা সে কেন? অথবা কোনও আনাড়ি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন শিকারির ছোঁড়া গুলিতে সে প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে।

-তারপর?

ভটকাই অধৈর্য হয়ে বলল।

তারপর আমি টর্চটাকে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে খুবই আস্তে আস্তে বন্দুকটাকে কাঁধে তুললাম যাতে সেই নড়াচড়া বাঘের চোখে না পড়ে। আমার ডান বাহুর সংযোগস্থলে বন্দুকের কুঁদোটাকে টাইট করে ধরে বাঁ হাতের পাতা দিয়ে লক-এর নীচে ধরে ডান হাত দিয়ে স্মল-অফ-দ্যবাট চেপে ধরে তর্জনী ট্রিগার গার্ডের উপরে ঠেকিয়ে রাখলাম। ডান হাতের বুড়ো আঙুল রইল সেফটি ক্যাচের উপরে।

একটু চুপ করে থেকে নিভে যাওয়া পাইপেই আরেক টান লাগিয়ে ঋজুদা বলল, বাঘের মাথাটা ঘাসবনকে চিরে আগে আগে আসছে। সব বাঘই তার সামনের দু’ কাঁধের মধ্যে শরীরটাকে ঝুলিয়ে দিয়ে যেমন ছন্দোবদ্ধ হয়ে হাঁটে তেমনি করেই হাঁটছে এও। তার শরীর বা মাথা দেখা যাবে না, ঘাসের আন্দোলন দেখেই আন্দাজ করে মারতে হবে এবং মারতে হবে সামান্য পরেই। বাঘের মনে, মড়ির কাছে যে তার বিপদ থাকতে পারে সে সম্বন্ধে আদৌ কোনও সন্দেহই জাগেনি দেখে অবাক হলাম আমি। সত্যিই কোনও বাঘকে এমন অদ্ভুত ডেয়ার-ডেভিল ব্যবহার করতে দেখিনি আগে। এ যেন আত্মহত্যা করবে বলে মনস্থির করেই এসেছে। কে জানে এর হয়তো খুবই খিদে পেয়েছে, অথবা প্রেমে ব্যর্থ হয়েছে যে, তাও হতে পারে। যাই হোক, বাঘ যখন পনেরো গজ দূরে তখন তার মাথাটা এবং ঘাড়টা কোথায় হতে পারে, প্রায় মাটি থেকে সাড়ে তিন চার ফিট উচ্চতাতে সামান্য lead দিয়ে সেফটি ক্যাচ অন করেই ট্রিগার টানলাম।

-তারপর?

আমরা আবারও সমস্বরে প্রশ্ন করলাম।

–ডান দিকের ব্যারেলে লেথাল বল ছিল। ইংলিশ ইলি-কিক কোম্পানির। বলটা গিয়ে বাঘের শরীরের কোথায় লাগল তা বোঝা গেল না, মানে কানে, না ঘাড়ে, কিন্তু কোনও শব্দ না করে বাঘ ঘাসের মধ্যে ডুবে গেল।

–গুলি যে লাগলই তা জানলে কী করে। বাঘ তোমাকে ভড়কি দেওয়ার জন্যে যে ঘাসের মধ্যে মাটিতে বসে পড়েনি তাই বা কী করে জানলে?

ভটকাই বলল।

আমি বললাম, তুইও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠ, তখন গুলির শব্দ শুনেই বুঝতে পারবি গুলি গন্তব্যে পৌঁছল না ফাঁকাতে হাওয়া-কেটে বেরিয়ে গেল।

ঋজুদা আমাকে শুধরে দিয়ে বলল, গুলি গন্তব্যে না পৌঁছে আশপাশের কোনও solid object-এ, যেমন গাছ বা পাহাড়ে বা বাঁধে লাগলেও যে শব্দ হতে পারে তাতে শিকারির ভুল হতে পারে। কিন্তু সেখানে কোনও solid object ছিলই না। ফাঁকা মাঠ আর ঘাসবন। তাই গুলি যে লেগেছে, তা গুলির শব্দেই বুঝে নিতে কোনও অসুবিধে হয়নি।

-তারপর?

–তারপর প্রায় আধঘণ্টা বসে থাকলাম গাছে।

-কেন? বাঘ যখন মরেইছে জানো তখন নেমে তখুনি গ্রামে চলে গেলে না কেন?

ভটকাই বলল।

বোকাইচন্দর এটা জেনে রাখ, যে, রাতের বেলা তো বটেই দিনের বেলাতেও বাঘকে মাচা থেকে গুলি করে কখনও মাচা থেকে নামতে নেই। এই সাবধানবাণী ব্যারিস্টার এবং বিখ্যাত শিকারি কুমুদ চৌধুরী মশায় বারংবার তাঁর নানা বইয়েতে লিখে গেছিলেন। তাই, ওটি আমাদের প্রজন্মর শিকারিদের দ্বিতীয় প্রকৃতি হয়ে গেছিল।

কুমুদ চৌধুরী কি বেঁচে আছেন?

না না। বাঘের হাতে না মারা গেলেও এতদিনে তিনি এমনিতেই পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হতেন। উনি তো আজকের মানুষ নন। প্রমথ চৌধুরী, আশুতোষ চৌধুরীদের পরিবারের মানুষ, যে পরিবারের মানুষ ছিলেন জেনারেল জে এন চৌধুরী।

উনিও বাঘের হাতে মারা গেলেন? বলছ কি ঋজুকাকা?

তিতির বলল।

–হ্যাঁ। ঋজুদা বলল, একেই বলে ‘As luck would have it’ এবং বাঘকে গুলি করে মাচা থেকে নেমে সেই আহত বাঘের হাতেই মারা গেলেন। ওড়িশার কালাহান্ডির জঙ্গলে শিকারে গেছিলেন।

আমি বললাম, কুমুদ চৌধুরীর গল্প বাদ দিয়ে এবারে তোমার গল্পটি শেষ করবে ঋজুদা?

–আধঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরেও যখন কোনও রকম নড়াচাড়ার লক্ষণ দেখা গেল না তখন পকেট থেকে টর্চটা বের করে আলো ফেলে বাঘের শায়ীন অবস্থান সম্বন্ধে আরও নিশ্চিত হয়ে বাঁ বারেলের এল. জি. টি-ও ফায়ার করলাম। তাতেও কোনও নড়াচড়া হল না।

-তারপর?

বাঘ যে অবশ্যই মরেছে একথা নিশ্চিত জেনেও পকেটে রাখা অন্য দুটি গুলি বন্দুকে ভরে নিয়ে গাছ থেকে নেমে এলাম। তারপর বন্দুক রেডি পজিশানে ধরে বাঘের যেখানে শুয়ে থাকার কথা সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। তারপর ব্যারেল দিয়ে ঘাস সরিয়ে নিশ্চিত হলাম যে বাঘ মরে গেছে। টর্চ জ্বালিয়ে দেখলাম যে, লেথাল বলটা ঢুকে গেছে বাঘের ডান কানের মধ্যে দিয়ে একেবারে মস্তিষ্কে। তাই ২বেচারি বুঝতেও পারেনি যে, সে মরে গেল।

দ্বিতীয় গুলির শব্দ হওয়ার পরই গ্রামের মধ্যে উসখুসানি ফিসফিসানি শুরু হয়েছিল যে, তা দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। আমি গ্রামে ফেরার পায়ে-চলা পথে মাঝামাঝি যেতেই দেখি জনা দশেক লোক দুটি হ্যাঁজাক জ্বালিয়ে হাতে লাঠি-সোটা টর্চ এবং দুটি বন্দুক নিয়ে এদিকে আসছে। তারা আমাকে দেখেই আনন্দে শোরগোল করে উঠল। তারপরে আমাকে হাড়িবন্ধুর জিম্মায় দিয়ে তার বড় সম্বন্ধী রাম এগিয়ে গেল অন্যদের সঙ্গে বাঘকে বয়ে আনতে। আজকে সারারাত উৎসব হবে গ্রামে।

-তারপর?

তারপর আর কী? আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বাঘের চামড়া ছাড়াতে পারে এমন কেউ কি আছে? তাহলে আমাকে আর রক্তাক্ত হতে হয় না।

-সে তো সব শিকারিই পারে কিন্তু আজ ভাগ্যক্রমে এক কসাই আছে। মহম্মদ জব্বার মহম্মদ।

আমি বললাম, সেই কি বাঘে মারা গোরুগুলোর চামড়াও ছাড়ায়?

–হ্যাঁ। ওই তো ছাড়ায়। ওর শালা আফজল মিঞাও আসে রেঢ়াখোল থেকে। একসঙ্গে অনেক চামড়া নিয়ে যায় টেম্পো ভাড়া করে।

–তোমাদের এই অঞ্চলে গত এক বছরে কত গোরু মেরেছে বাঘটা?

–ওঃ মেলাই। তার কি হিসাব আছে কোনও?

–এই বাঘ যে সমলেশ্বরীর বাঘ, ও বাঘ তো নয়, তোমরা তো বলেছিলে চিতা, তা তোমরা জানলে কী করে? প্রথমবার বাঘ গোরু মারার পরে সেই বাঘ মারতে কে বসেছিল মড়ির উপরে?

–মহম্মদ জব্বার মহম্মদের শালা আফজল মিঞা। সে তখন এখানেই ছিল। সেও খুব ভাল শিকারি। নামডাক আছে রেঢ়াখখালে। তার রাইফেলও আছে।

–সেই বলেছিল যে, গোরুখাদকটা চিতা এবং তার শরীরে গুলি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেলেও তার কিছু হয় না। নইলে সে আফজল মিঞার গুলি খেয়েও চলে যেতে পারে?

–একথা সেই প্রথমবার বলেছিল?

–হ্যাঁ। সেই বলেছিল। এবং তার পরের বার যখন গোরু মারা পড়ে তখন মড়ির উপরে বসেছিল মহম্মদ জব্বার মহম্মদ। সেও ভাল শিকারি। যদিও গাদা বন্দুকে মারে। সেও তাই বলেছিল।

কী বলেছিল জব্বার?

বলেছিল যে, ওই বাঘ নিশ্চয়ই সমলেশ্বরী দেবীর বাঘ। একে মারা কোনও মানুষের কর্ম নয়। তবে মহম্মদ জব্বার মহম্মদের মাচার নীচে বাঘ আসেনি।

–আসেইনি? না সে নিজেই হাততালি দিয়ে বাঘকে ভাগিয়ে দিয়েছিল?

–কী বলছেন ঋজুবাবু?

–আচ্ছা! তার পরের বার কে বসেছিল এই বাঘ মারতে?

–আবু আলি। সে তো এই গ্রামেরই বাসিন্দা।

–সে কী করে?

–সে মহম্মদ জব্বার মহম্মদের তামাকের ব্যবসার পার্টনার। চারমল-এ দোকান আছে তার। সেও চিতাকে গুলি করেছিল কিন্তু চিতার কিছুই হয়নি।

-তারপর?

আমরা বললাম।

ঋজুদা বলল, তারপর আর কী। ভারতবর্ষের সুন্দর অনেক দিক যেমন দেখেছিস নানা বনে বনে ঘুরে তেমনই আবার অন্য দিকটাও দ্যাখ। সরল মানুষগুলোকে কীভাবে ঠকিয়ে বাঘকে অক্ষত রেখে জব্বার আর তার শালা মিলে গোরুর চামড়াগুলো হাতিয়েছে। বাঘে মারা গোরুর চামড়ার জন্য কোনও দামও নেয়নি গ্রামবাসীরা। বুঝলি! যেখানে অজ্ঞতা, যেখানে অন্ধবিশ্বাস, তা সে সমলেশ্বরী দেবীর উপরেই হোক কি মহম্মদ জব্বার মহম্মদের উপরেই হোক, সেখানেই পীড়ন, সেখানেই অত্যাচার। বাঘে-খাওয়া গোরুগুলোর মাংসও ওরা হালাল করা-মাংস বলে চালিয়ে দিয়েছে জুজুমারা, চারমল এবং রেঢ়াখোলে অন্য ধর্মভীরু মুসলমানদের কাছে।

ভটকাই বলল, বাঘ আর কতটুকু ডেঞ্জারাস! দেখছি, মানুষ তো তার চেয়েও সরেস।

ঋজুদা বলল, আমার সামনে বাঘের নিন্দা কখনও করবি না। এত বড় মহৎ প্রাণের প্রাণী, এত বড় নির্জনতা-প্রিয় সন্ন্যাসী তুই কেদারবদ্ৰীতেও পাবি না। এই পৃথিবী থেকে বাঘ যদি সত্যিই হারিয়ে যায়, অনেক দেশেই তো গেছে ইতিমধ্যেই, সেদিনকার মতো দুঃখবহ দিনের কথা ভাবতে পর্যন্ত পারি না আমি।

–হারিয়ে যেতে আমরা দিলে তো! অত্ব সোজা নয়।

ভটকাই বলল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *