ফাগুয়ারা ভিলা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
চার
আমরা ফাগুয়ারা ভিলাতে ফিরে যেতেই আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে শাধূলনারায়ণ সিং চলে গেলেন। গাড়িতে ঝুমরি তিলাইয়ার উলটোদিকে ডোমচাঁচে গিয়ে ক্রিশ্চান মাইকা ইন্ডাস্ট্রিজ-এর গেস্ট হাউসে রাতটা কাটাবেন। তারপর ভোর রাতের গাড়ি ধরে কলকাতা চলে যাবেন। তারপর রাতের বম্বে মেল ধরে রায়পুর। তাঁর স্ত্রী দিয়াদেবীর এক বান্ধবীর অসুস্থতার খবর শুনে উনি অনেক আগেই চলে গিয়েছিলেন। তাঁর মন এমনিতেই ভারী খারাপ। ভীষ্মনারায়ণের তিনি খুবই কাছের মানুষ ছিলেন।
শার্দুলনারায়ণ বললেন, ঋজুদার হাত ধরে, আপনাকে কী আর বলব। আমার দেবতুল্য দাদার হত্যাকারীকে যদি খুঁজে বের করতে পারেন তবে আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। ফিস-এর জন্যে আপনি চিন্তা করবেন না।
বলেই বললেন, আমি বরং আপনাকে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে যাচ্ছি।
ঋজুদা হাত ধরে বললেন, ওসব কোনও ব্যাপারই নয়। কন্দর্পনারায়ণকে আমি বহুদিন হল জানি। আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে। এই দুঃখবহ ঘটনার সূত্রে আপনাদের সকলের সঙ্গেও চেনা হল। তারপরই বলল, প্রয়োজনে আপনার কাছে যেতে হতে পারে। হয়তো না-জানিয়েই রায়পুরে গিয়ে উপস্থিত হব। দিয়াদেবীর সঙ্গে একবার দেখা করতে পারলে আমার কাজের খুব সুবিধা হত।
শার্দুলনারায়ণ যেন কেমন মিইয়ে গেলেন এই কথাতে। বললেন, আমার স্ত্রী যদিও অধ্যাপিকা কিন্তু একেবারেই মিশুকে নন। কারও সঙ্গেই দেখা করতে চান না। যদি তেমন প্রয়োজন ঘটে তবেই আসবেন। ওঁর ব্যবহারে যেন ওঁকে ভুল বুঝবেন না। তবে আগে জানিয়ে আসবেন। উনি তো গোয়ালিয়রে থাকেন। ওঁকে আসতে বলতে হবে।
ঋজুদা বলল, আপনার অত অ্যাপলজেটিক হবার কোনও দরকার নেই। সমস্ত রকম মানুষের সঙ্গেই মেশা আমার কাজ। আমি একটুও ভুল বুঝব না ওঁকে। এবং নিতান্ত প্রয়োজন না পড়লে ওঁকে বিরক্তও করব না। আমিও গোয়ালিয়রে যেতে পারি ওঁর রায়পুরে আসার অসুবিধে থাকলে।
রাতে খেতে বসে ঋজুদা ইচ্ছে করে কেয়ারটেকার মিশিরজি এবং কিচেন ম্যানেজার শর্মাকে আপারহ্যান্ড দিল। ওরাই বক্তা আর আমরা শ্রোতা। মালিকদের মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন। তিনিও আজ চলে গেলেন তাই এখন ওঁরাই মালিক। মুখে একবারে খই ফুটছে।
সব মানুষই কথা বলতে ভালবাসেন শুধু ইন্ধন জোগানো চাই। দুজনের মধ্যে কে বেশি জানেন তা নিয়ে যেন প্রতিযোগিতা চলছে। ঋজুদা তো বটেই আমরাও ওঁদের পেট থেকে এই শুক্ল পরিবারের সব ভাই এবং তাদের পরিবার সম্বন্ধে যত কথা জানা যায় সব জেনে নিচ্ছিলাম।
সবচেয়ে আগে ময়ূর-রহস্য উন্মোচন করা হল। যা ভেবেছিলাম তাই। মৌলবি সাহেবকেই ভার দেওয়া হয়েছিল তবে ময়ূর পথ পাশের ঝোপে-ঝাড়ে তো তত দেখা যায় না তাই মৌলবি সাহেব তার ভাতিজা মুনতাজারকে দিয়ে মারিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মুনতাজারও ভাল শিকারি। মৌলবি সাহেবের ভাতিজা হলেও ওর নাকি অন্য নানা ধান্দা আছে। বোঝা গেল, তাকে মিশিরজি বা শর্মাজি বিশেষ পছন্দ করেন না।
মিশিরজি বলেছিলেন, ছেলেটা নাকি খুব উদ্ধতও। মৌলবিকেও মানে না। এখানে সব সময়ে থাকেও না। হাজারিবাগ, কোডারমা, গেয়া, চাতরা, নওয়াদা, গিরিডি এই সব অঞ্চলেই ঘুরে বেড়ায়। মুম্বাইও যায় মাঝে মাঝে। নানারকম খতরনাক লোকজনের সঙ্গে ওর মেলামেশা। কোনও মালিকই ওকে পছন্দ করে না, তবে বড়বাবু কন্দর্পনারায়ণ ওকে ছোটবেলা থেকে জানেন এবং নিজের কোনও সন্তান না থাকাতে মুনতাজারকে ছেলেবেলাতে অনেক চকলেট খাইয়েছেন, খেলনা দিয়েছেন, সাইকেল এবং এয়ার-গান কিনে দিয়েছেন। পুরনো স্নেহের কিছুটা এখনও রয়ে গেছে। বড়বাবু ওকে টাকা-পয়সাও দেন বলে ওঁদের ধারণা। অন্য মালিকেরা চান না যে মুনতাজার এ প্রাসাদে আসুক। ছোট রানিমা, মানে, দিয়াদেবী তো ওকে একেবারেই পছন্দ করেন না। দিয়াদেবী অত্যন্তই সুন্দরী। অনেকটা কারিশমা কাপুরের মতো।
শর্মা সাহেব যোগ করলেন। তাঁকে নাকি কী একটা খারাপ কথা বলেছিল কখনও মুনতাজার। সেই থেকে বড়বাবুই বারণ করে দিয়েছেন মুনতাজারকে ফাগুয়ারা ভিলাতে আসতে, যতক্ষণ ছোট রানি এখানে থাকেন। কন্দর্পনারায়ণের স্ত্রীর নাম রোজি কেন? তিতির শুধোল।
ভটকাই-এর ওই pertinent question-এর উত্তরে যা শোনা গেল তা সত্যিই অবাক হওয়ারই মতো। এখানকার নিরামিষাশী, ব্যবসা-অন্তপ্রাণ, দেব-দেবীতে মনপ্রাণ নিবেদিত কন্দর্পনারায়ণ নাকি যৌবনে অন্যরকম ছিলেন। এ নিয়ে রাজা রাজরাজেন্দ্রর নারায়ণের সঙ্গে তাঁর মতান্তর লেগেই থাকত। রোজি আসলে মুম্বাই-এর মেয়ে। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। মুম্বাই-এর একটা নামী নাইট ক্লাব-এর ক্রুনার ছিলেন তিনি। গান গাইতেন। পপ গান। বিটলসদের গান। কন্দর্পনারায়ণও তখন রেগুলার বার ক্রলার। এবং নানা নাইট ক্লাব-এ তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ওই বিয়েতে রাজাসাহেব এবং রানিসাহেবার একটুও মত ছিল না। কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ অটল। শেষে রাজাসাহেব এই শর্তে বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন যে রোজি বহুজি কোনওদিনও এ পরিবারের কোনও প্রাসাদে বা মেহাল-এ ঢুকতে বা থাকতে পারবেন না। তার সন্তান হলে তারা এই পরিবারের সব সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। কলকাতাতে রাজাসাহেব আলাদা বাড়ি কিনে দিয়েছিলেন রোজি বহুজির জন্যে, এবং বম্বের জুহুতে সমুদ্রতটের উপরে একটা ফ্ল্যাটও কিনে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে কন্দর্পনারায়ণ বড় ভাই হিসেবে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও তার স্ত্রীর সঙ্গে পরিবারের কারওরই কোনও সম্পর্ক ছিল না। আজও নেই। রোজি বহুজির কোনও খবরও মানে এর বেশি খবর ওঁদের কারওরই জানা। নেই।
রাজা রাজরাজেন্দর শুক্লর কোন ছেলে তার সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
মিশিরজির বয়স প্রায় সত্তর মতো। এ বাড়িতে জিম্মাতে আছেন আজ চল্লিশ বছরেরও বেশি। বললেন, মেজছেলে ভীষ্মনারায়ণ। কত দেখে-টেখে বিয়ে দিলেন অনসূয়াদেবীর সঙ্গে রূপে গুণে সরস্বতী-লক্ষ্মীও বটেন–তার বাবার একমাত্র মেয়ে ছিলেন–মুম্বাই-এর নামী জহুরি ছিলেন ওঁর বাবা। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যেই তিনি চলে গেলেন। তাতে যেন মেজকুমারের প্রতি রাজা ও রানিমার স্নেহ আরও উথলে উঠল। আর হবেই বা না কেন? অধ্যাপক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। অন্য ছেলেরা ব্যবসা করে বড়লোক হয়েছিল বটে অনেক কিন্তু মান তো অত পাননি। স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে। অমন মানুষকে কেউ মারতে পারেন এ কথা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়।
রোজি মেমসাহেব, থুড়ি, রানি এখন কোথায় থাকেন? কলকাতা? না মুম্বাই?
ভটকাই জিজ্ঞেস করল।
জানি না।
ওঁর খবর কে রাখেন?
কেউই রাখে না। যতদূর জানি বড় রাজকুমারও রাখেন না। তবে টাকা পাঠিয়ে যান অনবরত। বড় রাজকুমারের মনে শান্তি নেই। ডিভোর্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু রোজি মেমসাহেব ডিভোর্স দেবেন না। দেবেনই বা কেন? সাহেব চোখ বুজলে সবই তো তার।
উনি মুম্বাইতেই থাকেন শুনছি। তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে মুনতাজার।
মুনতাজার?
আমরা সকলেই চমকে উঠলাম।
ওঁরা অবাক না হয়ে বললেন, পোয্য নেননি বটে কিন্তু ছেলেবেলা থেকে বড় রাজকুমার পুত্রজ্ঞানেই তো দেখেছেন মুনতাজারকে। তা ছাড়া, রোজি মেমসাহেবও ওকে পছন্দ করেন।
মেমসাহেবের বয়স এখন কত?
বেশি নয়। বড় রাজকুমারের চেয়ে প্রায় বিশ বছরের ছোট তো। বিয়ের সময়ে তো শুনেছি সতেরো বছর বয়স ছিল। এখন হবে চল্লিশ-টল্লিশ।
অ।
ভটকাই এমন মুরুব্বিয়ানার সঙ্গে ‘অ’ টা উচ্চারণ করল যে আমরা সকলেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম।
তিতির বলল, তা মুনতাজারের চাচা মোরগা-যম মৌলবি সাহেব তো সাইকেলে করেই ঘোরাফেরা করেন। মুনতাজারের বাহন কী? না কি পায়ে হেঁটেই এত সব জায়গা চষে বেড়ায়।
না, তা কেন? তার একটা ঝিং-চ্যাক মোটর সাইকেল আছে এখানে চড়বার জন্যে। যা কিছু দুষ্কর্ম মোটর সাইকেলে চড়েই করে। তারপর বম্বে সিনেমার স্টাইলে উধাও হয়ে যায়। মোটর সাইকেলই বা কেন এয়ারোপ্লেন ছাড়া চালাতে জানে না এমন কোনও যানই নেই। কানাঘুষোতে শুনেছি, ওর চড়ার জন্যে কলকাতা ও মুম্বাইতে বড় রাজকুমার জিপ এবং গাড়িও রেখেছেন। তবে সেসব নিয়ে এখানে কখনও আসে না। এখানে থাকেই বা কতটুকু সময়! ডুমুরের ফুল সে। থাকে না বলে আমরাও নিশ্চিন্ত থাকি। তাকে আমরা সকলেই ভয় পাই। সে করতে পারে না এমন কোনও কাজ নেই।
কী রকম?
এই তো গত বছর মেজকুমার ভীষ্মনারায়ণের এক বন্ধু আর স্ত্রী তাদের প্রিয় সাদা একটা পমেনারিয়ান কুকুর নিয়ে এখানে বেড়াতে এসেছিলেন মেজ রাজকুমারের সঙ্গে। বিকেলে কুকুরটিকে নিয়ে ওঁরা তিনজনে বেড়াতে বেরিয়েছেন, মুনতাজার আসছিল নদীর দিক থেকে মোটর সাইকেলে চড়ে। কুকুরটিকে পছন্দ হওয়াতে সে কোলে তুলে নিয়ে বাইক হাঁকিয়ে চলে গেল। আমরা সকলে লজ্জাতে মরি। মেহমান বলে কথা! মেজকুমারও মৌলবিকে দিয়ে মুনতাজারকে ডেকে পাঠালেন। প্রথমে আসেনি। বলেছিল, আমি শুক্ল পরিবারের বান্দা নই। তারপরে কী মনে করে এসেছিল–এসে মেজকুমারকে বলেছিল আপনার দোস্তকে জিজ্ঞেস করুন কত দিয়ে কিনেছেন কুকুরটাকে। দাম আমি দিয়ে দেব।
স্তম্ভিত মেজকুমার বলেছিলেন ভালবাসার কী দাম হয়? কুকুরটার দামের চেয়ে ভালবাসার দাম যে অনেক বেশি।
মুনতাজার বলেছিল এ দুনিয়াতে সব ভালবাসারই দাম হয়। পয়সা দিলে পাওয়া যায় না এমন কিছুই নেই এখানে। আমি তো কুকুরের মালকিনকেও তুলে নিয়ে যেতে পারতাম। তাকেও তো আমার পছন্দ হয়েছিল। ভারী নমকিন। কিন্তু তা তো নিইনি।
মেজকুমার বন্ধুর সামনে মুখ নিচু করে আমাকে বললেন, মিশিরজি, ও লোকটা যেন আর কোনও দিন এই ফাগুয়ার ভিলার হাতার মধ্যে না ঢোকে, বলে দেবেন।
মিশিরজি বললেন।
তারপর?
তারপর আর কী? আমি কিছু বলার আগেই মুনতাজার বলল, আমি আসতে চাইলে আমাকে আটকায় এমন কে আছে? দয়া করে আমি আসি না, এই যা। আপনাদের ছোট বহু দিয়ারানিকেও আমার খুব পছন্দ। সে এলে, তাকে একটু দেখবার জন্যেই আসি। কিন্তু সে এত নিষ্ঠুর যে এলেও দেখা দিতে চায় না।
মেজকুমার বললেন, মিশিরজি, বন্দুকটা কোথায়? বন্দুকটা আনুন। আমি এখুনি এর বদতমিজি শেষ করব। তারপর সারাজীবন জেল খাটতে হয় কি ফাঁসি যেতে হয় তাই যাব।
মুনতাজার মেজকুমারের পায়ের কাছে থুথু ফেলে বলেছিল, বন্দুক থাকলেই কি হয় নাকি? চালাতে জানতে হয়।
বলেই, সে চলে গেছিল।
ভটকাই বলল, এত বড় কথা। ভাগ্যিস আমাদের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। হয়ে গেলে কুরুক্ষেত্র বাঁধত।
তিতির বলল, ময়ূর মারে, এ তো অ্যান্টিন্যাশনাল। ছিঃ!
মি.শর্মা বললেন, জুগনু নামের একটা রাখাল তার ঘরে না-ফেরা গোরু খুঁজতে খুঁজতে এক রাতের বেলা জঙ্গলে ঢুকেছিল। মুনতাজার তার জিভটা কেটে দেয়। জুগনু বোবা হয়ে গেছে।
মিশিরজি গভীর উম্মার সঙ্গে বললেন।
আর তারপরও সেই মানুষ মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়ায়, আপনাদের সঙ্গে ধমকে কথা বলে, আপনাদের বাড়িতে সে আসে!
না, বাড়িতে সেই কুকুরের ঘটনার পরে আর আসেনি। আর তার সঙ্গে দেখাই হয় না, তার কথা কী হবে।
আপনাদের গাঁয়ের মানুষগুলো মানুষ নয়।
ভটকাই ভীষণ রেগে মুঠি পাকিয়ে বলল।
হয়তো তাই।
মিশিরজি বললেন।
তারপর বললেন, গাঁয়ের মানুষেরা গরিব, খুবই গরিব, কোনওরকমে দিন। গুজরান করে বেঁচে থাকে।
ঋজুদা এতক্ষণে বলল, ওরা তো আপনাদেরই প্রজা ছিল এত বছর। জমিদারি বিলোপের পরে না-হয় জমিদারি গেল এই দেশে। কিন্তু ওদের গোলামি তো শেষ হয়নি। আপনারা ওদের মানুষের মর্যাদা দিলে খাওয়া-পরার সুবন্দোবস্ত করলে ওরা মানুষের মতো বাঁচত, মানুষ হত, এইভাবে অসম্মানের মধ্যে নিজেদের ধর্মের চরম অপমান সহ্য করেও খাওয়া-পরার জন্যে, নিছকই নিশ্বাস নেবার জন্যে বাঁচত না, এমন মনুষ্যেতর জীবন বইত না।
শর্মাজি বললেন, আমরা তো কর্মচারী, আমরা কী করব।
কর্মচারী যেমন, তাঁদের মনিবও তেমনই জোটে।
ভটকাই ফুট কেটে বলল।
তিতির বলল, ভটকাই এঁদের বলে দে কাল থেকে আমরা ডাল-ভাত আর একটা সবজি খাব দুপুরে আর রাতে স্রেফ খিচুড়ি। এসব শুনে খাওয়া-দাওয়ার স্পৃহা চলে গেছে।
তারপরই স্বগতোক্তি করল, একটা লাফাঙ্গা, সে তালিবানিই হোক আর যাই হোক, পুরো বস্তি, পুরো রাজবাড়িকে এমনভাবে টেররাইজ করে রাখবে এ সহ্য করা যায় না।
তারপরই খাওয়ার টেবিল ছেড়ে আমরা উঠে এলাম।
থানা কী করে? এখানে কি থানাটাই নেই?
আমি জিজ্ঞেস করলাম ঋজুদাকে।
থানাই যদি কিছু করত তবে কি মুনতাজারের অত বাড় বাড়ত?
ঋজুদা বলল।
মিশিরজি এবং শর্মাজি দুজনেই কিচেনের ভিতরে গেছিলেন। ওরাও বোধহয় এখন পস্তাচ্ছেন আমাদের এত কিছু বলে ফেলে।
ঋজুদা গলা নামিয়ে বলল, আমরা এখানে দাঙ্গা-মারামারি করতে আসিনি। যাদের যা যোগ্যতা তারা সেরকমই জীবন পায়। ক্লীব, ভীরু, নিজস্বার্থপরায়ণ মানুষদের এমন কুকুর, বেড়ালের মতোই বাঁচতে হবে। এরা নিজেদের হাতে-পায়ে বল সঞ্চার না করলে বাইরে থেকে এসে আমরা এদের বলীয়ান করতে পারব না।
ভটকাই বলল, তাহলে আমরা কী করব?
এখান থেকে আমরাও চলে যাব। কন্দর্পনারায়ণ তো আমাকে এ আপদের কথা ঘুণাক্ষরেও বলেননি অথচ দেখা যাচ্ছে এই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তারই হাতে তৈরি, তার পুত্রসম। এ তো মহা গোলমেলে ব্যাপার দেখছি।
খাওয়া-দাওয়ার পর রাতে ঋজুদার ঘরে গিয়ে আমরা একটু নিরিবিলিতে পরামর্শ করলাম। ঋজুদা বলল, কাল বিকেলেই আমরা এখান থেকে চলে যাব। আমার এমনিতেই ফিরতে হত। এখানে না হচ্ছে বিশ্রাম–মানে নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম–না হচ্ছে গোয়েন্দাগিরি। তা ছাড়া কন্দর্পনারায়ণের এই ব্যাপারটা আমার ঘাড়ে চাপানোর রকমটা গোড়া থেকেই আমার পছন্দ হয়নি।
চলে যাব?
হতাশ গলাতে ভটকাই বলল।
চলে যাব, তবে কাল সকালে তোদের সঙ্গে নদীতে যাব। কী সব রহস্যময় পদচিহ্ন এবং পুরীষ দেখেছিস তোরা বললি তা একটু আমার দেখা দরকার।
কেসটা ছেড়ে দেবে ঋজুদা? তাহলে ভীষ্মনারায়ণের মৃত্যুর তদন্ত হবে না আর মুনতাজার না কে সে হনুমানটা এখানে এমন করেই তাণ্ডব করে যাবে?
সেসব কন্দর্পনারায়ণের পরিবারের ব্যাপার। সব দায়িত্ব কি আমার নাকি? না আমাদের?
কিন্তু কেসটা মাঝপথে ছেড়ে দিলে কী হবে?
কী হবে? গোয়েন্দার কি অভাব আছে কি? কন্দর্পনারায়ণের পয়সা আছে। পয়সা ফেললে গোয়েন্দার অভাব কী?
না, তা নয়, আমতা আমতা করে তিতির বলল।
ঋজুদা বলল, ভীষ্মনারায়ণের হত্যা রহস্য উদঘাটন করি আর নাই করি ওই আউট-ল মুনতাজারকে একটু ঢিট করতে আসব একবার শিগগির। তবে এখানে উঠব না।
কোথায় উঠবে?
পিতিজ বনবাংলোতে। একেবারে নদীর উপর ছোট্ট কিন্তু সুন্দর বনবাংলো আছে। দুটি বেডরুম, মাঝে ড্রয়িং কাম ডাইনিং। বারান্দাটা চওড়া এবং ভারী সুন্দর। কাজমি সাহেব এখন হাজারিবাগের ডি. এফ. ও.। কলকাতাতে ফিরেই ফোনে ওঁকে বলে দেব রিজার্ভেশনের জন্যে।
কোন কাজমি? যিনি পালামৌতে ছিলেন? সাউথ কোয়েলে?
আমি বললাম।
যাঁর জিপ ল্যান্ডমাইনে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল জঙ্গি ছেলেরা? ড্রাইভার মারা গেছিল?
তিতির বলল।
হ্যাঁ। সেই কাজমি সাহেবই।
তারপর বলল, কাটা দিয়ে কাটা তুলব আমি। এই ছেলেদের দিয়েই আমি ওই মুনতাজারকে শায়েস্তা করব।
গুপ্তচরদের সঙ্গে এদের যোগ নেই তো?
ভটকাই উদ্বিগ্ন গলাতে বলল।
না। ওরা দেশদ্রোহিতা করবে না। ছেলেগুলো ভাল।
তুমি জানলে কী করে!
তিতির বলল।
আমার সঙ্গে ওদের একটা দলের দেখা হয়েছিল।
কোথায়? আমাদের তো বলোনি।
আমি বললাম।
পালামৌর কেঁড় বাংলোতে। বছর পাঁচেক আগে একা ছিলাম কেঁড় বাংলোতে। একটা জরুরি লেখা লিখতে গেছিলাম। বিদ্যুৎ ছিল না। সারাদিন, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত লিখতাম তারপর সন্ধের পরে চান করে বারান্দাতে বসে থাকতাম থামের গায়ে পা তুলে দিয়ে। সূর্য ডুবত, চাঁদ উঠত আর এম সি সি-র ছেলেরা হাততালি দিয়ে দিয়ে দারুণ ছন্দোবদ্ধ এবং মহড়া-দেওয়া সমবেত সংগীত গাইত জঙ্গলের মধ্যে বসে। একদিন ওদের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম একা।
তোমাকে কিছু করল না?
আমি বললাম।
না তো। আমাকে বসতে দিল বাঁশের খোঁটার মোড়াতে। বোঝা গেল যে, রুদ্র রায়ের কল্যাণে ওরা আমাকে চেনে। আমার সম্বন্ধে নানা লেখা ওরা পড়েছে। তা ছাড়া কোজাগর’ও পড়েছে ওরা। কোজাগর’-এ নকশাল ছেলেদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন চাপা তো ছিল না।
তারপর বলল, তখনই ওরা বলেছিল, যে কোনও প্রয়োজনে ওদের সঙ্গে যেন যোগাযোগ করি আমি। একটা পাসওয়ার্ডও দিয়েছিল। যে কোনও গাঁয়ের পান বিড়ি বা চায়ের দোকানে সেই পাসওয়ার্ড বললেই ওরা আলাদা করে ডেকে নিয়ে আমার কথা শুনবে তারপর রাঁদেভু পয়েন্ট ঠিক করে নিয়ে দেখা করবে।
পাসওয়ার্ড কী?
ভটকাই বলল।
তোকে বলব কেন? তুই একটা নিরেট হচ্ছিস দিনে দিনে-বুদ্ধি-সুদ্ধি সব ব্যাকগিয়ারে দিয়ে রেখে মহানন্দে আছিস।
ভটকাই লজ্জা পেল।
আমি বললাম, তা ছাড়া, পাঁচ বছরের পুরনো পাসওয়ার্ড এখন বাতিলও হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
