তিন
ভটকাই বলল, ও বাবা! আবারও দেখি অন্ধকার করে এল। আবার বৃষ্টি নামলেই চিত্তির। ও ঋজুদা, তোমার বাঘকে তাড়াতাড়ি মারো নইলে আমরা সবাই ভিজে বেড়াল হয়ে যাব যে!
ভটকাইয়ের কথাতে আমরা সকলে হেসে উঠলাম। ঋজুদাও।
তারপর ঋজুদা আবার শুরু করল।
রামকে বললাম, ফিরে যেতে গ্রামে, গিয়ে বন্দুক-রাইফেল যা কিছু হোক কী জোগাড় হল না হল দেখতে। আমি গিয়ে বেছে নেব। গুলিও যেন টাটকা থাকে। পিতলের ক্যাপে যদি সাদা স্যাঁতলা পড়ে গিয়ে থাকে তবে সেগুলি আদৌ ফুটবে না কি ফুটবে না তা ভগবানই বলতে পারেন।
একবার পালামৌর রাংকার জঙ্গলে একটা ভাল্লুকের হাতে মরতে মরতে বেঁচে গেছিলাম। তাই গুলি সম্বন্ধে আমার ভীষণই খুঁতখুঁতানি। সব শিকারিরই তা থাকা উচিত। যাঁদের অভিজ্ঞতা আছে তাঁরাই জানেন যে, নিজের আগ্নেয়াস্ত্র এবং গুলি ছাড়া বড় জানোয়ার শিকার করতে যাওয়াটা অত্যন্তই বিপজ্জনক।
রাম বলল, আপনি খালি হাতে থাকবেন?
আমি হেসে বললাম, খালি হাতে তো নেই। হাতে তো পাইপ আছেই।
ও কিছু না বলে চলে গেল।
গোরুর মড়িটা থেকে এগিয়ে গিয়ে একটি টিলা মতো জায়গাতে গিয়ে উঠে চারদিকটা ভাল করে নিরীক্ষণ করলাম আমি। রেঙ্গানিকানি পাহাড়শ্রেণী সুবিস্তৃত এবং বেশ উঁচু। তাতে হাতি সুষ্ঠু সব জানোয়ারই থাকার কথা। যেখানে পাহাড় শুরু হয়েছে তার দূরত্বে এবং উচ্চতাতেই বেশ কয়েকটি গুহা আছে। সেগুন গাছের ছায়াতে সেই সব গুহা গরমের দিনে এবং বর্ষাতেও বেশ আরামপ্রদও। পাহাড়ের পাদদেশ ঘিরে তিরতির করে জল বয়ে যাচ্ছে একটি নালা দিয়ে। এর নামও হয়তো রেঙ্গানি বা কানি হবে। কুচুয়া গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বলে হয়তো নাম কুচুয়াও হতে পারে। অথবা নালাটার নামই কুচুয়া, তাই হয়তো নালার ধারে পত্তনকরা বসতির নামও কুচুয়া হয়েছে।
তারপর একটু থেমে ঋজুদা বলল, আমাদের ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে একই নামের ছোট নদী, নালা ও গ্রাম যে কত আছে, তার ইয়ত্তা নেই। বড় নদীর সৌন্দর্য এবং ভয়াবহতার কথা ছেড়েই দিলাম, ছোট ছোট নদী-নালার যে কত বিচিত্র সৌন্দর্য, তা যার চোখ আছে সেই জানে। হাজারিবাগ জেলার ইটখোরি পিতিজ-এর পাশ দিয়ে যে পিতিজ নদী বয়ে গেছে তার একরকম সৌন্দর্য, ওড়িশার লবঙ্গীর পায়ের কাছ দিয়ে মাঠিয়াকুদু নালা বয়ে গেছে বা মধ্যপ্রদেশের সিধি জেলার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আশ্চর্য সুন্দর পুতানি বয়ে গেছে তার সৌন্দর্য বা হাজারিবাগ ন্যাশনাল পার্ক-এর মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া হারহাত নদীর সৌন্দর্যের কথা যাঁরা বার বার সেই সব নালার কাছে গেছেন শুধু তাঁরাই জানেন। সত্যি সত্যিই, এমন দেশটি কোথাও গেলে পাবে নাকো তুমি।
ভটকাই বলল, ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।
আমি আর তিতির সমস্বরে বললাম, এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতেই মরি।
ঋজুদা বলল, সত্যিই রে! আমাদের দেশের মতো এমন বৈচিত্র্যে ভরা, এমন ভয়ংকর, এমন সুন্দর আর একটিও দেশ নেই পৃথিবীতে। অনেক দেশেই তো পা পড়ল আমার। তোদেরও কম দেশে পা পড়ল না আমার সঙ্গে, বল?
তা সত্যি। তোমার দৌলতে আফ্রিকা, স্যেশেলস কত দেশই তো ঘুরে এলাম। এবং একাধিকবার।
তিতির বলল।
ভটকাই স্যেশেলস-এর কথা উঠতেই হঠাৎই উদাস হয়ে গিয়ে বলল, ভারত মহাসাগরের স্যেশেলস আইল্যান্ড-এর কেসটার মধুরেণ সমাপয়েৎ হল না, এই একটু দুঃখ রয়ে গেল। সেই মেমসাহেবকে, কোটি-কোটিপতি অপরূপ সুন্দরীকেও তুমি টাকা-কেন্নোর মতো দু আঙুলে টোকা মেরে হঠিয়ে দিলে ঋজুদা! আমার আর রুদ্রর এ জীবনে কখনও নিতবর হওয়া আর হবে না। হ্যাঁ ভাবি হো তো অ্যায়সা।
তারপর আমাকে বলল, যতই বলিস রুদ্র, তোর বই ‘ঋজুদার সঙ্গে স্যেশেলসে’র শেষটা তোর অন্যরকম করা উচিত ছিল।
আমি আর তিতির ভটকাই-এর আস্পর্ধাতে স্তম্ভিত হয়ে রইলাম। ভাবলাম, ঋজুদা বুঝি হঠাৎ চটে উঠবে। কিন্তু না। ঋজুদা বলল, জ্যাঠামি করবি? না বাঘ শিকারের গল্পটা শুনবি? মাঝে মধ্যে ফাজলামি খারাপ লাগে না। তবে তুই মাঝে মাঝে মাত্রা ছাড়িয়ে যাস।
ইনকরিজিবল ভটকাই মাটির দিকে চোখ নামিয়ে ওর কাবলি স্যান্ডেলের মধ্যে পায়ের নখগুলো আগুপিছু করতে করতে বলল, আমি ফাজলামি করিনি। তোমার সঙ্গে তো আমার ফাজলামির সম্পর্ক নয়। আমি সিরিয়াসলি বলছি। ঋজুদা, তুমি বড়ই দাগা দিলে আমাদের।
এমন করেই বদমাইস ভটকাই কথাটা বলল যে, আমরা তো বটেই ঋজুদাও হো হো করে হেসে উঠল। বলল, তুই সার্কাসের ক্লাউন হয়ে যা, মানাবে ভাল।
–ঠিক আছে। আর কিছু বলছি না আমি। এখন ব্যাক টু কুচুয়া গ্রাম অ্যান্ড রেঙ্গানিকানি পাহাড় অ্যান্ড চিতা আর বাঘের গল্পে।
ভটকাই বলল।
তিতির বলল, শুরু করো ঋজুকাকা। এইখানে জঙ্গলের মধ্যের পথপাশের এই আম গাছতলির পাথরে বসে তোমার মুখ থেকে গল্পটা শুনতে যেরকম ভাল লাগছে তেমন কি আর চলন্ত গাড়িতে যেতে যেতে শুনতে ভাল লাগবে। ড্রাইভার ত্রুষ্ণ দাস তো চলে আসবে সূর্য ডোবার আগেই।
–কোথায় যেন ছিলাম?
ঋজুদা বলল। এই ভটকাই বাঁদরটা দিল সব গোলমাল করে।
ভটকাই-ই বলল, রেঙ্গানিকানি পাহাড়ের পাদদেশে একটা টিলার উপরে। পাহাড়ের গায়ে যে অনেকগুলি গুহা আছে, তাই দেখছিলে।
–হুঁ। ঠিকই বলেছিস।
প্রকাণ্ড ঘাসবনের মাঝে কয়েকটা তেঁতরা, রসসি ও মিটকুনিয়া গাছ। কখনও বোধহয় ক্লিয়ার-ফেলিং হয়েছিল। বনবিভাগ আর প্ল্যানটেশন করেনি। ঘাসবন হয়ে গেছে। মড়িটার চারদিকে ঘুরে দেখলাম। একটা পাকদণ্ডি জানোয়ার-চলা game track চলে গেছে ঘাস মাড়িয়ে, নদী পেরিয়ে সেই পাহাড়ের দিকে। সকালে বৃষ্টিটা না হলে ওই নালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেই সবকিছু জানা যেত, কে যায়? কে আসে? কোনদিকে যায়। কিন্তু সব দাগ ধুয়ে গেছে।
ঠিক করলাম, ভরসা করতে পারি এমন বন্দুক বা রাইফেল একটা জোগাড় হলে বিকেলে এসে গোরুর মড়ির কাছের ঝাঁকড়া তেঁতরা গাছটাতে উঠে বসে থাকব। গাছটাতে ওঠবার পরেই বোঝা যাবে, তাতে বসে মড়ি দেখা যাবে কি না এবং দেখা গেলেও বাঘ মড়িতে এলে তাকে মারা যাবে কি না। গাছে না উঠে তা বলা যাবে না।
এখন যদিও শুক্লপক্ষ। হয়তো সপ্তমী অষ্টমী হবে। বাতের রুগি, নিষ্ঠাবতী হিন্দু বিধবা এবং মুসলমানেরা ছাড়া চাঁদের খবর আর কে রাখে! আর রাখে মধুচন্দ্রিমা যাপন করা নববিবাহিতারা। চাঁদের হিসাব আমার কাছে ছিল না। কিন্তু আকাশে মেঘ ছিল এবং এমন গুমোট করেছিল যে, মনে হচ্ছিল বিকালের দিকে আবারও বৃষ্টি নামতে পারে। বাঘের আস্তানা যদি ওই গুহার মধ্যেই হয় তবে বাঘ কোথা থেকে নেমে কোথা দিয়ে গোরুর মড়িতে আসতে পারে তার একটা আন্দাজ করে নিলাম। তারপর গ্রামের দিকে হেঁটে চললাম।
গ্রামের কাছে যখন পৌঁছে গেছি, সবুজ লুঙ্গি-পরা একজন মাঝবয়সি নোক, দেখলাম আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। তার ডান হাতে একটা পিতলের বদনা।
–বদনাটা কী জিনিস?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
মুসলমানদের ঘটি। সামনেটা সরু থাকে। দেখিসনি কখনও? দেখেছিস নিশ্চয়ই, লক্ষ করিসনি। দেখা আর লক্ষ করার মধ্যে তফাত আছে।
তারপর বলল ঋজুদা, লোকটা সম্ভবত প্রাকৃতিক প্রয়োজনে নালার দিকে চলেছে। সে আমার দিকে বিরক্তির সঙ্গে একটুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, আপনাকেই চিতাটা মারার জন্য হাড়িবন্ধু ধরে নিয়ে এসেছে বুঝি বাবু?
হ্যাঁ। কিন্তু ওটা চিতা নয় বড় বাঘ।
–ওর রূপের কথা আল্লাই জানেন। কখন যে সে কোন ভেক ধরে। এখানের মানুষেরা বলে এটা সমলেশ্বরীর বাঘ।
–কেন বলে? জঙ্গলে তো ঠাকুরানিও আছেন। জঙ্গলের বাঘ যদি দেবীর কৃপাধন্য হয় তবে তাকে ঠাকুরানির বাঘ না বলে অতদূরের সম্বলপুর শহরের
অধিষ্ঠাত্রী দেবী সমলেশ্বরীর নামে কেন ডাকে মানুষে?
–আমি তো মুসলমান বাবু। এসব কথা গ্রামের কোনও হিন্দুকে জিজ্ঞেস করলে সেই বলতে পারবে। তবে এটুকু বলতে পারি যে, এই বাঘ আপনি মারতে পারবেন না। উলটে আপনারই বিপদ ঘটতে পারে।
ঋজুদা বলল, লোকটাকে আমার পছন্দ হল না। তারপর আমার বিপদের জন্য তার এত মাথাব্যথা আমার আরও পছন্দ হল না। কিন্তু মনের ভাব মনে রেখে বললাম, কেন?
–এই বাঘের গায়ে গুলি লাগলেও এ মরে না। বহু শিকারি গুলি করেছে। তাতে রক্ত পর্যন্ত বেরোয়নি।
–তাই? এতজনই যদি বাঘটাকে চাঁদমারি করল তা আমিও না হয় একটা গুলি ঠুকে দেখি।
–সে আপনার ইচ্ছে। জানটা তো আপনার নিজেরই।
–তা তো অবশ্যই।
ভালর জন্যই বললাম বাবু। কথাটা ভেবে দেখবেন।
সে কথার জবাব না দিয়ে আমি তাকে শুধোলাম, এই অঞ্চলে এই চিতা বা বাঘ বা ভূত এ পর্যন্ত কতগুলো গোরু-মোষ মেরেছে?
এদিকের গ্রামের মানুষ মোষ পোষে না। পোষে গোরু এবং বলদ। তা বহুতই মেরেছে। কোনও গোন-গুনতি নেই।
বাবাঃ। অতগুলো! তবে তো খুবই ক্ষতি হয়ে গেছে এদিকের লোকের। আমি বললাম।
–তা তো নিশ্চয়ই। কিন্তু কী আর করা যাবে।
এই বলেই লোকটা হাতের বদনাটা দোলাতে দোলাতে চলে গেল নালাটার দিকে।
–আপনার নাম কী?
–মহম্মদ জব্বার মহম্মদ।
–ও।
–এই নালাটার কী নাম?
-রেঙ্গানিকানি।
–ও।
এমন সময়ে ভটকাই বলল, একটা গোরু বা বলদ মরলে কত ক্ষতি হয়? মানে, কত টাকার?
টাকার হিসেবে ক্ষতি হয় অনেকই। এখানকার গ্রামের মানুষের কাছে একটি বলদের সঙ্গে হরিয়ানা বা পাঞ্জাবের গ্রামের একটি ট্রাক্টরের তুলনা করা চলে। তা ছাড়া, গোরু যদি বাঘে মারে, তবে আর্থিক ক্ষতিরও উপরে ইমোশনাল অর্থাৎ মানসিক ক্ষতিও তত কম হয় না। যেদিন গোরুটিকে প্রথম কিনে আনে গ্রামের কোনও মানুষ সেদিন তার পা ধুইয়ে তাকে চান করিয়ে সিঁদুর পরিয়ে ঘরে তোলা হয়। সে যদি বাড়ির গাইয়ের বাছুর হয়, তবে তার সঙ্গে বাড়ির শিশুদের খেলার সাথীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গোরু হল গ্রামীণ মানুষের লক্ষ্মী। তার এই রকম রক্তাক্ত বিয়োগান্ত পরিণতিতে কারওরই তো সুখী হবার কথা নয়। এই গ্রামীণ ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে, আর ভারতবর্ষের অধিকাংশই তো এখনও গ্রামই, গোরু নিছক একটি প্রাণীমাত্রই নয়, সে পরিবারের সদস্যও। তাদের নাম থাকে, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা। বাড়ির বড় এবং ছোটরা সেই নামে তাকে ডাকে। আদর করে। তার এই রকম মৃত্যু মোটেই সুখপ্রদ ব্যাপার নয়।
ঋজুদা বলল।
আগে বাড়ো ঋজুদা। আবার ডিরেইলড হচ্ছ তুমি।
ভটকাই ঋজুদাকে ওয়ার্নিং দিল।
-তারপর?
তিতির বলল।
তারপর হাড়িবন্ধুদের বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখি তিনটি দোনলা বন্দুক জোগাড় হয়েছে। আরও একটি গাদা বন্দুক। একনলা। দোনলা বন্দুকের মধ্যে একটি ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স কোম্পানির, আঠাশ ইঞ্চি ব্যারেলের। বন্দুকটি এক জোতদারের। ডাকাতদের ভয় পাওয়াবার জন্য কেনা, তা দিয়ে একটি গুলিও সম্ভবত ছোঁড়া হয়নি। বন্দুকটির ব্রিচ ভেঙে আলোর দিকে ব্যারেল তুলে দেখলাম ব্যারেল একেবারে ঝকঝক করছে। খুবই যত্ন করে রাখা হয়েছে বন্দুকটিকে। এতই যত্ন করে যে মালিকের বোধহয় এটি ব্যবহার করে পুরনো করার কোনও অভিপ্রায়ই নেই। নিজের বাড়িতে ডাকাত পড়ুক তা কে আর চায়। শুনলাম, সেই জোতদারেরই সাত-সাতটি গোরু মেরেছে বাঘে।
গুলিগুলোও নতুন। দুটি প্লাস্টিক সেল-এর আমেরিকান কার্টিজও ছিল। লেথাল বল, ইংলিশ ইলি-কোম্পানির এবং ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স কোম্পানির এল. জি.।
অন্য দুটি বন্দুক মুঙ্গেরি, হ্যামার ট্রিগারওয়ালা। হ্যামার তুলে তারপর ট্রিগার টানতে হয়।
রামকে বললাম যে, জোতদারের বন্দুকটিই নেব। গুলির হয়তো প্রয়োজন হবে একটি কী দুটির কিন্তু নিলাম ছটি গুলি। তিনটি বল, তিনটি এল. জি.
