হনিমুন লজ (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ 

 

চমনলাল এবং রজনী দেবী জিপের কাছে ফিরে এসেছিলেন। ড্রাইভার রাম সিং তখন ছিল না। কিছুক্ষণ পরে সে ফিরে এসে নমস্তে করল। তারপর বিষণ্ণ মুখে বলল, রাত থেকে আমার আমাশা মতো হয়েছে সার। কিন্তু মালিকের হুকুম। আমাকেই আসতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে এসেছি। আপনারা ওদের সঙ্গে যাননি?

 

চমনলাল হাসলেন। দেখতেই পাচ্ছ রাম সিং। আমাদের বয়স হয়েছে, পায়ে। হেঁটে চড়াইয়ে উঠতে পারব না।

 

রজনী দেবী বললেন, আচ্ছা রাম সিং, তুমি লেকে যে লাশটা দেখেছিলে—

 

চমনলাল স্ত্রীর ওপর চটে গেলেন। আর লাশের কথা নয় রজনী! আমি ক্লান্ত। ফিরে যেতে পারলে বাঁচি!

 

রাম সিং অন্যমনস্কভাবে বলল, লেকের মাঝখানে স্রোত আছে। লেক যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে আবার ধারা নদী। লাশটা ওখানে গিয়ে পড়লে। বিশ-তিরিশ মিনিটের মধ্যে পাঁচ-সাত কিলোমিটার দূরে চলে যাবে। আমার ধারণা, এতক্ষণ ওটা ধারানগরের কাছে পৌঁছে গেছে।

 

চমনলাল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, আমার দুর্ভাগ্য! গুহাচিত্র স্বচক্ষে দেখতে পেলাম না।

 

রজনী দেবী আস্তে বললেন, আসলে তুমি নার্ভাস হয়ে পড়েছ লাল!

 

ঠিক বলেছ। আমার প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু ভদ্রতার খাতির ওঁদের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।

 

লাল! রাম সিংকে বলো না, আমাদের লজে পৌঁছে দিয়ে আসুক। ওঁদের ফিরতে দেরি হতে পারে!

 

কী বলছ! প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব। ওঁরা দৈবাৎ ফিরে এসে জিপটা দেখতে না পেলে–চমনলাল ফোঁস শব্দে শ্বাস ফেলে ফের বললেন, আমাদের দলে ভেড়া উচিত হয়নি। ইচ্ছেমতো ঘোরা যাচ্ছে না। জলপ্রপাতের ওপরদিকে একটা রোপওয়ে ছিল তোমার মনে পড়ছে রজনী?

 

রজনী দেবী ম্লান হাসি হাসলেন। মনে পড়ছে লাল! ফাদার পিয়ার্সনের বাংলো থেকে নদীর ওপর দিয়ে শর্টকাটে আমরা আসতাম। রোপওয়েতে দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্না দেখতাম।

 

ওঃ! সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা!

 

অথচ দেখ, তখন বুনো জানোয়ারের উপদ্রব ছিল। আমরা গ্রাহ্য করতাম না।

 

যৌবন মানুষকে দুঃসাহসী করে! তা ছাড়া তুমিও তখন যুবতী। তোমার রূপলাবণ্যে–

 

শাট আপ! রজনী দেবী তাকে থামিয়ে দিলেন। আচ্ছা লাল, সেই রোপওয়ের পিলারটা আসার পথে দেখতে পেলাম না কেন? গত বছরেও তো ওটা দেখেছি।

 

ভেঙে পড়ে গেছে সম্ভবত।

 

দুই দম্পতি এইসব কথা বলছিলেন। ইতিমধ্যে রাম সিং আবার জৈবকর্ম সেরে এসেছিল। ওর চেহারায় অসুস্থতার আদল ক্রমশ ফুটে উঠছিল। তারপর দলটিকে ফিরতে দেখা গেল। তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। সার বেঁধে ওরা আসছিল। পাথর বেয়ে নামতে পরস্পরকে সাহায্য করছিল।

 

অনির্বাণ এগিয়ে এসে বলল, কী ব্যাপার চমনলালজী? আমরা আপনার জন্য গুহার মুখে অপেক্ষা করছিলাম!

 

বৃদ্ধ ঐতিহাসিক কাচুমাচু মুখে বললেন, সম্ভব হলো না। আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তো আপনারা কি সত্যি ডাইনোসরের ছবি দেখতে পেলেন?

 

অনির্বাণ হাসল। গুহার ভেতর ভীষণ অন্ধকার। দেওয়াল কোথাও কোথাও মসৃণ করা হয়েছে। রঙবেরঙের অদ্ভুত-অদ্ভুত ছবি দেখেছি। তবে

 

দীপক তার কথার ওপর বলল, ওটা ডাইনোসর, না হাতি বোঝা গেল না চমনলালজি!

 

সবাই হেসে উছল। রজনী দেবী বললেন, ড্রাইভারের আমাশা। বেচারাকে শিগগির রেহাই দিলে ভালো হয়।

 

অনির্বাণ বলল, জানি। রাম সিংকে তো আমি দুটো ট্যাবলেট খেতে দিয়েছিলাম। খাওনি রাম সিং?

 

খেয়েছি স্যার! কিন্তু কমছে না।

 

পায়েল বলল, অনির্বাণ! তুমি ওকে গাড়ি ড্রাইভ করতে দিও না। রাস্তা খারাপ।

 

অনির্বাণ বলল, ওঃ পায়েল! আই অ্যাম ড্যাম টায়ার্ড।

 

শ্রুতি বলল, রাম সিং ড্রাইভ করতে পারবে না কেন? পেটের অসুখ তো আসার সময় থেকে শুনছি।

 

কুমকুম চোখে হেসে বলল, বেড়ে গেছে। আবার হয়তো মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে দেবে।

 

দীপক বলল, তখন আমরা ওকে ফেলে যাব। অনির্বাণদা ড্রাইভ করে আমাদের পৌঁছে দেবেন।

 

হারি আপ! অনির্বাণ তাড়া দিল। ফিরে গিয়ে স্নান করতে হবে। গুহার ভেতর ঢুকে নোংরা হয়ে গেছি! রাম সিং! তুমি খারাপ রাস্তাটুকু আমাদের পার করে দাও। তারপর বরং আমি ড্রাইভ করব।

 

সবাই জিপে উঠল। কুমকুমের হাতে একগোছা বুনো ফুল ছিল। জিপ চলতে শুরু করলে শ্রুতি তাকে বলল, তোমার বরকে গোপনে উপহার দেবে বুঝি কুমকুম?

 

দীপক ফুল বোঝে না শ্রুতিদি।

 

দীপক বলল, অন্তত এই ফুলগুলো বুঝি না! এই এরিয়ায় যেখানে সেখানে এই লাল ফুলগুলো ফুটে আছে। পায়েলদি! অনির্বাণদার শার্টের অবস্থা দেখেছেন?

 

পায়েল চটুল হেসে বলল, গুহার ভেতর তোমার বউ ওকে কিংবা ও তোমার বউকে ফুলগুলো প্রেজেন্ট করে থাকবে। অনির্বাণ ইজ ডেঞ্জারাস দীপক।

 

শ্রুতি বলল, অনির্বাণদার হাতে আমি কিন্তু প্রথমে এই ফুলের গোছ দেখেছিলাম। আসবার পথে।

 

পায়েল বলল, তাহলে সেগুলো এখন কুমকুমের হাতে চলে গেছে।

 

কুমকুম চ্যাঁচামেচি করে বলল, মোটেও না। এগুলো আমি গুহার কাছে তুলেছি।

 

শ্রুতি বলল, তাহলে অনির্বাণদার ফুলগুলো কোথায় গেল? পায়েল বলল, আমার বরকে আমি অত পাত্তা দিই না। তাই পথে কোথাও ফেলে দিয়েছিল।

 

দুর্গম রাস্তাটা দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে এসে জলপ্রপাতের কাছে সুগম হল এবং এবার জিপের গতি পূর্বে। বাঁ দিকে ধারা বা ধারিয়া নদী। সংকীর্ণ পিচরাস্তা তার সমান্তরালে এগিয়ে হাইওয়েতে মিশেছে। নদীর দুই তীরেই ঘন জঙ্গল আর পাথর। প্রায় চার কিলোমিটার দূরত্বে হাইওয়ে। নদী ওখানে সামান্য বাঁক নিয়ে উত্তর-পূর্বে চলে গেছে ধারানগরের দিকে। বাঁকের আগে ব্রিজ। তারপর বাঁদিকে সংকীর্ণ চড়াই রাস্তা ধরে গেলে টিলার মাথায় হনিমুন লজ। এই রাস্তাটা প্রাইভেট রোড। দুধারে শ্রেণীবদ্ধ গাছ।

 

জিপ প্রাইভেট রোডের মুখেই দাঁড় করাল অনির্বাণ। বলল, চমনলালজির অসুবিধা না হলে আমরা এখানেই নেমে যেতে পারি। রমেশকে কথা দিয়েছি, বারোটার মধ্যে জিপ ফেরত দেব।

 

চমনলাল বললেন, না। অসুবিধা কিসের? এটুকু পথ হেঁটে যেতে আমার ভালোই লাগবে।

 

সবাই জিপ থেকে নামল। তারপর রাম সিং জোরে জিপ চালিয়ে উধাও হয়ে গেল। দলটি হনিমুন লজের দিকে পা বাড়াল। শ্রুতি বলল, ও মা! অনির্বাণদার শার্টের কী বিচ্ছিরি অবস্থা।

 

অনির্বাণ হাসল। কুমকুমের শাড়ির অবস্থা দেখ।

 

কুমকুম বুকের কাছে শাড়ির একটা অংশ তুলে আঁতকে উঠল। এ কী! এ কী অদ্ভুত ফুল!

 

দীপক বলল, গন্ধ নেই। তাই রঙ ছড়ায়।

 

চমনলাল বললেন, লাতিন নাম ব্রাসিলিকা ইন্দিকা। আদিবাসীরা কাপড় রাঙানোর জন্য এই ফুলের রঙ ব্যবহার করে। আসলে লক্ষ্য করলে দেখবেন, ফুলের পরাগে লাল রেণু আছে. একটু নড়লেই রেণুগুলো ঝরে পড়ে। রজনী। তোমার মনে আছে? প্রথমবার এখানে এসে দুজনের হোলি খেলার অবস্থা!

 

রজনী দেবী সায় দিয়ে বললেন, প্রকৃতির খেয়াল! শরৎকালে এরা ফোটে। বসন্তকালে ফোঁটা উচিত ছিল।

 

কুমকুম ফলগুলো রাস্তার ধারে ছুঁড়ে ফেলল। বলল, বাজে ফুল! আমার হাত বিচ্ছিরি লাল হয়ে গেছে।

 

দীপক বলল, মনে হচ্ছে খুনখারাপি করেছ।

 

পায়েল চোখ পাকিয়ে বলল, তোমার একটুও রসবোধ নেই দীপক! রাঙা হাত টার্মটা তুমি ভুলে যাচ্ছ।

 

ক্রমে চমনলাল এবং রজনী দেবী পিছিয়ে পড়ছিলেন। অনির্বাণ সবার আগে হাঁটছে। টিলার মাটি কেটে এই রাস্তাটাকে যতটা সম্ভব কম চড়াই করা হয়েছে। কলকাতার হনিমুনাররা এগিয়ে গেলে রজনী দেবী আস্তে বললেন, কী রকম স্বার্থপর দেখছ লাল?

 

কেন রজনী?

 

তখনকার মতো আমাদের ফেলে চলে গেল ওরা।

 

তাতে কী? আমাদের অত তাড়া নেই।

 

কিন্তু প্রশ্নটা ভদ্রতার। তা ছাড়া আমরা দুজনেই বৃদ্ধ।

 

শরীরে রজনী, শরীরে। মনে নই।

 

একটু পরে রজনী দেবী বললেন, আচ্ছা লাল, কখন থেকে কথাটা মনে আসছিল, বলতে ভুলে গেছি। কলকাতা থেকে আসা বাঙালি হনিমুনারদের মধ্যে সেই দম্পতির আচরণ অদ্ভুত নয়? ওরা এদের সঙ্গে মেশেনি। কাল রাতের পার্টিতেও ওরা দুটিতে তফাতে বসেছিল।

 

সবাই হইহল্লা পছন্দ করে না ওরা আলাদা থাকতে চেয়েছে।

 

কিন্তু–

 

কিন্তু কী?

 

ওরা পায়ে হেঁটে শর্টকাটে গেলে ধারিয়া ফলসের ওপর দিকটায় পৌঁছুতে পারে। তাই না লাল?

 

তুমি কী বলতে চাইছ রজনী?

 

রজনী দেবী জোরে শ্বাস ফেলে বললেন, ড্রাইভার রাম সিং ধারিয়া লেকে একটা লাশ ভেসে যেতে দেখেছে।

 

চমনলাল থমকে দাঁড়ালেন। তুমি কেন ভাবছ–

 

তার কথার ওপর রজনী দেবী বললেন, আমাদের পাশের স্যুইটে ওরা উঠেছে। কাল রাতে দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি কানে আসছিল। তারপর আজ খুব ভোরে দরজা খোলার শব্দ শুনেছি। শব্দটা জোরালো। যেন রাগ করে কেউ বেরিয়ে গেল!

 

ওঃ রজনী! তুমি মাঝে-মাঝে অদ্ভুত সব কল্পনা করো!

 

কল্পনা নয়, লাল। আমি সত্যি শুনেছি।

 

চমনলাল হাসলেন। তুমি কি বলতে চাও, এই খুদে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে যুবকটি তার স্ত্রীকে খুন করে প্রপাতে ফেলে দিয়েছে? রজনী! বোকার মতো কথা বোলো না। কেউ কাকেও মেরে ফেলতে চাইলে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়াই যথেষ্ট। তবে প্রপাতের ওপরদিকে আজ মানুষজন কম ছিল না।

 

রজনী দেবী একটা পরে বললেন, এমন হতে পারে নিচের দিকে–মানে লেকের কাছাকাছি। কোথাও মার্ডার করে জলে ফেলে দিয়েছে।

 

কিন্তু অস্ত্রটা আমি পেয়েছি আবর্জনার পাত্রে। পাত্রটা ছিল ফলসের নিচে অন্য পারে। রোপওয়েটা আর নেই যে সে নদী পেরিয়ে অস্ত্রটা ওখানে ফেলে আসার সুযোগ পাবে। চমনলাল পা বাড়ালেন। ফের বললেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, হত্যার অস্ত্র জলে না ফেলে আবর্জনার পাত্রে ফেলল কেন সে?

 

তুমি বুঝতে পারছ না লাল! সে হত্যার দায় নিশ্চয় অন্যের কাঁধে চাপাতে চেয়েছে।

 

তাহলে–যদি সত্যিই একটা খুনখারাপি হয়ে থাকে, সেটা হয়েছে ধারা নদীর ওপারে। যেপারে আমরা ছিলাম।

 

অস্ত্রটা তোমার কাছে আছে। আমার ভয় করছে লাল! এখনও সুযোগ আছে। ওটা ফেলে দাও কোথাও।

 

রজনী! তুমি জানো আমি আজীবন সৎ নাগরিক। আমার সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রখর।

 

সে যুগ আর নেই লাল! তুমি ফেঁসে যাবে বলে দিচ্ছি।

 

স্যুইটে ফিরে আমাকে কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে।

 

রজনী দেবী হঠাৎ বাঁদিকে ঘুরে বললেন, আরে! মিসেস ঠাকুর ওখানে কী করছেন?

 

কই? কোথায়?

 

ওই দেখ। নদীর ধারে সেই বেদিটার কাছে।

 

চমনলাল ক্লান্তভাবে হেসে বললেন, আমাদের মতো ওঁরও কিছু স্মৃতি আছে। ফাদার পিয়ার্সনের পার্কের ওটাই শেষ চিহ্ন। আশ্চর্য ব্যাপার রজনী! বেদিটার পাশে একটা গাছ কত দ্রুত বেড়ে উঠেছে। ওখানে কোনও গাছ ছিল না।

 

দুজনে আবার হাঁটতে থাকলেন। দুধারে ঘন শ্রেণীবদ্ধ গাছ থাকায় প্রাইভেট রোড ছায়াচ্ছন্ন। হনিমুন লজের গেটের কাছে পৌঁছে রজনী দেবী আস্তে বললেন, আচ্ছা লাল! ওই কর্নেল ভদ্রলোককে দেখতে কতকটা ফাদার পিয়ার্সনের মতো তাই না?

 

ঠিক ধরেছ। আমি প্রথমে তো চমকে উঠেছিলাম ওঁকে দেখে। উনিও একজন প্রকৃতিপ্রেমিক।

 

কিন্তু উনি যেন আমাদের এড়িয়ে চলেছেন। কেমন রহস্যময় মানুষ যেন!

 

চমনলাল হাসলেন। মেয়েদের চোখ একটু অন্যরকম হয়তো। আমার তা মনে হয়নি। ম্যানেজার রঘুবীর বলছিল, উনি গত অক্টোবরেও এখানে এসেছিলেন। আমরা তখন চলে গেছি। প্রকৃতি সম্পর্কে ওঁর নাকি অদ্ভুত বাতিক আছে।

 

পিছনে পায়ের শব্দ শুনে দুজনেই ঘুরে দাঁড়ালেন। সুভদ্রা ঠাকুর হনহন করে আসছিলেন। তাদের পাশ কাটিয়ে লনে ঢুকে গেলেন। তারপর বারান্দায় উঠে একই গতিতে লজের ভেতর অদৃশ্য হলেন।

 

রজনী দেবী বললেন, ভদ্রমহিলা আঁচলের ভেতর দুহাতে কী যেন লুকিয়ে নিয়ে গেলেন!

 

শি ইজ লুনাটিক! ওঁকে এড়িয়ে চলাই উচিত।

 

লাউঞ্জের কোণে রিসেপশন কাউন্টারে সিদ্ধেশ ওয়াকম্যানে গান শুনছিল। বৃদ্ধ দম্পতিকে দেখে একটু হাসল শুধু। লাউঞ্জের কোণে দুজন গুফো অচেনা লোক বসে আছে। কিন্তু ডাইনিং হল ফাঁকা। চমনলাল বললেন, তুমি চলো রজনী! আমি যাচ্ছি।

 

রজনী দেবী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন।

 

কাউন্টারের সামনে চমনলালকে দেখে সিদ্ধেশ কান থেকে ওয়াকম্যান খুলে বলল, ক্যান আই হেল্প ইউ সার?

 

চমনলাল বললেন, ধন্যবাদ সিদ্ধেশ! তোমার ম্যানেজার কোথায় গেল?

 

ম্যানেজার সাব আবার বেরিয়েছেন সার! একটা মিসহ্যাপ হয়েছে!

 

মিসহ্যাপ? কোথায়?

 

আপনাদের পাশের স্যুইটের ভদ্রমহিলার ডেডবডি পাওয়া গেছে। ধারানগরের কাছে জেলেরা দেখতে পেয়েছিল। সিদ্ধেশ নির্বিকার মুখে বলল। তারপর একটু হাসল। হনিমুনারদের মধ্যে খারাপ লোক তো থাকে সার!

 

চমনলাল কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শক্ত হয়ে গেলেন। আস্তে বললেন, ভদ্রমহিলার স্বামী?

 

তার পাত্তা নেই। ম্যানেজারসাবের সঙ্গে পুলিশ এসেছিল একটু আগে। ওঁদের স্যুইট সিল করে গেছে পুলিস।

 

কী নাম ভদ্রমহিলার?

 

ঋতুপর্ণা রায়। ওঁর স্বামীর নাম শোভন রায়।

 

হনিমুনাররা এ খবর শুনেছে?

 

জগদীশের কাছে শুনল। তারপর চুপচাপ নিজেদের স্যুইটে চলে গেল। সিদ্ধেশ আস্তে বলল, পুলিস আমাকে জেরা করেছিল। আমাদের স্টাফদের সবাইকে করেছে। আমরা কেউ কিছু জানি না। তবে পুলিস আবার আসতে পারে।

 

আমাদের জেরা করতে?

 

সম্ভবত।

 

চমনলাল নিচের তলায় তার স্যুইটের দিকে এগিয়ে গেলেন। করিডরে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে দেখা হল। কর্নেল বললেন, নমস্তে মিঃ লাল!

 

নমস্তে। চমনলাল একটু ইতস্তত করার পর বললেন, একটা মিসহ্যাপ হয়েছে। শুনলাম। সিদ্ধেশ বলল।

 

আপনারা কেমন ঘুরলেন বলুন?

 

একই জায়গা। তত কিছু নতুনত্ব দেখলাম না।

 

ডাইনোসরের ছবি তো নতুনত্ব, মিঃ লাল!

 

আমি দেখতে যাইনি। পাহাড়ে ওঠার ক্ষমতা আমার নেই। সস্ত্রীক নিচে অপেক্ষা করছিলাম। চমনলাল পা বাড়াতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন! কর্নেলসাব! শুনলাম পুলিস একদফা লজের কর্মচারীদের জেরা করে গেছে। আপনাকেও নিশ্চয় করেছে?

 

করেছে মিঃ লাল! পুলিস আবার আসবে। অবশ্য লাঞ্চের আগে কাকেও ডিসটার্ব করবে না। আর কাকেও লজ ছেড়ে যেতে নিষেধ করেছে পুলিস। জরুরি কারণ থাকলে অনুমতি নিতে হবে। সাদা পোশাকে দুজন অফিসার লাউঞ্জে বসে আছেন।

 

সিদ্ধেশ তো বলল না কিছু! অবশ্য লাউঞ্জে দুজন লোককে বসে থাকতে দেখলাম। আজকালকার তরুণরা সবকিছুতে নির্লিপ্ত থাকতে চায়?

 

চমনলাল একটু দ্বিধার পর বললেন, মেয়েটিকে কি কেউ ধাক্কা মেরে জলে–

 

নাহ্ মিঃ লাল! তার মাথার পিছনে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা হয়েছে। তারপর বড়ি নদীতে ফেলে দিয়েছে হত্যাকারী।

 

ও মাই গড! তা হলে–পুলিস হনিমুনারদের স্যুইট সার্চ করবে। তাই না?

 

করা তো উচিত।

 

চমনলাল নড়ে উঠলেন। খুব আস্তে বললেন, আমার স্যুইটে আসুন দয়া করে। আমি দায়িত্বশীল নাগরিক। আপনার সঙ্গে কিছু গোপনীয় আলোচনা আছে। আসুন!..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *