হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

খুড়ো-ভাইপোর কীর্তি

 

শ্ৰীমান তুয়ার সাহায্যে আমরা প্রাণে বেঁচে ফিরেছি। একটা গোপন পথ আছে কোকো পাম হোটেলের পেছনেই। খাড়ির ধার দিয়ে লম্বা চাতাল চলে গেছে মানিনিহোলা শুকনো গুহার দিকে। টিহো ও পথেই বরাবর গোপনে গুহাগুলোতে গিয়ে সোনা ছুঁড়ত। বছর তিনেক আগে তুয়াকে সে না খেয়ে কাহিল অবস্থায় কুড়িয়ে পেয়েছিল একটা গুহার ভেতর। আমরা ফিরেছি সেই গোপনপথে।

 

হ্যাঁ, কথাটা টিহোর মুখেই জানতে পারলাম। সেকথা বলছি একটু পরে। ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় সে হায়েনার সেন্টপল হাসপাতালে রয়েছে এখন। বাঁচবে কি না বলা কঠিন।

 

সে রাতে আমরা কোকোপাম হোটেলে পৌঁছে কী তুমুল অভ্যর্থনা পেয়েছি বলার নয়। সারা হায়েনা টাউন আমার ও জ্যোৎস্নার নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়েছিল ববের দৌলতে। কতবার

 

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন মিলে ওয়েইকাপালির গুহার ভেতর তন্ন তন্ন খুঁজেছে। তারপর পেয়েছে। ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় টিহোকে। তার সঙ্গীদের তখন ক্ষুধার্ত হায়েনার পাল খেয়ে হজম করে ফেলেছে। টিহো কনটিকির মূর্তির ওপর চড়ে বসেছিল। হায়েনার কামড় খেয়ে তখন তার সারা শরীর রক্তাক্ত।

 

জনখুড়োর সঙ্গে জুটেছেন আরেক খুড়ো–আংকল ড্রাম ওরফে ঢাকুচাচা। দুজনে মোটর ষাটে সহস্র লোকজন নিয়ে ওয়ালিপিলি লেক থেকে সমুদ্র, সমুদ্র থেকে ওয়েইকাপালির খাড় র্যন্ত ঘোরাঘুরি করেছেন। তারপর হতাশ হয়ে সন্ধ্যায় ফিরে কোকো পাম হোটেলের লাউজে বসে আছেন। এমন সময় আমরা এসে পৌঁছেছি। তাদের চেঁচামেচিতে লোক জড়ো হয়েছে। দেখতে দেখতে কোকোপাম হোটেলের সামনে সে এক জনসমুদ্র। মারকিন দেশ বড় হুজুগে। কত সাংবাদিক, টিভি-র ক্যামেরা কত প্রশ্ন–হুঁলস্থুল পড়ে গিয়েছিল। পরদিন হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের সব কাগজে তো বটেই, আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে সব বড় বড় কাগজে আমাদের ছবিসহ রোমহর্ষক খবর বেরুল টি.ভি-তে সবাই আমাদের দেখল।

 

মারিয়া ঠাকমাকে পরদিন লসএঞ্জেলস, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশকের লোকেরা টেলিফোনে সাধাসাধি শুরু করল–তার ছত্রিশ বছরের গুহাজীবন আর ফাদার গ্রিনকটের কাহিনি নিয়ে তারা বই করতে চায়। লক্ষ লক্ষ ডলারের প্রস্তাব আসছিল। শেষে ঠাকমা হ্যাঁত্তেরি বলে সবাইকে না করে দিলেন। বই লিখতে হলে নিজেই সময়মতো লিখবেন। এখন তাঁর মাথায় ঘরে ফেরার চিন্তা।

 

গরাতে কলকাতায় আমার গুরুদেব কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে ট্রাংকল করার চেষ্টা করেছিলাম। লাইন পাইনি। সকালে চেষ্টা করতেই লাইন পেয়ে গেলাম।

 

গম্ভীর গলায় সাড়া এল। জয়ন্ত নাকি? রাতদুপুরে ঘুম ভাঙালে কেন? আবার মিনিহুন নাকি?

 

রাতদুপুর কী বলছেন? এখন তো সকাল।

 

ডার্লিং! তোমার সময়জ্ঞানের গণ্ডগোল আছে বরাবর। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে যে সূর্যকে দেখতে পাচ্ছ, কলকাতায় আসতে তার এখনও প্রায় ঘণ্টা ন’য়েক দেরি আছে।

 

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাও তো বটে। যাক্ গে, শুনুন। ভারি রোমহর্ষক ব্যাপার। আমি … তার চেয়ে রোমহর্ষক ব্যাপার ঘটেছে আমার ঘরে। অ্যারিজোনার সেই ক্যাকটাসটার ফুলের ভেতর একটা নীল পরাগ থেকে অপূর্ব গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং ইতিমধ্যে পাড়া জুড়ে প্রশ্ন উঠেছে, এ কীসের গন্ধ?

 

রাগ করে বললাম, আমি মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছি জানেন? গুহার ভেতরে এক শয়তান–তার নাম ফাদার গ্রিনকট, আমার হৃৎপিণ্ডটা উপড়ে নিয়েছিল প্রায়। তারপর …

 

কী নাম বললে?

 

ফাদার গ্রিনকট।

 

তাই বলো! জীববিজ্ঞানী ফাদার গ্রিনকট!

 

অবাক হয়ে বললাম, আপনি চেনেন নাকি?

 

নাম শুনেছিলাম একসময়। বাঁদরকে মানুষ আর মানুষকে বাঁদরে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই মার্কিন জীববিজ্ঞানীকে জার্মানরা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।

 

তা হলে শুনুন, এখন তিন হায়েনার ভূতুড়ে গুহাগুলোর ভেতর একটা পাতালপুরীতে বহাল তবিয়তে বাস করছেন। মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে তার হৃপিণ্ড উপড়ে চালান দিচ্ছেন প্রাইভেট ক্লিনিকে।

 

হুম। তা হলে ওটাই আদিম পলিনেশীয় রাজা হোলাহুয়ার গোপন প্রাসাদ? এবার তা হলে বাকিটা শুনুন।

 

সব শোনা যাবে না ডার্লিং! লাইন কেটে যাবে। তুমি বেঁচে-বর্তে ফিরেছ শুনে খুশি হলাম। আচ্ছা, ছাড়ছি। ঘুম পাচ্ছে।

 

কর্নেল ফোন রেখে দিলেন। রাগ হল। কিন্তু কী করা যাবে? হাজার হাজার মাইল দূরের লোককে রাগ দেখানোর উপায় আপাতত নেই। আসলে, গোয়েন্দাপ্রবরকে ক্যাকটাস পাঠানোই ভুল হয়েছে। ওই নিয়ে বুঁদ হয়ে আছেন আজকাল। পৃথিবীর সব মানুষ খুন হয়ে গেলেও তাকিয়ে দেখবেন না। বড় বিদঘুঁটে স্বভাব বুড়োর।

 

বব এসে বলল,–খুড়োকে নিয়ে মহা ঝামেলায় পড়া গেল দেখছি।

 

কী ঝামেলা?

 

হায়েনার পুলিশকর্তা গ্যান্সলারকে তাড়িয়েছেন। ফের হানা দিতে গেলেন পাতালপুরীতে। সঙ্গে রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশ আর কয়েকটা ডিনামাইট। মনে হচ্ছে গোটা এলাকাটা উড়িয়ে দেবে ওরা। ফাদার গ্রিনকটকে আর বাঁচানো যাবে না।

 

বাঁচিয়ে লাভ কী ব্যাটাছেলেকে? আমার হৃৎপিণ্ড ওপড়ানোর হুকুম দিয়েছিল মারিয়া ঠাকমাকে। ..

 

বব ফিক করে হেসে বলল,–ভালোই তো। কোনো কোটিপতির বুকে স্থান পেত তোমার হৃৎপিণ্ড। হয়তো তার বুকটা তোমর চেয়ে অনেক চওড়া। তা ছাড়া …

 

বাধা দিয়ে বললাম,–নিজের হৃৎপিণ্ডটা দান করে এসো না।

 

দৈবাৎ মারা পড়লে তাতে আপত্তি করব না। বব আমার হাত ধরে টেনে বলল। যাক গে, চলো-ঠাকমাকে নিয়ে টিহোর কাছে যেতে হবে। জোসনাকে ফোনে বলেছি, সেন্ট পল হাসপাতালে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে।

 

হোটেলের ম্যানেজার খাতির করছেন খুব। নিজের গাড়ি করে হাসপাতালে পৌঁছে দিলেন। আমাদের। তুয়া মারিয়া ঠাকমার কোলে চড়েছে তো আর তার নামবার নাম করে না। হাসপাতালে তাকে দেখতে ভিড় জমে গেল। কোনোরকমে ভিড় ঠেলে আমরা টিহোর কেবিনে ঢুকলাম।

 

সারা গায়ে ও মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে টিহো শুয়েছিল। তুয়া তার দিকে পিটিপিটি চোখে তাকিয়ে বলল,–হুঁ হুঁ হুঁ উঁয়া উঁয়া।

 

টিহো অতিকষ্টে একটু হাসল। তারপর মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মারিয়া বললেন, –কী টিহো! চিনতে পারছ না আমাকে? পাপের শাস্তি পেয়েছ, এতেই আমার আনন্দ হচ্ছে। ওঃ তোমরা এত বিশ্বাসঘাতক! আমাকে ছত্রিশ বছর গুহার ভেতর ফেলে রেখেছিলে! এবার মনে পড়েছে, আমি কে?

 

মারিয়ার চোখে জল। টিহো আস্তে বলল,–চিনেছি। তুমি মারিয়া। আমাকে ক্ষমা করো মারিয়া।

 

ক্ষমা? মারিয়া ক্ষুব্ধভাবে বললেন। অসবোর্ন আর ওলসন তাদের পাপের শাস্তি পেয়েছে। তুমিও পেয়েছ। তবু তোমাদের ক্ষমা করব না। আমার জীবনটা তোমরা নষ্ট করে দিয়েছ!

 

টিহো বলল,–কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তবু বলছি সব। শোনো মারিয়া, আমাদের কোনো দোষ ছিল না। কী হয়েছিল, সব বলছি শোনো।

 

টিহো যে কাহিনি বলল,–তা এই :

 

মারিয়াকে উদ্ধারের ইচ্ছা তাদের ছিল। প্লেন থেকে হুক আর দড়ি আনতে গিয়েছিল তারা। কিন্তু তখন যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা চলছে। ওখানে প্লেন দেখতে পেয়ে একদল সৈন্যের টনক নড়ে। প্লেনটা ঘিরে তারা পরীক্ষা করতে থাকে। এমন সময় এরা তিনজনে সেখানে যেতেই তাদের খপ্পরে পড়ে। কোনো কৈফিয়ত তারা বিশ্বাস করে না। টিহোদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তারপর পার্লহারবার থেকে খোঁজ নিলে তাদের কীর্তি ফাঁস হয়ে যায়। সোনা নিয়ে যাবার কথা কোথায় আর কোথায় তারা প্লেন নামিয়ে বসে আছে এবং সোনার চিহ্নমাত্র নেই। কোর্ট মার্শালে তিনজনের একবছর করে জেল হয়। পাছে সোনার হদিস কর্তৃপক্ষ পেয়ে যান, তাই মারিয়ার কথা ওরা বলেনি।

 

এক বছর পরে টিহো জেল থেকে বেরিয়ে অসবোর্ন ও ওলসনের খোঁজ করে। টিহো ছিল এই হায়েনার জেলে। ওরা দুজন ছিল লস এঞ্জেলসের জেলে। সেখানে গিয়ে টিহো জানতে পারে, অসবোর্ন জেল থেকে পালানোর সময় রক্ষীর গুলিতে মারা পড়েছে। আর ওলসন মারা পড়েছে ক্যান্সারে। জেলকর্তৃপক্ষকে ওলসন মরার আগে বলে গেছে, তার বন্ধু কাউয়াই দ্বীপের রাজবংশধর টিহোকে যেন এই সিগারেটকেসটা পৌঁছে দেওয়া হয়। সিগারেট কেসে লুকানো সোনার সঠিক জায়গা নির্দেশ করা ছিল।

 

টিহো একা গুহার ভেতর ঢুকতে সাহস পায়নি। পলিনেশীয়দের কুসংস্কার তার মধ্যে ছিল। তাই সে একজন সঙ্গী খুঁজছিল। যুদ্ধের সময় আরেক পাইলটের সঙ্গে তার বন্ধুতা ছিল। তার নাম ফস্টার। তাকে সে বিশ্বাস করে সোনার কথা বলে। দুজনে গুহায় ঢুকে সোনার প্যাকেটগুলো আনার পরিকল্পনা করে। কিন্তু লোভী ফস্টার রাতারাতি সিগারেটকেসটা চুরি করে কেটে পড়ে। ওতে পলিনেশীয়ার আদিম ভাষায় সঠিক জায়গার হদিস লেখা আছে। ওই হদিস না পেলে টিহোরপক্ষেও সোনা খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। টিহোর বোকামি হয়েছিল, যদি একটা কপি রাখত লেখাগুলোর তাহলে সোনাটা খুঁজে বের করতে পারত–আরও কাউকে সঙ্গে নিত বরং। একা সে কিছুতেই তার পূর্বপুরুষের পাতালপুরীতে ঢুকে অভিশাপের পাল্লায় পড়তে রাজি নয়।

 

টিহহ বুঝতে পারে না, ফস্টারের কাছে যে সিগারেটকেস ছিল–তা কেমন করে সুদূর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মাঠে মাটির তলায় গেল। সে আমার দিকে তাকিয়ে সেই প্রশ্নটা করল।

 

আমি বললাম, আমার ধারণা–ফস্টার ভেবেছিল, সুযোগমতো একা গিয়ে সোনা উদ্ধার করবে। সেই সময় তাকে ভারতে পাঠানো হয়। তার প্লেন দৈবাৎ ভেঙে পড়েছিল আমাদের গ্রামের সেই সামরিক বিমান ঘাঁটিতে।

 

টিহো বলল,–এতকাল পরে আপনার হাতে একটা সিগারেটকেস দেখলাম তাতে আমাদের পবিত্র রাজবংশের চিহ্ন! অমনি টের পেলাম, তা হলে এই সেই সিগারেটকেস! কিন্তু ওটা চুরি করে দেখি, ভেতরে অনেক লেখা অস্পষ্ট এবং মুছে গেছে। কাজেই ওটা পেয়েও খুব একটা সুবিধে হল না। তবু ভাবলাম, যেটুকু পড়া যাচ্ছে–তারই সূত্র ধরে খুঁজলে যদি সোনাটা পাই! কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য! কোথায় লুকিয়ে ছিল হিংস্র হায়েনার পাল। তারা আমাদের আক্রমণ করল।

 

অনেকক্ষণ কথা বলে টিহো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ডাক্তার এসে আমাদের বললেন,–আর নয়। আপনারা এবার আসুন। এভাবে কথা বললে ওকে বাঁচানো যাবে না।

 

আমরা বেরিয়ে এলাম। বব বলল,–ঠাকমাকে হোটেলে রেখে চলো আমার জনখুড়োর অবস্থা কী হল দেখি।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *