দৃষ্টি প্রদীপ (উপন্যাস) – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেয়ার করুনঃ

নয়

এখান থেকে কলকাতায় যাবার সময় হয়ে এল। বিকেলে আমি বটতলায় পুকুরের ঘাটে বসে মাছ-ধরা দেখচি, নবীন মুহুরী এসে বললে–তোমায় ডাকচেন মেজবাবু।

ওর মুখ দেখে আমার মনে হ’ল গুরুতর একটা কিছু ঘটেছে কিংবা ও-ই আমার নামে কি লাগিয়েচে। নবীন মুহুরী এ-রকম বার-কয়েক আমার নামে লাগিয়েছে এর আগেও। কারণ তার চুরির বেজায় অসুবিধে ঘটত আমি থাকার দরুন।

মেজবাবু চেয়ারে বসে, কুঞ্জ নায়েবও সেখানে দাঁড়িয়ে।

মেজবাবু আমাকে মানুষ বলেই কোনো দিন ভাবেননি। এ পর্যন্ত আমি পারতপক্ষে তাঁকে এড়িয়েই চলে এসেচি। লোকটার মুখের উগ্র দাম্ভিকতা আমাকে ওর সামনে যেতে উৎসাহিত করে না। আমায় দেখে বললেন–শোন এদিকে। কলকাতায় গিয়ে তুমি অন্য জায়গায় চাকরির চেষ্টা করবে। তোমাকে এক মাসের নোটিশ দিলাম।

–কেন, কি হয়েচে?

–তোমার মাথা ভাল না, এ আমিও জানি নবীনও দেখেচে বলচে। হিসেব-পত্রে প্রায়ই গোলমাল হয়। এ-রকম লোক দিয়ে আমার কাজ চলবে না। স্টেটের কাজ তো ছেলেখেলা নয়!

নবীন এবার আমায় শুনিয়েই বললে–এই তো সেদিন আমার সামনেই হিসেব মেলাতে মেলাতে মৃগীরোগের মত হয়ে গেল–আমি তো ভয়েই অস্থির।

মেজবাবুকে বিদ্বান বলে আমি সম্ভ্রমের চোখেও দেখতাম–বললাম–দেখুন, তা নয়। আপনি তো সব বোঝেন, আপনাকে বলচি। মাঝে মাঝে আমার কেমন একটা অবস্থা হয় শরীরের ও মনের, সেটা বলে বোঝাতে পারি নে–কিন্তু তখন এমন সব জিনিস দেখি, সহজ অবস্থায় তা দেখা যায় না। ছেলেবেলায় আরও অনেক দেখতুম, এখন কমে গিয়েছে। তখন বুঝতাম না, মনে ভয় হ’ত, ভাবতাম এ-সব মিথ্যে, আমার বুঝি কি রোগ হয়েচে। কিন্তু এখন বুঝেচি ওর মধ্যে সত্যি আছে অনেক।

মেজবাবু কৌতুক ও বিদ্রূপ মিশ্রিত হাসি-মুখে আমার কথা শুনছিলেন–কথা শেষ হলে তিনি কুঞ্জ নায়েবের দিকে চেয়ে হাসলেন। নবীন মুহুরীর দিকে চাইলেন না, কারণ সে অনেক কম দরের মানুষ। স্টেটের নায়েবের সঙ্গে তবুও দৃষ্টি-বিনিময় করা চলে। আমার দিকে চেয়ে বললেন–কতদূর পড়াশুনা করেচ তুমি?

–আই-এ পাস করেছিলাম শ্রীরামপুর কলেজ থেকে–

–তাহলে তোমায় বোঝানো আমার মুশকিল হবে। মোটের ওপর ও-সব কিছু না। নিউরোটিক যারা–নিউরোটিক বোঝ? যাদের স্নায়ু দুর্বল তাদের ওই রকম হয়। রোগই বইকি, ও এক রকম রোগ–

আমি বললাম–মিথ্যে নয় যে তা আমি জানি। আমি নিজের জীবনে অনেকবার দেখেচি–ও-সব সত্যি হয়েছে। তবে কেন হয় এইটেই জানি নে, সেইজন্যেই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। আমি সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসির লাইক-এ পড়েচি, তিনিও এ-রকম দেখতেন–

মেজবাবু ব্যঙ্গের সুরে বললেন–তুমি ‘তাহলে’—তুমি সেন্ট হয়ে গিয়ে দেখচি? পাগল কি আর গাছে ফলে?

নবীন ও কুঞ্জ দুজনেই মেজবাবুর প্রতি সম্ভ্রম বজায় রেখে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে হাসতে লাগল।

আমি নানাদিক থেকে খোঁচা খেয়ে মরীয়া হয়ে উঠলাম। বললাম–আর শুধু ওই দেখি যে তা নয়, অনেক সময় মরে গিয়েছে এমন মানুষের আত্মার সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের দেখতে পেয়েছি।

নবীন মুহুরীর বুদ্ধিহীন মুখে একটা অদ্ভুত ধরনের অবিশ্বাস ও ব্যঙ্গের ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু নিজের বুদ্ধির ওপর তার বোধ হয় বিশেষ আস্থা না থাকাতে সে মেজবাবুর মুখের দিকে চাইলে। মেজবাবু এমন ভাব দেখালেন যে, এ বদ্ধ উন্মাদের সঙ্গে আর কথা বলে লাভ কি আছে! তিনি কুঞ্জ নায়েবের দিকে এভাবে চাইলেন যে, একে আর এখানে কেন? পাগলামি চড়ে বসলেই একটা কি করে ফেলবে এক্ষুনি!

আমি আরও মরীয়া হয়ে বললাম–আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন তাতে যে-জিনিস সত্যি তা মিথ্যে হয়ে যাবে না। আমার মনে হয়, আপনি আমার কথা বুঝতেও পারেননি। যার নিজের অভিজ্ঞতা না হয়েছে, সে এ-সব বুঝতে পারবে না, এ-কথা এতদিনে আমি বুঝেচি। খুব বেশী লেখাপড়া শিখলেই বা খুব বুদ্ধি থাকলেই যে বোঝা যায় তা নয়। আচ্ছা, একটা কথা আপনাকে বলি, আমি যে ঘরটাতে থাকি, ওর ওপাশে যে ছোট্ট বাড়িটা আছে, ভাঙা রোয়াক যার সামনে–ওখানে আমি একজন বড়োমানুষের অস্তিত্ব অনুভব করতে পেরেছি–কি করে পেরেছি, সে আমি নিজেই জানি নে–খুব তামাক খেতেন, বয়স অনেক হয়েছিল, খুব রাগী লোক ছিলেন, তিনি মারা গিয়েচেন কি বেঁচে আছেন তা আমি জানি নে। ওই জায়গাটায় গেলেই এই ধরনের লোকের কথা আমার মনে হয়। বলুন তো ওখানে কেউ ছিলেন এ-রকম?

কুঞ্জ নায়েবের সঙ্গে মেজবাবুর অর্থসূচক দৃষ্টি বিনিময় হ’ল। মেজবাবু শ্লেষের সঙ্গে বললেন–তোমাকে যতটা সিম্পল ভেবেছিলাম তুমি তা নও দেখচি। তোমার মধ্যে ভণ্ডামিও বেশ আছে–তুমি বলতে চাও তুমি এত দিন এখানে এসেচ, তুমি কারও কাছে শোননি ওখানে কে থাকতো?

–আপনি বিশ্বাস করুন, আমি তা শুনিনি। কে আমায় বলেচে আপনি খোঁজ নিন?

—ওখানে আমাদের আগেকার নায়েব ছিল, ওটা তার কোয়ার্টার ছিল, সে বছর-চারেক আগে মারা গিয়েছে, শোননি এ-কথা?

–না আমি শুনিনি। আরও কথা বলি শুনুন, আপনার ছেলে হওয়ার আগের দিন কলকাতায় আপিসে আপনাকে কি বলেছিলুম মনে আছে? বলেছিলুম একটা খোকা দাঁড়িয়ে আছে–দরজা খুলে মেজবৌরাণী এসে তাকে নিয়ে গেলেন–এ-কথা বলেছিলুম কিনা? মনে করে দেখুন।

–হ্যাঁ আমার খুব মনে আছে। সেও তুমি জানতে না যে আমার স্ত্রী আসন্ন-প্রসবা ছিল? যদি আমি বলি তুমি একটা বেশ চাল চেলেছিলে–যে কোনো একটি সন্তান তো হ’তই– তুমি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছিলে, দৈবাৎ লেগে গিয়েছিল। শার্লাটানরা ও-রকম বুজরুকি করে–আমি কি বিশ্বাস করি ওসব ভেবেচ?

–বুজরুকি কিসের বলুন? আমি কি তার জন্যে আপনার কাছে কিছু চেয়েছিলুম? বা আর কোনোদিন সে-কথার কোনো উল্লেখ করেছিলুম? আমি জানি আমার এ একটা ক্ষমতা–ছেলেবেলায় দার্জিলিঙের চা-বাগানে আমরা ছিলাম, তখন থেকে আমার এ ক্ষমতা আছে। কিন্তু এ দেখিয়ে আমি কখনও টাকা রোজগারের চেষ্টা তো করিনি কারোর কাছে? বরং বলিই নে–

মেজবাবু অসহিষ্ণুভাবে বললেন–অল ফিডলস্ট্রিক–মনের ব্যাপার তুমি কিছু জানো না। তোমাকে বোঝাবার উপায়ও আমার নেই। ইট প্লেজ কুইয়ার ট্রিকস উইথ আস– যদি ধরে নিই তুমি মিথ্যাবাদী নও–ইউ মে বি এ সেলফ ডিলিউডেড ফুল এবং আমার মনে হয় তুমি তাই-ই। আর কিছু নয়। যাও এখন–

আমি চলে এলাম। নবীন মুহুরী আমার পিছু পিছু এসে বললে–তোমার সাহস আছে বলতে হবে–মেজবাবুর সঙ্গে অমন ক’রে তর্ক আজ পর্যন্ত কেউ করেনি। না! যা হোক, তোমার সাহস আছে। আমার তো ভয় হচ্চিল এই বুঝি মেজবাবু রেগে ওঠেন–

আমি জানি নবীনই আমার নামে লাগিয়েছিল, কিন্তু এ নিয়ে ওর সঙ্গে কথা কাটাকাটি করবার প্রবৃত্তি আমার হ’ল না। কেবল একটা কথা ওকে বললাম–দেখ নবীন-দা, চাকুরির ভয় আমি আর করি নে। যে-জন্যে চাকুরি করছিলাম, সে কাজ মিটে গিয়েছে। এখন আমার চাকুরি করলেও হয় না-করলেও হয়। ভেবো না, আমি নিজেই শীগগির চলে যাবো ভাই।

ক-দিন ধরে একটা কথা ভাবছিলাম। এই যে এতগুলো পাড়াগেঁয়ে গরীব চাষীলোক এখানে পুজো দিতে এসেছিল–এরা সকলেই মূর্খ, ভগবানকে এরা সে ভাবে জানে না, এরা চেনে বটতলার গোসাঁইকে। কে বটতলার গোসাঁই? হয়ত একজন ভক্ত বৈষ্ণব, গ্রাম্য লোক, বছর পঞ্চাশ আগে থাকত ওই বটতলায়। সেই থেকে লৌকিক প্রবাদ এবং বোধ হয় মেজবাবুদের অর্থগুধ্নতা দুটোতে মিলে বটতলাকে করেছে পরম তীর্থস্থান। কোথায় ভগবান, কোথায় প্রথিতযশা ঐতিহাসিক অবতারের দল–এই বিপুল জনসঙ্ঘ তাঁদের সন্ধানই রাখে না হয়ত। এদের এ কি ধর্ম? ধর্মের নামে ছেলেখেলা।

কিন্তু নিমচাঁদকে দেখেচি। তার সরল ভক্তি, তাদের ত্যাগ। তার স্ত্রীর চোখে যে অপূর্ব ভাবদৃষ্টি, যা সকল ধর্মবিশ্বাসের উৎসমুখ—এ-সব কি মূল্যহীন, ভিত্তিহীন, জলজ শেওলার মত মিথ্যার মহাসমুদ্রে ভাসমান? এ রকম কত নিমচাঁদ এসেছিল মেলায়। জ্যাঠাইমাদের আচারের শেকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ঐশ্বর্যের ঘটা দেখানো দেবার্চনার চেয়ে, এ আমার ভাল লেগেচে। ঘুসুড়ির সেই ষষ্ঠীমন্দিরের মত।

কোন দেবতার কাছে নিমচাঁদের তিনটে টাকার ভোগ অর্ঘ্য গিয়ে পৌঁছুলো, জীবনের শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে পরম ত্যাগে সে যা নিবেদন করলে?

আর একটা কথা বুঝেচি। কাউকে কোন কথা বলে বুঝিয়ে বিশ্বাস করানো যায় না। মনের ধর্ম মেজবাবু আমায় কি শেখাবেন, আমি এটুকু জেনেচি নিজের জীবনে মানুষের মন কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না সে জিনিসকে, যা ধরা-ছোঁয়ার বাইরের। আমি যা নিজের চোখে কতবার দেখলুম, বাস্তব বলে জানি–ঘরে-বাইরে সব লোক বললে ও মিথ্যে। পণ্ডিত ও মূর্খ এখানে সমান–ধরা-ছোঁয়ার গণ্ডীর সীমানা পার হয়ে কারুর মন অনন্ত অজানার দিকে পাড়ি দিতে চায় না। যা সত্যি, তা কি মিথ্যা হয়ে যাবে?

কলকাতায় ফিরে এলাম বড়বাবুর মেয়ের বিবাহ উপলক্ষে। জামাইকে বিয়ের রাত্রে বেবি অস্ট্রিন গাড়ী যৌতুক দেওয়া হ’ল–বিবাহ মণ্ডপের মেরাপ বাঁধতে ও ফুল দিয়ে সাজাতেই ব্যয় হ’ল আটশ টাকা। বিয়ের পরে ফুলশয্যার তত্ব সাজাতে আট-দশজন লোক হিমশিম খেয়ে গেল। ছোটবাবুর বন্ধুবান্ধবদের একদিন পৃথক ভোজ হ’ল, সেদিন শখের থিয়েটারে হাজার টাকা গেল এক রাত্রে। তবুও তো শুনলাম এ তেমন কিছু নয়– এরা পাঁড়াগাঁয়ের গৃহস্থ জমিদার মাত্র, খুব বড়মানুষি করবে কোথা থেকে।

ফুলশয্যার তত্ব সাজাতে খুব খাটুনি হ’ল। দু-মণ দই, আধ মণ ক্ষীর, এক মণ মাছ, লরি-বোঝাই তরিতরকারি, চল্লিশখানা সাজানো থালায় নানা ধরনের তত্বের জিনিস–সব বন্দোবস্ত করে তত্ব বার করে ঝি-চাকরের সারি সাজাতে ও তাদের রওনা করতে–সে এক রাজসূয় ব্যাপার।

ওদের রঙীন কাপড়-পরা ঝি-চাকরের লম্বা সারির দিকে চেয়ে মনে হ’ল এই বড়মানুষির খরচের দরুন নিমচাঁদের স্ত্রী তিনটে টাকা দিয়েছে। অথচ এই হিমবর্ষী অগ্রহায়ণ মাসের রাত্রে হয়ত যে অনাথা বিধবার খেজুরডালের ঝাঁপে শীত আটকাচ্চে না, সেই যে বুড়ী যার গলা কাঁপছিল, তার সেই ধার-করে দেওয়া আট আনা পয়সা এর মধ্যে আছে। ধর্মের নামে এরা নিয়েছে, ওরা স্বেচ্ছায় হাসিমুখে দিয়েছে।

সব মিথ্যে। ধর্মের নামে এরা করেচে ঘোর অধর্ম ও অবিচারের প্রতিষ্ঠা। বটতলার গোসাঁই এদের কাছে ভোগ পেয়ে এদের বড়মানুষ করে দিয়েছে, লক্ষ গরীব লোককে মেরে–জ্যাঠামশায়দের গৃহ-দেবতা যেমন তাদের বড় করে রেখেছিল, মাকে, সীতাকে ও ভুবনের মাকে করেছিল ওদের ক্রীতদাসী।

সত্যিকার ধর্ম কোথায় আছে? কি ভীষণ মোহ, অনাচার ও মিথ্যের কুহকে ঢাকা পড়ে গেছে দেবতার সত্য রূপ সেদিন, যেদিন থেকে এরা হৃদয়ের ধর্মকে ভুলে অর্থহীন অনুষ্ঠানকে ধর্মের আসনে বসিয়েছে।

দাদার একখানা চিঠি পেয়ে অবাক হয়ে গেলাম। দাদা যেখানে কাজ করে, সেখানে এক গরীব ব্রাহ্মণের একটি মাত্র মেয়ে ছিল, ওখানকার সবাই মিলে ধরে-পড়ে মেয়েটির সঙ্গে দাদার বিয়ে দিয়েচে। দাদা নিতান্ত ভালমানুষ, যে যা বলে কারও কথা ঠেলতে পারে না। কাউকে জানানো হয়নি, পাছে কেউ বাধা দেয়, তারাই জানাতে দেয়নি। এদিকে জ্যাঠামশায়ের ভয়ে বাড়ীতে বৌ নিয়ে যেতে সাহস করছে না, আমায় লিখেচে, সে বড় বিপদে পড়েছে, এখন সে কি করবে? চিঠির বাকী অংশটা নব-বধূর রূপগুণের উচ্ছ্বসিত সুখ্যাতিতে ভর্তি।

–জিতু, আমার বড় মনে কষ্ট, বিয়ের সময় তোকে খবর দিতে পারিনি। তুই একবার অবিশ্যি অবিশ্যি আসবি, তোর বউদিদির বড় ইচ্ছে তুই একবার আসিস। মায়ের সম্বন্ধে কি করি আমায় লিখবি। সেখানে তোর বউদিকে নিয়ে যেতে আমার সাহসে কুলোয় না। ওরা ঠিক কুলীন ব্রাহ্মণ নয়, আমাদের স্বঘরও নয়, অত্যন্ত গরিব, আমি বিয়ে না করলে মেয়েটি পার হবে না সবাই বললে, তাই বিয়ে করেচি। কিন্তু তোর বৌদিদি বড় ভাল মেয়ে, ওকে যদি জ্যাঠামশায় ঘরে নিতে না চান, কি অপমান করেন, সে আমার সহ্য হবে না…

পত্র পড়ে বিস্ময় ও আনন্দ দুই-ই হ’ল। দাদা সংসারে বড় একা ছিল, ছেলেবেলা থেকে আমাদের জন্যে খাটচে, জীবনটাই নষ্ট করলে সেজন্যে, অথচ ওর দ্বারা না হ’ল বিশেষ কোনো উপকার মায়ের ও সীতার, না হ’ল ওর নিজের। ভালই হয়েছে ওর মত স্নেহপ্রবণ, ত্যাগী ছেলে যে একটি আশ্রয়নীড় পেয়েছে, ভালবাসার ও ভালবাসা পাবার পাত্র পেয়েছে, এতে ওর সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হলুম। কত রাত্রে শুয়ে শুয়ে দাদার দুঃখের কথা ভেবেচি!

মাকে কাছে নিয়ে আসতে পত্র লিখে দিলাম দাদাকে। জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে রাখবার আর দরকার নেই। আমি শীগগিরই গিয়ে দেখা করবো।

মাঘ মাসের প্রথমে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মনে কেমন একটা উদাস ভাব, কিসের একটা অদম্য পিপাসা। আমার মনের সঙ্গে যা খাপ খায় না, তা আমার ধর্ম নয়। ছেলেবেলা থেকে আমি যে অদৃশ্য জগতের বার বার সম্মুখীন হয়েচি, অথচ যাকে কখনও চিনি নি, বুঝিনি–তার সঙ্গে যে ধর্ম খাপ খায় না, সেও আমার ধর্ম নয়।

অথচ চারিদিকে দেখচি সবাই তাই। তারা সৌন্দর্যকে চেনে না, সত্যকে ভালবাসে না, কল্পনা এদের এত পঙ্গু যে, যে-খোঁটায় বদ্ধ হয়ে ঘাসজল খাচ্চে গরুর মত–তার বাইরে ঊর্ধ্বের নীলাকাশের দেবতার যে-সৃষ্টি বিপুল ও অপরিমেয় এরা তাকে চেনে না।

বছরখানেক ঘুরে বেড়ালুম নানা জায়গায়। কতবার ভেবেচি একটা চাকরি দেখে নেবো, কিন্তু শুধু ঘুরে বেড়ানো ছাড়া কিছু ভাল লাগতো না। যেখানে শুনতাম কোনো নতুন ধর্মসম্প্রদায় আছে, কি সাধু-সন্ন্যাসী আছে, সেখানে যেন আমায় যেতেই হবে, এমন হয়েছিল।

কালনার পথে গঙ্গার ধারে একদিন সন্ধ্যা হয়ে গেল। কাছেই একটা ছোট গ্রাম, চাষী কৈবর্তের বাস। ওখানেই আশ্রয় নেবো ভাবলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খড়ের ঘর, বেশ নিকোনো-পুছোনো, উঠোন পর্যন্ত এমন পরিষ্কার যে সিঁদুর পড়লে উঠিয়ে নেওয়া যায়। সকলের ঘরেই ধানের ছোটবড় গোলা, বাড়ির সামনে-পিছনে ক্ষেত-খামার। ক্ষেতের বেড়ায় মটরশুঁটির ঝাড়ে সাদা গোলাপী ফুল ফুটে মিষ্টি সুগন্ধে সন্ধ্যার অন্ধকার ভরিয়ে রেখেচে।

একজন লোক গোয়ালঘরে গরু বাঁধছিলো। তাকে বললাম–এখানে থাকবার জায়গা কোথায় পাওয়া যাবে? সে বললে–কোত্থেকে আসা হচ্চে? আপনারা?

‘ব্রাহ্মণ’ শুনে নমস্কার করে বললে–ওই দিকে একটু এগিয়ে যান–আমাদের অধিকারী মশাই থাকেন, তিনি ব্রাহ্মণ, তাঁর ওখানে দিব্বি থাকার জায়গা আছে।

একটু দূরে গিয়ে অধিকারীর ঘর। উঠোনের এক পাশে একটা লেবুগাছ। বড় আটচালা ঘর, উঁচু মাটির দাওয়া। একটি ছোট ছেলে বললে, অধিকারী বাড়ী নেই, হলুদপুকুরে কীর্তনের বায়না নিয়ে গাইতে গিয়েচে-কাল আসবে।

আমি চলে যাচ্ছি এমন সময় একটি মেয়ে ঘরের ভেতর থেকে বললে–চলে কেন যাবেন? পায়ের ধুলো দিয়েছেন যদি রাতে এখানে থাকুন না কেনে?

কথার মধ্যে রাঢ় দেশের টান। মেয়েটি তারপর এসে দাওয়ায় দাঁড়াল। বয়স সাতাশ আটাশ হবে, রং ফর্সা, হাতে টেমির আলোয় কপালের উল্কি দেখা যাচ্ছে।

মেয়েটি দাওয়ায় একটা মাদুর বিছিয়ে দিলে, এক ঘটি জল নিয়ে এল। আমি হাত পা ধুয়ে সুস্থ হয়ে বসলে মেয়েটি বললে–রান্নার কি যোগাড় করে দেবো ঠাকুর?

আমি বললাম–আপনারা যা রাঁধবেন, তাই খাবো।

রাত্রে দাওয়ায় শুয়ে রইলাম। পরদিন দুপুরের পরে অধিকারী মশাই এল। পেছনে জনতিনেক লোক, একজনের পিঠে একটা খোল বাঁধা। তামাক খেতে খেতে আমার পরিচয় নিলে, খুব খুশী হ’ল আমি এসেচি বলে।

বিকেলে উল্কি-পরা স্ত্রীলোকটির সঙ্গে কি নিয়ে তার ঝগড়া বেধে গেল। স্ত্রীলোকটি বলচে শুনলাম–এমন যদি করবি মিন্সে, তবে আমি বলরামপুরে চলে যাব। কে তোর মুখনাড়ার ধার ধারে? একটা পেট চলে যাবে ঢের, সেজন্যে তোর তোয়াক্কা রাখি ভেবেচিস।

আগুনে জল পড়ার মত অধিকারীর রাগ একদম শান্ত হয়ে গেল। রাত্রে ওদের উঠোনে প্রকাণ্ড কীর্তনের আসর বসল। রাত তিনটে পর্যন্ত কীর্তন হ’ল। আসরসুদ্ধ সবাই হাত তুলে নাচতে শুরু করলে হঠাৎ। দু-তিন ঘণ্টা উদ্দণ্ড নৃত্যের পরে ক্লান্ত হয়ে পড়ার দরুনই হোক বা বেশী রাত হওয়ার জন্যেই হোক, তারা কীর্তন বন্ধ করলে।

আমি যেতে চাই, ওরা–বিশেষ করে সেই স্ত্রীলোকটি–আমায় যেতে দেয় না। কি যত্ন সে করলে! আর একটা দেখলাম, অধিকারীকেও সেবা করে ঠিক ক্রীতদাসীর মত– মুখে এদিকে যখন-তখন যা-তা শুনিয়ে দেয়, তার মুখের কাছে দাঁড়াবার সাধ্যি নেই অধিকারীর।

যাবার সময় মেয়েটি দিব্যি করিয়ে নিলে যে আমি আবার আসবো। বললে–তুমি তো ছেলেমানুষ, যখন খুশী আসবে। মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যাবে। তোমার খাওয়ার কষ্ট হচ্চে এখানে–মাছ মিলে না, মাংস মিলে না। বোশেখ মাসে এস, আম দিয়ে দুধ দিয়ে খাওয়াবো।

কী সুন্দর লাগল ওর স্নেহ!

আমার সেই দর্শনের ক্ষমতাটা ক্রমেই চলে যাচ্চে। এই দীর্ঘ এক বছরের মধ্যে মাত্র একটিবার জিনিসটা ঘটেছিল।

ব্যাপারটা যেন স্বপ্নের মত। তারই ফলে আটঘরায় ফিরে আসতে হচ্চে। সেদিন দুপুরের পরে একটি গ্রাম্য ডাক্তারের ডিসপেন্সারী-ঘরে বেঞ্চিতে শুয়ে বিশ্রাম করছি– ডাক্তারবাবু জাতিতে মাহিষ্য, সর্বদা ধর্মকথা বলতে ও শুনতে ভালবাসে বলে আমায় ছাড়তে চাইত না, সব সময় কেবল ঘ্যান ঘ্যান করে ওই সব কথা পেড়ে আমার প্রাণ অতিষ্ঠ করে তুলেছিল–আমি ধর্মের কথা বলতেও ভালবাসি না, শুনতেও ভালবাসি না– ভাবছি শুয়ে শুয়ে কাল সকালে এর এখান থেকে চলে যাব–এমন সময় একটু তন্দ্রা-মত এল। তন্দ্রাঘোরে মনে হ’ল আমি একটা ছোট্ট ঘরের কুলুঙ্গি থেকে বেদানা ভেঙে কার হাতে দিচ্ছি, যার হাতে দিচ্চি সে তার রোগজীর্ণ হাত অতিকষ্টে একটু করে তুলে বেদানা নিচ্চে, আমি যেন ভাল দেখতে পাচ্চি নে, ঘরটার মধ্যে ধোঁয়া-ধোঁয়া কুয়াশা–বারকতক এই রকম বেদানা দেওয়া-নেওয়ার পরে মনে হ’ল রোগীর মুখ আর আমার মায়ের মুখ এক। তন্দ্রা ভেঙে মন অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠল এবং সেই দিনই সেখান থেকে আঠারো মাইল হেঁটে এসে ফুলসরা ঘাটে স্টীমার ধরে পরদিন বেলা দশটায় কলকাতা পৌঁছুলাম। মায়ের নিশ্চয়ই কোনো অসুখ করেচে, আটঘরা যেতেই হবে।

শেয়ালদ’ স্টেশনের কাছে একটা দোকান থেকে আঙুর কিনে নেবো ভাবলাম, পকেটেও বেশী পয়সা নেই। পয়সা গুনচি দাঁড়িয়ে, এমন সময় দূর থেকে মেয়েদের বিশ্রাম ঘরের সামনে দণ্ডায়মানা একটি নারীমূর্তির দিকে চেয়ে আমার মনে হ’ল দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা আমার পরিচিত। কিন্তু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পারলাম না–আঙুর কিনতে চলে গেলাম। ফিরবার সময় দেখি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের কাছে একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে শ্রীরামপুরের ছোট বৌঠাকরুন। আমি কাছে যেতেই বৌঠাকরুন চমকে উঠলেন প্রায়। বললেন–আপনি! কোত্থেকে আসচেন? এমন চেহারা?

আমি বললুম–আপনি একটু আগে মেয়েদের ওয়েটিং রুমের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন?

হ্যাঁ, এই যে আমরা এখন এলাম যোগবাণীর গাড়ীতে–আমরা শ্রীরামপুরে যাচ্চি। ইনি মেজদা–এঁকে দেখেন নি কখনও?

যুবকটি আমায় বললে–আপনি তাহলে একটু দাঁড়ান দয়া ক’রে–আমি একটা ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে আসি–এখানে দরে বনচে না–

সে চলে গেল। ছোট-বৌঠাকরুন বললেন–মাগো কি কালীমূর্তি চেহারা হয়েছে! বড়দি বলছিল আপনি নাকি কোথায় চলে গিয়েছিলেন, খোঁজ নেই–সত্যি?

–নিতান্ত মিথ্যে কি করে বলি! তবে সম্প্রতি দেশে যাচ্চি।

ছোট-বৌঠাকরুন হাসিমুখে চুপ করে রইলেন একটু, তারপর বললেন–আপনার মত লোক যদি কখনও দেখে থাকি! আপনার পক্ষে সবই সম্ভব। জানেন, আপনি চলে আসবার পরে বড়দির কাছ থেকে আপনার সম্বন্ধে অনেক কথা জিজ্ঞেস করে করে শুনেচি। তখন কি অত জানতাম? বড়দি বাপের বাড়ি গিয়েচে আশ্বিন মাসে–আপনার সঙ্গে দেখা হবে’খন। আচ্ছা, আর শ্রীরামপুরে গেলেন না কেন? এত ক’রে বললাম, রাখলেন না কথা? আমার ওপর রাগ এখনও যায়নি বুঝি?

–রাগ কিসের? আপনি কি সত্যি ভাবেন আমি আপনার ওপর রাগ করেছিলাম?

ছোট-বৌঠাকরুন নতমুখ চুপ করে রইলেন।

—বলুন!

ছোট-বৌঠাকরুন নতমুখেই বললেন–ও কথা যাক। আপনি এ-রকম ক’রে বেড়াচ্ছেন কেন? পড়াশুনো করলেন না কেন?

–সে সব অনেক কথা। সময় পাই তো বলব একদিন।

–আসুন না আজ আমাদের সঙ্গে শ্রীরামপুরে? দিনকতক থেকে যান, কি চেহারা হয়ে গিয়েছে আপনার! সত্যি, আসুন আজ।

–না, আজ নয়, দেশে যাচ্চি, খুব সম্ভব মায়ের বড় অসুখ–

ছোট-বৌঠাকরুন বিস্ময়ের সুরে বললেন–কই সে কথা তো এতক্ষণ বলেননি! সম্ভব মানে কি, চিঠি পেয়েচেন তো, কি অসুখ?

একটু হেসে বললাম–না, চিঠি পাইনি। আমার ঠিকানা কেউ জানতো না। স্বপ্নে দেখেচি–

ছোট-বৌঠাকরুন একটু চুপ করে থেকে মৃদু শান্ত সুরে বললেন–আমি জানি। তখন জানতাম না আপনাকে, তখন তো বয়সও আমার কম ছিল। বড়দি তার পরে বলেছিল। একটা কথা রাখবেন? চিঠি দেবেন একখানা? অন্তত একখানা লিখে খবর জানাবেন?…

ছোট-বৌঠাকরুন আগের চেয়ে সামান্য একটু মোটা হয়েছেন, আর চোখে সে বালিকাসুলভ তরল ও চপল দৃষ্টি নেই, মুখের ভাব আগের চেয়ে গম্ভীর। আমি হেসে বললাম–আমি চিঠি না দিলেও, শৈলদির কাছ থেকেই তো জানতে পারবেন খবর–

এই সময় ওঁর মেজদাদা ট্যাক্সিতে চড়ে এসে হাজির হলেন। আমি বিদায় নিলুম।

সন্ধ্যার সময় আটঘরা পৌঁছে দেখি সত্যিই মায়ের অসুখ। আমাদের ঘরখানায় মেঝের ওপর পাতা বিছানায় মা শুয়ে। অন্ধকারে আমায় চিনতে না পেরে ক্ষীণস্বরে বললে–কে ওখানে, হারু?

তারপর আমায় দেখে কেঁদে উঠে বললেন–কে জিতু, আয় বাবা আয়, এতদিন পরে মাকে মনে পড়লো তোর? আয় এই বালিশের কাছে আয়–ওমা, এ কি হয়ে গিয়েছিস রে! রোগা কালো চেহারা–ওরা সত্যিই বলত তো!

মা একটি ঘরে শুয়ে–জনপ্রাণী কেউ কাছে নেই। সন্ধ্যা হব-হব, ঘরে একটা আলো পর্যন্ত কেউ জ্বালেনি। এমনিই বাড়ি বটে! কেন, এত ছেলে মেয়ে বৌ বাড়িতে, একজন কাছে থাকতে নেই? অথচ—, কিন্তু পরের দোষ দিয়ে লাভ কি, আমিই বা কোথায় ছিলুম এতদিন?

বললাম–মা, দাদা কোথায়? সীতা আসেনি?

মা নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন। বললেন–ওরা কেউ চিঠি দেয় না, ব’লে ব’লে আজ বুঝি হারু একখানা পত্র দিয়েচে সীতাকে।

–ক’দিন অসুখ হয়েছে তোমার, মা? ওরা কেউ দেখে না? জ্যাঠাইমা কাকিমারা আসে না?

–ভুবনের মা মাঝে মাঝে আসে। এই বিকেলে সাবু দিয়ে গেল–তা সাবু কি খেতে পারি, ওই রয়েছে বাটিতে। ছোটবৌ এসেছিল বিকেলবেলা। বটঠাকুর বাড়ি নেই বুঝি– আর কেউ এদিকে মাড়ায় না।

তারপর আমার গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন–হ্যাঁরে জিতু, তুই নাকি সন্নিসী হয়ে গিয়েচিস–দিদি, হারু, মেজবৌ, ঠাকুরপোরা সবাই বলে–সত্যি? বলে সে আর আসবে না, সে কোন দিকে বেরিয়ে চলে গিয়েছে, তার ঠিকানা কেউ জানে না। আমি ভাবি জিতু আমায় ভুলে যাবে এমনি হবে? আবার ভাবি আমার কপাল খারাপ, নইলে এ-সব হবেই বা কেন–ভেবে ভেবে রাত জেগে বসে থাকি।

–কেঁদো না, কেঁদো না, ছিঃ! ওসব মিথ্যে কথা। কে বলেচে সন্নিসী হয়ে গেছি! এই দ্যাখ না সাদা কাপড় পরনে, সন্নিসী কি সাদা কাপড় পরে?

মনে বড় অনুতাপ হ’ল–কি অন্যায় কাজ করেচি এতদিন এভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ে! আর এদেরও কি অন্যায়, সবাই মিলে মাকে এমন করে ভয় দেখানোই বা কেন, মা সরল মানুষ, সকলের কথাই বিশ্বাস করেন। কিন্তু আমার দোষ ছিল না, আমি ভেবেছিলাম মা আছেন দাদার কাছে। নিশ্চিন্ত ছিলুম অনেকটা সেজন্যে। জিজ্ঞেস করলাম–মা, দাদা তোমায় নিয়ে যায়নি?

–সে অনেক কথা। নিতু নিতেও এসেছিল, বটঠাকুর বললেন–যাও, কিন্তু আমার এখানে আর আসতে পাবে না। সীতার শ্বশুরবাড়ির লোক ভাল না এখন দেখচি–তারাও বটঠাকুরের হাতের লোক, বললে, তা হলে মেয়ে-জামায়ের সঙ্গে সম্বন্ধ ঘুচে যাবে। মেয়ে তারা আর পাঠাবে না। বৌমাকেও এখনও দেখিনি, এমনি আমার কপাল। বটঠাকুর সেই বউকে এ-বাড়ি নাকি ঢুকতে দেবেন না। তা নিতু আমায় লিখলে, মা, এই কটা মাস যাক–কোথায় নাকি ভাল চাকরি পাবে–এখানে পাড়াগাঁয়ে বাসাও পাওয়া যায় না। আমি আবার গিয়ে ওর শ্বশুরবাড়ি উঠবো সেটা ভাল দেখাবে না। মাঘ মাসে একেবারে নিয়ে যাবে এখান থেকে। এই তো নিতু ওমাসেও এসেছিল। আহা, বাছাকে কি অপমান করলে সবাই মিলে। আমার কপালে কেবল চারিদিকে অপমান ছাড়া আর কিছু জোটে না–

কেন চাকরি ছেড়ে দিলাম? কেন এভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়াই? এখন দেখতে পাচ্চি সীতার বিবাহ হয়ে গেলেই আমার কর্তব্য শেষ হয়েচে ভাবা উচিত ছিল না। মাকে আমি উপেক্ষা করে এসেচি এতদিন, দাদা সাধ্যমত অবিশ্যি করেচে–কিন্তু আমি কিছুই করিনি। কেন আমার এমন ধারা মতিগতি হ’ল? কোথায় আমার কর্তব্য, সে সম্বন্ধে আমি অন্ধ ছিলাম কেন?

লজ্জিত ও অনুতপ্ত সুরে বললাম–মা আঙুর খাবে?… আঙুর এনেছি, ভাল আঙুর শেয়ালদ’ থেকে–

–ভূতোকে বললাম, একটা আলো নিয়ে আয়, তা দেয়নি দেখচি–বলতে বলতে ছোট-কাকীমা ঘরের দোরের কাছে এসে আমায় দেখে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন–কে বসে ওখানে?

আমি অপরাধীর মত কুণ্ঠিত স্বরে বললাম–আমি, কাকীমা।

এগিয়ে এসে বললেন–কে নিতু?

—না, আমি।

কাকীমা অবাক হয়ে বললেন–ওমা, জিতু যে দেখচি, কোত্থেকে, কি ভাগ্যি তোমার মায়ের? তারপর, কি মনে করে?

আমি মাথা হেঁটে ক’রে বসে রইলাম, কি আর বলব।

কাকীমা বললেন–তোমার কাণ্ডজ্ঞান যে কবে হবে, তা ভেবেই পাই নে। একেবারে একটা বছর নিরুদ্দেশ নিখোঁজ।–আর এই এ-ভাবে মাকে ফেলে রেখে! তোমাদের একটু জ্ঞান নেই যে এটা কার বাড়ি? এখানে কে দ্যাখে তোমার মাকে? সবই তো জান– বয়েস হয়েছে, এখনও বুদ্ধি হ’ল না? বটঠাকুর বাড়ি নেই, একটা ডাক্তার-বদ্যি কে দেখায় তার নেই ঠিক। হরি ডাক্তারকে একবার আনতে হয়–টাকাকড়ি কিছু আছে? নেই বোধ হয়, সে দেখেই বুঝিচি–নেই। আচ্ছা, টাকা আমি দেব এখন, ভেব না, ডাক্তার আন।

ছোটকাকীমার পায়ের ধুলো নেবার ইচ্ছা হ’ল। এ বাড়িতে সবাই পশু, সবাই অমানুষ–সত্যিকারের মেয়ে বটে ছোটকাকীমা।

রাত্রেই ডাক্তার এল। ওষুধপত্রও হ’ল। দাদাকে পত্র দিলাম পরদিন সকালে।

আমায় নিয়ে খুব হৈ-চৈ হ’ল। জ্যাঠাইমা আমায় রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে খেতে দেবেন না–আমি জাতবিচার মানি নে, বাগদি দুলে সবার হাতে খেয়ে বেড়াই, এ-সব কথা কে এসে গাঁয়ে বলেচে। নানা রকম অলঙ্কার দিয়ে কথাটা রাষ্ট্র হয়েচে গাঁয়ে।

মায়ের অবস্থা শেষরাত থেকে বড় খারাপ হ’ল। সকালে আমাকে আর চিনতে পারেন না–ভুল বকতেও লাগলেন।

সন্ধ্যার সময় একটা মিটমিটে টেমি জ্বলচে ঘরের মেজেতে–আমি একা বসে আছি মায়ের শিয়রে, এমন সময় বাইরে উঠোনে একখানা গরুর গাড়ি এসে দাঁড়াবার শব্দ হ’ল। একটু পরেই ব্যস্তসমস্ত ভাবে মাটিতে আঁচল লুটোতে লুটোতে সীতা ঘরে ঢুকল। আমায় দেখে বললে, ছোড়দা?

আমি ওর দিকে চেয়ে রইলাম। সীতা একেবারে বদলে গিয়েছে, মাথায় কত বড় হয়েচে, দেখতেও কি সুন্দর হয়েছে–ওকে চেনা যায় না আর।

মাকে বললাম–মা, ওমা, সীতা এসেচে–

মা চাইলেন, কি বললেন বোঝা গেল না। বোধ হয় বুঝতে পারলেন না যে সীতা এসেচে।

সীতা খুব শক্ত মেয়ে। সে কেঁদেকেটে আকুল হয়ে পড়লো না। আমায় বললে– ছোড়দা, আমার বালাজোড়াটা দিচ্চি, তাই দিয়ে ভাল ডাক্তার নিয়ে এস। এখানকার হরিডাক্তার তো? তার কাজ নয়।

আমি অক্ষমতার লজ্জায় কুণ্ঠিত সুরে বললাম–তার পর তোর শ্বশুরবাড়ির লোকে তোকে বকবে। সে কি করে হয়–

সীতা বললে–ইস! বকবে কিসের জন্যে, বালা কি ওদের? মায়ের বালা, মা দিয়েছিলেন বিয়ের সময়। বাবা গড়িয়ে দিয়েছিলেন মাকে। তুমি বালা নিয়ে যাও, তারপর ওরা যা বলে বলবে–

এই সময় সীতার স্বামী ঘরে ঢুকল। আমি যে-রকম চেহারা কল্পনা করেছিলাম, লোকটা তার চেয়েও খারাপ। কালো তো বটেই, পেটমোটা, বোধ হয় পিলে আছে, কাঠখোট্টা গড়ন, চোয়ালের হাড় উঁচু–গায়ে একটা ছেলেমানুষের মত ছিটের জামা, একটা রাঙা আলোয়ান, পায়ে কেম্বিসের জুতো। আমায় দেখে দাঁত বার করে হেসে বললে–এই যে, ছোটবাবু না? কখন আসা হ’ল, বড়বাবু বুঝি এখনও আসবার ফুরসত পাননি–তার পর অসুখটা কি?…এখন কেমন আছেন?

তারপর সে খানিকক্ষণ বসে থেকে বললে–বসো তোমরা। আমি জ্যাঠাইমাদের সঙ্গে দেখা করে আসি–একটু চায়ের চেষ্টাও দেখা যাক, গরুর গাড়িতে গা-হাত ব্যথা হয়ে গিয়েচে।

ওর কথার ভঙ্গিতে একটা চাষাড়ে ভাব মাখানো। এই লোকটা সীতার স্বামী! সীতার মত মেয়ের! সীতাকেও আমরা সবাই মিলে উপেক্ষা করচি।

এই সময় হঠাৎ শৈলদিদির কথা আমার মনে পড়ল। শেয়ালদ’ স্টেশনে ছোট বৌঠাকরুন বলেছিল শৈলদি এখানে আছে। সীতার বালাজোড়াটা নেব না–ওকে তার জন্যে অনেক দুঃখ পোয়াতে হবে সেখানে। ও যে-রকম চাপা মেয়ে, কোন অভিযোগ করবে না কখনও কারু কাছে। শৈলদিদির কাছ থেকে টাকা ধার নেবো, মায়ের অসুখের পর যে-ক’রে হোক দেনা শোধ হবেই।

একবার বাড়ির মধ্যে গিয়ে দেখি সীতার স্বামী ওদের রান্নাঘরে বসে হুঁকো হাতে তামাক খেতে খেতে খুব গল্প জমিয়েচে–আমার খুড়তুতো জ্যাঠতুতো ভায়েদের সকলেরই প্রায় বিয়ে হয়ে গিয়েছে এবং বৌয়েরা সকলেই ওর শালাজ–তাদের সঙ্গে।

রাত দশটার সময় শৈলদিদি এসে হাজির। আমায় দেখে বললে–এই যে সন্নিসী ঠাকুর ফিরে এসেচ দেখচি। এই যে সীতা–এস এস, সাবিত্রীসমান হও, কখন এলে ভাই? আমি শুনলাম এই খানিকটা আগে, আমাদের ও-পাড়ায় কে খবর দেবে বল।

আমি আর সীতা শুধু ঘরে মায়ের পাশে বসে। সীতার স্বামী খেয়ে-দেয়ে শুয়েচে, অবিশ্যি সে বসে থাকতে চেয়েছিল–আমি বলেছিলাম, তার দরকার নেই তুমি খেয়ে একটু বিশ্রাম কর–দরকার হলে ডাকব রাত্রে।

শৈলদিদি রাত্রে থাকতে চাইলে, বললে–আজ রাতে লোকের দরকার। তোরা দুটিতে মোটে বসে আছিস। আমি খেয়ে আসি, আমিও থাকব।

আমি বললাম–না শৈলদি, আমরা দুজন আছি, ভগ্নীপতি এসেচে–তোমার আর কষ্ট করতে হবে না।

তারপর বাইরে ডেকে টাকার কথা বললাম। শৈলদি বললে–কত টাকা?

—গোটাকুড়ি দাও গিয়ে এখন। কাল সকালেই আমি তা হ’লে চলে যাই ডাক্তার আনতে–

–তা হলে কাল সকালে যাবার সময় আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবি। ওখান দিয়েই তো পথ–কেমন তো?

ছোটকাকীমা এই সময় এলেন। শৈলদিকে দেখে বললেন–জিতুর মাকে নিয়ে বেজায় মুশকিল হয়েচে ভাই–ওরা ছেলেমানুষ, কি বা বোঝে–নিতু এখনও তো এল না। হঠাৎ চার পাঁচ দিনের জ্বরে যে মানুষ এমন হয়ে পড়বে তা কি ক’রেই বা জানবো। তবুও তো জিতু কোথা থেকে ঠিক সময়ে এসে পড়েছিল তাই রক্ষে।

রাতে জ্যাঠাইমাও এসে খানিকটা বসে রইলেন। অনেক রাত্রে সবাই চলে গেল, আমি সীতাকে বললাম–তুই ঘুমিয়ে নে সীতা। আমি জেগে থাকি। রাতে কোন ভয় নেই।

সকাল বেলা আটটা-নটার পর থেকে মা’র অবস্থা খুব খারাপ হ’ল। দশটার পর দাদা এল–সঙ্গে বৌদিদি ও দাদার খোকা। বৌদিদিকে প্রথম দেখেই মনে হ’ল শান্ত, সরল, সহিষ্ণু মেয়ে। তবে খুব বুদ্ধিমতী নয়, একটু অগোছালো আনাড়ি ধরনের। নিতান্ত পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, বাইরে কোথাও বেরোয়নি বিশেষ, এই বোধ হয় প্রথম, কিছু তেমন দেখেও নি। গরম জলের বোতল পায়ে সেঁক করতে হবে শুনে ব্যাপারটা না বুঝতে পেরে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বিপন্ন মুখে সীতার দিকে চেয়ে রইল। কাপড়-চোপড় পরবার ধরনও অগোছালো–আজকালকার মত নয়। বৌদিদি যেন বনে-ফোঁটা শুভ্র কাঠমল্লিকা ফুল, তুলে এনে তোড়া বেঁধে ফুলের দোকানে সাজিয়ে রাখবার জিনিস নয়। আর একেবারে অদ্ভুত ধরনের মেয়েলী, ওর সবটুকুই নারীত্বের কমনীয়তা মাখানো।

সীতা আমায় আড়ালে বললে–চমৎকার বৌদি হয়েচে, ছোড়দা। আহা, মা যদি একটিবারও চোখ মেলে চেয়ে দেখতেন। আমাদের কপাল!

বেলা তিনটের সময় মা মারা গেলেন। যে মায়ের কথা তেমন করে কোন দিন ভাবি নি, আমাদের কাজকর্মে, উদ্যমে, আশায়, আকাঙ্ক্ষায়, উচ্চাভিলাষে মায়ের কোন স্থান ছিল না, সবাই মিলে যাকে উপেক্ষা করে করে এসেচি এত দিন–আজ সেই মা কতদূরে কোথায় চলে গেলেন–সেই মায়ের অভাবে হঠাৎ আমরা অনুভব করলাম। অনেকখানি খালি হয়ে গিয়েচে জীবনের। ঘরের মধ্যে যেমন প্রকাণ্ড ঘরজোড়া খাট থাকে, আজন্ম তার ওপর শুয়েচি, বসেছি, খেলেছি, ঘুমিয়েচি, সর্বদা কে ভাবে তার অস্তিত্ব, আছে তো আছে। হঠাৎ একদিন খাটখানা ঘরে নেই–ঘরের পরিচিত চেহারা একেবারে বদলে গিয়েছে–সে ঘরই যেন নয়, একদিন ঘরের সে নিবিড় সুপরিচিত নিজস্বতা কোথায় হারিয়ে গেল, তখন বোঝা যায় ঘরের কতখানি জায়গা জুড়ে কি গভীর আত্মীয়তায় ওর সঙ্গে আবদ্ধ ছিল সেই চিরপরিচিত একঘেয়ে সেকেলে খাটখানা–ঘরের বিরাট ফাঁকা আর কিছু দিয়েই পূর্ণ হবার নয়।

সীতার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভাঙলো। সে ছোট মেয়ের মত কেঁদে আবদার করে যেন মাকে জড়িয়ে থাকতে চায়। মা আর সে দুজনে মিলে এই সংসারে সকালে-সন্ধ্যায় খেটে দুঃখের মধ্যে দিয়ে পরস্পরের অনেক কাছাকাছি এসেছিল–সে-সব দিনের দুঃখের সঙ্গিনী হিসাবে মা আমাদের চেয়েও ওর কাছে বেশী আপন, বেশী ঘনিষ্ঠ–অভাগী এত দিনে সত্যি সত্যি নিঃসঙ্গ হ’ল সংসারে। ওর স্বামী যে ওর কেউ নয়, সে আমার বুঝতে দেরি হয় নি এতটুকু। কিন্তু ও হয়ত এখনও তা বোঝেনি।

দিন দুই পরে বৌদিদি দুপুরবেলায় ওদের রান্নাঘরে একটা ঘড়া আনতে গিয়েছেন। জ্যাঠাইমা বলেচেন-ওখানে দাঁড়াও, দাওয়াটাতে–অমনি হট করে ঘরে ঢুকলে যে?

বৌদিদি অবাক হয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েচেন, জ্যাঠাইমা ঘড়া বার করে দিয়েচেন দাওয়াতে। বৌদিদি নিয়ে এসেছে, কিন্তু বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা কি, বুদ্ধিমতী মেয়ে হ’লে তখনই বুঝত।

এ-কথা তখন সে কাউকে বলেনি।

পরদিন মেজকাকা আমায় ডেকে বললেন–একটা কথা আছে, শোন। তোমার মায়ের কাজটা এখানে না করে অন্য জায়গায় গিয়ে করো। মানে তোমার দাদার বৌয়ের এখানে তো পাকস্পর্শ হয়নি, বড়দাদাও নেই বাড়ি–এ অবস্থায় শ্রাদ্ধের সময় কেউ খেতে আসবে না। তোমার দাদার বৌকে আমরা সেভাবে ঘরে তো নিইনি। এই বুঝে যা হয় ব্যবস্থা করো। বলো তোমার দাদাকে।

তলায় তলায় এঁরা সীতার স্বামী গোপেশ্বরকে কি পরামর্শ দিয়েচেন জানি নে, সে হঠাৎ বেঁকে দাঁড়িয়ে বললে চতুর্থীর শ্রাদ্ধ সীতাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে করবে–অথচ আগে ঠিক হয়েছিল চতুর্থীর শ্রাদ্ধ এখানেই হবে। এর কোনও দরকার ছিল না, সীতা এখানে শ্রাদ্ধ করলে তাতে কোন দোষ সমাজের মতেও হবার কথা নয়। কিন্তু সে কিছুতেই শুনলে না এই অবস্থায় বৌদিদিকে পেয়ে সীতা অনেকটা সান্ত্বনা পেয়েছিল–কিন্তু সে ওদের সইল না। বৌদিদির সঙ্গে সীতার বেশী মেলামেশিটা যেন গোড়া থেকেই আমার ভগ্নীপতি পছন্দ করে নি। নিজেই হোক আর ওদের পরামর্শেই হোক।

যাবার সময় সীতা বৌদিদির গলা জড়িয়ে কাঁদতে লাগল। আমায় আড়ালে বললে– ছোড়দা আমায় বনবাসে ফেলে রেখে ভুলে থেকো না যেন, মাঝে মাঝে আসবে বল? আর শোনো, বৌদি বড্ড ভালমানুষ, ও এখনও জানে না যে ওর জন্যেই মায়ের কাজ এখানে করতে দিচ্চে না ওরা। এ কথা যেন বৌদিদির কানে না যায়, বলে দিও দাদাকে।

বৌদিদিকে বুঝিয়ে দেওয়া হ’ল এখানে শ্রাদ্ধ করতে খরচ বেশী পড়বে, কারণ জ্যেঠামশায়দের নাম বেশী, লোকজন নিমন্ত্রণ করতে হয় অনেক। গঙ্গাতীরে শ্রাদ্ধের কাজ করলে অনেক কম খরচ হবে। বৌদিদি তাই বুঝে গেল।

যাবার সময় আমাদের ঘরের চাবিটা ছোটকাকীমার হাতে দিয়ে বললুম-–এ বাড়িতে আর কাউকে আপন বলে জানি নে, কাকীমা। সীতার খোঁজখবর মাঝে মাঝে একটু নিও–ওর তো এ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক একরকম মিটেই গেল।

ছোটকাকীমার চোখে জল এল। বললেন–আমার কোনো ক্ষমতা নেই, নইলে নিতুর বৌকে এ বাড়ি থেকে আজকে অন্য জায়গায় যেতে বলে?

আমি বললুম–সে কথা বলো না কাকীমা। আমরা এখানে এসেছিলাম প্রার্থী হয়ে, পরের দয়ার ওপর নির্ভর করে। এখানে কোন অধিকার নেই আমাদের।

কাকীমা বললেন–তুই ও কি কথা বলচিস জিতু? এ তোদের যে সাতপুরুষের ভিটে। জায়গা-জমি আর দুখানা ইট থাকলেই বা কি, আর গেলেই বা কি? এ ভিটেতে হারু কি যোগেশের যে অধিকার, তোদের দু-ভায়ের তার চেয়ে এক চুল কম নয়।

ছোটকাকীমার এক মূর্তি দেখেছিলাম বাল্যে, এ আর এক মূর্তি। এই একজনই এ বাড়ির মধ্যে বদলে গিয়েছে একেবারে। গাড়িতে যেতে যেতে সেই কথাটা বার বার মনে হচ্চিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *