বরফ যখন গলে (ভাদুড়ি-গোয়েন্দা) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

প্রথম পরিচ্ছেদ 

দৈনিক বার্তাবহ থেকে মুখ তুলে কৌশিক বলল, “ব্লুবেয়ার্ড মানে কী?”

 

প্রশ্নটা ভাদুড়িমশাইকে করা। কিন্তু ইস্টার্ন কুরিয়ারে রোজ যে একটা ওয়ার্ড-জাম্বল বেরোয়, খবর, সম্পাদকীয় নিবন্ধ, বিশেষ নিবন্ধ ইত্যাদির উপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সদ্য তিনি তার মধ্যে তখন ডুব দিয়েছেন, সুতরাং কৌশিকের প্রশ্নটা যে তাঁর কানে ঢুকেছে, এমন মনে হল না। আত্মগতভাবে বললেন, “সি, ই, এল, এস, এ, টি তো উল্টেপাল্টে কাসল, কিন্তু জি, এন, ই, আর, এ, ডি? উল্টেপাল্টে এটা কী হতে পারে?”

 

সদানন্দবাবু উশখুস করছিলেন। সবাই চুপ করে যেতে বললেন, “উত্তরটা আমি বলব?”

 

কৌশিক বলল, “কোন প্রশ্নটার উত্তর? আমারটার, না মামাবাবুরটার?”

 

“তোমারটার।”

 

“বেশ, বলুন।”

 

“ব্লুব্লাড হচ্ছে গিয়ে বনেদি বংশের মানুষ। মানে রাজা-রাজড়া-নবাব-বাদশা-আমির-ওমরা কি নিদেন জমিদার-টমিদার বলতে যা বোঝো, সেই তেনারা আর কি।…ঠিক বলিচি তো?”

 

অরুণ সান্যাল বললেন,”খেলে যা! আরে বোসদা, কৌশিকের প্রশ্নটা তো আপনি দেখছি শুনতেই পাননি, তা হলে আর উত্তরটা কী করে ঠিক হবে?…শোন কৌশিক, ব্লু-বার্ড হচ্ছে এক রকমের পাখি, ওদের পিঠের রংটা একেবারে ঝকমকে নীল। হার্ট স্পেশ্যালিস্টদের একটা কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে এইট্টিনাইনে তো আমাকে স্যাক্রামেন্টোয় যেতে হয়েছিল, নর্থ আমেরিকার নানান জায়গায় তখন এই ব্লু-বার্ড আমরা বিস্তর দেখেছি। তোর মা তো সেবারে আমার সঙ্গে ছিলেন, তিনিও দেখেছেন। … কী গো, তোমার মনে নেই?”

 

মালতী আমাদের চায়ের পেয়ালায় আবার নতুন করে চা ঢালতে ঢালতে বলল, “দেখেছিলুম নাকি? কী জানি, আমার তো কিছু মনে পড়ছে না।”

 

“মনে না পড়তে পারে, কিন্তু দেখেছিলে।” অরুণ সান্যাল চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “আসলে নর্থ আমেরিকাই তো ব্লু-বার্ডের ন্যাচারাল হ্যাবিট্যাট। অবশ্য অন্যান্য দেশেও যে দেখা যায় না, তা নয়।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমাদের ইন্ডিয়ায় দেখা যায় না?”

 

আমি বললুম, “যেতেই পারে। এত বড় দেশ, এখানে কাক কোকিল শালিখ চড়ুই ময়না টিয়া বুলবুলি টুনটুনি ফিঙে কাঠঠোকরা- হাজার গণ্ডা পাখি রয়েছে আর ব্লু-বার্ড থাকবে না, তাও কি হয় নাকি?”

 

“না, কিরণদা,” অরুণ সান্যাল বললেন, “ইউ কান্ট বি দ্যাট সার্টেন। আমাদের দেশে নীলকণ্ঠ বলে একটা পাখি আছে বটে, বেতলার রেস্ট-হাউসের সামনে একবার একঝাঁক নীলকন্ঠ দেখেওছিলুম, কিন্তু সেটা ঠিক ব্লু-বার্ড নয়।”

 

আমি বললুম, “অত কথায় কাজ কী, হাতে পাঁজি মঙ্গলবার, ইন্ডিয়ান বার্ডসের উপরে সলিম আলির বইখানা একবার দেখে নিলেই তো গোল মিটে যায়।”

 

“ও-বই তো আমাদের বাড়িতেই এক কপি রয়েছে।” মালতী বলল, “ওরে কৌশিক, তোর বাবার পড়ার ঘরের আলমারি থেকে বইখানা একবার নিয়ে আয় তো।”

 

কৌশিক এতক্ষণ হাঁ করে আমাদের কথাবার্তা শুনে যাচ্ছিল, প্রশ্নটা তুলবার পর থেকে আর একটাও কথা বলেনি। এবারে সে তার মায়ের দিকে ফিরে তাকাল, কিন্তু এক্ষুনি যে চেয়ার ছেড়ে উঠবে, এমন মনে হল না।

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “কী হল রে, যাচ্ছিস না যে, বইখানা নিয়ে আয়।”

 

আমি বললুম, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নিয়ে এসো, কথাটা যখন উঠেই পড়েছে, তখন আর দেরি করে আজ কী, একটা মীমাংসা হয়ে যাক।”

 

কৌশিক হঠাৎ হো-হো করে হেসে উঠল। সে একেবারে দম ফাটা হাসি। কিছুতেই থামে না।

 

আমি বললুম, “কী হল রে? এত হাসছিস কেন?”

 

হাসি থামিয়ে কৌশিক বলল, “কিরণমামা, একটা কথা বলব? অফ কোর্স ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড…”

 

বললুম, “এত কিন্তু-কিন্তু করছিস কেন, যা বলবার বলে ফ্যাল।”

 

“বেশ, তা হলে বলেই ফেলছি, ইউ শুভ ইমিডিয়েটলি সি অ্যান ই. এন. টি. স্পেশ্যালিস্ট। শান্তনুকাকা তো ওয়ান অভ দ্য টপার্স ইন দিস লাইন, ওঁর কাছেই চলে যাও। বাবার বন্ধু, নো খর্চা, বিনি পয়সায় বেস্ট পসিবল চিকিচ্ছে পেয়ে যাবে।”

 

আমি তো হতভম্ব। বললুম, “তার মানে?”

 

“তাও বুঝিয়ে বলতে হবে?” কৌশিক বলল, “বাবাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেয়ো। আমি কী বললুম, আর তোমরা কী শুনলে!”

 

সদানন্দবাবু একগাল হেসে বললেন, “রাইট। আপনাদের দুজনেরই কানের বারোটা বেজে গেছে মশাই। কৌশিক বলল ব্লুব্লাড আর আপনারা শুনলেন ব্লু-বার্ড! আবার তা-ই নিয়ে আপনারা তক্কো জুড়ে দিয়েচেন। আরে ছ্যা ছ্যা!”

 

কৌশিক একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলল, “বোস-জেঠু, আপনিও একবার শান্তনুকাকাকে দিয়ে আপনার কানটা পরীক্ষা করিয়ে নিন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “অ্যাঁ?”

 

“হ্যাঁ, আপনার কানের অবস্থাও সুবিধের নয়।”

 

“তার মানে তুমি ব্লুব্লাড বলোনি?”

 

“না, বলিনি।”

 

“তা হলে কী বলেছিলে?”

 

“ব্লুবেয়ার্ড। কিছু বুঝলেন?”

 

ওদিক থেকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝেছি। জি, এন, ই, আর, এ, ডি। উল্টেপাল্টে ডি, এ, এন, জি, ই, আর। ডেঞ্জার। যাক, সমস্যা মিটে গেল।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “আপনার ওয়ার্ড-জাম্বলের সমস্যা তো মিটল, এদিকে আমাদের সমস্যা এখনও মেটেনি, বড়দা।”

 

“তোমাদের আবার কীসের সমস্যা?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ব্লুবেয়ার্ড? ওর মানে তো সবাই জানে।”

 

মানেটা যে কী, সেটা বুঝবার আগেই ডোর-বেল বেজে উঠল। অরুণ সান্যাল বললেন, “ওরে কৌশিক, কে এল একবার দ্যাখ তো বাবা।”

 

মালতী বলল, “পেশেন্ট হলে বিকেলে বাবার চেম্বারে যেতে বলে দিবি। বাবা রে বাবা, সারাক্ষণ শুধু রুগি আর রুগি! লোকটা যে একটা দিন একটু বিশ্রাম নেবে, তার জো নেই!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মনে হচ্ছে অরুণের পেশেন্ট নয়, আমার ক্লায়েন্ট। সকাল সাড়ে ন’টায় আসতে বলেছিলুম।”

 

কৌশিক ইতিমধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। মিনিট দেড়েক বাদে যে ভদ্রলোকটিকে সঙ্গে নিয়ে সে ফিরে এল, তাঁর বয়স আন্দাজ পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে হবে। এক নজর দেখেই বোঝা যায় যে, শৌখিন মানুষ। পরনে মিলের মিহি কাঁচি ধুতি আর গিলে-হাতা আদ্দির পাঞ্জাবি। পায়ে পেটেন্ট লেদারের গ্রিশিয়ান-কাট পাম্পশু, চোখে হালকা বাদামি ফোটোক্রোমাটিক লেন্সের রিমলেস চশমা। পাঞ্জাবির বোতামের ঘের আর গলার চারপাশে যে মিহি সাবুদানার বুটিদার কাজ করানো হয়েছে, সেটাও আমার নজর এড়াল না।

 

ভাদুড়িমশাই তাঁর সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “আরে আসুন আসুন মিঃ মিত্র।” তারপর একটা খালি সোফার দিকে হাত বাড়িয়ে, “বসুন, বসুন। বাড়ি চিনতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো?”

 

“না না, কোনও অসুবিধে হয়নি।” মিঃ মিত্র বললেন, “বাড়িটা যে কাঁকুড়গাছির মোড়ে, সে তো গত হপ্তার গোড়ায় ব্যাঙ্গালোরে যখন ফোন করি তখন আপনি বলেই দিয়েছিলেন, তা হলে আর অসুবিধে হবে কেন?”

 

“ভাল, তা এ-যাত্রায় কয়েকটা দিন এখানে আছেন তো?”

 

“ভেবেছিলুম তো থাকব, কিন্তু থাকতে আর পারছি কোথায়।” মিঃ মিত্র বললেন, “দেরাদুন থেকে কাল রাত্তিরে ফোন এসেছিল, ফোনে যা কথা হল তাতে মনে হচ্ছে, তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার। ভাবছি, কালই ফিরে যাব। আসলে ব্যাপারটা কী জানেন…”

 

ভদ্রলোক কথাটা শেষ করলেন না। কী জানি কেন মনে হল, আমরা আছি বলেই সব কথা তিনি খুলে বলতে পারছেন না, অস্বস্তি বোধ করছেন। এই অবস্থায় বসে থাকাটা অশোভন। তাই দাঁড়িয়ে উঠে বললুম, “চলি ভাদুড়িমশাই, আমার আবার আপিস রয়েছে। সদানন্দবাবু, আপনিও চলুন।”

 

ইঙ্গিতটা সদানন্দবাবু ধরতে পারলেন না। বললেন, “সে কী মশাই, আজ তো সরস্বতীপুজো, আপনার কাগজেও আজ ছুটির দিন, তা হলে এখুনি উঠতে হবে কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কাউকেই উঠতে হবে না। আসলে আমারই ভুল হয়েছে, মিঃ মিত্রের সঙ্গে আগেই আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। ইনি মিঃ মাধবানন্দ মিত্র, দেরাদুনে থাকেন, একটা সিনেমা হল, একটা হোটেল, দুটো স-মিল আর গোটাকয়েক অর্ডার্ডের মালিক। তা ছাড়া, যেমন দেরাদুন তেমনি মুসৌরি শহরেও বেশ কিছু ল্যান্ডেড প্রপার্টি আছে বলে শুনেছি।”

 

মিঃ মিত্র যে একটু অবাক বোধ করছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। অবাক-ভাবটা কাটিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, “নিজের সম্পর্কে আমি তো আপনাকে কিছুই প্রায় বলিনি, এক আমার ওই বিপদের কথাটা ছাড়া। তা হলে এত সব খবর আপনি কোথায় পেলেন?”

 

“বাঃ, আপনার কেসটা আমি নিয়েছি, আর আপনার সম্পর্কে দু-একটা খবর আমি নেব না? কোত্থেকে নিলুম, কে বলল, সে-সব আপনার না-জানলেও চলবে। তা সে-কথা যাক, যা বলছিলুম, আপনার পরিচয় তো এঁরা জানলেন, এবারে এঁদের পরিচয়টাও আপনাকে জানিয়ে দিই। …এ হচ্ছে কৌশিক, আমার ভাগ্নেও বটে, অ্যাসিস্ট্যান্টও বটে। ব্যাঙ্গালোরে আমার কাছেই থাকে। আপাতত ওই হচ্ছে সি বি আই অর্থাৎ চারু ভাদুড়ি ইনভেস্টিগেশানসের চিফ একজিকিউটিভ অফিসার।”

 

“আর এঁরা?”

 

“আপনার ডান পাশে বসে আছেন ডঃ অরুণ সান্যাল। কৌশিকের বাবা। হার্ট স্পেশ্যালিস্ট, তবে নিজেই হার্টের অসুখে ভোগেন। আর সামনে বসে আছেন কিরণ চাটুজ্যে আর সদানন্দ বসু। ইনভেস্টিগেশানের ব্যাপারে আমি এঁদের দুজনেরই সাহায্য নিয়ে থাকি। অর্থাৎ এঁরা কেউই বাইরের লোক নন, আপনার যা বলবার তা এঁদের সামনেই আপনি স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন, কোনও সংকোচ করবেন না।”

 

মিঃ মিত্র ঢোক গিলে বললেন, “কী যেন বলছিলুম?”

 

“বলছিলেন যে, দেরাদুন থেকে কাল ফোন এসেছিল। ফোনে যা কথা হল তাতে আপনার মনে হচ্ছে তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার। তাই ভাবছেন যে, কালই ফিরে যাবেন। এই পর্যন্ত বলবার পরে আপনি বলেন, ‘আসলে ব্যাপারটা কী জানেন…’। তারপরেই আপনি চুপ করে যান। এখন বলুন তো আসলে সেই ব্যাপারটা কী।”

 

মিঃ মিত্র একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, “আসলে ব্যাপার একটা অচার্ড অর্থাৎ ফলের বাগান নিয়ে। ওদিককার এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী, ওঙ্কারমল আগরওয়াল, ওটা কিনতে চায়, কিন্তু আমি বেচতে চাই না। আর চাই না বলেই এখনকার যা মার্কেট রেট, তার তুলনায় তা ধরুন ডবল তো বটেই, প্রায় আড়াই গুণ দায় শামি চেয়েছিলুম। ভেবেছিলুম, ব্যাটা ঝানু ব্যবসায়ী, বাগানটার যে ওই দাম হতে পারে না, তা খুব ভালই জানে, ফলে আর এগোবে না। কিন্তু এখন দেখছি সরাসরি ‘বেচব না’ বলে দিলেই ভাল হত। মানে…দেরাদুনে যে লোকটা আমাদের সম্পত্তি দেখাশোনা করে, কিষনলাল, কাল সে-ই ফোন করেছিল তো, তা ফোন করে সে বলল যে…

 

মাধবানন্দ তাঁর কথা শেষ করবার আগেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলল যে, মারোয়াড়ি বিজনেসম্যানটি ওই টাকাতেই রাজি, কেমন? তা অগ্রিম বাবদে ইতিমধ্যেই কিছু অফার করেনি তো?”

 

মিঃ মিত্র বললেন, “অফার করেছে তো বটেই, কিষনলাল সে-টাকা অ্যাকসেপ্ট করে একটা রসিদও দিয়ে দিয়েছে। কত টাকা, তাও কিষনলাল জানাল। আড়াই লাখ। অ্যান্ড দ্য এন্টায়ার অ্যামাউন্ট ইন ক্যাশ।”

 

“অথচ ওই বাগানটা আপনি বেচতে চান না।”

 

“না, চাই না।” এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন মিঃ মিত্র। তারপর বললেন, “না-বেচতে হলে ওই আড়াই লাখ এখুনি ফেরত দিতে হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তারও উপায় নেই।”

 

“কেন? অসুবিধে কোথায়?”

 

“বলছি। আমার যে একটা সিনেমা হল আছে, তা তো দেখছি আপনি জানেন, তা হালে সেটার রিনোভেশন করিয়েছি। সেই ব্যাপারে মাল-মেটিরিয়াল আর লেবার বাবদে এক কন্ট্রাক্টর আমার কাছে প্রায় লাখ চারেক টাকা পাবে। এখন কিষনলাল বলছে যে, বাগানের দাম বাবদে ওই যে আড়াই লাখ টাকা পাওয়া গেল, তার থেকে কন্ট্রাক্টরকে সে দু’লাখ টাকা পেমেন্ট করে দিয়েছে। ফলে, বাগানটা যদি না বেচি, তো আই হ্যাভ টু রেইজ দ্যাট অ্যামাউন্ট ইমিডিয়েটলি।”

 

“সেই জন্যেই কাল দেরাদুনে ফিরে যেতে চাইছেন?”

 

‘সেটা একটা কারণ।” মিঃ মিত্র বললেন, “কিন্তু সেটাই যে আসল কারণ, তা নয়। আসল কারণটা কী, তা তো দেরাদুন থেকে যখন ব্যাঙ্গালোরে আপনাকে ফোন করি, তখনই আপনাকে জানিয়েছিলুম। মিঃ ভাদুড়ি, দেরাদুনে গত তিন মাসে অন্তত তিনবার আমাকে মারবার চেষ্টা করা হয়েছে। মাই লাইফ ইজ ইন ডেঞ্জার।”

 

“কিন্তু সে তো দেরাদুনে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কলকাতায় তো আর আপনার জীবনের কোনও আশঙ্কা নেই। তা হলে আপনি কলকাতা ছাড়তে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেন?”

 

কাজের মেয়েটির হাত দিয়ে মালতী ইতিমধ্যে আর-এক প্রস্ত চা পাঠিয়ে দিয়েছিল। মাথা নিচু করে ধীরেসুস্থে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলেন মিঃ মিত্র। তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কলকাতায় এসে দেখছি এখানেও আমি নিরাপদ নই।”

 

“তার মানে?”

 

“মানে আর কিছুই নয়, দেরাদুনে যারা আমাকে মারবার চেষ্টা চালাচ্ছিল, কলকাতাতেও তারা লোক পাঠিয়ে দিয়েছে। পরশু আমি কলকাতায় পৌঁছেছি, তারপর থেকে আজ সকাল পর্যন্ত ক’বার আমাকে মারবার চেষ্টা হয়েছে জানেন? অন্তত দু’বার।”

 

“কীভাবে?”

 

“বলছি।” মাধবানন্দ আবার চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলেন। তারপর আস্তে-আস্তে মাথা তুলে বললেন, “গণেশ অ্যাভিনিউয়ের ক্যালকাটা হোটেলটা চেনেন?”

 

“বিলক্ষণ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাস্তার দক্ষিণ ফুটপাথে। ইউ. এন. আই.-এর অফিস আর মোড়ের এল. আই. সি. বিল্ডিং-এর মাঝামাঝি জায়গায়।”

 

“ঠিক বলেছেন। পরশু বিকেল থেকে ওখানেই আছি। তা কাল সকালে এই ধরুন দশটা নাগাদ একবার আলিপুর কোর্টে যাবার দরকার ছিল। রাস্তা পেরিয়ে ট্যাক্সি ধরতে যাব, এমন সময় পিছন থেকে কেউ আমাকে এমন ধাক্কা দেয় যে, ফুটপাথ থেকে রাস্তার উপরে আমি মুখ থুবড়ে পড়ে যাই। একটা স্টেশন-ওয়াগনের সামনে পড়েছিলুম। তার ড্রাইভার যদি না তক্ষুনি ব্রেক কষত তো নির্ঘাত আমি চাপা পড়তুম। পিছন ফিরে অবশ্য কাউকেই দেখতে পাইনি। আপিস-টাইম, ওই সময়ে তো রাস্তার উপরে ভিড় সারাক্ষণ লেগেই থাকে, তা বুঝতে পারলুম যে, যে-ই ধাক্কা মেরে থাকুক, সে ভিড়ের মধ্যে বেমালুম মিশে গেছে।”

 

“আর দ্বিতীয় ঘটনাটা?”

 

“সেটা আজ সকালে ঘটল। আপনার এখানে আসব বলে যখন হোটেল থেকে বেরুই, তখন।”

 

“কী হয়েছিল?”

 

“হোটেলের একতলার রিসেপশান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াবামাত্র উপর থেকে একটা ফুলগাছের টব আমার একেবারে পাশে এসে আছড়ে পড়ল। আমার বিশ্বাস, হোটেলবাড়িরই উপরের কোনও তলার বারান্দা থেকে কেউ ওটা ফেলেছিল। ইঞ্চি দু’চার এদিক-ওদিক হলে আর দেখতে হত না। মাথাটা থেঁতলে যেত।”

 

“হোটেলে ঢুকে খোঁজ করেছিলেন?”

 

“করেছিলুম।” মাধবানন্দ বললেন, “ম্যানেজার তৎক্ষণাৎ উপরে লোক পাঠিয়ে খোঁজখবরও করেছিলেন। কিন্তু কী করে যে এমনটা ঘটল, তার কোনও হদিশ পাওয়া গেল না। ভদ্রলোক অবশ্য খুব ক্ষমা-টমা চাইলেন, তারপর বললেন যে, টবগুলোকে বারান্দার সিলিং থেকে তারের জালে ঝুলিয়ে রাখা হয় তো, তা তিনতলায় একটা তারের জালে মরচে ধরেছিল, সেটা ছিঁড়ে গিয়ে এটা ঘটেছে।”

 

“আপনার সে-কথা বিশ্বাস হয় না, কেমন?”

 

“না, হয় না। তাই ঠিক করেছি, কালই আমি দেরাদুনে ফিরে যাব। দেরাদুনও অবশ্য আমার পক্ষে খুব সেফ জায়গা নয়। কিন্তু সেফ না হোক, চেনা জায়গা তো বটে। না, মশাই, কালই দুন একক্সপ্রেসে আমি ফিরে যাচ্ছি।”

 

“রিজার্ভেশন পাবেন?”

 

“পাব কী, পেয়ে গেছি। হোটেলের ম্যানেজারই ওঁদের চেনা এক ট্রাভল এজেন্টকে বলে দুটো বার্থ রিজার্ভেশনের ব্যবস্থা করে দিলেন। দুটোই লোয়ার বার্থ। তার জন্যে অবশ্য দুশো টাকা এক্সট্রা দিতে হল। কিন্তু তা হোক, আই ডোন্ট মাইন্ড।”

 

“দুটো বাৰ্থ কেন?”

 

“বাঃ, আপনি আমার সঙ্গে যাচ্ছেন না?” মাধবানন্দ বললেন, “ব্যাঙ্গালোরে যখন আপনাকে ফোন করি, তখন তো সেইরকমই কথা হয়েছিল, মনে নেই?”

 

“তা আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তাই বলে যে এত তাড়াতাড়ি যেতে হবে, সেটা তখন বুঝতে পারিনি।”

 

একেবারে হঠাৎই ভাদুড়িমশাইয়ের হাত দু’খানা জড়িয়ে ধরলেন মাধবানন্দ মিত্র। বললেন, “বুঝতে পারছি আপনার অসুবিধে ঘটালুম, কিন্তু আমার অবস্থাটা একবার বুঝে দেখুন। দয়া করে না বলবেন না।”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, যাব। কাল দেরাদুন এক্সপ্রেস ছাড়বার ঠিক পনেরো মিনিট আগে হাওড়া স্টেশনে বড়ঘড়িটার নীচে আমি দাঁড়িয়ে থাকব।”

 

মাধবানন্দ বিদায় নেবার পরে আমরাও উঠি-উঠি করছি দেখে মালতী বলল, “ইচ্ছে হলে আপনি আর সদানন্দবাবু এখানে খেয়ে যেতে পারেন, কিরণদা। তবে আগেই বলে দিচ্ছি, আজ আমাদের নিরামিষ খাওয়া।”

 

বললুম, “নিরামিষে আপত্তি নেই, তবে বাসন্তী একটু চিন্তায় থাকবে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমার ওয়াইফও খুব চিন্তা করবেন, মিসেস সান্যাল।”

 

মালতী বলল, “ও নিয়ে ভাববেন না, দুজনকেই আমি ফোন করে দিচ্ছি।”

 

বললুম, “তা করো। কিন্তু নিরামিষ কেন? আজ মঙ্গলবার বলে?”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “না, না, সে-সব নয়, আজ যে সরস্বতী পুজো সেটা ভুলে গেলেন? আজ তো নিরামিষ খাওয়াই নিয়ম।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোথাকার নিয়ম, তা তোমরাই জানো বাপু। তা খাওয়ার কথা বাদ দিয়ে এখন বলো তো মাধব মিত্তিরের কথা শুনে কী মনে হল?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমি বলব?”

 

“বলুন।”

 

“লোকটা খুব বিপদে পড়ে গেছে মশাই। দেরাদুনে তিন-তিনবার খুনের অ্যাটেমট হয়েচে, আবার এখানে দু-দুবার। উঃ ভাবা যায় না!”

 

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার কী মনে হল কিরণবাবু?”

 

বললুম, “ওই যে একটা কথা আছে না, আমি যাই বঙ্গে তো আমার কপাল যায় সঙ্গে, এ তো দেখছি সেই ব্যাপার। ভদ্রলোক দেরাদুন থেকে কলকাতায় এলেন, কিন্তু নিয়তির হাত থেকে এখানেও ওঁর নিষ্কৃতি মিলছে না।”

 

“অরুণ, তোমার?”

 

অরুণ সান্যাল হেসে বললেন, “সত্যি কথাটা বলব দাদা?”

 

“বলে ফ্যালো?”

 

“আমার ধারণা, ভদ্রলোক এক ধরনের হাইপোকনড্রিয়ায় ভুগছেন।

 

“ওরে বাবা, এ তো ভারী শক্ত কথা হয়ে গেল মশাই।” সদানন্দবাবু বললেন, “একটু বুঝিয়ে বলুন।”

 

“বলছি। হাইপোকনড্রিয়া হচ্ছে এক ধরনের মর্বিড ডিপ্রেশান, তবে কিনা উইদাউট এনি রিয়্যাল কজ। ভদ্রলোক দুটো ঘটনার কথা বলেছেন। কিন্তু দুটোই হয়তো আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনা, একটাও হয়তো ওঁকে মারবার জন্যে ঘটানো হয়নি। অর্থাৎ…

 

কৌশিক বলল, “অর্থাৎ আপিস-টাইমের ভিড়ের রাস্তায় কারও অমন একটা ধাক্কা হঠাৎ লাগতেই পারে, আর তারের জালে মরচে ধরে গিয়ে ঝুলন্ত একটা টবও ওইভাবে রাস্তার উপরে পড়ে যাওয়া কোনও বিচিত্র ব্যাপার নয়। বাবা ঠিকই বলেছে, মামাবাবু। কিছুদিন আগেই তো ওরই কাছে একটা সাততলা না দশতলা বাড়ির ছাত থেকে একটা ইট পড়ে গিয়ে এক ডাক্তারের মাথা ফেটে গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে যে ওই ডাক্তারবাবুকে মারবার জন্যেই ইটখানা ওইভাবে ছাত থেকে কেউ ছুড়ে মেরেছিল, তা তো আর বলা যাচ্ছে না। আসলে ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট, যেমন অ্যাক্সিডেন্ট কিনা যে-কোনও শহরে যে-কোনও দিন ঘটতে পারে।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “রাইট। ভদ্রলোক আসলে মৃত্যুভয়ে ভুগছেন, অ্যান্ড দ্যাট টু উইদাউট এনি রিয়্যাল কজ।”

 

আমি বললুম, “হতে পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু আপনার কী মনে হয়, তা তো বললেন না, ভাদুড়িমশাই।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মৃত্যুভয়টা সত্যি না মিথ্যে, অর্থাৎ ভয়ের কারণ আছে কি নেই, এখুনি তা আমি বলতে পারছি না। আগে দেরাদুনে যাই, তার পরে সেটা বুঝতে পারব। কিন্তু ইতিমধ্যে একটা কথা বলতে পারি। সেটা এই যে, যা ঘটেছে, সেটা ডেসক্রাইব করতে গিয়ে একটা মাইনর ব্যাপারে সম্ভবত মাধব মিত্তির একটা মিথ্যে কথা আমাদের বলে গেলেন। অথচ সেটা বলবার যে কোনও দরকার ছিল, তাও নয়।”

 

“বলেন কী মশাই, একটা ফল্স দিয়ে গেল?”

 

প্রশ্নটা সদানন্দবাবুর। উত্তরে ভাদুড়িমশাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই মালতী এসে বলল, “কাজের মেয়েটা ও-বেলা আসবে না।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “কেন?”

 

“বাঃ, আজ সরস্বতী পুজো না? বিকেলবেলায় ওদের পাড়ায় গানের মজলিশ বসবে। তোমরা উঠে পড়ো তো, চটপট যদি খেয়ে নাও তো থালাবাসনগুলো এ-বেলাই ওকে দিয়ে মাজিয়ে রাখতে পারি।”

 

বারোটার মধ্যে খাওয়া শেষ। বিদায় নিয়ে নীচে নামতে-নামতে সাড়ে বারোটা। ফিরতি পথে গাড়িটা সদ্য মানিকতলা ব্রিজের উপরে উঠেছে, এমন সময় পাশের সিট থেকে সদানন্দবাবু বললেন, “যাচ্চলে, একটা কথা তো শোনাই হল না।”

 

গিয়ার পালটে জিজ্ঞেস করলুম, “কী কথা?”

 

“ওই ফল্স দেওয়ার কথাটা।”

 

“আরে তা-ই তো।” পিছন থেকে যে স্কুটারটা অতি বিপজ্জনকভাবে আমাকে ওভারটেক করবার চেষ্টা করছিল, সেটাকে সামনে এগিয়ে যেতে দিয়ে বললুম, “খেয়ালই হয়নি।”

 

“আমি কিন্তু আর-একটা ফল্স ধরে ফেলেছি, মশাই।”

 

“সেটা আবার কী?”

 

“মাধব মিত্তিরের বয়েস কত বলুন তো?”

 

“বছর পঁয়তাল্লিশ হবে।”

 

“না মশাই, অনেক বেশি।” সদানন্দবাবু বললেন, “চুলের রং দেখে পঁয়তাল্লিশ ভাবছেন তো? ওটা ফল্স। কলপ লাগায়।”

 

১৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ছিল সরস্বতী পুজো। ১৬ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ভাসানের দিন ভাদুড়িমশাই দুন এক্সপ্রেসে মাধব মিত্তিরের সঙ্গে দেরাদুন রওনা হয়ে যান। আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি শনিবার। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে বৈঠকখানা ঘরে বসে কাগজ পড়ছি, এমন সময় সদানন্দবাবু এলেন। এসে, আমার পড়ার টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে বসে, একখানা কাগজ টেনে নিয়ে প্রথম পৃষ্ঠার হেডলাইনগুলোর উপর চোখ বুলোতে বুলোতে বললেন, “নাঃ, দেশটা একেবারে চোরে-জোচ্চোরে ছেয়ে গেল মশাই।”

 

বুঝলুম, এটা ভণিতা মাত্র, একটু বাদেই তিনি আসল কথায় আসবেন। তা এলেনও। মিনিট দু-চার খবর পড়ার ভান করে তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কোনও খবর পাওয়া গেল?”

 

হাতের কাগজ সরিয়ে রেখে বললুম, “একটু ঝেড়ে কাসুন তো। কীসের খবর?”

 

“দেরাদুনের।”

 

“অর্থাৎ ভাদুড়িমশাইয়ের খবর। কেমন?”

 

“তা নয় তো কি আমি দেরাদুন রাইসের চলতি বাজার দরের খবর জানতে চাইচি?” সদানন্দবাবু বললেন, “একটা পৌঁছ-সংবাদ পর্যন্ত পাওয়া গেল না। এদিকে আবার যার সঙ্গে গেছেন, হি ইজ এ স্নাই ফক্স। বড় চিন্তায় আছি মশাই!”

 

“মাধব মিত্তির যে স্নাই ফক্স, তা বুঝলেন কী করে?”

 

“বাঃ, লোকটা সেদিন কতক্ষণই বা ও-বাড়িতে ছিল, অথচ ভাদুড়িমশাই নিজেই বললেন যে, তারই মধ্যে ওঁকে একটা ফল্স মেরে দিয়েছে। তা হলে চিন্তা হবে না?”

 

“চিন্তার কিছু নেই। পৌঁছ-সংবাদ পাওয়া গেছে।”

 

“তা-ই? কখন পাওয়া গেল?”

 

“কাল রাত্তিরে।” হেসে বললুম, “ফোন করেছিলেন। তবে দেরাদুন থেকে নয়।”

 

“তবে কোত্থেকে?

 

“মুসৌরি থেকে।”

 

“কেন, মুসৌরি কেন?” সদানন্দবাবু বললেন, “ভাদুড়িমশাইয়ের কাজ তো যা বুঝলুম দেরাদুনে। তা হলে হঠাৎ মুসৌরি যাবার দরকার হল কেন?”

 

বাসন্তী চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। বললুম, “ব্যস, আসল লোক এসে গেছে, যা জিজ্ঞেস করবার বাসন্তীকেই করুন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কেন, বউমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে কেন?”

 

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললুম, “বলছি। বাড়ি ফিরতে কাল আমার একটু রাত হয়ে গিয়েছিল। ফলে মুসৌরি থেকে রাত আটটায় যে কল আসে, সেটা বাসন্তীকেই ধরতে হয়। কথাবার্তা যা হবার, তা ওরই সঙ্গে হয়েছে। ও-ই আপনাকে সব ভাল করে বুঝিয়ে বলতে পারবে।”

 

“ওরে বাবা, এখন আমার মরবার সময় নেই!” বাসন্তী হাঁ-হাঁ করে উঠল, “বাজার এসে পড়ে আছে। এখন যদি তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে বসি তো ওদিকটা কে দেখবে। আর তা ছাড়া, কথা যা হয়েছে, সে তো তুমি জানোই।… বোসমশাই, আপনি ওঁর কথায় কান দেবেন না তো, উনি সব জানেন।”

 

বাসন্তী চলে যাচ্ছিল। কিন্তু যেতে-যেতে ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তবে হ্যাঁ, একটা কথা বলে যাচ্ছি। কলকাতায় এরই মধ্যে একটু-একটু গরম পড়ে গেছে বটে, কিন্তু ওদিকে এখনও দারুণ শীত।”

 

বাসন্তী চলে গেল।

 

সদানন্দবাবুকে দেখে মনে হল, বাসন্তীর শেষ কথাটার তাৎপর্য তিনি ধরতে পারেননি। বললুম, “কিছু বুঝতে পারলেন না, কেমন?”

 

“বুঝব না কেন,” সদানন্দবাবু বললেন, “দারুণ শীত। মানে এদিকে নয়, ওদিকে…”

 

“কোন দিকে?”

 

“সেটা অবশ্য বুঝিনি।”

 

“বোঝা উচিত ছিল।” হেসে বললুম, “দেরাদুনে। মুসৌরিতে শীত অবশ্য আরও বেশি। মনে হবে যেন প্রকাণ্ড একটা ফ্রিজের মধ্যে বসে আছি। সে একেবারে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা।”

 

“কেন?”

 

“জায়গাটা আরও উঁচুতে কিনা। তার উপরে ধরুন হিমালয়ে এই সময়ে বরফ গলতে শুরু করেছে। ফলে বাতাস হয়ে উঠেছে একেবারে মাংস-কাটা চপারের ফলার মতন। তার ধার এমন বেড়ে গেছে যে, সে আর কহতব্য নয়। কিছু বুঝলেন?”

 

“ওরেব্বাবা, তার মানে তো ভয়ংকর ব্যাপার!” সদানন্দবাবু বললেন, “এহেহে, ভাদুড়িমশাইয়ের তো তা হলে যাচ্ছেতাই রকমের কষ্ট হচ্চে।”

 

বললুম, “আমাদেরও হবে।”

 

“বলেন কী মশাই, ওয়েদার ফোরকাস্টে সেইরকম কিছু লিখেছে নাকি? মানে বিষ্টি-ফিস্টি হয়ে কলকাতাতেও ফের জাঁকিয়ে শীত পড়বে?” বলে হাতের কাগজখানার পাতা উল্টে, আবহ-বার্তার উপরে চোখ বুলিয়ে, সদানন্দবাবু বললেন, “কই, কাগজে তো সে-রকম কিছু লিখছে না।”

 

“আমি তো কলকাতার কথা বলিনি।”

 

“তা হলে?” কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে সদানন্দবাবু আমার দিকে তাকালেন। তাকালেন তো তাকিয়েই রইলেন। তারপর দেখলুম, আস্তে-আস্তে তাঁর মুখখানি একেবারে অমলিন হাস্যে ভরে উঠেছে। বললেন, “ বুঝিচি।”

 

“কী বুঝেছেন?”

 

“আমরাও দেরাদুন যাচ্চি!”

 

বললুম, “আপনি যাচ্ছেন কি না জানি না, তবে আমি যাচ্ছি। ভাদুড়িমশাই অবশ্য আপনার কথা বলেছেন। তাঁর ধারণা, কাজ মিটতে খুব একটা সময় লাগবে না। যেতে পারবেন? ওখানে এখন কিন্তু বড্ড শীত। তাই ভাবছিলুম যে, মিসেস বসু আপনাকে পারমিশন দিলে হয়।”

 

এই শেষের কথাটা বললুম স্রেফ ভদ্রলোককে একটু উশকে দেবার জন্য। তাতে কাজ হল সদানন্দবাবু ঝাঁঝালো গলায় বললেন, “অত মিসেস বসুর ভয় দেখাবেন না তো! কী ভাবেন আপনারা আমাকে, অ্যাঁ? অ্যাম আই এ হেনপেক্‌ক্ড ম্যান? আমি যাচ্ছি।”

 

“তা হলে তৈরি হোন। আর তো সময় নেই। আজ শনিবার। ভি. আই. পি. কোটা থেকে বলে- কয়ে দুটো বার্থ যদি জোগাড় হয়ে যায় তো সোম কি মেরেকেটে মঙ্গলবারই আমরা বেরিয়ে পড়তে পারব। তবে হ্যাঁ, গরম জামাকাপড় যত পারেন সঙ্গে নেবেন।”

 

“তা তো নেবই।” সদানন্দবাবু বললেন, “জাম্পার, পুলোভার, গলাবন্ধ কোট, অলেস্টার, আলোয়ান, দস্তানা, মোজা, মাফলার, সব চাই। একটা মাঙ্কি-কাপ আছে, ওই যেটা পরে শীতকালে আমি মর্নিং ওয়াক করি, সেটাও নিয়ে নেব।”

 

(এই মাঙ্কি-ক্যাপ নিয়ে মুসৌরিতে পরে একটা তাজ্জব ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এক্ষুনি সেই প্রসঙ্গে আমি যাচ্ছি না। তার চেয়ে বরং আমার ডায়েরিতে যেভাবে লিখে রেখেছি, ঘটনাগুলোকে সেইভাবেই পরপর সাজিয়ে যাই।)

 

সদানন্দবাবু উঠে পড়লেন। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে দরজার কাছ থেকে ফের ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। বললেন, “আজকের কাগজটা ভাল করে পড়েচেন?”

 

“কাগজ পড়বার সময় পেলুম কোথায়?”

 

“বেলা আটটায় ঘুম থেকে উঠলে সময় কখনও পাবেনও না।”

 

“মোটেই আটটায় উঠিনি।” প্রতিবাদ করে বললুম, “গরম পড়ছে না? সাড়ে সাতটার মধ্যেই এখন আমার ঘুম ভেঙে যায়।”

 

দেরি করে যারা শয্যাত্যাগ করে, তাদের সম্পর্কে সদানন্দবাবুর একটা গায়ে-জ্বালা ধরানো স্পেশ্যাল তাচ্ছিল্যের হাসি আছে। সেই হাসিটা হেসে তিনি বললেন, “ওই একই হল। নিন, এখন দৈনিক বার্তাবহের তিনের পাতায় বারাসতের একটা বাগান নিয়ে যে হাঙ্গামার খবর বেরিয়েচে, সেটা পড়ে ফেলুন দিকি।”

 

ঠিক বারাসতের নয়, বারাসত থেকে মাইল সাতেক দূরের একটা গ্রামের খবর। গ্রামের নাম মহেশপুর। সেখানে একটা বাগান কিনে এক মারোয়াড়ি ভদ্রলোক তার চারদিক ঘিরে পাঁচিল তুলে ফেলেছেন। ফলে, বাগানের মধ্যে যে একটা দিঘি আছে, গ্রামের মানুষরা সেখানে থেকে আর জল নিতে পারছে না। আসল অশান্তি কিন্তু তা-ই নিয়ে নয়, দিঘির ধারের একটা মন্দির নিয়ে। পুরনো, পরিত্যক্ত শিবমন্দির। পুজো হয় না, তবে চৈত্র মাসের শেষ সাতটা দিন ওই মন্দিরের সামনে ছোটখাটো একটা মেলা বসে যায়। এবারে সেটাও যে বন্ধ হতে চলেছে, তা বুঝতে পেরে স্থানীয় মানুষরা নাকি খেপে আগুন হয়ে আছে। বার্তাবহের নিজস্ব সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, বাগানের চৌকিদারদের সঙ্গে গ্রামের লোকজনের একটা রক্তারক্তি সংঘর্ষও ঘটে গেছে ইতিমধ্যে। সংঘর্ষে কারও অবশ্য মৃত্যু হয়নি, তবে আহত অবস্থায় জনা পনেরো লোককে বারাসত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন-চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

 

খবর পড়া শেষ করে সদানন্দবাবুর দিকে তাকাতে তিনি বললেন, “কী বুঝলেন?”

 

বললুম, “এতে আর বোঝাবুঝির কী আছে? এ-রকম ঘটনা তো আকছার ঘটছে আজকাল। কাগজে তো সবসময় এই ধরনের খবরের জায়গাই হয় না। এটার জন্য যে আধ কলামের মতো জায়গা করা গেছে, তা-ই যথেষ্ট।”

 

সদানন্দবাবু আবার সেই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। তারপর বললেন, “আসল ব্যাপারটাই আপনার চোখে পড়েনি দেখছি।”

 

“তার মানে?”

 

“মালিকের নামটা দেখুন।” সদানন্দবাবু বললেন, “বাগান কিনে যে-লোকটা পাঁচিল তুলেছে, তার নাম কিন্তু ওঙ্কারমল আগরওয়াল।”

 

“তাতে কী হল?”

 

“বাঃ, মাধব মিত্তির সেদিন যে-লোকটার নাম করল, মানে মাধব মিত্তির বেচতে চায় না, তবু যে-লোকটা তার ফলের বাগান কিনতে চায়, তার কথা মনে নেই?”

 

“কেন, সে কী করেছে?”

 

“কিছু করেনি….মানে কিছু করেছে কি না তা আমি জানি না, তবে তার নামও কিন্তু ওঙ্কারমল আগরওয়াল।”

 

দরজায় পাশ থেকে লাঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে সদানন্দবাবু বেরিয়ে গেলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *