চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২১
একবারের বেশি টোকা দিতে হল না, দরজা খুলে রামু বলল, “কী ব্যাপার আঙ্কল?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?”
“মাত্র তো এগারোটা বাজে, এত তাড়াতাড়ি আমি ঘুমোই না, একটা বই পড়ছিলুম। কিন্তু আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভিতরে আসুন।”
ভিতরে ঢুকেই বুঝতে পারলুম যে, দক্ষিণখোলা যে-ঘরে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে তার তুলনায় এই ঘরটা অনেক ছোট। একটু অগোছালোও বটে। আমাদের ঘরে দু’দুটো রাইটিং টেবিল আর চেয়ার ছাড়াও বসবার জন্য আলাদা একটা সোফা সেট রয়েছে। তার উপরে আর্মচেয়ারও রয়েছে একটা। রামুর ঘরে না আছে সোফা-সেট, না আছে আর্ম চেয়ার। একদিকের দেওয়াল ঘেঁষে একটা খাট, অন্যদিকের দেওয়ালে একটাই ওয়ার্ডরোব। তার পাশে কাচের বুক-কেস। তাতে মোটা মোটা বই ঠাসা। ঘরের মধ্যে ছোট একটা রাইটিং টেবিল আর তার সামনে একটা চেয়ারও রয়েছে, কিন্তু যেমন টেবিল তেমন চেয়ারের উপরেও ডাঁই করে রাখা হয়েছে একগাদা বই আর খাতা।
ব্যাবসা-বাণিজ্য নিয়ে যে-সব ম্যাগাজিন বেরোয়, খাটের উপরে তারই খান-তিনেক ছড়িয়ে আছে। বসবার অন্য কোনও ব্যবস্থা না থাকায় ম্যাগাজিনগুলোকেই একপাশে সরিয়ে দিয়ে রামু বলল, “আপনারা বরং খাটেই বসুন।……কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো, কোনও কথা ছিল?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইট’স নো ইউজ বিটিং অ্যাবাউট দ্য বুশ। হাতে আর সময় নেই, কাল ধৌলি এক্সপ্রেসে আমরা কলকাতা ফিরছি।”
“কালই ফিরবেন? কেন? আরও দু-একটা দিন থেকে যান না। এবারে তো অনেকদিন বাদে এলেন?”
“পরে আবার আসব। এ-যাত্রায় একটা কাজ নিয়ে এসেছিলুম। সেটা মিটে গেছে। কিন্তু যাবার আগে তোমাকে দু’একটা কথা জিজ্ঞেস করা দরকার।”
“কী জিজ্ঞেস করবেন, আমি জানি।” মৃদু হেসে রামু বলল, “পার্টনারশিপের দলিলে আমি কেন সই করছি না, এই তো?”
এবারে ভাদুড়িমশাইও হাসলেন। তারপর রামুর চোখে চোখ রেখে বললেন, “না না, ও নিয়ে কোনও কথাই আমি বলব না। আই অ্যাম নো ফুল। কেন যে তুমি সই করছ না, তা তো আমি জানিই। তা হলে আর ও নিয়ে কোনও প্রশ্ন করতে যার কেন?”
রামু কি একটু চমকে উঠল? যদি বা চমকে উঠে থাকে, সেটা নেহাতই এক মুহূর্তের জন্য। কেননা, পরক্ষণেই দেখলুম, তার চোখ থেকে সেই মৃদু হাসির আলোটা আদৌ মিলিয়ে যায়নি। একই রকমের শান্ত গলায় সে বলল, “বেশ তো, জানেন যখন, তখন আপনিই বলুন যে, কেন আমি সই করছি না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি তো কিছু বলতে আসিনি। আমি শুনতে এসেছি।”
“কী শুনবেন?”
“ভাই কোথায়?”
রামু এবারে স্পষ্ট করে হাসল, “সে তো পুলিশের জানবার কথা, আমি কী করে জানব?”
“পুলিশ না জানুক, আমি জানি। তুমি জানো, আজ আমি কটকে গিয়েছিলুম। কেন গিয়েছিলুম? না লক্ষ্মণের কলেজের এক অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করতে। দেখা করে কী লাভ হল? না তাঁর কাছে পাওয়া গেল লক্ষ্মণের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ বঙ্কুর ঠিকানা। আর-কিছু শুনতে চাও?”
“বলুন।”
“লক্ষ্মণের সেই বঙ্কুদের সঙ্গে আমি দেখা করি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন দেখা করেছিলুম? না কোন্ ব্যাপারে লক্ষ্মণ কোন্ দোকানকে পেট্রনাইজ করে, তাদের কাছে সেটা জেনে নেবার দরকার ছিল। সব রকমের দোকান নিয়ে অবশ্য আমার মাথাব্যথা ছিল না, আমি শুধু জানতে চাইছিলুম একটা বিশেষ ধরনের দোকানের খবর। তো বঙ্কুরা বলল যে, সে-দোকান তো কটকে নয়, ভুবনেশ্বরেই রয়েছে। ফলে তিরিশ মাইল উজিয়ে আমাকে আবার ভুবনেশ্বরেই ফিরতে হল।…..কী হল, কোনও কথা বলছ না যে?”
রামু বলল, “আমি আর কী বলব?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আর-কিছু না বললেও এটা অন্তত বলতে পারো যে, রবিবারে তো দোকানপাট বন্ধ থাকে, তাই দোকানের খোঁজে আজ রবিবার আমার ভুবনেশ্বরে যাওয়া উচিত হয়নি। কেমন?….কিন্তু না, তা তুমি বলবে না। কেননা তুমি খুব ভাল করেই জানো যে, যে-দোকানের খোঁজে আমি গিয়েছিলুম, অন্য সব দোকান বন্ধ থাকলেও সে-দোকানের কাজ-কারবার রবিবারে বন্ধ থাকে না। বরং ছুটির দিনেই ও-সব দোকানে খদ্দের আরও বেশি জোটে।”
দোকানের মালিক আপনাকে কিছু বলেছে?”
“প্রথমে বলতে চায়নি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু কতক্ষণ আর চুপ করে থাকবে বলো। কড়কড়ে একখানা একশো টাকার নোট যখন তার হাতের মধ্যে গুঁজে দিলুম, গড়গড় করে সবই তখন বলে ফেলল।”
রামুর দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলুম। মনে হল, নিমেষে তার মুখ থেকে যেন সমস্ত রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। স্খলিত গলায় সে বলল, “বাবাকে আপনি বলেছেন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “খেপেছ? তোমার বাবা আমার বঙ্কু। আমি কি তাঁর হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারি? কলিকালের রাম আর লক্ষ্মণের মধ্যে একজনও যে পিতৃ-আজ্ঞা পালনে বিশেষ উৎসাহী নয়, বরং দুজনেই ঘোর পিতৃদ্রোহী, এটা জানলেই তো তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।”
“আমি তা হলে কী করব?”
“তোমাকে কিছু করতে হবে না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা করবার আমিই করব। তুমি শুধু বলো, নিখোঁজ ভাইটির খোঁজ আমরা কবে পাচ্ছি।”
রামু বলল, “একেবারে এগজ্যাকট তারিখ কি বলা সম্ভব আঙ্কল?”
“এগজ্যাকট তারিখ তো আমি জানতে চাইছি না, কিন্তু মাসটা এগজ্যাকট হওয়া চাই।”
“আই থিংক হি উইল সারফেস বাই দ্য এন্ড অব মে।”
“বাঃ, লক্ষ্মী ছেলে। আজ হল গিয়ে মার্চ মাসের দশ তারিখ। মাঝখানে এপ্রিল, তারপরেই মে এসে যাচ্ছে। চমৎকার। তোমার বাবাকে তা হলে কথাটা জানিয়ে দিই, কেমন?….আরে না না, তোমাকে আর এর মধ্যে টানছি না, আই শ্যাল কিপ ইউ আউট অব ইট।”
“ঠিক বলছেন তো আঙ্কল?”
“শতকরা একশো ভাগ ঠিক বলছি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আর হ্যাঁ, আমরা যখন চলেই যাচ্ছি, তখন কাঁধ থেকে ওই স্লিংটা ঝুলিয়ে রাখবার দরকার কী, ওটা খুলে ফ্যালো। ….চলুন কিরণবাবু, ঘরে যাওয়া যাক, আপনার নিশ্চয় ঘুম পেয়ে গেছে।”
ঘরে ফিরে বললুম, “ব্যাপার কী বলুন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন কিছু বলব না। কাল সকালেও না। দুপুর দেড়টার ট্রেনে তো আমরা কলকাতা ফিরছি। যা বলবার তখন বলব। এখন ঘুমিয়ে পড়ুন।”
