হাঙরের পেটে হিরে (অর্জুন) – সমরেশ মজুমদার

শেয়ার করুনঃ

দুই 

মেজর চোখ খুলে একবার তাকালেন, তারপর নির্লিপ্ত স্বরে বললেন, খাচ্ছি।

 

সে তো দেখতেই পাচ্ছি। তোমাকে আমি ফোন করে করে হাল্লাক। কেউ ফোন ধরছেই না।

 

বাড়িতে কেউ না থাকলে ফোন বেজেই যায়।

 

আঃ। এভাবে কথা বলছ কেন? এই মেজর?

 

বন্ধু যখন বন্ধুর মতো আচরণ করে না তখন… তুমি কী ভেবেছ বলো। তো, অ্যাঁ? হঠাৎ মেজর চিৎকার করে উঠলেন।

 

ভদ্রলোকের মুখে এবার হাসি ফুটল। এই তো! এতক্ষণে তুমি নর্মাল হয়েছ। মিট দিস জেন্টলম্যান। মিস্টার জর্জ রেগ। মেজর, আমার বন্ধু।

 

লম্বা-চওড়া শরীরটা টেনে তুলে মেজর পেপার ন্যাপকিনে আঙুল মুছে হাত বাড়ালেন, আমি আশা করব আপনি এ-দেশের প্রেসিডেন্টের কোনও আত্মীয়ও নন?

 

না, না। ভদ্রলোক বেঁটেখাটো, সুন্দর চেহারার, লজ্জিত হলেন, আমি সোনা-রুপো মণি-মুক্তোর ব্যাবসা করি মাত্র। তার ডান হাতে একটি লাল পাথরের আংটি চমৎকার দেখাচ্ছিল।

 

মেজর এবার অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বাংলায় বললেন, যে হতচ্ছাড়াটার জন্যে অ্যাদুর এলাম এ হল সেই, হেনরি ডিমক। হেনরি। হি ইজ অর্জুন।

 

হেনরি ডিমক মাথা দুলিয়ে হাত বাড়ালেন। বোঝা গেল, মেজর ইচ্ছে করেই অর্জুনের পরিচয় বিশদে জানালেন না। অবশ্য পরিচয় বলতে তো ওই একটাই, যা লাইটারকেন্দ্রিক। কিন্তু এত অন্তরঙ্গ বন্ধুকে মেজর এতদিন তার কথা বলেননি কেন? অর্জুনের মনে হল, হয়তো মেজর হেনরি ডিমককে বলেছিলেন, কিন্তু সেটা তার মনে আছে কি না যাচাই করার জন্যে শুধু নামটা বলেই চেপে গেলেন। রেগনসাহেব ততক্ষণে কাউন্টারে চলে গেছেন। কাগজের গ্লাসে দু’কাপ কফি নিয়ে ফেরত এলেন ভদ্রলোক। একবারও জিজ্ঞাসা করলেন না অর্জুনরা কফি খাবে কি না। হয়তো তাতে মিল্কশেকের গ্লাস দেখেই তা করেননি। চিনি, নুন এবং ঝালমশলা আলাদা আলাদা ছোট প্যাকেটে স্তূপ করে রাখা আছে। প্রয়োজন মতো নিয়ে নাও। দেখা গেল, রেগনসাহেব চিনি বেশি খান, ডিমক আদৌ খান না। ডিমক কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, মিস্টার রেগন একটা অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। টেলিফোনে তোমাকে যে হিরেটার কথা বলেছিলাম, সেটা উনি কিনতে চান। এখন দশ হাজার পর্যন্ত উঠতে রাজি আছেন।

 

দশ হাজার ডলারের হিরে কেউ তিরিশ সেন্টে বিক্রি করে না। ওটা স্রেফ কাচ। মেজর মন্তব্য করতেই রেগনসাহেব কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন, আমি আমার প্রফেশনটা বুঝি। কোন হকার ওঁকে বিক্রি করছে, কীভাবে তার হাতে এল ও-জিনিস, তা আমি জানি না। কিন্তু ওর একটা পেয়ার আছে লস অ্যাঞ্জেলিসে। দিনের বেলায় ঠিক কাচ বলে মনে হলেও, রাত্রে বিচিত্র আলো বের হয়।

 

হেনরি জিজ্ঞেস করলেন, লস অ্যাঞ্জেলিসের কোথায়?

 

স্যার ডিয়াগোর সি-ওয়ার্ল্ডে। জলের মধ্যে দিয়ে ওই হিরের আলো প্রবাহিত হয়। গভর্নমেন্ট স্পেশাল সিকিউরিটি রেখেছে হিরেটার জন্যে।

 

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, প্রথম কথা, দুটো জিনিস এক কি না, তাতেই আমার সন্দেহ হচ্ছে। দ্বিতীয় কথা, আপনি এত ইন্টারেস্টেড কেন?

 

কারণ আমি এসব জিনিসের ব্যাবসাদার। সিদ্ধান্তটা তাড়াতাড়ি নিন, মিস্টার ডিমক।

 

খবরটা চাউর হতে বেশি দেরি হবে না। আর জানেনই তো, যত মানুষ জানবে, তত সমস্যা বাড়বে। রেগন সাহেব বললেন।

 

কিন্তু মিস্টার ডিমক কোনও স্থির সিদ্ধান্ত জানালেন না। তিনি আরও দু’দিন ভাববার সময় নিলেন। ব্যাপারটা পছন্দ হল না রেগন সাহেবের। তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে সেটা বুঝিয়ে বলে চলে যাওয়ার পর ওরা হেনরি ডিমকের বাড়িতে এল।

 

নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে খুব ভাল লাগছিল অর্জুনের। ঠান্ডা জোরবাতাসে চুল উড়ছিল। রঙিন বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে ওরা পৌঁছোল মিস্টার ডিমকের বাড়িতে। এদিকে দোকানপাট নেই। ছাড়া ছাড়া একতলা ছবির মতো বাড়ি। চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে মিস্টার ডিমক ওদের ভেতরে আসতে বললেন। ম্যাকডোনাল্ড থেকে বেরিয়ে পুরো রাস্তাটা হেঁটে আসার সময় সারাক্ষণ তিনি মেজরের সঙ্গে কথা বলে গেছেন। অর্জুন ছিল খানিকটা পিছিয়ে। ঘরে ঢুকে দেখল, দেওয়ালময় যেসব জিনিস টাঙানো তাতে মানুষটির শখ অথবা জীবিকার কথা বোঝা যায়। বিভিন্ন অভিযানের নানান স্মারক ওগুলো। ওদের বসবার ঘরে বসতে বলে কয়েক পা এগিয়ে মিস্টার ডিমক চিৎকার করে উঠলেন, মাই গড!

 

মেজর আরাম করে বসতে যাচ্ছিলেন, না বসে বললেন, কী হল?

 

কেউ এসেছিল। এপাশের দরজাটা ভেজানো। অথচ গত এক সপ্তাহ ধরে ওটা বন্ধ ছিল।

 

হেনরি ডিমক প্রায় ছুটে গিয়ে দরজায় চাপ দিতে খুলে গেল। ওপাশটায় বারান্দা এবং এক চিলতে ঘেরা বাগান। বাগানের পাঁচিলটা বড়জোর পাঁচ ফুট উঁচু।

 

তিরের মতো হেনরি ডিমক পাশের ঘরে ঢুকলেন, অফ কোর্স কেউ এসেছিল। মাই গড। আমি তো মাত্র মিনিট পঁয়তাল্লিশেক বাড়ির বাইরে ছিলাম।

 

ঘরের সমস্ত জিনিস ওলট পালট করেছে কেউ। দু’দুটো আলমারির পাল্লা ভাঙা। তার সব জিনিস ঘরের মধ্যে উঁই করে রাখা। মেজর ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বউ কখন বেরিয়ছে হেনরি?

 

সে তো ব্রেকফাস্ট খেয়েই অফিসে চলে গিয়েছে। কিন্তু কী নিতে এসেছিল লোকটা? বলতে বলতে হেনরি ছুটল পাশের দরজা নিয়ে। অর্জুন অনুসরণ করে সিঁড়ি বেয়ে মাটির তলার ঘরে নেমে এল। ঘরটা বিশাল। হয়তো এ-পাড়ায় দোতলা করার নিয়ম নেই বলেই মাটির তলায় এই ঘর করা হয়েছে। পুরোটা কার্পেট এবং ওয়ালপেপারে মোড়া। টিভি, পড়ার টেবিল, বইয়ের আলমারি থেকে ডিভান পর্যন্ত রয়েছে। ওপাশে একটা মিনি টয়লেট।

 

এখানেও আগন্তুক পা রেখেছিল। হেনরি ডিমক টেবিল থেকে কঁপা হাতে একটা কালির দোয়াত তুলে নিলেন। একটু নাড়ালেন কানের কাছে এনে। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। আর একটা পাত্রে দোয়াতটা উপুড় করতেই মেজরের গলা পাওয়া গেল, বলিহারি বুদ্ধি! কাচটাকে দোয়াতে রেখেছ?

 

কাচ নয়, হিরে। রেগনকে দেখানোর পর মনে হয়েছিল কালির ভেতর রাখলে আলো বের হয় কি না এসে দেখব। রেখেছিলাম বলেই বেঁচে গেল।

 

মেজর ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, চোর এই বস্তুর জন্যে এসেছিল এটা মনে করার কী যুক্তি আছে? তুমি যে ফুটপাথ থেকে কাচটা কিনেছ…’

 

কাচ নয়, হিরে। হেনরি বাধা দিলেন।

 

ওই হল। যে ফুটপাথ থেকে কিনেছ, তা এই কুইন্স থেকে অনেক দূরে। অতএব কারও জানার কথা নয় জিনিসটা তোমার কাছে এসেছে। জহুরি এবং আমাকে ছাড়া কাউকে বলেছ?

 

মেজরের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নেড়ে না বললেন হেনরি। মেজর বললেন, তা হলেই বুঝতে পারছ, যখন কেউ জানেই না যে, ওটা তোমার কাছে। আছে, তখন খামোখা নিতে আসবে কেন? চোর এসেছিল নিশ্চয়ই অন্য ধান্দায়। এই নাও। বলে একটা খাম পকেট থেকে বের করে উঁচিয়ে ধরলেন মেজর।

 

কী ওটা? হেনরির চোখ ছোট হয়ে এল।

 

রেয়ার টাইপ অব পপি। কালিম্পঙের পাহাড়ে দেখতে পেয়ে তোমার জন্যে নিয়ে এলাম।

 

কাচটা অথবা সত্যিকারের হিরেটাকে টেবিলের ওপর রেখে হেনরি যেভাবে খামটা নিলেন অর্জুন তাতে অবাক হয়ে গেল। মহার্ঘ কোনও বস্তু পাচ্ছেন এইরকম ভঙ্গিতে তিনি খামটা খুলতে লাগলেন। অর্জুনের মনে পড়ল, কালিম্পঙের বিষ্টসাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে সে মেজরকে প্রথম দেখেছিল পপি খুঁজতে। এখন দুই প্রৌঢ় যেভাবে তন্ময় হয়ে পপির গুণাগুণ নিয়ে কথা বলছেন, তাতে কে বলবে একটু আগেই ওঁরা হিরের ব্যাপারে বিব্রত ছিলেন।

 

অর্জুন টেবিলে রাখা হিরেটার কাছে চোখ নিয়ে গেল। এখনও কালির সামান্য দাগ হয়ে গেছে ওর শরীরে, কিন্তু আলো-ফালো তো কিছু বের হচ্ছে না। সে আঙুলের ডগায় বস্তুটিকে ধরল। সাধারণ কাঁচের মতো। রাস্তায় পড়ে থাকলে সে নিজেও এটাকে গুরুত্ব দিত না। অথচ এর দাম এখন উঠেছে দশ হাজার ডলার। ভাবা যায়?

 

মেজর ব্যাপারটা লক্ষ করে এগিয়ে এলেন, কী ভাবছ মিস্টার ডিটেকটিভ?

 

হেনরি অবাক হলেন, ডিটেকটিভ?

 

মেজর বললেন, তোমার স্মৃতি খুব খারাপ টাইপের। তোমাকে সেদিন বললাম না, ভারত থেকে যে তরুণ ছেলেটি এদেশে এসে জোন্স অ্যান্ড জোন্সের লাইটার খুঁজে বের করছে, সে আমার কাছেই উঠেছে? এই সেই ছেলে।

 

হঠাৎ যেন এতক্ষণ বাদে হেনরি ডিমক তাকে নজর করলেন। উচ্ছ্বসিত হাসি নিয়ে হাত বাড়ালেন হেনরি ডিমক, ওহ, ইউ আর দ্যাট ডিটেকটিভ। তোমার বয়স এত কম আমি ভাবতে পারিনি। তোমার কি মনে হয় লোকটা ওই হিরের জন্যে এসেছিল?

 

অর্জুন বলল, আমরা এখনও জানি না, একজন না অনেকে। তা ছাড়া জহুরি ভদ্রলোক যদি কাউকে গল্প করে থাকেন যে, ওটা আপনার কাছে আছে, তা হলেই… আপনি একবার জহুরিকে টেলিফোন করে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

 

হেনরি বললেন, দ্যাটস এ গুড আইডিয়া। পুলিশকেও বলতেই হবে। আমার বাড়িতে অজানা লোক এভাবে ঢুকুক আমি পছন্দ করি না।

 

হঠাৎ অর্জুনের মাথায় একটা মতলব ঢুকল। কেন ঢুকল সে জানে না, হেনরি যখন রিসিভারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তখন সে বলল, রেগন সাহেবকে বলুন, মেজর হিরেটা কিনতে চাইছেন। উনি আপনাকে পনেরো হাজার ডলার দাম দিচ্ছেন।

 

আমি? মেজর আঁতকে উঠলেন, নো! নেভার! পনেরো ডলার পর্যন্ত নয়। ওসব মণিমুক্তো থেকে আমি দশ মাইল দূরে থাকতে চাই।

 

হেনরি যখন কথা বলছিলেন, তখন অর্জুন ঘুরে ঘুরে ঘরটাকে দেখছিল। পুলিশ কি এখানে আগন্তুকের হাতের ছাপ পাবে? এতটা কাঁচা এদেশের মানুষ হবে বলে মনে হয় না। সে এমন কিছু পাচ্ছিল না যা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। হেনরি টেলিফোন নামিয়ে বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে তাকালেন, এ কী কথা! রেগন এখন বিশ হাজার বলছে। লস অ্যাঞ্জেলিসে যেটা আছে, তার দামও নাকি তাই। সাত বছর আগে একটা হাঙর পাগল হয়ে কাচ ভেঙে ফেলবার পর এই হিরেটা নাকি খোয়া গিয়েছিল। তিনটে মার্ডার হয়েছে হিরেটাকে কেন্দ্র করে। শেষ মৃত মানুষটি পৃথিবীতে ছিল আড়াই বছর আগে। তারপর হিরেটার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।

 

মেজর বললেন, কিন্তু রেগন কি কাউকে বলেছে যে, হিরেটা তোমার কাছে আছে?

 

হেনরি ডিমক মাথা নাড়লেন, বললেন, বোকারাই এ নিয়ে আলোচনা করে। বাট আই ডোন্ট বিলিভ। চোর অন্তর্যামী নয়। কিন্তু আমার এসব ভাল লাগছে না, মেজর। বিশ হাজারে দিয়েই দিই। টাকাটা সামনের বছর আমাদের ইয়েতির অনুসন্ধানে কাজে লাগবে।

 

অর্জুন ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল। চোর দ্বিতীয় এবং নীচের ঘরটাই তছনছ করেছে, কিন্তু ওপাশের বন্ধ ঘরটায় ঢোকেনি। দরজাটা ভাঙারও চেষ্টা করেনি। কেন? সময় কম ছিল বলে? তা হলে ওরা এবাড়িতে ঢোকার কাছাকাছি সময়ে চোর পালিয়েছে। বন্ধ ঘরটায় কে থাকে? অর্জুন ওপরের বিধ্বস্ত ঘরটায় কিছু খুঁজে পেল না। তারপর পাশের দরজাটা খুলে বারান্দায় এল। সরু লম্বা বারান্দা। সবুজ ঘাসের লন গা ঘেঁষে। তারপরই ফুলের গাছ। অর্জুন ঝুঁকে দেখতে লাগল। ঘাসের ওপর পায়ের চাপ পড়েছে। দরজাটা যদি সাতদিন বন্ধ থাকে, তা হলে হেনরি এদিকে আসেননি। চাপটা চোরের শরীরের। ঘাস যেখানে হয়েছে, সেখানে নরম মাটির ওপর জুতোর দাগ। অর্জুন লক্ষ করল, জুতোর হিলে অর্ধগোলাকৃতি কিছু বসানো ছিল বলে সেটা মাটিতে ঢুকেছে পা ফেলার সময়। অল্প মাটি উঠে গেছে তাই জুতোর তলায়। দাগটা অনুসরণ করে সে পাঁচিলটা পর্যন্ত গেল। তারপর লাফিয়ে পাঁচিলে উঠে বসল। ওপাশে ঢালু মাঠ, পপলার গাছ, ছবির মতো সুন্দর রাস্তা। কোনও মানুষের চিহ্ন নেই। সে শরীর ঝুলিয়ে এপাশে নেমে এল। মাটি শক্ত, জুতোর চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না। সোজা এগিয়ে এসে রাস্তায় পড়তেই ও পার্কিং লটটা দেখতে পেল। এখানে গাড়ি রেখে স্বচ্ছন্দে ওপরে ওঠা যায়। অর্জুন চারপাশে তাকাল। পার্কিং লটের পাশেই টেলিফোন-বুথের মতো একটা ঘর। ওপর থেকে গাছপালার আড়াল থাকায় এটাকে চোখ পড়েনি। অর্জুন একটু এগিয়ে যেতেই গলা ভেসে এল, ইয়েস সার! হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?

 

বুথের ভেতর টুলে বসা একটি বৃদ্ধ হাসিমুখে প্রশ্নটা ছুড়লেন। অর্জুন মাথা নাড়ল, আমি এক ভদ্রলোককে খুঁজছি, যিনি এখানে গাড়ি রেখেছিলেন একটু আগে।

 

ভদ্রলোক? বৃদ্ধ খিঁচিয়ে উঠলেন, ওকে ভদ্রলোক বোলো না। পনেরো সেন্ট কম দিয়ে গেছে। পার্কিং ফি দিতে যাদের গায়ে লাগে, তারা গাড়ি রাখে কেন?

 

কীরকম দেখতে বলুন তো ওকে?

 

ওই তো লম্বা, ভারী চেহারা, একটা পা সামান্য টেনে হাঁটছিল। আরে, লাল টয়োটা গাড়ি, দু’চক্ষে দেখতে পারি না। বৃদ্ধ বিড়বিড় করছিলেন।

 

গাড়িটার নাম্বার মনে আছে?

 

না। খাতায় লেখা আছে। কিন্তু আপনাকে বলব কেন?

 

অর্জুনের হঠাৎ খেয়াল হল কার্ডটার কথা, যেখানে লেখা আছে, তাকে সাহায্য করা মানে সরকারকে সাহায্য করা হবে। সেটা দেখাতেই বৃদ্ধের মুখের চেহারা পালটে গেল। তিনি খাতা দেখে নম্বর বললেন, এটা রিনসেক কোম্পানির গাড়ি। ওরা গাড়ি ভাড়া দেয়।

 

সামান্য ঘুরে হেনরি ডিমকের বাড়িতে যখন ফিরে এল অর্জুন, তখন মেজর খুব চিন্তিত। দেখামাত্র চিৎকার করে উঠলেন, কোথায় গিয়েছিলে তুমি?

 

একটু পায়চারি করে এলাম। মিস্টার ডিমক, রিনসেক বলে কোনও কোম্পানি আছে যারা গাড়ি ভাড়া দেয়? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

 

থাকতে পারে। কেন?

 

অর্জুন ব্যাপারটা বলল। হেনরি ডিমক গাইড দেখে নম্বর বের করে বোতাম টিপলেন টেলিফোনের। রিনসেক জানাল, ওই নাম্বারের গাড়িটা তিনদিন হল এক ভদ্রলোক ভাড়া নিয়েছিলেন। একটু আগে তিনি ফেরত দিয়ে গেছেন ভাড়া মিটিয়ে।

 

অর্জুন বলল, ব্যাপারটা সুবিধের নয়, মিস্টার ডিমক। আপনি পুলিশকে জানান।

 

হেনরি বললেন, জানাব। কিন্তু আমার খুব লোভ হচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলিসের হাঙরের বাক্সে অন্য যে হিরেটা আছে, সেটাকে দেখতে। আমারটা যদি ওটার জোড়া হয়, তা হলে সমান্তরালভাবে দুটোকে রাখলে যে আলো বের হবে, সেই আলো জলের মধ্যে মিলিত হলে নাকি কোনও হাঙর তা অতিক্রম করতে পারে না। রেগন বলেছিল এটা। পুলিশকে জানালে হিরেটার কথাও বলতে হবে। বললে ওরা জাতীয় সম্পত্তি বলে এখনই নিয়ে নেবে। লস অ্যাঞ্জেলিসের ব্যাপারটা দেখার পর এটা পুলিশের হাতে তুলে দেব।

 

কিন্তু হিরেটা আপনার কাছে রাখা বিপজ্জনক।

 

আমার কাছে নেই।

 

নেই মানে? অর্জুন হতভম্ব হতেই মেজর হাতের ছড়িটা নাচালেন। এখানে আসার সময় মেজরের হাতে ছড়ি ছিল না। কাজ-করা দামি ছড়িটা তিনি হেনরির ডিমকের কাছ থেকেই পেয়েছেন। অর্জুন বলল, ওতে ঠিক থাকবে তো?

 

মেজর হাসলেন, লুকোনো গর্ত। আট-পাঁচ না খুললে পড়ার চান্স নেই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *