গুগুনোগুম্বারের দেশে (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

চার

কাল রাতে আমাদের ঘুম হয়নি। ঘুমোবার সাহসও হয়নি। ঋজুদা ম্যাপ নিয়ে আঁকিবুঁকি করেছিল তাঁবুর সামনে বসে, আর বই পড়েছিল। আমাকে তাঁবুর মধ্যে ঘুমুতে বলেছিল বটে, কিন্তু একটু করে শুয়েছি আর ঋজুদার কাছে এসে বসেছি বারবার আগুনের সামনে।

 

কাল রাতেও সিংহগুলো এসে হাজির হয়েছিল। কিন্তু দূর দিয়ে চলে গেছিল। ওরা বোধহয় কোনো বড় জানোয়ার, মোষ অথবা টোপি মেরে থাকবে। বেশ শান্ত-সভ্য ছিল সে-রাতে। আমাদের কাল কিছুই খাওয়া হয়নি। খাওয়ার মতো মনের অবস্থাও ছিল না। আজ সকালে জিনিসপত্র হাতড়ে বিস্কুটের টিন বেরুল। সেই বিস্কুট আর কফি খেলাম আমরা।

 

আমি বললাম, কী হবে ঋজুদা! চলো আমরা মারিয়াবো পাহাড়ের দিকে যাই নাইরোবি সর্দারের গ্রামে। তাও তো এখান থেকে ষাট সত্তর মাইল কম করে। জলও তো সব ট্রেলারেই ছিল। জল পাব কী করে? তার চেয়ে চলো ফিরে যাই।

 

ঋজুদা আমার চোখে চোখ রেখে বলল, এখানে আমরা কেন এসেছিলাম?

 

আমি ঋজুদার চোখে তাকিয়ে লজ্জা পেলাম। মুখ নিচু করে বললাম, তা ঠিক।

 

ঋজুদা বলল, ভুলে যাস্ না রুদ্র যে, তুই মানুষ! মানুষ মনের জোরে কী না পারে, কী না করতে পারে? একা একা পালতোলা নৌকোতে মানুষ সমুদ্র পেরোয়নি? মরুভূমি পেরোয়নি পায়ে হেঁটে? এইসব জায়গায় যখন প্রথম ইংরেজ ও জার্মান পর্যটকরা আসেন, শিকারীরা আসেন, বিজ্ঞানীরা আসেন, তাঁরা কি গাড়ি করে এসেছিলেন? এই অঞ্চলেই একজন জার্মান প্রজাপতি-সংগ্রাহক একা-একা প্রজাপতি খুঁজতে এসে রিফটভ্যালিতে মানুষের হাড় কুড়িয়ে পেয়ে ফিরে গিয়ে বার্লিন মিউজিয়ামে জমা করেন। তার থেকে আবিষ্কার হয় ওলডুভাই গর্জ-এর। ডঃ লিকি সস্ত্রীক এসে বছরের পর বছর এইরকমই জায়গায়, তাঁবু খাঁটিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি চালান সেখানে। আবিষ্কৃত হয় কত নতুন তথ্য, কত কী জানতে পারেন।

 

একটু চুপ করে থেকে ঋজুদা বলল, রুদ্র, তুই না অ্যাডভেঞ্চারের লোভে প্রায় জোর করেই আমার সঙ্গে এসেছিলি আফ্রিকায়? এরই মধ্যে অ্যাডভেঞ্চারের শখ মিটে গেল! তোর বয়সি গুজরাটি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি ছেলেরা বিদেশ-বিভুঁইতে একা একা ব্যবসা করতে চলে আসে। দেখলি তো ডার-এস-সালাম-এ, আরুশাতে কত ভারতীয় ব্যবসা করছে। তার মধ্যে বাঙালি দেখলি একজনও?

 

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, তুই তাহলে আমার সঙ্গে এলি কেন? আমি তো এখানে ছেলেখেলা করতে আসিনি। জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেই এসেছি।

 

ঋজুদার হাঁটুতে হাত দিলাম। বললাম, আমাকে ক্ষমা করো। বলো, আমরা এখন কী করব?

 

ঋজুদা আমার হাতে হাত রেখে বলল, আমরা এখন জীপের চাকার দাগ ধরে এগোব। প্রথমত, ওরা কোথায় যায় তা দেখতে চাই আমি। আমি যে কাজে এসেছি তার জন্যে ওদের চলাচলের পথ জানা দরকার। দ্বিতীয়ত, ওরা ট্রেলারটা কিছুদূর গিয়েই ছেড়ে দেবে। কারণ ট্রেলার নিয়ে জোরে গাড়ি চালাতে পারবে না। ট্রেলারটা পেলে আমরা মালপত্র পেয়ে যাব। ঐসব মাল ওরা ভয়ে নেবে না- পাছে চোরাই মাল সন্দেহে পুলিস ওদের ধরে।

 

আমি বললাম, তুমি কি পায়ে হেঁটে ওদের গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে?

 

ঋজুদা বলল, তা পারব, যদিও সময় লাগবে। তাছাড়া ভুষুণ্ডার সঙ্গে আমার বোঝাপড়া আছে। আসলে ও তো কর্মচারী। এই যে সব লোক দেখছিস, এই সব নানা চোরাশিকারীর দল, ভুষুণ্ডার মতো অর্ধশিক্ষিত লোকেরা, সব এক বিরাট দলের মধ্যে আছে। এই সব দলকে চালায় খুব ধনী ব্যবসায়ীরা। তাদের অন্য ব্যবসার আড়ালে এটাও তাদের একটা লাভের ব্যবসা। আমি যে কাজে এসেছি, তা সফল হলে, অনেক রাঘববোয়ালের মাথা ধরে টান পড়বে। তাই তারা আগেভাগেই বুদ্ধি করে ভুষুণ্ডাকে আমার দলে ভিড়িয়ে দিয়েছিল। সর্ষের মধ্যেই ভূত ঢুকিয়ে দিয়েছিল, ভূত আর ঝাড়বে কী করে বল্ ওঝা? ভুষুণ্ডা একা-লোক নয়। ও এক বিরাট চক্রের একটি যন্ত্র মাত্র। ও তো সামান্য চাকর। আমার দরকার ভুষুণ্ডার মালিকদের। ফয়সালা তাদেরই সঙ্গে। তবে ভুষুণ্ডার সঙ্গেও বোঝাপড়া করতে হবে টেডির কারণে। টেডির মৃত্যুর প্রতিশোধ এই আফ্রিকার জঙ্গলেই আমি নেব।

 

আমি বললাম, চলো তাহলে, আর দেরি কেন?

 

ঋজুদা উঠল। দুজনের হ্যাভারস্যাকে যা-যা অবশ্য-প্রয়োজনীয় জিনিস নেওয়া যায় তা ভরে নিয়ে, দুজনের কাঁধে দুটি জলের ছাগল উঠিয়ে ভাল করে বেঁধে নিয়ে আমরা রওনা হলাম নিরুদ্দেশ যাত্রায়। পিছনে পড়ে রইল তাঁবু দুটো– আমাদের ক্যাম্প-কট, বিছানা, জুতো জামা, অনেক কিছু জিনিস, যা বইবার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর পড়ে রইল টেডি, চিরদিনের জন্যেই পড়ে রইল।

 

ল্যাণ্ড-রোভার আর ট্রেলারের চাকার দাগ দেখে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। মাইল দুয়েক আসার পর পিছনের সব-কিছু ধুধু মাঠের রোদের তাপে আর হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। এখন আমরা আবার ঘাসের সমুদ্রে এসে পড়লাম। কম্পাসই সম্বল এখন। আর সূর্য। এই সাভানা। পৃথিবীর এক ভৌগোলিক আশ্চর্য!

 

সারাদিনে হেঁটে আমরা কত মাইল এলাম বলা মুশকিল, কিন্তু আমরা এখনও ল্যাণ্ড-রোভারের চাকার দাগ হারাইনি। মাঝে একবার গোলমাল হয়ে গেছিল দুপুরের দিকে। তারপর ঋজুদা আবার খুঁজে পেয়েছিল। যেদিকে চোখ যায় শুধু ধু-ধু হলুদ ঘাসের প্রান্তর। একটাও গাছ নেই, ঘর নেই, বাড়ি নেই, মানুষ নেই-শুধু জানোয়ারের মেলা। সেৎসী মাছির জন্যে এখানে মাসাইরাও বিশেষ গরু চরাতে পারে না। বসবাস করতে পারে না রাইফেল বন্দুকধারী মানুষও। এমনই সাংঘাতিক এই মৃত্যুবাহী মাছিরা।

 

সন্ধের আগে-আগে আমরা কিছুটা ঘাস পরিষ্কার করে জিনিসপত্র নামিয়ে বসলাম। এক টিন ককটেল সসেজ বেরোল। কফি এখনও আছে। কফি আর সসেজ খেয়ে, হ্যাভারস্যাকে মাথা দিয়ে রাইফেল পাশে রেখে কম্বল মুড়ে শুয়ে পড়লাম দুজনে। পাশাপাশি! রাতে ভাল ঠাণ্ডা পড়বে।

 

আস্তে-আস্তে তারারা ফুটে উঠল। কাল থেকে আজ চাঁদের জোর বেশি। দিনভর হেঁটে দুজনেই খুব ক্লান্ত ছিলাম। ঋজুদা তো কাল রাতে একটুও ঘুমোয়নি। তাই দুজনেই শুতে না শুতেই ঘুমোলাম।

 

মাঝরাতে কী যেন একটা শব্দে আমি চমকে উঠলাম। মনে হল ভূমিকম্প হচ্ছে বুঝি। হঠাৎ হাজার-হাজার খুরের জোর শব্দে ঘুম-চোখে উঠে বসে দেখি, ঋজুদা আমাদের দুজনেরই পাঁচ ব্যাটারির টর্চ দুটো জ্বালিয়ে রেখেছে সামনে। আর সেই আলোতে দূরে দেখা যাচ্ছে হাজার-হাজার জানোয়ার জোরে ছুটে যাচ্ছে পশ্চিম থেকে পুবে প্রচণ্ড শব্দে ধুলোর ঝড় উড়িয়ে।

 

আমি ঋজুদাকে জিজ্ঞেস করতে গেলাম, কী ব্যাপার?

 

কিন্তু আমার গলার স্বর গলার মধ্যেই মরে গেল। এত আওয়াজ!

 

অনেকক্ষণ, কতক্ষণ ধরে যে ওরা দৌড়ে গেল তার হিসেব করতে পারলাম না। শব্দ থামলে দেখা গেল, ধুলোর মেঘে আকাশের চাঁদ-তারা সব ঢেকে যাওয়ার যোগাড়।

 

ঋজুদা বলল, আশ্চর্য! এই সময় তো মাইগ্রেশনের সময় নয়! ওরা এমন করে দৌড়ে গেল কেন? কোনো আগ্নেয়গিরি কি জেগে উঠল? নিশ্চয়ই কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা ঘটবে। নইলে এ-রকম হত না।

 

কত হাজার জানোয়ার যে ছিল বলতে পারব না। লক্ষও হতে পারে। জেব্রা, ওয়াইল্ডবীস্ট আর গ্যাজেলস।

 

ঋজুদা বলল, আমরা এতক্ষণে কিমা হয়ে মিশে যেতাম ওদের পায়ে-পায়ে। দূর থেকে শব্দ শুনে উঠে পড়ে ভাগ্যিস দুটো টর্চ একসঙ্গে জ্বালিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাতে লেগেছিলাম। তাতেই সামনে যারা আসছিল তারা দয়া করে পথ একটু পালটাল। নইলে পুরো দলটাই আমাদের উপর দিয়ে চলে যেত।

 

আমি বললাম, ঋজুদা! ল্যাণ্ড-রোভারের চাকার দাগ তো আর দেখা যাবে না। ওরা বোধহয় কয়েক মাইল জায়গা একেবারে সাদা করে দিয়ে গেছে পায়ে-পায়ে। তাই না?

 

ঋজুদা বলল, ঠিক বলেছিস তো? আমার তো খেয়ালই হয়নি।

 

বললাম, এখন কী করবে তবে?

 

ঋজুদা বলল, ঘুমুব। নে, শুয়ে পড়। আর মনে কর, তোদের বাড়ির দক্ষিণের ঘরে, গ্রিল-দেওয়া জানালার পাশে ডানলোপিলোর বিছানায় ধবধবে সাদা চাদরে ঘুমিয়ে আছিস। ঠিক ছ’টার সময় জনার্দন ট্রেতে করে ফলের রস এনে বলবে, ওঠো গো দাদাবাবু! আর কত ঘুমোবে?

 

আমি হেসে ফেললাম। বললাম, তুমিও সেইরকম ভাবো।

 

বলে, দুজনেই শুয়ে পড়লাম।

 

ভোর হল শকুনের চিৎকারে। আমাদের চারধারে বড় বড় বিশ্রী দেখতে লাল-মাথা প্রায় একশো শকুন উড়ছে, বসছে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অদ্ভুতভাবে হাঁটছে। আমরা কি মরে গেছি? নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখলাম, না তো! দিব্যি নিশ্বাস পড়ছে। ঋজুদা দেখলাম ছবি তুলছে শকুনগুলোর।

 

আমি উঠে বসতেই ঋজুদা বলল, আশ্চর্য! এরা কি আমাদের মড়া ভাবল! ব্যাপারটা কী বল তো?

 

আমার মনে পড়ল টেডি বলেছিল একটা প্রবাদের কথা। শকুন যদি কোনো জীবন্ত মানুষের তিন দিকে ঘিরে থাকে তাহলে সে মানুষ তিন দিনের মধ্যে মরে যায়। শকুনগুলো আমাদের চারদিক ঘিরে রয়েছে।

 

ঋজুদাকে এই কথা বলতেই সে বলল, তোর লেখাপড়া শেখা বৃথা হয়েছে।

 

বলেই, গুলিভরা শটগানটা তুলে নিয়ে দুমদাম করে দুদিকে দুটো গুলি করে দিল। দুটো শকুন উল্টে পড়ল। অন্য শকুনগুলো সঙ্গে-সঙ্গে বিচ্ছিরি চিৎকার করে উড়ে গেল।

 

ঋজুদা বলল, চল তো এই ভাগাড় থেকে পালাই। বলে মালপত্র উঠিয়ে নিয়ে অন্যদিকে চলল। পিছন-পিছন আমি।

 

আমরা একটু দূরে গিয়ে, ঘাস পরিষ্কার করে, খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করছি, এমন সময় দেখি অন্য শকুনগুলো ঐ দুটো মরা শকুনকে খেতে লেগেছে।

 

ঋজুদা সেইদিকে একদৃষ্টে চেয়ে গম্ভীরভাবে বলল, এদের দেখে আমার মানুষদের কথা মনে পড়ছে। সংসারে কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা এই শকুনগুলোর মতো।

 

আমি বিস্কুটের টিন বের করলাম। নাইরোবি সর্দারের দেওয়া দুটো কলা ছিল। মুখ ধোওয়া, দাঁত মাজা, সব ভুলে গেছি। জল কোথায়? খাওয়ার জলই যেটুকু আছে তাতে কদিন চলবে ঠিক নেই। ঋজুদাকে কলা ও বিস্কুট এগিয়ে দিয়ে কফির জল চড়ালাম, কফির খালি টিনে।

 

ঋজুদা বাইনাকুলারটাকে তুলে নিয়ে চোখে লাগিয়ে এদিকে-ওদিকে দেখতে লাগল। আমি খেতে-খেতে ফুটন্ত জলের দিকে লক্ষ রাখলাম।

 

হঠাৎ ঋজুদা বাইনাকুলারটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ভাল করে দ্যাখ তো, রুদ্র। কিছু দেখতে পাস কি না?

 

ফোকাসিং নবটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে ভাল করে দেখে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। জাইস-এর বাইনাকুলার। খুবই পাওয়ারফুল। তাতে দেখলাম দূরদিগন্তের একটি জায়গায় একটু সবুজ-সবুজ ভাব–যেন জঙ্গল আছে, আর তার ঠিক সামনে একটা ল্যাণ্ড-রোভার ট্রেলার সুদ্ধু!

 

বাইনাকুলারটা নামিয়ে খালি চোখে কিছুই দেখতে পেলাম না।

 

ঋজুদা বলল, কী দেখলি?

 

আমি বললাম, দেখলাম।

 

ঋজুদা বলল, তবে এবার খেয়েদেয়ে চল্। যাওয়া যাক।

 

খাওয়া শেষ করে আমরা আবার মালপত্র কাঁধে নিয়ে রওনা হলাম।

 

ট্রেলারটা ভুষুণ্ডা ছেড়ে যাছে ভেবেছিলাম। ঋজুদা তেমনই বলেছিল। কিন্তু জীপটাও যখন ট্রেলারের সঙ্গে আছে তখন ব্যাপারটা কী বোঝা যাচ্ছে না মোটেই। ওরা কি তবে ওখানেই আছে? গাড়ির কাছে? নাকি গাড়ি এবং ট্রেলার হজম করতে পারবে না বলে পথেই ফেলে গেছে।

 

একটু যেতেই হঠাৎ গুড়-গুড়-গুড় একটা শব্দ শুনতে পেলাম। চারধারে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না আমি। ঋজুদা আকাশে তাকাতে বলল। তাকিয়ে দেখি, এক-এঞ্জিনের একটা সাদা আর হলুদ রঙের মোনোপ্লেন উত্তর থেকে দক্ষিণে যাচ্ছে।

 

ঋজুদা তাড়াতাড়ি মালপত্র নামিয়ে রেখে তারা জামার কলারের নীচে ভাঁজ করে রাখা লাল সিল্কের রুমালটা জোরে জোরে নাড়তে লাগল। আমিও ক্যামেরা-মোড়া হলুদ কাপড়ের টুকরোটাকে পতাকার মতো ওড়াতে লাগলাম হাওয়াতে। কিন্তু প্লেনটা আমাদের দেখতে পেল বলে মনে হল না। যেমন যাচ্ছিল, তেমনই উড়ে চলল। দেখতে-দেখতে একটি ছোট্ট হলুদ-সাদা পাখির মতো দিগন্তে হারিয়ে গেল প্লেনটা।

 

আমরা আবার মালপত্র তুলে নিয়ে এগোলাম।

 

কিছুদূর যাওয়ার পর খালি চোখেই গাড়িটাকে দেখা গেল দিগন্তে একটা গুবরে পোকার মতো। আমরা এগিয়ে চললাম। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর গাড়িটার কাছাকাছি এসে ঋজুদা বলল, এবারে একসঙ্গে নয়। তুই বাঁ দিকে চলে যা, আমি ডান দিকে যাচ্ছি। গুলি ভরে নে তোর শটগানে। কোনো লোক দেখলেই গুলি চালাবি। ওদের তীর যতখানি দূরে পৌঁছতে পারে সেই দূরত্বে পৌঁছনোর অনেক আগেই গুলি চালাবি। আর কোনো খাতির নেই। কোনো রিস্ক নিবি না। খুব সাবধান। ওরা গাড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে। তাহলে একেবারে কাছে না-যাওয়া অবধি কিন্তু বুঝতেই পারবি না।

 

সুতরাং খুউব সাবধান!

 

আমরা ছাড়াছাড়ি হওয়ার আগে ঋজুদা আরেকবার বাইনাকুলার দিয়ে ভাল করে দেখে নিল, গাড়িটা এবং তার চারপাশ।

 

তারপর বলল, গুড লাক্, রুদ্র।

 

আমরা দুজনে দুদিকে ছড়িয়ে যেতে লাগলাম। ক্রমশ দুজনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যেতে লাগল। যখন আমি গাড়িটা থেকে দুশো গজ দূরে তখন আমার দিকে লক্ষ করে গাড়ির দিক থেকে কেউ গুলি ছুঁড়ল। আমি কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। গাদা-বন্দুকের গুলি। আমার সামনে পড়ল গুলিটা। ধুলো উড়ে গেল। আমি গুলি করার আগেই ঋজুদার রাইফেলের গুলির আওয়াজ হল। আমি দৌড়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম এবার। আমার শটগান-এর এফেক্টিভ রেঞ্জ একশো গজ। তার চেয়ে বেশি দূর থেকে গুলি করে লাভ নেই। আরও একবার গুলি হল। এবার দেখতে পেলাম, দুজন লোক একজন লোককে বয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে যাবার চেষ্টা করছে। ঐ লোকটার গায়ে নিশ্চয়ই ঋজুদার গুলি লেগেছে। আমি এবারে গুলি করলাম এল-জি দিয়ে। দুটো লোকের মধ্যে একটা লোক পড়ে গেল। তখন বাকি লোকটা তাকে ও অন্য লোকটিকে ফেলে খুব জোরে দৌড়ে পালাল। লোকটার দৌড়নোর ধরন ও জামাকাপড় দেখে মনে হল যে, সে ভুষুণ্ডা। আমার ভুলও হতে পারে। অল্পক্ষণের মধ্যেই যে লোকটি দৌড়চ্ছিল সে পিছনের নিবিড় জঙ্গলে পৌঁছে চোখের আড়াল হয়ে গেল।

 

আমি আর ঋজুদা প্রায় এক সঙ্গেই দৌড়ে গিয়ে গাড়ির কাছে পৌঁছলাম। ঋজুদা ট্রেলারের উপর উঠে গাড়ির ভিতরটা ভাল করে দেখে নিল। তারপর মাটিতে শুয়ে থাকা লোক দুটোর দিকে এগিয়ে এল। আমি ঐ দিকেই যাচ্ছিলাম। এমন সময় সাঁ করে একটা তীর ছুটে এল আমার দিকে। যে-লোকটা গুলিতে ধরাশায়ী হয়েছিল সে-ই তীরটা ছুঁড়েছিল। কিন্তু শুয়ে-শুয়ে ছোঁড়ার জন্যেই হোক, বা যে কারণেই হোক, তীরটা আমার মাথার অনেক উপরে দিয়ে চলে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঋজুদার রাইফেলের গুলি লোকটাকে স্তব্ধ করে দিল। লোকটা একটু নড়ে উঠে পা দুটো টান-টান করে ছড়িয়ে দিল। তীরধনুক-ধরা হাত দুটো দুদিকে আছড়ে পড়ল ঘাসের উপর।

 

আমরা গিয়ে লোক দুটোর কাছে দাঁড়ালাম। প্রথম লোকটি, যাকে বাকি দুজন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, ততক্ষণে মরে গেছে। ঋজুদার রাইফেলের গুলি তার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। দ্বিতীয় লোকটিও মারা যাবে এক্ষুনি। আমরা কাছে যেতেই বিড়বিড় করে কী বলল।

 

ঋজুদা ওয়াটার-বটল খুলে তার মুখে জল ঢেলে দিল। এক ঢোক খেল সে। তারপরই মুখটা বন্ধ হয়ে গেল, কষ বেয়ে জল গড়িয়ে গেল, মাথাটা একপাশে এলিয়ে গেল। দুটি খোলা চোখ স্থির হয়ে আমাদের দিকে চেয়ে রইল।

 

আমার গা বমি-বমি লাগছিল। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।

 

ঋজুদা বলল, বেচারিরা! ওরা কেউ নয়। যারা ওদের আড়ালে থাকে চিরদিন, তাদের মারতে পারলে তবেই হত।

 

তাড়াতাড়ি ট্রেলারের উপরের দড়ি কেটে কয়েক টিন খাবার বের করে নিল ঋজুদা। পাইপের টোব্যাকো, দেশলাই এবং রাইফেল ও বন্দুকের গুলিও। তারপর বলল, আর নষ্ট করার মতো সময় নেই। চল রুদ্র।

 

আমরা দৌড়ে চললাম যেদিকে ঐ লোকটা দৌড়ে গেছিল সেদিকে।

 

দৌড়তে-দৌড়তে আমি ঋজুদাকে শুধোলাম, ভুষুণ্ডা?

 

ঋজুদা ঘাড় নেড়ে জানাল, হ্যাঁ। মুখে কোনো কথা বলল না।

 

জঙ্গলের কিনারাতে দৌড়ে যেতেই পরিষ্কার দেখা গেল একটা পায়ে-চলা পথ। আমরা সেই পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেইসময় কে যেন আবার গুলি করল অনেক দূর থেকে গাদা-বন্দুক দিয়ে। সিসের গুলিটা ঠক্ করে আমাদের একেবারে সামনে একটা বড় গাছের গুঁড়িতে এসে আটকে না গেলে কী হত বলা যায় না।

 

আমরা শব্দ লক্ষ করে দৌড়লাম! পথ ছেড়ে।

 

কিন্তু শব্দটা যেদিক থেকে এসেছিল সেইদিকে দৌড়ে গিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম। এমনকী কারো পায়ের চিহ্নও নয়। তবে কি গাছ থেকে কেউ গুলি ছড়ল? ভুষুণ্ডা কি এই জঙ্গলে একা, না সঙ্গে আরো লোক আছে? কিছুটা এগিয়ে যাবার পরই সামনে একটু দোলা-মতো জায়গা দেখলাম। সেখানে চাপ চাপ ঘাস হয়েছে সবুজ। বর্ষাকালে নিশ্চয়ই জলে ভরা থাকে জায়গাটা। সেই জায়গাটাতে নেমে গেল ঋজুদা, তারপর আমাকে ইশারাতে ডেকে নামতে বলল। সেই দোলার মধ্যে থেকে একটা প্রকাণ্ড বড় গাছ উঠেছে। ফিকাস্ গাছ। ঋজুদা আমাকে আগে উঠতে ইশারা করল, আমার পিছনে-পিছনে নিজে উঠল। আমরা কুড়ি ফুট মতো উঠে দুটি বড় ডাল দেখে পাশাপাশি বসলাম। ঐ মালপত্র নিয়ে গাছে ওঠা সহজ কথা নয়। কিন্তু আমাদের তো সবই গেছে–এখন এই সবেধন নীলমণি যা আছে তা খোয়ালে বাঁচাই মুশকিল হবে। তাই এগুলোকে কাঁধছাড়া করা যাচ্ছে না এক মুহূর্তও।

 

কারো মুখে কথা নেই কোনো। আমরা দুজনে দুদিকে দেখছি। হঠাৎ নীচের সবুজ দোলা থেকে প্রচণ্ড জোরে কে যেন শিস দিল। এত জোরে হল শব্দটা যে, মনে হলো কোনো গাড়ির টায়ার পাংচার হল বুঝি।

 

ঋজুদা চমকে উঠল। মনে হল, একটু ভয়ও পেল। ভয় পেতে তাকে বড় একটা দেখিনি। পরমুহূর্তেই বলল, তোর কাছে এক নম্বর কি দুনম্বর শটস আছে?

 

আমি হ্যাভারস্যাকে হাত ঢুকিয়ে বের করলাম একটা দু’নম্বর গুলি!

 

ঋজুদা বলল, তোর বন্দুকের ডান ব্যারেলে ভরে রাখ। এক্ষুনি।

 

ডান ব্যারেল থেকে এল-জি বের করে শটস ভরে নিলাম। ঠিক সেই সময় আবার শব্দটা হল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না।

 

কিছুক্ষণ পর সেই শব্দটা দূরে, জঙ্গলের গভীরে শুনলাম। আমরা যেদিক থেকে এলাম সেদিকে।

 

ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, গুলি আবার বদলে নিয়ে বোস।

 

ঐ গাছে বসেই লক্ষ করলাম যে, আমাদের বাঁ দিকে, জঙ্গলের প্রায় গায়ে একটা প্রকাণ্ড কোপি আছে। বিরাট-বিরাট বড় বড় কালো পাথর আর গুহায় ভরা টিলার মতো। এমন অদ্ভূত টিলা আমাদের দেশে দেখা যায় না।

 

আমি ঋজুদাকে ইশারাতে দেখালাম। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ঐদিকে, তারপর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ঋজুদার।

 

কী একটা ছোট কাঠবিড়ালির মতো জানোয়ার সামনের একটা গাছে উঠছিল, নামছিল। ছাই আর সবুজ-সাদা রঙ, ন্যাড়া মুখটা।

 

ঋজুদাকে দেখালাম ঐ দিকে। ঋজুদা বলল, ওটা কাঠবিড়ালি নয়। একটা পাখি। ওদের নাম গো এওয়ে। ওদের ডাক শুনলে মনে হয় বলছে, গো-এওয়ে, গো-এওয়ে।

 

আমি বললাম, ও তো তাহলে আমাদের চলে যেতে বলছে?

 

ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, আপাতত এখানেই শুয়ে ঘুমো। এত মোটা-মোটা ডাল। খাটের চেয়েও চওড়া। তবে দেখিস, নাক ডাকাস না যেন।

 

দুপুরে কোনো আওয়াজ পেলাম না কারও। গাছের ডালে বসেই ক্যানড স্যামন খেলাম আমরা। আর জল।

 

আমার অধৈর্য লাগছিল। গাছের ডালে ঘন্টার পর ঘন্টা বাঁদরের মতো বসে থেকে কী লাভ?

 

এদিকে ভুষুণ্ডা কত মাইল ভিতরে চলে গেছে এতক্ষণে! ঋজুদা কী যে করে, কেন যে করে, সে-সব আমার বোঝা ভার। মাঝে-মাঝে বিরক্তি লাগে। মুখে বলেও না কিছু যে, মতলবটা কী তার!

 

বিকেলে যখন আলো পড়ে এল তখন আস্তে-আস্তে আমরা গাছ থেকে নামলাম। ঋজুদা বলল, একদম শব্দ করবি না। আর আলোও জ্বালাবি না।

 

বাইরের বিস্তীর্ণ মাঠে যদিও তখন অনেক আলো, বনের ভিতরে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। নানা জাতের হরিণ, পাখি ও বেলুনের ডাকে জঙ্গল সরগরম। সেৎসী মাছির পাখার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে বনাঞ্জা প্লেনের এঞ্জিনের শব্দের মতো।

 

ঋজুদা আস্তে-আস্তে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে গাড়ির দিকে। কিন্তু যে-পথ দিয়ে এসেছিলাম তা থেকে প্রায় তিন-চারশো গজ বাঁ দিক দিয়ে একেবারে গভীর জঙ্গলের ভিতরে-ভিতরে চলেছি আমরা। সামনেই একটা নদী আছে। জলের কুলকুল শব্দ আসছে। আর-একটু এগোতেই খুব জোর হাপুস-হুপুস শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হল, হাতির দল বোধহয় নদীতে নেমেছে। জলের কাছাকাছি এসে সামান্য আলোয় দেখলাম। জলের মধ্যে এক-দেড় হাত লম্বা মতো কী কতগুলো লালচে-লালচে ফোলা-ফোলা জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভাসছে আর মাঝে-মাঝে তাদের গা থেকে ফোয়ারার মতো জল ছিটকে উঠছে।

 

এমন জিনিস আমাদের দেশে কখনও দেখিনি আমি। অবাক হয়ে জলের পাড়ে দাঁড়িয়ে বোঝবার চেষ্টা করছিলাম, ওগুলো কী জানোয়ার।

 

এমন সময় ঋজুদা আমার কাঁধে জোরে চাপ দিয়ে বলল, এগিয়ে চল। দাঁড়াস না।

 

আমি ফিসফিস করে একেবারে ঋজুদার কানের সঙ্গে কান লাগিয়ে বললাম, কী? কুমির?

 

ঋজুদা বলল, হিপোপটেমাস্। জলহস্তী! পালিয়ে চল্।

 

আমি তাড়াতাড়ি পা চালাতে চালাতে ভাবলাম, কত বড় জানোয়ার–অথচ সমস্ত শরীরটা জলে ডুবিয়ে শুধু নাকটা বের করে রয়েছে, যেমন কুমিরেরা করে। জলহস্তী উভচর জানোয়ার। তবে জল বেশি ভালবাসে।

 

আমরা জঙ্গল আর রেড-ওট ঘাসের বনের সীমানাতে এসে ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে পড়লাম। ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, অন্ধকার হয়ে গেলে আমি একা গাড়ির কাছে যাব। চাবিটা গাড়িতেই লাগানো আছে দেখেছিলাম। তারপর হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে সোজা চলে যাব আস্তে আস্তে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, ভুষুণ্ডা পথের আশেপাশে কোনো গাছে বা ঝোপঝাড়ের আড়ালে অপেক্ষা করছে। ও জানে যে, আমরা গাড়ির লোভ ছাড়তে পারব না। সারা দিন ওকে খুঁজে না-পেয়ে আমরা ঠিক ফিরে যাব গাড়িতে। এবং হয়তো গাড়িতেই থাকব রাতে। অথবা গাড়ি নিয়েই চলে যাব একেবারে। যা পেট্রল আছে আমাদের, তাতে গোরোংগোরো আগ্নেয়গিরির কাছে মাসাইদের বস্তিতেও চলে যেতে পারব। একবার যদি বড় রাস্তায় উঠতে পারি, তাহলে অন্য গাড়ির দেখা পাবই। আর পেলে, সেরোনারাতে খবর চলে যাবে। তখন কোনো অসুবিধা হবে না আর। যে কারণে আমি যাচ্ছি তোকে এখানে একা রেখে, সেই কারণটা হচ্ছে এই যে, ভুষুণ্ডা গাড়ির কাছেও গিয়ে পৌঁছে থাকতে পারে দিনে-দিনেই। ও হয়তো গাড়ির মধ্যেই অপেক্ষা করছে। কারণ ও জানে যে, ও যা করেছে এতদিন, এবং টেডিকে অকারণে খুন করেছে–সেই সবের শাস্তি ওকে পেতেই হবে যদি আমার অথবা তোর দুজনের মধ্যে একজনও বেঁচে ফিরি। তাই ও আমাদের ছেড়ে পালাতে পারবে না। আমরা বেঁচে-ফেরা মানে ওর সর্বনাশ। ওদের পুরো দলেরই সর্বনাশ! ও বোধহয় ভেবেছিল, টেডি ছাড়া, গাড়ি ছাড়া আমরা সিংহ আর সেৎসীদের হাতে সেরেঙ্গটিতেই মরে যাব। আমরা যে পায়ে হেঁটে ওর পিছু নেব এমন কথা ও ভাবতেও পারেনি। ও এখন নানা কারণে মরিয়া হয়ে আছে। ও যদি গাড়িতেই গিয়ে থাকে, আমি নিজেই যেতে চাই। তোকে পাঠানো ঠিক হবে না।

 

ঠিক এমন সময় আমাদের অনেক ডান দিকে তিন-চারজন লোকের উত্তেজিত গলা শুনলাম। তাদের মধ্যে কী নিয়ে যেন তর্ক লেগেছে। ওদের মধ্যেই কেউ বকা দেওয়াতে ওরা সব চুপ করে গেল।

 

ঋজুদা যেন কী ভাবল। তারপর বলল, নাঃ। ওরা অনেকে আছে। তুইই যা রুদ্র। খুব সাবধানে অনেকখানি বাঁ দিকে গিয়ে আস্তে-আস্তে গাড়িতে পৌঁছবি। গাড়িতে যদি কাউকে দেখতে পাস তবে সঙ্গে-সঙ্গে গুলি চালাবি। আর কাউকে দেখতে না পেলে গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে, গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা গাড়ি চালাবি। এক সেকেণ্ডও দেরি করবি না। তারপর গাড়ি চালিয়ে চলে যাবি। একেবারে মাইল দশেক গিয়ে গাড়ি থামিয়ে, গাড়ির কাচ-টাচ সব বন্ধ করে, খাওয়া-দাওয়া করে গাড়িতেই বসে থাকবি। গাড়ির মুখটা এদিকে ঘুরিয়ে রাখিস। যদি এরা আমাকে ঘায়েল করতে পারে, তবেই তোর কথা ভাববে।

 

আমি বললাম, ঋজুদা, খুব সাবধান। তোমাকে একা ফেলে যেতে ইচ্ছে করছে না আমার।

 

ঋজুদা বলল, যে কম্যাণ্ডার, তার কথা শুনতে হয়। গুড লাক্। বী আ ব্রেভ ম্যান। ঊ্য আর নো মোর আ বয়।

 

আমি আস্তে আস্তে ভুতুড়ে চাঁদের আলোতে ভুতুড়ে ছায়ার মতো আড়াল ছেড়ে ঘাসবনে উঠে গেলাম। তারপর বাঁ দিকে আরও কিছুদূর চলে গিয়ে খুব আস্তে-আস্তে গাড়ির দিকে এগোতে লাগলাম।

 

সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় মেঘে ঢেকে গেল আকাশ। এত মেঘ যে কোন্ দিগন্তে লুকিয়ে ছিল কে জানে? হয়তো খনভাম ভুষুণ্ডা আর তার সঙ্গীদের মিছিমিছি এত জানোয়ার মারার কারণে দারুণ চটে গিয়ে চাঁদকে ঢেকে দিলেন মেঘে যাতে আমাকে ওরা দেখতে না পায়। কিন্তু অন্ধকার হয়ে গেলে ঋজুদাও ওদের আর দেখতে পাবে না। মহা মুশকিলে পড়া গেল। ঠাণ্ডা-ভিজে হাওয়া বইতে লাগল আর মেঘের মধ্যে গুড়গুড় করে বাজের ডাক শোনা যেতে লাগল। খনভাম কথা বলছেন। এখন খনভামের গলার স্বর, টেডি, তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? আমরা তোমার মৃত্যুর বদলা নিতে এসেছি।

 

আহা! টেডি মানুষটা বড় সরল আর ধার্মিক ছিল।

 

কতক্ষণ পর আমি আন্দাজে গাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছলাম তা নিজেই জানি না। অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায় তাতে ভাল করে দেখে নিলাম দূর থেকে। কান খাড়া করে শুনলাম কোনো আওয়াজ পাই কি না। হায়নার দল এসে সেই মরা লোক দুটোকে খাচ্ছে। দূর থেকে আমাকে দেখতে পেয়েই তারা হাঃ হাঃ হাঃ করে বুককাঁপানো হাসি হেসে উঠল।

 

কিন্তু নাঃ। হায়নার আওয়াজ ছাড়া কোনোই আওয়াজ নেই।

 

আফ্রিকার হায়নারা যে শুধু মরা মানুষ বা পশুর মাংসই খায়, তাই নয়; তারা দল বেঁধে বুনো কুকুরদের মতো শিকারও করে। যদিও শিকারের কায়দাটা অন্যরকম। তাই আফ্রিকান হায়নারা সিংহের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। খুব সাবধানে বন্দুকের ট্রিগার-গার্ডে আঙুল ছুঁইয়ে আস্তে-আস্তে গাড়ির দিকে এগোতে লাগলাম।

 

গাড়ির দরজাটা আস্তে করে খুলে, দরজাটা বন্ধ না করে লাগিয়ে রাখলাম। যাতে, শব্দ না হয় কোনো। তারপর অন্ধকারেই সুইচটার সঙ্গে চাবি আছে কি না হাত দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে দেখলাম।

 

একবার খুব জোরে বিদ্যুৎ চমকাল। ড্যাশবোর্ডের আলো জ্বালিয়ে তেল দেখলাম। আমার গলা শুকিয়ে গেল। তেল একেবারেই নেই। পিছনের জ্যারিকেনে হয়তো আছে, যদি-না ওরা তা সরিয়ে নিয়ে গিয়ে থাকে; কিন্তু এখন তো তেল থাকলেও ঢালা যাবে না! ড্যাশবোর্ডের আলো জ্বালাবার পরই আমার খেয়াল হল যে, ওই আলোর সঙ্গে সাইড লাইটও নিশ্চয়ই জ্বলে উঠেছিল বাইরে। ওরা তাহলে জেনে গেছে যে, গাড়িতে কেউ ঢুকেছে।

 

আরেকবার বিদ্যুৎ চমকাল। আমি মাথা নামিয়ে নিলাম। ঠিক এমনি সময়ে গাড়ির নীচ থেকেই যেন সেই দুপুরে শোনা শব্দটা আবার শুনলাম, হিসসসস। যেন গাড়ির টায়ার পাংচার হল। আমি চমকে উঠলাম। বন্দুকটা শক্ত করে ধরলাম। জানোয়ারটা যে কী তা ঋজুদা একবারও বলেনি। দৈত্য-দানো নয় তো! গুগুনোগুম্বার বা ওগরিকাওয়া বিবিকাওয়া কোনো আশ্চর্য জানোয়ারের রূপ ধরে আসেনি তো এই দুযোগের রাতে?

 

এখন গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। জেরিক্যান থেকে তেল ঢাললেও শব্দ হবে অনেক। কী করব বুঝতে না পেরে আমি সামনের উইন্ডস্ক্রীনের নবটা ঘুরিয়ে যাতে বন্দুকের নল বের করা যায় ততটুকু তুলে, চুপ করে বসে রইলাম। এবারে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করল ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে। গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছিল। একবার খুব জোর করে বিদ্যুৎ চমকাল। আর আমি মাথা নামানোর আগেই দেখলাম, চারজন লোক গাড়ির বেশ কাছে চলে এসেছে। ওরা দৌড়ে আসছে নিঃশব্দে।

 

বন্দুকের নলটা বাইরে বের করে বাঁ হাতের তেলোর উপরে রাখলাম; যাতে শব্দ না হয়। ট্রিগার-গার্ডেও হাত ছুঁইয়ে রইলাম।

 

বিদ্যুতের আলোতে দেখেছিলাম যে, ওদের তিনজনের হাতে তীর-ধনুক ও একজনের হাতে বন্দুক আছে। ওদের দেখে হায়নাগুলো আবার ডেকে উঠল। কিন্তু ভোজ ছেড়ে নড়ল না।

 

ওরা আরও একটু কাছে আসুক, একেবারে সিওর রেঞ্জের মধ্যে, আমি ব্যারেল ঘুরিয়ে একসঙ্গে দুটি ব্যারেলই ফায়ার করব।

 

সাঁত করে হঠাৎ একটা শব্দ শুনলাম। একটা হায়না সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। বুঝলাম, বিষের তীর ছুঁড়ছে ওয়াণ্ডারাবোরা। সঙ্গে-সঙ্গে অন্যান্য হায়নাগুলো পড়ি-কি-মরি করে পালাল। লোকগুলো প্রায় এসে গেছে, ঠিক সেই সময় হিসসসস শব্দটা আবার শুনলাম গাড়ির তলা থেকে। তারপরই কিছু বোঝার আগেই লোকগুলো চোঁ-চা দৌড় লাগাল যে দিক থেকে এসেছিল সেই দিকে। আর গাড়ির তলা থেকে একটা কিছু যেন ব্যালস্টিক মিসাইলের মতো গতি আর শব্দে লোকগুলোর দিকে ধেয়ে গেল।

 

কী যে হল, কিছুই বুঝতে পারলাম না আমি।

 

লোকগুলো ভয় পেয়ে শোরগোল করে উঠল। এবং অন্ধকারের মধ্যেও শব্দ শুনে মনে হল, যেন ওদের মধ্যে একজন ধুপ করে পড়ে গেল মাটিতে। অন্যরা কিন্তু দৌড়েই চলে যেতে লাগল। এদিকে আর এলই না। মিনিট দশেক পরেই গভীর বৃষ্টিভেজা অন্ধকারে জঙ্গলের দিক থেকে একটা রাইফেলের আওয়াজ পেলাম। এবং তার একটু পরই একটা গাদা-বন্দুকের আওয়াজ। তারপরই সব চুপচাপ।

 

ঋজুদার কি কিছু হল?

 

আধ ঘন্টা, এক ঘন্টা, দুঘন্টা কাটল! ওদিক থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। এমনি সময় হঠাৎ গাড়ির পিছন দিক থেকে হাতির ডাক শুনতে পেলাম, প্যাঁ-এ-এ-এ করে।

 

আমি মুখ ফিরিয়ে পিছন ফিরে দেখি আমার পিছনে স্লেট-কালো ভেজা আকাশের পটভূমিতে একটা ঘন কালো চলমান পাহাড়শ্রেণী এগিয়ে আসছে। ওদিকে গুলির শব্দের পর ঋজুদারও কোনো খবর নেই। এদিকে আমার এই অবস্থা! গাড়িটা যদি দুমড়ে মুচড়ে খেলনার মতো ভেঙে দিয়ে যায় তাতেও কিছু করার নেই। আমি ভয়ে আর পিছনে তাকালামই না। সামনে তাকিয়ে কাঠ হয়ে বসে রইলাম। এই শটগান দিয়ে হাতিদের সামনে কিছুই করার নেই। আমার সামনে গুলি খেয়ে মরা দু-দুটো মানুষ পড়ে আছে। তাদের ফুলে-ওঠা মৃতদেহ হায়নারা খেয়ে গেছে খুবলে খুবলে। আরেকটা মানুষ পড়ে গেছে আরো সামনে। সে কেন পড়ল, বেঁচে আছে কি না তাও জানি না। কী জিনিস যে গাড়ির তলা থেকে ছুটে গেল তাও অজানা। যে হিসসসস শব্দ করেছিল, সেই কি? জানোয়ারটা কী? তাদেরই মধ্যে পড়ে আছে বিষ-তীর-খাওয়া একটা হায়না। আর পিছনে ছুটে আসছে হাতির দল।

 

আশ্চর্য! হাতিগুলো গাড়িটাকে মধ্যে রেখে দুপাশ দিয়ে আমার সামনে এল। সমস্ত দিক গাঢ় অন্ধকার হয়ে গেল। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। উইন্ডস্ক্রীনের সামনেই যে হাতিটা দাঁড়িয়ে ছিল সেটা একটা দাঁতাল। তার দাঁতটা এত বড় যে, গাড়ির ছাদটা সেই দাঁতের মাঝামাঝি পড়ছিল। নীচে প্রায় মাটিতে লুটোচ্ছিল সেই দাঁত। আমার মনে হল, ঐ হাতিটা যে-কোনো চকমিলানো দোতলা বাড়ির সমান।

 

হাতির দল নানারকম শব্দ করছিল শুঁড় দিয়ে–ফোঁসফোঁস, ফোঁ ফাঁ করে। শুঁড় হেলাচ্ছিল, দোলাচ্ছিল। গাড়ির বনেট আর উইন্ডস্ক্রীন আর ট্রেলারের উপরে শুড় বোলাচ্ছিল। মিনিট দশেক তারা গাড়িটাকে এরকম করতে থাকল। ভাগ্যিস নাইরোবি সর্দারের কলা আর পেঁপে শেষ হয়ে গেছিল, নইলে মুশকিল ছিল আমার। ভুষুণ্ডা আর টেডির উগালির ভুট্টা ও আমাদের চালডালও সব তাঁবুতেই পড়ে আছে। ওসব খাবার যদি ট্রেলারে থাকত, তবে খুবই বিপদ হত।

 

এর পরই একটা সাংঘাতিক কাণ্ড হল। হাতিগুলো ঐ লোকগুলোর মৃতদেহ দুটি শুঁড়ে তুলে নিয়ে লোফালুফি করতে লাগল। করতে করতে ক্রমশই সামনের জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। যত দূরে যেতে লাগল গাড়ি থেকে, ততই তাদের পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। বৃষ্টির মধ্যে তাদের জলে-ভেজা যুদ্ধজাহাজের মত শরীরগুলো বিদ্যুতের আলোয় চকচক করে উঠছিল।

 

ঘটনার পর ঘটনাতে স্তম্ভিত মন্ত্রমুগ্ধ আমি ভাবছিলাম, এ সবই হয়তো খনভামের কীর্তি। নইলে কেন হাতিগুলো আমার কোনো ক্ষতি করল না। তার বদলে, যে-বীভৎস দৃশ্য আমার পক্ষে দেখা সম্ভব হচ্ছিল না, তারা সেই দৃশ্যও আমার চোখের সামনে থেকে শুঁড়ে-শুঁড়ে সরিয়ে নিয়ে গেল কেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *