চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

প্রায় ছুটে গিয়ে আমরা বাড়ির মধ্যে ঢুকলুম। আশ্চর্য ব্যাপার, একতলাটা একেবারে খাঁ-খাঁ করছে। অথচ, একগাদা লোকের গলার আওয়াজ যে পাওয়া যাচ্ছে, তাও ঠিক। ভাদুড়িমশাই বললেন, “দোতলায় চলুন।”

বলে আর তিনি দাঁড়ালেন না। এক-এক বারে সিঁড়ির দু-দুটো করে ধাপ টপকে দোতলায় উঠে গেলেন।

আমি ওঁর চেয়ে বয়েসে বছর তিনেকের ছোট। কিন্তু খানিকটা পথ ছুটে আসায় আমার বুক ধড়ফড় করছিল। মনে হচ্ছিল যে, দম আটকে আসছে। ওইভাবে উঠতে গেলে আমার হার্ট-অ্যাটাক না হয়ে যায়। একতলাতেই একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাই আস্তে-আস্তে উপরে উঠলুম।

উঠে দেখি, আমারই ঘরটায় ভিড় জমে গেছে। বঙ্কুবাবু, মিসেস ঘোষ, দীপক, শঙ্কর—সবাইকে সেখানে দেখলুম। তা ছাড়া আরও পাঁচ-ছজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের আমি চিনি না। আন্দাজে বুঝে নিলুম যে, তারা এ-বাড়ির কাজের লোক।

দীপক আর শঙ্কর ভিড়টা একটু সরিয়ে দিতে দেখলুম, ঘরের মেঝের উপরে দীপকেরই বয়সী একটি ছেলে চিত হয়ে শুয়ে আছে, আর ভাদুড়িমশাই ক্রমাগত তার মুখেচোখে জলের ঝাপটা দিচ্ছেন।

শঙ্করকে জিজ্ঞেস করলুম, “কে এই ছেলেটি?”

শঙ্কর বলল, “রামবাবু। ঘোষসাহেবের ছেলে। অজ্ঞান হয়ে গেছেন।”

একটু বাদেই রামুর জ্ঞান ফিরল। তখন ঘটনার যে বিবরণ তার কাছে শোনা গেল, তাতে তো আমরা হতবাক। সকাল ছ’টায় সে ঘুম থেকে উঠেছিল। তারপর বেড-টি খেয়ে বাথরুমে যায়। দাড়ি কামিয়ে, মুখহাত ধুয়ে আধঘন্টা যোগব্যায়াম করে। তারপর বাগানে খানিক পায়চারি করে সওয়া সাতটা নাগাদ ঘরে ফিরে আসে। আগের দিনই নতুন-মা তাকে জানিয়ে রেখেছিলেন যে, সওয়া আটটার মধ্যে সাগরমহলে যাওয়া হবে, তাই চটপট সবাই যেন স্নান সেরে নেয়। কিন্তু স্নান করতে গিয়ে রামু দেখতে পায় যে, তার ঘরের অ্যাটাচড বাথরুমটা ভিতর থেকে বন্ধ। বাবা আর নতুন-মা’ও তখন স্নান করবার জন্যে যে-যার বাথরুমে ঢুকেছেন। ফলে, উপরতলার দুটো বাথরুমের অন্তত একটা খোলা পাবে ভেবে সে দোতলায় চলে যায়। দোতলায় সে আমাদের কাউকে দেখতে পায়নি। নিশ্চিন্ত মনে সে তাই আমার ঘরের বাথরুমটায় ঢুকতে গিয়েছিল। কিন্তু ঢুকবার উপক্রম করতেই ভিতর থেকে কেউ এমন জোরে তাকে ধাক্কা দেয় যে, সে মেঝের উপরে ছিটকে পড়ে।

ভাদুড়িমশাই মেঝে থেকে তুলে রামুকে ইতিমধ্যে আমার বিছানার উপরে শুইয়ে দিয়েছিলেন। রামু উঠে বসবার চেষ্টা করছিল। ভাদুড়িমশাই তাকে উঠতে নিষেধ করে বললেন, “আর কিছুক্ষণ পরে উঠবে, এখন একটু বিশ্রাম নাও। আর হ্যাঁ, এখন তোমাকে বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করব না, শুধু কয়েকটা কথার জবাব দাও।”

“বলুন।”

“মেঝের উপরে পড়ে গিয়ে তোমার কোথায় চোট লেগেছে?”

“মাথায়।”

শুনে সস্নেহে রামুর মাথার হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আহা, খুব লেগেছে নিশ্চয়! এই এখানটা তো দেখছি বেশ ফুলেও গেছে।”

“খুব ব্যথা করছে।”

“আহা।…আচ্ছা রামু, বাথরুমের ভিতর থেকে কে তোমাকে অমন ধাক্কা মেরে ফেলে দিল, তা তুমি জানো?”

“না।”

“তার মুখ দেখতে পেয়েছিলে?”

“না। মুখটা একটা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল।”

“কিন্তু এতলায় তোমার নিজের বাথরুমটা কে আটকে রেখেছিল, সেটা নিশ্চয় জানো?”

“না, তাও জানি না।”

“বাইরে থেকে জিজ্ঞেসও করোনি?”

“না। মনে হয়েছিল, মামাজি হয়ত ঢুকেছে। ও তো মাঝে-মাঝেই আমার বাথরুমটা ব্যবহার করে।”

দীপক বলল, “না ভাঞ্জা, আমি আজ একবারও তোমার বাথরুমে যাইনি। আমি আর রাজেশ তো আউটহাউসে থাকি, সেখানকার বাথরুমেই আমরা আজ স্নান করে নিয়েছি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “তা হলে? এ তো বড় মিস্টিরিয়াস ব্যাপার।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সবাইকে নিয়ে নীচে যাও, বঙ্কু। রামুর যা চোট লেগেছে দেখছি, তাতে মনে হয়, আজ আর আমাদের সাগরমহলে যাওয়া হবে না।”

মৃদু গলায় রামু বলল, “না না, এখন আর আমার তেমন ব্যথা নেই। আমি যেতে পারব।”

বলে সে আর দেরি করল না, বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে বলল, “এ কী, সবাই দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?”

সবাই নীচে নেমে গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে আর আপনিই বা দেরি করছেন কেন? বাথরুমে ঢুকে তৈরি হয়ে নিন।”

বললুম, “আপনি স্নান করবেন না?”

“রাত চারটেতেই আমি স্নান সেরে নিয়েছি। তাবৎ কাজ না সেরে যে আমি ঘর ছেড়ে বেরুই না, তা আপনি খুব ভালই জানেন।”

যাওয়ার সময়টা একটু পিছিয়ে না-দিয়ে উপায় ছিল না। ব্রেকফাস্ট খেয়ে সবাই যখন বাইরে এসে জমায়েত হলুম, তখন ন’টা বাজে।

কথা ছিল, দীপক সাগরমহলে যাবে না। কলকাতায় অন্তত দুটো ফোন আজ করতেই হবে। একটা অরুণ সান্যালদের বেহালার বাড়িতে, আর একটা আমাদের বাড়িতে। দীপককে তাই যেতে হবে আগরতলায়। কিন্তু তার মুখ দেখে বুঝতে পারলুম যে, কাল রাত্তিরে সে যা-ই বলে থাকুক, এখন আর তার আগরতলায় যাবার বিশেষ ইচ্ছে নেই।

মিসেস ঘোষও তাঁর ভাইয়ের বেজার ভাবটা লক্ষ করেছিলেন। বললেন, “কী রে, অত গম্ভীর কেন? সাগরমহলে তোর যাওয়া হচ্ছে না বলে বুঝি মন খারাপ?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা আগরতলায় তো আর কাউকেও পাঠানো যায়। দীপক তা হলে আমাদের সঙ্গে যেতে পারে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “কে যাবে? ড্রাইভার দুজনকে তো ছাড়া যাবে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমার গাড়িটা কে চালাবে?”

“বিজয়নারায়ণ…..মানে বিজু। গত তিরিশ বছর ধরে বিজু আমার গাড়ি চালাচ্ছে। যেখানেই যাই, ও আমার সঙ্গে থাকে। মানে….শুধু গাড়িই চালায় না, হরেক কাজে ওকে আমার দরকার হয়। ওকে তো ছাড়তে পারব না।”

“তা হলে শঙ্কর যাক। কী হে শঙ্কর, আগরতলা থেকে কলকাতায় এই ফোন দুটো তুমি করে দিতে পারবে না?”

শঙ্কর বলল, “খুব পারব।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “ওহে চারু, শঙ্করকে তো খুব আগরতলায় পাঠাচ্ছে, তা হলে তোমাদের গাড়িটা কে চালাবে? দীপক তো গাড়ি চালাতে পারে না।”

এতক্ষণ আমি কোনও কথা বলিনি। এবারে আর না-বলে পারলুম না। হেসে বললুম, “সে কী দীপক, অমিতাভ বচ্চন তোমার গুরুজি, অথচ তুমি গাড়ি চালাতেও শেখোনি?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “সত্যিই তো। তা হলে তুই সাগরমহলে যাবি কী করে দীপক?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নো প্রবলেম। গাড়ি আমিও চালাতে পারি, কিরণবাবুও পারেন। শঙ্করকে তাই অক্লেশে ছেড়ে দেওয়া যায়। শঙ্কর বাসে উঠে আগরতলায় চলে যাক। গাড়ি আমিই চালাব।”

অন্য গাড়িটা অ্যাম্বাসাডার। সেটার পিছনে উঠলেন বঙ্কুবাবু, মিসেস ঘোষ আর রামু। বিজু গিয়ে ড্রাইভারের আসনে বসল। তার পাশের সিটে বসল পীতাম্বর। বঙ্কুবাবুর খাস-বেয়ারা।

মারুতির পিছনে বসল দীপক আর রাজেশ। যেমন কাল রাত্তিরে, তেমন আজ সকালেও খাবার টেবিলে এই ছেলেটিকে আমি দেখেছি, কিন্তু ওর সঙ্গে পরিচয় হয়নি। দীপকই পরিচয় করিয়ে দিল। শুনলুম ও দীপকের বঙ্কু, ভাল ফোটোগ্রাফার। আউটহাউসে দীপক আর রাজেশ একই ঘরে থাকে।

ভাদুড়িমশাই আর আমি বসলুম, সামানে। স্টিয়ারিং হুইল ধরে, জানলায় মুখ রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বঙ্কু, তোমরা এগিয়ে যাও, আমি তোমাদের ফলো করছি।”

দুটো গাড়ি প্রায় একই “ঙ্গে স্টার্ট দিল। বিজু এগিয়ে গেল, মোটামুটি একটা দূরত্ব বজায় রেখে আমরা তার পিছন পিছন চললুম।

রাস্তা যে একটানা একই রকমে: তা নয়। কখনও কখনও সমতল, আবার কখনও-কখনও ঢেউ খেলানো। কিন্তু খানাখন্দ কোথাও চোখে পড়ল না। ঝাঁকুনি নেই, গাড়ি বেশ মসৃণ গতিতে চলেছে, জানলায় চোখ রেখে আমি দু-দিকের বনজঙ্গল, ঘরবাড়ি খেতখামার আর মানুষজন দেখছি। মাঝে-মাঝে এক-একটা ঘন-বসতির জায়গা পেরিয়ে যাই। এক-আধ মিনিটের জন্যে দেখতে পাই যে, দু-পাশের দোকানপাটে কেনাবেচা চলেছে। তার পরেই আবার ফাঁকা রাস্তা। রাস্তার পাশে বাঁশঝাড়, পুকুর, ধানখেত।

দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম, দীপকের কথায় আমার চমক ভাঙল।

“আচ্ছা মিঃ চ্যাটার্জি, ফিল্মে নামতে হলে কি গাড়ি চালানো শিখতেই হবে?”

হেসে বললুম, “সেটা নির্ভর করছে কোন ভূমিকায় তুমি নামবে, তার উপরে।”

“গুরুজি যে-সব ভূমিকায় নামে, সেইরকম কোনও ভূমিকায় যদি নামতে চাই?”

“ওরেব্বাপ রে বাপ,” শিউরে উঠে বললুম, “তা হলে শুধু ড্রাইভিং কেন, শিখতে হবে আরও অনেক কিছু। নাচ জানো?”

“না।”

“সেটা শিখতে হবে। বক্সিং জানো?”

“না।”

“সেটা শিখতে হবে। হ্যান্ডগ্রেনেড ছুড়তে আর বন্দুক চালাতে শিখতে হবে। ফেন্সিংটাও শেখা চাই। তা ছাড়া আরও অনেক কিছু শেখা দরকার। চোদ্দোতলা বাড়ির ছাতের উপর থেকে কীভাবে ঝাঁপ খেতে হয়, জানো?”

“না।”

“ওটাও না শিখলে নয়। ওইভাবে তোমাকে ঝাঁপ খেতে হবে। তারপর, ফুটপাথ থেকে উঠে, যেন কিছুই হয়নি এইভাবে একটা আলতো টোকা মেরে তোমার জামাকাপড়ের ধুলো ঝেড়ে ফের লাফিয়ে পড়তে হবে ভিলেনের উপরে। মেরে তাকে তক্তা বানিয়ে ফেলতে হবে। তা ছাড়া শুধু মারলেই তো চলবে না, মারটা প্রথমদিকে আচ্ছারকম খাওয়াও চাই। কী করে মার খেতে হয় জানো?”

“না।”

যে-রকম ক্ষীণ গলায় দীপক ‘না না’ বলছিল তাতে বুঝতে পারছিলুম যে, তার গলা ক্রমেই শুকিয়ে আসছে। বললুম, “জল খাবে দীপক?”

“আছে আপনার সঙ্গে?”

ওয়াটার-বটলটা পিছনে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললুম, “দীপক, তোমার ধারণা ফিল্মের নায়ককে শুধু নাচা-গানা করতে হয়। আর মিঠি-মিঠি কথা বলতে হয়। বাস, তা ছাড়া আর তার কোনও কাজ নেই। না রে বাপু, অত সহজ নয়। বিস্তর হ্যাপা।”

“কিন্তু আপনি যে-সব কাজের কথা বললেন, ও-সব তো শুনেছি ডামিরা করে।”

বললুম, “তোমরা গুরুজি কিন্তু ডামি দিয়ে কাজ চালানো খুব একটা পছন্দ করেন না। অন্তত মারপিটের চোদ্দো আনা তিনি নিজেই করেন শুনেছি। তবে হ্যাঁ, চোদ্দোতলা বাড়ির ছাত থেকে তিনি লাফ মারেন না। ওটা ক্যামেরার কারসাজি।”

ভাদুড়িমশাই কথা বললেন, অনেকক্ষণ বাদে। সামনের গাড়িটা ডাইনে বাঁক নিতে তিনি বললেন, “আমরা সাগরমহলে পৌঁছে গেছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *