বুটিদার ফেট্টি (শার্লক হোমস) – আর্থার কোনান ডয়েল

শেয়ার করুনঃ

আট বছর ধরে শার্লক হোমসের সঙ্গে সঙ্গে থেকে যে গোটা সত্তর কেসের তদন্ত ও ফলাফল দেখবার সুযোগ আমার হয়েছে সেগুলোর সবক’টাই আমি ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। যখনই হাতে সময় থাকে তখন এই ডায়েরির পাতা উলটোই। দেখি যে, এই সব কেসের কোনও কোনওটা দারুণ মজার ব্যাপার। আবার দু’-একটা খুবই দুঃখের ঘটনা। তবে মজাদার কাণ্ডই হোক আর দুঃখজনক ব্যাপারই হোক, সবগুলো ঘটনাই কোনও না কোনও ভাবে অসাধারণ, অদ্ভুত। এই সব ঘটনার একটাও ছিঁচকে চুরি, সাধারণ গুন্ডামি বা রাহাজানির ব্যাপার নয়। তদন্ত করে কোনও রহস্যের সমাধান করাটা শার্লক হোমসের কাছে নিছক রুজিরোজগারের উপায় নয়। তাই শুধুমাত্র পয়সা উপার্জন করবার জন্যে যে-কোনও রকম ‘কেস’ নিতে সে মোটেই রাজি নয়। যে-সব ‘কেস’ একটু অন্য রকম, মানে যে-সব ঘটনা জীবনে বড় একটা চট করে ঘটে না, হোমস বেছে বেছে সেই সব ‘কেস’ই নেয়। এই যে-সব কেসের কথা বলছি, তার মধ্যে স্টোক মোরানে সারের বিখ্যাত রয়লট বংশের ব্যাপারটা বোধহয় সবচেয়ে গায়ে কাঁটা দেওয়া জমজমাট কাণ্ড। হোমসের সঙ্গে আমার আলাপ হবার অল্প কিছুদিন পরেই এই ঘটনাটা ঘটে। তখন আমরা বেকার স্ট্রিটে থাকতাম। এই ঘটনার কথা আমি আগেই লিখতাম। কিন্তু লিখিনি, কেন না আমি একজন ভদ্রমহিলাকে কথা দিয়েছিলাম, তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন এ কথা কারও কাছে প্রকাশ করব না। সেই ভদ্রমহিলা কিছুদিন আগে হঠাৎ মারা গেছেন। আর আমাকেও প্রতিজ্ঞা থেকে মুক্তি দিয়ে গেছেন। আর একটা কারণেও ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছিল, তা পরিষ্কার করে বলা দরকার। কেন না ডাঃ গ্রিমসবি রয়লটের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে যে-সব গুজব আর গালগল্প ছড়াচ্ছে, তা আসল ঘটনার চাইতে ঢের বেশি মারাত্মক।

 

সেটা ১৮৮৩ সালের এপ্রিল মাস। একদিন ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলতেই দেখি যে, জামাকাপড় পরে বাইরে বেরোবার জন্যে ‘রেডি’ হয়ে শার্লক হোমস আমার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে। হোমস সাধারণত দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সবে সওয়া সাতটা বাজছে। হোমসের দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকালাম। নিজের ওপর একটু রাগও হল। আমি জীবনে মোটামুটিভাবে একটা ‘রুটিন’ মেনে চলি।

 

“ওয়াটসন, সাতসকালে তোমার ঘুম ভাঙালাম বলে খারাপ লাগছে। তবে কী জানো, আজ আমাদের সকলেরই এক অবস্থা। মিসেস হাডসনকে কে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছে। তিনি তার শোধ তুলেছেন আমার ওপর। আর আমি তুললাম তোমার ওপর।”

 

“কিন্তু হয়েছেটা কী? আগুনটাগুন লেগেছে নাকি?”

 

“না। এক মক্কেল এসে হাজির হয়েছেন। যতটুকু জানতে পেরেছি, তা হল এক কমবয়সি ভদ্রমহিলা খুব উত্তেজিত অবস্থায় এখানে এসে উপস্থিত। তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন বলে ভীষণ জেদ ধরেছেন। তাঁকে বাইরের ঘরে বসানো হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে যে, যদি কমবয়সি কোনও ভদ্রমহিলা ভোরবেলায় লন্ডন শহরে অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় একা একা ঘুরে বেড়ান আর কোনও অপরিচিত লোকের ঘরে জোর করে ঢুকে তাকে বিছানা থেকে ঘুম ভাঙিয়ে টেনে তোলেন, তো বুঝতে হবে ব্যাপার খুবই গুরুতর। আর ব্যাপারটা যদি সত্যি সত্যি ‘ইন্টারেস্টিং’ হয় তো তুমি নিশ্চয়ই গোড়া থেকে সব কথা জানতে চাইবে। তাই ভাবলাম তোমাকে সবকিছু জানানো উচিত।”

 

“বন্ধু হে, এমন সুযোগ আমি কিছুতেই ছাড়ছি না।”

 

শার্লক হোমসের তদন্ত করবার কায়দা কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আমি যে রকম আনন্দ পাই, সে রকম আনন্দ আর কোনও কিছুতেই পাই না। আমার সব চাইতে ভাল লাগে তার বিশ্লেষণের পদ্ধতি। যখন সামান্য কোনও সূত্র থেকে সে কোনও সিদ্ধান্ত করে, তখন মনে হয় যে, ব্যাপারটা স্রেফ একটা ‘ইনটুইশন’। কিন্তু তা নয়। ইনটুইশন নয়, তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত যুক্তির ওপর দাঁড় করানো। তার কাছে যে-সব সমস্যা এনে হাজির করা হয় এই চুলচেরা বিশ্লেষণের সাহায্যেই হোমস সেগুলোর নির্ভুল ভাবে মীমাংসা করে দেয়। আমি কোনও রকমে চোখেমুখে জল দিয়ে জামাকাপড় পরে নিতেই হোমস আমাকে নিয়ে বাইরের ঘরে গেল। আমরা ঘরে ঢুকতেই কালো কাপড়জামা পরা মুখে ওড়না চাপা দেওয়া এক ভদ্রমহিলা জানলার কাছের চেয়ারটা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

 

“গুডমর্নিং মাদাম। আমার নাম শার্লক হোমস। আর ইনি আমার বন্ধু ও সহকারী ডঃ ওয়াটসন,” অল্প হেসে হোমস বলল। “এঁর সামনে আপনি আপনার সব কথাই কোনও রকম সংকোচ না করে বলতে পারেন।…যাক, মিসেস হাডসন দেখছি বুদ্ধি করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। আপনি আগুনের কাছে সরে আসুন। আমি দেখি, একটু গরম কফির ব্যবস্থা করতে পারি কিনা। আপনি তো দেখছি ঠান্ডায় খুবই কাহিল হয়ে পড়েছেন।”

 

হোমসের কথায় ভদ্রমহিলা ফায়ার প্লেসের কাছে এসে বসলেন। তারপর খুব আস্তে আস্তে বললেন, “আমি কাঁপছি দেখে আপনি ভাববেন না আমি ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়ছি।”

 

“তবে?”

 

“বিশ্বাস করুন মিঃ হোমস, আমি ঠান্ডায় এ রকম কাঁপছি না। ওহ, সাংঘাতিক বিভীষিকা।” এই কথা বলে ভদ্রমহিলা মুখের চাপাটা সরিয়ে দিলেন। দেখলাম ভদ্রমহিলার অবস্থা সত্যি খুবই শোচনীয়। দেখে কষ্ট হল। মুখ শুকিয়ে গেছে। মুখের রংটা কেমন বিশ্রী রকম সাদাটে হয়ে গেছে। চোখে একটা ভয়ের ছাপ। কী যেন বিপদের আশঙ্কায় চোখ দুটো সব সময়েই এদিক-ওদিক ছটফট করছে। চেহারা দেখে মনে হল, ভদ্রমহিলার বয়স তিরিশের মধ্যেই হবে। কিন্তু এরই মধ্যে চুলে পাক ধরেছে। তার শরীরে একটা অসম্ভব হতাশা আর ক্লান্তির ছোপ পড়েছে। শার্লক হোমস খুব ভাল করে ভদ্রমহিলার আপাদমস্তক দেখে নিল।

 

তারপর ভদ্রমহিলার হাতে হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “আপনি একদম ভয় পাবেন না। আমরা নিশ্চয়ই আপনার সমস্যার খুব তাড়াতাড়ি একটা সমাধান করে ফেলতে পারব।…আপনি সকালের ট্রেনে এসেছেন দেখছি।”

 

“আপনি আমায় চেনেন নাকি?”

 

‘না। তবে আপনার বাঁ হাতের দস্তানার ফাঁকে একটা রিটার্ন টিকিটের আধখানা গোঁজা রয়েছে, দেখতে পাচ্ছি। আপনি খুব সকাল সকাল বেরিয়েছেন। আরও দেখতে পাচ্ছি, টমটমে চেপে অনেকটা মেঠো রাস্তা পেরিয়ে আপনাকে স্টেশনে আসতে হয়েছে।”

 

ভদ্রমহিলা ভয়ানক রকম চমকে উঠলেন। তারপর আমার বন্ধুর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।

 

“না, না, এর মধ্যে কোনও ম্যাজিক নেই,” হাসতে হাসতে হোমস বলল। “আপনার কোটের বাঁ হাতায় কম করে সাত জায়গায় কাদার ছিটে লেগেছে। দাগগুলো দেখতে পাচ্ছি টাটকা। টমটম ছাড়া আর কোনও গাড়ি থেকে এ রকম কাদা ছিটোয় না। আর গাড়োয়ানের বাঁ দিকে বসলে এ রকম কাদার ছিটে লাগবেই।”

 

“সে যে ভাবেই আপনি কথাগুলো বলুন না, আপনার কথা সবই সত্যি,” ভদ্রমহিলা বললেন। “আমি ছ’টা বাজার আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। ঠিক ছ’টা বেজে কুড়ি মিনিটে লেদারহেডে এসে পৌঁছেছি। তারপর সেখান থেকে প্রথম যে ট্রেন পেয়েছি, সেটায় চেপে ওয়াটারলু স্টেশনে এসেছি।…বিশ্বাস করুন, আমার মনের ওপর যে অসম্ভব চাপ পড়ছে, তা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি হয়তো পাগল হয়ে যাব। আমার এমন কেউ নেই, যার কাছে এই ঘোর বিপদের দিনে আমি একটু সাহায্য পেতে পারি। আমার কেউ নেই, কেউ নেই। আপনার কথা আমি শুনেছি মিঃ হোমস। মিসেস ফ্যারিন্টশ আমাকে আপনার কথা বলেছেন। মিসেস ফ্যারিন্টশকে আপনি বিপদ থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন। তিনিই আমাকে আপনার ঠিকানা দিয়েছেন। আচ্ছা, আপনি কি আমাকে কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারেন না? আর কিছু না হোক, যে-কাণ্ড সব ঘটছে, সেগুলো অন্তত কেন বা কী ভাবে ঘটেছে, আমাকে যদি বুঝিয়ে দেন? ঠিক এখুনি আমি আপনাকে আপনার ফি দিতে পারব না। তবে দু’-এক মাসের মধ্যেই আমি আমার সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে যাব। তখন আমি আপনাকে আপনার উপযুক্ত পারিশ্রমিক অবশ্যই দেব। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”

 

ভদ্রমহিলার কথার কোনও জবাব না দিয়ে হোমস তার ডেস্কের কাছে গেল। তারপর ডেস্ক খুলে একটা ছোট নোটবই বের করে পাতা ওলটাতে লাগল।

 

“ফ্যারিন্টশ,” হোমস আপন মনে বলল, “ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখন ঘটনাটা মনে পড়েছে। একটা গয়না নিয়ে গোলমাল হয়েছিল। বুঝলে ওয়াটসন, ফ্যারিন্টশের ব্যাপারটা যখন তদন্ত করছিলাম, তখন তোমার সঙ্গে আলাপ হয়নি।” তারপর ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে হোমস বলল, “আপনাকে শুধু এই কথা দিতে পারি যে, ফ্যারিন্টশের বেলায় যে রকম আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম, আপনার বেলায়ও সেই রকম চেষ্টাই করব। আর পারিশ্রমিকের কথা বলছেন? কাজের আনন্দই আমার সবচেয়ে বড় পারিশ্রমিক। আর খরচপত্র যা হবে, তা আপনি আপনার যখন সুবিধে হবে তখনই দেবেন। এখন আপনি আমাকে আগাগোড়া সব কথা খুলে বলুন, যাতে করে আমি আপনার সমস্যাটার সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা করতে পারি।”

 

খুব একটা বড় নিশ্বাস ফেলে আমাদের মক্কেল বলতে শুরু করলেন। “কিন্তু মুশকিলটা কী জানেন, আমার এই বিপদের আশঙ্কাটা অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে। আর ব্যাপারটা ঠিক ধরাছোঁয়া যায় না বলেই আমার ভয়টা আরও বেশি ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। আমার এই আশঙ্কার মূলে এমন সব ছোটখাটো তুচ্ছ ব্যাপার রয়েছে যে, কারও কাছে আমার মনের কথা খুলে বললেই সে মনে করে সবটাই মিথ্যে মেয়েলি কল্পনা। আমার মুখের ওপর এই কথা কেউ বলে না ঠিকই, তবে হাবেভাবে ঠারেঠোরে সেই কথাই জানিয়ে দেয়। মিঃ হোমস, আমি শুনেছি যে, আপনি দুষ্টু লোকেদের সব শয়তানি মতলবই ধরে ফেলতে পারেন। হয়তো আপনি আমাকে বলে দিতে পারবেন যে, কী করে আমার চারপাশে বিপদের যে বেড়াজাল বিছিয়ে রয়েছে তা থেকে আমি বেরিয়ে আসতে পারব।”

 

“আপনার কথা শোনবার জন্য আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে।”

 

“আমার নাম হেলেন স্টোনার। আমি আমার বিপিতার, মানে আমার মায়ের দ্বিতীয় পক্ষের স্বামীর কাছে থাকি। আমার বিপিতা এক খুব পুরনো স্যাক্সন বংশের সন্তান। সারের পশ্চিম অংশে স্টোক মোরান অঞ্চলে রয়লটদের খুব খাতির।”

 

হোমস মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, ওদের কথা শুনেছি বটে।”

 

“রয়লটরা একসময় খুবই অবস্থাপন্ন লোক ছিল। উত্তরে বার্কশায়ার থেকে পশ্চিমে হ্যামশায়ার পর্যন্ত এদের জমিদারি ছিল। গত একশো বছর এদের বংশে পর পর বেশ কয়েকজন বেহিসেবি উড়নচণ্ডে ধরনের লোক জন্মায়। এরা টাকা আয় করার চাইতে টাকা ওড়াতেই বেশি পটু ছিল। এদের হাতে পড়ে জমিদারির অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। শেষকালে এমন একজন নচ্ছার স্বভাবের লোকের হাতে জমিদারির ভার এল, যে সে সব উড়িয়েপুড়িয়ে ছাই করে দিল। ফলে এমন হল যে, কয়েক একর জমি আর ওই দু’শো বছরের পুরনো বাড়িটা ছাড়া আর কিছুই রইল না। অবশ্য বসতবাড়িটাও এখন বন্ধক পড়েছে। আমার বিপিতার পিতা ছিলেন যেমন দাম্ভিক, তেমনই অত্যাচারী। কিন্তু আয় বলতে তাঁর একটি কানাকড়িও ছিল না। আমার বিপিতা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বাঁচতে হলে তাঁকে পয়সা উপায় করতেই হবে। তাই তিনি তাঁর এক আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকাপয়সা ধার করে ডাক্তারি পড়তে যান। ডাক্তারি পাশ করে তিনি প্র্যাকটিস করতে কলকাতায় যান। সেখানে তার চেষ্টায় আর যোগ্যতায় তিনি বেশ ভাল রকম পসার জমিয়ে তোলেন। কলকাতায় একদিন তাঁর বাড়িতে একটা ছোটখাটো ছিঁচকে চুরি হয়। সেই চুরির সঙ্গে তাঁর চাকরের যোগসাজস আছে মনে করে তিনি তাকে এমন বেধড়ক ঠ্যাঙানি দেন যে, বেচারা প্রাণে মারা পড়ে। অল্পের জন্য তিনি ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে যান বটে, তবে তাঁকে অনেক দিন হাজতবাস করতে হয়েছিল। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে এই ঘটনার পরে তাঁর স্বভাব পালটে যায়। তাঁর মেজাজ ক্রমশ রুক্ষ হয়ে ওঠে।

 

“ভারতবর্ষে থাকবার সময় ডঃ রয়লটের সঙ্গে আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল। আমার মায়ের হাতে অনেক টাকাকড়ি ছিল। তিনি সেই টাকাকড়ি আমার আর আমার যমজ বোন জুলিয়ার মধ্যে উইল করে ভাগ করে দেন। উইলের শর্ত হল যে, যত দিন না আমাদের বিয়ে হচ্ছে, তত দিন আমাদের বিপিতাই আমাদের সম্পত্তির দেখাশোনা করবেন। বিয়ের পর আমরা নিজের নিজের ভাগ পেয়ে যাব। ইংল্যান্ডে ফিরে আসবার অল্প কিছু দিন পরে ক্রু স্টেশনের কাছে এক দুর্ঘটনায় আমাদের মা মারা যান। এই ঘটনার পরই আমাদের বিপিতা লন্ডন শহরের বাস তুলে দিয়ে আমাদের নিয়ে স্টোক মোরানের বাড়িতে চলে যান। আমাদের মায়ের যে টাকাপয়সা ছিল তাতেই আমাদের খুব ভাল ভাবে চলে যেত।

 

“আমাদের মায়ের মৃত্যুর পরে আমাদের বিপিতার স্বভাব হঠাৎ খুব পালটে যেতে শুরু করল। আমরা স্টোক মোরানে ফিরে যাওয়ায় ওখানকার বাসিন্দারা খুবই খুশি হন। তাঁদের খুশি হবার কারণ এই যে, অনেক দিন পর একজন রয়লট বংশের লোক আবার গ্রামে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমাদের বিপিতা স্থানীয় অধিবাসীদের এই মনোভাব মোটেই ভাল চোখে দেখেন না। তিনি কারও সঙ্গে মেলামেশা করা পছন্দ করেন না। গ্রামের লোকেদের সঙ্গে বচসা ছাড়া তিনি বাক্যালাপ করেন না। রয়লট বংশের লোকেরা এমনিতেই রাগী বলে কুখ্যাত। কিন্তু আমার বিপিতার বেলায় এই বদমেজাজ আর রাগ প্রায় পাগলামিতে ঠেকেছে। আমার নিজের মনে হয়, অনেক দিন গরম দেশে কাটানোর ফলেই তাঁর স্বভাব এমন হয়ে গেছে। স্টোক মোরানের অধিবাসীদের সঙ্গে ওঁর ঝগড়াঝাঁটি লেগেই আছে। দু’-চার বার তো ব্যাপার এতদূর এগিয়েছে যে, পুলিশ পর্যন্ত এসেছে। এর ফলে এখন এমন হয়েছে, গ্রামের লোকেরা তাঁকে রীতিমতো ভয় করে। তাঁকে আসতে দেখলেই পালাতে থাকে। একে তো ডঃ রয়লট দারুণ বদমেজাজি, তার ওপরে তাঁর গায়ের জোরও অসম্ভব।

 

“গত সপ্তাহে উনি একজন ছুতোর মিস্ত্রিকে বাড়ির ছাদ থেকে ছুড়ে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। আমার হাতে যা টাকাপয়সা ছিল, সব তাকে দিয়ে কোনও রকমে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিই। গ্রামের লোকেদের কানে কথাটা গেলে খুব মুশকিল হত। ওঁর এমনি কোনও বন্ধুবান্ধব নেই। তবে বেদেদের সঙ্গে ওঁর খুব ভাব। আমাদের ওদিকে বেদের দল প্রায়ই আসে। বেদের দল এলে তিনি তাদের আমাদের বাগানে থাকতে দেন। উনি অনেক সময় ওদের তাবুতে থাকেন। আবার কখনও কখনও কাউকে কিছু না জানিয়ে ওদের সঙ্গে কোথায় চলে যান। ওঁর খুব জীবজন্তু পোষার শখ। তবে সাধারণ জীবজন্তু নয়, ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে আসা অদ্ভুত সব জন্তু। আমাদের বাড়িতে একটা চিতা আর একটা বেকুন আছে। ওগুলো সব সময়ে বাগানে ছাড়া থাকে। ওই অঞ্চলের লোকেরা আমাদের বিপিতা আর ওঁর পোষা জন্তুদের মধ্যে কাকে বেশি ভয় করে বলা শক্ত।

 

“আমার কথা থেকে বুঝতে পারছেন যে, আমার আর আমার বোন জুলিয়ার জীবন কী রকম। আমাদের জীবনে কোনও আনন্দ, কোনও বৈচিত্র্য নেই। আমাদের বাড়িতে চাকরবাকর টেঁকে না। সংসারের বেশির ভাগ কাজই নিজেদের করে নিতে হয়। জুলিয়া যখন মারা যায়, তখন তার বয়স তিরিশও হয়নি। অথচ তার মাথার সব চুল একেবারে সাদা হয়ে গিয়েছিল।”

 

“আপনার বোন কি মারা গেছেন ?”

 

“হ্যাঁ, ঠিক দু’বছর আগে সে মারা যায়। তার মৃত্যুর সম্বন্ধে কথাবার্তা বলতেই আমি আপনার কাছে এসেছি। আপনি বুঝেছেন নিশ্চয়ই যে, আমরা কী রকম বন্দির মতো থাকি। বাইরের কারও সঙ্গে মেলামেশা করবার সুযোগ আমাদের নেই। হ্যারোতে আমাদের এক মাসি থাকেন। আমাদের মায়ের আপন বোন। বিয়ে-থা করেননি। নাম মিস হনোরিয়া ওয়েস্টফেল। আমরা ন’মাসে-ছ’মাসে মাসিরবাড়ি বেড়াতে যাই। বছর দু’য়েক আগে বড়দিনের সময় আমরা মাসিরবাড়িতে ছিলাম। তখন আমার মাসি জুলিয়ার সঙ্গে ওই অঞ্চলের বাসিন্দা এক নৌসেনাবাহিনীর মেজরের বিয়ের সম্বন্ধ করেন। জুলিয়াকে ভদ্রলোকের বেশ পছন্দ হয়েছিল। আমাদেরও ভদ্রলোককে ভাল লেগেছিল।

 

“মাসিরবাড়ি থেকে ফিরে আমি আমাদের বিপিতাকে সব খুলে বলি। তিনি সব কথা শুনে বেশ খুশি হয়েই এই বিয়েতে মত দেন। বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু বিয়ের ঠিক পনেরো দিন আগে এমন এক দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে আমি আমার বোন, আমার একমাত্র নিজের লোককে চিরকালের জন্যে হারাই।”

 

শার্লক হোমস এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে চুপচাপ আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসেছিল। চোখদুটো একটু ফাঁক করে আমাদের মক্কেলকে লক্ষ্য করে এবারে সে বলল, “ঠিক যা যা ঘটেছে, সব আমাকে খুলে বলুন। অপ্রয়োজনীয় মনে করে কোনও কথাই বাদ দেবেন না, শুধু এইটুকু আমার অনুরোধ।”

 

হেলেন স্টোনার বললেন, “না না, কোনও কথাই আমি বাদ দেব না।”

 

“বেশ, তা হলে আপনার বোনের মৃত্যুর ব্যাপারটা সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে সব বলুন। যা যা ঘটেছিল, সবই আমি শুনতে চাই।”

 

“তখন যা যা ঘটেছিল, তা সবই আমি আপনাকে ঠিক ভাবে বলতে পারব। সেই নিদারুণ ঘটনা আমার মনে দাগ কেটে বসে গেছে। আগেই বলেছি যে, আমাদের বাড়িটা খুবই পুরনো। বড় বাড়ির একটা দিকে আমরা থাকি, অন্য দিকটা এমনি পড়ে থাকে। আমরা যে অংশে থাকি তার একদিকে পর পর তিনটে ঘর। ঘরগুলোর পিছনে বাগান। বাগানের দিকে জানলা। ঘরগুলোর সামনের দিকে একটা বারান্দা। বারান্দার আর এক দিকে বসবার ঘর। এই ঘরগুলোর প্রথমটায় থাকেন আমাদের বিপিতা। মাঝেরটায় থাকত জুলিয়া। শেষেরটায় থাকি আমি। এই ঘরগুলোর ভেতরে কোনও দরজা নেই, যাতে করে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়া যায়। আমি কি আপনাকে কথাটা ভাল করে বুঝিয়ে বলতে পেরেছি, মিঃ হোমস ?”

 

“খুব চমৎকার ভাবে গুছিয়ে বলেছেন।”

 

“আগেই বলেছি যে, ঘরগুলোর জানলা সবই বাগানের দিকে। সেই সাংঘাতিক কালরাত্রিতে যা ঘটেছিল এবার সেই কথায় আসি। আমাদের বিপিতা সেদিন অন্য দিনের চেয়ে একটু আগেই শুয়ে পড়েছিলেন। তবে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, তিনি ঘুমিয়ে পড়েননি, জেগেই আছেন। তাঁর ঘর থেকে খুব কড়া ভারতীয় তামাকের গন্ধ বের হচ্ছিল। আমার বোন তামাকের ওই রকম কড়া গন্ধ মোটেই সহ্য করতে পারত না। তাই সে আমার ঘরে এসে বসেছিল। আমরা দু’জনে বিয়ের জোগাড়যন্ত্র নিয়ে কথা কইছিলাম। ঘড়িতে এগারোটা বেজেছে দেখে জুলিয়া উঠে পড়ল। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার মুখে সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে বলল, “আচ্ছা হেলেন, রাত্তিরবেলায় তুমি কি কোনও শিসের শব্দ শুনেছ?”

 

‘“না তো।’

 

‘“তুমি নিশ্চয়ই ঘুমের ঘোরে শিস দাও না?’

 

‘“মোটেই নয়। কিন্তু হঠাৎ শিস দেবার কথা বলছ কেন?

 

‘“বলছি এই জন্যে যে, গত কয়েক রাত্তিরে ঠিক তিনটে নাগাদ আমি পরিষ্কার অথচ চাপা শিস শুনেছি। তুমি জানো যে, আমার ঘুম খুব পাতলা। শিসের শব্দ কানে গেলেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঠিক কোথা থেকে যে শব্দটা আসে, বুঝতে পারি না। একবার মনে হয় পাশের কোনও ঘর থেকে আসছে, আবার মনে হয় যে, বাগান থেকে আসছে। তাই ভাবলাম তোমাকে জিজ্ঞেস করে দেখি তুমিও ও রকম কোনও শিসের শব্দ শুনেছ কিনা।’

 

“না আমি শুনিনি। মনে হয় ওই হতচ্ছাড়া বেদেগুলোর কাণ্ড।’

 

‘“তাই হবে। তবে শব্দটা যদি বাইরের বাগান থেকেই আসে, তবে তোমারও শুনতে পাওয়া উচিত ছিল। তুমি শুনতে পাচ্ছ না কেন?’

 

‘“সোজা ব্যাপার। আমার ঘুম গাঢ়, চট করে ভাঙে না।’

 

‘“ঠিকই বলেছ। যাই হোক, এটা এমন কিছু সাংঘাতিক ব্যাপার নয়।’ মুচকি হেসে জুলিয়া চলে গেল। একটু পরেই শুনলাম জুলিয়া ঘরের খিল লাগিয়ে দিল।”

 

“আচ্ছা ! আপনারা কী বরাবর ঘরের খিল লাগিয়ে শুতে যান?” হোমস প্রশ্ন করল।

 

“হ্যাঁ, বরাবর।”

 

“কেন?”

 

“আপনাকে যে আগে বললাম, আমাদের বিপিতার পোষা একটা চিতা আর একটা বেবুন আছে। সেগুলো রাত্তিরে ছাড়া থাকে। তাই রাত্তিরবেলায় ঘরের দরজা ভেতর থেকে খিল দিলে আমরা নিশ্চিন্তে শুতে পারি না।”

 

“ঠিক কথা। তারপর কী হল বলুন।”

 

“সেই রাত্তিরে আমার ভাল ঘুম হল না। মনের মধ্যে কেমন একটা অজানা আশঙ্কা ভর করল। আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই যে, আমি বলেছিলাম আমরা যমজ। আপনি তো জানেন যে, যমজদের মধ্যে মনের টান খুব বেশি হয়। সেই রাত্তিরে ভীষণ দুর্যোগ চলছিল। তুমুল বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া জানলার শার্সিতে বার বার আছড়ে পড়ছিল। হঠাৎ হাওয়ার গোঙানি আর বৃষ্টির ঝরঝর শব্দকে ছাপিয়ে আমার কানে এল এক মেয়েলি কণ্ঠের প্রাণফাটা তীব্র চিৎকার। শুনেই বুঝলাম, আমার বোনের গলা। আমি লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। একটা গরম চাদর কোনও রকমে জড়িয়ে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে বারান্দায় পা দিতেই স্পষ্ট একটা শিসের শব্দ শুনতে পেলাম। ঠিক যে রকম শিসের কথা জুলিয়া বলেছিল। তার একটু পরেই ঝনঝন শব্দ শুনলাম, মনে হল ধাতু দিয়ে গড়া কোনও জিনিস পড়ল। আমি ছুটে আমার বোনের ঘরের কাছে যখন গেলাম, তখন দেখলাম, ঘরের দরজা খোলা। দরজার একটা পাল্লা হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে। আমার মনে হচ্ছিল আমার বোনের ঘর থেকে সাংঘাতিক একটা কোনও কিছু বোধহয় বেরিয়ে আসবে। বারান্দা থেকে যেটুকু আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরে গিয়ে পড়ছিল, তাতে দেখলাম আমার বোন মাতালের মতো হাত নাড়তে নাড়তে টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে। ভয়ে তার মুখ কাগজের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিল। আমি ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। আর তখনই সে ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। মনে হল তার পায়ে যেন বল নেই। মাটিতে পড়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। তার শরীর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। প্রথমে আমার মনে হল যে, সে আমাকে চিনতেই পারেনি। তাই আমি হেঁট হয়ে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে যেতে ও বলে উঠল, ‘ও ভগবান ! হেলেন, হেলেন, একটা ফেট্টি। বুটিদার ফেট্টি।’ এ ছাড়াও হয়তো ও আর কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। যন্ত্রণায় ও তখন কাটা ছাগলের মতো ছটফট করছিল। জুলিয়া কোনও রকমে আমার বিপিতার ঘরের দিকে দেখাল। আমি ছুট্টে ডাক্তারের ঘরের দিকে গেলাম। ডাক্তার গায়ে ড্রেসিং গাউন চাপাতে চাপাতে বেরিয়ে এলেন। যখন তাকে নিয়ে জুলিয়ার ঘরে এলাম, তখন তার জ্ঞান ছিল না। আমার বিপিতা তাকে ব্র্যান্ডি খাইয়ে চাঙ্গা করার চেষ্টা করলেন। তখন ডাক্তার ডাকতে পাঠানো হল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। জুলিয়া আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ল। সে আর জাগল না। এই ভাবে আমার বোনটি মারা গেল।”

 

শার্লক হোমস বলে উঠল, “ওই শিসের শব্দ আর ঝনঝনানি শুনতে আপনার ভুল হয়নি তো? আপনি আদালতে শপথ করে বলতে পারবেন তো?”

 

“এ কথা ওখানকার করোনারও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি ঠিকই শুনেছি। তবে সেই ঝড়জলের মধ্যে আর আমাদের পুরনো বাড়ির নানা রকমের শব্দের মধ্যে আমার ভুলও হয়ে থাকতে পারে।”

 

“আচ্ছা, আপনার বোন কি বাইরে বেরোবার জামাকাপড় পরেছিলেন?”

 

“না। এমনি শোবার পোশাক পরেছিল। ওর ডান হাতের মুঠোয় ছিল একটা পোড়া দেশলাই কাঠি, আর বাঁ হাতের মুঠোয় একটা দেশলাই বাক্স।”

 

“বোঝাই যাচ্ছে যে, বিপদের আঁচ পেয়ে তিনি দেশলাই জ্বেলে ঘরের চারদিক দেখছিলেন। এটা একটা মস্ত বড় সূত্র। আচ্ছা, সব দেখেশুনে করোনার কী ঠিক করলেন ?”

 

“আমাদের বিপিতাকে স্থানীয় লোকেরা একদম পছন্দ করে না। তাই করোনার ভদ্রলোক এই ব্যাপারে খুব খুঁটিয়ে তদন্ত করেছিলেন। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও জুলিয়ার মৃত্যুর কোনও কারণ বা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। আমার সাক্ষ্য থেকে প্রমাণ হল যে, জুলিয়ার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ঘরের জানলার পাল্লা বেশ মজবুত আর জানলার পাটি দুটো ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া ছিল শক্ত করে। ঘরের মেঝে দেওয়াল সব ঠুকে ঠুকে পরীক্ষা করা হল। নিরেট শক্ত। কোথাও এতটুকু ফাঁকফোকর নেই। ঘরের চিমনিটা অবশ্য বেশ বড় আকারের। কিন্তু সেটার ভেতর শক্ত লোহার পাত এমন আড়াআড়ি ভাবে বসানো যে, সেটা দিয়ে ঢোকা বা বেরোনো কোনও লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং এ কথা ঠিকই যে, যে ভাবেই আমার বোনের মৃত্যু হোক না কেন, ঘরে সে একলাই ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, তার শরীরে কোনও আঘাত বা ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যায়নি।”

 

“তাকে তো বিষ দিয়ে মারা হয়ে থাকতে পারে?”

 

“ডাক্তারেরা সে পরীক্ষাও করে ছিলেন। কিন্তু কোনও প্রমাণ পাননি।”

 

“আপনার বোনের মৃত্যুর সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা ?”

 

“আমার মনে হয়, বেচারা স্রেফ ভয় পেয়েই মারা যায়। তবে কেন যে সে ও রকম সাংঘাতিক ভয় পেয়েছিল, তা অবশ্য আমি বলতে পারব না।”

 

“তখন আপনাদের বাগানে কি বেদেরা ছিল ?”

 

“হ্যাঁ, ছিল। সব সময়ই একটা-না-একটা দল থাকে।”

 

“তাই নাকি? আচ্ছা, মারা যাবার ঠিক আগে আপনার বোন যে ফেট্টি, বুটিদার ফেট্টির কথা বলেছিলেন, সেটা আপনি কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন ?”

 

“এক এক বার মনে হয় যে, সে যন্ত্রণার ঘোরে ভুল বকছিল। আবার এক এক সময়ে মনে হয় যে, সে কোনও লোক বা দলের কথা বোঝাতে চেয়েছিল। হয়তো সে সময় আমাদের বাগানে যে-বেদের দল ছিল, তাদেরই ও বোঝাতে চেয়েছিল। আমি জানি না বেদের দলের কেউ কেউ যে মাথায় বুটিদার রঙিন রুমাল বাঁধে, সেই কথাই ও অদ্ভুত উপমা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিল কি না।”

 

শার্লক হোমস মাথা নাড়ল। তার মাথা নাড়ার ধরন দেখে আমি বুঝলাম যে, ওই ব্যাখ্যায় সে মোটেই খুশি হয়নি।

 

হোমস বলল, “হুঁ, এ দেখছি গভীর জল। যাক, এখন আপনি আপনার কথা বলুন।”

 

“ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর দুটো বছর কেটে গেছে। আমি আগের চেয়ে এখন আরও একলা হয়ে গেছি। মাসখানেক আগে আমার নিজের বাবার এক বন্ধু তাঁর ছেলে পার্সি আর্মিটাজের সঙ্গে আমার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। মাস দুয়েক পরে আমাদের বিয়ে হবার কথা। আমার বিপিতা এই বিয়েতে মত দিয়েছেন। দিনদুয়েক হল আমাদের বাড়িতে রাজমিস্ত্রির কাজ হচ্ছে। বাড়ির পশ্চিম অংশটা মেরামত হচ্ছে। সারাবার সময় মিস্ত্রিরা অসাবধানে আমার ঘরের দেওয়ালে একটা ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। সেই জন্যে আমাকে আমার বোনের ঘরে থাকতে হচ্ছে। যে খাটে, যে বিছানায় সে শুত, সেই খাটে সেই বিছানায় আমাকে শুতে হচ্ছে। একবার ভাবুন আমার মনের কী অবস্থা হল, যখন কাল রাত্রে বিছানায় শোবার পর ঘুম আসছিল না বলে আমার বোনের কথা ভাবতে ভাবতে আমার কানে এল যেন কেউ চাপা গলায় শিস দিচ্ছে। রাত্তিরবেলা চারদিকের নিস্তব্ধতার মধ্যে আমি স্পষ্ট শিসের শব্দ শুনলাম। আমি এক লাফে খাট থেকে নেমে তাড়াতাড়ি ঘরের আলো জ্বাললাম। সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কাউকে দেখতে পেলাম না। আমার এত ভয় হল যে, আর শুতে পারলাম না। সারা রাত জেগে কাটিয়ে দিলাম, তারপর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে কোনও রকমে তৈরি হয়ে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়লাম। তারপর ‘ক্রাউন ইন’ পর্যন্ত হেঁটে এসে একটা গাড়ি ভাড়া করে এলাম লেদার হেডে। তারপর সেখান থেকে এই সাতসকালে আপনার কাছে এসে হাজির হয়েছি, আপনার সঙ্গে দেখা করে সব কথা বলে আপনার পরামর্শ নিতে।”

 

“আপনি ঠিক কাজই করেছেন। তবে আপনি কি সব কথা খুলে বলেছেন?”

 

“হ্যাঁ, সব কথাই বলেছি।”

 

“না, মিস স্টোনার, আপনি সব কথা বলেননি। আপনি আপনার বিপিতাকে বাঁচিয়ে কথা বলছেন।”

 

“মানে? আপনি কী বলছেন?” মিস স্টোনারের কথার কোনও উত্তর না দিয়ে তার জামার হাতাটা হোমস একটু সরিয়ে দিল। ভদ্রমহিলার ফরসা হাতের কবজির কাছে কালশিটে পড়ে পাঁচ আঙুলের দাগ হয়ে গেছে।

 

“আপনার ওপর অত্যাচার তো দেখছি কম হয় না,” হোমস বলল।

 

লজ্জায় ভদ্রমহিলার চোখমুখ লাল হয়ে গেল। তিনি তাড়াতাড়ি তাঁর কবজিটা চাপা দিয়ে দিলেন। “আমার বিপিতা খুব কড়া ধাতের মানুষ। অনেক সময়ে তাঁর গায়ের জোর যে কী ভীষণ সে কথাটা খেয়াল থাকে না।”

 

এরপর আর কেউ কোনও কথা বলল না। হোমস ফায়ারপ্লেসের গনগনে আগুনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইল।

 

অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকবার পর হোমস বলল, “খুব ঘোরালো ব্যাপার। আমরা কোন পথে কী ভাবে তদন্ত শুরু করব, তা ঠিক করবার আগে অনেকগুলো ছোটখাটো খবর আমাকে জোগাড় করতে হবে। অথচ মুশকিল হল, আমাদের হাতে সময় একদম নেই।…ভাল কথা, আজ কোনও এক সময়ে যদি স্টোক মোরানে যাই, আপনার বিপিতাকে না জানিয়ে আপনাদের বাড়িটা কি ঘুরে দেখা সম্ভব হতে পারে?”

 

“হ্যাঁ, হবে। এটা সৌভাগ্যই বলতে পারেন। আজ ওঁর লন্ডনে কী সব কাজ আছে। কাজ সারতে গোটা দিনটাই লাগবে। তাই আজকে যদি আপনারা স্টোক মোরানে আসেন তো আমাদের বাড়ি ঘুরে দেখতে আপনাদের অসুবিধে হবে না। আমাদের বাড়িতে একজন কাজের লোক আছে। সে চব্বিশ ঘণ্টাই থাকে। কিন্তু সে ভয়ানক বোকা। আর তার বয়স হয়েছে অনেক। তাকে আমি চালাকি করে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে পারব।”

 

“বাহ্। ওয়াটসন, তোমার ঘুরে আসতে আপত্তি নেই তো?”

 

“মোটেই না।”

 

“বেশ। ওই কথাই রইল। আমরা দু’জনেই যাব।…আপনি এখন কী করবেন?”

 

“লন্ডনে যখন এসে পড়েছি, দু’-একটা কাজ সেরে যাব। আমি ঠিক বারোটার গাড়িতে ফিরব। তা হলে আপনাদের যাবার আগেই বাড়ি পৌঁছে যাব।”

 

“আমরা দুপুরের একটু পরেই পৌঁছোব। ইতিমধ্যে আমাকেও দু’-একটা খুঁটিনাটি কাজ সেরে নিতে হবে।…আপনি কি আমাদের সঙ্গে প্রাতরাশ সারবেন ?”

 

“ধন্যবাদ। আজ নয়। আমাকে এখন উঠতে হবে। আপনাকে আমার কথা সব খুলে বলতে পেরে মনটা ভীষণ হালকা লাগছে। খুব চাঙ্গা লাগছে নিজেকে। এখন তা হলে চলি। দুপুরবেলায় আবার আমাদের দেখা হবে।”

 

মুখের ওপর ওড়না চাপা দিয়ে ভদ্রমহিলা বেশ খুশি খুশি ভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

 

ভদ্রমহিলা চলে যাবার পর হোমস তার আরামকেদারায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ে আমাকে বলল, “তারপর ওয়াটসন, সব কথাই তো শুনলে। এখন তোমার কী মনে হয় বলো শুনি।”

 

“ব্যাপার যে বেশ জটিল আর মারাত্মক, সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহই নেই।”

 

“হ্যাঁ, খুবই জটিল আর সাংঘাতিক রকমের মারাত্মক।”

 

“কিন্তু ভদ্রমহিলা যা বললেন, তা যদি সত্যি হয়, মানে ঘরের মেঝে, দেওয়াল, জানলা, চিমনির নল দিয়ে কারও পক্ষে ঢোকা বা বেরোনো যদি সত্যিই অসম্ভব হয়, তা হলে এ কথা তো অস্বীকার করা চলে না যে, ভদ্রমহিলার বোনের মৃত্যুর সময় তিনি একাই ঘরে ছিলেন।”

 

“তা হলে রাত্তিরে ওই শিসের শব্দটা কী? আর মারা যাবার আগে ভদ্রমহিলা যে অদ্ভুত কথাগুলো বললেন, তারই বা মানে কী?”

 

“বলতে পারব না।”

 

“শোনো, রাত্তিরবেলায় শিসের শব্দ, কাছাকাছি বেদের আস্তানা, ডাক্তারের সঙ্গে তাদের মেলামেশা, তার ওপর এই ভদ্রমহিলাদের বিয়ে না হওয়ায় ডাক্তারের স্বার্থ, মারা যাবার আগে ভদ্রমহিলার ওই অস্বাভাবিক উক্তি, মিস স্টোনারের ধাতু দিয়ে তৈরি কোনও-কিছু পড়ার ঝনঝন শব্দ শোনা, যেটা কোনও লোহার ভারী পাতকে সরিয়ে আবার ঠিক জায়গায় ফেলে দেবার শব্দ হওয়াই সম্ভব—এই সব সূত্রকে এক করলে মনে হয় না কি যে, এই পথ ধরে এগিয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে?”

 

“তা হলে এই ব্যাপারে বেদেরা কতখানি জড়িয়ে আছে বলে মনে করছ ?”

 

“আমি জানি না।”

 

“না, হোমস, তোমার এই থিয়োরিতে অনেক ফাঁক আছে বলে আমার মনে হচ্ছে।”

 

“আমারও মনে হচ্ছে। আর ঠিক এই কারণেই আমি আজই স্টোক মোরানে যেতে চাইছি। ওখানে গিয়ে আমি দেখতে চাই যে, এই ফাঁকগুলো কতখানি গুরুতর, অথবা এই ফাঁকগুলোকে অন্য কোনও ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় কিনা।…আরে, এটা আবার কী হল ?”

 

হোমস শেষ কথা ক’টা বলল এক অদ্ভুত পোশাক-পরা ভদ্রলোককে লক্ষ করে। বিরাট দৈত্যের মতো চেহারার এই লোকটি আমাদের কোনও রকম জিজ্ঞেস না করেই দড়াম করে এক ধাক্কায় দরজা খুলে আমাদের ঘরের মধ্যে ঢুকলেন। ভদ্রলোক ডাক্তার আর কৃষিজীবী দু’ ধরনের লোকের পরিচ্ছদ মিলিয়ে একটা খিচুড়ি টাইপের পোশাক পরেছেন। মাথায় কালো লম্বা টুপি। গায়ে লম্বা ফ্রককোট, পায়ে গেটার। হাতে একটা বেশ মজবুত চাবুক। ভদ্রলোক চাবুকটা অল্প অল্প দোলাতে লাগলেন। ভদ্রলোক এত লম্বা যে, তাঁর টুপিটা দরজার কাঠের ফ্রেমের সঙ্গে ঠেকে গিয়েছিল। আর তার বুকের ছাতি প্রায় আমাদের ঘরের দরজার সমান চওড়া। শরীরের তুলনায় ভদ্রলোকের মুখটা বড়। মুখের চামড়া কুঁচকে গিয়ে ভাজ পড়েছে। গায়ের রং রোদে-পোড়া। ভদ্রলোক বেশ রাগ রাগ মুখ করে আমাদের দেখছিলেন। ওঁর চোখ দুটো ভেতর দিকে ঢোকানো, চোখের রং হলুদ। নাকটা বেশ চোখা। ওঁকে দেখে, কী জানি কেন, আমার শিকারি পাখির কথা মনে হল।

 

সেই বদখত ধরনের লোকটি বললেন, “আপনাদের মধ্যে কার নাম হোমস ?”

 

যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে হোমস বলল, “আমার নাম। আপনার নামটি জানতে পারলে সুখী হই।”

 

“আমি ডঃ গ্রিমসবি রয়লট, স্টোক মোরানে থাকি।”

 

খুব আপ্যায়নের ভঙ্গিতে হোমস বলল, “আরে, তাই নাকি। ডাক্তার, আপনি বসুন।”

 

“না, আমি বসতে আসিনি। আমার একটি আত্মীয়া আপনার কাছে এসেছিল। তাকে আমি এখানে আসতে দেখেছি। সে আপনাকে কী বলছিল ?”

 

হোমস বলল, “ডাক্তার, দেখছেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার এখনও বেশ ঠান্ডা রয়েছে।”

 

ভদ্রলোক গর্জে উঠলেন, “সে আপনাকে কী বলছিল?”

 

একটুও বিচলিত না হয়ে হোমস বলল, “তবে সবাই বলছে, ক্রকাসের পক্ষে এ ঠান্ডা ভাবটা খুব ভাল।”

 

“ও, আমার কথার জবাব দেবেন না? আমার সঙ্গে ঠাট্টা হচ্ছে?” হোমসের দিকে দু’-চার পা তেড়ে এসে ডাক্তার রয়লট বললেন, “আপনাকে আমি চিনি। আপনার কথা আমার কানে এসেছে। আপনার স্বভাব হচ্ছে সব ব্যাপারে নাক গলানো।”

 

হোমস অমায়িক ভাবে হাসল।

 

“আপনি হচ্ছেন গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল হোমস।”

 

হোমসের মুখে হাসি আর ধরে না।

 

“আপনি হচ্ছেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের দালাল।”

 

হাসতে হাসতে হোমস আর একটু হলে চেয়ার থেকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিল। “ওহ্, আপনি দেখছি দারুণ মজার মজার কথা বলতে পারেন। বেরিয়ে যাবার সময় কিন্তু মনে করে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাবেন, খুব হাওয়া আসছে।”

 

“আমার যা বলবার তা বলা হলেই আমি চলে যাব। আমার ব্যাপারে খবরদার নাক গলাবেন না। আমি জানি, মিস স্টোনার এখানে এসেছিল। তার প্রমাণ আমার কাছে আছে। আমি কিন্তু সোজা লোক নই। আমাকে চটাবেন না। দেখুন তবে—” বলেই ভদ্রলোক চোখের পলকের মধ্যে ফায়ারপ্লেসের আগুন খোঁচাবার লোহার ডান্ডাটা তুলে নিয়ে স্রেফ হাতের চাপে দুমড়ে দিলেন।

 

“আমার হাতের নাগালের বাইরে থাকবেন।” ডান্ডাটা ফায়ারপ্লেসের দিকে ছুড়ে দিয়ে ভদ্রলোক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

 

হোমস হাসতে হাসতে বলল, “ভদ্রলোককে বেশ মিশুকে বলে মনে হল। আমি অবশ্য ওঁর মতো ষণ্ডামার্কা নই। তবে একটু দাঁড়ালে দেখতে পেতেন যে, আমার কবজির জোরও ওঁর চেয়ে কম নয়।” লোহার ডান্ডাটা তুলে নিয়ে এক হেঁচকা টানে হোমস সেটাকে সোজা করে ফেলল।

 

“ওঁর আস্পর্ধার কথাটা একবার ভাবো। আমাকে কিনা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের দালাল বলা। এই কথাটার জন্যেই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাবার উৎসাহ আমার বেড়ে গেল। মিস স্টোনার আমাদের কাছে আসাটা গোপন রাখতে পারেননি দেখছি। এই জন্যে ওই জংলি পাষণ্ডটা ওঁর ওপর না আবার অত্যাচার করে।…এসো ওয়াটসন, আগে খাওয়াদাওয়ার পাটটা সাঙ্গ করা যাক। তারপর আমি একবার ‘ডক্টরস কমনসে’ যাব। সেখানে হয়তো এমন। কিছু খবর পেতে পারি, যাতে তদন্ত করাটা সহজ হবে।”

 

শার্লক হোমস বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আমি চুপচাপ বসে রইলাম। আমার হাতে কোনও কাজ নেই। সুতরাং বসে বসে ভাবতে লাগলাম এই অসহায়া মহিলার কথা। যতই ভাবি, ততই মনখারাপ হয়ে যায়। এরই মধ্যে শার্লক হোমস তার কাজ সেরে বাড়ি ফিরল। তখন একটা বেজে গেছে। তার হাতে একটা নীল রঙের কাগজ। কাগজটার দু’ পিঠেই নানা রকম সংখ্যা আর ‘নোটস’ করা। সেসব সংখ্যা আর নোটসের কোনও অর্থ আমার বোধগম্য হল না।

 

হোমস বলল, “আমি সেই ভদ্রমহিলার উইলটা পড়লাম। তারপর হিসেব করে দেখলাম যে, ভদ্রমহিলা যখন মারা যান, তখন তার সম্পত্তির মোট দাম ছিল ১১০০ পাউন্ড। এখন। অবশ্য চাষের জমির বাজারদর পড়ে গেছে বলে ওই সম্পত্তির দাম দাঁড়িয়েছে এই ধরো ৭৫০ পাউন্ডের মতো। উইলের শর্ত অনুযায়ী সম্পত্তি তিন ভাগ হবে। তা হলে বিয়ের পর প্রত্যেক মেয়ে পাবে ২৫০ পাউন্ড আর ডাক্তারের ভাগে পড়বে ২৫০ পাউন্ড। ২৫০ পাউন্ড মানে কিছুই নয়। যাকে বলে চটকস্য মাংস। যদি একজনও বিয়ে করে, তা হলেই ভদ্রলোক অসুবিধেয় পড়বেন। দু’জন করলে তো কথাই নেই।..যাক, আমার পরিশ্রমটা বৃথা যায়নি। অন্তত এটা বেশ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, মেয়ে দুটির বিয়ে না হলে ভদ্রলোকেরই লাভ হবে। বুঝলে ওয়াটসন, ব্যাপারটা ক্রমেই খুব ঘোরালো আর বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। নাহ্‌ এ নিয়ে আলোচনার আর একদম সময় নেই। তার ওপর ভদ্রলোক টের পেয়ে গেছেন যে, এ ব্যাপারে আমরা নাক গলাতে শুরু করেছি। তাই তুমি তৈরি হলেই আমরা একটা গাড়ি ধরে ওয়াটারলু স্টেশনের দিকে এগোতে পারি। ভাল কথা, তোমার রিভলভারটা সঙ্গে নিতে ভুলো না। যে-লোক লোহার ডান্ডাকে অক্লেশে বেঁকিয়ে দিতে পারে তাকে শায়েস্তা করতে ‘এলি’ কোম্পানির দু’ নম্বরের চাইতে ভাল ওষুধ আর কিছু নেই।”

 

আমরা যখন ওয়াটারলু স্টেশনে পৌঁছোলাম, তখনই লেদারহেডে যাবার একটা ট্রেন ছাড়ছিল। আমরা সেটাতে উঠে পড়লাম। তারপর লেদারহেড স্টেশনে নেমে আমরা একটা গাড়ি ভাড়া করলাম। আমাদের গাড়ি সারের চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলল। দিনটা বেশ সুন্দর। নীল আকাশে তুলোর মতো দু’-একটা সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছিল। চারদিক সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল। রাস্তার দু’ ধারের গাছে গাছে দু’-একটা করে কচি পাতা বেরোতে শুরু করেছে। আমার মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভাব হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, চারদিকে বসন্তকাল আসি আসি করছে, অথচ আমরা এখন এমন একটা ঘটনার মোকাবিলা করতে চলেছি, যেটা অত্যন্ত বীভৎস আর নোংরা। বুকের ওপর দু’হাত জড়ো করে টুপিটা সামনের দিকে টেনে এনে চোখে চাপা দিয়ে আমার বন্ধু গাড়ির সামনের আসনে চুপ করে বসেছিল। বুঝলাম, সে গভীর ভাবে কোনও কিছু চিন্তা করছে। হঠাৎ সে নড়েচড়ে উঠে আমার কাঁধে হাত দিয়ে আস্তে ঠেলা দিল।

 

“ওই দেখো।” হোমস বলল।

 

দেখলাম আমাদের সামনে বিশাল বিশাল গাছপালায় ভরতি এক বিরাট বাগান। বাগানের ভেতরে একটা বড় বাড়ির ছাদ আর দেওয়ালের অংশ গাছের সারি আর ডালপালার ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে।

 

আমাদের গাড়ির কোচোয়ানকে হোমস বলল, “এটা কি স্টোক মোরান ?”

 

কোচোয়ান বলল, “হ্যাঁ। আর ওইটে ডঃ গ্রিমসবি রয়লটের বসতবাড়ি।”

 

“ওইখানে কিছু মেরামতির কাজ হচ্ছে। আমরা ওইখানেই যাব,” হোমস বলল।

 

রাস্তার বাঁ দিকে মাঝে মাঝে ঘরবাড়ি নজরে পড়ছিল। সেগুলো দেখিয়ে কোচোয়ান বলল, “ওইদিকে গ্রাম। তবে আপনারা যদি ডঃ রয়লটের বাড়ি যেতে চান, এইখানে নেমে পড়ে মাঠ দিয়ে চলে যান। তাতে সুবিধে হবে, তাড়াতাড়িও হবে। ওই যে ওই ভদ্রমহিলা হেঁটে যাচ্ছেন।”

 

হোমস কপালে হাত ঠেকিয়ে আলো থেকে চোখ ঢেকে ভাল করে দেখে বলল, “আমার মনে হচ্ছে উনি মিস স্টোনার।…হ্যাঁ, তোমার কথামতো আমাদের এখানেই নেমে পড়ে হাঁটাপথে যাওয়াই ভাল।”

 

আমরা গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি আবার উলটো মুখে লেদারহেডের দিকে চলল।

 

মাঠের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে হোমস বলল, “ভালই হল যে, কোচোয়ান আমাদের ঠিকেদারের লোক বলে মনে করেছে। ও জানল, আমরা কী উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছি। তাই আমাদের এখানে আসা নিয়ে ও আর গাঁয়ের পাঁচজনের সঙ্গে গুলতানি করবে না।…গুড আফটারনুন মিস স্টোনার, দেখছেন তো আমাদের যা কথা তাই কাজ।”

 

আমাদের মক্কেল আমাদের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখ দেখেই বুঝলাম যে, আমরা আসায় তিনি খুবই খুশি হয়েছেন। আমাদের শেকহ্যান্ড করতে করতে তিনি বললেন, “আপনারা আসবেন বলে আমি সেই কখন থেকে ছটফট করছি। সবকিছুই ঠিকঠাক করে রেখেছি। ডঃ রয়লট লন্ডন থেকে এখনও ফেরেননি, সন্ধের আগে ফিরবেন বলে মনে হচ্ছে না।”

 

“ডঃ রয়লটের সঙ্গে ইতিমধ্যেই আমাদের পরিচয় হয়েছে।” তারপর হোমস সকালবেলায় যা ঘটেছিল তা মিস স্টোনারকে বলল। হোমসের কথা শুনতে শুনতে মিস স্টোনারের মুখ একেবারে সাদা হয়ে গেল।

 

“হায় ভগবান। উনি নির্ঘাত আমার পিছু পিছু গেছেন,” মিস স্টোনার বললেন। আমার মনে হল যে, তিনি বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছেন।

 

“তাই তো মনে হচ্ছে।”

 

“ওহ, কী সাংঘাতিক ধূর্ত লোক। ওঁর হাত থেকে কী করে যে মুক্তি পাব তা আমি ভেবে ঠিক করতে পারছি না। ফিরে এসে কী করবেন কী বলবেন কে জানে!”

 

হোমস বলল, “দেখুন, এখন থেকে ওঁকেও একটু সমঝে চলতে হবে! শিগগিরই উনি টের পাবেন যে, এমন একজন লোকের খপ্পরে উনি পড়েছেন, যে ওঁর চাইতে ঢের ঢের ধুরন্ধর। যাই হোক, আজ রাত্তিরে আপনি কোনও ভাবেই ওঁর কাছে যাবেন না। যদি উনি আপনাকে মারধর করার চেষ্টা করেন তা আপনাকে আপনার মাসির কাছে হ্যারোতে পৌঁছে দেব। যাই হোক, এখন আমাদের হাতে যে অল্প সময় রয়েছে, সেটার সদব্যবহার করতে হবে। তাই চলুন, যে-ঘরগুলো দেখতে এসেছি আগে সেগুলো ভাল করে দেখে নিই।”

 

বাড়িটা পাথরের। বাইরেটা ছাই ছাই রঙের। কোথাও কোথাও দেওয়ালে শ্যাওলার ছোপ পড়ে গেছে। বাড়িটার মাঝখানটা উঁচু। দু’ পাশে দুটো অংশ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা অতিকায় কাঁকড়া দাড়া ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাড়িটার বাঁ দিকের অবস্থা শোচনীয়। জানলাটানলা সব ভেঙে পড়েছে। জানলাগুলো কাঠের পাটা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এক জায়গায় ছাদটা ধসে গেছে। বাড়ির মাঝখানটার অবস্থা ওই অংশের চেয়ে ভাল। সারানো হয়েছে। তবে ডান দিকটা দেখলেই মনে হয় মূল বাড়িটার চাইতে নতুন। চিমনি থেকে মাঝে মাঝে বেরোনো নীল ধোঁয়া দেখলেই বোঝা যায় যে, এদিকে লোকের বসবাস আছে। এই অংশের এক জায়গায় অবশ্য ভারা বাঁধা রয়েছে। কোনও কোনও জায়গায় দেওয়ালের পলেস্তারা খসিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে তখন কোনও রাজমিস্ত্রিকে ওখানে বা ওর কাছাকাছি কাজ করতে দেখলাম না। হোমস খুব ধীরে ধীরে সেই অযত্নে রাখা অপরিচ্ছন্ন বাগানের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত পায়চারি করতে লাগল। আর মাঝে মাঝে জানলার কাছে গিয়ে কী যেন দেখতে লাগল।

 

“মনে হয়, এই ঘরটা আপনার। তার পরেরটা আপনার বোনের। আর তারও পরেরটা ডাঃ রয়লটের। ডাক্তারের ঘরটা মনে হচ্ছে মূল বাড়ির লাগোয়া, তাই নয় ?”

 

“আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে এখন আমি আমার বোনের ঘরটা ব্যবহার করছি।”

 

“হ্যাঁ, যত দিন না আপনার ঘরের মেরামতি শেষ হচ্ছে। তবে বাইরে থেকে দেখে তো মনে হচ্ছে না যে, দেওয়ালটা সারানোর কোনও দরকার আছে।”

 

“কোনও দরকার নেই। এ শুধু একটা ছুতো করে আমাকে আমার ঘর থেকে বের করে দেওয়া।”

 

“আহ-হা! এটা একটা ভাববার কথা বটে। আচ্ছা, এর উলটো দিকে বারান্দা, তাই তো? আর বারান্দা দিয়ে ওই ঘরগুলোয় ঢুকতে-বেরোতে হয়। আচ্ছা, বারান্দার দিকে কি জানলা আছে?”

 

“আছে। তবে সেগুলো খুবই ছোট। ওই জানলা দিয়ে কারও পক্ষেই ঢোকা বা বেরোনো সম্ভব নয়।”

 

“আপনারা তো ঘরের দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে থাকেন। তা হলে বোঝা যাচ্ছে যে, ওই দিক দিয়ে কারও পক্ষে আপনাদের ঘরে ঢোকা সম্ভব নয়। আচ্ছা, আপনি একবার ঘরে গিয়ে জানলাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিন তো।”

 

মিস স্টোনার হোমসের কথামতো কাজ করলেন। হোমস জানলাটা নানা রকম ভাবে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে সেটাকে বহু ভাবে খোলবার চেষ্টা করল। কিন্তু জানলার পাল্লা খোলা গেল না। খোলা যাবে কী করে? কোথাও এমন একটুও ফাঁক নেই, যেখান দিয়ে কোনও ছুরির ফলা ঢোকানো যেতে পারে। হোমস তার আতশকাচ দিয়ে জানলার কবজাগুলো দেখল। লোহার মোটা পাত দিয়ে তৈরি করা কবজাগুলো দেওয়ালের সঙ্গে একেবারে সেঁটে বসানো।

 

“হুঁ।” গালে হাত বুলোতে বুলোতে হোমস বলল, “ব্যাপারটা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। যে রকম ভেবেছিলাম সে রকম তো নয়। ভেতর থেকে বন্ধ থাকলে এ জানলা বাইরে থেকে খুলে ঘরের ভেতর ঢোকা তো অসম্ভব ব্যাপার ?…চলো এখন ঘরের ভেতরটা দেখি, যদি কোনও রকম হদিস পাওয়া যায়।”

 

একটা ছোট দরজা দিয়ে আমরা বারান্দায় ঢুকলাম। বারান্দাটা চুনকাম করা। এই বারান্দা দিয়েই ঘরে ঢুকতে হয়। অন্য কোনও ঘরে না গিয়ে হোমস প্রথমেই মাঝের ঘরে গেল, যে ঘরে এখন মিস স্টোনার থাকছেন। এই ঘরেই তাঁর বোন জুলিয়া রহস্যময় ভাবে মারা পড়েছে। ঘরটা আকারে বেশ ছোট। নিচুও বটে। ঘরের মধ্যে একটা সাবেকি আমলের মস্ত বড় ফায়ারপ্লেস। এক কোণে একটা ছোট আলমারি। আর এক কোণে একটা একজনের শোবার মতো খাট। জানলার এক পাশে একটা ড্রেসিং টেবিল। আর দুটো বেতের চেয়ার। ঘরের আসবাব বলতে এই। ঘরের দেওয়ালে ওক কাঠের প্যানেল। প্যানেলের পালিশ চটে গেছে। কোথাও কোথাও পোকা লেগেছে। বুঝলাম বাড়িটা তৈরি হবার সময়েই ওই প্যানেল বসানো হয়েছিল। তারপর থেকে প্যানেলের আর রংটং হয়নি। হোমস চেয়ার টেনে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। কিন্তু বুঝলাম যে, সে ঘরের প্রত্যেকটি ইঞ্চি খুঁটিয়ে দেখছে।

 

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হোমস বলল, “আচ্ছা, খাটের ধারে ওই দড়িটা কেন ঝোলানো রয়েছে?”

 

“এটা আমাদের ওই যে কাজের লোকটি আছে, তাকে ডাকবার জন্যে।”

 

“দেখে মনে হচ্ছে এটা খুব বেশি দিন লাগানো হয়নি।” “না। এই বছর দুই হল লাগানো হয়েছে।” “আপনার বোনের কথামতো লাগানো হয়েছিল নিশ্চয় ?”

 

“না। আমি কখনও ওকে এটা বাজাতে শুনিনি। বা দেখিনি। নিজেদের কাজ আমরা নিজেরাই করে নিই।”

 

“তা হলে তো দেখছি এই সুন্দর ঘণ্টা-টানা দড়িটা নেহাত মিছিমিছি খাটানো হয়েছে। যাই হোক, এখন ঘরের মেঝেটা একবার দেখি।” কোথাও কোনও ফাঁকফোকর আছে কিনা দেখবার জন্যে হোমস চোখে আতশকাচ লাগিয়ে কখনও বা মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল, কখনও বা কচিছেলের মতো হামাগুড়ি দিতে লাগল। ঘরের মেঝে দেখে যখন সে সন্তুষ্ট হল, তখন ঘরের প্যানেলটা ভাল করে দেখল। সেটা দেখা হয়ে গেলে হোমস বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কী যেন দেখল। তারপর সেই ঘণ্টা-টানা দড়িটা ধরে এক হেঁচকা টান দিল।

 

“কী কাণ্ড! এটা তো দেখছি ভুয়ো।”

 

“কেন, বাজছে না?”

 

“না। এটা কোনও ঘণ্টার তারের সঙ্গে লাগানো নেই। খুবই আশ্চর্য ব্যাপার তো! এই তো এখান থেকে দেখুন, এটা ঘুলঘুলির সঙ্গে একটা আংটা দিয়ে বাঁধা।”

 

“এ আবার কী উদ্ভট কাণ্ড। এটা তো আগে লক্ষ করিনি,” মিস স্টোনার বললেন।

 

“সত্যিই উদ্ভট,” তারপর দড়িটা টানতে টানতে খানিকটা যেন নিজের মনেই হোমস বলল, “এই ঘরটার দু’-একটা বিশেষত্ব লক্ষ করবার মতো। যেমন এই ঘুলঘুলিটা। যে রাজমিস্ত্রি এটা করেছে, সে তো একদম আহাম্মক। লোকে ঘুলঘুলি করে হাওয়া-বাতাসের জন্যে। সেই জন্যে ঘুলঘুলিটা করা উচিত ছিল বারান্দার দিকে। কিন্তু বোকারাম তা না করে ঘুলঘুলির মুখটা করেছে আর একটা ঘরের দিকে।”

 

হোমসকে বাধা দিয়ে মিস স্টোনার বললেন, “এই ঘুলঘুলিটা কিন্তু পরে করানো হয়েছিল।”

 

“বোধহয় ওই ঘণ্টাটা লাগাবার সময়েই এই ঘুলঘুলিটা করা হয়েছিল।”

 

“হ্যাঁ। তখন বেশ কিছু টুকিটাকি মেরামতির কাজ আর অদলবদল করা হয়েছিল।”

 

“বেশ অভিনব অদলবদল। ভুয়ো ঘণ্টা-টানা দড়ি, এমন ঘুলঘুলি যা দিয়ে বাইরের হাওয়া ঢুকবে না।…মিস স্টোনার, যদি আপত্তি না করেন তো এখন আমরা অন্য ঘরগুলো দেখব।”

 

ডঃ রয়লটের ঘর অন্য ঘর দুটোর তুলনায় আকারে বড়। অন্য ঘরের মতো এ ঘরেও আসবাবপত্র কম। একটা ক্যাম্পখাট, একটা বই-ঠাসা কাঠের ব্যাক। বইগুলো বেশির ভাগই বিজ্ঞানের বিষয়ে। খাটের পাশেই একটা আরামকেদারা। ঘরের অন্য আসবাব বলতে আর যা কিছু, তা হল দেওয়ালের ধারে রাখা একটা কাঠের চেয়ার, একটা গোল টেবিল, আর একটা বড় আয়রনসেফ। হোমস ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকটা জিনিস ভাল করে দেখল।

 

আয়রনসেফটায় টোকা মেরে বলল, “এর মধ্যে কী আছে?”

 

“ওঁর সব দরকারি কাগজপত্র।”

 

“ও। এর ভেতরটা আপনি দেখেছেন?”

 

“হ্যাঁ, অনেকদিন আগে একবার দেখেছিলাম। ভেতরটা কাগজপত্রে ভরতি।”

 

“আচ্ছা, এর মধ্যে বেড়ালটেড়াল নেই তো?”

 

“কী আশ্চর্য। সেফের মধ্যে বেড়াল থাকতে যাবে কেন?”

 

“তা হলে এটা কী?” সেফের ওপর থেকে হোমস একটা ডিশ পেড়ে দেখাল। ডিশটাতে দুধ রয়েছে।

 

“না, আমাদের পোষা বেড়াল নেই। তবে বাড়িতে একটা চিতা আর বেবুন আছে।”

 

“হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক কথা। চিতা যদিও আসলে বড় আকারের বেড়ালই বটে, তবু এই ছোট ডিশের সামান্য দুধটুকুতে ওর খিদে মিটবে কিনা বলা শক্ত।…তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হতে চাই।”

 

হোমস কাঠের চেয়ারটার সামনে উবু হয়ে বসে পড়ল। তারপর চেয়ারের বসার জায়গাটা আতশকাচ দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। “যাক, ব্যাপারটার কিনারা হয়ে গেল, আতশকাচটা পকেটে পুরতে পুরতে হোমস বলে উঠল, “আরে, এটা আবার এখানে কেন?” যে-জিনিসটার ওপর হোমসের নজর পড়েছিল, সেটা আর কিছু নয়, কুকুরের গলার বকলসের সঙ্গে একটা দড়ি। দড়িটা খাটের একধারে ঝোলানো ছিল। দড়িটার একটা মুখ পাকিয়ে ফাঁসের মতো করা। প্রয়োজনে এটা চাবুক হিসেবে ব্যবহার করা চলবে।

 

“ওয়াটসন, এটা দেখে কী মনে হচ্ছে?”

 

“এটা যে কুকুরের গলায় আটকাবার একটা সাধারণ দড়ি সেটা বুঝেছি, কিন্তু এখানে এটা এ ভাবে রাখার কী মানে সেটা মাথায় ঢুকছে না।”

 

“বলেছ ঠিকই, জিনিসটা এখানে বেমানান।…ওহ, দেশটা বজ্জাতিতে ভরে গেছে। যখন বুদ্ধিমান লোক শয়তানির পথ ধরে, তখনই হয় মুশকিল। আমার যা দেখবার দেখা হয়ে গেছে। চলন মিস স্টোনার, আমরা এখন বাগানে বেড়াতে বেড়াতে কথাবার্তা বলি।”

 

আমি এর আগে কখনও কোনও অবস্থায় হোমসকে এত গম্ভীর আর উদ্‌বিগ্ন হতে দেখিনি। তার চোখ-মুখ দেখে বুঝতে পারলাম, কোনও বিশেষ কারণে সে খুব বিচলিত আর চিন্তিত হয়ে পড়েছে।

 

ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হোমস কোনও কথা না বলে বাগানের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত পায়চারি করতে লাগল। হোমসের গম্ভীর মুখ দেখে আমরা কেউ কোনও কথা বলতে সাহস করিনি।

 

হঠাৎ এক সময় নিস্তব্ধতা ভেঙে হোমস বলল, “মিস স্টোনার, অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে আপনাকে আমার পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে।”

 

“আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।”

 

“অত্যন্ত মারাত্মক পরিস্থিতি। একটু দোনামোনা করলে ভীষণ বিপদ হবে। আমার পরামর্শ শোনা বা না-শোনার ওপর আপনার জীবন-মরণ নির্ভর করছে।”

 

“আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনার সব কথা আমি শুনব।”

 

“প্রথম কথা হচ্ছে আজ রাত্রে আমি আর আমার বন্ধু আপনার ঘরে থাকব।”

 

আমি আর মিস স্টোনার অবাক হয়ে হোমসের দিকে তাকাতে হোমস বলল, “হ্যাঁ, এ ব্যবস্থাটা করতেই হবে। বলছি শুনুন। এখানে নিশ্চয় রাত কাটাবার মতো হোটেল আছে?”

 

“হ্যাঁ, ক্রাউন ইনু বলে একটা আস্তানা আছে।”

 

“খুব ভাল। সেখান থেকে কি আপনার ঘরটা দেখা যায় ?”

 

“হ্যাঁ, দেখা যায়।”

 

“বেশ। এবার ভাল করে শুনুন। আপনার বিপিতা ফিরে আসামাত্রই আপনি মাথা ধরার ছুতো করে আপনার ঘরে খিল লাগিয়ে শুয়ে পড়বেন। তারপর যখন বুঝবেন যে আপনার বিপিতা শুয়ে পড়েছেন, তখন খুব সাবধানে আপনার ঘরের বাগানের দিকে জানলাটা খুলে সেখানে একটা মোমবাতি জ্বেলে বসিয়ে দিয়ে আপনার জিনিসপত্র নিয়ে আপনার নিজের ঘরে চলে যাবেন। সে ঘরে মিস্ত্রির কাজ চলছে বলে আপনার শুতে হয়তো একটু অসুবিধে হবে। কিন্তু এক রাত্তিরের জন্যে সে অসুবিধে মেনে নিতেই হবে। তবে সাবধান, সব ব্যাপারটা চুপিসারে করতে হবে, কেউ যেন টের না পায়।”

 

“ঠিক আছে। আমার ও ঘরে শুতে কোনও অসুবিধে হবে না।”

 

‘ভাল কথা। বাকিটা আপনি আমাদের হাতে ছেড়ে দিন।”

 

“আপনারা কী করবেন?”

 

“আজ রাতটা আপনার ঘরে থেকে, যে-শব্দের জন্যে আপনার ঘুম হয়নি তার কারণটা খুঁজে বের করব।”

 

হোমসের কোটের হাতটা চেপে ধরে মিস স্টোনার বললেন, “মিঃ হোমস, আমার মনে হচ্ছে আপনি যেন কিছু আঁচ করেছেন?”

 

“হয়তো করেছি।”

 

“তা হলে দয়া করে আমার বোনের মৃত্যুর কারণটা আমায় বলুন।”

 

“দেখুন, সব কথা খুলে বলবার আগে আমার আরও প্রমাণ চাই।”

 

“অন্তত এটুকু বলুন যে, তার মৃত্যুর সম্বন্ধে আমি যা ভেবেছি সেটা ঠিক কি না। জুলিয়া কি ভয় পেয়েই মারা পড়েনি?”

 

“আমি তা মনে করি না। আপনার বোন নিছক ভয় পেয়েই মারা পড়েননি। তাঁর মৃত্যুর পিছনে বাস্তব কারণ ছিল।…মিস স্টোনার, এখন আমরা আপনার কাছ থেকে বিদায় নেব। ডঃ রয়লট যদি হঠাৎ এসে পড়ে দেখেন যে, আমরা আপনার সঙ্গে কথা বলছি, তা হলে যে-জন্যে আমাদের আসা সেটাই ব্যর্থ হবে। এখন চলি। মনে ভরসা রাখুন। যে রকম বললাম, সেই মতো কাজ করলে আপনার সব বিপদ কেটে যাবে।”

 

মিস স্টোনারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা সোজা এলাম ক্রাউন ইন-এ। সেখানে রাত কাটাবার উপযুক্ত একটা ঘর পাওয়া গেল। আমরা দোতলার ঘর নিলাম। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে মিস স্টোনারদের বাড়িটা পরিষ্কার দেখা যায়। সন্ধের একটু পরে দেখলাম যে, ডঃ গ্রিমসবি রয়লট একটা গাড়ি করে বাড়ি ফিরছেন। তাঁর দৈত্যের মতো বিশাল চেহারার পাশে পুঁচকে কোচোয়ান ছোকরাকে বামনের মতো মনে হচ্ছিল। বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কোচোয়ান ছেলেটা লোহার গেট খুলতে গেল। বেচারা বোধহয় ভারী গেটটা খুলতে পারছিল না। আমরা দেখলাম ডাক্তার চিৎকার করে ছেলেটাকে কী সব বলছে আর ঘুসি পাকিয়ে শাসাচ্ছে। একটু পরেই গাড়িটা গেটের ভেতরে ঢুকে গেল। আর তার অল্পক্ষণ পরেই একটা ঘরের আলো জ্বলে উঠল।

 

আমরা ঘর অন্ধকার করে বসেছিলাম। “ওয়াটসন, আজ রাত্তিরে তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না। বিপদের ঝুঁকি বড় বেশি।”

 

“আমি কি তোমাকে কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারব?”

 

“তুমি থাকলে আমার খুব সুবিধে হবে।”

 

“তা হলে আমি অবশ্যই যাব।”

 

“আমি জানতাম।”

 

“হোমস, তুমি বার বার বিপদের কথা বলছ। বুঝতে পারছি ওখানে তুমি এমন কিছু দেখেছ যা নিশ্চয়ই আমার নজর এড়িয়ে গেছে। একটু বুঝিয়ে দেবে?”

 

“না, ঠিক তা নয়। আমার ধারণা, আমি কিছু কিছু সঠিক সিদ্ধান্ত করতে পেরেছি। তুমি যা দেখেছ আমিও তা-ই দেখেছি।”

 

“সত্যি কথা বলতে কী, আমি কিন্তু ওই ঘণ্টা-টানা দড়িটা ছাড়া বিশেষ করে চোখে পড়বার মতো আর কিছু দেখতে পাইনি। তবে কী উদ্দেশ্যে ওই দড়িটা ওই জায়গায় ঝোলানো আছে তা বুঝতে পারিনি।”

 

“ওই ঘুলঘুলিটা তোমার নজরে পড়েনি?”

 

“হ্যাঁ, তবে দুটো ঘরের মধ্যে ঘুলঘুলি থাকাটা এমন কী আশ্চর্যের ব্যাপার তা আমার মাথায় ঢুকছে না। আর ঘুলঘুলিটা এতই ছোট যে, ওর মধ্যে দিয়ে একটা বড় ইঁদুরও গলতে পারবে না।”

 

“ওয়াটসন, স্টোক মোরানে আসবার আগে থেকেই আমি জানতাম যে, ওখানে ওই ঘুলঘুলিটা আছে।”

 

“হোমস!!!”

 

“জানতাম বই কী! তোমার মনে আছে বোধহয় যে, মিস স্টোনার বলেছিলেন তার বোন প্রায়ই রয়লটের কড়া তামাকের গন্ধ পেতেন। এর থেকে তো বোঝা যায় যে, দুটো ঘরের মধ্যে অন্তত পক্ষে একটা হাওয়া চলাচলের মতো রন্ধ্র আছে। আর এই পথটা নিশ্চয়ই খুবই ছোট। না হলে এটা করোনার ভদ্রলোকের চোখে পড়ত। তাই একটা ঘুলঘুলি থাকবে বলেই আমি সিদ্ধান্ত করেছিলাম।”

 

“কিন্তু একটা ছোট ঘুলঘুলি থাকাটা দোষের কী হল!”

 

“ঘটনাগুলো পর পর যেমন যেমন ঘটেছে, সেই তারিখগুলো মিলিয়ে দেখলে একটা অদ্ভুত কোইনসিডেন্স—মানে ঘটনার সন্নিপাত—নজরে পড়ে। একটা ঘুলঘুলি করানো হল, সেখান থেকে একটা দড়ি ঝোলানো হল, আর সেই ঘরে যে ভদ্রমহিলা শুতেন তিনি মারা গেলেন।”

 

“দেখো, তুমি যে যোগাযোগের কথা বলছ, সেটা আমি ঠিক ধরতে পারছি না।”

 

“তুমি কি বিছানাটা ভাল করে লক্ষ করেছিলে ?”

 

“না।”

 

“খাটটা ঘরের মেঝের সঙ্গে একেবারে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। তুমি কি কখনও মেঝের সঙ্গে আটকানো খাট দেখেছ ?”

 

“তা দেখিনি।”

 

“মানে ভদ্রমহিলার পক্ষে খাটটাকে ওই ঘরের অন্য কোনও জায়গায় সরিয়ে নেবার উপায় ছিল না। ঘুলঘুলি দড়ি আর খাট সব সময়ে একই জায়গায় একই অবস্থায় থাকতেই হবে। এখন অবশ্য ওটাকে দড়ি বলতে দোষ নেই। কেন না ওটার সঙ্গে কোনও ঘণ্টার যোগ নেই তা আমরা জেনে গেছি।”

 

“হোমস,” আমি চিৎকার করে উঠলাম, “তুমি কী বলতে চাইছ তা খানিকটা আন্দাজ করতে পারছি। আমরা ঠিক সময়ে এসে পড়েছি। খুব সূক্ষ্ম অথছ খুব জঘন্য ধরনের ক্রাইমকে আমরা হয়তো ঠেকাতে পারব।”

 

“হ্যাঁ, খুব সূক্ষ্ম আর খুবই জঘন্য। যখন কোনও ডাক্তার পাপের পথে যায় তখন সে সবচেয়ে খারাপ ধরনের ক্রিমিন্যাল হয়। পামার আর পিচাডের কথা তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে। এ কিন্তু আরও বুদ্ধিমান। তবে আমার বিশ্বাস, আমরা ওর চাইতেও ঘড়েল। যাই হোক, আজ রাত্তিরে সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই এসো, চুপচাপ বসে পাইপ খেতে খেতে সৎ চিন্তা করে মনটা প্রফুল্ল করা যাক।”

 

গাছের সারির ফাঁক দিয়ে নজর রাখতে রাখতে রাত ন’টা নাগাদ দেখলাম যে, মিস স্টোনারদের ঘরের আলোগুলো এক এক করে নিবে গেল। চারদিক অন্ধকারে ঢেকে গেল। এর প্রায় দু’ঘণ্টা পরে ঘড়িতে যখন ঢং ঢং করে এগারোটা বাজল, তখন অন্ধকারের মধ্যে একটা ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।

 

হোমস লাফিয়ে উঠল। “আলোটা মাঝের জানলায় জ্বলছে! ওইটে আমাদের সংকেত। চলো, ওঠা যাক।” আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বেরোবার আগে হোটেলের ম্যানেজারকে হোমস বলল, “আমরা এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। তিনি যদি রাত্তিরে আমাদের না ছাড়েন, তো হোটেলে আমরা না-ও ফিরতে পারি।” ঘোর অন্ধকারের মধ্যে আমরা পথে নামলাম। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। দূরে অন্ধকারের মধ্যে একটা মোমবাতির আলো লক্ষ করে আমরা এগিয়ে গেলাম এক অজানা বিপদের মোকাবিলা করতে।

 

বাড়ির ভেতর ঢুকতে আমাদের কোনও অসুবিধে হল না। পুরনো বাড়ির পাঁচিল অনেক জায়গায় ভেঙে গেছে। গাছের সারির মধ্যে দিয়ে সাবধানে আমরা লনে পৌঁছোলাম। তারপর লন পেরিয়ে যখন জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকতে যাব, তখনই একটা ঝোপের মধ্যে থেকে একটা কদাকার কী যেন এসে ঘাসের ওপর গড়াগড়ি দিয়েই আবার চোখের পলক ফেলতে-না-ফেলতে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল।

 

আমি রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, “ওটা কী বলো তো?”

 

হোমসও একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তাই বোধহয় ও আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছিল। তারপর চাপা হাসি হেসে আমার কানে কানে বলল, “বেশ মজার গেরস্থালি বটে। ওটা সেই বেবুনটা।”

 

ডাক্তারের যে এই রকম বন্য জীবজন্তু পোষার শখ আছে, তা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল একটা চিতাও তো আছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে লাগল, যে-কোনও সময় সেটা আমাদের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়তে পারে। সত্যি কথা বলতে কী, হোমসের পেছন পেছন তার দেখাদেখি জুতো খুলে চুপিসারে ঘরে ঢুকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। হোমস জানলাটা বন্ধ করে দিল। মোমবাতিটা জানলা থেকে সরিয়ে এনে টেবিলের ওপর রাখল। মোমবাতির আলোয় সারা ঘরটা হোমস দেখে নিল। আমিও দেখলাম। দুপুরবেলায় যে রকম দেখেছিলাম, তার থেকে ভিন্ন রকম কিছু নজরে পড়ল না। আমার কাছে সরে এসে কানের সঙ্গে মুখ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে হোমস বলল, “কোনও রকম শব্দ কোরো না। তা হলে আমাদের চাল ভেস্তে যাবে।”

 

ঘাড় নেড়ে বললাম, “বুঝেছি।”

 

“অন্ধকারে বসে থাকতে হবে। আলো জ্বললে ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে দেখা যাবে।”

 

আমি যথাসম্ভব চুপি চুপি বললাম, “ঠিক আছে।”

 

“ঘুমিয়ে পোড়ো না যেন। তা হলে প্রাণ নিয়ে টানাটানি হতে পারে। রিভলভারটা হাতের কাছে রাখবে। দরকার হতে পারে। আমি বিছানার এক পাশে বসব। তুমি চেয়ারটায় বোসো।”

 

আমি খাপ থেকে রিভলভারটা বের করে টেবিলের ওপরে রাখলাম। হোমস সঙ্গে একটা ছিপছিপে লম্বা বেত নিয়ে এসেছিল। সেটাকে হোমস তার হাতের কাছে রাখল। তারপর হাতের কাছে দেশলাইটা রেখে ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিল। ঝপ করে অন্ধকার নেমে এল।

 

ওহ, সেই রাতের গায়ে-কাঁটা-দেওয়া রক্ত-জল-করা অভিজ্ঞতার কথা আমি এ জীবনে ভুলব না। চারদিক একেবারে চুপচাপ। কানে কোনও শব্দই আসছিল না। এমনকী, হোমসের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম না। যদিও জানি যে, ঘরের মধ্যেই সে আছে এবং জেগেই আছে। অনুমান করতে পারছিলাম যে, ভেতরে ভেতরে হোমসও খুব উত্তেজিত হয়ে আছে। জানলার পাল্লা বন্ধ করে দেওয়ায় ঘরে আলোর ছিটেফোঁটাও আসছিল না। নিরেট অন্ধকারের মধ্যে বসে আছি। মাঝে মাঝে রাতচরা পাখির চিৎকার কানে আসছিল। এক সময় জানলার ও পাশ থেকে একটা গর্‌র্‌র্‌র্‌ গর্জন শুনে বুঝতে পারলাম, চিতাটাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পনেরো মিনিট অন্তর অন্তর গির্জার ঘড়িতে ঘণ্টা শোনা যাচ্ছিল। যদিও ঠিক পনেরো মিনিট অন্তরই ঘণ্টা পড়ছিল, আমার কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন অনেকক্ষণ পরে ঘণ্টা পড়ছে। এই ভাবে এক সময় বারোটা বাজল। একটা বাজল। দুটো বাজল। এক সময় তিনটে বাজল। আমি ভাবলাম, আমাদের হয়তো কিছু ঘটে কিনা দেখবার জন্যে সারা রাতই এই ভাবে বসে থাকতে হবে। হঠাৎ ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে আলোর ঝলকানি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। একটু পরে পোড়া তেলের আর লোহা বা ওই জাতীয় কোনও ধাতুকে গরম করলে যেমন গন্ধ বের হয়, সে রকম গন্ধ নাকে এল। বুঝলাম পাশের ঘরে কেউ ঢাকা দেওয়া লণ্ঠন জ্বালল। শুনলাম পাশের ঘরে কেউ পা টিপে টিপে চলাফেরা করছে। একটু পরেই আবার সব চুপচাপ। কেবল গন্ধটা ক্রমেই বাড়তে লাগল। প্রায় আধ ঘণ্টা কান খাড়া করে বসে রইলাম। হঠাৎ একটা চাপা শব্দ কানে আসতে লাগল। কেতলিতে জল ফুটে গেলে যে রকম শব্দ হয়, অনেকটা সেই রকম শব্দ। শব্দটা শোনা মাত্রই হোমস ফস করে দেশলাই জ্বালিয়ে সেই দড়িটার ওপর পাগলের মতো সপাসপ বেত মারতে লাগল।

 

হোমস চেঁচিয়ে উঠল, “ওয়াটসন, দেখতে পেয়েছ? ওটাকে দেখতে পেয়েছ।”

 

আমি কিন্তু কিছুই দেখতে পাইনি। হোমস যখন দেশলাই জ্বালল তখন খুব চাপা একটা শিস আমি শুনতে পেয়েছিলাম। কিন্তু ঘোর অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠায় আমার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। তাই হোমস বেত চালাচ্ছে এটা দেখেছিলাম, কিন্তু কার ওপর সে ও রকম নির্দয় ভাবে বেত চালাচ্ছিল সেটা দেখতে পাইনি। তবে হোমসের মুখে তখন রাগ আর ঘৃণা ফুটে বেরোচ্ছিল।

 

বেশ কিছুক্ষণ পাগলের মতো এলোপাথাড়ি বেত চালাবার পর হোমস ঠান্ডা হল। তারপর সে ঘুলঘুলির দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খান খান করে ভেঙে উঠল আর্ত চিৎকারের পর চিৎকার। ভয়, রাগ আর যন্ত্রণা এই তিনে মিলে সে আর্তনাদকে এমন ভয়ানক করে তুলেছিল যা যে না শুনেছে তাকে বলে বোঝানো যাবে না। তার পরের দিন আমরা খবর পেয়েছিলাম যে, সেই আর্তনাদ গ্রামের লোকেরাও শুনেছিল, তবে স্রেফ ভয়ে তারা কেউ বাড়ি থেকে বেরোয়নি। এখন স্বীকার করতে লজ্জা নেই, সেই সময়ে ওই প্রাণফাটা চিৎকার শুনে আমার নিজেরই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আমি কোনও কথা না বলে হোমসের মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। হোমসও আমার দিকে তাকিয়েছিল। এক সময় সেই রক্ত-জল-করা আর্তনাদ থেমে গেল।

 

একটু ধাতস্থ হয়ে হোমসকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী, ব্যাপারটা কী!”

 

“সব শেষ হয়ে গেল,” হোমস বলল। “সব দিক দিয়ে দেখলে এটাই হয়তো ভাল হল। আমরা এখন ডঃ রয়লটের ঘরে যাব।”

 

হোমস মোমবাতি জ্বালল। আমরা বারান্দায় এলাম। হোমসের মুখ অসম্ভব রকম গম্ভীর। হোমস বারদুয়েক ডঃ রয়লটের ঘরে টোকা দিল। কোনও সাড়া নেই। তখন হোমস দরজার হাতল ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকল। তার পিছু পিছু আমিও ঢুকলাম। আমি রিভলভারটা বাগিয়ে ধরলাম।

 

ঘরে ঢুকে যে-দৃশ্য চোখে পড়ল, তা দেখে আমি অবাক। টেবিলের ওপরে একটা ঢাকা-দেওয়া লণ্ঠন জ্বলছে। লণ্ঠনের ঢাকনাটা সরানো। লণ্ঠনের আলোটা গিয়ে পড়েছে লোহার সেফটায়। সেফটা খোলা। টেবিলের কাছে একটা কাঠের চেয়ারে রয়লট বসেছিলেন। গায়ে একটা ছাই রঙের ড্রেসিং গাউন। পায়ে লাল রঙের টার্কিশ চটি। তাঁর কোলের ওপর সেই কুকুর-বাঁধা দড়িটা গোটানো রয়েছে। তাঁর ঘাড়টা কাত করা। চোখের দৃষ্টি ঘরের ছাতের দিকে। তাঁর চোখের তারায় ফুটে উঠেছে সাংঘাতিক ভয়ের ভাব। কপালে একটা নতুন ধরনের হলদে পটি বাঁধা ছিল। পটিটায় খয়েরি রংয়ের ফোঁটা দেওয়া। আমাদের ঘরে ঢোকার শব্দ পেয়েও রয়লট কোনও সাড়াশব্দ দিলেন না।

 

“ওইটেই সেই ফেট্টি। বুটিদার ফেট্টি!” হোমস ফিসফিস করে বলল।

 

আমি এক পা এগিয়ে গেলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে রয়লটের কপালের অদ্ভুত পটিটা নড়ে উঠল। তাঁর মাথার ঘন চুলের জঙ্গল থেকে মাথা তুলল একটা সাপ!

 

“খরিশ জাতের সাপ। ভারতবর্ষের অতি বিষাক্ত সাপ। এর কামড় খাবার দশ সেকেন্ডের মধ্যে ইনি মারা পড়েছেন। হিংসের পথে গেলে শেষ পর্যন্ত এই রকমই হয়। যে অপরকে বিপদে ফেলবার জন্যে ফাঁদ পাতে, একদিন সেই ফাঁদে পা দিয়ে সে নিজেই বিপদে পড়ে। আগে এই জীবটাকে এর গর্তে পুরে দিই। তারপর মিস স্টোনারকে তার মাসির বাড়িতে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে পুলিশকে খবর দিলেই হবে।” হোমস বলল।

 

আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে অত্যন্ত ক্ষিপ্র ভাবে হোমস মৃত ডাক্তারের কোল থেকে ফাঁস দেওয়া দড়িটা তুলে নিল। তারপর অব্যর্থ নিশানায় ফাঁসের দিকটা সাপটার দিকে ছুড়ে এক হেঁচকা টান লাগাল। ফাঁসটা সাপের মাথায় টেনে বসে গেল। তারপর খুব সাবধানে শরীর থেকে যতখানি সম্ভব দূরে রেখে সবসুদ্ধ সেফের মধ্যে ছুড়ে দিয়েই সেফের পাল্লাটা বন্ধ করে দিল।

 

এই হল ডঃ গ্রিমসবি রয়লটের মৃত্যুর আসল কাহিনী। এর পরের ঘটনার কথা, কী করে আমরা মিস স্টোনারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে তাঁর মাসির বাড়ি হ্যারোতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, কী ভাবে পুলিশ তদন্তে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে, ডঃ গ্রিমসবি রয়লটের হিংস্র জীবজন্তু পোষার শখ থেকেই দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হল, এই সব বলে আমার কাহিনীকে আর বাড়াব না। আমার নিজের যা জানবার ছিল, সেটা পরের দিন ট্রেনে ফেরবার পথে হোমসের কাছে জেনে নিলাম।

 

হোমস বলতে লাগল, “বুঝলে ওয়াটসন, আমি ভীষণ ভুল করতে যাচ্ছিলাম। এই কেসটা থেকে আমার এই শিক্ষা হল যে, সব তথ্য ঠিকমতো না সংগ্রহ করে কোনও সিদ্ধান্তে আসা কী ভয়ানক বিপজ্জনক। ওইখানে বেদেদের আনাগোনা আর ওই ‘ফেট্টি’ শব্দটা আমাকে একদম ভুল দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। তবে আমার বাহাদুরি এইটুকু যে, আমি সঙ্গে সঙ্গে ভুলটা বুঝতে পেরেছিলাম। আমি অকুস্থল পরীক্ষা করেই বুঝে নিয়েছিলাম যে, বিপদ বাইরে থেকে আসেনি। আমার নজর পড়ল ঘুলঘুলিটার দিকে, ওই ভুয়া ঘণ্টা-টানা দড়িটার দিকে আর খাটটাকে ওই জায়গায় সেঁটে রাখার ব্যাপারটার দিকে। আমার তখনই মনে হল যে, ওই দড়িটা ওখানে রাখা হয়েছে যাতে করে কোনও কিছু ওই ঘুলঘুলিটার ভেতর দিয়ে খাটের কাছে আসতে পারে। সাপের কথাটা আমার মাথায় তখনই আসে। বিশেষত ডঃ রয়লট প্রায়ই ভারতবর্ষ থেকে জীবজন্তু আমদানি করেন, এ কথাটাও আমার জানা ছিল। এই সাপে কামড়ালে বিষ খুব তাড়াতাড়ি কাজ করে। এটা ডঃ রয়লটের পক্ষে ভালই হয়েছিল। আর খুব ভাল করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না দেখলে সাপে কামড়ানোর দুটো ছোট্ট ফুটো সহজেই নজর এড়িয়ে যেতে পারে। তখন আমি শিসের কথাটা ভাবলাম। শিস দিয়ে সাপটাকে ডেকে নেওয়া হত, যাতে করে ওই ঘরে যে রয়েছে সাপটাকে সে দেখতে না পায়। যে-সময়টা উপযুক্ত বলে মনে হত, সেই সময়ে সাপটাকে ঘুলঘুলি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হত। তারপর দড়ি বেয়ে সাপটা খাটের ওপর নেমে আসত। এখন এমন তো কোনও কথা নেই যে, বিছানায় যে শুয়ে থাকবে সাপটা প্রথম দিনেই তাকে কামড়াবে। হয়তো পর পর কয়েক দিনই কামড়াবে না। তবে এ কথা ঠিক, একদিন-না-একদিন সাপ কামড়াবেই।

 

“ডঃ গ্রিমসবি রয়লটের ঘরে পা দেবার আগেই আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। তারপর ওঁর ঘরে গিয়ে দেখলাম যে, উনি ওঁর চেয়ারটার ওপর প্রায়ই উঠে দাঁড়াতেন। তা তো দাঁড়াতেই হবে। তা না হলে উনি ঘুলঘুলির নাগাল পাবেন কী করে? তারপর সিন্দুকের ওপর দুধের ডিশ, আর ওই দড়ির ফাঁস দেখে আমি নিশ্চিত হলাম যে, আমার সিদ্ধান্ত ভুল হয়নি। তারপর আমি প্রমাণ সংগ্রহের জন্যে কী করলাম, তা তো তুমি জানোই। সাপটার হিসহিস শুনেই আমি আলো জ্বেলে ওটার ওপরে বেত মারতে লাগলাম।”

 

“আর তার ফলে ওটা আবার যে-পথে এসেছিল, সে পথেই ফিরে গেল,” আমি বললাম।

 

“হ্যাঁ। আমার বেতের ঘা খেয়ে সাপটা খেপে গিয়ে মালিককেই কামড়ে দিল। বোধহয় ডঃ রয়লটের মৃত্যুর জন্যে আমি কিছুটা দায়ী। তবে সত্যি কথা বলতে কী, তার জন্যে আমার একটুও অনুশোচনা হচ্ছে না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *