হাঙরের পেটে হিরে (অর্জুন) – সমরেশ মজুমদার

শেয়ার করুনঃ

চার 

ঠিক আটটায় ওরা হোটেল ছেড়ে বের হল। কিছুদিন আগে একটা চমৎকার সামারজ্যাকেট কিনেছিল অর্জুন, মেজরের সঙ্গে, টাইম স্কোয়ারের একটা দোকান থেকে। সেটা চাপানোয় এখন গরম লাগছে। লস অ্যাঞ্জেলিসের আবহাওয়া পাজামা-পাঞ্জাবি পরার মতো। নিউইয়র্কের ভয়ংকর শীতের ছায়াও এখানে নেই। ওরা খানিকটা হাঁটতে মেজর লাঠিটা ঠুকে ফুটপাতের দিকে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। অর্জুন দেখল, ফুটপাতের ওপর পেতলের প্লেট সার-সার আটকানো। প্রতি প্লেটে এক-একজন বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রী অথবা পরিচালকের নাম খোদাই করা। ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্ক, ক্যাথরিন হেপবার্ন, গ্রেগরি পেক, রক হাডসন, গ্রেটা গার্বো থেকে শুরু করে চার্লি চ্যাপলিন, হিচকক, সর্বত্র ছড়িয়ে। এঁদের ওপর দিয়ে মানুষজন হেঁটে যায়। হাঁটার সময় প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হয়, এঁরা ছিলেন। হেনরি বললেন, ফুটপাতের প্লেটে নাম না-ওঠা পর্যন্ত হলিউডের শিল্পী-পরিচালকরা জাতে ওঠেন না। অর্জুনের খুব মজা লাগছিল। সে জানত, খোদ হলিউড এখান থেকে বেশি দূরে নয়। বস্তুত এখানেই তার কিছুটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ডানদিকে এক জাপানি বাজিকর বাজি দেখাচ্ছে টিকিট বিক্রি করে। প্রেক্ষাগৃহের সামনে জাপানিদের ভিড়। টেলিফোনের হুঁশিয়ারির কথাটা অর্জুন এখনও মেজরকে জানায়নি। জানালে উনি যেমন বুক চিতিয়ে, থ্রি পিস সুট পরে লাঠি ঝুলিয়ে হাঁটছেন, তেমন হাঁটতেন কিনা সন্দেহ। হেনরি ডিমকও বেশ সাজগোজ করেছেন।

 

সাহেব দারোয়ান সেলাম করে দরজা খুলে দিতেই একটা রেস্তোরাঁর ভেতর ঢুকে গেল ওরা। চোরা আলোর ব্যবস্থা থাকলেও টেবিলে টেবিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে খাবার সার্ভ করে এরা। কোণের দিকে একটা টেবিলে বসল ওরা। অর্জুনের মনে হল জায়গাটা বেশ অভিজাত। মেজর এবং হেনরি হলিউডের ইতিহাস নিয়ে গল্প করছেন। ব্যাপারটা সত্যিই মজাদার, কিন্তু অর্জুনের নজর চারপাশে ঘোরায় সে মন দিতে পারছিল না। মৃত্যু বারবার খালি হাতে ফিরে যায় না। যারা তাদের সব খবর রাখছে, তারা নিশ্চয়ই এখানে অনুসরণ করে এসেছে। কিন্তু এখানে এই অভিজাত জনসাধারণের মধ্যে কে তাদের লক্ষ করছে, তা ধরা শক্ত। সে চোখ ঘোরাতেই চমকে উঠল। ঠিক তাদের পাশের টেবিলে এক ভদ্রমহিলা একজন কিশোরের সঙ্গে খাচ্ছেন। ভদ্রমহিলাকে তার খুব চেনা মনে হচ্ছে। এবং তখনই নামটা মাথায় এল, সোফিয়া লোরেন। জলপাইগুড়ির সিনেমা হলে সে টু উইমেন’, ইয়েসটারডে টুডে টুমরো’ দেখেছে। লম্বা স্বাস্থ্যবতী ভদ্রমহিলা, মুখ ফেরাতেই মনে হল বয়স হয়েছে, কিন্তু খুব পালটাননি। সে কোনওদিন সোফিয়া লোরেনের এত কাছে বসে থাকবে ভাবা যায়? এই সময় আর এক লম্বা ভদ্রলোক সাদা হাফস্লিভ আর খয়েরি রঙা প্যান্ট পরে অতি সাধারণ ভঙ্গিতে সোফিয়া লোরেনের টেবিলে এসে কিশোরের মাথায় হাত বুলিয়ে চেয়ার টেনে বসলেন। এবং বসামাত্র অর্জুন প্রায় লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। মেজর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হল?

 

গ্রেগরি পেক। গানল অব নাভারোন-এর নায়ক, রোমান হলিডে…।

 

হেনরি ডিমক বললেন এখানে তো প্রায় সব ফিল্মস্টার খেতে আসেন। চোখ মেলে থাকলেই সবাইকে দেখতে পাবে। এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে ওঁরা বিরক্ত হতে পারেন।

 

অর্জুন সেটা জানে। কিন্তু এমন অভাবনীয় ব্যাপার দেখে নিজেকে সামলানো শক্ত হল। হেনরি অর্ডার দিয়েছিলেন, এখন সেটা পরিবেশিত হল। কিছুটা খাওয়ার পর অর্জুনের আর খেতেই ইচ্ছে করছিল না। এই মুহূর্তে যে সে সব বিস্মরিত। গানল অব নাভারোন’-এর পাহাড়ে ওঠার সময় গ্রেগরি পেক একটা গর্তে হাত ঢোকানো মাত্র বিশাল একটা বাজপাখি চিৎকার করে বেরিয়েছিল, সেই দৃশ্যটার কথা বারবার মনে পড়ছে। এইসময় মেজর জিজ্ঞেস করলেন, কী হল, খাবে না?

 

আর ভাল লাগছে না। কিন্তু নষ্ট করতেও ইচ্ছে করছে না। অর্জুন। জানাল।

 

মেজর বললেন, জোর করে খেয়ো না। দাও, আমি তোমাকে সাহায্য করছি। তিনি অর্জুনের বাটিগুলো টেনে নিতেই বিদ্যুৎ-চমকের মতো একটা চিন্তা অর্জুনের মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। মেজর তখন কাঁটা-চামচ দিয়ে অর্জুনের খাবার আক্রমণ করেছেন। ধরা যাক ওই স্মোকড চিকেনে বিষ মেশানো আছে। ওটা অর্জুনের পেটে যেত। এখন মেজর খেয়ে নিতেই আততায়ী লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। প্লেনেও তো একই ব্যাপার হতে পারে। যে ছেলেটি খুন হল, সে জানত না অর্জুনের জন্যে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেচারা খিদের চোটে সেটাই খেয়ে নিয়েছিল। অর্জুন যে পার্কিং লটে গিয়ে খবর নিয়েছে, রিনসেক কোম্পানিতেও হাজির হয়েছিল, তা যদি প্রতিপক্ষের জানা হয়ে গিয়ে থাকে, তবে জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির ব্যাপারটাও অজানা নেই। সেক্ষেত্রে ওরা যদি তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা…হ্যাঁ, তাই তো, নইলে বলবে কেন, মৃত্যু বারবার খালি হাতে ফিরে যায় না। সে বিল মেটানো পর্যন্ত অপেক্ষা করল। তারপর হেনরি ডিমককে বলল আমি এয়ারপোর্টে যাব।

 

হেনরি অবাক, কেন?

 

একটু ইতস্তত করে অর্জুন তার সন্দেহের বিষয় এবং টেলিফোনের কথাটা জানাল। সব শুনে মেজর হাত নেড়ে উড়িয়ে দিলেন, এজন্যে এয়ারপোর্ট অথরিটির কাছে যাওয়ার কী দরকার! এসব কথা বিস্তারিত জানাতে গেলেই হিরেটার কথাও বলতে হবে। কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি। সি ওয়ার্ল্ড থেকে ঘুরে এসে না হয় সব বলা যাবে।

 

হেনরি বললেন, তা ছাড়া অনুমানটায় একটা বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। বিষ মেশাল কে? প্লেনে যে খাবার সার্ভ করা হয়, তা অত্যন্ত দায়িত্ববান কেটারার সাপ্লাই করে। যদি বিশেষ একটি প্লেটে বিষ মেশানো থাকে, তা হলে সে প্লেটটা বিশেষ এক যাত্রীর কাছে সে পৌঁছে দিতে পারে না। তোমার অনুমান যদি সত্যি হয়, তা হলে বিষটা মিশিয়েছে যে এয়ারহোস্টেস, তোমাকে প্লেটটা দিয়েছে সে-ই। এয়ারলাইনসের কোনও হোস্টেস এমন কাজ করবে না। কারণ তাতে তার সরাসরি ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।

 

অর্জুন মাথা নাড়ল, আমি কিছু জানি না। কিন্তু এ ছাড়া ওর মরে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। থাকলে টেলিফোনটা আসত না।

 

হেনরি বললেন, তাহলে আমি একটা ফোন করছি এয়ারপোর্ট অথরিটিকে। তোমার গলা শুনলে ওরা বুঝতে পারবে যে, আমেরিকান নয়।

 

রাস্তার পাশেই একটা বুধে ঢুকে পড়লেন হেনরি। মেজর লাঠি দিয়ে ফুটপাত ঠুকছিলেন। অর্জুন সেদিকে তাকিয়ে হাসল। মেজর কি নার্ভাস? ওই লাঠির ভেতরে লুকোনো সম্পত্তিটির জন্যে একদল লোক এখন মরিয়া। এবং তারপরেই মনে হল, খাবারের ব্যাপারটা মাথায় ঢোকামাত্রই সে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল যে, বেরোবার আগে পাশের টেবিলের দিকে তাকাতেই ভুলে গেছে।

 

এখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। অথচ অন্ধকারের বালাই নেই। বিকেল বিকেল ছায়া মেলেছে শুধু। সে দেখল, পথের পাশেই একটা স্ট্যাচু রয়েছে। একজন মানুষ এক পায়ে দাঁড়িয়ে টুপি পেতে রয়েছে। সে কয়েক পা এগিয়ে স্ট্যাচুটার সামনে দাঁড়াল। বাড়ানো টুপিতে বেশ কিছু ডলার পড়েছে। স্ট্যাচুকে কেউ ভিক্ষে দেয়? সে মুখের দিকে ভাল করে তাকাতেই স্ট্যাচুর একটা চোখ বন্ধ হয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেল। চমৎকার! এটাও এক ধরনের অভিনয়, এই স্ট্যাচু সেজে থাকা। খুব কষ্ট হচ্ছে মানুষটার, হাত-পা-মুখ মায় সমস্ত শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। শুধু পয়সার জন্যে?

 

হেনরি বেরিয়ে এসেছেন দেখে অর্জুন ফিরে এল। হেনরি মাথা নাড়লেন, ইউ আর রাইট। আমি রিপোর্টার পরিচয় দিতে ওরা জানাল, লোকটির পেটে বিষ পাওয়া গিয়েছে। বিষক্রিয়া শুরু হওয়ার তিন মিনিটের মধ্যে হার্ট ব্লক হয়েছে। লোকটা যে খাবার খেয়েছিল, তাতেও একই বিষ পাওয়া গিয়েছে। সন্দেহভাজন হিসেবে ওরা এয়ারহোস্টেস ও কোরারের লোককে গ্রেফতার করেছে। এখন ওরা সেই ইন্ডিয়ান ছেলেটির খোঁজ করছে, যে ওর পাশে বসেছিল।

 

শোনামাত্র অর্জুনের শরীরে শীতল স্রোত বয়ে গেল। লস অ্যাঞ্জেলিসের পুলিশ তাকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করবে? সে খামোখা ওই ছেলেটাকে খুন করতে যাবে কেন? তারপরেই সেই অফিসারের দৃষ্টি চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে যখন মৃতদেহ খুঁটিয়ে দেখছিল, ভদ্রলোক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিলেন। একদম অজানা সহযাত্রীর পায়ের জুতোর তলা কেউ খুঁটিয়ে দেখে না। সে নিজেই ওদের হাতে সন্দেহের সূত্র তুলে দিয়ে এসেছে।

 

মেজর চিৎকার করে উঠলেন, ইন্ডিয়ান ছেলে? মানে তুমি? তোমাকে খুঁজলেই হল? মামদোবাজি? চলো, আমরা সবাই মিলে এয়ারপোর্টে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, এর মানে কী?

 

অর্জুনের সত্যি অস্বস্তি হচ্ছিল। ওরা ইচ্ছে করলে তাকে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে পারবে না যে, সে খুন করেছে। কিন্তু এখন এয়ারপোর্টে গেলে আর হিরের ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখা যাবে না। অবশ্য পুলিশ যদি ইচ্ছে করে, তা হলে হোটেলেই তাকে ধরতে পারে। সে হেনরি ডিমকের দিকে তাকাল। ডিমকসাহেবের যদি শুধু সি-ওয়ার্ল্ডে গিয়ে দুটো হিরের মিলিত আলো দেখাই উদ্দেশ্য হয়, তা হলে সেটা পুলিশের সঙ্গে গিয়েও দেখা যেতে পারে। তিনি আলাদা যেতে চাইছেন কেন?

 

হেনরি বললেন, অবশ্য পুলিশ যে আমাদের খুঁজছে, তা আমাদের জানার কথা নয়। চলো, হোটেলে ফিরে যাই।

 

আবার হাঁটা শুরু হতেই অর্জুন মুখ ফিরিয়ে সেই স্ট্যাচু হয়ে থাকা লোকটির দিকে তাকাতেই দেখল, সেখানে কেউ নেই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *