প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার আমাদের প্রিয় ‘হালদারমশাই’ খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ তিনি কাগজটা ভাঁজ করে রেখে একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর বললেন, –জয়ন্তবাবু তো সাংবাদিক। তাই কথাটা আপনারে জিগাই।
বললুম,–বলুন হালদারমশাই।
গোয়েন্দাপ্রবর একটু হেসে বললেন, আপনাগো কাগজে বিজ্ঞাপনে দেখি, কোনওটার হেডিং নিরুদ্দেশ। আবার কোনওটার হেডিং নিখোঁজ। ক্যান? মানে তো এক।
–এটা বিজ্ঞাপন বিভাগের লোকেদের খেয়াল। তারাই তো বিজ্ঞাপনের হেডিং দেন।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে একটা ইংরেজি পত্রিকা পড়ছিলেন। দাঁতে কামড়ানো চুরুটের নীল ধোঁয়া তার টাকের ওপর ঘুরপাক খেতে খেতে মিলিয়ে যাচ্ছিল। তিনি পত্রিকাটা বুজিয়ে রেখে বললেন,–জয়ন্তের জবাব হালদারমশাইয়ের মনঃপুত না হওয়ারই কথা।
হালদারমশাই সায় দিলেন,–ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার! নিরুদ্দেশ আর নিখোঁজ। দুইরকম হেডিং অথচ একই মানে। ক্যান দুইরকম?
কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। মিটিমিটি হেসে বললেন,–হালদারমশাই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন জয়ন্ত! এটা হালকাভাবে নিও না। রীতিমতো ভাষাবিজ্ঞানের শব্দার্থতত্ত্বের মধ্যে ব্যাপারটা পড়ে।
বললুম, সর্বনাশ! এই সুন্দর সকালবেলায় ওইসব গুরুগম্ভীর তত্ত্ব আওড়াবেন না প্লিজ!
–মোটেও গুরুগম্ভীর তত্ত্ব নয় জয়ন্ত! হালদারমশাই তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন পড়ছিলেন। তুমিও একবার পড়ে নিলে পারো!
এবার একটু অবাক হতে হল। আজকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপনে কর্নেল কোনও রহস্যের লেজ দেখতে পেয়েছেন নাকি? কাগজটা তুলে নিয়ে কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়ল না। নিরুদ্দেশ শিরোনামে পর-পর দুটো বিজ্ঞাপন আছে। প্রথমটা এই :
‘বাবা অমু! তুমি শীঘ্র বাড়ি ফিরে এসো। তোমার মা মৃত্যুশয্যায়। টাকার দরকার হলে টেলিফোনে জানাও।–বাবা’
দ্বিতীয়টা এই :
‘পুঁটুদা, তুমি যা চেয়েছিলে তা-ই হবে। যেখানেই থাকো, ফিরে এসো। –ভুঁটু’
এরপর ‘নিখোঁজ শিরোনামের তলায় একটি প্যান্ট-হাফশার্ট-পরা বলিষ্ঠ গড়নের ছেলের ছবি। তার নিচে ছাপা হয়েছে :
‘এই ছবিটি শ্রীমান দীপক কুমার রায়ের। বয়স প্রায় ১৪ বছর। গায়ের রং ফর্সা। চিবুকে একটু কাটা দাগ আছে। কেউ এর সন্ধান দিতে পারলে নগদ ১০ হাজার টাকা পুরস্কার।
পীতাম্বর রায়, ৮-১ সি ঘোষপাড়া লেন, কলকাতা – ৪৬’
এরপর জ্যোতিষী এবং তান্ত্রিকদের ছবিসহ বিজ্ঞাপন। কাগজ থেকে মুখ তুলে বললুম-নাঃ! বিজ্ঞাপনের লোকেদের খেয়াল-খুশিমতো হেডিং।
কর্নেল দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললেন,–হালদারমশাই ঠিক ধরেছেন। নিরুদ্দেশ আর নিখোঁজ একই ব্যাপার। কিন্তু বিজ্ঞাপনগুলো পড়ে কথাদুটোর মানেতে যে একটা তফাত আছে, তা তোমার বোঝা উচিত ছিল।
হালদারমশাই একটু উত্তেজিত হলেই ওঁর ছুঁচলো গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কঁপে। লক্ষ করলুম উনি উত্তেজিত। হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বললেন,–হঃ! বুঝছি। যে স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে পালায়, তার হেডিং দিচ্ছে নিরুদ্দেশ। আর কোনওভাবে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যারে বাড়িছাড়া, কইর্যা কেউ বা কারা গুম করে, কিংবা ধরেন, মার্ডার কইর্যা ফ্যালে
ওঁর কথার ওপর বলে উঠলুম–কী সর্বনাশ! হালদারমশাই; ওসব অলুক্ষুণে কথা প্লিজ বলবেন না।
কর্নেল বললেন,–নিখোঁজ ছেলেটির ছবি দেখার পর মার্ডার কথাটা শুনলে সত্যি খারাপ লাগে। কাজেই হালদারমশাই, এ প্রসঙ্গ থাক। হেডিং দুটোর প্রচলিত অর্থ বুঝেছেন, এই যথেষ্ট।
প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোককে তখনও উত্তেজিত এবং অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। একটু পরে তিনি আস্তে বললেন,–কর্নেলস্যার! কর্নেল হাসলেন, আপনি কী বললেন, বুঝতে পেরেছি হালদারমশাই। নিখোঁজ ছেলেটি সম্পর্কে আপনার উৎসাহ জেগেছে।
হালদারমশাই হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–দশ হাজার টাকার জন্য না। আমার ডিটেকটিভ এজেন্সির হাতে এখন কোনও কেস নাই, এ জন্যও না। কথাটা হইল গিয়া, এমন বিজ্ঞাপন মাইনষে দেয় কখন? যখন পুলিশ দিয়াও কাম হয় না, তখন।
–ঠিক বলেছেন।
–ভদ্রলোকের লগে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছা হয়।
–বেশ তো। ঠিকানা দেওয়া আছে। টুকে নিয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করুন।
গোয়েন্দাপ্রবর সোয়েটারের ভেতর হাত ঢুকিয়ে খুদে নোটবই এবং ডটপেন বের করলেন। তারপর পীতাম্বর রায়ের ঠিকানা টুকে নিয়ে বললেন,–কলকাতা ছেচল্লিশ কোন এরিয়া য্যানো?
কর্নেল হাত বাড়িয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে ছোট্ট স্ট্রিট-ডাইরেক্টরি বের করলেন। তারপর পাতা উলটে দেখে নিয়ে বললেন,–ঠিকানাটা গোবরা এলাকার।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার তখনই উঠে দাঁড়ালেন এবং সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
বললুম, — যাকগে। হালদারমশাই তখন দুঃখ করছিলেন, আজকাল রহস্যের খুব আকাল চলেছে দেশে। চুরি ছিনতাই ডাকাতি খুনোখুনি প্রচুর হচ্ছে। কিন্তু সবই প্রকাশ্যে আর সাদামাটা ব্যাপার। কাকেও মেরে গুম করে ফেলাটাও আর তত রহস্যজনক নয়। কাজেই দেখা যাক, এই ঘটনাটার পেছনে ছুটোছুটি করে উনি যদি কোও রহস্য খুঁজে পান, মন্দ কী?
কর্নেল কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন, এইসময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন, –ষষ্ঠী।
একটু পরে দুজন ভদ্রলোক এসে কর্নেলকে নমস্কার করলেন। একজনের পরনে প্যান্ট শার্ট, জ্যাকেট। রাশভারী মধ্যবয়সী মানুষ। অন্যজনের পরনে ধুতি পাঞ্জাবি শাল। কর্নেল প্রথমজনের উদ্দেশে বলে উঠলেন, –কী আশ্চর্য! মিঃ অধিকারী যে! বসুন, বসুন! ষষ্ঠী! শিগগির কফি চাই।
মিঃ অধিকারী বললেন, –কিছুদিন থেকেই আসব-আসব করছিলুম। শেষ পর্যন্ত আসতেই হল। আলাপ করিয়ে দিই। আমার বন্ধু কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য। আমাদের রায়গড় স্কুলেই শিক্ষকতা করতেন। গতবছর রিটায়ার করেছেন। কুমুদ! বুঝতেই পারছ ইনি সেই স্বনামধন্য কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।
এবার কর্নেল আমার সঙ্গে তাদের আলাপ করিয়ে দিলেন। লক্ষ করলুম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ভদ্রলোকের চেহারায় যেন কিছুটা অস্বাভাবিকতার ছাপ আছে। চোখের তলায় কালচে ছোপ। কপালে ভাঁজ। মুখে ও চোখে বিষণ্ণতা গাঢ় ছাপ ফেলেছে।
মিঃ অধিকারীর পুরো নাম কৃষ্ণকান্ত অধিকারী। তিনি আমার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, — জয়ন্ত আমার বিশ্বস্ত। তাছাড়া সব ব্যাপারে ও আমার সহকারী। কথা যত গোপনীয় হোক, ওর সামনে বলতে দ্বিধা করবেন না।
মিঃ অধিকারী বললেন, — আমি অক্টোবর-নভেম্বর এই দুটো মাস ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলুম। ফিরেছি ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে। তারপর ঘটনাটা শুনে প্রথমে পুলিশ সোর্সে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। শেষে আপনার দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলুম। কুমুদ আমার বাল্যবন্ধু। অত্যন্ত কাছের মানুষ। তাকে সাহায্যের জন্য যতদূর যেতে হয়, আমি রাজি।
–ঘটনাটা কী?
–কুমুদ! তুমিই বলো। তোমার মুখ থেকেই কর্নেলসায়েবের শোনা উচিত।
কুমুদ একটু কেশে গলা সাফ করে বললেন, — রায়গড়ে তো আপনি গেছেন! একেবারে দক্ষিণপ্রান্তে খেলার মাঠ আর তার পাশে ঘন জঙ্গলটা সম্ভবত দেখেছেন!
কর্নেল বললেন, — হ্যাঁ। জঙ্গলটার অদ্ভুত নাম। হাড়মটমটিয়ার জঙ্গল। আমি অবশ্য কোনওরকম হাড়-মট-মট করা শব্দ শুনিনি।
মিঃ অধিকারী বললেন, –আপনাকে তো বলেছিলুম, কোনও যুগে কেউ শুকনো গাছে বাতাসের শব্দ শুনে ভূতুড়ে গল্প রটিয়েছিল। একটা ভূত নাকি হাঁটাচলা করে। আর পায়ের হাড় মটমট করে ভাঙার মতো শব্দ হয়। বোগাস! কুমুদ! সংক্ষেপে বলো এবার।
কুমুদবাবু বললেন, — লক্ষ্মীপুজের পরদিনের ঘটনা। আমার একটিমাত্র ছেলে। সুদীপ্ত নাম। ডাকনাম দীপু। ক্লাস টেনের ছাত্র। পড়াশুনা, খেলাধুলো সবেতেই ভালো। তবে একটু একরোখা আর দুঃসাহসী। তো অন্যদিনের মতো সেদিন বিকেলে দীপু ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল। ওদের খেলার কোনও সময়-অসময় থাকে না। সূর্য ডুবেছে, তখনও ওরা খেলায় মেতে আছে। জঙ্গলের দিকটায় একটা গোলপোস্ট। দীপুর কিকের খুব জোর। তার কিকে বলটা গোলপোস্টের ওপর দিয়ে জঙ্গলের ভেতর পড়েছিল। তাই দীপুই বলটা কুড়িয়ে আনতে জঙ্গলে ঢুকেছিল।
এইসময় ষষ্ঠীচরণ কফি আনল। কর্নেল বললেন,–কফি খান। কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।
কুমুদবাবু অনিচ্ছাসত্ত্বেও কফির পেয়ালা তুলে নিলেন কৃষ্ণকান্তবাবু তাগিদে। কয়েক চুমুক খাওয়ার পর তিনি জোরে শ্বাস ফেলে বললেন,–দীপু জঙ্গলে বল আনতে গেল তো গেলই।
আর ফিরল না। আজ জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ। দীপু এখনও ফিরল না।
কর্নেল বললেন,–একটু খুলে বলুন প্লিজ! আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। তবু সব কথা খুলে না বললে তো আমার পক্ষে এক পা এগোনো সম্ভব নয়।
কুমুদবাবু বললেন, –দীপু ফিরছে না দেখে ওর বন্ধুরা প্রথমে ডাকাডাকি করে। সাড়া না পেয়ে ওরা দীপু যেখানে জঙ্গলে ঢুকেছিল, সেখান দিয়ে ঢোকে। তখন জঙ্গলে আঁধার ঘনিয়েছে। অনেক ডাকাডাকি আর খোঁজাখুঁজি করে ওরা ভয় পেয়েছিল। হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে জন্তুজানোয়ার থাকতে পারে। কিন্তু বাঘ-ভালুক থাকার কথা শোনা যায় না। ওরা রায়গড়ে ফিরে পাড়ার লোকেদের খবর দেয়। আমিও খবর পেয়ে ছুটে আসি। তারপর টর্চ-লাঠিসোঁটা আর বন্দুক নিয়ে আমরা জঙ্গলে ঢুকেছিলুম। তখন শরৎকালে জঙ্গল খুব ঘন। সাপের উৎপাতও স্বাভাবিক।
কুমুদবাবু চুপ করলেন। কর্নেল বললেন,–জঙ্গলটা তো বেশ বড়। আপনারা পুরোটাই কি খুঁজেছিলেন?
–না। জঙ্গলের ভেতরে একটা গভীর ভোবা আছে। সেই ডোবার পাড়ে খানিকটা টাটকা রক্ত দেখেছিলুম। আর
–বলুন!
–আমরা যখন রক্ত দেখছি, তখন জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত অমানুষিক চিৎকার শুনতে পেয়েছিলুম। না–চিৎকার বলাও যাবে না। চেরা গলায় আর্তনাদ কিংবা ওইরকম এখটা তীক্ষ্ণ কাঁপাকাঁপা হিংস্র শব্দ–শব্দটা একটানা অন্তত একমিনিট ধরে শোনা গেল। কৃষ্ণকান্তের বন্দুক আছে। ওর ভাই বরদা দুবার ফায়ার করল বন্দুকের। কিন্তু আমরা আর এগোতে সাহস পেলুম না। রক্ত দেখেই ধরে নিয়েছিলুম দীপু কোনও হিংস্র জন্তুর কবলে পড়েছে। বাঘ-ভালুকের কথা শোনা যায় না বটে, কিন্তু জঙ্গল তো! কোত্থেকে এসে জুটলেই হল। তবে সেই অমানুষিক চিৎকারটা কোন জানোয়ারের, তা আমরা এখনও বুঝতে পারিনি।
–তারপর আপনারা কী করলেন?
–সে রাত্রে থানায় খবর দিলুম। পুলিশ রাত্রে জঙ্গলে ঢুকতে রাজি হয়নি। সকালে থানার কজন সশস্ত্র কনস্টেবল নিয়ে বড়বাবু ডোবার পাড়ে রক্ত দেখেই বললেন, –দীপুকে বাঘে তুলে নিয়ে গেছে। ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। এলাকার লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সারা জঙ্গল তোলপাড় করল। কিন্তু দীপুর চিহ্নটুকু খুঁজে পাওয়া গেল না।
কর্নেল কুমুদবাবুর কথা শোনার পর বললেন, — এটাই যদি ঘটনা হয়, তাহলে মিঃ অধিকারী, আপনি নিশ্চয়ই আমার কাছে আসতেন না।
কৃষ্ণকান্ত অধিকারী বললেন, –আপনি ঠিকই ধরেছেন কর্নেলসায়েব! কুমুদ! এবার বাকি অংশটা বলো।
কুমুদবাবু বললেন, — দিন দশেক পরে পোস্টম্যান একটা খাম দিয়ে গেল। খামের ওপরে ইংরেজিতে আমার নাম-ঠিকানা লেখা ছিল! কিন্তু ভেতরে ছিল শুধু একটা রঙিন ফোটো। ফোটোটা দীপুর।
কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, — আপনার নিখোঁজ ছেলের ফোটো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি অবাক হয়েছিলুম। ফোটোটা উলটে দেখে আরও অবাক হলুম। পিছনে লাল কালিতে লেখা আছে : দীপু বেঁচে আছে। সময় হলেই বাড়ি ফিরবে।
মিঃ অধিকারী বললেন, “অদ্ভুত ব্যাপার! কুমুদ নিজের ছেলের হাতের লেখা চেনে। খামের ওপর ইংরেজি লেখা আর ফোটোর পিছনে বাংলায় লেখা নাকি দীপুর নয়।
কুমুদবাবু বললেন, — হ্যাঁ। দীপুর লেখা নয়। অন্য কেউ লিখেছে। মিঃ অধিকারী বললেন, –খাম আর ফোটোটা কর্নেলসায়েবকে দাও কুমুদ!
কুমুদবাবু বুকপকেট থেকে একটা খাম বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল খাম থেকে ফোটোটা বের করে উলটে-পালটে দেখলেন। তারপর বললেন, — হুঁ। তারপর?
কুমুদবাবু বললেন, — এর কদিন পরে আবার একটা খাম এল ডাকে। একই হাতের লেখা এবার শুধু একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা আছে —
মিঃ অধিকারী বললেন, –চিঠিটা বরং কর্নেলসায়েবকে দাও। কুমুদবাবু পকেট থেকে আর একটা খাম বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল চিঠিটা বের করে মৃদুস্বরে পড়তে থাকলেন,
‘দীপুর পড়ার টেবিলে ড্রয়ারের মধ্যে খুঁজে দেখুন একটা অঙ্কের ধাঁধা লেখা আছে। ধাঁধার চারদিকে ৩২ লেখা আছে দেখতে পাবেন। যদি ওটা ড্রয়ারে না থাকে ওর বই আর খাতাগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবেন। নিশ্চয়ই ওটা পাবেন। পেয়ে গেলে ধাঁধার কাগজটা খামে ভরে হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে জোবার দক্ষিণপাড়ে একটুকরো ঢিল চাপা দিয়ে গোপনে রেখে আসবেন। সাবধান! পুলিশ কিংবা অন্য কাকেও ঘুণাক্ষরে একথা জানাবেন না। কিংবা নিজেও সেখানে, গোপনে লক্ষ রাখবেন না। তাহলে দীপুকে আর ফিরে পাবেন না।‘
পড়া শেষ করে কর্নেল বললেন, — ধাঁধাটা পেয়েছিলেন?
– আজ্ঞে না। অগত্যা কী করব, অনেক ভেবেচিন্তে একটা চিঠি লিখে জঙ্গলের ভেতর ডোবার পাড়ে রেখে এসেছিলুম। লিখেছিলুম, ওটা খুঁজে পাচ্ছি না। দয়া করে আমাকে আরও দু’সপ্তাহ সময় দেওয়া হোক।
-তারপর? ঠিক দু-সপ্তাহ পরে আবার একটা চিঠি এল ডাকে। ওটা পেয়েছি কি না জানতে চেয়েছে।–বলে কুমুদবাবু আবার একটা খাম কর্নেলকে দিলেন।
মিঃ অধিকারী বললেন, — কুমুদ আবার সময় চেয়ে চিঠি রেখে এসেছিল। তার কিছুদিন পরে আমি হংকং থেকে ফিরলুম। কুমুদ আমাকে সব ঘটনা বলল। তখন আমাদের রেঞ্জের পুলিশের ডি. আই. জি. সুকুমার ভদ্রের কাছে কুমুদকে নিয়ে গেলুম। মিঃ ভদ্র হেসে উড়িয়ে দিলেন। পাত্তাই দিলেন না। বললেন, ছেলে বাবার সঙ্গে দুষ্টুমি করছে। আর কিছুদিন অপেক্ষা করুন। দীপু ঠিকই বাড়ি ফিরে আসবে।
কুমুদবাবু বলেন, –ওঁকে কিছুতেই বোঝাতে পারিনি, দীপু তেমন ছেলে নয়। জঙ্গলে রক্তের ব্যাপারটাও ডি. আই. জি. সায়েব গ্রাহ্য করলেন না। বললেন, — তাঁর কাছে এই কেসে রায়গড় থানার পুলিশ-রিপোর্ট আছে। ডোবাটার কাছে আদিবাসীদের ওঝারা নাকি গোপনে মুরগি বলি দেয়।
মিঃ অধিকারী বললেন, –সেটা অবশ্য ঠিক। জঙ্গলের পূর্বে আদি বস্তি আছে। ছোটবেলায় দেখেছি ওরা জঙ্গলে গিয়ে ধামসা বাজিয়ে নাচ-গান করে পুজো দিত। আজকাল ওরা খ্রিস্টান হয়ে গেছে। তা বলেও পুরোনো প্রথা কেউ গোপনে মেনে চলতেই পারে। যাই হোক, কর্নেলসায়েবকে অনুরোধ, দীপুর অন্তর্ধান রহস্যের একটা কিনারা করুন।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ওঁরা দুজনে চলে গেলেন। তারপর বললুম, –রীতিমতো রহস্যজনক ঘটনা কর্নেল! বিশেষ করে অঙ্কের ধাঁধা এবং ৩২ সংখ্যাটার মধ্যে নিশ্চয় কোনও মূল্যবান জিনিসের সম্পর্ক আছে।
কর্নেল দীপুর ফোটোটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। হঠাৎ তিনি সেই খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে ‘নিখোঁজ’ শীর্ষক ছবিটা দেখতে থাকলেন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতশ কাঁচ বের করে দুটো ছবি মিলিয়ে দেখে সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, — বত্রিশের ধাঁধার আর একটা দিক খুবই অদ্ভুত জয়ন্ত! খবরের কাগজে ছাপা নিখোঁজ দীপককুমার রায়ের ছবি আর রায়গড়ের কুমুদবাবুর নিখোঁজ ছেলে সুদীপ্ত ওরফে দীপুর ছবি হুবহু মিলে যাচ্ছে।
চমকে উঠে বললুম, –দেখি, দেখি।
তারপর ছবি দুটো দেখেই আমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। দুটো ছবিই একজনের!