রাম বলল, বহুত বড্ড বড্ড ডাবল বারা অচ্ছি এটি। গুট্টে বড় বারা মারি দেলে আম্মেমানে শিকার খাইথান্তি।
-মানে কি হল?
তিতির বলল।
বলে দে রুদ্র মেমসাহেবকে। এদিকে ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশে বিশারদ অথচ ওড়িয়া অহমিয়া কিছুই জানে না। লজ্জার কথা।
আমি বললাম, এখানে খুব বড় বড়, মানে পেল্লায় বড় সব শুয়োর আছে। একটা বড় শুয়োর মেরে দিলে আমরা মাংস খেতে পারতাম।
তিতির বলল, শুয়োর। ম্যাগো!
আমি বললাম, হ্যাম, বেকন, সসেজ যখন খাও তখন বুঝি শুয়োর খাওয়া হয় না? দিশি শুয়োরের নামেই উঃ ম্যাগো।
ভটকাই বলল, শুয়োর যে ময়লা খায়!
–মোটেই না। বুনো শুয়োর ফল-মূল খায়। রামচন্দ্রও বন্য বরাহ খেতেন। তাও জানো না।
ঋজুদা বলল, বুনো শুয়োরের ভিন্দালু যা হয় না! আহা!
আমি বললাম, আবার সব গুলিয়ে দিচ্ছ তুমি ঋজুদা। আজ বড়ই গুবলেট করছ তুমি।
–হ্যাঁ। ফিরে যাই।
তারপর বলল, আমি রামকে জিজ্ঞেস করলাম, মহম্মদ জব্বার মহম্মদ লোকটা কে?
জব্বার? সে তো চামড়ার ব্যবসায়ী।
–এ গ্রামেই সে থাকে?
না তো৷ এখানে আসে যায়। আবু আলিরা একঘর মুসলমান থাকে কুচুয়াতে। সে কসাই। জুজুমারা এবং চারমলেও হাটের দিন খাসে কাটে আর বিক্রি করে। আবু আলিরই কী রকম রিস্তেদার হয় মহম্মদ জব্বার মহম্মদ। বাঘে বা চিতাতে গোরু মারলে সেই গোরুর চামড়া আবু ছাড়িয়ে রাখে, মহম্মদ জব্বার মহম্মদ এসে নিয়ে যায়।
–জব্বার কি ইদানীং একটু ঘন ঘন আসছে তোমাদের গ্রামে?
–হ্যাঁ তা তো আসবেই। গোরু তো মারা পড়ছে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই। সেই চামড়ার সদগতি তো ওরাই করে। আমরা পোষা গোরুর চামড়া বিক্রি করি না কোনও দামও নিই না–অনেক সময় ওরা মরা গোরুর মাংসও কেটে নিয়ে বিক্রি করে আশপাশের মুসলমান গ্রামে।
–সে কী! হালাল না করা মাংস মুসলমানেরা খায় নাকি? তাদের ধর্মে তো মানা আছে।
–যেখানে বিক্রি করে সেখানে গিয়ে থোই বলে যে চিতাতে মারা গোরুর মাংস। বলে, হালাল-করা মাংসই।
ভটকাই বলল, বুঝবে মহম্মদ জব্বার মহম্মদ। এই পাপের জন্য গুনাহ লাগবে তার। দোজখ-এ যেতে হবে।
এই অবধি বলে ঋজুদা বলল, এবারে বসি একটু। পাইপ খাই একটু। কোথায় যে গেল মিস্টার ত্রুষ্ণ দাস।
–সে ঠিকই এসে যাবে। হাড়িবন্ধুর কাছে তো শুনলে। সে আসার আগে তুমি গল্পটা শেষ করো।
–হ্যাঁ। তবে মনে করিস তো রেঢ়াখখালে পৌঁছে বিমলবাবুকে একটা ফোন করে দিতে হবে। নইলে চিন্তা করবেন। বউদির হাতের রান্না তো খাসনি। খেলে বুঝবি।
একটা বড় কালো পাথরের উপরে বসে দু’ দিকে দু পা ছড়িয়ে দিয়ে ঋজুদা বলল, দুপুরে আমাকে খুব খাওয়াল রাম এবং হাড়িবন্ধুরা মিলে। খুব তৃপ্তি করে খেয়ে আমি বললাম এবারে ঘুম লাগাব একটা। চারটের সময়ে আমাকে তুলে দেবে।
-চা খাবেন তো?
–যদি খাওয়াও তো খাব।
