হাঙরের পেটে হিরে (অর্জুন) – সমরেশ মজুমদার

শেয়ার করুনঃ

তিন 

কেনেডি এয়ারপোর্টটা এত বড় যে, সামলে ওঠা মুশকিল। যেসব এয়ারলাইনস দেশের মধ্যে চলাচল করে, তাদের মধ্যে আমেরিকান এয়ারলাইনসের সুনাম বেশি। টিকিটের দাম ট্রেনের টিকিটের চেয়ে কম অবশ্য পিপলস এয়ারওয়েজে। জনতা এক্সপ্রেস আর কী! ওতে টিকিট নিতে হয় আকাশে ওড়ার পর কনডাক্টারের হাতে ডলার দিয়ে। সস্তা বলেই বিনি পয়সায় কিছু খেতে দেয় না। মেজর এবং হেনরি ডিমক অবশ্য আমেরিকান এয়ারলাইনসেই যাচ্ছেন। লাইটার’-এর কল্যাণে অর্জুনের টিকিটের অসুবিধে হয়নি।

 

এর মধ্যে একদিন হেনরি ডিমকের বাড়িতে হামলা হয়েছে। সেটা হয়েছে, যখন তিনি বা তার স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। টেলিফোন এসেছিল হুমকি দিয়ে যে, যদি তিনি হিরেটা কাউকে বিক্রি করেন, তা হলে পৃথিবীর মায়া কাটাতে হবে। হেনরি ডিমক অম্লান বদনে বলেছেন, হিরেটা তার কাছে নেই।

 

সেদিন ডিমসাহেবের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেজরকে নিয়ে অর্জুন গিয়েছিল রিনসেক কোম্পানিতে। যে-লোকটা ডিউটিতে ছিল, সে কার্ডটা দেখার পর মাটির তলায় গ্যারেজ ওদের নিয়ে গিয়েছিল। শখানেক গাড়ির মধ্যে সেই নাম্বারের গাড়িটা বের করে দেখিয়েছিল ওদের। দামি এয়ারকন্ডিশনড গাড়ি। কোথাও কোনও চিহ্ন ফেলে যায়নি লোকটা। কিন্তু ড্রাইভিং সিটের পাদানিতে অর্জুন এক টুকরো মাটি দেখতে পেয়েছিল। লোকটার সম্পর্কে মেজর খোঁজখবর নিতে কর্মচারীটি বিশদ বলতে পারল না। শুধু জানিয়েছিল, ওই গাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল লস অ্যাঞ্জেলিস থেকে, টেলিফোনে।

 

কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে প্লেনটা উড়েছিল দুপুরে। টানা পাঁচ ঘণ্টা ওড়ার পর লস অ্যাঞ্জেলিসে থামবে। মেজর এবং হেনরি ডিমক পাশাপাশি বসেছেন। মেজর খুব উত্তেজিত। না হলে ছড়িটাকে ওইভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতেন না। সিকিউরিটি চেকিং-এর সময় বেশ মজার ব্যাপার ঘটেছিল। মেজর যখনই ছড়ি হাতে মেটাল ডিটেক্টারের মধ্যে দিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন, তখনই টুংটাং শব্দ বাজছিল। সিকিউরিটির লোকজন ওঁকে ছড়ি ছাড়া হাঁটতে বলায় মেজর অভিনয় করলেন যেন তিনি সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না। ছড়িটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তলার লোহার নালটাকে আবিষ্কার করে ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, লোহার জন্যেই শব্দটা হচ্ছে। পরে একা হলে মেজর বলেছিলেন, অ্যাকটিং করলে, বুঝলে, আলেক গিনেসকে হার মানিয়ে দিতাম। বলার সময় যদিও গলা কঁপছিল।

 

পাশাপাশি বসে মেজর এবং হেনরি খুব গল্পে মশগুল। অর্জুন বসেছে। কিছুটা পিছিয়ে। সুন্দরী এয়ারহোস্টেসরা হাসিমুখে খাবার সার্ভ করছে। অর্জুন তার সামনের খাপ থেকে একটা ম্যাগাজিন তুলে নিল। আমেরিকান এয়ারলাইনসের নিজস্ব পত্রিকা। রঙিন বিজ্ঞাপন দেখতে মন্দ লাগে না। ওর পাশে যে ছেলেটি বসে আছে, সে বেশ স্বাস্থ্যবান। বসা অবধি উসখুস করছে। একসময় সে উঠে টয়লেটের দিকে চলে গেল। অর্জুন নিজের আসন ছেড়ে মেজরের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলে এসে দেখল এয়ারহোস্টেস তাদের সিটের সামনের ট্রে টেনে খাবার দিয়ে গেছে। ছেলেটি টয়লেট থেকে ফিরে এসে নিজের খাবার গপগপিয়ে খাচ্ছে। খিদে ছিল না। একটা প্যাস্ট্রি তুলে– অর্জুন নিজের প্লেট থেকে হাত গোটাবার আগেই ছেলেটা বলেছিল, মে আই হেলপ ইউ? যেন অর্জুনের খাবার শেষ করার দায়টা ও নিতে চাইছে। মজা লেগেছিল, প্লেটটা এগিয়ে দিয়েছিল অর্জুন। সেটাও সাবাড় করে ছেলেটা চোখ বন্ধ করেছিল, কিন্তু শান্ত হয়নি। সাহেবরা যে কারও এঁটো খাবার চেয়ে খেতে পারে, তা আগে কেউ বললে অর্জুনের বিশ্বাস হত না। এখন ম্যাগাজিন দেখতে দেখতে সে ছেলেটির অস্বস্তি আর একবার লক্ষ করল। হেসে বলল, কী ব্যাপার, তোমার কি কোনও অসুবিধে হচ্ছে?

 

কে বলেছে অসুবিধে হচ্ছে? আমি তোমাকে বলতে গিয়েছি? ছেলেটা রাগী গলায় বলল।

 

অর্জুন আর কথা বাড়াল । যারা ভাল ব্যবহারের এমন জবাব দেয়, তাদের এড়িয়ে যাওয়াই উচিত। প্লেন উড়ছে অন্তত তিরিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে। চারধারে পরিষ্কার আকাশ। নীচে মেঘের মাঠ। এই প্লেন সোজা উড়ে গিয়ে থামবে লস অ্যাঞ্জেলিসে, যে শহরে আছে হলিউড। সঙ্গে সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিন, লরেল হার্ডি থেকে হিচককের মুখ মনে পড়তেই সে সোজা হয়ে বসল। মেজরকে বলতে হবে হলিউড ঘুরে দেখাবার কথা।

 

পাশের ছেলেটা উঠে গিয়েছে টয়লেটে। অনেকক্ষণ। এয়ারহোস্টেসরা জানলা বন্ধ করতে বলল যাত্রীদের। তারপর ভিডিওতে ছবি শুরু হল। জেমস। বন্ডের ডক্টর নো’। ছবি চলছে। হঠাৎ একটা আর্ত চিৎকারে প্লেনটা কেঁপে উঠল। চমকে সমস্ত যাত্রী উঠে দাঁড়িয়েছে। পেছন দিকে খুব ব্যস্ততা, উঁচু গলায় উত্তেজিত সংলাপ। ছবি বন্ধ হয়ে গেল। তারপরেই ক্যাপ্টেনের গলা শোনা গেল, ভদ্রমহোদয় এবং ভদ্রমহিলাগণ, আপনারা যে যার আসনে বসে থাকুন। প্লেনের মাঝখানের টয়লেট আপাতত বন্ধ থাকছে। আমরা আপনাদের সাহায্য চাইছি।

 

একজন এয়ারহোস্টেস ছুটে আসছিলেন, পেছনের সিটের দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের প্রশ্নের জবাবে জানিয়ে গেলেন, টয়লেটে একটি মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। কথাটা কানে যাওয়ামাত্র যাত্রীরা যে-যার আসনে বসে পড়ল। অর্জুনের শরীরে হিম-ছোঁয়া লাগল। ছেলেটা এখনও আসছে না। তা হলে কি…। সে উঠে এগিয়ে যেতেই একজন বিমান-কর্মচারী বলল, ওদিকে যাবেন না। আপনার পাশের ছেলেটা ওখানে মারা গিয়েছে।

 

অর্জুন যেন অসাড় হয়ে গেল। সে কোনওমতে মুখ ফেরাতে দেখল পেছনের সিটের দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ালেন।

 

লস অ্যাঞ্জেলিস এয়ারপোর্টে ওদের তিন ঘণ্টা আটকে থাকতে হল। প্লেনের সমস্ত যাত্রীকেই পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। যেহেতু ছেলেটির আসন ছিল অর্জুনের পাশে, তাই তাকে একটু বেশি। একটা ছেলে নিজেরটা অন্যেরটা খেয়ে টয়লেটে গিয়ে আত্মহত্যা করবে, এটা ভাবতেও অবাক লাগছিল অর্জুনের। অথচ মৃতদেহে হত্যার কোনও চিহ্ন নেই।

 

যে অফিসার অর্জুনকে ডেকে নিয়ে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন, তাঁর সামনে যে ব্যাগটা পড়ে রয়েছে, সেটা মৃত ছেলেটির। ওটাকে মাথার ওপরের ল্যাগেজ-র্যাকে রাখতে সে দেখেছিল ছেলেটিকে। অফিসার বললেন, আপনি বলছেন মৃত মানুষটি আপনার কাছ থেকে খাবার নিয়ে খেয়েছিল। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

 

অর্জুন হাসল, আমি মিথ্যে বলি না। তারপর সে পকেট থেকে কার্ডটা দেখাল।

 

কার্ড দেখে সামান্য ভাবান্তর হল অফিসারের। তিনি বললেন, সরকারি অতিথিরা যে সম্মান পান, আপনি তাই পাচ্ছেন। কিন্তু… আপনি এর আগে লস অ্যাঞ্জেলিস এসেছেন?

 

আমি এই প্রথম আমেরিকায় এসেছি। পাসপোর্ট দেখুন।

 

মুশকিল কী জানেন, একবার আমেরিকায় এসে বার কয়েক নিউইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলিস ঘুরে যাওয়া যায়। ঠিক আছে, আমরা সবাইকে যা বলছি আপনিও তা-ই করুন। আপনার ঠিকানা রেখে যান, দরকার হলে যোগাযোগ করতে পারি।

 

অর্জুন মেজরের ঠিকানা লিখে দিল। তারপর একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, ওর ব্যাগে কোনও ক্ল পাওয়া যায়নি?

 

না। শুধু রিনসেক কোম্পানির কার হায়ারের রসিদ ছাড়া।

 

রিনসেক কোম্পানি? অর্জুন চমকে উঠল।

 

কী ব্যাপার বলুন তো?

 

উনি কবে রিনসেক কোম্পানিতে গাড়ি ভাড়া করেছিলেন?

 

অফিসার হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা টেনে নিয়ে রসিদ বের করে তারিখটা বললেন। চোখ বন্ধ করে অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর বলল, অফিসার, আমি বোধহয় আপনাকে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু ওর মৃতদেহ কোথায়?

 

এয়ারপোর্টের মর্গে আছে এখনও।

 

আমি দেখতে পারি একবার?

 

কেন?

 

আমি আপনাকে বলব, কিন্তু তার আগে আমি দেখতে চাই।

 

অফিসার আর একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চালাবার নির্দেশ দিয়ে অর্জুনকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হলেন। পুরো বাড়িটাই নিশ্চয়ই এয়ারকন্ডিশন্ড। কারণ, নামার সময় প্লেনে শহরের টেম্পারেচার যা বলেছিল, আগস্ট মাসে জলপাইগুড়িতে তা-ই থাকে। অথচ তার একফোঁটাও গরম লাগছে না। অনেকটা যাওয়ার পর ওরা যে-ঘরে ঢুকল, সেখানে একটা লম্বা ট্রে-র ওপরে ছেলেটা শুয়ে আছে। ধীরে ধীরে অর্জুন ওর সামনে দাঁড়াল। একটা চোখ বন্ধ, একটা চোখ আধ খোলা। কিছুক্ষণ আগেও ও তার খাবার চেয়ে খেয়েছিল। মুখে কোনও বিকৃতি নেই। পোস্টমর্টেম না করলে মৃত্যুর কারণ বোঝা যাবে না। অর্জুন ওর পায়ের দিকে চলে এল। তারপর নিচু হয়ে জুতোর হিলটা লক্ষ করে উত্তেজিত হয়ে উঠল। মৃত মানুষটার জুতোর তলায় অর্ধগোলাকৃতি লোহা বসানো। এবং লম্বা খাঁজে মাটি চাপ হয়ে বসে আছে। দুটো পায়ের জুতোতেই এক ব্যাপার।

 

অর্জুন বুঝল অফিসার তার দিকে তাকিয়ে আছেন। লস অ্যাঞ্জেলিস থেকে টেলিফোনে নিউইয়র্কের রিনসেক কোম্পানি থেকে গাড়ি ভাড়া করে হেনরি ডিমকের বাড়িতে যে হানা দিয়েছিল সে এই ব্যক্তি, তা প্রমাণ করতে ওর জুতো নিয়ে যেতে হয় হেনরি ডিমকের বাগানে। সেখানে জুতোর ছাপ এখনও আছে কিনা সন্দেহ, কিন্তু জুতোর ভেতর ঢুকে থাকা মাটি আর বাগানের মাটি যে এক, তা প্রমাণিত হবে। কিন্তু যদি না হয়, এই ছেলেটি যদি অন্য কারণে। গাড়ি ব্যবহার করে থাকে, অন্য জায়গার মাটি ওর জুতোয় লেগে যায়, তা হলে? আর এবার সেই সত্যিটা বলতে হয় অফিসারকে। হেনরি ডিমকের কেনা কাচ কী করে হিরে হয়ে গিয়েছে, কী উদ্দেশ্যে ওরা লস অ্যাঞ্জেলিসে এসেছে, এবং, সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার,… হিরেটা ওরা লাঠিতে ভরে নিয়ে এসেছে।

 

জুতোর শব্দ করে অফিসার এগিয়ে এলেন, ব্যাপারটা কী?

 

এই লোকটি রিনসেক কোম্পানি থেকে গাড়ি ভাড়া করে কুইন্সের একটা পার্কিং লটে ঝামেলা করেছিল পার্কিং ফি দেওয়া নিয়ে। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

 

সেটা আপনি মুখ দেখে বলতে পারলেন না, জুতোর তলা দেখে বলতে হল?

 

কারণ মুখটা মনে ছিল না। ওর পায়ের জুতোর হিলে লোহাটা সেদিন খুব শব্দ করছিল। এইটুকু স্মরণে আছে।

 

কুইন্সের কোন পার্কিং লটে?

 

অর্জুন হেনরি ডিমকের বাড়ির পেছনের এলাকাটা বুঝিয়ে দিল। ওরা অফিসে ফিরে এলে অফিসার ইতিমধ্যে-আসা একটা কাগজ টেবিল থেকে তুলে নিলেন। সেটা পড়ে চাপা গলায় বললেন, দিস ম্যান ওয়াজ এ প্রফেশনাল থিফ। এর আগে তিনবার জেল খেটেছে। একটা চোরের মৃত্যু হলে আমাকে বেশি চিন্তা করতে হবে না।

 

পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ওরা যখন ট্যাক্সিতে চেপে শহরে ঢুকছিল, তখন অর্জুনের মাথায় নানান চিন্তা ধাক্কা খেয়ে চলেছে। এখনও পর্যন্ত সে হেনরি সাহেবকে বলেনি যে তার বাড়িতে যে চোর ঢুকেছিল, সে-ই মারা গেছে। ও যদি প্রফেশনাল চোর হয়, তা হলে কেউ কি তাকে ভাড়া করে নিউইয়র্কে পাঠিয়েছিল? যদি তা-ই হয়, তা হলে প্লেনে কি কেউ ওকে খুন করেছে? খুন করলে তো তার চিহ্ন থাকবে শরীরে। আত্মহত্যা করলেও। এরকম ভদ্রলোকের মতো কেউ মরে যেতে পারে?

 

সে বিষয়টা নিয়ে এমন মগ্ন ছিল যে, শহরটাকে ভাল করে দেখছিল না। মেজরের কথায় তার খেয়াল হল। তুমি লস অ্যাঞ্জেলিসে নামামাত্র একটা খুন হয়ে গেল হে!

 

নামার আগেই। কিন্তু মেজর, আমাদের সাবধানে থাকতে হবে।

 

সাবধানে! আমি কখনও ভয় পাই না। হেনরি, তুমি কি ভয় পাও?

 

হেনরি নীরবে মাথা নাড়লেন। অর্জুন কিছু বলল না। মেজর দু’হাতে লাঠিটা আঁকড়ে ধরে আছেন। যাঁরা লাঠি ব্যবহার করেন, তারা কখনওই ওই ভঙ্গিতে লাঠি ধরেন না।

 

সেই একই দৃশ্য। বিরাট চওড়া রাস্তা, ফুটপাথে মানুষ নেই, অথচ মিনিটে হয়তো একশোটা গাড়ি ছুটছে। যেতে যেতে দুটো মোটেল দেখল অর্জুন। মোটরে যারা ঘুরে বেড়ায়, তাদের জন্যে থাকার ব্যবস্থা মোটেলে। মোটর ছাড়া মানুষ ওখানে থাকতে পারে কিনা কে জানে। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা কথা মনে পড়ল। ছেলেবেলায় জলপাইগুড়িতে মোটর কথাটা খুব চালু ছিল। এখন সচরাচর কেউ বলে না। কিন্তু মোটেল শব্দটাকে তো বেশ রোমান্টিক লাগছে।

 

ওরা যে হোটেলে উঠল, তার নাম এঞ্জেলস। সুন্দর ঝকঝকে হোটেল। আটতলা। প্রতিটি ডাবল-বেড ঘরের জন্য নেবে পঞ্চাশ ডলার। মেজর ও হেনরি একটি ঘর নিলেন। অর্জুনকে সিঙ্গল বেড দেওয়া হল, যার দাম তিরিশ ডলার। এখন আর সে টাকার হিসাবে ডলারকে দেখে না, ওতে খুব কষ্ট হয়। এই এত টাকা নিচ্ছে, কিন্তু শোওয়ার জায়গা ছাড়া এক কাপ চা পর্যন্ত বিনি পয়সায় দিচ্ছে না।

 

নিজের ঘরে ঢুকে অর্জুন নরম সাদা বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। মেজর বলেছেন ঠিক আটটায় তৈরি থাকতে, ডিনার খেতে বের হবেন। দীর্ঘ বিমানযাত্রা, মৃত্যু নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, অর্জুনকে কাহিল করেছিল। সে চুপচাপ শুয়ে ব্যাপারটা ভাবছিল। হেনরি ডিমকের হিরের প্রতি কোনও লোভ নেই। তিনি ওটা পুলিশের হাতে স্বচ্ছন্দে তুলে দিতে পারতেন। কিন্তু জোড়া হিরের আলো দেখবার লোভে একটা বিরাট ঝুঁকি নিয়েছেন। হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গের মাথায় পা রাখা অথবা উত্তরমেরুর শেষ বিন্দুতে পৌঁছে যাওয়ার লোভে মানুষ যে ঝুঁকি নেয়, তাতে একমাত্র আনন্দ ছাড়া অন্য কোনও বাস্তব লাভ হয় না। তবু মানুষ ছুটছে। মেজর কিংবা ডিমক সেই জাতের মানুষ। কিন্তু যারা বা যে ওই হিরেটার দখল পেতে চাইছে, তারা যে সুবোধ ব্যক্তি

 

হবে, এমন ভাবার কারণ নেই। লস অ্যাঞ্জেলিস থেকে নিউইয়র্কে ভাড়াটে চোর পাঠায় যারা হিরেটার সন্ধানে, না পেয়ে ফিরে আসার পথে প্লেনে সেই চোরটাকে যারা স্বচ্ছন্দে মেরে ফেলতে পারে, তারা খুব সহজে পিছু ছাড়বে এমন ভাববার কোনও কারণ নেই। প্রথম প্রশ্ন, হিরেটা হেনরি ডিমকের কাছে। রয়েছে এই তথা এরা জানল কী করে? স্পষ্টত, সেই জহুরি ভদ্রলোকের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে তা সম্ভব নয়। কিন্তু এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। চোরটা এত প্লেন থাকতে ঠিক আজকেই এবং একই প্লেনে এল কেন মরতে?

 

এই সময় টেবিলের ওপর রাখা রিসিভারের তলার আলোটা দপদপ করতে লাগল, এবং যন্ত্রটা থেকে বিপ বিপ শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। এরকম টেলিফোন অর্জুন জীবনে দেখেনি। সে রিসিভার তুলে নিতেই ওপাশ থেকে জড়ানো মার্কিং ঢঙের ইংরেজিতে কেউ প্রশ্ন করল, আমি কি সেই ইন্ডিয়ান ছোকরার সঙ্গে কথা বলছি, যার পাশের ছেলেটি আজ প্লেনে মারা গিয়েছে?

 

হ্যাঁ, আপনি কে বলছেন?

 

চমৎকার। মৃত্যু বারবার খালি হাতে ফিরে যায় না। কথাটা শেষ হওয়ামাত্র লাইনটা কেটে গেল। হতভম্বের মতো কয়েক সেকেন্ড বসে থাকল। অর্জুন। তারপর রিসিভার রেখে ধীরে ধীরে চেয়ারে এসে বসল। অর্থাৎ তারা যে এখানে উঠেছে, আলাদা ঘরে আছে, তা প্রতিপক্ষের জানা। ব্যাপারটা আর সহজ জায়গায় নেই। টেলিফোনে ভয় দেখানোর কায়দা খুব পুরনো। কিন্তু সতর্ক থাকতেই হবে। যারা আগ্রহী, তারা ধরা না দিক, দর্শন দিতে দেরি করবে না। ওর খুব ইচ্ছে করছিল হিরেটাকে একবার নেড়েচেড়ে দেখতে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *