ছয়
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার চমনলালের সুইট থেকে বেরিয়ে দেখলেন, সুভদ্রা ঠাকুর তাঁর স্যুইটের দরজা ফাঁক করে উঁকি দিচ্ছেন। মাঝখানের সুইটটায় শোভন এবং ঋতুপর্ণা উঠেছিল। সেটার দরজা পুলিস সিল করে রেখেছে। কর্নেলকে দেখে সুভদ্রা নিঃশব্দে হাসলেন। তেমনি পাগলাটে চাউনি।
কর্নেল বললেন, কিছু বললেন কি মিসেস ঠাকুর?
সুভদ্রা ফিসফিস করে বললেন, ফাদার পিয়ার্সনের পার্কটা আর নেই। শুধু একটা বেদি আছে। দেখেছেন?
হ্যাঁ। দেখেছি।
আপনাকে বলছি কথাটা। পুলিসকে আমি বলিনি এবং বলবও না। ওখানে সকালে লক্ষ্য করেছিলাম একজন হনিমুনার অন্যজনের বউয়ের সঙ্গে বসে ছিল। আমি লুকিয়ে ওদের দেখছিলাম।
কর্নেল হাসলেন। আমিও দেখেছি মিসেস ঠাকুর!
এইমাত্র ওখানে গিয়ে দেখলাম পাথরের বেদিতে প্রচুর রক্ত! গিয়ে দেখে আসুন।
প্রচুর রক্ত? আমি অবশ্য একটু লাল রঙের ছিটে দেখেছিলাম।
সুভদ্রা রুষ্টমুখে বললেন, আপনি ভালো করে দেখেননি! এখন গিয়ে দেখুন।
মিসেস ঠাকুর! বুঝতে পারছি না আপনি কেন আমাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন? আমি আপনার সহযোগিতা আশা করছি কিন্তু।
কী বলতে চান আপনি?
বেদিতে যে লাল রঙের ছিটে দেখেছিলাম, তা রক্ত নয়। ব্রাসিলিকা ইন্দিকা নামে একরকম উদ্ভিদের লাল ফুল এই এলাকায় এখন প্রচুর ফোটে। ওটা তারই রঙ। এবং আপনিই চুপিচুপি ওই রঙটুকু ছড়িয়ে এসেছিলেন। কিন্তু কেন? আপনি কি এমন কিছু লক্ষ্য করেছিলেন–
তাকে বাধা দিয়ে সুভদ্রা বললেন, জিতেন্দ্রর আত্মা আমাকে বলেছিল কিছু সাংঘাতিক ঘটনা ঘটবে।
মিসেস ঠাকুর! বুঝতে পারছি, আপনি এখন আবার গিয়ে বেদিতে ওই ফুলের রঙ বেশি করে ছড়িয়ে এসেছেন। চমনলালজি একটু আগে দেখেছেন আপনি দুহাত শাড়ির আঁচলে ঢেকে লজে ঢুকছিলেন। কারণ আপনার দুহাত লাল হয়ে গিয়েছিল।
সুভদ্রা তখনই দরজা বন্ধ করে দিলেন।
কর্নেল রিসেপশনে গেলেন। সিদ্ধেশ কান থেকে ওয়াকম্যান খুলে বলল, আপনার আর কোনও টেলিফোন আসেনি স্যার!
সে ঘড়ি দেখে বলল, বড় জোর দেড়টা বাজবে। আসলে ম্যানেজার সাব মার্কেটিংয়ে দেরি করে ফেলেছিলেন। আপনার লাঞ্চ আগেই পাঠিয়ে দেব।
সিদ্ধেশ! এ বেলা আমি ডাইনিংয়েই খাব। হনিমুনারদের সঙ্গে।
কর্নেল তার স্যুইটে ফিরে আসছিলেন। ওপরে করিডরে সোমক দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, আপনাকে খুঁজছিলাম কর্নেল সরকার! আপনার স্যুইটে নক করে সাড়া পেলাম না।
বলুন মিঃ চ্যাটার্জি!
আমার স্ত্রী শ্রুতি এখন স্নান করছে। সে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। পুলিস আবার আসার আগে সে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
আমি ঘরেই থাকছি।
কর্নেল চাবি বের করে তার স্যুইটের দরজা খুলছেন, তখন সোমক আস্তে বলল, আপনি নদীর ধারে পাথরটার ওপর যে লাল রঙের ছিটে দেখেছিলেন, শ্রুতির কথা শোনার পর তা এক্সপ্লেন করতে পারি।
জানি। তা একরকম লাল ফুলের রঙ।
কিন্তু পুলিস আমাকেই সন্দেহ করেছে তা বুঝতে পেরেছি। সোমক ক্ষুব্ধভাবে বলল। ওই উন্মাদ মহিলা মিসেস ঠাকুরের কথায় পুলিস আমাকে জেরার ছলে অপমান করছিল। আপনি চুপচাপ ছিলেন কর্নেল সরকার। আপনার আচরণের অর্থ বুঝতে পারছি না। আমার কেরিয়ার নষ্ট করে আপনার কী লাভ?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, মাই ডিয়ার ইয়ং ম্যান, কেউ কারও কেরিয়ার নষ্ট করতে পারে না। মানুষ নিজের কেরিয়ার নিজেই নষ্ট করে। এনিওয়ে! আপনার স্ত্রী কথা বলতে চাইলে আমি অবশ্যই শুনব। হা–আই অ্যাম রিয়্যালি ইন্টারেস্টেড। প্লিজ ডোন্ট বি ওয়ারিড।
ঘরে ঢুকে দরজা লক করে দিলেন কর্নেল। প্রায় একটা বাজে। প্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে তিনি রুমালে মোড়া খুদে আগ্নেয়াস্ত্রটি বের করলেন। চমনলালের বর্ণনা অনুসারে এতে আর হত্যাকারীর আঙুলের ছাপ আশা না করাই উচিত। আবর্জনার পাত্রে অনেক তরল পদার্থ পড়ে ছিল।
একটা ব্যাপার স্পষ্ট। ঋতুপর্ণাকে হত্যা করা হয়েছে নদীর ওপারেই সম্ভবত, লেক অর্থাৎ প্রপাত জলাশয়ের কাছাকাছি। রমেশ পাণ্ডের ড্রাইভার রাম সিং লেকের কোথায় মৃতদেহ দেখেছিল, পুলিস তার কাছে জেনে নেবে। এই অঞ্চল নাকি সে যা খুশি তা-ই করতে পারে। সে নিজে যদি ও ঘটনায় জড়িত থাকে, হত্যাকারীকে চেনা গেলেও রেহাই পেয়ে যাবে।
কিন্তু শোভন রায় গা ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছে কেন? এটাই এ ঘটনার সবচেয়ে অদ্ভুত দিক।
অনেক প্রশ্ন মাথার ভেতর ভনভন করছে ক্রমাগত। হত্যারহস্য খুবই জটিল হয়ে গেল এতক্ষণে–চমনলালজির কাছে এই আগ্নেয়াস্ত্রটি পাওয়ার পর।
কর্নেল কিটব্যাগে অস্ত্রটা রুমালে জড়ানো অবস্থায় লুকিয়ে রাখলেন। চমনলাল দম্পতিকে তিনি নিষেধ করেছেন, পুলিসকে যেন ওঁরা এ সম্পর্কে কিছু না বলেন। এই জিনিসটা তার ট্রাম্পকার্ড। পুলিস এটা জেনে গেলে কী করবে সে বিষয়ে নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় তিনি দেখেছেন স্থানীয় পুলিস আনপ্রেডিক্টেবল। কাজেই ওপরতলার কোনও অফিসার না এসে পৌঁছুনো পর্যন্ত তাঁকে ওয়েট অ্যান্ড সিনীতি অনুসরণ করতেই হবে।
কর্নেল কিটব্যাগটা বিছানার ওপাশে রেখে এলেন। ইজিচেয়ারে বসে চুরুট ধরালেন। সোমক চ্যাটার্জি যে কেরিয়ারিস্ট, তা বুঝতে পেরেছেন। সে মডেলিং এবং অভিনয় করে। তার লক্ষ্য ফিল্মস্টার হওয়া। কিন্তু সে যে একটা কিছু গোপন করেছে, তাতে ভুল নেই এবং তা করেছে সম্ভবত কেরিয়ারের স্বার্থেই। এবার স্ত্রীকে দিয়ে সে কি তাকে ভুল পথে ছোটাতে চায়? দেখা যাক।
দরজায় কেউ নক করল। কর্নেল উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখলেন সোমক এবং তার স্ত্রী শ্রুতি দাঁড়িয়ে আছে। শ্রুতি নমস্কার করল। কর্নেল বললেন, আসুন–মিসেস চ্যাটার্জি!
সোমক বলল, আমি ঘরে যাচ্ছি। শ্রুতি! ওঁকে সব কথা খুলে বলো।
শ্রুতি সদ্য স্নান করে এসেছে। আড়ষ্টভাবে বসল। বলল, আমাকে তুমি বললেন খুশি হব কর্নেল সরকার! আমার নাম শ্রুতি।
হুঁ। বলো!
আমি আর দীপক ধারিয়া ফলসের ওপরদিকে শোভনবাবুকে দেখেছিলাম। মাত্র এক মিনিটের জন্য। আপনি দীপককে জিজ্ঞেস করতে পারেন। দুটো পাথরের ফাঁকে ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ সরে গেলেন। এখন মনে হচ্ছে। উনি নিজেই স্ত্রীকে মেরে ফলসে ফেলতে এসেছিলেন।
কর্নেল হাসলেন। আমিও বাইনোকুলারে ওঁকেই দেখেছিলাম। হা–ওঁর গতিবিধি অবশ্যই সন্দেহজনক। তো তোমার স্বামী কি তোমাকে বলেছে সে ঋতুপর্ণার সঙ্গে নদীর ধারে বসে গল্প করছিল?
বলেছে। সোমককে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু
কিন্তু কী?
শ্রুতি আস্তে বলল, সোমকই ফলসে দল বেঁধে যাওয়ার প্ল্যান করেছিল। অথচ মর্নিংয়ে বলল, শরীর খারাপ। যাবে না। ফিরে এসে ঘটনাটা শোনার পর ওকে চার্জ করলাম। তখন ও একটা অদ্ভুত কথা বলল।
কী বলল?
পায়েল–মানে অনির্বাণদার স্ত্রী সোমকের মডেলিংয়ের জুটি ছিল একসময়। পায়েলকে এড়িয়ে থাকার জন্য সে নাকি যায়নি।
কেন এড়িয়ে থাকতে চেয়েছে?
সোমক খুলে কিছু বলল না। শুধু বলল, শি ইজ ডেঞ্জারাস। শ্রুতি একটু ইতস্তত করার পর ফের বলল, ওদের দুজনের মধ্যে এমোশনাল সম্পর্ক ছিল একসময়। আমি জানি। তারপর সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যায়। আমার ধারণা, পায়েল অনির্বাণদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। সোমকের এতে রাগ হতেই পারে।
কিন্তু তুমি সোমকের স্ত্রী! কর্নেল হাসলেন। সব জেনেও তুমি
কর্নেল সরকার! আমার মন অত নিচু নয়। অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ জেলাস ওয়াইফ।
যাই হোক! বেড়ানো কেমন এনজয় করলে বলো?
আই এনজয়েড। কিন্তু ফিরে এসে একটা সাংঘাতিক মিসহ্যাপ শুনে সব আনন্দ চলে গেছে।
ডাইনোসরের ছবি দেখেছ?
টর্চের আলোয় কিছু বোঝা যায় না। মে বি এ হোক্স! শ্রুতি উঠে দাঁড়াল। আমি যাই। আপনি দীপককে ডেকে জিজ্ঞেস করুন। শোভনবাবুকে প্রথমে সেই দেখতে পেয়েছিল।
একটা কথা। দীপক তোমার পূর্বপরিচিত?
শ্রুতির চোখে একটু চমক লক্ষ্য করলেন কর্নেল। সে বলল, ওকে চেনা মনে হচ্ছিল, তা সত্যি। কোথায় যেন দেখেছি। তবে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। দীপক আর তার স্ত্রী কুমকুমের সঙ্গে এখানে এসেই আলাপ হয়েছে। দীপককে কি পাঠিয়ে দেব?
কর্নেল বললেন, থাক্। দেড়টায় লাঞ্চ খেতে যাব। তৈরি হয়ে নিই।
শ্রুতি চলে গেল। কর্নেল দরজা ভেতর থেকে লক করে বাথরুমে গেলেন। স্নান করার পর পোশাক বদলে কিটব্যাগ থেকে সেই আগ্নেয়াস্ত্রটা বের করে জ্যাকেটের ভেতর পকেটে ঢোকালেন। তারপর নীচে ডাইনিং হলে গেলেন।
সুভদ্রা ঠাকুর এক কোণে বসে খাচ্ছেন এবং আপন মনে বিড়বিড় করে কী সব বলছেন। চমনলাল এবং রজনী দেবী অন্য কোণে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। কিচেনবয় তাদের খাদ্য পরিবেশন করছে। কর্নেল রিসেপশন কাউন্টারের দিকে তাকালেন। সিদ্ধেশ ডাকল, কর্নেল সাব!
কর্নেল কাছে গিয়ে বললেন, বলো সিদ্ধেশ?
সিদ্ধেশ চাপা স্বরে বলল, একটা টেলিফোন এসেছিল। কেউ বলছিল, আমি শোভন রায় বলছি। আমার স্ত্রী ঋতুপর্ণাকে ডেকে দিন। তো আমি বললাম, আপনার স্ত্রী মিসহ্যাপ হয়েছে। আপনি এখনই চলে আসুন এখানে। পুলিস। আপনাকে খুঁজছে। অমনই লাইন কেটে গেল। মিঃ রায় এবার এসে পড়বেন। মনে হচ্ছে। ভদ্রলোক জানেন না কী হয়েছে।
কর্নেল হাসলেন। জানেন। জেনেও কৌতুক করছেন। বুঝলে সিদ্ধেশ?
সিদ্ধেশ হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
কর্নেল বললেন, আবার শোভন রায় বলে কেউ টেলিফোন করলে তুমি তাকে বলবে, আপনি কর্নেল সরকারের সঙ্গে কথা বলুন।
আচ্ছা সার!
কর্নেল চমনলাল দম্পতির কাছাকাছি একটা টেবিলে বসলেন। জগদীশ সেলাম ঠুকে তার খাবার নিয়ে এলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনির্বাণ ও পায়েল, সোমক ও শ্রুতি, দীপক ও কুমকুম এসে গেল। সোমক ও শ্রুতি বসল আলাদা টেবিলে। অনির্বাণ, পায়েল, দীপক আর কুমকুম একই টেবিলে মুখোমুখি বসল। সবাই গম্ভীর। কর্নেল লক্ষ্য করেছিলেন, সোমক ও শ্রুতি ছাড়া ওরা চারজনে আড়চোখে তাকে একবার করে দেখে নিচ্ছে।
কর্নেল একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে লাউঞ্জে গেলেন। পুলিসের দুই গোয়েন্দা অফিসার এবার ডাইনিংয়ে ঢুকলেন। তাদের হনিমুন লজ খাওয়াবে। কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বাইরের বারান্দায় গিয়ে বসলেন।
কিছুক্ষণ চুরুট টানার পর তিনি রিসেপশন কাউন্টারে গেলেন। বললেন, সিদ্ধেশ! তোমার তো মোটরবাইক আছে!
সিদ্ধেশ বলল, মোপেড আছে সার!
তোমার গাড়িটা একবার দেবে?
কেন দেব না?
শিগগির এনে দাও। আমি একবার বেরুব। থানা থেকে ইন্সপেক্টর মিঃ দুবে এলে তাকে বলবে, জরুরি কাজে আমি একটু বেরিয়েছি। ওঁদের যা কর্তব্য, ওঁরা করবেন।
সিদ্ধেশ একটু অবাক হয়ে বলল, আপনি মোপেড চালাতে পারেন বিশ্বাস করা যায় না।
কর্নেল হাসলেন। ভুলে যেও না সিদ্ধেশ। আমি সামরিক বাহিনীতে ছিলাম। সবরকমের যানবাহন চালানোর অভ্যাস আমার আছে। হা–প্রথমে কিছুক্ষণ অসুবিধে হবে। তারপর বাহনটিকে শায়েস্তা করে ফেলব।
সিদ্ধেশ গ্যারাজের দিক থেকে তার দুচাকার গাড়িটা এনে দিল। তারপর চাবি দিল।
কর্নেল লন পেরিয়ে গেটে গেলেন। গেট খুলে বেরিয়ে মোপেড চেপে স্টার্ট দিলেন। উৎরাইয়ের রাস্তায় স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছিল দুচাকার গাড়িটি। নতুন কেনা হয়েছে। তাই এমন সাবলীল গতিবেগ। হাইওয়েতে পৌঁছেই ডাইনে ব্রিজের দিকে এগিয়ে চললেন কর্নেল।
পায়ে হেঁটে প্রপাত-জলাশয়ের কাছে পৌঁছুতে দুঘণ্টার বেশি সময় লেগে যেত। হাইওয়ে সোজা দক্ষিণে চলে গেছে। ডানদিকে সংকীর্ণ পিচ রাস্তা এগিয়েছে ধারিয়া প্রপাতের দিকে। পিচ রাস্তায় গতি কমালেন কর্নেল। ডাইনে ধারা নদী গাছপালা আর পাথরের ফাঁকে মাঝে-মাঝে চোখে পড়ছিল। এতক্ষণে প্রপাত দেখে ফিরে আসছিল মানুষজন চারচাকা বা দুচাকার গাড়িতে। বিকেলের মধ্যেই নির্জন হয়ে যায় ধরিয়া প্রপাত। ইদানীং এখানেও আদিবাসীদের মধ্যে জঙ্গি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। তাদের হামলার ভয় আছে।
লেকের একটু আগে থেকে মোপেডের গতি খুবই মন্থর করেছিলেন কর্নেল। এক জায়গায় থেমে গেলেন। পিচরাস্তার ডানদিক ঘেঁষে কোনও গাড়ির চাকার দাগ স্পষ্ট ফুটে আছে। কারণ ঘাসের কুটোভর্তি কাদা লেগেছিল কোনও গাড়ির চাকায়।
মোপেড একপাশে রেখে কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক খুঁটিয়ে দেখে নিলেন। তারপর চাকার দাগের দিকে তাকালেন। গাড়িটা এখানে ডাইনে ঘাসের ওপর একদিকের চাকা নামিয়েছিল। অন্য গাড়িকে সাইড দেবার জন্য?
তা হতেই পারে। ট্রাক বোঝাই মানুষজন প্রপাতের ওখানে পিকনিক করতে যায়। একটা ট্রাক এবং একটা প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সি পাশাপাশি চলার মতো চওড়া রাস্তা এটা নয়। তবে ডানদিকে নেমে যে গাড়ি অন্য গাড়িকে সাইড দিয়েছে, সেটা প্রপাতের দিক থেকে আসছিল বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু একটু পরে কর্নেল লক্ষ্য করলেন, গাড়িটার চাকার দাগ ডাইনে নদীর দিকে একটুকরো ঘাসে ঢাকা জমির ওপর থেকে উঠে এসেছে। ঘাসের ওপর চাকার দাগ মুছে যায়নি। ঘাসগুলো র্থেতলে গেছে এবং কাদা ছড়িয়ে আছে।
ঘাসজমিটার দুধারে জঙ্গল এবং উঁচু পাথরের চাই। শেষ দিকটায় গিয়ে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। জঙ্গলের আড়াল থাকায় বোঝা যায়নি এটা লেকের একটা প্রান্ত। জলপ্রপাতের গর্জনও কানে এল এবার। আসলে প্রপাতের কাছে। রাস্তাটা একটু ঘুরে গিয়ে পৌঁছেছে। এখান থেকে প্রপাত কাছেই।
তার মানে গাড়িটা এই ঘাসের জমিতে নেমেছিল। কর্নেল দেখলেন, নদীর দিকে জঙ্গলের মধ্যে সেই লাল ফুল প্রচুর ফুটে আছে। তারপরই চমকে উঠলেন কর্নেল। একটা ঝোপের তলায় পাথরের ফাঁকে একপাটি স্লিপার পড়ে আছে। মেয়েদের জুতো!
এবং তার নিচেই লেকের জল ফুঁসছে। ঘুরপাক খাচ্ছে।
তাহলে কি এখানেই ঋতুপর্ণাকে কেউ ডেকে এনে গুলি করে মেরেছে?
জুতোটা একটা চ্যাপ্টা বড় পাথর তুলে ঢেকে দিলেন কর্নেল। তারপর ঘাসজমিটা আবার খুঁটিয়ে দেখার পর রাস্তায় গেলেন। বাইনোকুলারে প্রপাতের দিকটা দেখতে থাকলেন। নীলসারস দম্পতির কথা মনে পড়ে গেল। সেই গাছটা খুঁজতে থাকলেন।
সারসদম্পতি নেই। ওরা একজায়গায় বেশিক্ষণ থাকে না।
কর্নেলের মাথায় এখন সারসদম্পতি ভর করেছে। তা ছাড়া একা কোথাও বসে ধীরে-সুস্থে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। কর্নেল মোপেডে চেপে ধারিয়া ফলসের দিকে চললেন।
রাস্তাটা একটা টিলা ডাইনে রেখে একটু ঘুরে প্রপাতের এপারে পৌঁছেছে। এখনই ঘন ছায়া ঢেকে ফেলেছে জায়গাটা। পুরনো সরকারি বাংলো জনহীন সুনসান। আদিবাসীদের আন্দোলনের পর বাংলোটা পোড়া হয়ে গেছে। মোপেড বাংলোর নীচে সমতল এক টুকুরো জমিতে দাঁড় করিয়ে কর্নেল নেমে গেলেন। পাথরের সিঁড়ির নীচে চওড়া পার্কমতো জায়গা। ওখান থেকেই লোকেরা প্রপাত দর্শন করে। সেই আবর্জনার পাত্রটার কাছে গেলেন কর্নেল। ওটা একটা লোহার ড্রাম। লেখা আছে, ইউজ মি। ড্রামটা আবর্জনায় ভর্তি। চমনলালজি এর মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রটা পেয়েছিলেন।
একটা প্রশ্ন মনে এল। উনি কেন দলের লোকেদের ফেলে দেওয়া এঁটো পেপারকাপ ড্রামে ফেলতে গেলেন? কাকেও কি অস্ত্রটা ফেলতে দেখেছিলেন? চমনলালজি বলেছেন, পেপারকাপগুলো ওভাবে পড়ে থাকায় তার মনে হয়েছিল, দলের যুবকযুবতীদের একটু শিক্ষা দেওয়া উচিত। কিন্তু ওরা কেউ তার এই কাজের দিকে ফিরেও তাকায়নি।
কর্নেলের মনে খটকা থেকে গিয়েছিল। এখানে এসে সেটা বেড়ে গেল, চমনলালজি নিশ্চয় কিছু লক্ষ্য করেছিলেন। হয়তো সন্দেহ হয়েছিল কেউ গোপনে কিছু ফেলল। তাই পেপারকাপ ফেলার ছলে আবর্জনার পাত্র খুঁজেছিলেন। ফিরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আবার কথা বলা দরকার।
হঠাৎ কর্নেল দেখলেন প্রপাতের শীর্ষে দুটো পাথরের মাঝখানে কেউ উঁকি দিচ্ছিল। এইমাত্র সরে গেল।
দ্রুত বাইনোকুলারে তাকে খুঁজলেন। কিন্তু দেখতে পেলেন না আর। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কর্নেল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে মোপেডের কাছে গেলেন। তারপর স্টার্ট দিয়ে ফিরে চললেন হনিমুন লজ।
তার মনে এখন একটাই সাফল্যের আনন্দ। হত্যার স্থান আবিষ্কার।…
