ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
এক
‘এলেম নতুন দেশে।
এ এ এ লেম, এলেম নতুন দেশে।
তলায় গেল ভগ্নতরী, কূলে এলেম ভেসে।’
বলে গান ধরে দিল তিতির। ঝিঙ্গাঝিরিয়ার মানুষখেকো শিকার করতে ঋজুদার সঙ্গী শুধু আমিই ছিলাম কিন্তু এবারে ঋজুদার সঙ্গে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে বেড়াতে এসেছি তিতির, ভটকাই এবং আমি, ঋজুদা অ্যান্ড কোম্পানি ইন ফুল স্ট্রেংথ।
কলকাতা থেকে বেরোবার আগে ঋজুদার বিশপ লেফ্রয় রোডের ফ্ল্যাটে প্রতিবার বাইরে কোথাও যাওয়ার আগে আমাদের যেমন একটা গেট-টুগেদার হয়ই, ভটকাই-এর ঠিক করে দেওয়া মেনুমতো জম্পেশ করে খাওয়া-দাওয়াও হয়, এবারেও তেমনিই হয়েছিল। সেই গেট-টুগেদারেই ঋজুদা গদাধরকে বলে দিয়েছিল, দ্যাখো, মিস্টার গদাধর এবারে আর আমাদের জন্যে খামোকা চিন্তা কোরো না। এবারে শুধু বেড়াতেই যাচ্ছি আমরা। শুধু খাওয়া-দাওয়া, বেড়ানো। আর ঘুম। অনেকদিন হল এই তিনজনকে নিয়ে শুধুই বেড়াতে যাইনি কোথাওই।
কী করব আমরা সেখানে ঋজুকাকা? সত্যিই কি শুধু খাব-দাব আর ঘুমোব? তিতির জিজ্ঞেস করল।
বলতে গেলে তাইই। তবে আমার পুরনো বন্ধু ন্যাভাল কমোডর বাটলিওয়ালা বহুদিন হল নেমন্তন্ন করে রেখেছে। আমাদের একটা ভাল বোট দিয়ে দেবে নেভির। তাই ভাবলাম, তোদের মধ্যে কেউই যখন দেখিসইনি আন্দামান, তোদের ভাল করে ঘুরিয়েই আনি। নারির ওয়েস্টার্ন কম্যান্ডে চলে যাবার কথা আছে বদলি হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই।
নারিটা কী বস্তু? নারী তো জানি।
ভটকাই ধন্ধে পড়ে বলেছিল।
নারি হচ্ছে বাটলিওয়ালার ফাস্ট নেম।
হেসে বলেছিল, ঋজুদা।
বালতিওয়ালা?
বালতিওয়ালা পদবি যে পারসিদের হয় না তা নয়, তবে নারি, বাটলিওয়ালাই।
ঋজুদা বলেছিল।
আজ সকালে সিনক আইল্যান্ডস-এর সমুদ্রের মধ্যে হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, সত্যি! ভাগ্যিস এসেছিলাম আমরা। এ এক স্বর্গরাজ্য। আমরা তো ভারত মহাসাগরের বুকে স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জে গেছিলাম জলদস্যুদের গুপ্তধনের রহস্য উদঘাটন করতে। রংবেরং-এর প্রবালে ভরা নানা দ্বীপে, কিন্তু সে তো বিদেশে। আন্দামান তো আমাদের। স্বদেশ। নিজের দেশ, নিজের দেশ। তার সঙ্গে অন্য কোনও দেশের তুলনা চলে!
ভোররাতে উঠে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে সমুদ্রের মধ্যে এই অপরূপ সিনক আইল্যান্ডে এসে পৌঁছেছি আমরা। না এলে, সত্যিই বড় মিস করতাম। সমুদ্রে তখন ভাঁটি দিয়েছে। ছ’ বোনেরই মতো, সুনীল স্বচ্ছ জলের মধ্যে যেন হাত ধরাধরি করে নাচছে বড় সুন্দরী এই ছটি দ্বীপ।
তিতির সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে কাঁঠালিচাঁপা রঙা। সুইমিং ট্রাঙ্ক আমরাও কেউই আনিনি। সুইমিং-ট্রাঙ্ক পরে আসব কালকে, যখন জলিবয় আইল্যান্ডে যাব। সমুদ্রে যখন ভাঁটি দেয় তখন সিনক আইল্যান্ডস-এর ছটি দ্বীপের এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে পায়ে হেঁটে চলে যাওয়া যায় রংবেরং-এর কোরালদের বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে। কত রকম মাছ যে চলে যাচ্ছে স্বচ্ছ জলের মধ্যে দিয়ে তাদের পিছল শরীরের হঠাৎ ছোঁয়া লাগিয়ে আমাদের পায়ে!
ভটকাই-এর একেবারে বাকরোধ হয়ে গেছে। ভয়ে বাকরোধ অনেকেরই হয় : কিন্তু সৌন্দর্যেও যে বাকরোধ হতে পারে তা ভটকাইকে দেখেই প্রথম বুঝলাম। তিতির চিৎকার করে উঠেছিল, অ্যান আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড প্লেস। আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। ঋজুদা তার স্ট্র-হ্যাটের নীচের ছায়াঘেরা পাইপ-ধরা মুখে এক ভারী তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বলল, কী? তোদের বলেছিলাম না? পছন্দ?
পছন্দ? সারাটা জীবন ওখানে থাকার বন্দোবস্ত করতে পারো ঋজুকাকা, তোমার বন্ধু কমোডর বাটলিওয়ালাকে বলে? তিতির বলল।
দু’পায়ে সাদা বালি আর নীল জল ছিটকিয়ে ভটকাই বলল, যেখানে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে নীল সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে পৌঁছনো যায় সেই সব দ্বীপের নাম সিল্ক আইল্যান্ড হয় কী করে! অবাক কাণ্ড। ডুবে যাওয়ার তো কোনও ব্যাপারই নেই এখানে।
ঋজুদা খুব জোরে হেসে উঠে বলল, ওরে গর্ধভচন্দ্র, Sink’ নয়, ‘Cinque’। ফরাসি শব্দ। মানে ছয়। ফরাসি-বিশেষজ্ঞ তিতিরকে জিজ্ঞেস কর না..বিশ্বাস না হয়। এই সিনক আইল্যান্ডস একটা ম্যারিন স্যাংচুয়ারি। আমাদের দেশে বাঘের জন্যে যেমন আছে করবেট, পালামৌ, মানস বা সুন্দরবন, হাতির জন্যে বক্সা বা পেরিয়ার, তেমনি হাজারো রকমের মাছ, রংবেরং-এর প্রবাল এবং নানারকম নানারঙা জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীকে বাঁচাবার জন্যেই নানারকম প্যাংকটকে, অ্যালগকে, ফাঙ্গিদের নির্বিঘ্ন করার জন্যে, এই অভয়াঞ্চল।
বলেই বলল, এবার তাড়াতাড়ি পা চালা উলটোদিকে। জোয়ার আসছে; যে দ্বীপে আমরা নেমেছি সেই দ্বীপে পৌঁছতে সাঁতরাতে হবে পরে তা না হলে।
আগে বলবে তো! সুইমিং ট্রাঙ্ক নিয়ে আসতাম। আমরা সমস্বরে বললাম।
বলেইছি তো! সে হবে কাল যখন জলিবয় আইল্যান্ডে যাব। সেখানে স্নারকেলিং আর স্কুবা ডাইভিংও করতে পারিস। ইকুইপমেন্টস সব ভাড়া পাওয়া যায়।
ম্যা গোঃ। পরের স্মরকেল আর স্কুবা-ডাইভিং-এর ইকুইপমেন্টস নিয়ে নামব সমুদ্রে! আমি নেই।
ঠিক আছে, সাঁতার তো সব সমুদ্রেই কাটা যায়, হাঁটা কি যায় সব সমুদ্রে? সমুদ্রে হাঁটার সুযোগ, এ জীবনে আর আসবে না–মনের সুখে হেঁটে নে।
তিতির হেসে বলল, কেন আসবে না? চিনিয়েই যখন দিলে ঋজুকাকা আমি এখানেই হানিমুন করতে আসব।
তা আসিস। সত্যি। হানিমুনের এমন জায়গা পৃথিবীতে কমই আছে। এ জন্মে বিয়ে করা তো আমার কপালে নেই, নইলে আমিও এখানে আসতাম।
সত্যি! আমি চুপ করে মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে ছিলাম। হালকা নীল আকাশ, তার ছায়া-পড়া ঘননীল সমুদ্র, সাদা আর গেরুয়া বালি, হলদেটে, ছাইরঙা আর সবুজাভ সব প্রবালের ছড়া জলের নীচে নীচে, যেন বহুরঙা জলজ নেকলেস। পলশান’ শব্দটাই এখানে জানে না কেউ। আমাদের অদেখা অথচ এমন সুন্দর দেশ যে আমাদের ভারতেই ছিল তা ঋজুদা আমাদের আন্দামানে না নিয়ে এলে কি জানতে পারতাম?
আমরা ফিরে গিয়ে যে দ্বীপে আমাদের বোট থেকে নেমে সকলে প্রথমে গিয়ে পৌঁছেছিলাম তার বালিতে বসলাম সতরঞ্চি পেতে একটা গাছতলাতে। কী গাছ এটা কে জানে। এ এক আশ্চর্য দেশ! এখানের প্রায় গাছই আমার অচেনা। হোটেল থেকে প্যাকড-লাঞ্চ দিয়ে দিয়েছিল, স্যান্ডউইচ, কিছু ফল, জোড়া ডিমসেদ্ধ, কোল্ড চিকেন, হ্যাম, সঙ্গে মাস্টার্ড। আর প্রাইট। স্পাইট ঋজুদার খুবই প্রিয়। সবাই যা করে, ঋজুদা তা করে না। হাসতে হাসতে বলে, অকল লাগাও, দিখাপে মত যাও।’ ঋজুদার চেলা হিসেবে আমরাও স্প্রাইট ভক্ত হয়ে উঠেছি।
খেয়ে-দেয়ে আমাদের তারপরই রওনা দিতে হবে কারণ বিকেলের দিকে প্রায় রোজই এই সমুদ্রে ঝড় বৃষ্টি আসে। সমুদ্রের ওপর দিয়ে যেতে হবে ছোট মোটর বোটে করে। ছোট বোট বলেই সাবধানের মার নেই। এ বোটটি আমরাই ভাড়া করে এনেছি। ওয়ানডুর থেকেও আসা যেত কিন্তু তাতে সমুদ্রযাত্রা সংক্ষিপ্ত হত। তা ছাড়া ছাব্বিশ মাইল পথ পোর্ট ব্লেয়ার থেকে। মাইল মানে, নটিক্যাল মাইল।
খাওয়া-দাওয়া সেরে লাঞ্চ-প্যাকেটের মধ্যে সমস্ত টুকরো-টাকরা ভরে গাছের নীচের জায়গাটা পুরো সাফ-সুতরো করে দিয়ে আমরা বোটের দিকে চললাম। ততক্ষণে জোয়ারের জলে অনেকখানি ভরে গেছে সমুদ্র। টার্ন আর স্যান্ড পাইপার পাখিরা বালির ওপরে ওড়াওড়ি করছে। তাদের উড়ন্ত শরীরের মুঠিভরা নরম সাদা, ওই হালকা আর গাঢ় নীল পটভূমিতে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে।
যেহেতু এই সিনক আইল্যান্ড বা জলিবয় আইল্যান্ড সবই ম্যারিন স্যংচুয়ারি, ওখানে কোনও রকম নোংরা ফেলে আসা একেবারে বারণ। রোজ পুলিশেরাও আসে বোটে করে নজরদারি করতে।
সাদা কাঠের ছোট্ট বোর্ড লাগানো আছে বালির উপরে পোঁতা বেঁটে খোঁটার T6 ‘Leave only your foot prints behind.’
ঋজুদা বলল এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষাটা আমাদের দেশের মানুষদের এখনও নেওয়া বাকি। শুধুমাত্র নিজেদেরটাই বুঝি আমরা। অন্যর প্রতি কিছুমাত্র consideration নেই। নিজেদের পিকনিক, নিজেদের আনন্দ হলেই হল, আমাদের পরে অন্যরাও যে আসবেন তাঁরাও যে পরিষ্কার দেখতে চান এসব জায়গা এই বোধটা জাগতে আমাদের মধ্যে আর কতদিন লাগবে কে জানে।
তিতির বলল, যা বলেছ। পুলিশরাও এখানে ভেসে না এলে হয়তো জায়গাটা এমন পরিচ্ছন্ন থাকত না। বড় লজ্জার কথা জাতি হিসেবে আমরা যেন এখনও প্রাপ্তবয়স্ক হইনি। কবে যে হব, কে জানে!
ছোট নৌকোতে করে বোটে পৌঁছতে হল। দুটি কারণে বোট দ্বীপ পর্যন্ত আসতে পারে না। প্রথম কারণ, জল কম। দ্বিতীয় কারণ, দ্বীপের চারপাশের কোরালদের ক্ষতি না করা। ওই ছোট ছোট নৌকো, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের তালের ডোঙার মতো, তারই নাম গ্লাস বটম বোট। নৌকোর তলাতে দু ফিট বাই চার ফিট মোটা ঘোলা কাঁচ বসানো একটা। সেই স্বচ্ছতার মধ্যে দিয়েই নৌকোতে বসে নীচের প্রবাল, মাছ, নানারঙা উদ্ভিদ দেখা যায়।
ঋজুদা বলছিল গ্লাস-বটম বোট দেখতে হয় প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াইয়ান আইল্যান্ডের ওয়াইকিকি আর ভারত মহাসাগরের স্যেশেলসে। তেমন বোট হয়তো আমাদের দেশেও হবে একদিন। কিন্তু কবে যে হবে তা ভগবানই জানেন।
আমাদের বোট ছেড়ে দিয়েছে। জোরে হাওয়া বইছে এখনই তবে আকাশে মেঘ নেই। ভয়ের কিছু নেই। বোটের মাথাতে ত্রিপল বেঁধেবঁধে চাঁদোয়ার মতো করা। রোদ-জল থেকে যাত্রীদের বাঁচাবার জন্যে। ভাবছিলাম স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জে কত সুন্দর সুন্দর আর কতরকম বোটই না দেখেছিলাম। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর তুলনা নেই কিন্তু আমরা গরিব বলেই আমাদের সব ব্যাপারই সাদামাঠা? তবে কোনও কোনও ব্যাপারে আমাদের সৌন্দর্যজ্ঞানেরও হয়তো খামতি আছে কিছুটা।
ঋজুদা একদিন বলেছিল আমাদের শান্তিনিকেতনে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে যে, Art is born out of superflirty. কথাটা নাকি আসলে রবীন্দ্রনাথেরই। রবীন্দ্রনাথের কাছে এক বিদেশি এসেছিলেন। তাঁরা দুজনে বসে নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময়ে জানালা দিয়ে দেখা গেল রাধু মালি দুটি ক্যানেস্তারায় জল ভরে বয়ে নিয়ে আসছে বাঁকে করে। তার চলার গতিতে ছলাৎ ছলাৎ করে উপচে পড়ছিল ভর্তি ক্যানেস্তারার জল। সেদিকে অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাকি রবীন্দ্রনাথ সেই বিদেশিকে বলেছিলেন যে, ক্যানেস্তারাগুলি খালি থাকলে জল উপচে পড়ার উপায়ই থাকত না। প্রয়োজন পূরিত হবার পরেই যা উপচে পড়ে তাই আর্ট এর উপচার। কথাটা, শোনা কথা ঋজুদার।
ঋজুদার শোনা কথাটা যে আমরা খুব একটা বুঝেছিলাম তখন এমন নয়, তখন আমাদের বয়স আরও কম ছিল, কিন্তু শুনতে ভাল লেগেছিল। পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও এসব কথা শুনতে ভাল লাগে। বোঝার আভাস পাওয়া যায়, আর তা গেলেই এইসব কথা যা আজকাল খুব কম মানুষকেই বলতে শুনি, আরও শোনবার একটা ইচ্ছা মনের মধ্যে জাগে। এই মস্ত গুণ ঋজুদার। তার চেয়ে আমরা প্রত্যেকেই বয়স, জ্ঞান, বিদ্যা এবং বুদ্ধিতে অনেকই ছোট হলেও সে আমাদের কখনওই ছোট ভাবে না। আমাদের সঙ্গে সমান সমান ব্যবহার করে। আমাদের প্রত্যেককে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়, ভটকাই-এর ফাজলামোও অসীম ধৈর্যর সঙ্গে সহ্য করে আর তাই আমাদের প্রত্যেকেরই মধ্যে অবচেতনে ঋজুদার মতো হয়ে ওঠার একটা উচ্চাশা ক্রমশই গড়ে উঠতে থাকে, সেই উচ্চাশা ক্রমশ দীপ্তি পায়। এই কথা যে কত বড় সত্যি তার মস্ত বড় প্রমাণ ভটকাই। আমাদের দলভুক্ত হবার পর এবং বিশেষ করে ঋজুদার ছত্রছায়াতে এসে মাত্র কয়েক বছরেই ওর উন্নতিটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। ও নাকি স্কুলের লেখাপড়ার পরীক্ষাতেও আগের থেকে অনেক ভাল ফল করছে ইদানীং। ওদের পাশের বাড়ির বিল্ট বলছিল।
ঋজুদা সবসময়ই বলেছে আমাকে আর তিতিরকে, শুধু বই-মুখস্থ পড়াশোনা করলে জীবনে কিছুই হতে পারবি না, square হতে হবে, চৌকশ, তবেই না জীবনে অন্যদের সঙ্গে টক্কর দিতে পারবি। দশজনের একজন হতে পারবি।
টক্কর দিতে পারব কী না জানি না, তবে শুধু ভটকাইরই নয়, আমাদেরও যে ঋজুদার সঙ্গে সঙ্গে থেকে অনেকই উন্নতি হয়েছে সব দিক দিয়েই সেটা নিজেরাও বুঝতে পারি।
ঋজুদা একটা কথা প্রায়ই বলে আমাদের হাসতে হাসতে: ‘জ্ঞানের সীমা চিরদিনই ছিল, অজ্ঞতার কোনও সীমা কখনও ছিল না।
সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ আমাদের সামনে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সূর্যের আলো পড়ছে নীল সমুদ্রের সবুজ দ্বীপের ওপরে। সেই দ্বীপের রং তো শুধু সবুজ নয়। সবুজের যে কত রকম, হলুদের, লালের, সাদারও, তা কী বলব! কত রকমের যে গাছ-গাছালি সেই দ্বীপে ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে–বোট যতই এগিয়ে যাচ্ছে সেই দিকে।
ওগুলো কি গাছ ঋজুদা, সাদা কাণ্ড, লম্বা, সব গাছের মাথা ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে?
তিতির শুধোল।
ঋজুদা ঘুরে বসে, ভাল করে দেখে বলল, ওড়িশার লবঙ্গীবনের গেণ্ডুলি, আর পালামৌর চিলবিল গাছের মতো দেখতে না অনেকটা? এই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে গাছের মেলা। আর যেহেতু ওদের অধিকাংশই endemic, ওদের অন্য কোথাও দেখতেও পাবি না। একদিন তোদের সকলকে নিয়ে যাব চ্যাথাম আইল্যান্ডে।
চ্যাথাম আইল্যান্ডে কী আছে? আইল্যান্ড তো অনেক আছে, রসস আইল্যান্ড, ভাইপার আইল্যান্ড ইত্যাদি। চ্যাথামে কী?
ভটকাই বলল।
কী থাকবে? কাঠচেরাই-কল আছে। কাঠ চেরাই হয় সেখানে। সরকারি saw mil আছে মস্ত। সব গাছই এক সঙ্গে চিনিয়ে দিতে পারব তোদের সেখানে নিয়ে গেলে।
আমি বললাম, মরা গাছ কে দেখতে যাবে। গাছ মরে গেলে তো গাছ থাকে না, সে কাঠ হয়ে যায়। যাকে বলে শুষ্কং কাষ্ঠং।
সে তো গাছেদের কবর ভূমি, শ্মশান ভূমি। ওখানে যাব না। তুমি আমাদের জ্যান্ত গাছ চেনাও ঋজুকাকা।
তিতির বলল।
ঋজুদা হেসে বলল, কথাটা ভালই বলেছিস। এবং কথাটা ঠিকও বটে।
তিতির আবার বলল, বলো না ঋজুকাকা, ওই সাদা গাছগুলো কী গাছ? দ্যাখো, এখন আগের থেকে অনেকই কাছে এসে গেছে।
ঋজুদা বলল, সাদা দেখাচ্ছে, আলোর জন্যে। আসলে ওগুলো রুপোলি আর ছাই রঙে মেশা। গাছগুলোর নামও Silver-grey. আর ওই দ্যাখ, ওই পুবের দিকে, ওই গাছগুলোকে কাছ থেকে দেখলে তবে বুঝতে পারবি কী মসৃণ তাদের গা। নাম কী জানিস ওই গাছগুলোর?
কী?
Satin-wood.
বাঃ।
হ্যাঁ। আর ওই দক্ষিণ দিকে চেয়ে দ্যাখ, ওই গাছগুলোর নাম Marble Wood.
Marble Wood.
আমি অবাক হয়ে বললাম।
হ্যাঁ।
বলল, ঋজুদা।
তারপর বলল, চল, আশা করি ডেভিলস আইল্যান্ডে যখন তোদের নিয়ে যাব ১৩৮
তখন তোদের আরও অনেকরকম গাছ দ্যাখাতে পারব আন্দামানের।
ডেভিলস আইল্যান্ডে এখানকার সবরকমের গাছ আছে?
তিতির বলল।
ঋজুদা হেসে বলল, তুই একটি পাগলি। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সবশুদ্ধ প্রায় ছশো প্রজাতির গাছ আছে। তার মধ্যে মাত্র চুয়াল্লিশ পঁয়তাল্লিশ রকমের গাছের পরিচর্যা করা হয়। যে সবের বাণিজ্যিক মূল্য আছে আর কি। বাণিজ্যিক মূল্য অবশ্য তেমন আছে মাত্র ঊনত্রিশ-ত্রিশ রকমের গাছের। অন্যরা কম বেশি ব্রাত্য। চ্যাথাম আইল্যান্ডে গেলে বাণিজ্যিক গাছগুলোকেই দেখতে পাবি।
যাব না আমরা গাছেদের মর্গ-এ।
ভটকাই প্রতিবাদী গলাতে বলল।
তুমি এমনি করেই আমাদের গাছ চেনাও, আর ডেভিলস আইল্যান্ডে যখন যাব তখন তাদের কাছ থেকে গায়ে হাত দিয়ে দেখব।
তিতির বলল।
হাসল ঋজুদা। বলল, বেশ। তাই দেখিস।
তারপর বলল, এই মোটর বোটে বসে মনে হচ্ছে না যে দ্বীপটা, গাছগুলো সব দ্রুত পেছনে দৌড়ে যাচ্ছে এই নরম কোমল আলোতে? সুন্দরবনেও গোসাবা, বা বিদ্যা বা মাতলা অথবা হাড়িয়াভাঙ্গা নদীতে বোটে বসে দ্বীপগুলোকে এইরকম সুন্দর লাগে। সুন্দরবনের মতো এমন সুন্দর ও ভয়াবহ জায়গা পৃথিবীতে খুব কমই আছে অথচ আমরা এমন একটি জায়গাকে পৃথিবীর পর্যটকদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখলাম। সুন্দরবনের গভীরে গেলেই মনের মধ্যে এক ধরনের uncanny, আধিভৌতিক অনুভূতি হয়, তীব্র ভয়-মিশ্রিত ভাল লাগার অনুভূতি, এমনটি আমার আর কোনও বনে গিয়েই হয় না, হয়নি। সুন্দরবনকে আমি চিরদিনই ভয় পেয়ে এসেছি।
সেই জন্যেই কি আমাদের নিয়ে একবারও যাওনি সুন্দরবনে তুমি?
ফাজিল ও দুঃসাহসী ভটকাই বলল।
ঋজুদা কিন্তু হাসল না। বলল, যাইনি, তোদর মারাত্মক বিপদের মধ্যে ফেলতে চাইনি বলেই। নিজের না হয় যা হবার হবে। তোদর দায়িত্বও তো আমারই।
তিতির বলল, আহা! সুকুমারমতি সব, কুসুমকোমল বালক-বালিকা যেন। আমরা একেবারেই অনভিজ্ঞ অনভিজ্ঞা!
তারপর বলল, কোন বিপদের মধ্যেই না তুমি নিয়ে গেছ বল আমাদের? মানুষ খেকো বাঘ কি আমরা ট্যাঁকস্থ করিনি অনেকবার?
ঋজুদা বলল, সে কথা নয়রে, সে কথা নয়। সুন্দরবন সুন্দরবনই। পৃথিবীতে সুন্দরবনের সঙ্গে আর কোনও বনেরই তুলনা চলে না।
আমরা একা একাই যাব একবার। তুমি নিয়ে না গেলে।
ভটকাই বলল।
আত্মহত্যা করতে চাস তো যাস।
ঋজুদা বলল।
তিতির বলল, একটা সোজা কাজের জন্যে অত কমপ্লিকেশানের কী দরকার। তুমি আমার সঙ্গে জয়িতাদের বাড়িতে চলো একদিন। চোদ্দোতলা বাড়ির খোলা বারান্দাতে তুলে দেব। নীচে লাফ দিয়ে পড়লেই তো কার্যসিদ্ধি হতে পারে, সে জন্যে সুদূর সুন্দরবনে, কীড়ে-মাকড়ের কামড় খাবার জন্যে, সাপ ও স্যালাসাল্ডারদের ছোবল খাওয়ার জন্যে এবং অবশেষে বাঘের পেটে গিয়ে ধন্য হবার দরকার কী?
ঠিক আছে। তোদের নিয়ে যাব একবার সুন্দরবনে।
ঋজুদাকে থামিয়ে দিয়ে তিতির আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলল, দ্যাখো দ্যাখো, পাখিটাকে। ওটা কী পাখি ঋজুকাকা?
আমরা ঘাড় উলটোদিক করে সোজা উপরে চেয়ে দেখলাম, একটা বাজ জাতীয় পাখি, তার বিরাট ডানা মেলে, দুই ডানাতে বিকেলবেলার সামুদ্রিক রোদকে ছিটকোতে ছিটকোতে চক্রাকারে উড়ছে মাথার উপরে।
আমরা চুপ করে রইলাম। পাখিটাকে কেউই চিনতে পারলাম না। অনেক সময়েই নিজেদের জ্ঞান ভারে একেবারে পণ্ডিতপ্রবর বলে মনে হয় নিজেদের। তবে আনন্দর কথা এই যে, আমরা যে পরম মূর্খ তা আমরা সকলেই জানি। তবে ঋজুদার কাছে থাকলে শেখার যে অনেকই বাকি এই কথাটাই নতুন করে মনে হয়। আশ্বস্ত হই আমরা প্রত্যেকে।
ঋজুদা আমাদের সকলকেই চুপ করে থাকতে দেখে বলল, লক্ষ করেছিস, পাখিটার পেটটা রুপোলি। ওদের নাম সিলভার-বেলিড হক। এরা সমুদ্রের ও বড় জলার পাশে পাশে থাকে, বড় মাছ ধরার জন্যে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হয় পাখিগুলো। সামুদ্রিক বাজ।
