চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১৮

বঙ্কুবাবুকে তাঁর ঘরে পৌঁছে দিয়ে আমাদের ঘরে এসে ঢুকলুম। তারপর দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললুম, “উরে বাবা!”

ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে আরাম-কেদারাটির দখল নিয়েছিলেন। সেখানে বসে তাঁর সেই ফাইলটা খুলে কী-সব কাগজপত্র দেখছিলেন তিনি। আমি যে ফিরে এসেছি, সেটা বুঝতে পেরেও ফাইল থেকে মুখ তুললেন না। যা পড়ছিলেন, তারই উপরে চোখ রেখে বললেন, “কী হল?”

“আর বলবেন না, মিসেস ঘোষ দেখলুম ঘুমোননি, জেগেই ছিলেন।”

“তা তো থাকতেই পারেন। রাত এখনও এগারোটাও বাজেনি।”

“এক কপি স্টারডাস্ট পড়ছিলেন।”

“আপনি কি ভেবেছিলেন যে, ঘুমোবার আগে উনি স্টারডাস্ট না পড়ে জেমস জয়েসের ইউলিসিস পড়বেন?”

“না, তা নয়, তবে বঙ্কুবাবুর উপরে খুব রেগে রয়েছেন বলে মনে হল।”

‘কেন, কেন,” ফাইলটা সারিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “অমন কথা মনে হল কেন? “

“একবার টোকা দিতে দরজা খোলেননি। দু-বার টোকা দিতেও না। তিনবারের বার দরজা খুলে দিলেন। ওঃ, সে এক রণচন্ডী মূর্তি! ভুরু নেই, নীচের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই! ওঃ, সে এক বীভৎস ব্যাপার!”

“যাদের আমরা সুন্দরী ভাবি, মেক আপ তুলে ফেললে তাদের অনেককেই ওরকম দেখাবে! কিন্তু বর্ণনা ছাড়ুন, রেগে রয়েছেন সেটা বুঝলেন কী করে?”

“দরজা খুলে দিতে কটমট করে বঙ্কুবাবুর দিকে তাকালেন। তারপর হাতের ম্যাগ্যাজিনখানা বঙ্কুবাবুর নাকের ডগায় উঁচিয়ে ধরে বললেন, অনেক রাত হয়েছে, যাও এবারে শুয়ে পড়ো গিয়ে!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বটে? কিন্তু বঙ্কু তাতে কী করল?”

“সেইটেই তো আশ্চর্যের ব্যাপার মশাই। আমি ভেবেছিলুম, বঙ্কুবাবু একেবারে সুড়সুড় করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বেন। কিন্তু তা তো তিনি করলেনই না, উলটে মিসেস ঘোষকে ধমক দিয়ে বললেন, শাট আপ, ইউ সিলি উয়োম্যান! তারপর গলার স্বর একেবারে পালটে ফেলে আমাকে বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ ফর অ্যাকসেপটিং আওয়ার টার্ম… সত্যি আমরা খুব কৃতজ্ঞ রইলুম।”

“জাস্ট লাইক বঙ্কু।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কলেজে যা দেখেছিলুম, আজও… মানে এই পঁচাত্তর বছর বয়েসেও … ঠিক সেইরকমই আছে। একটুও পালটায়নি।”

টেবিলে জাগ আর গেলাস রাখা রয়েছে। সেলোফেনের মোড়ক থেকে গেলাসটা বার করে তাতে জল ঢেলে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো এক গেলাস জল খেয়ে ফেললুম। তারপর টেবিলের সামনে থেকে চেয়ারটাকে সরিয়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের মুখোমুখি বসে জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপারটা কী বলুন তো?”

“কীসের ব্যাপার?”

“এই যে রামুর উপর মাঝে-মাঝেই হামলা হচ্ছে, এটা নিয়ে বঙ্কুবাবুকে কি আরও কিছু প্রশ্ন করলে ভাল হত না?”

“কী প্রশ্ন করব?”

“এই যেমন টাকার লোভে… মানে বঙ্কুবাবুর সম্পত্তির লোভে… কেউ এ-কাজ করতে পারে কি না।”

“কে করবে?”

“কেন, দীপকই তো করতে পারে। আপনিই তো বলছিলেন…”

“মোটেই আমি অমন কথা বলিনি। আমি একটা সম্ভাবনার কথা ভাবছিলুম মাত্র। মেবি আই ওয়াজ থিংকিং অ্যালাউড। কিন্তু ওটা তো আরও অনেকের সম্বন্ধেই ভাবা যায়। আর তা ছাড়া, একটা কথা ভেবে দেখুন। দীপক কে? না বঙ্কুর শালা। তো বঙ্কুকে আমি কী জিজ্ঞেস করব? ‘ওহে বঙ্কু, দীপক যে রামুকে খুন করতে পারে, এই কথাটা ভেবে দেখেছ?” …আরে দূর মশাই, এসব কথা ওইভাবে কাউকে বলা যায় নাকি?”

“বেশ তো, ওইভাবে না হয় না-ই বললেন। কিন্তু দীপককে উনি কতটা বিশ্বাস করেন, একটু কায়দা করে সেটা তো জেনে নেওয়া যায়। যেমন ধরুন, এটা তো আপনি বলতেই পারেন যে, ওহে বঙ্কু, একা যখন সব সামলাতে পারছ না, তখন দীপককে তোমার ব্যাবসার মধ্যে ঢুকিয়ে নিচ্ছ না কেন?”

“ওভাবে বললে বঙ্কু কী জবাব দিত, সেটা জানি বলেই জিজ্ঞেস করবার দরকার বোধ করিনি।”

“কী জবাব দিতেন, সেটা আপনি জানেন?”

“জানি বই কী। বঙ্কু বলত, ‘অমিতাভ বচ্চন যার গুরুজি, তাকে দিয়ে ব্যাবসার কাজ চলবে না বলেই ঢোকাইনি।’ …কিন্তু, কিরণবাবু, দীপককে ব্যাবসায় ঢোকাতে চায় না বলেই যদি আপনি ভাবেন যে, সব ব্যাপারেই দীপককে ও অবিশ্বাস করে, তা হলে কিন্তু মস্ত ভুল করবেন। বঙ্কু মনে করে, ব্যাবসা-বাণিজ্যে ওর মাথা খুলবে না, কিন্তু তার থেকে কি এটা ইনফার করা যায় যে, বঙ্কুর ধারণা, খুন-খারাপির লাইনে দীপকের মাথা খুলবে? না না, তা নিশ্চয় ভাবা চলে না। আর তা ছাড়া, এই ক’দিন তো খুব কাছের থেকে ওদের দেখলুম। তাতে মনে হল, দীপককে বঙ্কু একটি আকাট অপদার্থ ভাবে ঠিকই, কিন্তু স্নেহও করে।”

“তা হলে কে হামলা করছে?”

“এর জবাব দুটো হতে পারে।”

“একটা-একটা করে বলুন।”

“বলছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এক নম্বর জবাব, এমন কেউ হামলা করছে, যে ওকে প্ৰাণে মারতে চায় না, শুধু ভয় দেখাতে চায়।”

“এটা আপনি আগেও আমাকে বলেছেন। এবারে দু-নম্বর জবাবটা দিন।”

ভাদুড়িমশাই সরাসরি আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “সম্ভবত কেউই হামলা করছে না।”

বললুম, “তার মানে?”

“মানেটা এখুনি জানা চাই?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এত তাড়া কীসের? অনেক রাত হয়েছে, এবারে লক্ষ্মী ছেলের মতো শুয়ে পড়ুন দেখি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *