চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১৪

ফিরতি পথে আমরা যে সিপাহিজলায় খানিকক্ষণ থেমে তারপর অগরতলায় যাব, আগেই সেটা বলে রাখা হয়েছিল। গাড়িতে উঠবার সময় বঙ্কুবাবু বললেন, “লাঞ্চ আমরা সিপাহিজলাতেই খেয়ে নেব। ঘন্টাখানেক ওখানে একটু বিশ্রাম করা যাবে।”

আসবার সময় পথের দু’দিকে খর নজর রেখেছিলুম, ফিরবার সময়ে তাই আর দৃশ্য-ট্রিশ্য দেখবার বিশেষ উৎসাহ ছিল না। তা ছাড়া মাঝ-রাত্তিরে ভাদুড়িমশাই কালও ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিলেন বলে এখন আবার চোখ দুটো যেন ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু নিজেও গাড়ি চালাই বলে এটা খুব ভালই জানি যে, ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে কখনও ঢুলতে নেই। ওটা বড় ছোঁয়াচে ব্যাপার, ওতে ড্রাইভারের চোখও ঘুমে জড়িয়ে আসতে থাকে। এই পাহাড়িয়া পথে তা যদি হয়, তবেই তো সর্বনাশ।

ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “গাড়িটা একটু থামাবেন?”

সামনের দিক থেকে চোখ না ফিরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন?”

“ওয়াটার-বল থেকে চোখে একটু ভাল করে জল ছিটিয়ে নেব।”

“ঘুম-ঘুম লাগছে নাকি?”

“হ্যাঁ।”

“তা বেশ তো, একটু ঘুমিয়ে নিন না।”

“আপনার গাড়ি চালাতে তাতে কোনও অসুবিধে হবে না তো?”

“কিছুমাত্র না।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমার অব্যেস আছে। শুধু একটা কাজ করুন। আপনার সিটটা তো অ্যাডজাস্টেবল, ঠেলে একটু পিছিয়ে দিন, তা হলে পা ছড়িয়ে ঘুমুতে পারবেন।”

দীপক আমার ঠিক পিছনেই বসে আছে। ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে সে বলল, “দাঁড়ান দাঁড়ান, আগে আমি একটু ডাইনে সরে বসি, তার পরে সিট অ্যাডজাস্ট করবেন, নইলে আমার হাঁটুতে চোট লাগবে।”

বললুম, “আরে ভাই, ভয় পেয়ো না, যেমন বসে আছি সেইভাবেই আমি ঘুমিয়ে নিতে পারবে। কাউকে নড়াচড়া করতে হবে না।”

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম জানি না। গাড়ি যে থেমে গেছে, তাও বুঝতে পারিনি। ভাদুড়িমশাইয়ের গলার আওয়াজে ঘুম ভাঙল। “নিন, এবারে উঠে পড়ুন।”

চোখ খুলে বললুম, “সিপাহিজলায় পৌঁছে গেছি?”

“বিলক্ষণ। চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক।”

ভিতরে ঢুকে দেখলুম, ড্রইংরুমে সবাই বসে আছেন। মিসেস ঘোষ বললেন, “এরা তো জানত আমরা আসব, তাই রান্না করে রেখেছে। আপনারা হাতমুখ ধুয়ে নিন, তারপরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসে যাব।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “ওহে চারু, আগরতলা থেকে শঙ্করও ফিরে এসেছে। এবারে নাকি কলকাতার লাইন পেতে অসুবিধে হয়নি। যাদের যাদের ফোন নাম্বার দিয়েছিলুম, সব্বাইকে খবর দিতে পেরেছে। ও নিয়ে আর কোনও চিন্তা কোরো না। তোমার ভগ্নিপতির মা’ও এখন অনেকটা ভাল আছেন।”

বললুম, “যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।”

গলা শুনে বঙ্কুবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ কিরণবাবু, আপনার জন্যে খবর আছে একটা। আপনার স্ত্রী জানিয়েছেন যে, এলাহাবাদ থেকে আপনার ছেলে অফিসের কাজে কলকাতায় এসেছে। তবে তাই বলেই যে আপনাকে এখুনি পড়িমরি করে আগরতলায় ছুটে আজ বিকেলের ফ্লাইট ধরতে হবে, তার কোনও মানে নেই। ছেলে এখন হপ্তাখানেক কলকাতায় থাকবে, তার আগে এলাহাবাদে ফিরবে না।”

বেয়ারা এসে খবর দিল, খাবার দেওয়া হয়েছে। মুখহাত ধুয়ে আমরা ডাইনিং হলে গিয়ে ঢুকলুম।

খেতে-খেতে কথা হচ্ছিল। এক ফাঁকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি একটা কথা ভাবছি বঙ্কু।”

“বলো।”

“তোমরা তো খেয়ে উঠে একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর আগরতলা রওনা হবে। তো আমি ভাবছিলুম যে, তোমরা বিশ্রাম নাও, সেই ফাঁকে আমি কিরণবাবুকে একবার কসবার কালীবাড়িটা দেখিয়ে দেব। …তারপর সেখান থেকে আগরতলার হোটেলে গিয়ে মিট করব তোমাদের সঙ্গে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “তা বেশ তো। কিরণবাবুর যখন কসবার কালীবাড়ি দেখা হয়নি, তখন দেখিয়ে দেওয়াই তো উচিত। কমলাসাগরটাও দেখে নিতে পারবেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমিও তা-ই ভাবছিলুম। অবশ্য একটা প্রবলেম হচ্ছে…”

“কেন, এতে আবার প্রবলেম কীসের?”

“না মানে আনরা যদি যাই তো দীপক আর রাজেশকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে ওদেরও বিশ্রাম নেওয়া হয় না।”

বঙ্কুবাবু হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “আরে দূর, ওরা ইয়াং ম্যান, ওদের আবার বিশ্রামের কী দরকার। না না, ও নিয়ে তুমি ভেবো না। আর তা ছাড়া, ওদের যে তোমার সঙ্গে যেতেই হবে, তাও নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে ওরা যাবে কী করে? তোমার অ্যাম্বাসাডারে তো অলরেডি পিছনে তিনজন সামনে দু’জন রয়েছে। আরও দুজনকে যে গাদাগাদি করে ওর মধ্যে ঢোকানো যায় না, তা নয়। বড় গাড়ি যখন, জায়গা হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু তাতে তোমাদের কষ্ট হবে। না না, তার দরকার নেই।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আমার গাড়িতে ঢোকাতে হবে কেন? শঙ্কর আর-একটা গড়ি নিয়ে এসেছে আগরতলা থেকে। মানে ভাড়া করতেও হয়নি। কলকাতায় ক’টা ফোন করবার জন্যে আগরতলায় আমার এক এজেন্টের বাড়িতে শঙ্কর গিয়েছিল তো, তা সে নিজের থেকেই শঙ্করকে দিয়ে গাড়িটা পাঠিয়ে দিল।”

“তবে তো কথাই নেই। দীপক আর রাজেশ তা হলে শঙ্করের গাড়িতে আগরতলায় যাক। ওরা সেক্ষেত্রে একটু বিশ্রামও নিতে পারবে। আমি আর কিরণবাবু মারুতিটা নিয়ে কসবার পথে রওয়া হয়ে পড়ি, কেমন?”

“স্বচ্ছন্দে।” বঙ্কুবাবু বললেন, “আগরতলায় আমরা কোন হোটেলে উঠব, তা তো তুমিই জানোই।”

খাওয়া শেষ হতেই আমরা কসবার পথে বেরিয়ে পড়লুম। পিছনের সিট এ-যাত্রায় ফাঁকা।

সিপাহিজলা থেকে কসবা মোটামুটি কাছেই। বড় রাস্তায় পড়ে বাঁ-দিকে টার্ন নিলেন ভাদুড়িমশাই। তারপরেই দাঁতে জিব ঠেকিয়ে আক্ষেপের একটা শব্দ করে বললেন, “যাচ্চলে!”

বললুম, “কী হল?”

“বড্ড ক্ষতি হয়ে গেল! এবারেও আপনার চশমা পরা বাঁদর দেখা হল না! সিপাহিজলায় আবার যখন আাসতেই হল, স্বচ্ছন্দে একবার চিড়িয়াখানাটা আপনাকে ঘুরিয়ে আনা যেত।”

বললুম, “কিসসু ক্ষতি হয়নি। চশমা পরা বাঁদর দেখবার জন্যে চিড়িয়াখানায় যেতে হবে কেন, সে তো কলকাতা, দিল্লি, মাদ্রাজ, বোম্বাই, কোনওখানেই কিছু কম দেখি না।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তা বটে!”

যে-রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলুম আমরা, সেটা বিশেষ চওড়া নয়। তবে একে তো খানাখন্দ নেই, তার উপরে উলটো-দিক থেকে বাস কি ট্রাক খুব-একটা আসছিল না বলে গাড়ি চালাতে তেমন কিছু অসুবিধেও হচ্ছিল না। মাঝে-মাঝে দু-একটা ছোটখাটো টিলা আমাদের চোখ পড়ছিল। রাস্তাটা একেবারে ভারত-বাংলাদেশের বর্ডার ঘেঁষে তৈরি হয়েছে। টিলাটা যদি ভারতবর্ষের মধ্যে, তো তার নীচেই বাংলাদেশের ধানখেত।

বললুম, “ওদিককার লোক তো স্বচ্ছন্দেই এদিকে চলে আসতে পারে, মশাই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসেও। এদিকে একটা মস্ত হাট বসে। তো প্রতি হাটবারে ওদিককার লোক দলে-দলে মুরগি, মাছ আর আনাজপত্র নিয়ে এদিকে চলে আসে; তারপর সে-সব বিক্রি করে যা পাওয়া।গল তাই দিয়ে দরকারি দু-একটা জিনিস… এই ধরুন ওষুধ কি জামাকাপড় কিনে নিয়ে আবার দলে-দলে ওদিকে ফিরেও যায়।”

বললুম, “শঙ্করও তা-ই বলছিল বটে। কিন্তু এ তো ঘোর বেআইনি ব্যাপার। পাসপোর্ট, ভিসা, এসব তবে কেন হয়েছে?”

“ও-সব বড়লোকদের জন্যে হয়েছে। গরিবেরা ও-সবের ধার ধারে না।”

কথা বলতে-লতে আমরা কমলাসাগরে পৌঁছে গিয়েছিলুম। মস্ত দিঘি। পাড়ে ছোটখাটো কয়েকটা চা-পান-মিষ্টির দোকান। খানিক এগিয়ে চওড়া শান-বাঁধানো সিঁড়ি। তার ধাপগুলিতে পা ফেলে-ফেলে কালীবাড়ির চাতালে উঠে যেতে হয়। একটা দোকানে দু-গ্লাস চায়ের কথা বলে দিয়ে আমরা দিঘির ধারের গাছতলায় গিয়ে দাঁড়ালুম। দিঘির ওদিকে খানিকটা উঁচু জমি। তারপরেই সেই জমি হঠাৎ নীচে নেমে গিয়েছে। শুরু হয়েছে ধু-ধু ধানখেত। ভাদুড়িমশাই আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে ধানখেত দেখছেন, ওটা বাংলাদেশের মধ্যে।”

বললুম, “বর্ডার পাহারা দেবার ব্যবস্থা নেই?”

“আছে বই কী। কি গোটা বর্ডার পাহারা দিতে হলে পাঁচ ফুট অন্তর-অন্তর সেপাই দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। তা কি সম্ভব? তার উপরে ভাবুন, আমাদের বর্ডার কি শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে? নেপাল রয়েছে, পাকিস্থান রয়েছে, চিন রয়েছে—কত পাহারা দেবেন?”

“অর্থাৎ রাত্তিরবেলায় আমি যদি এখানে আসি, আর বর্ডার টপকে নেমে যাই ওই ধানখেতের মধ্যে, কেউ আমাকে বাধা দেবে না?”

“রাত্তিরে নামবার দরকার কী,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এখন এই দিনের বেলাতেই নেমে দেখতে পারেন, কেউ আপনাকে বাধা দেবে না।”

বাধা দেবার মতো সত্যিই কেউ নেই। না এদিকে, না ওদিকে। বললুম, “এতে তো স্মাগলারদের মস্ত সুবিধে।”

“তা তো বটেই। রাত্তিরের অন্ধকারে আসিও পাচার হয়ে আসতে পারে। তাতেই বা বাধা দিচ্ছে কে? আপনি শুধু এই বর্ডার দেখছেন। পঞ্জাবে যান, কাশ্মীরে যান, সর্বত্র. আর্মস আসছে সীমান্ত পেরিয়ে। গাদা বন্দুক নয়, সফিসটিকেটেড মানে আর্মস। চিনা, মার্কিন, কোনও কিছুরই অভাব নেই। এক্সট্রিমিস্টদের কোমরের জোরটা কারা জোগাচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারেন না?”

বললুম, “আর বুঝে দরকার নেই। চলুন, কালীবাড়ি থেকে ঘুরে আসি।”

চায়ের দোকানের একটি বাচ্চা ছেলে ইতিমধ্যে দু-গেলাস চা দিয়ে গিয়েছিল। দিঘির ধারে একটা।।ছতলায় বসে চা খাওয়া হল, তারপর চায়ের দাম মিটিয়ে আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলুম কালীবাড়ির চাতালে।

কালীমূর্তিটি শুনলুম বাংলাদেশ থেখে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেও অবশ্য হালের ব্যাপার নয়, অনেক কাল আগের ঘটনা। জায়গাটা মনোরম। বেশ নিরিবিলিও বটে। খানিকক্ষণ সেখানে কাঠিয়ে আমরা আবার গাড়িতে এসে উঠলুম।

খানিকটা এগোবার পরে জিজ্ঞেস করলুম, “রাত্তিরে যে বঙ্কুবাবুকে হোটেলে আমাদের ঘরে আসতে বললেন, তখন কি সেখানে আমার থাকা উচিত হবে?”

“নিশ্চয় হবে।” ভাদুড়িমশাই আমার দিকে মুখ না-ফিরিয়ে হেসে বললেন, “আমি চাইছি আপনি থাকুন। আসলে, ওর সঙ্গে আমার যে কথা হবে, আপনার সেটা শোনা দরকার।”

“কেন?”

“বা রে, আমিও বুড়ো হচ্ছি না? ওকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। উত্তরে ও যা বলবে, তারই মধ্যে থেকে হয়তো বেরিয়ে আসতে পারে এমন দু’একটা কথা, যা কিনা খুবই ভাইটাল। আমি হয়তো সেটা মিস্ করে যেতে পারি। আপনি একটু খেয়াল রাখবেন।”

এবারে আমার হাসবার পালা। বললুম, “ভাইটাল কথাটা আপনি মিস করে যাবেন আর আমি ধরে রাখতে পারব? খুব বিনয়ী হয়েছেন দেখছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা নতুন কিছু নয়, বরাবরই আমি বিনয়ী। আপনারা সেটা নেঝেন না। ভাবেন যে, লোকটা নেহাত খারাপ নয়, তবে কিনা বড্ডই দাম্ভিক। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। কিন্তু সে-কথা থাক, আর কোনও প্রশ্ন করবেন?”

“কী নিয়ে বঙ্কুবাবুর সঙ্গে কথা বলবেন?”

“সে তো আপনার সামনেই আমি বঙ্কুকে বললুম। যে ব্যাপারে ও এ মার সাহায্যে চেয়েছে, তাই নিয়ে।”

“অর্থাৎ রামুর প্রোটেকশন নিয়ে?”

“হ্যাঁ। কিন্তু এখানে থেকে যে সেটা কী করে দেব, বুঝে উঠতে পারছি না ….বাস্, ‘এ নিয়ে এখন আর কোনও প্রশ্ন নয়। ইউ মে আস্ক মি ইয়োর নেকসট কোয়েশ্চেন।”

“আপাতত আর-কোনও প্রশ্ন নেই।”

“সে কী, রানিমহলে ওই যে লোকটাকে আমরা অধো-অন্ধকারের মধ্যে পিছন থেকে দেখতে পেলুম, সে কে, আর রাত্তিরে ওখানে সে কী করছিল, তাও জিজ্ঞেস করবেন না?”

লজ্জিত হয়ে বললুম, “ও হ্যাঁ, ওটা তো ভুলেই গিয়েছিলুম। তা…”

ভাদুড়িমশাই আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, “থাক্, থাক্, আপনাকে আর পশ্ন করতে হবে না! তবে কিনা এইজন্যেই বলছিলুম যে, আপনার বিস্মরণশক্তি ইদানীং অনেক বেড়ে গেছে।”

“তা তো বেড়ে গেছে। কিন্তু লোকটা কে?”

“রাজেশ।”

“অ্যাঁ! এলেন কী? রাজেশ ওখানে কী করছিল?”

“ছবি তুলছিল।”

“ছবি তুলছিল শেষরাতের অন্ধকারে?”

“কেন, অন্ধকারে কি ছবি তোলা যায় না? ফ্ল্যাশ তা হলে কী করতে আছে?”

“তা বুঝলুম, কিন্তু দিনের বেলাতেও তো আমাদের সঙ্গে রাজেশ ওখানে গিয়েছিল। তখন ছবি না-তুলে শেষরাতে যাবার দরকার হল কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দিনের বেলায় যে ছবি তোলেনি, তা নয়, তবে তার সবই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। তখন নাকি কালার ফিল্ম নিতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে আবার যেতে হয়।”

“আপনাকে এই কথা বলছে?”

“না বললে আমি জানব কী করে?”

“আপনি বিশ্বাসও করেছেন?”

“না-করবার কোনও কারণ অন্তত এখনও খুঁজে পাইনি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমার তো রাত থাকতে ঘুম ভেঙে যায়, সেই সময় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, নীরমহলে পরপর কয়েকবার আলো জ্বলে উঠল। খুব উজ্জ্বল আলো। তখনই আন্দাজ করেছিলুম যে, কেউ নিশ্চয় ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তুলছে। … তবে হ্যাঁ, ভিজে জামাকাপড় কি তোয়ালের সন্ধানে আজ সকালে একবার ওদের ঘরে ঢুকেছিলুম তো, তখন আর-একটা জিনিস আমার চোখে পড়ে যায়।”

“কী?”

“একটা পিস্তল। টেবিলের টানার মধ্যে ছিল। …কী হল, কথা বলছেন না যে? ঘাবড়ে গেলেন নাকি?”

বললুম, “ঘাবড়ে যাবারই তো কথা। তা পিস্তলটা কার?”

“কী করে বলব? রাজেশেরও হতে পারে, দীপকেরও হতে পারে। …কিন্তু ও নিয়ে এখন ভেবে কিছু লাভ নেই। তার বদলে আপনি একটা কাছ করুন দেখি। আমার হ্যান্ডব্যাগটা তো পিছনের সিটে রয়েছে। হাত বাড়িয়ে ওটা সামনে নিয়ে আসুন।”

ভাদুড়িমশাইয়ের হ্যান্ডব্যাগটা সামনের সিটে নিয়ে এসে আমার কোলের উপরে রেখে বললুম, “এবার কী করব? কিছু বার করতে হবে?”

“হ্যাঁ, ওর মধ্যে একটা ফাইল রয়েছে, সেটা বার করুন। দেখবেন, লক্ষ্মণের নিরুদ্দেশ হবার বিজ্ঞাপন যে ক’টা কাগজে বেরিয়েছিল, তার সবগুলিরই ক্লিপিং রয়েছে ওখানে। যে বিজ্ঞাপনে লক্ষ্মণের ছবিটা সবচেয়ে পরিস্কার ছাপা হয়েছে, সেটা দেখুন।…না না, দায়সারাভাবে দেখলে হবে না, বেশ ভাল করে দেখতে হবে।”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শেষ হবার আগেই ফ্ল্যাট ফাইলে রাখা বিজ্ঞাপনের কাটিংগুলোর উপরে আমি চোখ বুলোতে শুরু করেছিলুম। মনে হল, কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকাতেই ছবিটা সবচেয়ে পরিষ্কার ছাপা হয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা দেখেও কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারলুম না।

বললুম, “কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কী ব্যাপার বলুন তো?”

“কিচ্ছু মনে পড়ছে না?”

“কই, না তো।”

“ইডেন গার্ডেন। বারো বছর আগে। নাইনটিন সেভেনটিনাইন। তাও মনে পড়ছে না? …ভাবুন, ভাবুন।”

“ভাবছি তো, কিন্তু আপনার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই ধরতে পারছি না।”

“বেশ, তা হলে আরও কয়েকটা ক্লু দিচ্ছি। ক্রিকেট-টেস্ট, বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আমরা ক্লাব-হাউসে বসে খেলা দেখছিলুম… একটা বছর দশ-বারোর ছেলে আমাদের পাশে বসে…”

হঠাৎ যেন একটা পর্দা সরে গেল আমার চোখের সামনে থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *