ব্রিফকেস রহস্য (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
চার
বিকেলে সহসা প্রাকৃতিক উপদ্রব। তুমুল বৃষ্টি এবং মেঘের গর্জন। সেই সঙ্গে ঝাঁপিয়ে আসা এলোমেলো হওয়া। শ্যুটিংয়ের তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। পণ্ড হয়ে গেল।
শরৎকালে এ উপদ্রব অপ্রত্যাশিত ছিল না। কদিন থেকে গুমোট গরম পড়েছিল। নিসর্গ ছিল পটে আঁকা ছবির মতো স্থির। এখন চারদিকে জোরালো আলোড়ন। চোখ ধাঁধানো বিদ্যুতের মুহুর্মুহু চাবুক।
বারীন্দ্রনাথ ফিল্মের লোকেদের সভয়ে পালিয়ে যাওয়া দেখে মনে মনে হাসছিলেন। একসময় টের পেলেন বৃষ্টির ছাঁট এসে তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। পাইনের ডালগুলো হেঁটে ফেলা ঠিক হয়নি। আসলে আউটহাউসের পুরোটা যাতে চোখে পড়ে, সেইজন্য বাবুরামকে কতকগুলো ডাল দেখিয়ে দিয়েছিলেন। বাবুরাম এ বাড়ির পুরনো মালী। এসব কাজ সে শিল্পীর দক্ষতায় করতে পারে। পাইনগাছটার দিকে তাকালে এখন বরং ছিমছাম লাগে।
জনি মেঘ ডাকলে ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। রুক্মিণী তাকে পাশের ঘরে রেখে এসেছে। ও ঘরে কিছু পুরনো আসবাব আছে। দুটো আলমারি আর একটা আয়রন চেস্ট আছে। জনির মন্দ লাগবে না।
বারীন্দ্রনাথ হুইলচেয়ার গড়িয়ে তাঁর শোওয়ার ঘরের দরজার কাছে সরে এলেন। একটা সিগারেট ধরালেন। সৌম্য বলে গিয়েছিল, চারটেয় নীতা সোম আসবে। এদিন সে নাকি খুব ক্লান্ত। শুটিংয়ের মেজাজ নেই। চারটে বাজতে দু মিনিট বাকি। এখনই ঘরের ভেতর আবছা আঁধার ঘনিয়েছে। বারীন্দ্রনাথ ডাকলেন, রুক্মিণী!
রুক্মিণী দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। জি বড়াসাব বলে ছুটে এল।
বারীন্দ্রনাথ বললেন, আলো জ্বেলে দে।
রুক্মিণী তার পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে সুইচ টিপে বলল, কারেন্ট বন্ধ আছে বড়াসাব!
বারীন্দ্রনাথ একটু হেসে বললেন, ট্রান্সফর্মারে বাজ পড়ে গেল নাকি দ্যাখ। সিনেমার বাবুরা আজ রাতে ঝিলের ডাইনির পাল্লায় পড়বে। কী বলিস?
রুক্মিণী হেসে ফেলল। তারপর বলল, চিনাবাত্তি জ্বেলে দিই বড়াসাব। মাচিস কোথায় রাখলেন?
নিয়ে আয়। আমি লাইটারে জ্বেলে দিই। আমার কাছে দেশলাই নেই।
চিনা লণ্ঠন টেবিলে রেখে রুক্মিণী বলল, চা আনব বড়াসাব?
পুরো একপট চা নিয়ে আয়। দুটো কাপপ্লেট আনিস। কেমন?
রুক্মিণী চলে গেল। প্রতীক্ষা একটা দুঃসহ ঘটনা মানুষের জীবনে। সৌম্য কি ডাইরেক্টর ভদ্রলোকের সঙ্গে আউটহাউসে চলে গেছে? বৃষ্টি সমানে ঝরছে। এলোমেলো হাওয়া বইছে। আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়ে গেল ক্রমশ।
সুদক্ষিণা দক্ষিণের বারান্দা ঘুরে এলেন। তার সঙ্গে দুই যুবতী। সুদক্ষিণা বললেন, কারেন্ট নেই। হঠাৎ কি বিচ্ছিরি উৎপাত। আমি বললাম, ওপরে চলো বরং। দাদা আলাপ করতে চেয়েছেন।
বারীন্দ্রনাথ নীতার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি নীতা সোম?
নীতা একটু ঝুঁকে করজোড়ে নমস্কার করল। তার পরনে শাড়ি। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। সিনেমার নায়িকাদের আদল তার মুখে।
বারীন্দ্রনাথ হুইলচেয়ার গড়িয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, বসো। বাইরে বৃষ্টির ছাঁট আসছে।
নীতা শান্তভাবে বসল। রাত্রির পরনে সালোয়ার কামিজ। পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলে বারীন্দ্রনাথ বললেন, কাঠের পা প্রণাম নেয় না। বসো। তোমার নাম কী?
রাত্রি সেন।
বাহ। অসাধারণ নাম। তুমি ফিল্ম জার্নালিস্ট? কোন কাগজের?
আমি ফ্রি ল্যান্সার।
সকালে একটি ছেলে আলাপ করতে এসেছিল। অরিত্র সেন। বাই এনি চান্স, তোমাদের দুই সেনের মধ্যে কোনও আত্মীয়তা আছে কি?
রাত্রি মাথা নাড়ল। নাহ্। অরিত্র থিয়েটারে অভিনয় করে। সেই সূত্রে চেনা জানা আছে।
পুপু। রুক্মিণীকে চা আনতে বলেছি। তুমি গিয়ে দেখ। আরও একটা কাপপ্লেট পাঠিয়ে দিও। আর দ্বারিককে হলঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে বলো।
রাত্রি বলল, মাসিমা। আমি কিন্তু চা খাই না। নীতা। তুমি তো খাও।
নীতা বারীন্দ্রনাথকে দেখছিল। কোনও কথা বলল না। সুদক্ষিণা চলে গেলেন। বারীন্দ্রনাথ রাত্রির দিকে ঘুরে বললেন, রাত্রি। আমার মনে হচ্ছে তোমাদের মধ্যে বন্ধুতার সম্পর্ক আছে।
রাত্রি হাসল। আছে। আমি ওকে এক্সপ্লয়েট করি। তবে ওরও পাবলিসিটি হয়।
বারীন্দ্রনাথ সিগারেট অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে আস্তে বললেন, তুমি কিছু। মনে কোরো না। আমি নীতার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলব। প্রাইভেট অ্যান্ড কনফিডেনসিয়াল।
বলুন না। আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি। রাত্রি নীতার দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল।
বারান্দায় দাঁড়ালে ভিজে যাবে। বরং তুমি নীচে আমার বোনের সঙ্গে গল্প করতে পারো। বারীন্দ্রনাথ হাসলেন। শি টক্স মাচ। তো তুমি জার্নালিস্ট। ইউ লাইক টক্স।
আমি ফিল্ম জার্নালিস্ট।
হু। যে পরিবেশে এই ফিল্ম তোলা হচ্ছে, সে বিষয়ে ডিটেলস জানতে পারবে। এবাড়ির একটা ইতিহাস আছে। তা ছাড়া উত্তরের ওই ঝিলটার নাম ডাইনির ঝিল। ইন্টারেস্টিং না?
রাত্রি হাসবার চেষ্টা করল। তারপর বেরিয়ে গেল। উত্তরের বারান্দার দিকে এগোতে গিয়ে ঘুরল দক্ষিণের বারান্দায়। তিনটে ঘরের পর হলঘরে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। সে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সুদক্ষিণা তাকে দেখতে পেয়ে নীচে ডাকলেন। হলঘরে টেবিলের ওপর একটা চিনা লণ্ঠন জ্বলছে। অনিচ্ছার সঙ্গে রাত্রি নেমে গেল। বলল-মাসিমা। আপনারা এমার্জেন্সি লাইট রাখেন না কেন? চার্জ দিয়ে রাখলেই তো লোডশেডিংয়ের সময় প্রচুর আলো পান।
সুদক্ষিণা বললেন, যতগুলো সৌম্য এনে দেয়, বেশিদিন টেকে না। দাদা কি নীতার সঙ্গে একা আলাপ করতে চাইলেন?
হ্যাঁ। আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
দাদার ওই এক বেয়াড়া স্বভাব। দেখবে, তোমার সঙ্গেও একা আলাপ করতে চাইবেন। ও কিছু না।
নীতা সোম আস্তে বলল, আমার সঙ্গে আপনার প্রাইভেট অ্যান্ড কনফিডেনসিয়াল কী কথা থাকতে পারে? আমি আপনাকে কখনও দেখিনি। চিনি না।
তোমাকে একটা ছবি দেখাব। বলে পকেট থেকে চাবি বের করলেন বারীন্দ্রনাথ। পাশের টেবিলের ড্রয়ার খুললেন। তারপর একটা খাম থেকে ছবি বের করে বললেন, দেখ তো, চিনতে পারো কি না?
নীতা ছবির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেছিল। কিন্তু মুহূর্তে শক্ত হয়ে উঠল সে। তারপর শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, কেন এ ছবি দেখাচ্ছেন আমাকে?
এই ভদ্রলোকের নাম এস কে রায়। ভদ্রমহিলা তার স্ত্রী। মাঝখানে তাদের মেয়ে–তোমার সঙ্গে আশ্চর্য মিল। এমন কি চিবুকের তিলটাও।
নীতা চুপ করে থাকল। রুক্মিণী এসে চা রেখে গেল। বারীন্দ্রনাথ চা তৈরি করে তার হাতে তুলে দিলেন। তারপর নিজের চা তৈরি করে চুমুক দিলেন। বললেন, দু বছর আগে ইতালির লা মারেম্মা পাইন উডসের মধ্যে একটা প্লেন ক্র্যাশল্যান্ডিং করেছিল। আমি সেই প্লেনের যাত্রী ছিলাম। আমার পাশের সিটে ছিলেন এস কে রায়। এমার্জেন্সি ডোর খুলে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি। মিঃ রায়ও আমার সঙ্গে ঝপ দেন। তার দুর্ভাগ্য। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিলাম। হঠাৎ উনি তুষারখাদে তলিয়ে যান। যাওয়ার মুহূর্তে ডান হাতে ওঁর ব্রিফকেসটা থেকে যায়। ফ্লোরেন্সের একটা হসপিট্যালে সুস্থ হয়ে ওঠার পর ব্রিফকেসটা আমি খুলেছিলাম। হাইট ওয়াজ লকড। আমি নার্সদের বলে একজন লক মেকানিকের সাহায্য নিয়েছিলাম।
নীতা ঠোঁট কামড়ে ধরে শুনছিল। বলল, কী ছিল ওতে?
কিছু জামাকাপড়। অনেকগুলো নেমকার্ড। কয়েকটা চিঠি। ছ মাস পরে এই অবস্থায় কলকাতায় ফিরলাম। তারপর তোক পাঠিয়ে মিঃ রায়ের ঠিকানায় খোঁজ নিলাম। শুনলাম মিঃ রায়ের স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে কোথায় চলে গেছেন। প্লেন কোম্পানির অফিসে যোগাযোগ করেছিলাম। আমি একজন এক্স এম পি। আমার বাবা মন্ত্রী ছিলেন। আই হ্যাড সো মেনি কনট্যাক্টস্, ইউ নো? তো ওঁরা জানালেন, মিসেস রায় সত্তর হাজার টাকা কম্পেনসেশন পেয়েছেন। আমি সব নিউজ পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। দুটো রেসপন্স পেয়েছিলাম। দুটোই জাল। পুলিসের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। মিসেস রায়ের ছবির সঙ্গে মেলেনি।
নীতা চুপ করে থাকল। তার দৃষ্টি নীচের দিকে।
বারীন্দ্রনাথ গম্ভীর মুখে বললেন, মিঃ রায় ছিলেন বিজনেসম্যান। তবে একই সঙ্গে অকশনিয়ারের কারবারও করতেন। ওঁর কাগজপত্র থেকে একথা জেনেছি। দামি জিনিস বিশেষ করে পুরনো ঐতিহাসিক জিনিস নিলামে কিনে অন্য দেশে নিলামে বেচতেন। ওঁর স্ত্রীর নাম তপতী রায়। মেয়ের নাম ঊর্মি।
নীতা চাপা শ্বাস ছেড়ে মাথা দোলাল। বলল, আমি বুঝতে পারছি না কিছু। গতরাতে কেউ আমার প্রাইভেট নাম্বারে ফোন করে থ্রেটন করেছিল, এখানে এলে নাকি আমার বিপদ হবে। এখন আপনি এসব কথা বলছেন। আমার অস্বস্তি হচ্ছে। প্লিজ স্টপ ইট।
বারীন্দ্রনাথ বললেন, তুমি চা খাচ্ছ না!
ইচ্ছে করছে না।
বারীন্দ্রনাথ সিগারেট ধরিয়ে বললেন, লা মারেম্মা পাইন উডস ভ্যালিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ডান হাতে আঘাত লেগেছিল। মিঃ রায় আমার এই হাতটা আঁকড়ে ধরেছিলেন। আমি জোর করে ছাড়িয়ে না নিলে হয়তো– হ্যাঁ। এই অপরাধবোধ আমার মধ্যে থেকে গেছে। তাই ওঁর ব্রিফকেস ওঁর স্ত্রী বা মেয়ের হাতে তুলে দিতে চাই। অ্যান্ড আই থিংক, আই অ্যাম নট টকিং টু দ্য রং পার্সন।
নীতা একবার তাকিয়েই চোখ নামাল।
বারীন্দ্রনাথ একটু হেসে বললেন, সৌম্য বলে, আমার নাকি সিক্সথ সেন্স আছে। সৌম্য কাল বিকেলে আমাকে এই ফিল্ম ম্যাগাজিনটা দিয়েছিল। এতে তোমার ছবি আছে। এনিওয়ে। তুমি এইমাত্র বললে, গতরাতে কে তোমাকে এখানে আসতে নিষেধ করে হুমকি দিয়েছে। কাজেই হা–তুমি ঊর্মি। এক মিনিট। তোমাকে ব্রিফকেসটা এনে দেখাচ্ছি।
নীতা ভাঙা গলায় বলল, প্লিজ। দ্য পাস্ট ইজ পাস্ট। আই ওয়ান্ট টু ফরগেট দ্যাট ন্যাস্টি টাইম।
ব্রিফকেসটা এখন তোমাকে দেব না। কারণ তোমার বাবা একটা খুব দামি জিনিস লন্ডনের অকশন হাউসের মাধ্যমে বেচতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেটা ওতে আছে। যাইহোক, তোমার মা কোথায় আছেন?
আমি নিজের মুখে বলতে পারব না। দ্যাট্রক্স এ স্ক্যান্ডালাস অ্যাফেয়ার।
ঊর্মি। এ খুব গোপনীয় ব্যাপার। তোমার প্রাণের ঝুঁকি আছে তা বুঝতে পেরেছি। এর মধ্যে কোনও থার্ড পার্সনকে টেনে আনা ঠিক নয়। বারীন্দ্রনাথ চাপা গলায় বললেন ফের, তোমার বন্ধুকে কিছু বোলো না।
নীতা একটু চুপ করে থাকার পর বলল, শি ইজ এ প্রাইভেট ডিটেকটিভ।
বলো কী, বারীন্দ্রনাথ হাসলেন। তারপর আবার গম্ভীর হয়ে বললেন, এটা তোমার কোনও সিনেমার গল্প না। রূঢ় বাস্তব।
রাত্রির একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে। ব্ল্যাক ক্যাট এসকর্ট সার্ভিস। নীতা চোখের জল মুছে ফের বলল, দ্য সন অব এ বিচ–যে লোকটা আমার মাকে এলোপ করেছিল, অ্যান্ড দ্যা ফুলিশ উওম্যান হ্যাড টু কমিট সুইসাইড রাত্রি তাকে ফিনিশ করেছে।
ফিনিশ? হোয়াট ডাজ দ্যাট মিন?
শি ইজ ডেঞ্জারাস।
বারীন্দ্রনাথ দরজার দিকে ধোঁয়ার রিং পাকিয়ে বললেন, দেন ইউ মাস্ট। অ্যাভয়েড হার।
রাত্রির কাছে আমার কিছু গোপন থাকে না।
এটা তোমাকে গোপন রাখতেই হবে, ঊর্মি।
প্লিজ ডোন্ট কল মি ঊর্মি। শি ইজ ডেড।
ঠিক আছে। বারীন্দ্রনাথ চোখ বুজে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, বাট আই ইনসিস্ট, ওকে ব্রিফকেসের কথা বোলো না।
গতরাতে আমাকে থ্রেটন করার কথা রাত্রিকে তখনই জানিয়েছিলাম। তারপর সে আমার সঙ্গে এসেছে। রিস্ক নিয়েও এসেছে। নাও ইউ থিংক।
বারীন্দ্রনাথ সিগারেট অ্যাসট্রেতে ঘষে নিবিয়ে দিলেন। সোজা হয়ে বসে বললেন, তুমি কি কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের নাম শুনেছ?
না। হু ইজ হি?
হি ইজ মোর জেঞ্জারাস দ্যান ইওর ডিটেকটিভ ফ্রেন্ড। তিনিও প্রয়োজনে কাকেও ফিনিশ করেন। তবে নট ইন দ্যাট সেন্স। ডোন্ট ফরগেট নীতা, আমি একজন এক্স এম পি। তুমি আমার কথা শোনো। এ ধরনের প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির কথা আমি জানি। ওরা আসলে ভাড়াটে গুণ্ডা পোষে। পুলিস এদের দিকে নজর রেখে চলে। হা–পুলিসকে এরা একটা শেয়ার দেয়। তাও জানি। অ্যান্ড আই মাস্ট টেল ইউ-অরিত্র ইজ ভেরি মাচ ইন্টারেস্টেড অ্যাবাউট দ্য প্লেনক্র্যাশ। রাত্রি আর অরিত্র পরস্পর পরিচিত।
এইসময় পাশের ঘরে জনির গর্জন শোনা গেল। বারীন্দ্রনাথ আস্তে বললেন, যা শুনেছ, ভুলে যাও। কেউ আসছে–যাকে জনি পছন্দ করে না। তুমি বসো। আমি দেখছি।
বারীন্দ্রনাথ হুইলচেয়ার গড়িয়ে বাইরে গেলেন। তিনি ডাকলেন, দ্বারিক। দ্বারিক।
রুক্মিণী দক্ষিণের বারান্দা দিয়ে দৌড়ে এল। জি বড়াসাব।
দ্বারিক কোথায়?
কিচেনে বৈঠে আছে। ঠাকুরমোশায়ের সঙ্গে কথা বলছে।
জনিকে নিয়ে আয়। শোন। এ ঘরের ভেতর দিয়ে যা। ও ঘরটা আমি ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছি। গলার চেন ধরে নিয়ে আসবি। দেখিস, আমার ঘরে ফিল্মের মেমসাব বসে আছে। জনির মেজাজের ঠিক থাকে না।
রুক্মিণী সাবধানে জনিকে নিয়ে এল। জনি নীতাকে দেখল। কিন্তু কিছু বলল না। বারীন্দ্রনাথ রুক্মিণীর কাছ থেকে জনিকে নিলেন। বললেন, তুই নীচে গিয়ে দ্বারিককে বল, সিঁড়ির মাথায় হ্যাঁজাগটা জ্বালিয়ে রাখবে।
বৃষ্টি টিপটিপ করে ঝরছে। হাওয়াটা থেমে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার ছমছম করছে নীচের দিকে। আউটহাউসে আলো জ্বলছে। বারীন্দ্রনাথ উত্তরের বারান্দা থেকে দরজার সামনে দিয়ে দক্ষিণের বারান্দায় গেলেন। তারপর ফিরে এলেন।
জনির গলার চেন ধরে হুইলচেয়ার গড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন বারীন্দ্রনাথ। তারপর টেবিলের একটা পায়ার সঙ্গে বেঁধে রাখলেন। কুকুরটা পিছনের দুই ঠ্যাং মুড়ে জিভ বের করে তাকিয়ে থাকল নীতার দিকে।
বারীন্দ্রনাথ বললেন, জনি লাইকস ইউ।
নীতা সেই ছবিটা দেখছিল। সে নিঃশব্দে কাঁদছিল। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে বলল, এই ছবিটা আমি নিতে পারি?
এখন নয়। যথাসময়ে এটা তুমি পাবে। ব্রিফকেসটাও পাবে। বারীন্দ্রনাথ ছবিটা নীতার হাত থেকে নিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে রাখলেন। তারপর ড্রয়ারে তালা এঁটে সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন, সেইসময় আউটহাউসের দিকে একটা চিৎকার-চাঁচামেচি শোনা গেল। জনি গরগর করে উঠল। বারীন্দ্রনাথ দ্রুত ওর গলার চেন ধরে না ফেললে টেবিলসুদ্ধ টেনে দরজার দিকে এগিয়ে যেত সে।
নীতা উঠে দাঁড়িয়েছিল। বারীন্দ্রনাথ বললেন, তুমি বসো। আমি দেখছি কী হয়েছে।
জনির চেন ধরে বারান্দায় গেলেন বারীন্দ্রনাথ। নীচের রাস্তার টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে কে দৌড়ে আসছে। বারীন্দ্রনাথ ডাকলেন, দ্বারিক। দ্বারিক।
হলঘরে সিঁড়ির মাথায় হ্যাঁজাগ জ্বলছে। দ্বারিকের সাড়া পাওয়া গেল নীচে পোর্টিকোর কাছে। তারপর সৌম্যের গলা শোনা গেল। সে দ্বারিককে কিছু বলল। দ্বারিক টর্চ জ্বালতে জ্বালতে আউটহাউসের দিকে দৌডুল। জনি সমানে গর্জন করছিল।
একটু পরে সৌম্য দক্ষিণের বারান্দা ঘুরে ছুটে এল। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, মামাবাবু। সাংঘাতিক ব্যাপার। অরিত্রকে কে মার্ডার করেছে।
একটু শান্ত হও। তারপর বলো।
এ একটা অসম্ভব ব্যাপার। আমরা মেঝেয় বসে স্ক্রিপ্ট শুনছিলাম। লক্ষ্য করিনি কখন অরিত্র করিডরের দরজা খুলে ঘাটে গেছে। বটুকদা বাইরে থেকে বললেন, ঘাটের দরজা খুলল কে? আমি অরিত্রকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাই মনে হল, রোয়িং করতে গেল নাকি। ও মাই গড! ঘাটে আলো ফেলে দেখি, অরিত্রের মাথায় চাপ-চাপ রক্ত-উপুড় হয়ে ঘাটের ধাপে পড়ে আছে।
সুদক্ষিণা হন্তদন্ত হয়ে এসে বললেন, কোথায় খুনোখুনি হয়েছে সৌম্য?
নীতা সোম উঠে দাঁড়িয়েছিল। ভাঙা গলায় বলল, রাত্রি কোথায় মাসিমা?
ও তো আউটহাউসের দিকে ছুটে গেল। বারণ করলাম। শুনল না।
বারীন্দ্রনাথ বললেন, পুপু। তুমি নীচে গিয়ে থাকো। সৌম্য। আমি দেখছি থানার লাইন পাই কি না। না পেলে তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যাবে। এক মিনিট।
ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে একটা টুলে রাখা টেলিফোনের রিসিভার তুলে বারীন্দ্রনাথ গম্ভীর মুখে বললেন, টেলিফোন লাইন ডেড। সৌম্য। তুমি থানায় গিয়ে খবর দাও। আর এই টেলিফোন নাম্বারটা নিয়ে যাও। বরং ওঁর নেমকার্ডটাই দিচ্ছি। এক্সচেঞ্জের বা থানা যেখান থেকে হোক, এই ভদ্রলোককে ট্রাঙ্ককল করে আমার কথা বলবে। শুধু বলবে, হেয়ার ইজ আ ভেরি মিসটিরিয়াস মার্ডার। যতক্ষণ লাইন না পাও, ওয়েট করবে। তবে আমার নাম করলে শিগগির পেতেও পারো। কুইক…
