ব্যাকরণ রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এক
“ছাগলে কী না বলে, পাগলে কী না খায়!” বাঁকা মুখে কথাটি বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে, কে, হালদার, আমাদের প্রিয় হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিলেন।
হাসি চেপে বললুম, “একটু ভুল হল হালদারমশাই!”
গোয়েন্দা-ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে চার্জ করলেন, “কী ভুল? যতসব পাগল-ছাগলের কারবার!”
“সে-বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমি একমত।”
“তা হলে?”
“কথাটা উলটে গেছে। ওটা হবে, পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়।”
গোয়েন্দামশাই এবার তাঁর অনবদ্য ফ্যা’ শব্দটি বের করলেন। অর্থাৎ হাসলেন। “তাই বটে। তবে আমার রাগ হচ্ছিল, বুঝলেন? ভদ্রলোকের মাথার গণ্ডগোল আছে। খামোকা কর্নেল-স্যারের মূল্যবান সময়ের অপচয় করে তো গেলেনই, উপরন্তু আমারও ক্ষতি করলেন।” বলে নিজের কাঁচা-পাকা চুল খামচে ধরলেন। মুখে আঁকুপাঁকু ভাব।
আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার প্রকাণ্ড একটা বইয়ের পাতা খুলে মনোযোগী ছাত্রের মতো কী সব নোট করছিলেন। দাঁতে কামড়ে-ধরা চুরুট। সেটি নিবে গেছে বলেই আমার ধারণা। তবে ওঁর সাদা সান্তাক্লজ সদৃশ দাড়িতে একটু ছাই আটকে আছে এবং সকালের রোদ্দুরের ছটায় চওড়া টাক ঝকমক করছে। মুখ না তুলেই বললেন, “হালদারমশাই যা বলতে এসেছিলেন, আশা করি সেটা ভুলে গেছেন।”
বিমর্ষ মুখে হালদারমশাই শুধু বললেন, “হঃ।”
“মাথার ভেতর পাগল আর ছাগল যুদ্ধ করছে,– বলে কর্নেল এবার মুখ তুলে মিটিমিটি হাসলেন। “তবে জয়ন্ত যা বলল, ঠিক নয়। হালদারমশাই ঠিকই বলেছেন, ছাগলে কী না বলে, পাগলে কী না খায়।”
অবাক হয়ে বললুম, “কী বলছেন! কথাটা একটা বাংলা প্রবচন। তাকে উলটে দিচ্ছেন আপনি?”
কর্নেল আমাকে পাত্তা না দিয়ে বললেন, “আসলে হালদারমশাইয়ের বলতে আসা কথাটা এক্ষেত্রে পাগলেই খেয়ে ফেলেছে।”
বই বন্ধ করে রেখে প্রকৃতিবিদ উঠে দাঁড়ালেন। সাদা দাড়ি থেকে ছাইয়ের টুকরোটি খসে পড়ল। আমাদের কাছে এসে বসলেন। তারপর নিবে-যাওয়া চুরুটটি লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে নিলেন এবং একরাশ ধোঁয়ার ভেতর ফের বললেন, “ছাগলে কী না খায়, এটা একেবারে বাজে কথা। ছাগলের যা খাদ্য, তাই ছাগল খায়। কিন্তু সেই ছাগল যখন মানুষের ভাষায় আবোল-তাবোল বলে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন…”
কর্নেলের কথার ওপর বললুম, “আপনি ভদ্রলোকের কথা বিশ্বাস করেছেন দেখছি।”
“হুঁউ, করেছি।” হতভম্ব হয়ে বললুম, “কী আশ্চর্য! ছাগল শুধু ব্যা করে শুনেছি।”
“ব্যাকরণ রহস্য ডার্লিং! ব্যাকরণ রহস্যও বলতে পারো।”
“কী বলছেন! ওঁর হাবভাব কথাবার্তা শুনেও ওঁকে বদ্ধ পাগল মনে হল না আপনার?”
কর্নেল হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে চোখ বুজলেন। আপনমনে বলতে থাকলেন, “ছাগলটা কালো। কালো যা কিছু, মানুষের কাছে তাই অশুভ। কারণ কালো রং অন্ধকারের প্রতীক। অন্ধকারে মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে। তা ছাড়া কালোর সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক আছে ধরে নিয়েই যেন কালো শোকবস্ত্র পরার প্রথা..হঁ, বিজ্ঞানীরাও এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত নন। ব্ল্যাক হোল’ কথাটিতে সেটা স্পষ্ট। নক্ষত্রের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত এই টার্ম। …যাই হোক, কালো ছাগলটা আবার কিনা একটা পোডড়াবাড়ির ভাঙা দেউড়ির মাথায় চড়ে ঘাস-পাতা খায় এবং অদ্ভুত একটা কথা বলে নিপাত্তা হয়ে যায়!”
হালদারমশাই কান দুটো খাড়া করে ওঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। তাকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে বললুম, “আপনি ওই ভদ্রলোকের চেয়ে আরও পাগল!”
“উঁহু, পাগল নয় ডার্লিং, ছাগল,– কর্নেল চোখ খুলে বললেন। এবার মুখটা গম্ভীর। “মুরারিবাবু, মুরারিমোহন ধাড়া স্পষ্ট শুনেছেন ছাগলটা তাকে কিছু বলছে। একদিন নয়, তিন দিন,– বলে কর্নেল তিনটে আঙুল দেখালেন।
অমনি হালদারমশাই সশব্দে শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন, “মনে পড়েছে! মনে পড়েছে!” জিজ্ঞেস করলুম, “কী হালদারমশাই?” হালদারমশাই ছটফটিয়ে বললেন, “ওই যে কর্নেল-স্যার তিনখান ফিঙার দ্যাখাইলেন, লগে-লগে কথাখান আইয়া পড়ল।”
কর্নেল বললেন, “ত্রিশূল?”
প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভীষণ হকচকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমিও একটু অবাক। বললুম, “থট-রিডিং, নাকি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছেন?”
ধুরন্ধর প্রকৃতিবিদ বললেন, “তোমার এই একটা অদ্ভুত স্বভাব জয়ন্ত! তুমি কাগজের খবর লেখো, কিন্তু খবর পড়ো না। ময়রা নাকি সন্দেশ খায় না। যাই হোক, হালদারমশাই, জয়ন্তদের ‘দৈনিক সত্যসেবক’ পত্রিকায় আজ যে ভয়ঙ্কর ত্রিশূলের খবর বেরিয়েছে, তার সঙ্গে একটু আগে মুরারিবাবুর আবির্ভাবের সম্পর্ক আছে। না, থট-রিডিং নয়, নিছক অঙ্ক। খবরটার ডেটলাইন হল রূপগঞ্জ। আর মুরারিবাবুর বাড়িও রূপগঞ্জে।”
হালদারমশাই বললেন, “কিন্তু ভদ্রলোক তো ত্রিশূলের ব্যাপারটা বললেন না?”
আমিও বললুম, “শুধু ছাগল-টাগল নিয়েই বকবক করে গেলেন।” কর্নেল একটু হেসে বললেন, “বেশি উত্তেজনা অনেক প্রাসঙ্গিক কথা ভুলিয়ে দেয়। তা ছাড়া ভদ্রলোক পাগল না হলেও একটু ছিটগ্রস্ত, তাতে সন্দেহ নেই। তবে..হ্যাঁ, উনি ফিরে আসছেন। সিঁড়িতে ভীষণ পায়ের শব্দ আর লিন্ডাদের কুকুরটা আবার চেঁচাচ্ছে! যে কারণেই হোক, কুকুরটা ওঁকে পছন্দ করছে না।” বলে হাঁক ছাড়লেন, “ষষ্ঠী, দরজা খুলে দে।”
কলিং বেল বাজল। বাজল বলা ঠিক হচ্ছে না, বাজতে লাগল। বিরক্তিকর! গ্রামগঞ্জের মানুষ বলে নয়, ছিটগ্রস্ততাও বিশ্বাস করি না, বদ্ধ পাগল! কলিং বেল একবার বাজানোই তো যথেষ্ট। যেন কারা তাড়া করেছে কাউকে এবং সে মরিয়া হয়ে কলিং বেলের বোম টিপে চলেছে। ষষ্ঠীচরণ ছোট্ট ওয়েটিং-রুমের ভেতর বাঁকা মুখে বিড়বিড় করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে দেখতে পেলুম। বাইরের লোক এলে ওখানেই বসিয়ে রেখে সে কর্নেল-বাবামশাই’কে খবর দেয়। আমরা যে বিশাল ঘরটাতে বসে আছি, এটা ড্রইংরুম, তবে জাদুঘর বা প্রশালা-পাঠাগার-গবেষণাগার এসবের একটা বিচিত্র জগাখিচুড়ি।
হ্যাঁ, তিনিই বটে। হুড়মুড় করে পরদা ফুঁড়ে ঢুকেই হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন, “আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি।”
কর্নেল বললেন, “ত্রিশূল?”
ভদ্রলোক বললেন, “ত্রিশূল।” তারপর অদ্ভুত খাক শব্দে কষ্টকর হাসি হাসলেন। এমন বিদঘুঁটে হাসি মানুষের মুখে কখনও শুনিনি।
হালদারমশাইয়ের ফ্যাচটা হাসিই বটে। এই ‘খ্যাঁক’-টা দাঁত খিঁচুনি।
কর্নেল বললেন, “আপনি বসুন মুরারিবাবু।”
“বসব না। ট্রেন ফেল হয়ে যাবে। তবে আপনি স্যার, সত্যিই অন্তর্যামী! নকুলদার কথা বর্ণে-বর্ণে মিলে গেল এতক্ষণে। নকুলদার চেনাজানা ছিলেন বঙ্কুবাবু…বন্ধুবিহারী ধাড়া স্যার…সম্পর্কে আমার জ্যাঠাকমশাই হন। ব্রিটিশ আমলে অমন ডাকসাইটে দারোগা আর দুটি ছিল না। তার কাছে নকুলদা আপনার সাঙ্ঘাতিক-সাঙ্ঘাতিক গল্প শুনেছিল। …তবে স্যার, কালো ছাগলটারও একটা ব্যাপার মনে পড়ে গেল। ছাগলটার তিনটে শিং। তার, তিরিশ ফুট উঁচু দেউড়ির মাথায় ওঠে কী করে? …আর স্যার…হা, মনে পড়েছে! কাছেই শিবমন্দিরটা। তার মাথায় ত্রিশূল। …সেও তিন, এও তিন…তিন তিরিক্তে নয়…নয়নয়ে একাশি…।…কালো ছাগলটা স্পষ্ট বলেছে ‘একাশি, বুঝুন স্যার! এক গ্লাস আশি, একাশি। এক বাদ দিলে রইল আশি। আশির শূন্য বাদ দিন। রইল আট। এবার ওই বাদ দেওয়া এক-কে আটের সঙ্গে যোগ করুন, আবার নয় পাচ্ছেন। তিন তিরিক্কে নয়। ছাগলের তিনটে শিং আর মন্দিরের মাথায় তিনটে শিং। গুণ করলে নয় পাচ্ছেন না কি?…আমি আসি স্যার! ট্রেন ফেল হবে,– বলে মুরারিবাবু ঘুরেই পা বাড়ালেন।
কর্নেল বললেন, “ত্রিশূলটা, মুরারিবাবু!”
“ও, হা! ত্রিশূলটার কথা বলা হল না। মাথার ঠিক নেই স্যার!”মুরারিবাবু নিজের মাথায় গাঁট্টা মেরে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেন। “কালো ছাগলটা পরপর তিনদিন আমাকে বলেছে, একাশি। চারদিনের দিন রাত্তিরে দেখি, সেই দেউড়ির নীচে ঘাসের ওপর নকুলদা মরে পড়ে আছে। পিঠে তিনটে ক্ষত। রক্ত শুকিয়ে গেছে। চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করলুম। তারপর স্যার আশ্চর্য ঘটনা…মন্দিরের ত্রিশূলে রক্ত…কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! পুলিশ এল। কিন্তু কিছুই হল না। …চলি স্যার! ট্রেন ফেল হবে।”
হালদারমশাই সোজা টানটান হয়ে বসে কথা শুনছিলেন। অভ্যাসমতো বলে উঠলেন, “রহস্য! প্রচুর রহস্য!”
কর্নেল বললেন, “মুরারিবাবু! পুলিশকে কালো ছাগলটার কথা বলেছেন কি?”
মুরারিবাবু ততক্ষণে ওয়েটিং-রুমটাতে ঢুকে গেছেন। সেখান থেকেই জবাব দিলেন, “বলেছি। দারোগাবাবু বললেন, মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি হোন।…শুনে বেজায় রাগ হল বলেই আপনার কাছে…নাঃ, ট্রেন ফেল হবে।”
মুরারিবাবু সশব্দে বাইরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। সিঁড়িতে তেমনি জুতোর শব্দ এবং কুকুরের চেঁচানি শোনা যাচ্ছিল। কর্নেল হাঁকলেন, “ষষ্ঠী, দরজা বন্ধ করে দে।”
হালদারমশাই নড়েচড়ে বসে আবার একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, “তখন শুধু ছাগল ছিল। এবার এল মার্ডার। কাগজে ছাগল-টাগলের কথা লেখেনি। তবে ত্রিশূলে রক্তের দাগ আর ডেডবডির পিঠে তিনটে ক্ষতচিহ্নের কথা লিখেছে। মন্দিরে পুজো বন্ধ ছিল। আবার ঘটা করে ঢাকঢোল পুজোআচ্চা পাঁঠাবলির কথা লিখেছে। রীতিমতো রহস্য।”
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, “ব্যাকরণ কিংবা ব্যাকরণ রহস্য।”
আমি অবাক হয়ে বললুম, বারবার এ-কথাটা বলার কারণ কী?”
“তুমি কি ব্যাকরণ পড়োনি ডালিং?”
“স্কুলে পড়েছি। কিন্তু এখানে ব্যাকরণ আসছে কী সুত্রে?”
“সন্ধি, জয়ন্ত, সন্ধি! এক এবং আশি এই দুটো শব্দ সন্ধি করলে একাশি হয়।”
ষষ্ঠী ট্রে’তে কফি আর স্ন্যাকস্ রেখে গেল। কর্নেল তার উদ্দেশে বললেন, “শিগগির ছাদে যা তো ষষ্ঠী! কাকের ঝগড়া শুনতে পাচ্ছি। ফের কোনো ক্যাকটাসের ভেতর কার ঠোঁট থেকে মরা ইঁদুর পড়ে গেছে হয়তো।”
ষষ্ঠী ছাদের সিঁড়ির দিকে ছুটল। এই ঘরের কোণা থেকে এঁকেবেঁকে সিঁড়িটা ছাদে কর্নেলের শূন্যোদ্যানে উঠে গেছে। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “রূপগঞ্জের ওদিকে এক জাতের অর্কিড দেখেছিলুম। এনে বাঁচাতে পারিনি। রেনবো অর্কিড’ নাম দিয়েছিলুম। রামধনুর মতো সাতরঙা ফুল ফোটে। মোট তিনটে পাপড়ি। মাই গুডনেস!” কর্নেল নড়ে বসলেন। “আবার সেই তিন…তিন তিরিক্তে নয়…নয়-নয়ে একাশি। কালো ছাগলের ব্যাকরণ!”
হেসে ফেললুম, “মুরারিবাবু এ-ঘরে এক খাবলা পাগলামি রেখে গেছেন। আপনার মাথায় সেটা ঢুকে পড়েছে।”
হালদারমশাইকে প্রচণ্ড উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। কফির পেয়ালায় পুনঃ পুনঃ ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে দ্রুত গিলে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। বললেন, “ছাগলেরও তিনটে শিং! বোকা বানিয়ে চলে গেল। পাগল না সেয়ানা পাগল। …অরে ফলো করুম। কর্নেল-স্যারের লগে ফাইজলামি?”
কর্নেল বললেন, “তার আগে একটু ব্যাকরণচর্চা করে নিন, হালদারমশাই!”
“ক্যান?” হালদারমশাইয়ের চোখ দুটো গোলাকার দেখাল।
“ছাগল কোন লিঙ্গ জানেন তো?”
আমি ঝটপট বললুম, “স্ত্রীলিঙ্গ। পুংলিঙ্গে পাঁঠা।”
কর্নেল চোখ পাকিয়ে বললেন, “তোমাদের কাগজের লোকেদের নিয়ে এই এক জ্বালা। সুকুমার রায়ের হাঁসজারু! ব্যাকরণ মানেন না। ছাগল পুংলিঙ্গ এবং তার দাড়িও থাকে।” বলে হালদারমশাইয়ের দিকে ঘুরলেন। এবার মুখে অমায়িক ভাব। “হালদারমশাই, কথাটা মনে রাখবেন। ছাগল পুংলিঙ্গ। কাজেই তার দাড়ি থাকে। রূপগঞ্জে শিবমন্দিরে যে চারঠেঙে জীবগুলো বলি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর দাড়ি আছে, এটা ইমপর্ট্যান্ট।”
“হঃ!” কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার রূপগঞ্জের মুরারিমোহন ধাড়ার দ্বিগুণ জোরে বেরিয়ে গেলেন।
চুপচাপ কফি খাওয়ার পর বললুম, “আপনার কথাটাও সুকুমার রায়ের সেই বদ্যিবুডোর পদ্যটার মতো হল, যে নাকি হাত দিয়ে ভাত মেখে খেত এবং খিদে পেত বলেই খেত। আশ্চর্য! দাড়িওলা ছাগলকেই তো লোকে পাঁঠা বলে এবং শুধু পাঁঠাই বলি হয়।”
“অবশ্যই।” কর্নেল দাড়ি নেড়ে সায় দিলেন। “ছাগলি বলিদান শাস্ত্রমতে চালু নয়।”
“তা হলে কথাটা ইমপর্ট্যান্ট বলার কারণ কী?”
“একাশির হ্যাপা। সন্ধিবিচ্ছেদ করা কতকটা ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হওয়ার মতো। বলিদান হলেই প্রব্লেম!” কর্নেল ঘনঘন দাড়িতে হাত বুলোতে শুরু করলেন। “হুঁ, ফের সুকুমার রায় এসে যাচ্ছেন। গোঁফচুরি’ পদ্যটা।’গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। এক্ষেত্রে দাড়ি দিয়ে চেনার একটা ব্যাপার আছে। সব দাড়ি একরকম নয়, ডার্লিং! আমার মনে হচ্ছে, ছাগলটার দাড়ি তাকে বাঁচাতে পারত–কিন্তু তার তিনটে শিং নিয়েই সমস্যা।”
কর্নেল হঠাৎ উঠে পায়চারি শুরু করলেন এবং রূপগঞ্জের ওই ছিটগ্রস্ত ভদ্রলোকের মতো এলেবেলে কথাবার্তা বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন। “…বলির জন্তুর কোনো খুঁত থাকা শাস্ত্রসিদ্ধ নয়। কিন্তু তিনটে শিং থাকাটা কি খুঁত? ও-তল্লাটে শাস্ত্রজ্ঞ বামুন আছেন অনেক। শিবমন্দিরের ছড়াছড়ি..ধ্বংসস্তূপ…জঙ্গল…ঢিবি…শৈবযুগে এক রাজাও ছিলেন দেখলুম। শিবসিংহ!”
অমনি লেখাপড়ার টেবিলের সেই প্রকাণ্ড বইটার দিকে চোখ গেল। বাদামি চামড়ায় বাঁধানো gehiaCO GHIRT 967 66781 0169, ‘Ancient Kingdoms of Bengal, Vol. I’.
একটু হেসে বললুম, “তাহলে এখানেও শিং এসে যাচ্ছে। একটা পপুলার বাংলা গান শুনেছি, ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ/ডিম নেই তবু অশ্বডিম্ব…’ তাতে ‘ভ্যাবাচাকা’ কথাটাও ছিল মনে পড়ছে।”
কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, “রেনবো অর্কিড, ডার্লিং! তুমি তো আকাশে রামধনু দেখেছ। পৃথিবীতে রামধনু… শ’য়ে-শ’য়ে রামধনু দেখতে হলে রূপগঞ্জে চলো। গেঁয়ো যোগী ভিক্ষে পায় না বলে একটা কথা আছে। রূপগঞ্জের লোকেরা রেনবো অর্কিডের কদর বোঝে না। চোখ জ্বলে যায়, জয়ন্ত। কী অসাধারণ সৌন্দর্য এই এপ্রিলে!”
“তার মানে, আপনি যাচ্ছেন এবং আমাকেও তাতাচ্ছেন!”
কর্নেল টেলিফোনের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, “রূপগঞ্জ নামটা যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনি নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যরসিক। শুধু কি রেনবো অর্কিডের ফুল? প্রজাপতিও। আর সেই প্রজাপতির ডানায় রামধনুর সাতরঙা সৌন্দর্য! দুঃখের কথা, ডার্লিং! রেনবো অর্কিড এনে বাঁচাতে পারিনি। তার চেয়ে আরও দুঃখ প্রজাপতিগুলো এত চালাক যে, একটাও নেটে আটকাতে পারিনি।”
ফোনে হাত বাড়াতে গিয়ে ডাইনে দরজার দিকে প্রায় ঝাঁপ দিলেন কর্নেল। কী একটা জিনিস তুলে নিলেন মেঝের কার্পেট থেকে।
একটা ছোট্ট গোল কালচে রঙের খয়াটে চাকতি।
বললুম, “কী ওটা?”
কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতস কাঁচ বের করে দেখতে দেখতে বললেন, “প্রাচীন যুগের মুদ্রা অথবা সিল। পরিষ্কার করলে বোঝা যাবে। মনে হচ্ছে, মুরারিবাবুর হাতেই এটা ছিল। দেখাতে এনেছিলেন। ট্রেন ফেলের ভয়ে তাড়াহুড়োয় হাত থেকে পড়ে গেছে। কার্পেটে পড়ার জন্যই শব্দ হয়নি। তবে…ওই! আবার উনি আসছেন। জয়ন্ত, দরজা খুলে দাও, প্লিজ!”
ফের নীচের দোতলায় কুকুরের চ্যাঁচামেচি, বিচ্ছিরি জুতোর শব্দ। ভদ্রলোক ছিটগ্রস্ত নন, বদ্ধ পাগলই। বাইরের দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গে দেখলুম, কলিং বেলের দিকে ওঠানো হাত সটান নেমে গেল এবং সেই বিদঘুঁটে এ্যাক হেসে আমাকে ঠেলে ঢুকে পড়লেন। আগের মতো হাঁসফাস করে বললেন, “আবার ভুল! আসলে মাথার ঠিক নেই। ওদিকে ট্রেনের সময় হয়ে গেছে…কোথায় যে জিনিসটা হারিয়ে ফেললুম, কে জানে…হাতেই ছিল…”।
“চাকতি?” কর্নেল জিনিসটা দেখালেন।
মুরারিবাবুর মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল। “পেয়েছেন? বাঁচলুম তা হলে। যাই, ট্রেন ফেল হবে,– বলে ঘুরে পা বাড়ালেন।
কর্নেল বললেন, “মুরারিবাবু, এটা কোথায় পেয়েছেন?”
মুরারিবাবু না ঘুরে জবাব দিলেন, “নকুলদার হাতের মুঠোয়। পুলিশকে বলিনি। …ট্রেন ফেল হবে।”
তারপর অদৃশ্য হলেন। ফের সিঁড়িতে শব্দ, কুকুরের চাঁচানি। দরজা বন্ধ করে ড্রইংরুমে ফিরে দেখি কর্নেল একটা শিশিতে ছোট্ট বুরুশ চুবিয়ে চাকতিটাতে খুব ঘষাঘষি করছেন। সোফায় বসে ওঁর ক্রিয়াকলাপ লক্ষ করতে থাকলুম। একটু পরে ষষ্ঠী শূন্যোদ্যান থেকে নেমে একগাল হেসে ঘোষণা করল, “না বাবামশাই! মরা ইঁদুর নয়, খামোকা ঝগড়া। আপনাকে বলি না কাকেরা বড্ড ঝগড়াটে।”
বাবামশাই’কান করছেন না দেখে সে আমার উদ্দেশে বলল, “বুঝলেন দাদাবাবু? যার ওপরটা কালো, তার ভেতরটাও কালো। কালো বেড়াল, কালো কুকুর…আপনারা কালো ছাগলের কথা বলছিলেন, কানে আসছিল। বড্ড গণ্ডগুলে স্বভাব, দাদাবাবু। দোতলার মেমসায়েব একটা কালো কুকুর পুষেছেন। খালি চাঁচায়। ওই সিঙ্গিবাবুদের একটা কালো ময়না আছে। আমাকে দেখলেই ইংরিজিতে গাল দেয়…”।
কর্নেল মুখ তুলে তার দিকে চোখ কটমটিয়ে তাকাতেই ষষ্ঠী কেটে পড়ল।
দেখলুম, খয়াটে চাকতিটা মোটামুটি সাফ হয়েছে। “সোনা না পিতল?” জিজ্ঞেস করলুম।
কর্নেল চাকতিটাতে চোখ রেখে বললেন, “তুমি সাংবাদিক হলে কী করে জানি না। আজকাল খাঁটি সাংবাদিক হতে হলে জ্যাক অব অল ট্রেড’ হওয়া দরকার। কিন্তু হোপলেস জয়ন্ত। সোনা বা পিতল অন্তত চেনা উচিত। এটা ব্রোঞ্জ! হ্যাঁ, পুরোনো সোনা অনেক সময় একটুখানি তামাটে দেখায়। কিন্তু এত বেশি তামাটে নয়।” বলে উঠে গেলেন। বইয়ের ঝাঁক থেকে আবার একটা বিশাল বই নিয়ে এলেন।
গতিক বুঝে বললুম, “চলি। আজ মুখ্যমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স। একটু তৈরি হয়ে যাওয়া দরকার।”
কর্নেল হাসলেন। “মোটা বই দেখে ভয় পাওয়ার কারণ নেই, ডার্লিং! মাথার সাইজ মোটা হলেই যেমন বিদ্যাসাগর হওয়া যায় না, মোটা বই মাত্রই তেমনি বিদ্যার সাগর নয়। মোটা মানুষ হলেই তাকে স্বাস্থ্যবান বলা যাবে? বরং মজার ব্যাপারটা দ্যাখো জয়ন্ত! বোকাদেরই আমরা মাথামোটা বলি। অথচ মোটা যা কিছু, তার প্রতি আমাদের ভয়-ভক্তি প্রচুর…এই বইটার সাইজ মোটা। প্রচুর বাক্য ছাপা আছে। কিন্তু আমার দেখার বিষয় হল এর ফোটোগ্রাফগুলো। এক মিনিট! চাকতিটার সঙ্গে মিলিয়ে নিই।”
বুঝলুম, বইটা প্রাচীন মুদ্রা এবং সিল সম্পর্কে কোনো পণ্ডিতের গবেষণার ফলাফল। ধৈর্য, নিষ্ঠা আর হাতে সময় না থাকলে এমন জিনিস তৈরি করা যায় না। কিন্তু তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, রূপগঞ্জের ব্যাকরণ রহস্য যা ব্যাকরণ রহস্য-কর্নেল যাই বলুন, ভীষণ জট পাকিয়ে গেল যে!
কর্নেল বই বন্ধ করে রেখে চাকতিটাকে আবার আতসকাঁচে পরীক্ষা করতে থাকলেন। তারপর নিভন্ত চুরুটটি জ্বেলে বললেন, “হালদারমশাইয়ের ভাষায় বলতে গেলে প্রচুর রহস্য, প্রচুর।”
“জিনিসটা কী?”
“পুরোনো মুদ্রা। কিন্তু আশ্চর্য, এতে একটা তিন-শিংওয়ালা ছাগলের মূর্তি খোদাই করা আছে!”
“বলেন কী!” বলে কর্নেলের কাছে গিয়ে চাকতিটা দেখলুম। আবছা একটা ছাগল জাতীয় প্রাণীর মূর্তি দেখা যাচ্ছে। মাথায় ত্রিশূলের মতো তিনটে শিং, কী সব দুর্বোধ্য লিপিও খোদাই করা রয়েছে।
কর্নেল বললেন, “এও আশ্চর্য, বিস্তর প্রাণী দেবদেবী হিসেবে বা দেবদেবীর বাহন হিসেবে মানুষের পুজো পেয়েছে। কিন্তু ছাগল? সে তো বলির প্রাণী।”
কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। বললুম, “সে যাই হোক, আমার ভাবনা হচ্ছে হালদারমশাই মুরারিবাবুকে মিস করেছেন। তবে মিস করুন বা নাই করুন, রূপগঞ্জে উনি যাবেনই এবং এও ঠিক, গণ্ডগোলে পড়বেন। ওঁর যা স্বভাব। রহস্যের গন্ধ পেলেই হল। আসলে পুলিশের চাকরি থেকে রিটায়ার করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন, কিন্তু মক্কেল জোটে না। কাজেই যেচে মক্কেল জোটাতে ছাড়েন না। পকেট থেকে ট্রেন-ভাড়া দিয়েও যাওয়া চাই।”
“জয়ন্ত, আমরাও ট্রেনে যাব।” কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। “গত এপ্রিলে গাড়ি নিয়ে গিয়ে বড় ঝামেলায় পড়েছিলুম। জায়গায়-জায়গায় রাস্তার অবস্থা শোচনীয়। ট্রেনই ভালো। শুধু একটাই অসুবিধে। পরের ট্রেনে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যাবে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ইরিগেশন বাংলো। চড়াই রাস্তা বলে সাইকেল-রিকশা মেলে না–সে তুমি যত টাকাই ভাড়া দাও
কেন। একটা ভরসা ঘোড়াগাড়ি। কিন্তু রাতবিরেতে ঘোড়াগাড়ি পাওয়ার চান্স কম। ..হঁ, ডি ই ভদ্রলোককে বললে জিপের ব্যবস্থা হতে পারে। তাঁকে টেলিফোনে পাওয়া সমস্যা। তবে কলকাতা হেডকোয়ার্টার থেকে বাংলো বুক করার অসুবিধে নেই। দেখা যাক।”
উনি টেলিফোনের দিকে উঠে গেলেন। বললুম, “হালদারমশাইয়ের মতো তাড়াহুড়ো না করলেই কি নয়? আগামীকাল সকালের ট্রেনে গেলে ক্ষতি কী?”
কর্নেল মুখটা যথেষ্ট গম্ভীর করে বললেন, “ক্ষতি মুরারিবাবুরই হওয়ার চান্স বেশি। ভদ্রলোক একেবারে ছিটগ্রস্ত। আমার খুব ভয় হচ্ছে জয়ন্ত…” কথা শেষ না করে কর্নেল ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন।
