অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার
ছয়
মাটির নীচ থেকে উপরে উঠে এসে প্রথমে মনে হল, নিউ ইয়র্ক শহরের প্রান্ত এলাকার সঙ্গে কোনও ফারাক নেই। লোকজন দ্রুতগতিতে হাঁটছে। কিছুটা চলার পর অর্জুন লক্ষ করল, ক্রমশ কালো মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দূরে বিকট শব্দ হতেই জো অর্জুনকে নিয়ে একটা দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দোকানদার কিছু বলতে চাইলে জো বলল, ভাই, তিন মিনিটের বেশি থাকব না। ও কে!
তখনই দৃশ্যটা দেখতে পেল অর্জুন। পাশাপাশি ছ’টা মোটরবাইক, পিছনে অন্তত আঠারোটা মাঝারি গতিতে এগিয়ে আসছে। সাদা-কালো মিশিয়ে স্বাস্থ্যবান চালকদের পরনে চামড়ার প্যান্ট, হাতকাটা জ্যাকেট। হাতে নানানরকম উল্কি আঁকা। প্রত্যেকের চুলে বেণি, কাঁধের উপর লুটোনো। চোখগুলো রোদচশমায় ঢাকা, মুখে দাড়ির জঙ্গল। ওদের আসতে দেখে রাস্তা ফাঁকা করে সবাই ফুটপাতের ওধারে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যটি দেখলেই ভয় জাগবেই। ওরা ওপাশের রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে যেতেই জো বলল, চলুন।
এরা কারা? হাঁটতে হাঁটতে অর্জুন জিজ্ঞেস করল।
ঈশ্বর পৃথিবীতে পাঠাবার সময় ওদের বুকে দয়ামায়া, ভালবাসা বোধগুলো দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। জো বলল।
এরাই তা হলে সেই কুখ্যাত অপরাধী? পুলিশ ধরছে না কেন?
অপরাধ করলেই ওরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। এখন যাদের দেখলেন, তাদের বিরুদ্ধে কেউ পুলিশের কাছে কোনও নালিশ করেনি।
দুটো সাদা ছেলে একটা ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখেই বোঝা যায় অনেকদিন স্নান করেনি। চুলে নানারকমের রং। হাতকাটা গেঞ্জি আর জিনস পরনে। কিছু একটা চিবুচ্ছিল ওরা। ওদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একজন পা সামনে তুলে দিয়ে পথ আটকাল। দ্বিতীয়জন জিজ্ঞেস করল, ইউ স্টে হিয়ার?
জো মাথা নাড়ল, নো।
ছেলেটা খ্যাকখ্যাক করে হাসল, তোমার পকেটে যা আছে তা বের করো? কুইক।
বের তো করতেই পারি ব্রাদার, কিন্তু তুমি মুশকিলে পড়বে। জো বলল।
মুশকিলে পড়ব? হা হা হা। আমি কথা বলি কিন্তু ও ছুরি চালাতে ভালবাসে।
বেশ নাও। পকেটে হাত ঢোকাল জো, কিন্তু একটু পরেই মিস্টার ডি সিলভার কাছে তোমাদের যেতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে প্রথম ছেলেটা পা নামিয়ে দিল, ইউ নো হিম?
হি ইজ মাই ক্লায়েন্ট।
সঙ্গে সঙ্গে ছেলে দুটো যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গি করে উলটো দিকে তাকিয়ে থাকল।
আবার হাঁটা শুরু করতে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, ডি সিলভা কে?
এই পাড়ার গড ফাদার। জো জবাব দিল।
একটা ছোট্ট আধা অন্ধকার বারে ঢুকল জো। সেখানে চার-পাঁচজন ছড়িয়েছিটিয়ে বসে। বারম্যানকে জো ডি সিলভার কথা জিজ্ঞেস করতে সে মুখের ইশারায় পাশের দরজা দিয়ে ভিতরে যেতে বলল। দরজাটা ভেজানো।
জোর সঙ্গে ভিতরে ঢুকে অর্জুন দেখল, বিশাল চেহারার একটা লোক টেবিলে বসে দাবা খেলছে। তার সামনে কেউ নেই। লোকটার ঊধ্বাঙ্গের অনেকটা জ্যাকেটে ঢাকা পড়েছে। সেখানে প্রচুর উল্কি আঁকা।
জো বলল, হাই! কেমন আছ?
মরে যাওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত আমি খারাপ থাকব না। অনেক দিন পর এলে? লোকটি দাবার বোর্ড থেকে চোখ না সরিয়ে কথাগুলো বলল।
আমার কর্মচারী অসুস্থ বলে আসতে হল। মিস্টার কার্ভালার নামে একটা পার্সেল এসেছে টেক্সাস থেকে। জো বলল।
কাভার্লো এখন মাটির নীচে। মাসখানেকের মধ্যে উপরে উঠবে না।
ও।
ফালতু খুন করে ঝামেলায় পড়েছে। উপরে উঠলেই পুলিশ ওকে ধরবে।
ডি সিলভা বলল, তুমি যদি চাও তা হলে কাউকে সঙ্গে দিয়ে তোমাকে নীচে পাঠাতে পারি। না হলে আমাকে দিয়ে যেতে পারো।
তুমিই নাও। দয়া করে ওকে দিয়ে দেবে।
এটি কে? ডি সিলভা বোর্ডের চাল দিল।
আজ থেকে আমার কাজ করছে। ওকে চেনানোর জন্যে সঙ্গে এসেছি।
একটা নাম নিশ্চয়ই আছে।
অর। জো বলল।
অর? অবাক হয়ে তাকাল ডি সিলভা। তারপর অট্টহাস্যে ভেঙে পড়ল। শেষে হাসি থামতে বলল, আমি বাবার জন্মে এমন নাম শুনিনি। সুতরাং তুমি হলে অলটারনেটিভ। কোন দেশ থেকে এসেছ?
ইন্ডিয়া। অর্জুন বলল।
ইন্ডি! মাথা নাড়ল ডি সিলভা, এখানে এসে যদি কোনও প্রবলেমে পড়ো তা হলে আমার নাম বলবে। কিন্তু মনে রেখো, এই তিনটে ব্লকে। তার বাইরে নয়।
বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল অর্জুন।
পার্সেলটা ডি সিলভাকে দিয়ে দিল জো। সেটা তুলে কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ঝাঁকাল ডি সিলভা। তারপর গন্ধ শুকল। এবার হাসি ফুটল তার মুখে। তারপর সেলফোনের বোতাম টিপল। সেটা কানে লাগিয়ে ধরতেই ওপারের সাড়া পেয়ে হাসতে হাসতে যে ভাষায় কথা বলে গেল, সেটা সম্ভবত স্প্যানিশ। বিন্দুবিসর্গ বুঝল না অর্জুন। লোকটি ফোনে কথা বলছে চেঁচিয়ে। মোটা শরীর কাঁপিয়ে হাসছে। শেষে সেলফোন বন্ধ করে ডি সিলভা বলল, কার্ভালো খুব এক্সাইটেড। ও তোমাকে কিছু দেবে কুরিয়ার করার জন্যে।
কীভাবে দেবে?
ও তো উপরে উঠবে না। তুমি নীচে গিয়ে দেখা করে এসো।
আমাকে নীচে যেতে হবে? জো-এর মুখ শুকিয়ে গেল।
তুমি তো এর আগে নীচে নেমেছ?
হ্যাঁ। কিন্তু মিস্টার ডি সিলভা, ওখানে না গেলেই খুশি হব।
এই সময় একটা বাইকের আওয়াজ বাইরের রাস্তায় থামল। তারপর দরজায় শব্দ হল। একটা লোক মাথা গলিয়ে বলল, বেন দেখা করতে চাইছে।
পাঠিয়ে দাও। কিন্তু তুমি ওর পিছনে থেকো। ডি সিলভা বলল।
তারপরই যে ছেলেটি ঢুকল তাকে পাঙ্ক ছাড়া কিছু মনে হয় না। চুল রঙিন এবং মাথার উপরে খাড়া হয়ে আছে। হাতে-গলায় উল্কি। পরনে বারমুডা আর হাতকাটা জ্যাকেট। মুখের চেহারা নির্বিকার। উল্কিগুলো সাপের।
বেন বলল, কার্ভালো ফোনে বলল আপনার সঙ্গে দেখা করতে।
আমি শুনছি তুমি নাকি প্রায়ই ব্রঙ্কসের বাইরে যাচ্ছ?
প্রায়ই না, গত কাল গিয়েছিলাম।
আই ডোন্ট লাইক দ্যাট।
আমার মনে থাকবে। কিন্তু শুধু আমার বেলায় এই নির্দেশ কেন?
তুমি কি তোমার বন্ধুর কথা বলছ? ওকে আমি যেতে দিই। কারণ, ওর যাওয়ার পিছনে সেন্টিমেন্টাল কারণ আছে। যাকগে, তুমি এই ভদ্রলোককে কার্ভালোর কাছে নিয়ে যাও। জো, ফলো হিম। ডি সিলভা বলল।
আমি কি আপনার প্রাইভেট প্যাসেজ ব্যবহার করতে পারি?
যদিও আমি পছন্দ করি না, তবু, জো-এর জন্যে। হাত নাড়ল ডি সিলভা।
জো অর্জুনকে অপেক্ষা করতে বলে বেনকে অনুসরণ করে ভিতরে চলে গেল।
ডি সিলভা তার কর্মচারীকে বলল, অ্যাসকে বলবে বেনের উপর নজর রাখতে। ওর চালচলন আমার ভাল লাগছে না।
লোকটি বেরিয়ে গেলে অর্জুন বলল, আমি কি একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পারি?
নিশ্চয়ই। কিন্তু বেশি দূরে যাবেন না। ডি সিলভা আবার দাবার বোর্ডের সামনে গেল।
অর্জুন বাইরে বেরিয়ে এল। আকাশে হঠাৎই মেঘ জমছে। ছায়াছায়া হয়ে আছে সামনের পথ। হঠাৎ চিৎকার কানে এল। একটা লোক প্রাণভয়ে দৌড়ে যাচ্ছে আর তার পিছনে ছুটছে তিনটে ছেলে। বীভৎস চিৎকার করছে ছেলেগুলো। একটা পুলিশের গাড়ি দ্রুত সেদিকে যেতে আচমকা চিৎকার থেমে গেল। ছেলে তিনটে পাশের বাড়িগুলোর খাঁজে উধাও। পুলিশ লোকটিকে জিজ্ঞেস করে গাড়িতে তুলে চলে গেল।
অর্থাৎ জায়গাটা মোটেই নিরাপদ নয়। দু’পাশের ফুটপাতে যে সমস্ত মানুষ চলাফেরা করছে তাদের দেখে কিন্তু অপরাধী বলে মনে হল না। নিতান্তই সাংসারিক মানুষ। এই সব কাণ্ডের মধ্যেও এরা এখানে আছে। অদ্ভুত ব্যাপার!
হঠাৎ ফুটপাতের গায়ে দাঁড় করানো মোটরবাইকের উপর নজর পড়ল অর্জুনের। ঝকঝকে বাইক। দেখতে বেশ সুন্দর। সে সামনে গিয়ে চাকার দিকে তাকাতেই কীরকম অস্বস্তি এল মনে। টায়ারের উপরে যে ডিজাইনটা রয়েছে তা যেন সে আগেও দেখেছে। বাইকের পিছনের রাস্তায় কাদার উপরে যে ছাপটা পড়েছে তা দেখামাত্র অর্জুন বুঝতে পারল, মিস্টার ব্রাউনের বাড়ির গায়ে এই রকম চাকার ছাপ সে দেখেছিল। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, ওখানেও একই বাইক গিয়েছিল। একই কোম্পানির চাকা অনেক বাইকে থাকাই স্বাভাবিক। অর্জুন দেখল, আর-একটা মোটরবাইক তার সামনে এসে দাঁড়াল। এই ছেলেটির পরনে ফ্যাকাশে জিন্স আর টি শার্ট। বেশ শক্তপোক্ত চেহারায় বাইক থেকে নেমে ছেলেটি আগের বাইককে দেখল। ঠিক তখনই ডি সিলভা এসে দাঁড়াল দরজায়।
এখানে কী দরকার? ডি সিলভার কোমরে হাত।
পুলিশ আমাকে খুঁজছে। ওরা আমার বিরুদ্ধে মার্ডার চার্জ এনেছে। ছেলেটি নার্ভাস।
কেন?
আমি জানি না। আমার মা নাকি হাসপাতালে। ওরা মনে করছে, আমি নাকি তাঁকে ছুরি মেরেছি। ঈশ্বরের দিব্যি, আমি আমার মাকে কখনওই তা করতে পারি না।
কে বলল তোমাকে?
থানা থেকে খবরটা এসেছে। আমি আমাদের এলাকার হাসপাতালে ফোন করে জেনেছি, মাকে কাল রাতে ভরতি করা হয়েছে। মিস্টার ডি সিলভা, আপনি আমাকে বাঁচান। প্লিজ। আমি আমার মাকে স্পর্শ পর্যন্ত
করিনি। ছেলেটি বলল।
তুমি তো কাল বাড়িতে গিয়েছিলে?
হ্যাঁ। কেউ সাড়া দেয়নি। দরজা খোলেনি। আমি চলে এসেছিলাম।
তা হলে কে ছুরি মেরেছে?
আমি জানি না।
ঠিক আছে। তুমি ড্যানিয়েলের কাছে চলে যাও। আমি বলে দিচ্ছি।
থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ। বলে ছেলেটি বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল। ডি সিলভা অর্জুনের দিকে তাকিয়ে হাসল, খুব সুন্দর জায়গা, না? বেশ পিসফুল!
এই সময় বেন আর জো বেরিয়ে এল। বেন বলল, আমি কি যেতে পারি?
শিয়োর। ডি সিলভা বলল।
সে বাইক নিয়ে চলে যেতে জো বলল, আমার কাজ হয়ে গিয়েছে। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মিস্টার ডি সিলভা।
ডি সিলভা বলল, নেক্সট টাইম তোমার আসার দরকার নেই। অরকে পাঠিয়ে দিয়ো। হ্যাভ এ নাইস ডে। বলে ভিতরে চলে গেল লোকটি।
দ্রুত হেঁটে ওরা টিউব স্টেশনে পৌঁছে গেল। ট্রেনে উঠে জো জিজ্ঞেস করল, কেমন দেখলেন? দেখার ইচ্ছে নিশ্চয়ই পূর্ণ হয়েছে?
কিছুটা। কিন্তু আপনি অত দূর থেকে এখানে ডেলিভারি দিতে কেন আসেন? ওরা তো এখানকার কোনও কুরিয়ার কোম্পানিকে পাঠাতে পারে। আপনাকেও এখানে আসার ঝুঁকি নিতে হয় না। অর্জুন বলল।
ওদের পক্ষে এখানকার কুরিয়ার ব্যবহার করা সম্ভব নয়। যে-কোনও মুহূর্তে পুলিশের হাতে চলে যেতে পারে বলে এত দূরে আমার কাছে পাঠায়। আর আমি আসি, কারণ, ওরা অনেক গুণ বেশি অর্থ দেয়। হাসল জো।
