চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১৩
ব্রেকফাস্ট টেবিলে বঙ্কুবাবু বললেন, “চারু, খানিক বাদেই তো আমরা রওনা হচ্ছি, তবে আজকের ফ্লাইটে কলকাতায়, ফিরব না। আজ আমাদের আগরতলায় থাকতে হবে। কলকাতায় ফিরব কাল বিকেলের ফ্লাইটে। তোমার কিংবা কিরণবাবুর তাতে কোনও অসুিবধে নেই তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। কিরণবাবুকে নিয়েও ভাববার কিছু নেই; বাড়তি এক-আধ দিন যে থাকতে হতে পারে, তা আমি ওঁকে বলেই রেখেছি।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “ধন্যবাদ। আপনার কাছে আমার অনেক ঋণ জমা হয়ে রইল।”
কথাগুলি অবশ্যই আমার উদ্দেশে বললেন, কিন্তু আমি যেহেতু এতক্ষণ কোনও কথা বলিনি, তাই বঙ্কুবাবু বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে, ব্রেকফাস্ট টেবিলের ঠিক কোনখানে আমি বসে আছি। ধন্যবাদটা তাই খানিকটা স্বগতোক্তির মতো শোনাল।
আমি বললুম, “একটা দিন বাড়তি যদি আগরতলায় থাকি, তাতে আমার সুবিধেই হবে। আর-কিছু না হোক, স্টোরিটা কোত্থেকে কীভাবে শুরু হবে, সেটা অন্তত ভেবে নিতে পারব। বাট অফ কোর্স ইট উইল বি ডান্ অন দ্য বেসিস অব দ্য প্লট দ্যাট আই হ্যাভ রিসিভড ফ্রম মিসেস ঘোষ।”
মিসেস ঘোষ বললেন, “আমার একটা আবদার আছে কিন্তু। সেটা আপনাকে রাখতে হবে।”
“বলুন।”
“ছবির টাইটেলে গল্পের ক্রেডিট-লাইনটা কিন্তু আমাকেই দিতে হবে।”
বললুম, “বিলক্ষণ। গল্প তো আপনারই, আমি সেটা লিখে দিচ্ছি বই তো নয়।”
মিসেস ঘোষ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বললেন, “বাস্, তা হলে ওই কথাই রইল। আমি এখন ঘরে চললুম। একটু বাদেই তো রওনা হচ্ছি, তৈরি হয়ে নিতে হবে।”
রাজেশ, দীপক আর রামুও ডাইনিং হল থেকে নিজেদের ঘরে চলে গেল।
বঙ্কুবাবু ঘরে যাবেন বলে পীতাম্বরকে ডাকতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু বোসো, বঙ্কু। দু-একটা কথা আছে। তুমি কি আজ আমাকে ঘন্টা খানেক সময় দিতে পারবে? কয়েকটা প্রশ্ন ছিল। …না না, ঘরে এখন কেউ নেই। যা বলবার, স্বচ্ছন্দে বলতে পারো।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “প্রশ্নগুলো কী নিয়ে?”
“যে জন্যে তুমি আমার সাহায্য চাও, তাই নিয়ে। একটু ডিটেলসে তোমার সঙ্গে কথা বলা দরকার।”
“সেটা কি এখন সম্ভব? একটু বাদেই তো আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।”
“ঠিকই বলেছ, এখানে সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যাপারটাকে আর পিছিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আগরতলায় আমরা কোথায় থাকব?”
“হোটেলে। সেখানে পাঁচটা ঘর নিয়ে রাখা হয়েছে।”
“চমৎকার। সেখানে কোনও একটা সময়ে কোনও একটা অজুহাত দেখিয়ে আমাদের ঘরে তোমাকে চলে আসতে হবে।”
“কী অজুহাত দেখাব?”
“বলবে যে, ডিরেকশান আর স্ক্রিপ্ট-রাইটিংয়ের পেমেন্ট নিয়ে আমাদের সঙ্গে তোমার দু-একটা কথা বলা দরকার।”
“ঠিক আছে।” বঙ্কুবাবু বললেন, “কিন্তু একটা কথা সত্যি করে বলো। রামুর বোনও বিপদ ঘটবার আশঙ্কা নেই তো?”
“ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, ওর জন্যে তো ‘মামিই আছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে ওই কথাই রইল। …দাঁড়াও, নিজে উঠবার চেষ্টা কোরো না, পীতাম্বরকে ডেকে দিচ্ছি।”
পীতাম্বর ঘরের বাইরেই অপেক্ষা করছিল। ডাকবামাত্র সামনে চলে এল।।
ঘরে এসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোনও কাজ কি বাকি পড়ে আছে?”
চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললুম, “না। স্নান-টান সবই তো করে নিয়েছি। হ্যান্ডব্যাগে যা-কিছু ঢোকাবার ছিল, তাও ঢোকানো হয়ে গেছে।”
“অর্থাৎ আপনি রেডি?”
“একদম রেডি।”
“তা হলে শুয়ে পড়ুন।”
“বেরিয়ে পড়তে হবে না?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনার পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতাও দেখছি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।”
“তার মানে?”
“মানে আর কিছুই নয়, মিসেস ঘোষ যে প্রসাধন-পর্ব না-সেরেই আজ ব্রেকফাস্ট টেবিলে চলে গিয়েছিলেন, সেটাই আপনি খেয়াল করে দেখেননি। তাঁর মেক-আপ শেষ হতে অন্তত আধ ঘন্টা লাগবে। বঙ্কুদের ঘরের দরজা তো হাট করে খোলাই ছিল। আসবার সময় এটাও আপনার চোখে পড়তে পারত যে, সবকিছু সেখানে ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। সে-সব গোছগাছ করে নিতে তা ধরুন আরও আধঘন্টা তো লাগবেই। সব মিলিয়ে কী দাঁড়াল?”
“এক ঘন্টা।”
“এখন ন’টা বাজে। তার সঙ্গে এক ঘন্টা যোগ করলে হয় দশটা। কিরণবাবু, আপনি লম্বা হোন, দশটার আগে আমরা এখান থেকে রওয়া হচ্ছি না।”
শুয়ে পড়ে বললুম, “যা, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, আমি আপনাকে শুয়ে পড়তে বলেছি ঠিকই, কিন্তু তাই বলে যেন নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়বেন না। বরং শুয়ে-শুয়ে একটু চিন্তা করুন।”
“কী নিয়ে চিন্তা করব? মিসেস ঘোষের ওই কিম্ভূত প্লটটা কীভাবে ডেভেলাপ করব, তাই নিয়ে?”
“ও নিয়ে চিন্তার কী আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যেভাবে প্রাণ চায়, ডেভেলাপ করুন। ড্রিম সিকোয়েন্সের মধ্যে যখন একবার মহাদেবের আবির্ভাব হয়েছে, তখন আর তাঁকে নেহাত স্বপ্নের মধ্যে আটকে রাখবেন না। তাঁকে বাস্তবে নিয়ে আসুন। দেখিয়ে দিন যে, বড়লোকটার লেঠেলরা যখন হিরোকে ধরে পেটাচ্ছে, তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে হিরোইন খুব করুণ গলায় একটা গান গাইতে লাগল। তা প্লে-ব্যাকে লতা মঙ্গেশকর গাইবে তো, মহাদেব তাই আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারলেন না। কৈলাস থেকে নেমে এসে তিনি লতার গানের সঙ্গে তাল রেখে তান্ডব নাচতে লাগলেন আর ত্রিশূল দিয়ে সমানে সেই লেঠেলগুলোকে বেধড়ক পেটাতে লাগলেন।”
বললুম, “আর ইউ সিরিয়াস?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে দূর মশাই, আপনিও যেমন! মিসেস ঘোষের কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছেন, বেশ করছেন, তাই বলে কি ওই রদ্দি প্লটের উপরে কোনও ছবি হয় নাকি? হয় না। আপনাকেও অতএব ওর উপরে স্টোরি-ফোরি লিখতে হবে না। তার বদলে একটা কথার জবাব দিন দেখি।”
“বলুন।”
“দীপককে আপনার কেমন লাগছে?”
“খারাপ কেন লাগবে। একটু সিনেমা-পাগ্লা আছে ঠিকই, তবে কিনা যা ব্যাকগ্রাউন্ড আর যা বয়েস, তাতে সেটাই তো স্বাভাবিক। দীপকের একটা কথা শুনলে অবশ্য হাসি পেয়ে যায়।”
“কোন্ কথাটা? ভাঞ্জা?”
“ঠিক ধরেছেন। যখনই ও রামুকে ভাঞ্জা বলে, তখনই আমার টিভি-সিরিয়ালের মহাভারতের কথা মনে পড়ে যায়। শকুনির ভুমিকায় গুপি পেন্টালের মুখখানাও তক্ষুনি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কী বলব মশাই, অনেক কষ্টে তখন হাসি চেপে রাখতে হয়।”
“ভাগ্নেকে ভাঞ্জা বলবে, তাতে হাসির কী আছে। ওটা বাদ দিন, এমনিতে ওকে আপনার কেমন লাগে?”
“বললুমই তো। খারাপ লাগে না।”
“টাকার জন্যে ও কাউকে খুন করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”
চমকে উঠে বললুম, “খুন? কাকে খুন করবে?”
“ধরা যাক রামুকে।”
“কেন, রামুকে ও খুন করবে কেন?”
“নাঃ, শুধু যে আপনার মেমারির ধার আর পাওয়ার অব অবজারভেশান কমে গেছে, তা নয়, কিরণবাবু, আপনার বুদ্ধিও আগের তুলনায় অনেক ভোঁতা হয়ে গেছে দেখছি।”
বুঝলুম, প্রতিবাদ করে কোনও লাভ হবে না। তা ছাড়া, কথাটা যে একেবারে মিথ্যে, তাও হয়তো নয়। অন্তত বাসন্তী এই কথাটা আজকাল প্রায়ই বলে। তাই মিনমিন করে বললুম, “আমার কথা ছাড়ুন। দীপক যে রামুকে খুন করতে পারে, এই কথাটা আপনার কেন মনে হচ্ছে?”
“আমার যে অমন কথা মনে হচ্ছে তা কিন্তু আমি বলিনি। আমি শুধু একটা সম্ভাবনার কথা ভেবে দেখছিলুম।”
“ঠিক আছে, ধরে নেওয়া গেল যে, দীপক রামুকে খুন করতে পারে। অন্তত এমন একটা সম্ভাবনার কথাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু একটা মোটিভ থাকা চাই তো। সেটা কী?”
“মোটিভ অনেক-কিছুই হতে পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার মধ্যে যেটা অভিয়াস, সেটার কথাই ভাবা যাক। আপনাকে যা বলেছি, তার থেকে আপনি নিশ্চয় বুঝেছেন যে, বঙ্কু এখন কোটি-কোটি টাকার মালিক।”
“তা বুঝেছি।”
“ভাল। এখন এটাও আপনি স্বচক্ষে দেখছেন যে, বঙ্কুর শরীর মোটেই ভাল যাচ্ছে না। একে তো ও চোখে খুবই কম দেখতে পায়, তার উপরে ওর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে।”
“হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পাচ্ছি।”
“চমৎকার। তো বঙ্কু যদি এখন মারা যায়, তা হলে সেই কোটি-কোটি টাকা কে পাবে?”
বললুম, “এ কি একটা প্রশ্ন হল নাকি? বঙ্কুবাবু যদি অন্যরকম কোনও উইল না করে মারা যান, তা হলে টাকাটা পাবেন মিসেস ঘোষ আর বঙ্কুবাবুর দুই ছেলে।”
“বাঃ, ঠিক বলেছেন। কিন্তু বঙ্কুর ছোট ছেলে যে নিরুদ্দেশ, সেটা ভুলে যাবেন না। সে যদি আর ফিরে না আসে, তা হলে? টাকাটা তখন বঙ্কুর বউ আর বড় ছেলে পাচ্ছে। তাই না?”
“তা বটে।”
“এবারে বড় ছেলেটাকেও যদি সরিয়ে দেওয়া যায়?”
“ওরেব্বাবা, তা হলে তো সব টাকাটাই মিসেস ঘোষের হাতে এসে যায়।”
“কিন্তু মিসেস ঘোষের নিজের কোনও ছেলেপুলে নেই। বঙ্কুর তাবং টাকা তাঁর হাতে এসে গেলে অতএব শেষ পর্যন্ত কার লাভ হচ্ছে?”
আমার মুখ দিয়ে যেন কোনও কথাই সরছিল না। অনেক কষ্টে বললুম, “এটা তো ভেবে দেখিনি। সেইজন্যেই কি দীপক রামুকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছে?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কে বলল যে, সে রামুকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছে? আমি কিন্তু অমন কথা একবারও বলিনি।”
“ঠিক আছে, আপনি কিছু বলেননি, আমি বলেছি। কিন্তু এর মধ্যে কি রাজেশেরও হাত রয়েছে?”
“যাচ্চলে, কোথায় আমি প্রশ্ন করব, আপনি জবাব দেবেন, তা নয়, আপনিই দেখছি আমাকে জেরা করতে শুরু করলেন। রাজেশের কথা আপাতত ভুলে যান। বলুন, দীপককে আপনার কেমন লাগে? বেশ ভাল করে ভেবেচিন্তে বলুন।”
“ভালই তো লাগত।”
“পাস্ট টেন্স কেন? এখন কি আর তত ভাল লাগছে না?”
“না মানে…” আমতা-আমতা করে বললুম, “কাল মাঝরাত্তিরে সত্যি ও কি সাঁতার কাটতে দিঘিতে নামেনি?”
“বলল তো নেমেছিল, কিন্তু ঘরে কিংবা বাথরুমে তো ভিজে কিছুই দেখলুম না। এমনকী, তোয়ালেটা পর্যন্ত শুকনো। নাঃ, ব্যাপারটা সত্যি ভাবিয়ে তুলল! এক হতে পারে…”
কী হতে পারে, সেটা আর শোনা হল না। ভেজানো দরজায় টোকা দিয়ে পীতাম্বর এসে ঘরে ঢুকল। বলল, “সবাই রেডি। আপনাদের আসতে বললেন।”
