হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ফকিরসাহেবের কেরামতি
বিকেলে আমরা আবার চলেছি মাহেনজোদাড়োর দিকে। এবার সঙ্গে রীতিমতো মিলিটারি কনভয়। চারটে ট্রাকভর্তি মিলিটারি সামনে ও পিছনে যেন আমাদের জিপটাকে গার্ড দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ তো দেখছি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে যাওয়ার মতো। আমার অস্বস্তি বেড়ে যাচ্ছিল।
আমাদের জিপে আছেন আর পাঁচজন। কর্নেল, আমি এবং ডঃ তিড়কে বসেছি পেছনে। কর্নেল কামাল খাঁ জিপ চালাচ্ছেন। তাঁর পাশে বসেছেন ডঃ করিম। বুঝতে পারছি, ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার কড়া আয়োজন করা হয়েছে।
ভারতের অন্যান্য প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা আজ মোহেনজোদাভোর সাত মাইল দূরে একটা বৌদ্ধস্তূপ দেখতে গেছেন। সহকারী নেতা ডঃ দীনবন্ধু আচার্য তাদের নেতা হয়েছে। কারণ মূল নেতা ডঃ তিড়কে আমাদের সঙ্গে এসেছেন।
মোহেনজোদাভোর কাছাকাছি এসে আমাদের জিপ একটা এবড়োখেবড়ো বাজে রাস্তার দক্ষিণে এগোল। বাঁদিকে অজস্র ন্যাড়া টিলার আড়ালে সিন্ধু নদ দেখা যাচ্ছে মাঝে-মাঝে। ডানদিকে রুক্ষ ধু-ধু মরুভূমি বলাই চলে-বালি, পাথর আর কঠিন মাটির দেশ। ছোট-ছোট কাঁটাগাছ আর ক্কচিৎ ঝোঁপঝাড় আছে। সেইসব ক্ষয়াখবুটে ঝোঁপের পাতা মুড়িয়ে খাচ্ছে মস্ত-মস্ত ছাগল আর তাগড়াই গড়নের দুম্বা নামে এক জাতের ভেড়া। কোথাও উটের পিঠে জিনিসপত্র চাপিয়ে দড়ি ধরে ধীরে-সুস্থে চলেছে কোনো মানুষ। মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, হাতে একটা লম্বা বর্শা। একখানে জিপসিদের ছোটখাটো একটা দলকে দেখলুম তবু পেতে রান্নাবান্না করছে। ওখানে একটা কুয়ো আছে। একদল ছাগল ভেড়াকে লাইন দিয়ে চৌবাচ্চা থেকে জল খাওয়াচ্ছে রাখালরা। জিপসি মেয়েরা চাকা ঘুরিয়ে জল তুলছে আর অকারণে হাসাহাসি করছে। আমাদের মিলিটারি গাড়িগুলো দেখে কিছুক্ষণ যেন ওরা সবাই ভয় পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
এবার সত্যি বলতে কী কোনো পথই নেই। অসমতল প্রান্তর ও বালিয়াড়ি পেরিয়ে কনভয় চলেছে। ধুলোর মেঘ চলেছে আমাদের সঙ্গে। দম আটকানো অবস্থা।
কর্নেল ও ডঃ তিড়কে চাপাগলায় কী সব আলোচনা করছেন। মাঝে মাঝে পিছু ফিরে সামনের সিট থেকে ডঃ করিমও তাতে যোগ দিচ্ছেন। কিছু বুঝতে পারছি না–শুধু ‘হিটাইট’ শব্দটা বাদে।
এদিকে ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছি সবাই। বড্ড বিরক্তিকর লাগছিল যাত্রাটা। একসময় কর্নেলের উদ্দেশে না বলে পারলুম না, আর কতদূর?
সামনে থেকে ডঃ করিম জবাব দিলেন,–এসে পড়েছি।
সামনে বাঁদিকে সিন্ধুনদ দেখা যাচ্ছিল। ঘড়িতে তখন ছটা বাজে। সূর্য অস্ত যেতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরি আছে। কিন্তু এবার আর ধুলো নেই। মাটি শক্ত। হলদে ঘাসের চাবড়া গজিয়েছে। তারপর একটা দুটো করে গাছও নজরে পড়তে থাকল। আমরা সিন্ধুনদের প্রায় কিনারা ধরে চলেছি এখন।
কোথাও কোনো বসতি দেখতে পেলুম না। তবে আরও দূরে দক্ষিণে দিগন্তের কাছে সবুজ রং দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলুম,–ওটা কী?
ডঃ করিম বললেন,–ওটা সেচ এলাকা। ওখানে সরকারি কৃষিক্ষেত্র আছে।
বাঁয়ে অনেকগুলো টিলা সিন্ধুনদের ধারে সার বেঁধে চলে গেছে সবুজ কৃষিক্ষেত্রের দিকে। ডাইনেও তেমনি টিলার সারি আছে। এখানে অজস্র কাটাগুল্মের জঙ্গল গজিয়ে রয়েছে। আর তারমধ্যে একটা করে চ্যাপ্টা পাথর পোঁতা আছে দেখলুম। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, ওগুলো কোন্ যুগের গোরস্থান। প্রাগৈতিহাসিক যুগের তো বটেই। ওই পাথরগুলো নাকি এই এলাকার এক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে খুব পবিত্র। তারা প্রতি বছর শীতের শুরুতে এসে ওখানে পুজো আচ্চা করে। ভেড়া বলি দেয়। মেলা বসে তখন। অনেক পর্যটক দেখতে আসে। শুনলুম, জায়গাটার নাম দুহালা। নামটা অদ্ভুত লাগল। কতকটা বাংলা-বাংলা নাম যেন!
এখানেই আমাদের কনভয় থামল। আমরা জিপ থেকে নামলুম। কর্নেল কামাল খাঁ মিলিটারি সেপাইদের দুর্বোধ্য ভাষায় কী সব আদেশ দিলেন। তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সিন্ধুনদের ধারে টিলাগুলোর দিকে চলে গেল। কয়েকজন সেপাই সাবমেসিনগান নিয়ে পাহারায় রইল গাড়িগুলোর কাছে।
ফ্লাস্কে আনা চা খাওয়া হল ঘাসে বসে। আলোচনা শুরু হল তার ফাঁকে-ফাঁকে। সামনে একটা ম্যাপও রাখা হল। ওঁরা ঝুঁকে পড়লেন ম্যাপটার দিকে। আমি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।
একসময় অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়ালুম। সেই প্রাগৈতিহাসিক গোরস্থানে গিয়ে চ্যাপ্টা পাথরগুলো দেখতে লাগলুম। প্রতিটি পাথর মাটির ওপর অন্তত ছ’সাতফুট লম্বা। তার গায়ে দুর্বোধ্য কী যেন লেখা আছে।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল, পূর্বভারতে মেঘালয় এলাকায় এমন অনেক গোরস্থান দেখেছিলুম বটে। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি যাবার পথে একটা দেখেছি। আরও নানা জায়গায়। ওগুলো খাসি জাতির লোকদের কাছে খুব পবিত্র। ওরাও পুজো-আচ্চা করে সেখানে গিয়ে।
আমার পিছনে জুতোর শব্দ হচ্ছিল। ঘুরে দেখি, আমার বৃদ্ধ বন্ধুটি আসছেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। –হ্যাল্লো খুদে পণ্ডিত! নতুন কিছু আবিষ্কার করলে নাকি?
–চেষ্টা করছি।
–কিন্তু সাবধান, এখানে বিস্তর ভূত আছে। ঘাড় মটকে দেবে।
বুড়োর কথায় না হেসে পারা যায় না। হাসতে-হাসতে বললুম,–আপনারা কি সেইসব ভূতের সঙ্গে লড়াই করতে সেপাইসাথ্রি গোলাগুলি নিয়ে এসেছেন?
–তুমি ঠিকই ধরেছ, জয়ন্ত।
–আর কিষাণচাঁদ ডাকু বুঝি ওদেরই সর্দার।
–বাঃ! তা হলে তোমার বুদ্ধি খুলে গেছে!
–কিন্তু কর্নেল, আগেভাগে বলে দিচ্ছি, ওসব গোলাগুলির মধ্যে আমি নেই।
আমার মুখের কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে সিন্ধুনদের ধারে টিলাগুলোর দিকে পৃথিবী কাঁপানো একটা আওয়াজ হল। তারপর দেখলুম, কিছুটা দূরে প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং তার সঙ্গে বড় বড় পাথরের টুকরো আকাশে ছড়িয়ে গেল। পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠেছিল। কী সাংঘাতিক ওই বিস্ফোরণ!
কর্নেল চাপা গলায় বললেন,–ডিনামাইট দিয়ে টিলাটা উড়িয়ে দিল বুঝি!
উত্তেজিতভাবে বললুম,–কারা ডিনামাইট চার্জ করল কর্নেল?
–আবার কারা? কিষাণচাঁদরা।
–কেন বলুন তো?
–একটা গুহায় ঢোকার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না, তাই পাহাড় উড়িয়ে দিয়ে সে গুহার পথ আবিষ্কার করতে চায়।
–কী আছে সে গুহায়?
-জানি না। শুধু এইটুকুই জানি, কিষাণচাঁদ মশাই ধুরন্ধর লোক এবং সে আমাদের টেক্কা দিতে পেরেছে। সম্ভবত সে অসাধারণ পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিতের সাহায্য নিয়েছে।
–ডাকুকে কোন পণ্ডিত সাহায্য করতে যাবেন?
কর্নেল জবাব না দিয়ে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।–চলে এসো জয়ন্ত। আমরা এবার রওনা দেব।
ওঁর সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে দেখলুম, ডঃ তিড়কে এবং কর্নেল কামাল খাঁ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। এবার দলবেঁধে সবাই দ্রুত টিলাগুলোর উপর দিয়ে এগিয়ে চললুম।
একটা টিলার উপর পোঁছে বড় পাথরের আড়ালে সব বসে পড়লুম। উঁকি মেরে দেখে অবাক হয়ে গেলুম। নীচে সিন্ধুনদ দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হবে সমুদ্র যেন। কূল-কিনারাহীন। তবে জায়গায় জায়গায় অনেক বালিয়াড়ি দ্বীপের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। সেই চাতালে জনাপাঁচেক সশস্ত্র লোক একজন আলখাল্লাধারী ফকিরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
ফকির আর কেউ নন, আমার প্রাণদাতা সেই সাধকপুরুষ এবং বাঙালি পণ্ডিত ডঃ আমেদ!
কর্নেলের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। ফিসফিস করে বললেন,–যা আশঙ্কা করেছিলুম, তাই ঘটেছে। ফরিসাহেব কিষাণাদের পাল্লায় পড়েছেন।
ডঃ করিম বললেন,–মুক্তি পেয়েই উনি গা ঢাকা দিয়েছিলেন। অনেক খুঁজে আর পাত্তা পেলুম না। কিন্তু ভাবিনি যে উনি বোকার মতো আবার এখানে এসে পড়বেন।
ওঁকে থামিয়ে দিলেন কর্নেল কামাল খাঁ। ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে ইশারা করলেন। সেই সময় দেখলুম, মিলিটারি সেপাইরা বুকে হেঁটে চাতালটার দুদিক থেকে পাথরের আড়ালে এগুচ্ছে। আমার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। নির্ঘাত প্রচণ্ড লড়াই বেধে যাবে। তার মধ্যে ফকিরসাহেব বিপন্ন হয়ে পড়বেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই কর্নেল কামাল খাঁ পাঠান বলেই বুঝি এত গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ।
কিন্তু তারপরই আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, সেপাইরা চাতালের তলায় গিয়ে ঢুকল। এবং ফকিরসাহেব দুহাতে বার কতক তালি বাজালেন। আকাশের দিকে মুখ।
তারপর সিন্ধুনদের দিকে ইশারা করে কিছু বললেন। সশস্ত্র লোকগুলো সেদিকে তাকিয়ে কী দেখতে থাকল। তখন সদ্য সূর্যাস্ত হয়েছে। সিন্ধুর জলে রক্তিম ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। দেখতে-দেখতে সেই সিঁদুর গোলা জলের রঙ বদলাতে থাকল। এমন বিচিত্র দৃশ্য আমি দেখিনি। সোনালি-রূপালী পাখনা মেলে যেন অসংখ্য পরী স্নান করতে নেমেছে।
ব্যাপারটা বিস্ময়কর এজন্যে যে শুধু একটা জায়গায় ওই রঙের খেলা দেখা যাচ্ছে। লোকগুলো নিশ্চয় তাজ্জব হয়ে দেখছে। ফকিরসাহেব এবার সোজা দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে প্রার্থনা করছেন।
তারপর দেখলুম, ফকিরসাহেব প্রার্থনা শেষ করে কয়েকবার তালি দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পাথরের চাতালটার কিনারা থেকে মিলিটারি সেপাইরা আচমকা লাফিয়ে উঠল এবং লোকগুলোকে ঘিরে ফেলল।
লোকগুলো চমকে উঠেছিল। ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় প্রত্যেকে বন্দুক ফেলে দিয়ে দুহাত তুলে দাঁড়াল।
কর্নেল কামাল খাঁ দৌড়ে নেমে গেলেন। দুহাতে দুটো রিভলভার থেকে দুবার গুলি ছুঁড়তে ভুললেন না।
আমারও নীচে গিয়ে ব্যাপারটা মুখোমুখি দেখার ইচ্ছে করছিল। কিন্তু একটু নড়তেই কর্নেল চিমটি কেটে বসে থাকতে ইশারা করলেন।
কর্নেল কামাল খাঁ এবং তাঁর বাহিনী ডাকাতগুলোকে আগ্নেয়াস্ত্রের ডগায় রেখে চাতাল থেকে নামালেন। অপেক্ষাকৃত ঢালু পথটা দিয়ে ভেড়ার পালের মতো তাড়িয়ে নিয়ে চললেন। ফকিরসাহেব এবার আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
কর্নেল বললেন,–চলুন, এবার যাওয়া যেতে পারে।
আমরা চারজনে নীচে নেমে গেলুম। নামাটা সহজ হল না অবশ্য। পাথরে সাবধানে পা রেখে নামতে হল।
কাছে গিয়েই ডঃ করিম বুকে জড়িয়ে ধরেছেন ফকিরসাহেবকে। কর্নেল এবং ডঃ তিড়কে করমর্দন করলেন ওর সঙ্গে। আর আমি ওঁর পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকালুম। এই মানুষটি আমার প্রাণদাতা!
ফকিরসাহেব হাসতে হাসতে বললেন,–কেরামতিটা কেমন দেখালুম বলুন? সিন্ধুনদের ওই জায়গাটায় অদ্ভুত আলোর খেলা দেখা যায় সন্ধ্যার আগে। ন্যাচারাল ফেনোমেনা। ব্যাটাদের বললুম, ওই দ্যাখ–ওখানেই রাজা হেহয়ের গুপ্তধন পোঁতা আছে। ওরা বিশ্বাস করল। …
