ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

নয়

অন্ধকার মানেই সংশয়, অসহায়তা, ভয় এবং অনিশ্চিত আর আলো মানেই সব সংশয়ের অবসান, আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং নিশ্চয়তা। প্রতিটি তমসানাশিনী সকালই যে আমাদের জন্যে কী বয়ে আনে তা এই ‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ডের পাশে নোঙর করা ছোট্ট বোটে রাত না কাটালে নতুন করে বুঝতে পারতাম না। মানুষখেকো বাঘের অপেক্ষায় থাকা, অনেক ডাকাত ও খুনির সঙ্গে মোকাবিলা করার অপেক্ষাতে ঋজুদার সঙ্গে অথবা ঋজুদার নির্দেশে অনেকই বিনিদ্র রাত কাটিয়েছি আজ পর্যন্ত। আজ এই আন্দামান উপসাগরেও সকাল হল অনেক জানার মধ্যে দিয়ে। পৃথিবীর তিন ভাগই যে জল, মাত্র একভাগ স্থল একথা শিশুকাল থেকেই জেনে এসেছি কিন্তু সেই জানাটার তাৎপর্য যে ঠিক কী তা গত রাতে যেমন করে জানলাম তেমন করে আগে কখনও জানিনি।

এতদিন জানতাম পাহাড় দারুণ ব্যক্তিত্বময়, প্রত্যেক পাহাড়েরই আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব আছে কিন্তু এখন জানছি সমুদ্রের ব্যক্তিত্ব হয়তো পাহাড়ের চেয়েও বেশি। তার প্রধান কারণ হয়তো এই যে, পাহাড় পর্বত অনড় কিন্তু সমুদ্র গতিশীল, বিচিত্র তার রূপ, বিচিত্রতর তার মন।

ঋজুদা বলল, ব্রেকফাস্ট খাওয়া-টাওয়া হবে না আজ। ভটকাইকে বলে দে রুদ্র, একটু আগেই দেখলাম কিচেনে গিয়ে কী ফিসির ফিসির করছে বাবুর্চির সঙ্গে। এক কাপ করে কফি আর দুটি করে বিস্কিট খেয়েই পনেরো মিনিটের মধ্যেই বেরিয়ে যাব আমরা। বন্দুক দুটো চেয়ে নিস ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে। আর জলের বোতল, মানে প্লাস্টিকের, নিয়ে নিস দুটো।

ক্যাপ্টেন ভাদেরা তো যাচ্ছেন আমাদের সঙ্গে।

তাই? তা হলে তো ভালই। উৎসাহ আছে ছেলেটির। ওর ফার্স্ট নেম কী? জানিস নাকি?

যুবরাজ। ভটকাই দোস্তি করে ফেলেছে।

করল কী করে? ইংরেজি তো ভাল বলতে পারে না।

উনি তো বাংলা জানেন একটু একটু, তা ছাড়া বডি ল্যাঙ্গোয়েজ।

বাঃ। চেহারাটি অবশ্য যুবরাজেরই মতো। সেনগুপ্ত সাহেবের ভাগ্য ভাল অমন জামাই পেয়েছেন। কী বল তিতির?

বিয়েতে অবিশ্বাসী তিতির কী বুঝল জানি না, একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে, গলাতে অনাবশ্যক জোর এনে বলল, নিশ্চয়ই!

কফি খেয়ে আমরা উঠে পড়লাম ‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’-এ। আগে আমি, ভটকাই আর ভটকাই-এর সদ্য-লব্ধ যুবরাজ দাদা। ভটকাই কোন মন্ত্রবলে ইতিমধ্যেই তার সঙ্গে দাদা পাতিয়ে ফেলেছে কী জানি! উপরে ওঠার পরেই আমাদের বোটটি যে কী সুন্দর তা বোঝা গেল। ফুটফুটে এক মেমসাহেবের মতো বসে আছে যেন সাদা টপ পরে আর নীচে সমুদ্র মেখলার নীল স্কার্ট পরে। সাদার উপর কালো রং দিয়ে তার নাম লেখা আছে: The Bad Guy। এতক্ষণ নামটি লক্ষ করিনি। দ্য ব্যাড গাই না হলে অবশ্য ‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ডে’ আসবেই বা সে কেন?

উপরে উঠতে যে একটু কষ্ট হল না তা নয়, পরে নিশ্চয়ই অন্য কোনও দিক দিয়ে উঠলে চড়াইটা কম পড়বে তা খুঁজে বের করতে পারা যাবে। এর চেয়ে কম। খাড়াই নিশ্চয়ই থাকবে অন্য কোনও দিকে। কিন্তু এদিকে যে এক ফালি তটভূমি আছে সেখানে আমরা চান করতে পারব এবং রাতে পিকনিক করব ক্যাম্পফায়ার করে। সেই লোভেই এখানে নৌকো বাঁধা। কোথায় যে নৌকো বাঁধব সেই সিদ্ধান্ত জলে এবং জীবনেও সমান জরুরি, কারণ, নৌকো বাঁধার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

উপরে উঠেই সত্যিই চোখ জুড়িয়ে গেল। উপরটা একটা মালভূমির মতো। কত রকমের যে গাছ! আদিগন্ত চারদিকে নীল সবুজ সমুদ্র দিয়ে ঘেরা। একদল টিয়া উড়ে গেল। ছোট ছোট একরকমের পাখি, দল বেঁধে ওড়াওড়ি করছিল ফিচ ফিচ করে ডাকতে। ফটিক জল-এর চেয়েও ছোট, এগুলোর নামই বোধহয় বলেছিল ঋজুদা সুইফট-লেট। এরাই থুথু দিয়ে বাসা বানায় আর সেই বাসা আদর করে খায় চিনারা। Bird’s nest soup!

ঋজুদা বলল, দ্যাখ এটা গুর্জন গাছ। সুন্দর নয়? এর চেয়েও সুন্দর গাছ অবশ্য অনেক আছে এখানে। ডানদিকে দ্যাখ, ওই গাছটার নাম বাদাম। ওর বাঁদিকে ওটা কোকো। ওগুলো সবই হার্ড-উড। নীচে যখন নামব তখন দ্যাখাব সিলভার-গ্রে গাছ। তাদের কাণ্ডর অনেকখানিই রুপোলি-ধূসর রঙের। তোরা আগে আগে গেলি তো, তাই দ্যাখাতে পারলাম না ওঠার সময়ে। চাঁদনি রাতে ভারী সুন্দর দেখায় এই গাছগুলোকে। পালামৌর চিলবিল বা ওড়িশার গেণ্ডুলি গাছেদের মতো।

আজ চাঁদ উঠবে?

তিতির বলল।

চাঁদকেই জিজ্ঞেস কর। পক্ষটা তো শুক্লপক্ষই। গত রাতে তো বিকেল থেকেই মেঘে আকাশের মুখ ঢেকে ছিল।

আরে। আরে। এ যে বটানিকাল গার্ডেনেই এসে পৌঁছলাম আমরা। এই ডেভিলস ডেন দ্বীপে দেখছি আন্দামানে যত গাছ হয় তার প্রায় সবই আছে। স্বাভাবিকভাবে এমনটা হতেই পারে না। এক বা একাধিক কোনও রসিক ফরাসি বা ইংরেজ বা ডাচ জলদস্যুই হয়তো এনে লাগিয়েছিল।

তুমি, মধ্যপ্রদেশ থেকে কিছু সরু বাঁশ, হালকা বেগুনি ফুলের জ্যাকারান্ডা আর বাসন্তী রঙা ফুলের অমলতাস বা বাসন্তীই এনে লাগিও এখানে ঋজুকাকা।

তিতির বলল।

আমি আর ভটকাই বললাম, আমরা এখানে ঋজুদাকে আর আসতেই দেব না।

ভটকাই-এর যুবরাজ দাদা বলল, কোনও মারাঠি জলদস্যুও এনে লাগাতে পারে অথবা কনৌজি আংরে। তিনি তো এই সব সাগর উপসাগরে কম লড়াই করেননি বহু বিদেশির সঙ্গে।

তিতির বলল, সত্যি! ভাবা যায়! কোথায় মহারাষ্ট্র আর কোথায় আন্দামান। এ তো আর প্লেনে করে উড়ে আসা নয়। পুরো ভারতবর্ষকে পাক দিয়ে সমুদ্রপথে পশ্চিম ভারত থেকে এখানে আসা কি সোজা কথা।

আমি বললাম, সে কালের মানুষেরা সব অতিমানব ছিলেন। শিবাজিই বলল আর জাহাঙ্গিরই বলল, কি ঔরঙ্গজেব। ঘোড়ায় চড়ে তাঁরা ভারতের এপার থেকে ওপার করতেন অবহেলে।

ভটকাই বলল, নবাবদের সঙ্গে আবার থাকত পোবা, নাপিত, বাবুর্চি, বেয়ারা, ডাক্তার, নার্স, শয়ে শয়ে বউ। তাঁরা যুদ্ধও করতেন আবার কবিতাও লিখতেন। মার মতো, শোনগড়-এর মতো দুর্গ আকছার বানিয়েও ফেলতেন যখন তখন। অরণ্য-দুর্গ, পর্বত-দুর্গ, মরু-দুর্গ, জয়সলমিরের মত, আবার সমুদ্র-দুর্গও, জিনজিরার মতো। সত্যিই ভাবা যায় না।

ঋজুদা বলল, সেই বইটা পড়েছিস কি তোরা? ক্যাপ্টেন আপনি পড়েছেন কি?

কোনটা ঋজুদা? তিতির বলল।

ভাদেরাও জিজ্ঞাসু চোখে ঋজুদার চোখে তাকাল।

‘The Wonder that was India’

কার লেখা?

A.L. Basham.

না, পড়িনি।

কলকাতা ফিরেই পড়ে ফেলবি। ভটকাই, তুইও পড়বি।

আমি কি সায়েবের ইংরেজি বুঝব ঋজুদা?

ভটকাই মিচকেমি করে বলল।

তিতির বলল, ন্যাকামি কোরো না। পাক্কা সাহেব হয়েছ আজকাল, আর…তারপর যুবরাজকে বলল, আন্দামানের ন্যাভাল লাইব্রেরিতে পেয়ে যাবেন বইটি ভাদেরা। এই বই না থেকেই পারে না। প্রত্যেক ভারতীয়রই এ বই পড়া উচিত।

ঋজুদা বলল, এবার গাছগুলোকে চিনে নে। এখানে চিরহরিৎ গাছ যেমন আছে, পর্ণমোচীও আছে।

পর্ণমোচী মানে?

তিতির বলল।

পর্ণমোচী মানে deciduous মেমসাহেব। যে গাছেদের পাতা ঝরে গিয়ে আবার গজায়। মানে, যে গাছ coniferous নয়।

তারপর বলল, তোদের বাদাম গাছ তো দেখালাম, না? হার্ড-উড!

এখানে একরকম গাছ আছে তার নাম ডিডু।

ডিডু? কী নাম রে বাবা!

ইয়েস। ডিডু।

ওই দ্যাখ, সাদা চুগলাস, টঙ্গপিন, লাল ধুপ, আর সমুদ্র-মওহা।

মওহা মানে? মহুয়ার কাজিন-টাজিন না কি?

হতে পারে। আর ডিডু কিন্তু আসলে শিমুল। এখানে শিমুলকেই ডিডু বলে।

হার্ড-উড আছে, তো সফট-উড নেই?

যুবরাজ, বাঙালির ভাবী-জামাই জিজ্ঞেস করল।

নিশ্চয়ই আছে। সাদা ধূপ, বাকোটা, পপিতা, লম্বাপাত্তি। এবং ডিডুও সফট-উডই।

হার্ড এবং সফট-উড ছাড়াও এখানে অনেক ornamental গাছও হয়।

গাছ আবার ornamental হয় না কি?

ভটকাই বলল।

হয়, হয়, ভটকাইচন্দ্র। এখানে সবই হয়। নতুন দেশে এসেছ না?

তিতির জলিবয় আইল্যান্ডে সেই গানটা গাইছিল না? এলেম নতুন দেশে, তলায় গেল ভগ্নতরী কূলে এলেম ভেসে।

অর্নামেন্টাল গাছ কোথায়?

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ওই দ্যাখ, আগেই দেখিয়েছি সিলভার গ্রে। তা ছাড়া, আছে উড। সাটিনের মতো মসৃণ, বুঝলি। ওই দ্যাখ ওই উপরে ওই গাছটার নাম মাৰ্বল-উড।

সত্যি!

তিতির বলল।

আর যে মস্ত গাছটার ঠিক নীচে তুই দাঁড়িয়ে আছিস সেটার নাম জানিস কি?

কী?

চুল।

সত্যিই চুল?

আমি বললাম।

হ্যাঁ রে। চুল-এর বটানিকাল নাম Sagerala Eliptics.

বলেই বলল, আর ওই দ্যাখ, ওই প্রাগৈতিহাসিক মহীরুহ, চিড়িয়াটাপ্পর পথে দেখেছিলি দু’-একটা–এখানের সবচেয়ে সুপরিচিত গাছ প্যাডক।

তিতির বলল, এর পরও চ্যাথাম আইল্যান্ডে চেরাই করা কাঠ দেখতে যাচ্ছি না। করাতকল তো নয়, গাছেদের লাশ কাটা ঘর।

বাঃ। ভাল বলেছিস।

ঋজুদা বলল।

ভটকাই বলল, তুমি এবারে তোমার বটানির ক্লাসটা বন্ধ করো। চলো, গুহাটাকে আবিষ্কার করি আমরা। বাবাঃ এত গাছ কি এক সঙ্গে হজম করা যায়। সবই গুলিয়ে গেল। কাল রাতের সার্ডিন ভাজাই হজম হয়নি তার উপরে এত বড় বড় সব বিদঘুটে নামের গাছ।

ঋজুদা হেসে বলল, ভটকাইকে, হ্যাঁ। ঠিকই বলেছিস, গুহাটা কোনদিকে, তা তোরা স্কাউটিং করে বের কর। একেকজন একেক দিকে চলে যা। আর গুহাটা খুঁজে পেলে গুহার মধ্যে তোদের কার ঘর কোনদিকে হবে তা এখন থেকেই ঠিক করে নে। ফার্স্ট কাম ফাস্ট-সার্ভড। কলকাতা থেকে আর্কিটেক দুলাল মুখার্জি আর মিহির মিত্রকে নিয়ে আসব। দ্য ডেভিলস ডেন-এ আমার ভিলার প্ল্যান করার জন্যে। আমার বাড়ি হবে, আর সেখানে তোদের আলাদা আলাদা ঘর থাকবে না, তা কি হতে পারে!

চাই না ঘর আমাদের। এখানে তোমাকে আর আসতেই দেব না।

যুবরাজ ভাদেরা আমাদের ঝগড়া দেখে হাসছিলেন।

ঋজুদা বলল, তোরা তিনজনেই গুহার খোঁজ কর আমি আর ভাদেরা যাই পুকুরটার খোঁজে। নারি বলেছিল এখানে একটা মিষ্টি জলের পুকুর আছে।

পাহাড়চুড়োয় পুকুর? আজব কাণ্ড তো!

জল তো আর নীচ থেকে ওঠেনি। পুকুর খুঁড়েছিল কেউ কোনও সময়ে। তারপর বৃষ্টির জল জমে জমে পুকুর হয়ে গেছে। এখানকরা স্যান্ডস্টোন যদিও কোয়ার্টজাইট বা ব্যাসাল্ট বা মাৰ্বল বা গ্রানাইটের মতো ওয়াটারটাইট নয়, মানে ওইসব পাথরের তুলনাতে পোরাস’, তবু পাথর তো৷ পুকুর যদি খুঁজে পাই তা হলে সেখানে আমিও রুই কাতলা কই-মাগুর সব ছাড়ব। আর তেলাপিয়াও। বাঙালির পো, মিষ্টি জলের মাছ ছাড়া চলে? বল? আর গদাধরকেও নিয়ে আসব। কালোজিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে তেল কই রাঁধবে সে জম্পেশ করে। পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কা বা সরষে দিয়ে তেলাপিয়া।

আমি বললাম, তুমি মাসে এক লক্ষ টাকা মাইনে দিলেও গদাধরদা আসবে না মরতে এখানে। দোখনো বাদার মানুষ তার মদনটাকির ফির দেশ ছেড়ে সে থোড়াই এই মেগাপড়ের দেশে আসবে। তা ছাড়া, আমি তো গিয়েই জুরুইন ভূতের গল্প করব তার কাছে। আর দেখতে হবে না।

ঋজুদা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, তা তো করবিই! বুড়ো বয়সে যে এই ডেভিলস ডেন-এর টঙে বসে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখব আর আবৃত্তি করব I am the monarch of all I survey’–সেই সুখ কি আছে আমার কপালে! তোরা তো আমার মিত্র নোস, শত্রুই।

তারপর বলল, তোদের কাছে একটা বন্দুক রাখ, গুলি ভরেই রাখ, আর অন্যটা আমাকে দে। সেটাও গুলি ভরে দে। সাপ দেখলেই ট্রিগার-হ্যাপি মিস্টার ভটকাই। গুলি চালাবে না। বুঝেছ। সাপ যদি তোমাদের দিকে তেড়ে আসে তবেই মারবে। মনে থাকে যেন। আমার জমিদারিতে অযথা খুন-খারাপি ঘটাতে দেব না আমি। একে এক অভয়ারণ্য করে গড়ে তুলব।

ঋজুদা আর ভটকাই-এর যুবরাজ দাদা দ্বীপের উত্তর দিকে চলে গেল, আমরা দক্ষিণ দিকে এগোলাম।

‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’-এর এলাকা কত হবে তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। তবে এক থেকে দেড় বর্গ কিমি তো হবেই কম করে।

তিতির বলল।

ভটকাই বলল, একবার চিন্তা কর রুদ্র। আমার এক পিসতুতো জামাইবাবু সল্টলেক-এ পাঁচ কাঠা জমি কিনে গর্বে বেঁকে গেছে। আবার বলে, আমেরিকান কায়দায়, সল্টলেক সিটি। দেড় দু’বর্গকিমিতে কত কাঠা জমি থাকে রে রুদ্র?

এমন সুন্দর জায়গাতে আমাকে দিয়ে অঙ্ক করাস না। ক্যালকুলেটরও নিয়ে আসিনি।

আমি বললাম।

থাকগে। ওই অঙ্ক আমি ওই জামাইবাবুকে দিয়েই কষাব। অঙ্ক কষতে কষতে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যাবে।

কেন?

কেন আবার? জে ফর জেলাসি।

আমি আর তিতির হেসে উঠলাম। ভটকাই-এর হরকতে।

একটু এগোতেই আমরা একটা ঘাসবনে এসে পড়লাম। সুন্দর একরকম ফিকে গোলাপি ফুল ফুটেছে সেই ঘাসে। প্রভাতী হাওয়ায় সুন্দর একটা আলতো গন্ধও ভাসছে সামুদ্রিক হাওয়াতে। পলিউশন যে কাকে বলে, তা ভুলেই গেছি পোর্ট ব্লেয়ারে প্লেন থেকে নামার পরে। আর ‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’-এ হাওয়াতে যে পরিমাণ অক্সিজেন তাতে বছর খানেকের জন্যে গড়িয়াহাটের মোড় বা ডালহৌসি স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকলেও ফুসফুঁসের কিচ্ছু ক্ষতি হবে না।

ভটকাই দেখি, ডাঙায় তোলা কই মাছের মতো মুখ হাঁ করে প্রশ্বাস নিচ্ছে। মুখ খুলছে আর বন্ধ করছে।

কী রে?

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, ফুসফুসটাকে সার্ভিস করে নিয়ে যাচ্ছি। সত্যি। ঋজুদা এখানে থাকলে মন্দ হয় না কিন্তু। বছরে একবার করে জাহাজের ডেকে শুয়ে সবচেয়ে কম পয়সার টিকিটে কলকাতা থেকে চলে আসতে পারলে বাকিটা তো কেয়ার-অফ ঋজু বোস হয়ে যাবে। ঋজুদার বোট আনতে যাবে আমাদের পোর্ট ব্লেয়ারে। তারপর গুহার মধ্যে নিজের ঘরের বারান্দাতে পায়ের উপর পা তুলে বসে শুধু প্রশ্বাস নিয়ে যাব।

এই ফুলগুলোর কী নাম, জানো রুদ্র?

তিতির বলল।

না, জানি না, জানতে চাইও না। তোমাকে দেখি আধুনিক মানুষের রোগে ধরল।

মানে?

মানে, এই পৃথিবীতে জানার অনেক কিছুই আছে কিন্তু তা বলে সব কিছুই জানতে চাইতে নেই তিতির। কিছু জানার বাকি থাক, রহস্য থাক কিছু অমীমাংসিত। সবজান্তা মানুষের বড়ই বিপদ।

কেন?

কারণ, সে বড় রিক্ত।

সে আবার কী কথা।

এটা ভাববার কথা। ভেবে দেখো। শুধুমাত্র এই কারণেই আধুনিক মানুষদের জন্যে আমার মাঝে মাঝে বড় কষ্ট হয়। চাঁদে কী আছে? বৃহস্পতিতে প্রাণ আছে কি না? সমুদ্রের গভীরে কী কী থাকে? তার সব মাছ, সব প্রাণী, অক্টোপাস, তিমি, হাঙর, সব ফাঙ্গি, প্ল্যাংকটন, অ্যালগিকে চিরে চিরে না জানলে মানুষের শান্তি নেই। প্রকৃতির মধ্যের সব রহস্যই যেদিন মানুষ জেনে যাবে, সেদিন তার রিক্ততার আর শেষ থাকবে না। রহস্যময়তাই সব সৌন্দর্যর, ভাললাগা, ভালবাসার গোড়ার কথা। তা, তোমার মতো সুন্দর কোনও মেয়ের রহস্যময়তাই হোক, কি সমুদ্র বা পাখি বা প্রজাপতি বা কোনও ফুলের।

তারপর বললাম, জানি না, বুঝিয়ে বলতে পারলাম কিনা। কিন্তু এমনই মনে হয়।

ভটকাই বলল, খাইছে। পোলাড়া দেহি এক্কেরে ফিলসফার হয়্যা গেল গিয়া। হায়! হায়! কলকাতা ফিরেই মাসিমাকে বলতে হবে তোকে চোখে চোখে রাখতে।

সামনেই বড় বড় গাছের একটা দঙ্গল। তার মধ্যে প্যাডক আর ডিডু চিনলাম। অন্য গাছগুলোর পরিচয় ঋজুদা এক সঙ্গে আমাদের ক্যাপসুলে ভরে বলে দিল বলেই গুলিয়ে গেছে। মানুষ চেনারই মতো, গাছ চেনাও সহজ নয়। ওই জঙ্গলের আড়ালে কী আছে দেখা যাচ্ছে না। হয়তো আরও জঙ্গলই আছে। মাটিতে ও গাছে সাপের জন্যে চোখ রেখে ওই গাছের জঙ্গলের মাঝামাঝি আসতেই ভটকাই চেঁচিয়ে উঠল, ওই তো গুহাটা।

আমরা তিনজনেই সেদিকে তাকিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ঋজুদার সঙ্গে কম জঙ্গলে তো ঘুরিনি দেশে-বিদেশে, কম পাহাড়ে চড়িনি, কম গুহাও দেখিনি কিন্তু এক ঝলক দেখেই মনে হল, এই গুহাটার মধ্যে কেমন এক প্রাগৈতিহাসিকতা আছে যেন। তার মুখের সামনে আগাছার জঙ্গল। নানা লতা লতিয়ে উঠেছে ছাদে। মধ্যপ্রদেশের হাম্পি বা বিজয়নগরে একা একা গেলে যেমন গা ছমছম করে এই গুহাটা দেখেও তেমনই গা ছমছম করে উঠল।

গুহার মুখটা প্রকাণ্ড। চার পাঁচটা হাতি ঢুকে যেতে পারে সহজেই পাশাপাশি। সাবধানে আমরা গুহার মুখে গিয়ে পৌঁছলাম জঙ্গলটা পেরিয়ে। তার মধ্যে কোন জন্তু জানোয়ার বা সাপ-খোপ আছে তা কে জানে! মস্ত লম্বা তার মধ্যেটা। খুব উঁচুও। পেছনের মুখটাও খোলা। তবে সেটা ঢোকার মুখের মতো অতখানি চওড়া নয়। গুহার পেছনের খোলা মুখ দিয়ে আকাশের নীল আর সমুদ্রের সবুজ দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের নিজের তো কোনও রং নেই, জলের গভীরতার জন্যে কোথাও সবুজ, কোথাও নীল বা কোথাও কালো মনে হয় আর আকাশ তার রং ধার দেয় সমুদ্রকে, ধার দেয় চাঁদ এবং সূর্যও। সমুদ্রের বুকে অনেকই আঁটে। অন্ধকার রাতে সমুদ্রের আবার অন্য রূপ। কখনও কখনও ফসফরাস জ্বলে ঢেউ-এর মাথায় মাথায় জলপরী আর মৎস্যকন্যাদের কোনও উৎসবের দিনে।

গুহার ভিতরে পা বাড়াতেই ভিতরে যেন একটা ঝড় উঠল। আর তার সঙ্গে উৎকট দুর্গন্ধ। বাঘের গুহাতে যেমন দুর্গন্ধ থাকে, তেমন। প্রায় দু-তিনশো বাদুর তাদের ডানারফটাফট শব্দে পাখিদের পাখসাটের চেয়েও অনেক জোরদার শব্দ করে। একই সঙ্গে গুহার বাইরে আসতে লাগল। উড়ে। আমরা কী করব বুঝতে না পেরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম তিনজনেই। কিছু উড়ে গেল পেছনের মুখ দিয়েও সমুদ্রের উপরে। ভটকাই বলল, ফ্লাইং মারব? শটগান দিয়ে? কী রে রুদ্র? এক নম্বর দিয়ে মারলে গোটা চারেক কি বেশিও নির্ঘাত পড়ে যাবে। এরা সব ফল-খাওয়া বাদুড়। এদের মাংস যা রোস্ট হবে না! লাজোয়াব!

তিতির নাক কুঁচকে বলল, খবরদার নয়। মরে গেলেও ওই দুর্গন্ধ প্রাণীর মাংস আমি খাব না। মেরো না রুদ্র।

বাদুড়দের মেঘ মাথার উপর দিয়ে উড়ে বাইরে গিয়ে ছড়িয়ে গেল ডেভিলস আইল্যান্ডের আকাশে। নানা গাছে গিয়ে বসল বোধ হয়।

তারপর তিতির বলল, এখানে মারামারি নয়। ঋজুদানা বলেছে এখানে অভয়ারণ্য গড়বে!

ছাড়ো তো ঋজুদার কথা। সারাজীবন জন্তু-জানোয়ার মেরে ঢিবি করে দিয়ে এখন বড় ধার্মিক হতে চাইছে। ঋজুদার মতিভ্রম হয়েছে।

আমি রুদ্রকে বললাম, তোর বড় বাড় বেড়েছে ভটকাই।

ঠিক সেই সময়েই মালভূমির অন্যদিক থেকে ধ্বপ করে একটা গুলির আওয়াজ হল। গভীর জঙ্গলের মধ্যে শটগানের গুলির আওয়াজ ওরকমই শোনায়।

আমাদের কথার মধ্যেই বাদুড়গুলো গুহা খালি করে দিল আমাদের জন্যে। প্রোমোটারেরা যেমন পুরনো বাড়ির গরিব ভাড়াটেদের নির্দয়ভাবে উৎখাত করে, আমরাও আমাদের নতুন আস্তানার জন্যে বাদুড়দের উদ্বাস্তু করে দিলাম। বেচারিরা কোথায় থাকবে এখন, কে জানে! তিতির তখনও বাঁ হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে নাক চেপে ছিল। সত্যিই ভীষণই দুর্গন্ধ। এখানে যে কত পেটি রুম-ডেওডরান্ট লাগবে গন্ধ মারতে তা ঈশ্বরই জানেন। দুর্গন্ধটা কোনওরকমে সহ্য করে আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম এবং এগিয়ে যেতেই এক জায়গাতে চার-পাঁচটি নরকঙ্কাল দেখতে পেলাম। কঙ্কালদের গায়ের পোশাক ধুলো হয়ে গেছে। কিন্তু মাথার রংচঙে টুপিগুলো প্রায় অক্ষতই আছে। ইংরেজি ছবিতে জলদস্যুরা যেমন টুপি রত তেমনই টুপিগুলো।

ভটকাই বলে উঠল ইরিবাবা। ওদের খুন করা হয়েছিল না নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল কে জানে কোন দেশি মানুষ এরা তাই বা কে জানে। এক পাশে দেখলাম একটা লম্বা দূরবিন পড়ে আছে যেমন তালের ভেঁপুর মতো দুরকিন আগে ব্যবহার হত সমুদ্রে।

এসব পাশ কাটিয়ে গিয়ে আমরা গুহার অন্য মুখে গিয়ে পৌঁছলাম। আর পোঁছেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। গুহাটার বাইরে অনেকখানি অনাবৃত পাথুরে জায়গা, ইংরেজিতে যাকে বলে ledge তাই আছে। খোলা বারান্দার মতো। আর সেখানে দাঁড়ালে সমুদ্রর যা দৃশ্য তা কী বলব! একবারে খাড়া প্রায় ছ-সাতশো ফিট নীচে সমুদ্র। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ডেভিলস আইল্যান্ডের পায়ের পাথরে। তটভূমি নেই। আসলে এই দ্বীপও তো একটি পাহাড়ই। প্রায় হাজারখানেক সাদা সিগাল আর টার্নচক্রকারে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের কিছু কিছু মাঝে মাঝেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তার মানে, এই পাহাড়ের খাড়া গায়ে ওদের বাসা আছে। ওদের তীক্ষ্ণ কিন্তু বিলাপের মতো ডাকের মধ্যে এক গভীর বিষণ্ণতা আছে। যে বিষণ্ণতা সমুদ্রের জলে এবং ওই গুহাতেও ছড়িয়ে যাচ্ছে, আবিরের মতো উড়ে যাচ্ছে সামুদ্রিক হাওয়ার দমকে দমকে।

আমরা তিনজনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম সেই প্রাকৃতিক বারান্দাতে। অনেকক্ষণ। কোনও কথা সরছিল না কারও মুখেই। অনেকক্ষণ পরে বাঁচাল ভটকাই বলল, সত্যিই যদি ঋজুদা এখানে আস্তানা গাড়ে তা হলে আমি কিন্তু ঋজুদার ফ্রাইডে হয়ে সেঁটে যাব। আঃ কী জীবন। চিন্তা করা যায় না। বল রুদ্র?

তিতির স্বগতোক্তি করল, ঋজুকাকার কোনও বিপদ হল না তো! গুলি ছুঁড়তে হল। কেন? আমাদের উচিত একবার ওদিকে গিয়ে খোঁজ করা।

ঠিক বলেছ। বলে, আমরাও সেই স্বর্গের বারান্দা ছেড়ে সেই গা-ছমছম করা প্রায়ান্ধকার গুহার মধ্যে ঢুকে এলাম আবার।

ভটকাই বলল, এখান থেকে সানরাইজ আর সানসেট কেমন দেখাবে বলত রুদ্র।

তিতির সঙ্গে সঙ্গে সুইজারল্যান্ড থেকে তার বড় মামার এনে দেওয়া ঘড়ির ব্যান্ডে লাগানো কম্পাসে চেয়ে বলল, বাঃ। গুহাটা উত্তরমুখো। তার মানে, ওই বারান্দাতে দাঁড়িয়ে ডানদিকে চাইলে সানরাইজ আর বাঁদিকে চাইলে সানসেট দেখা যাবে। ফার্স্টক্লাস।

গুহা থেকে বেরিয়ে আমরা বাইরে পড়ে কিছুটা যেতেই ঋজুদা আর যুবরাজের গলার স্বর শুনতে পেলাম। ওরা এদিকেই আসছেন। ভটকাই গলা তুলে বলল, ঋজুদা, আমিও একটা বই লিখব ঠিক করলাম।

কী বই?

দূর থেকেই বলল, ঋজুদা।

‘দ্য ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়ার সেকেন্ড পার্ট।

তারপরই বলল, গুলি চালালে কেন?

এবার ওঁদের দেখা গেল। ঋজুদা বলল, এমার্জেন্সি হয়েছিল। বাঙালির ভাবী জামাই-এর প্রাণ বাঁচাতে গুলি চালাতে হল। নইলে, এতক্ষণে শঙ্খচূড় সাপে তার মাথাতে ছোবল মারায় সে ‘ফিনিতে’ হয়ে যেত। বাপরে বাপ। কত বড় সাপ। সাপটার সঙ্গে বোধহয় যুবরাজের ফিয়াসেরও প্রেম আছে নইলে যুবরাজকে দেখেই সে অমন তেড়ে আসবে কেন? আমিও তো পাশেই ছিলাম।

যুবরাজ ভাদেরা হাসছিল। বলল, রিয়্যালি আই উড হ্যাভ বিন ডেড অ্যাজ হ্যাম বাই নাউ। থ্যাঙ্কস টু মিস্টার বোস।

তিতির উত্তেজিত গলায় বলল, কী দুর্গন্ধ জানোনা ঋজুকাকা। অসংখ্য বাদুড়। তা ছাড়া কঙ্কাল আছে গুহার মধ্যে, জানো ঋজুকাকা। বিদেশি নাবিকদের।

কী করে বুঝলি যে বিদেশি নাবিকদের?

টুপি আর দূরবিন দেখে।

ভালই হল। নিয়ে যেতে হবে মেমেন্টো হিসেবে। একটা টুপি যুবরাজকে দিয়ে দেব, ভাল করে ড্রাই-ক্লিনিং করে মেমেন্টো হিসেবে ওর ফিয়াসেকে প্রেজেন্ট করবে। শঙ্খচূড়ের চামড়াটাও ‘স্কিন’ করে দিস তো রুদ্র।

আমি কিছু বললাম না। গুহাটা দেখে এতই অভিভূত হয়ে গেছিলাম যে, অত কথা তখন ভাল লাগছিল না। আবার আমরা ঋজুদাকে আর যুবরাজদাদাকে নিয়ে গুহার মধ্যে ঢুকলাম। বাদুড়ের কথা শুনে ঋজুদা উত্তেজিত হয়ে উঠল। বলল, বাদুড়গুলোর যা রোস্ট হত না, মারলি না কেন গোটা চারেক? তা ছাড়া খারাপ কি গন্ধটা? আমার তো বেশ ভালই লাগে।

ভটকাই বলল, ওই যে! তোমার চেলা-চেলিদের জিজ্ঞেস করো।

ঋজুদা বলল, কঙ্কালগুলোও নিয়ে যেতে হবে। নৃতত্ত্ববিদদের কাছে পাঠাব। তাঁরা এইসব কঙ্কালের মালিক মানুষেরা ঠিক কত বছর আগের তা বলে দিতে পারবেন পরীক্ষা করে। এখানে কঙ্কাল তো থাকতেই পারে। খুনখারাপি তো হতই, আবার–খেয়েও মরে থাকতে পারে এরা। ধরো আমরা যাবার সময়ে যদি ভটকাইকে এখানে নামিয়ে দিয়ে চলে যাই, তবে বাদুড় আর ফল খেয়ে আর কতদিন বাঁচবে। ছমাস পরে এলে আমরাও ভটকাই-এর কঙ্কালও পাব, এই নীলরঙা জামাটা গায়ে দেওয়া অবস্থাতেই।

ভটকাই তাকে নিয়ে বদ রসিকতাতে চটে গিয়ে বলল, মরে গেলে দাহ না হলে সকলেই তো কঙ্কাল হবে। তা আমিও হব। তাতে আর কী?

বাইরের খোলা বারান্দাতে পৌঁছে ঋজুদা বলল, বাঃ যেমনটা ভেবেছিলাম, ঠিক তেমনই। এখানে না থাকলেইনয়। এই দ্বীপ থেকে কোনও বাণিজ্যিক জাহাজও দেখা যাবে না কারণ এর ধারেকাছে কোনও শিপিং চ্যানেলই নেই। তবে যুদ্ধজাহাজ দেখা যেতে পারে।

ভাদেরা বলল, সাবমেরিনও মাঝে মাঝে দেখা যেতে পারে। জলের নীচ থেকে দেশি বা বিদেশি সাবমেরিন পেরিস্কোপ তুলে দেখে যাবে আপনাকে। কখনও বা অক্সিজেন ভরার জন্যে সাব’ ভেসে উঠলেও দেখতে পারেন প্রকাণ্ড, কালো, তিমি মাছের মতো তার শরীরের পিঠের উপরের কনিং-টাওয়ারে’ ক্যাপ্টেন আর ক্রুরা দাঁড়িয়ে আছে।

এই গুহাটা কিন্তু ইন্ডিয়ান নেভি সহজেই রকেট-লঞ্চার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। লং-রেঞ্জ রকেট লঞ্চার। আজকাল তো নিশানা নেওয়ারও দরকার নেই। Heat-Seeking Rocket নিজেই শত্রুপক্ষের প্লেন বা জাহাজ বা সাবমেরিনকে খুঁজে নেবে।

তা ঠিক। ভাদেরা বলল। তারপর বলল, ব্যবহৃত হবেও হয়তো কখনও। কে বলতে পারে। আমাকে একটা রিপোর্টও দিতে বলেছেন কমোডর বাটলিওয়ালা।

নানা জনে নানা কথা বলছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে। ওই সামুদ্রিক হাওয়ার মধ্যে, টার্ন আর সি-গালেদের সংক্ষিপ্ত কিন্তু চাবুকের মত ডাকের মধ্যে, ডেভিলস আইল্যান্ডের সেই উঁচু, খোলা পাহাড়ি বারান্দাতে দাঁড়িয়ে আমি ভাবছিলাম, আমি আরও বড় হয়ে, সচ্ছল হয়ে নিজস্ব মালিকানার এমন একটি দ্বীপের বাসিন্দা হব। সেখানে বসে লিখব, ছবি আঁকব, গান গাইব আর ভাবব। হেনরি ডেভিড থোরোর The Walden’-এর মতো, ওয়াল্ট হুইটম্যানের The Leaves of Grass’-এর মতো, শ্রীঅরবিন্দ বা স্বামী বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথের মতো লেখা লিখব, যা পড়ে, আমার পরের পরের পরের প্রজন্মর মানুষেরা মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পারবে। শুধু মানুষের চেহারা থাকলেই তো আর কেউ মানুষ হয়ে ওঠে না, ওই সব লেখা পড়েই তো আমার মতো সাধারণেরও মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠার ইচ্ছা জাগে মনে।

ঋজুদা হঠাৎ বলল তিতিরকে, তিতির, আয় আমরা সবাই এখানে বসি কিছুক্ষণ। মৃত বিদেশিদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি কিছুক্ষণ নীরব থেকে। বলে, নিজেই আগে পাথরের উপরে পা মুড়ে থেবড়ে বসে পড়ল। সর্বক্ষণ হাওয়া চলে, তাই পাথরের উপর কোনও ধুলোবালি ছিল না। এমনিতে মসৃণও।

আমরাও সকলে বসলে কিছুক্ষণনীরবতা পালনের পরে ঋজুদা বলল, সেই গানটা শোনা তো তিতির। পুরোটা গাইবি কিন্তু। আস্তে আস্তে, তাড়াহুড়ো করবি না।

কোন গানটা তা তো বলবে?

তিতির বলল।

ও হ্যাঁ।

সেই যে, ‘ঘাটে বসে আছি আনমনা’।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিতির বলল কথা যে মনে নেই।

এই তো তোদের দোষ।

ঘাটে বসে আছি আনমনা যেতেছে বহিয়া সুসময়
সে বাতাসে তরী ভাসাব না যাহা তোমা পানে নাহি বয়।

তারপরে কী তা আমিও ভুলে গেছি। শেষটা মনে গাছে। গানটা ধরই না। ধরলেই মনে পড়ে যাবে।

শেষটাই বলো তুমি। তিতির বলল।

এতদিন তরী বাহিলাম যে সুদূর পথ বাহিয়া–
শতবার তরী ডুবুডুবু করি সে পথে ভরসা নাহি পাই।
তীর সাথে হেরো শত ডোরে বাঁধা আছে মোর তরী খান–
রশি খুলে দেবে কবে মোরে, ভাসিতে পারিলে বাঁচে প্রাণ।
কবে অকূলে খোলা হাওয়া দিবে সব জ্বালা জুড়ায়ে
শুনা যাবে কবে ঘন ঘোররবে মহাসাগরের কলগান ॥

ঋজুদা সুললিত গলায় আবৃত্তি করল। নিজে গাইলেই পারত। ভারী ভাল গায় অথচ গাইবে না। তবে আমার কখনও কখনও শোনার সৌভাগ্য হয়েছে।

ঋজুদা বলে, সব কিছুকেই কি বাজারে আনতে হয়? কিছু তো আমার নিজস্ব থাকবে!

কথাটা আমার খুবই ভাল লেগেছিল। আজকের এই আদেখলাপনার যুগে মঞ্চে উঠে নিজেকে নির্লজ্জর মতো প্রচার করার যুগে এমন মানসিকতা খুব কম মানুষেরই মধ্যে দেখতে পাই।

তিতির ধরল গানের মুখটা। রবীন্দ্রনাথের বা অতুলপ্রসাদের কিছু কিছু গান কোনও কোনও পরিবেশে কোনও সাধারণ গাইয়ের গলাতেও এমন গভীরতা ও দীপ্তি পায় যে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়।

গান শেষ হবার অনেকক্ষণ পর পর্যন্ত আমরা সবাই-ই চুপ করে বসে রইলাম। ঋজুদার পাইপ অনেকক্ষণ নিভে গেছিল কিন্তু নতুন করে আর ধরাল না। সমুদ্রের দিকে চেয়ে চুপ করে বসে রইল আত্মস্থ হয়ে। ওই মানুষটির মধ্যে যে কতজন পরস্পর-বিরোধী মানুষ আছে তা শুধু আমরা তিনজনই জানি। অন্যেরা ঋজুদার তল পাবে না।

গান শেষ হলে ভাদেরা লাজুক মুখে নরম করে বলল, ও ও রবীন্দ্রসংগীত গায়।

ঘোর ভেঙে ঋজুদা বলল, ও কে?

মানে, আমার ফিঁয়াসে।

ও। আই সি।

ঋজুদা হেসে বলল।

তারপর বলল, তুমি বাংলা শিখছ, রবীন্দ্রনাথকে ভাল করে পড়ো। সত্যিই যদি পড়ো, যদি তাঁর গানকে হৃদয়ের শরিক করে তুলতে পারো, তবে কোনওদিন বা তোমারও উত্তরণ হবে। উ্য আর ভেরি লাকি দ্যাট উ্য আর গোয়িং টু ম্যারি আ বেঙ্গলি গার্ল হু সিংগস টেগোর সঙস।

ভটকাই-এর যুবরাজদাদা চুপ করেই রইল মাথা নামিয়ে। আমরাও চুপ করে রইলাম।

সব জায়গাতে, সব সময়ে কথা শুনতে তো ভাল লাগেই না, বলতেও নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *