তিন
ধারিয়া জলপ্রপাতের একধারে ঝকড়া মহুয়া গাছের তলায় হনিমুনাররা ব্রেকফাস্ট করছিল। অনির্বাণ রুদ্রের আয়োজন ছিল তাক লাগানো। স্যান্ডউইচ, সেদ্ধ ডিম, কলা আর আপেল। আসার পথে শালপাতার ছাউনি দেওয়া এক আদিবাসীর দোকানে প্রচুর তেলেভাজা কেনা হয়েছিল। এখানে পৌঁছেই সেগুলো সাবাড় হয়েছে। বেলা নটায় এখন ব্রেকফাস্ট। দুটো বড় ফ্লাস্কভর্তি চা পেপার কাপে বিলি করছিল পায়েল। ততক্ষণে প্রপাত দেখতে আসা আরও মানুষের ভিড় বেড়েছে। কয়েকটি পিকনিকপার্টিও এসে গেছে। টেপরেকর্ডার বাজাচ্ছিল তারা। তবে প্রপাতের প্রচণ্ড গর্জনে সব শব্দই চাপা পড়ছিল।
শ্রুতির হাবভাবে অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করেছিল পায়েল। সে একটু তফাতে দাঁড়িয়েছিল। পায়েল তাকে চা দিতে গিয়ে চোখে হেসে বলল, ফিরে গিয়ে সোমককে একটু ধাঁতানি দেব। তুমি জানো ও আমাকে ভয় পায়।
শ্রুতি অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু হাসল। কে কাকে ভয় পায় বলা কঠিন পায়েল। আমার ধারণা, তুমিই ওকে ভয় পাও।
কেন ভয় পাব শুনি?
তুমি গিয়ে ইনসিস্ট করলে ও নিশ্চয় আসত!
পায়েল চোখেমুখে কপট রোষের ভঙ্গি করল। বয়ে গেছে আমার! তোমার বর।
সত্যি কথাটা বলব পায়েল?
স্বচ্ছন্দে।
এখানে এসে সোমককে দেখে তুমি কেমন যেন নার্ভাস হয়ে পড়েছিলে! মডেলিংয়ে তোমার জুটি ছিল ও।
সোমককে দেখে আমি নার্ভাস হব কোন দুঃখে? হাসালে শ্রুতি! বরং তুমিই আমার বরকে দেখে–পায়েল চোখ নাচিয়ে সকৌতুকে চাপা স্বরে ফের বলল, শ্রুতি! লেটস্ হ্যাভ এ ফান। অনির্বাণের সঙ্গে একটু প্রেম-প্রেম খেলো না দেখি!
দেখ পায়েল, সবকিছুর একটা সীমা থাকা উচিত।
ও মা! তুমি যে রেগে গেলে মনে হচ্ছে!
শ্রুতি হেসে বলল। নাহ! রাগিনি। বরং তোমার বরকে পরীক্ষা করে দেখতে চাইলে কুমকুমকে অ্যাপ্রোচ করতে পারো। কাল রাতে কুমকুম তোমার বরের সঙ্গে নাচছিল।
নাহ্। কুমকুম বোকাসোকা মেয়ে। তা ছাড়া ওর মধ্যে তেমন কোনও চার্ম নেই।
আমার আছে?
আছে। পায়েল হেসে কুটিকুটি হল। কাল রাতে ডিনারের পর দেখি অনির্বাণ প্রায় ড্রাংক। কী বলছিল জানো? শ্রুতি একজন রং ম্যানকে বেছে নিয়েছে দেখে। ওর নাকি খারাপ লাগছে।
দীপক প্রপাতের ধারে একটা পাথরের ছোট্ট চাতালে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল। সেখান থেকে উঠে এসে বলল, পায়েলদি, বড্ড বেশি ভিড় হয়ে যাচ্ছে এখানে। চলুন! আমরা ডাইনোসরের ছবি দেখতে যাই।
ঠিক বলেছ। তবে তোমার বউয়ের দিকে লক্ষ্য রাখো। ওই দেখ কুমকুম আমার বরের সঙ্গে ভাব জমিয়েছে।
দীপক হেসে উঠল। তার চেয়ে ফানি ব্যাপার আপনার চোখে পড়ছে না পায়েলদি!
কী বলো তো?
চমনলালজি এ বয়সেও অসাধারণ রোমান্টিক। ওই দেখুন, উনি রজনী দেবীকে নিয়ে নিভৃতে প্রেমালাপ করছেন!
পায়েল চোখ পাকিয়ে বলল, ইউ নটি বয়! গুরুজনদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে নেই।
চমনলালজি ঠিক গুরুজনটাইপ নন! আপনার সঙ্গে কেমন জমিয়ে নাচছিলেন!
তোমার সঙ্গেও নাচতে আমার আপত্তি ছিল না!
দীপক শ্রুতির দিকে তাকাল। আপনার শরীর খারাপ নাকি শ্রুতিদি?
পায়েল বলল, না। মন খারাপ! সোমক এল না! তো দীপক তুমি শ্রুতির মন ভালো করে দাও। আমি তোমার কচি বউকে প্রোটেকশন দিই ততক্ষণ।
পায়েল অনির্বাণের কাছে গেল। দীপক বলল, পায়েলদি অদ্ভুত মহিলা! সবসময় হাসিখুশি এবং স্মার্ট থাকতে পারেন। তা শ্রুতিদি, সত্যি আপনাকে যেন মনমরা দেখাচ্ছে।
শ্রুতি উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, শি ইজ ওভারস্মার্ট। আপনি জানেন কি না জানি না ও মডেলিং করত বিজ্ঞাপনে। এখন করে কি না জানি না।
শ্রুতিদি! আমাকে তুমি বললে ভালো লাগবে।
শ্রুতি আস্তে বলল, আচ্ছা দীপক, আমাদের হনিমুনারদের মধ্যে আমার হাজব্যান্ড ছাড়া আরও দুজন এখানে আসেনি লক্ষ্য করেছ?
হ্যাঁ। কিন্তু ওঁরা তো আমাদের সঙ্গে মেশেননি। কোথা থেকে এসেছেন– নামটাম কিছুই জানি না। কাল রাতে লক্ষ্য করেছি, ওঁরা চুপচাপ লাউঞ্জে বসে ছিলেন। দীপক সঙ্কোচের সঙ্গে বলল, আমি কিন্তু আপনার সামনে স্মোক করছি। কিছু মনে করবেন না যেন।
মনে করার কী আছে? শ্রুতি ঠোঁটের কোণে হাসল। তুমি আমার সামনে ড্রিঙ্ক করেছ। নেচ্ছে। স্মোকও করেছ। এখন হঠাৎ এ কথা কেন?
ওঃ শ্রুতিদি! সে তো পার্টিতে। এখানে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে একটু ভদ্রতা মেনে চলতে হয়।
ভ্যাট। আমি ওসব মানি না। তুমি দেখে থাকবে আমার হাজব্যান্ড চেইন স্মোকার।
দীপক সিগারেট ধরাল। তারপর বলল, অনির্বাণদা তো আপনার পরিচিত?
হ্যাঁ। আমার দাদার বন্ধু। সেই সূত্রে চেনাজানা আছে। কেন এ কথা?
ওঁকে কোথায় যেন দেখেছি, ঠিক মনে করতে পারছি না।
কথাটা ওঁকেই জিজ্ঞেস করতে পারো।
দীপক প্রপাতের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ বলল, আরে! দেখুন তো শ্রুতিদি, সেই ভদ্রলোক কি না? কাল রাতে ককটেলপার্টির সময় লাউঞ্জের এক কোণে সস্ত্রীক বসে ছিলেন। হা–মনে হচ্ছে তিনিই বটে!
কোথায়?
ফলসের ওপরে পাথরের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন।
শ্রুতি দেখে নিয়ে বলল, হ্যাঁ। তিনিই মনে হচ্ছে।
কিন্তু একা!
ওঁর স্ত্রী আশেপাশে কোথাও আছেন নিশ্চয়।
উনি চলে গেলেন হঠাৎ! ওঁর মিসেসকে কোথাও দেখছি না।
শ্রুতি একটু হাসল। কাউকে খুঁজতে এসেছিলেন সম্ভবত! ম্যানেজার রঘুবীর বলছিলেন না? হনিমুনাররা অনেক সময় বউকে হারিয়ে ফেলে!
ভদ্রলোক খুব রসিক। গত অক্টোবরে বউবদলের গল্পও বলছিলেন।
এই সময় অনির্বাণ মুখের কাছে দু হাতে চোঙ বানিয়ে চিৎকার করে বলল, হারি আপ ফ্রেন্ডস। এবার আমরা ডাইনোসর দেখতে যাব।
শ্রুতি নড়ে উঠল। মাই গুডনেস! ক্যামেরার কথা ভুলেই গেছি। এক মিনিট। কয়েকটা ছবি তুলে নিই।
সে ক্যামেরা তৈরি করে জলপ্রপাতের কয়েকটা ছবি তুলল। তারপর বলল, দীপক! তুমি আমার জন্য প্লিজ একবার শাটার টেপো! আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি। দেখবে, ছবিতে যেন আমি একা থাকি। ব্যাকগ্রাউন্ডে ফস্। আর ওই ওপরের টিলার গাছটা।
দীপক ক্যামেরা নিল। শ্রুতি পোজ দিয়ে দাঁড়াল। জোরে হাওয়া দিচ্ছিল। ছবি তুলে দীপক বলল, আমার ক্যামেরা কুমকুমের কাছে। আসলে ভিড়ভাট্টা দেখে ছবি তুলতে ইচ্ছে করছিল না। এক মিনিট! ওকে ডাকি।
শ্রুতি বলল, কেন? আমি তোমার ছবি তুলে রাখছি! ঠিকানা দিলে পাঠিয়ে দেব। নাকি বউকে পাশে নিয়ে ছবি তুলবে?
থাক। অনির্বাণদা তাড়া দিচ্ছেন।
শুতি দ্রুত দীপককে ক্যামেরাবন্দি করল। তারপর বলল, ওই দেখ, তোমার বউয়ের হাত ধরে অনির্বাণদা নিয়ে যাচ্ছেন। সীতাহরণের সিন! তাই না?
দীপক জিভ কেটে বলল, ছিঃ! অনির্বাণদা রাবণ নন।
শ্রুতি পা বাড়িয়ে বলল, সাবধান দীপক! কচি বউটিকে হারিয়ে ফেলো না।
দীপক হাসতে হাসতে ওকে অনুসরণ করল। অনির্বাণ লম্বা পা ফেলে পাথরের ধাপ ডিঙিয়ে উঠছে। কুমকুমের একটা হাত তার হাতে। কুমকুম একটু নাকাল হচ্ছিল অবশ্য। পায়েল চমনলাল দম্পতিকে পাকড়াও করে নিয়ে যাচ্ছিল। চমনলালজি হঠাৎ ঘুরে এসে ব্রেকফাস্টের আবর্জনাগুলো কুড়িয়ে একটা আবর্জনা-পাত্রে ফেলে দিলেন। পাত্রটা একটা বড় ড্রাম। সেটার গায়ে লেখা আছে, প্লিজ ইউজ মি!
দীপক গিয়ে বলল, সরি চমনলালজি! আমাদের খেয়াল ছিল না!
চমনলাল সহাস্যে বললেন, নেভার মাইন্ড! আপনারা চলুন! ধাপ বেয়ে উঠতে আমি একটু সময় নেব। রজনী! তুমি এগোও!
রজনী দেবী মুচকি হেসে ডাকলেন, পায়েল! তুমি আমার হাজব্যান্ডকে রাতারাতি যুবক করে তুলেছিলে। আবার ও বৃদ্ধ হয়ে গেছে। ওকে সামলাও।
পায়েল রজনী দেবীর হাত ধরে টানল। চলে আসুন দিদি! আমরা ওঁকে ফেলে গেলে উনি আবার যুবক হতে বাধ্য হবেন।
রজনী দেবী স্বামীকে বলে গেলেন, তুমি ভালো করে হাত ধুয়ে নেবে কিন্তু। আবর্জনা ঘেঁটেছ।
ওপরের দিকটায় বিশাল বিশাল গাছ। তার ভেতর একটা পুরনো সরকারি বাংলো। দেখতে হানাবাড়ির মতো। প্রাঙ্গণে আগাছার সঙ্গে ফুলের ঝোপ মিশে আছে। একপাশে মোরাম রাস্তায় জিপটা দাঁড়িয়ে আছে। অনির্বাণ ড্রাইভারকে খুঁজছিল। কুমকুম দীপককে বলল, জানো না তুমি কী মিস করলে!
দীপক কিছু বলার আগেই শুতি বলল, তোমাকে মিস করল বেচারা!
না শ্রুতিদি! অনির্বাণদা বলছিলেন, এই পোড়ো বাংলোয় ভূত আছে। এখানে আমরা একটা রাত কাটিয়ে গেলে দারুণ হয়। তাই না?
দীপক বলল, তার চেয়ে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের মধ্যে একটা করে ভূত খুঁজলে পেয়ে যাব!
তার মানে? কুমকুম ভুরু কুঁচকে তাকাল। তোমার কথাবার্তা মাঝেমাঝে অদ্ভুত লাগে।
শ্রুতি বলল, কুমকুম! তোমার বর একটু জেলাসটাইপ। জানো? আমি ওকে করতলগত করতে চাইছিলাম। বাট আই ফেল্ড।
কুমকুম বলল, লক্ষ্য করেছি আপনি দীপকের ছবি তুলছিলেন।
এবং দীপক আমার।
বলে শ্রুতি দীপকের কাঁধে হাতের চাপ দিল। আস্তে বলল, বড্ড শক্ত। হজম করা যাবে না। কিন্তু সাবধান! পায়েলদি একে–
পায়েল জিনিসপত্র গুছিয়ে জিপে তুলছিল। তার কথার ওপর বলল, শ্রুতি! আমার নামে কী যেন রটাচ্ছ! ওদিক থেকে বাতাসে ভেসে আসছে।
এই সব হাসিপরিহাসের মধ্যে চমনলালজি এসে গেলেন। মুখটা বেজায় গম্ভীর। দীপক বলল, আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে লালজি।
চমনলাল বললেন, আমার ছড়িটা আনতে ভুলে গেছি। খেয়াল থাকে না। বছর বছর আমার শরীরের শক্তি কমে যাচ্ছে। যাই হোক, গুহাচিত্র দেখতে গেলে আর দেরি করা ঠিক নয়। বেলা যত বাড়বে, হুজুগে লোকেদের ভিড় তত বেড়ে যাবে।
অনির্বাণ জিপের ড্রাইভারকে এতক্ষণ খুঁজে পেয়েছিল। সে জৈবকৃত্যে গিয়েছিল। নীচের দিকে প্রপাত যেখানে একটা হ্রদ সৃষ্টি করেছে, সেদিক থেকে ঝোপঝাড় ঠেলে সে বেরিয়ে আসছিল। হ্রদের দুই তীরই দুর্গম এবং ঘন জঙ্গলে ঢাকা। অনির্বাণ রসিকতা করে বলল, রাম সিং! আমি ভাবছিলাম তুমি বাঘের পাল্লায় পড়েছ।
ড্রাইভার রাম সিংকে কেমন হতচকিত দেখাচ্ছিল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, বড়াসাব! আমার মনে হচ্ছে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
অ্যাকসিডেন্ট! কী অ্যাকসিডেন্ট?
কথাটা কানে যেতেই হনিমুনাররা তার কাছে এগিয়ে এল। রাম সিং নার্ভাস মুখে বলল, আমার চোখের ভুল হতেও পারে। তবে আমি যেন একটা লাশ দেখতে পেলাম। ফলসের দিক থেকে এসে লেকের মধ্যে একটা পাথরে আটকেছিল। তারপর ভেসে গেল।
সবাই হইচই করে বলল, কোথায়? কোথায়?
রাম সিং আঙুল দিয়ে নীচে যেদিকটা দেখাল, সেখানে ঘন জঙ্গল। লেকটা দেখা যায় না। দীপক বলল, কই! চলো তো দেখি!
অনির্বাণ বলল, দীপক! আমরা এখানে দুর্ঘটনা দেখতে আসিনি। শুনেছি, ফলস্ দেখতে এসে অত্যুৎসাহী কেউ পা হড়কে পড়ে যায়। তো যদি কেউ পড়ে গিয়ে থাকে, সে আমাদের দলের কেউ নয়। তাছাড়া এসব ব্যাপারে আমাদের জড়িয়ে পড়াটা ঠিক নয়।
পায়েল বলল, অনির্বাণ ঠিক বলেছে। হনিমুন এবং সাইটসিইংয়ে এসে অন্য কোনও ব্যাপারে নাক গলানো উচিত হবে না।
রজনী দেবী বললেন, রাম সিং! তুমি কি ঠিক দেখেছ?
রাম সিং বিব্রতভাবে বলল, আমার মনে হল মাঈজি!
পুরুষ না মেয়ের লাশ?
চমনলাল একটু চটে গিয়ে বললেন, রাম সিং নিশ্চিত নয়। যা দেখেছে, তা লাশ না অন্য কিছু
তাঁর কথার ওপর অনির্বাণ তাড়া দিয়ে বলল, জিপে ওঠ সবাই। আমাদের প্রোগ্রাম ভেস্তে যাওয়া ঠিক নয়। হারি আপ!
চুপচাপ দলটি জিপে উঠল। অনির্বাণ এবং চমনলাল সামনে বসলেন আগের মতো। বাকি সবাই পেছনে। জিপ স্টার্ট দিলে শ্রুতি বলল, ফসের ওপর থেকে কেউ পড়ে গেলে আমরা টের পেতাম। আরও কত লোক তো ছিল। কারও চোখে পড়ত। হইচই শুরু হত। তাই না পায়েলদি?
পায়েল বলল, ছাড়ো তো! রাম সিং কী দেখতে কী দেখেছে।
কুমকুম বলল, ডাইনোসরের গুহাটা কত দূরে?
রজনী দেবী একটু হাসলেন। কাছেই। তবে গুহায় ডাইনোসর নেই। ছবি আছে নাকি। আমার স্বামীকে প্রাচীন ইতিহাস ভূতের মতো পেয়েছে। উনি কাগজওয়ালাদের খবর নিয়ে মাথা ঘামান। সরেজমিন পরীক্ষা করতে ছোটেন। বাতিক!
পায়েল বলল, আমার ধারণা কেউ চালাকি করে সম্প্রতি ছবিটা এঁকে রেখেছে।
কুমকুম সায় দিয়ে বলল, সোমবাবু ঠিক একথাই বলছিলেন। তাই না শ্রুতিদি?
শ্রুতি কিছু বলল না। পায়েল বলল, শ্রুতি! তোমরা কি ঝগড়াঝাটি করেছ?
রাস্তা বলতে কিছু নেই। তাই জিপটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগোচ্ছিল। শ্রুতি পায়েলের দিকে তাকাল। কিন্তু টালমাটাল অবস্থার দরুন তার কথা বলতে ইচ্ছে করল না। এক জায়গায় জিপ এমনভাবে কাত হল যে টাল সামলাতে সে দীপককে আঁকড়ে ধরল। জিপ আবার সোজা হলে পায়েল বলল, কুমকুম! এবারও একটা বউবদলের চান্স আছে। তোমার. বর সম্পর্কে সাবধান কিন্তু!
শ্রুতি চটে গিয়ে ইচ্ছে করেই দীপকের কাঁধে হাত রাখল। এই সময় জিপটা থেমে গেল। রাম সিং বলল, এখানেই নেমে হেঁটে যেতে হবে সাব! আর গাড়ি চলার রাস্তা নেই।
অনির্বাণ নামল। তারপর চমনলালজি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে নেমে দাঁড়ালেন। পেছন থেকে হনিমুনাররাও নেমে দাঁড়াল। পায়েল বলল, কোথায় সেই গুহা?
সামনে উঁচু পাহাড়। কোনওটা ঘাসে বা জঙ্গলে ঢাকা, কোনওটা নগ্ন। চমনলাল পকেট থেকে খবরের কাগজের একটা কাটিং বের করে মিলিয়ে দেখছিলেন। একটু পরে বললেন, একটা ম্যাপ ছেপেছিল সানডে এক্সপ্রেস। কিন্তু এটা থেকে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। রাম সিং! তুমি তো স্থানীয় লোক। ছবি আঁকা গুহাটা কোথায় জানো?
রাম সিংকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। সে আস্তে বলল, আমার মালিক গত মাসে এসেছিলেন সার! আমি ওঁর সঙ্গে যাইনি। আর একটা কথা স্যার! এসব পাহাড়ে অজগর সাপের উপদ্রব আছে।
অনির্বাণ একটু এগিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে বলল, রমেশ পাণ্ডেও বলছিলেন পাইথনের কথা। কিন্তু ওঁর কথামতো গুহাটা সহজেই চোখে পড়ে। কারণ গুহামুখে সব জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। এক মিনিট। আমি খুঁজে বের করছি।
পায়েল মুখে আতঙ্ক ফুটিয়ে বলল, পাইথন সাপ নাকি সাংঘাতিক। মানুষ গিলে খায়। তোমরা যে যাবে যাও। আমি যাচ্ছি না।
অনির্বাণ তার কাঁধে ঝোলানো কিটব্যাগ থেকে একটা ভিউফাইন্ডার বের করে পাহাড়গুলো দেখছিল। হঠাৎ বলল, একটা লোক কাঠের বোঝা মাথায় নেমে আসছে। ওকে জিজ্ঞেস করা যাক।
সবাই মিলে লোকটার প্রতীক্ষা করতে থাকল। লোকটাকে খালি চোখে দেখা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পরে সামনেকার টিলার জঙ্গল থেকে সে বেরিয়ে এল। একজন আদিবাসী প্রৌঢ়। তার মাথায় চেলাকাঠের বোঝা। কাঁধে একটা কুড়ুল। সে দলটিকে দেখে থমকে দাঁড়াল।
অনির্বাণ হিন্দিতে বলল, এই যে ভাই। ওখানে একটা গুহায় ছবি আঁকা আছে। তুমি গুহাটা চেনো?
লোকটা ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে বলল, ওটা আমাদের দেবতার থান সায়েব! আমরা ওখানে আর কাকেও যেতে দিচ্ছি না। তবে আপনারা টাকাকড়ি দিলে অন্য কথা।
অনির্বাণ বলল, নিশ্চয় দেব। কত দিতে হবে বলো?
লোকটা গম্ভীর মুখে বলল, ওই যে পিপুলগাছ দেখছেন, ওখানে আমাদের সর্দার বসে আছে। তার সঙ্গে কথা বলুন।
পিপুলগাছটা সামনেকার টিলার গায়ে এবং সেখানে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের ফাঁকে ঝোপ গজিয়ে আছে দলটি উৎসাহে এগিয়ে চলল। রাস্তা নেই। রজনী দেবী তার স্বামীকে বললেন, তুমি কি উঠতে পারবে? ছড়িটা তো ফেলে এসেছ!
শুনতে পেয়ে অনির্বাণ বলল, আমি একটা ডাল ভেঙে ছড়ি বানিয়ে দিচ্ছি।
চমনলাল বললেন, না। দরকার হবে না। আপনারা এগোন। আমি আস্তে সুস্থে এগোচ্ছি। তারপর একটু হাসলেন বৃদ্ধ ঐতিহাসিক। এবার আমি কিন্তু আমার স্ত্রীকে পাশে রাখতে চাই।
সবাই হেসে উঠল। রজনী দেবী বললেন, গুহাচিত্র স্বচক্ষে দেখার কী দরকার? এরা ক্যামেরা এনেছে। তুমি ছবি পেয়ে যাবে।
অনির্বাণ একটা পাথরে উঠে বলল, হারি আপ! লাঞ্চের আগে ফিরতে হবে, মাইন্ড দ্যাট!
ওরা তাকে একে-একে অনুসরণ করল। ঝোপজঙ্গলের আড়ালে দলটি অদৃশ্য হওয়ার পর রজনী দেবী বললেন, তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে লাল!
চমনলাল খুব আস্তে বললেন, রজনী! ড্রাইভার রাম সিং বলছিল লেকে একটা লাশ দেখেছে। এদিকে আমি আবর্জনার পাত্রে একটা সাংঘাতিক জিনিস কুড়িয়ে পেয়েছি!
রজনী ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। চমকে উঠে বললেন, কী?
চমনলাল একটু তফাতে জিপের দিকে তাকিয়ে রাম সিংকে দেখে নিলেন। সে জিপের গায়ে হেলান দিয়ে খৈনি ডলছে। চমনলাল বললেন, পেপারকাপগুলো ফেলতে গিয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম খেলনা। কিন্তু সন্দেহ হল। তুলে নিয়ে বুঝলাম খেলনা নয়।
আহ! জিনিসটা কী?
একটা ছোট্ট ফায়ার আর্মস। ওজন আছে।
সর্বনাশ! এখানে ফায়ার আর্মস ফেলল কে?
চমনলাল বললেন, এদিকে এস। আড়ালে বসে পরীক্ষা করে দেখি। ফায়ার আর্মস সম্পর্কে আমার কিছু জ্ঞান আছে।
দুজনে একটা ঝোপের ধারে গেলেন। চারদিক দেখে নিয়ে চমনলাল কোটের ভেতর পকেট থেকে রুমালে জড়ানো আগ্নেয়াস্ত্র বের করলেন। বললেন, আঙুলের ছাপ যাতে না পড়ে তাই রুমাল দিয়ে তুলে নিয়েছিলাম।
রুমালে আঙুল জরিয়ে বুলেটকেস খুলে চমলাম বললেন, সিক্স রাউন্ডার পয়েন্ট টোয়েন্টিটু ক্যালিবার রিভলবার একটা বুলেট ফায়ার করা হয়েছে। ও মাই গড, রাম সিং তা হলে ঠিকই দেখেছে!
রজনী দেবী ভয়-পাওয়া গলায় বললেন, ওটা এখনই কোথাও ফেলে দাও!
নাহ! আমার নাগরিক দায়দায়িত্ব আছে। তুমি জানো আমি কেমন মানুষ।
কিন্তু এটা মার্ডার-উইপন লাল!
সেইজন্যই এটা গুরুত্বপূর্ণ। তুমি সতর্ক হও! কোনওভাবে মুখ ফসকে যেন–
না না! রজনী দেবী দ্রুত বললেন। কিন্তু তুমি এখনই ওটা লুকিয়ে ফেলো।
