চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১৫

চিৎকার-চেঁচামেচি সমানে চলেছে। সেটা স্বাভাবিক। কেননা, নানান গেট দিয়ে একে তো পিলপিল করে তখনও লোক ঢুকছে, তার উপরে আবার আগেভাগেই যারা স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়েছিল, তাদেরও সবাই তখনও নিজের-নিজের জায়গা খুঁজে পায়নি। কিন্তু সেই হট্টগোলও হঠাৎ থেমে গেল। দেখলুম, ক্লাব হাউসের যেখানে আমরা বসে আছি, তার পাশের সিঁড়ি দিয়ে ব্যাট হাতে দুজন খেলোয়াড় মাঠের মধ্যে নেমে গিয়ে উইকেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথমজন বেঁটেখাটো, দ্বিতীয়জন অন্তত ছ-ফুট লম্বা। বেশ রোগাও বটে।

যে-মাঠ মুহূর্তের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, পরক্ষণেই তা আবার উত্তাল হয়ে উঠল। ‘গাভাসকর! গাভাসকর!’

মনে হল যেন গোটা মাঠ একসঙ্গে চেঁচাচ্ছে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বড়বাবুকে তো চিনলুম, তা ওঁর সঙ্গের ওই রোগা ঢ্যাঙা ছোকরাটি কে মশাই?”

আমাকে কিছু বলতে হল না। ভাদুড়িমশাই তাঁর যে বঙ্কুপুত্রটিকে সঙ্গে করে মাঠে এসেছেন, সে একেবারে ঝাঁঝিয়ে উঠল। “ও আঙ্কল, ইউ আর ইমপসিবল! উনি হচ্ছেন দিলীপ বেঙ্গসরকর। দারুণ খেলছেন! এটা নিয়ে সতেরোটা টেস্ট খেললেন, তবে কিনা এখনও পর্যন্ত একটাও সেঞ্চুরি করতে পারেননি।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সতেরোটা টেস্ট, অথচ সেঞ্চুরি করেনি, তবু বলছিস দারুণ খেলোয়াড়! তোরা বটে বাড়িয়ে বলতে পারিস।”

ছেলেটি একটুও দমে গেল না। বলল, “এটাতেও না করতে পারেন, তবু বলব, সুনীলের পরে এ-রকম ব্যাটসম্যান আর একজনও আসেননি। তবে আমার কী মনে হয় জানো আঙ্কল, ওঁর ব্যাড প্যাঁচটা কেটে গেছে, এবারে ঠিকই সেঞ্চুরিটা পেয়ে যাবেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “টাচ উড। কাগজ পড়ে তো যা বুঝলুম, গোটা চল্লিশ রানে এগিয়ে আছি, তাও এক উইকেট খুইয়ে।”

তা ভাদুড়িমশাই কিছু মিথ্যে বলেননি। প্রথম ইনিংসে আমরা করেছিলুম তিনশো, আর ওরা তিনশো সাতাশ, দ্বিতীয় ইনিংসের সূত্রপাতেই গন্ডগোল, অংশুমান গায়কোয়াড় মাত্র পাঁচ রান করেই ক্লার্কের বলে ক্লিন বোল্ড হয়ে যায়। তার পরে অবশ্য আর-কেউ আউট হয়নি। সুনীল চৌত্রিশ রানে নট আউট রয়েছে, দিলীপ সাতাশ রানে।

এ হল ১৯৭৯ সালের পয়লা জানুয়ারির কথা। সেদিন রাত্তিরেই ভাদুড়িমশাইয়ের ফোন পাই। কী একটা কাজে কলকাতায় এসেছিলেন। বললেন, “খেলাটা বড়ই ইন্টারেস্টিং একটা স্টেজে এসে পৌঁছেছে। দেখতে যাবে নাকি?”

বললুম, “কী ব্যাপার? আপনার মাথায় আবার ক্রিকেটের ভূত চাপল কবে থেকে?”

“আমার মাথায় নয়, আমার এক বঙ্কুপুত্রের মাথায়। ব্যাঙ্গালোর থেকেই ব্যাটা আমার সঙ্গ নিয়েছে। বলছে, এই টেস্টটা ওকে দেখাতেই হবে।”

“টিকিট পেলেন?

“তা পেয়েছি। ব্যাঙ্গালোর থেকেই লালবাজারের এক পুলিশ-অফিসারকে ফোন করে সব জানিয়ে রেখেছিলুম। তো আজ ফোর্থ ডে’র তিনটে টিকিট তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন। যাবেন নাকি?”

বললুম, “কেন, কৌশিক যাবে না?”

“ও তো অনেক আগেই টিকিট কেটে রেখেছে। বঙ্কুদের সঙ্গে রোজই যাচ্ছে, কালও যাবে। ওর জন্যে ভাববেন না, আপনি যাবেন তো বলুন।”

“যদি যাই তো কোথায় মিট করব?”

“আপনার অফিসে গাড়ি রেখে খানিকটা পথ হেঁটে আসুন। কার্জন পার্কে সুরেন বাঁড়ুজ্যের স্ট্যাচুর কাছে আমি ওয়েট করব। সাড়ে নটায় এলেই হবে।”

না এলে সত্যি পস্তাতে হত। একে তো গাভাসকরের এইট্টিথ আর বেঙ্গসরকরের মেডেন সেঞ্চুরিটা তা হলে দেখা হত না, তার উপরে আবার সাক্ষী হতে পারতুম না নতুন একটা বিশ্ব রেকর্ডের। একই টেস্টের দু-ইনিংসে সেঞ্চুরি আছে অনেকেরই; কিন্তু একটা নয়, দুটো নয়, তিন-তিনটে টেস্টের দু-ইনিংসেই সেঞ্চুরি একমাত্র সুনীল ছাড়া আর কারও নেই।

ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটি দেখলুম ক্রিকেটের বিশ্বকোষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নামজাদা খেলোয়াড়দের অনেকেই এবারে খেলতে আসেনি। যারা এসেছে, তাদের মধ্যে কালীচরণ ছাড়া অন্য দু-একজনের নাম শুনেছি মাত্র, বেশির ভাগকেই চিনি না। অথছ দশ-বারো বছর বয়েসের এই ছেলেটি দেখা গেল প্রত্যেককেই চেনে। যারা বল করছিল, তাদের মধ্যে একজনকে দেখিয়ে বলল, “উনি হচ্ছেন মার্শাল। উঠতি পেসারদের মধ্যে সেরা। কিন্তু লাইন আর লেংথ ঠিক রেখে বল করতে পারছেন না তো, তাই মারও খাচ্ছেন খুব। অথচ ওরই মধ্যে কীভাবে একটা ইয়র্কার দিলেন দেখুন। দিলীপ ব্যাট তোলেননি, তাই বেঁচে গেলেন। নইলে আর দেখতে হত না, ব্যাটের তলা দিয়ে ও বল নির্ঘাত উইকেট ভেঙে দিত।”

আর-একজনকে দেখিয়ে বলল, “উনি হচ্ছেন হোল্ডার। এককালে খারাপ বল করতেন না, এখন একদম ফুরিয়ে গেছেন। বড্ড লুজ বল দেন। হোল্ডিং আসেননি, তাই ওঁকে আনা হয়েছে; কিন্তু দেখুন, বল যা করছেন, তাতে একটুও ধার নেই। আর তাই, সমানে পিটুনি খাচ্ছেন।”

পিটুনি অবশ্য একা হোল্ডারই যে খাচ্ছিল, তা নয়। উইকেটের দুই প্রান্ত থেকে সুনীল আর দিলীপ একেবারে পক্ষপাতহীনভাবে সবাইকে পিটিয়ে যাচ্ছিল। প্রথম দিকের খানিকটা সময় ফিল্ডিং ছিল উইকেট-ঘেঁষা, কিন্তু কিছুক্ষণ বাদেই সেই আঁটোসাঁটো ব্যূহ একেবারে তছনছ হয়ে যায়। পরপর কয়েকটা বাউন্ডারি হতেই ফিল্ডিং নিমেষে বাউন্ডারি লাইনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন আবার শুরু হয়ে যায় প্রতিটি বলে আলতো করে ব্যাট ছুঁইয়ে সিঙ্গল রান তুলবার পালা।

তারই মধ্যে একটা চিকি সিঙ্গল নিতে গিয়ে রান-আউট হতে-হতে বেঁচে গেল দিলীপ। ময়দান-এন্ড থেকে বল করা হচ্ছিল তখন। সুনীল নন্-স্ট্রাইকিং ব্যাটসম্যান। দিলীপ দেখলুম স্লিপের ভিতর দিয়ে একটা বল গলিয়ে দিয়েই কয়েক পা এগিয়ে এসেছে। সুনীল কিন্তু ঠিকই দেখে নিয়েছিল যে, বলটা বেশি দূরে যায়নি। তার ধমক খেয়ে দিলীপ তৎক্ষণাৎ ক্রিজে ফিরে যায়। না গেলে যে তাকে রান-আউট হতে হত, তাতে সন্দেহ নেই।

ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটি বলল, “এত চমৎকার ব্যাট করেন, অথচ এইটেই ওঁর মস্ত দোষ। বড্ড ছট্‌ফটিয়া। একটু ঠান্ডা মাথায় খেলতে পারলে অ্যাদ্দিনে ওঁর তিন-চারটে সেঞ্চুরি হয়ে যেত। এটা ওঁর কত নম্বর ইনিংস জানেন?”

“কত?”

“থার্টিয়েথ। অর্থাৎ এর আগে ঊনতিরিশবার সেঞ্চুরি করবার সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু একটাও কাজে লাগতে পারেননি। অথচ কত বড় ব্যাটসম্যান!”

ঠাট্টা করে বললুম, “উনি যত বড় ব্যাটসম্যান, তুমি দেখছি তার চাইতেও বড় ভক্ত!”

শুনে ফ্যালফ্যাল করে ছেলেটি খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর বলল, “ওহ্ নো, আমি কারও ব্লাইন্ড সাপোর্টার নই। আমি জানি, ওঁরও কয়েকটা দোষ রয়েছে। একটা দোষ উনি কভার-ড্রাইভে খুব-একটা সুবিধে করতে পারেন না। তা আজ তো দেখছি, কভার দিয়েও কয়েকটা বল চমৎকার বাউন্ডারি-লাইনের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। তার মানে কী জানেন, চিঠিতে কাজ হয়েছে।”

“এই নিয়ে তুমি ওঁকে চিঠি লিখেছিলে?”

“শুধু এই নিয়ে কেন, অনেক কিছু নিয়েই লিখি। উনি উত্তরও দেন। এমনও বলেন যে, আমি যদি বোম্বাই গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করি, তো ক্রিকেটের ব্যাপারে উনি আমার জন্যে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করে দেবেন।”

“যাও না কেন?”

“বাবা যেতে দেন না যে।” বেজার মুখে ছেলেটি বলল, “যতবার বাবাকে বলি, তিনি কী উত্তর দেন জানেন?”

“কী?”

“বলেন যে, বি.এ.টা অন্তত পাশ করে নাও। তারপর যা খুশি কোরো। তা আমি তো এখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, কবে যে বি.এ. পাশ করব, কে জানে!”

“এখন যদি তোমার ক্লাস সিক্স হয়, বি.এ. পাশ করতে তা হলে তোমার… আর মাত্র নটা বছর লাগবে। কী, হিসেবটা ঠিক হল তো?”

উত্তরটা আর শোনা হল না, তার আগেই মাঠ জুড়ে একটা তুমুল চিৎকার উঠল। ভাদুড়িমশাই তাঁর বঙ্কুপুত্রটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেঙ্গসরকর নব্বইয়ের ঘরে পৌঁছে গেল। মনে হচ্ছে, তোর কথাই ঠিক, ছেলেটা আজ সেঞ্চুরি না করে ছাড়বে না। দিস টাইম ইট ওন্ট স্লিপ থ্র হিজ ফিঙ্গার্স।”

সুনীলের সেঞ্চুরি একটু আগেই হয়েছে। এই নিয়ে ওর আঠারোটা টেস্ট-সেঞ্চুরি হল। ইডেনের মাঠে সুনীল এর আগে তেমন সুবিধে করতে পারেনি, কলকাতার দর্শকদের তাই নিয়ে বিস্তর ক্ষোভও ছিল, কিন্তু আজ ওর একেবারে অন্য চেহারা। সম্ভবত মাথায় একটু খাটো বলেই হুকটা সাধারণত মারতে চায় না, তবে কিনা ওটা বাদে আর যত রকমের মার একজন ব্যাটসম্যানের থাকতে পারে, ঝুলি উজার করে সে-সব ও আজ একটার পর একটা দেখিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে দিলীপ দেখলুম ধীরস্থির। পরপর কয়েকটা বল স্রেফ ব্লক করে গেল, মারার কোনও চেষ্টাই করল না।

বললুম, “এরকম করলে কিন্তু আমি ঘুমিয়ে পড়ব।”

তা ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটি অতি তুখোড় ছেলে। আমার মন্তব্য শুনে হেসে বলল, “আপনাকে জাগিয়ে রাখবার জন্যে উইকেটটা ওদের হাতে তুলে দিয়ে উনি কি হাসতে-হাসতে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন নাকি? উনি এখন প্রতিটি বল দেখে-দেখে খেলবেন। যতক্ষণ না লুজ বল পাচ্ছেন, মারবেন না।”

আমাদের সামনে যিনি বসে ছিলেন, মুখ ঘুরিয়ে তিনি বললেন, “হি ইজ রাইট। এখন কি আর ধুমধাড়াক্কা পেটাবার সময়? নব্বুই পেরিয়েছে, বুঝতে পারছে যে, বারবার বোলার পালটে একটা সাইকোলজিক্যাল প্রেশার ক্রিয়েট করবার চেষ্টা হচ্ছে ওর উপরে, এখন ওকে দারুণ হুঁশিয়ার থাকতে হবে। নব্বুইয়ের ধাক্কা বড় মারাত্মক ধাক্কা মশাই। পঙ্কজ তো একবার এই ইডেনেই নিরানব্বই করে আউট হয়ে গেল। ওফ, মাত্তর একটা রান, তারই জন্যে সেঞ্চুরিটা করতে পারল না!”

বঙ্কুপুত্রটি ঝুঁকে পড়ে বলল, “ইউ মিন পঙ্কজ রায়? …মানে ভিনু মাকড়ের সঙ্গে এখনও যাঁর একটা ওয়ার্লড রেকর্ড রয়েছে?”

“তবে আর বলছি কী! দিব্বি নিরানব্বইয়ে পৌঁছে গেল। আমরা ভাবছি, যাক্, ঘরের ছেলে তা হলে মান রাখল বটে, সেঞ্চুরি না হয়ে যায় না। কিন্তু কোথায় কী, যেই না একটু অন্যমনস্ক হয়েছে, অমনি আউট! আরে বাবা, এ হচ্ছে কনসেনট্রেশনের খেলা। হুম্দো-হুম্দো সব বোলার, কে কখন কী করে বসে, তার তো ঠিক নেই। তাদের উপরে নজর রাখো, গ্রিপটা খেয়াল করো, বলটা ছাড়বার সময় কবজি ঘুরল না আঙুল ঘুরল, সেটা দেখে নাও, বলটাকেও একেবারে শেষ অব্দি দেখতে হবে, তার আগেই যদি ব্যাট তুলেছ তো মরেছ। তো তা-ই হল। মাত্তর একটা রান দরকার ছিল রে ভাই, ওফ্…”

“এটা কবে হয়েছিল বলব?”

বলা আর হল না। কবজির মোচড়ে বেঙ্গসরকর ততক্ষণে বাউন্ডারিতে বল পাঠিয়েছে। বোঝা গেল, অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পরে আবার সে রান তুলবার দিকে মন দিয়েছে। তার দরকারও আছে বই কী। রানের ব্যাপারে ভারতকে এখন চটপট একটা ব্যবধান গড়ে তুলতে হবে, নয়তো এ-খেলা ড্রয়ের দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া মোটেই বিচিত্র নয়।

সেঞ্চুরিটা এরপর তাড়াতড়িই এসে গেল, আর তারপরেই শুরু হল বেধড়ক পিটুনি। সুনীল সব সময়েই সতর্ক ব্যাটসম্যান, ওপেনারের ধর্ম আসলে সেটাই হওয়া উচিত, পারতপক্ষে সে ঝুঁকি নিয়ে ব্যাট চালায় না। সত্যি বলতে কী, এক বিজয় মর্চেন্ট ছাড়া আর কাউকেই আমি কখনও সুনীলের মতো এত ধীরস্থির ভঙ্গিতে বলের মোকাবিলা করতে দেখিনি। কিন্তু সেই সুনীলও যেন আজ হঠাৎ কেমন পালটে গেছে। মাঝে মাঝই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে আসছে সে, আর মধ্যপথেই সপাটে ব্যাট চালিয়ে বল পাঠিয়ে দিচ্ছে বাউন্ডারির সীমানায়। বেশ কিছুটা পালটে গেছে দিলীপও। ফলে রানও এখন একেবারে লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠেছে।

হাততালির শব্দে কানে তালা লাগবার উপক্রম। যেমন হাততালি, তেমন চিৎকার। বাউন্ডারি হলে তো বটেই, খুচরো এক-একটা রান করলেও সবাই গলা ফাটিয়ে ব্যাটসম্যানকে শাবাশ দিচ্ছে। আমার যে বয়েস হয়েছে, এই বয়েসে চেঁচানো যে আমার মোটেই শোভা পায় না, তার উপরে আবার ক্লাব-হাউসে যেখানে জায়গা পেয়েছি, সেখানে বসে চিৎকার করা যে ঘোর অশোভন ব্যাপার, সে-সব কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আমিও একবার গাভাসকরের দুর্দান্ত একটা স্ট্রেট ড্রাইভ দেখে “শাবাশ সানি” বলে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েছিলুম, কিন্তু ‘শাবাশ’ বলে তারপর আর বলা হয় না, ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটির দিকে চোখ পড়তে দেখি, ছেলেটা একেবারে কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

ঢোক গিলে বললুম, “কী ব্যাপার?”

“চেঁচাচ্ছেন কেন?”

“বা রে, ওইরকম একটা স্ট্রেট ড্রাইভ দেখলে না- চেঁচিয়ে পারা যায়? বোলারের পাশ দিয়ে মাঠের ঘাস পুড়িয়ে বলটা কীভাবে বাউন্ডারি লাইন পেরিয়ে গেল, দেখলে? ও-বল আটকাতে গেলে হাতে নিশ্চয় ছ্যাঁকা লেগে যেত। তা ছাড়া, রান ওঠাও তো দরকার।”

“শুধু রান উঠলেই চলবে?”

“সুনীল একশো আশির ঘরে পৌঁছে গেছে, দিলীপও দেড়শো পেরিয়ে গেল। হাত সেট হয়ে গেছে তো, তাই মনে হচ্ছে, ওরা দুজনেই আজ ডবল সেঞ্চুরি করবে।”

“তা যদি ওঁরা করেন, ইন্ডিয়াকে তা হলে এ টেস্ট জিততে হচ্ছে না।”

ওরেব্বাবা, সময় বলেও যে একটা ব্যাপার বয়েছে, সেটা তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। এ-ছেলের দেখছি সবদিকেই সমান নজর। বললুম, “তা হলে এখন ডিক্লেয়ার করাই ভাল।”

“নিশ্চয়। আজ ফোর্থ ডে। আর মাত্র একটা দিনের খেলা বাকি। অবশ্য কুড়িটা ম্যান্ডেটারি ওভার পাওয়া যাবে। কিন্তু তার মধ্যেই যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসটা মুড়িয়ে দিতে হবে, সেটা ভুলে গেলেই তো মুশকিল।”

“তা তো বটেই। তা হলে?”

ছেলেটি হেসে বলল, “অত ভাবনার কিছু নেই। গাভাসকর আর বেঙ্গসরকর খুব ভালই জানেন যে, এটা শুধু ওঁদের দুজনের খেলা নয়, গোটা দলের খেলা। দুজনেই টিম-ম্যান। দলের জন্যে ওঁরা যতটা করা যায় করেছেন, এখন দলের জন্যেই দানটা ওঁদের ছাড়তে হবে। তা ওঁরা ছেড়েও দেবেন।”

এ সব কথা যখন হচ্ছিল, চা-বিরতির পরের পর্যায়ের খেলা তখন আধ ঘন্টাটাক গড়িয়ে গেছে। আস্তে আস্তে কমে আসছে দিনের আলো। স্টেডিয়াম হবার আগেও এ মাঠে বিস্তর খেলা দেখেছি। মাঠের চারদিকে তখন মস্ত মস্ত গাছ ছিল। সূর্য একটু পশ্চিমে গড়িয়ে গেলেই মাঠের উপরে তার ছায়া পড়তে শুরু করত। মাথার মধ্যে তার স্মৃতি একটু-একটু নড়াচড়া করতে শুরু করেছিল। মাঝে-মাঝেই মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই আমলের সব মহারথীদের কথা। সি. কে. নাইডু, মুস্তাক আলি, মার্চেন্ট, হাজারে, কাকে খেলতে দেখিনি এই মাঠে?

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রের কথায় আমার চমক ভাঙল। “দেখুন, দেখুন, যা বলেছিলুম, তা-ই হল কি না। ইনংস ডিক্লেয়ার করে দেওয়া হল। খানিক বাদেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাঠে নামবে। এই শেষ বেলায় যদি কপিল ঝপাঝপ দুটো উইকেট নিয়ে নেন, তা হলে আর দেখতে হচ্ছে না, খেলাটা একেবারে হাতের মুঠোয় এসে গেল?”

কিন্তু দুটো কেন, একটা উইকেটও নেওয়া গেল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেকেন্ড ইনিংস যারা ওপেন করতে নেমেছিল, ছেলেটিই চিনিয়ে দিল তাদের। বাকাস আর মারে। এক উইকেটে তিনশো একষট্টি রান তুলে আমরা যখন আমাদের সেকেন্ড ইনিংস ডিক্লেয়ার করেছিলুম, গাভাসকরের রান তখন একশো বিরাশি, বেঙ্গসরকরের একশো সাতান্ন। দুজনেই নট আউট। কিন্তু বাকাস আর মারে সেই যে মাটি কামড়ে পড়ে রইল, কিছুতেই আর তাদের একজনকেও নড়ানো গেল না।

খেলা ভাঙতে আমরা মাঠ থেকে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে এলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, হাঁটতে-হাঁটতে এসপ্লানেড পর্যন্ত যাওয়া যাক। ওখান থেকে আপনি অফিসে ফিরবেন।”

“আর আপনারা?”

“আমরা একটা ট্যাক্সি নিয়ে বালিগঞ্জে চলে যাব। কালই আমরা বাঙ্গালোরে ফিরছি। এ যাত্রায় আর আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না।”

হাঁটতে-হাঁটতে অফিসে ফিরে এলুম। হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে, এতক্ষণ যে বাচ্চা ছেলেটির পাশে বসে খেলা দেখলুম, তার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করা হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *