আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৭)

আশা মালহোত্রার বয়স মনে হল বছর পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। গাত্রবর্ণ উৎকট রকমের ফর্সা। পরনে হাল্কা সবুজ শালোয়ার-কামিজ ও একটা সাদা চুর্নি। বব-ছাঁট চুলের রং সামান্য হলদেটে, যেটা স্বাভাবিক নয়, মেহেদির জন্যে হয়েছে। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিকের প্রলেপ। সুন্দরী ঠিকই, তবে একটু রুক্ষ ধরনের, সৌন্দর্যের তুলনায় লাবণ্য অনেক কম। ড্রয়িং রুমে যখন প্রথম ঢুকি, ভদ্রমহিলাকে তখন একটু আড়ষ্ট মনে হয়েছিল। সেই আড়ষ্ট ভাবটা এখন আর চোখে পড়ল না।

 

কিন্তু কী এঁর সমস্যা, এত লোকের মধ্যে একা আমিই বা সেটা বুঝতে পারব কেন, আর যদি-বা বুঝি, তাতেই বা আমি এঁর কোন উপকারে লাগব, কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। কেমন যেন হেঁয়ালির মতো লাগছিল সবকিছু।

 

বললুম, “প্রবলেমটা কী?”

 

“এরা আমাকে ফাঁসিয়ে দিল,” আশা মালহোত্রা সরাসরি আমার দিকে তাকালেন না, সামনের লনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেই দিকেই চোখ রেখে হাতের গেলাসে একটা চুমুক মেরে বললেন, “আমিও রিফিউজ করতে পারলুম না। কী করেই বা সেটা করব বলুন। আফটার অল ইট্স আ স্মল কমিউনিটি, রিফিউজ করলে বদনামি হত, সবাই বলত যে, একটা ভাল কাজ হতে যাচ্ছিল, লেকিন মিসেস মালহোত্রার ঘমকে লিয়ে সেটা হতে পারল না, সো আই হ্যাড টু এগ্রি…বললুম যে, ঠিক আছে, আপনারা যখন এত করে চাইছেন, তখন ওটা আমি করে দিব। আর সেটাই হল প্রবলেম।”

 

কিছুই বুঝতে পারলুম না। বুঝে লাভই বা কী। ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে একটা দিনের জন্যে এখানে এসেছিলুম, এখন এসে শুনেছি তিন-চার দিন থাকতে হবে, তা তা-ই নাহয় থাকা গেল, নদী পাহাড় আর জঙ্গল দেখে সময়টা নেহাত খারাপ কাটবে না, কিন্তু এরই মধ্যে যদি আবার ভদ্রমহিলার ‘প্রবলেম’ নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়, তবেই তো মুশকিল। বললুম,”দেখুন আমরা বাইরের লোক, এখানকার কিছুই তো আমাদের জানা নেই, তা ছাড়া আপনার সমস্যাটা কী তাও তো ঠিক বুঝতে পারছি না, তাই…মানে ভাবছিলুম যে…”

 

কথাটা যে কীভাবে শেষ করব, সেটা ঠিক করতে না পেরে চুপ করে গেলুম।

 

“না না, আপনি পারবেন, অ্যাট লিস্ট আমি সেটা বিশোয়াস করি।”

 

“কিন্তু আপনার বিশ্বাস তো ভুল হতে পারে।”

 

ভদ্রমহিলা এবারে একেবারে সরাসরি আমার দিকে তাকালেন। বললেন, “কিন্তু আপনার ফ্রেন্ড…আই মিন মিঃ ভাদুড়ি…বললেন, আপনি একজন রাইটার।”

 

মৃদু হেসে বললুম, “সর্ট অব।”

 

“ও, ইউ আর বিইং পোলাইট। উনি তো বললেন যে, দো-চারঠো কিতাব আপনি লিখেচেন, বহোত কাদম্বরী অওর নাটক আপনার পড়া ভি আছে, তাই আমার প্রবলেমটা যদি আপনাকে বলি তো আপনি কোই-না-কোই ফিকির আমাকে ঠিক বাতলাতে পারবেন।”

 

এঁকে কারা কী সমস্যায় ফেলেছে জানি না, তবে ভাদুড়িমশাই যে তাঁর সমস্যাকে আমার ঘাড়ে চালান করেছেন, সেটা বুঝে গিয়ে বললুম, “মিঃ ভাদুড়ি বললেন আর আপনি বিশ্বাস করে ফেললেন?”

 

মিসেস মালহোত্রা বললেন, “ইয়ে ভি কোই পুছনেকি বাত হ্যায়? আপনি হাসালেন মিঃ চাটার্জি। কেনো বিশোয়াস করব না? উনি কি ঝুট বলবেন?…ও, কাম অন, প্লিজ ডু সামথিং!”

 

বুঝলুম যে, এঁর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে না। তাই একটু হেসে বললুম, “ঠিক আছে, কিন্তু আপনার সমস্যাটা কী, তা-ই তো এখনও বলেননি।”

 

“বলছি। আমাদের ফাংশানে যেমন নাচা-গানা হবে, তেমনি একটা নাটক ভি হবে, সেটা জানেন তো?”

 

“জানি। ডি.এল. রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’। মিঃ সেন তাঁর চিঠিতেই এটা লিখেছিলেন।”

 

“বাঃ, তব তো আচ্ছা-ই হুয়া, নাউ হু ইজ দিস ডি. এল. রয়?”

 

সত্যি বলতে কী, আমি একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলুম। হঠাৎ কেন এই প্রশ্ন? ডি. এল. রায় কে ছিলেন, সেটা জেনে এঁর কোন চতুর্বর্গ ফললাভ হবে? ঢোক গিলে বললুম, “আ গ্রেট বেঙ্গলি রাইটার। বড় কবি, বড় নাট্যকার। ‘চন্দ্রগুপ্ত’ ছাড়া আরও অনেক নাটক লিখেছেন।”

 

“তা লিখুন, আমার কুছু বলবার নাই, লেকিন এইটা…আই মিন দিস ‘চন্দরগুপ্তা’, এইটা না-লিখলে বহোত ভাল কাম করতেন। দ্যাট উড হ্যাভ সেভড আস আ হোল লট অব ট্রাব্‌ল।”

 

‘চন্দ্রগুপ্ত’ লিখে দ্বিজেন্দ্রলাল এঁদের কী অসুবিধে ঘটালেন, কিছুই বোঝা গেল না। একবার সন্দেহ হল, ভদ্রমহিলার মাথার কিছু গণ্ডগোল আছে, আবার পরক্ষণেই মনে হল, হাতের গেলাশে চুমুক মেরে যে তরল পদার্থটি ইনি গিলে যাচ্ছেন, সেটা বোধহয় এঁর ধাতে ঠিক সয় না। বললুম, “একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

 

“বলব,” গেলাশে ফের একটা চুমুক মেরে মিসেস মালহোত্রা বললেন, “ইন ফ্যাক্ট সেটা বলবার জন্যেই তো মিঃ ভাদুড়ির কথায় আমি বারান্দায় এসে আপনাকে পাকড়াও করলাম। আপনাদের এই ‘চন্দরগুপ্তা’ নাটকে দুটা ফিমেল ক্যারেক্টার আছে না?”

 

“দুটো কেন, আমার যদ্দুর মনে পড়ছে, দুটোর বেশিই আছে।”

 

“ছোড়িয়ে মিঃ চাটার্জি, আমি বলছি দুটা মেন ক্যারেক্টারের কথা। ছায়া অওর হেলেন।”

 

“বেশ তো, তারপর?”

 

মিসেস মালহোত্রা তাঁর হাতের গেলাশটাকে মুখের সামনে তুলে আনলেন, তারপর লম্বা একটা চুমুকে সেটা নিঃশেষ করে বললেন, “জাস্ট আ মিনিট। আই নিড আ রিফিল। আবভি আমি ফিরে আসছি।”

 

ভদ্রমহিলা বারান্দা থেকে ড্রয়িংরুমে গিয়ে ঢুকলেন। চকিতে একবার মনে হল যে, এঁর হাত থেকে যদি নিস্তার পেতে হয়, তা হলে এই সুযোগে আমারও এই বারান্দা ছেড়ে ড্রয়িংরুমের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়া দরকার, ওখানে গিয়ে দলের মধ্যে ভিড়ে গেলে আর আমাকে ইনি আলাদা করে পাকড়াও করতে পারবেন না, আর এঁর এইসব অর্থহীন প্রলাপও আমাকে শুনতে হবে না। কিন্তু তার আর সময় পাওয়া গেল না, গেলাশটাকে ভর্তি করে মিসেস মালহোত্রা ফের বারান্দায় বেরিয়ে এসে বললেন, “হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম?”

 

ঢোক গিলে বললুম, “ছায়া আর হেলেনের কথা।”

 

“ও ইয়েস, ছায়া অওর হেলেন। এখন আমি এমন একটা খবর দিব, যেটা শুনলে আপনি…কী বলব…যেটা ইউ উইল ফাইভ রাদার ডিফিকাল্ট টু বিলিভ।…কী ঠিক ছিল জানেন মিঃ চাটার্জি?”

 

“কী ঠিক ছিল?”

 

“ঠিক ছিল যে, ছায়ার পার্টটা মিসেস দাশ করবেন অওর হেলেনেরটা মিসেস সেন। সেটা অবশ্য মিসেস সেন পসন্দ করেননি, তিনি ছায়ার পার্টটা চেয়েছিলেন।”

 

“চেয়েছিলেন তো পেলেন না কেন?”

 

‘কী করে পাবেন? কলকাতা থেকে যে ট্রেনার এল, সে বহোত গোলমাল করল। সে বলল, ছায়ার পার্ট যে করবে, তাকে গানা গাইতে হোবে, লেকিন মিসেস সেনকো তো মিউজিক বিলকুল নেহি আতি। ওই যে একটা গানা আছে না…আ যা বসন্ত…

 

হাসি চেপে, যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে বললুম, “আপনি কি আয় রে বসন্ত…’ গানটার কথা বলছেন?”

 

“হাঁ হাঁ, আয় রে বসন্ত্।” মিসেস মালহোত্রা বললেন, “ট্রায়ালের সময় মিসেস সেন ওই গানটা এমন হরিবল গাইলেন যে, ট্রেনার হেসে বলল, ইয়ে রোল ইনসে নেহি হোগা।…মাস্ট বি আ ভেরি কারেজাস ম্যান। নেহি তো চিফ এগজিকিউটিভ অফিসারের ওয়াইফকো কোই অ্যায়সা মু-তোড় বাত বোল্ শকতা?…আলটিমেটলি মিসেস সেনকে দেওয়া হল হেলেনের পার্ট, অওর ছায়ার পার্ট দেওয়া হল মিসেস দাশকে। ইনসিডেন্টালি, মিসেস দাশ ওয়জ আ ভেরি ফাইন সিঙ্গার। এখানকার ওয়ার্কারদের চিলড্রেনকে লিয়ে একটা প্রাইমারি স্কুল আছে না, মিসেস দাশই সেখানে গানের ক্লাস নিতেন।”

 

“এখন আর নেন না?”

 

“কী করে নিবেন?” মিসেস মালহোত্রা এক মুহূর্তে চুপ করে রইলেন, তারপর বিষণ্ণ গলায় বললেন, “শি ডায়েড দিস মর্নিং।”

 

শুনে আমি এতটাই চমকে উঠেছিলুম যে, কিছুক্ষণ আমার মুখ দিয়ে কোনও কথাই বার হল না। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললুম, “উনি কি…উনি কি মিঃ সুরেশ দাশের স্ত্রী?”

 

“হাঁ,” আশা মালহোত্রা বললেন, “সুরেশের ওয়াইফ। পুয়োর সুরেশ। পুলিশ নাকি সাসপেক্ট করছে যে, ইট’স নট অ্যান আউটসাইড জব, সুরেশ হি আপনা ঘরওয়ালিকো খতম কর দিয়া।”

 

“এ-রকম সন্দেহ করছে কেন?”

 

“বিকজ নাথিং ওয়াজ মিসিং ফ্রম দ্য ফ্ল্যাট। ক্যাশ, জুয়েলারি, কিছুই খোয়া যায়নি। এমনকি, রেখার গলার সোনার হারটা পর্যন্ত তার গলাতেই ছিল। সো দে ডিসাইডেড ইট ওয়াজ নট আ মার্ডার ফর গেইন। অ্যান্ড, ন্যাচারালি, দেয়ার সাসপিশন ফেল অন সুরেশ।”

 

“আপনিও মনে করেন কাজটা সুরেশেরই?”

 

“ওহ্ নো, তা আমি মনে করি না। দে ওয়্যার সাচ এ হ্যাপি কাপল। অ্যাট লিস্ট দ্যাট ইজ হোয়াট আই থিংক। ওই যে বিজ্ঞাপনে বলে না ‘মেড ফর ইচ আদার’, আমার তো সেইরকম লাগত।”

 

সামনের বাগানে চাঁদের আলো ছড়িয়ে গেছে। ফিনিক-ফোটা জ্যোৎস্না। অল্প-অল্প বাতাস দিচ্ছে। ফুলগাছগুলির পাতা যে মাঝে-মাঝেই দুলে উঠছে, আকাশের এই অপার্থিব আলোয় তাও স্পষ্ট দেখা যায়। এরই মধ্যে আবার এসে পড়েছে সেই খুনের প্রসঙ্গ। আমি চুপ করে রইলুম। কথা বলতে আমার ভাল লাগছিল না।

 

মিসেস মালহোত্রার গেলাশ আবারও শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেটাকে জানলার তেলাঞ্চির উপরে নামিয়ে রেখে, তাঁর কাঁধ থেকে যে চামড়ার ব্যাগটা ঝুলছিল তার ভিতর থেকে এক প্যাকেট সিগারেট আর একটা লাইটার বার করে আনলেন তিনি। তারপর সিগারেটে আগুন লাগিয়ে, ধোঁয়া ছেড়ে, সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটিকে ফের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে, মুখ তুলে বললেন, “বাট আই ওয়াজ ডাইগ্রেসিং। আমার নিজের কথা তো কিছুই বলা হল না।”

 

রেখা দাশের ব্যাপারটা নিয়ে আরও দু-একটা প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু মনে হল যে, এক্ষুনি এ সম্পর্কে খুব বেশি কৌতূহল দেখানো বোধহয় সমীচীন হবে না। আর তা ছাড়া একটু আগেই বলেছি, কথা বলবার কোনও উৎসাহই আমি পাচ্ছিলুম না। কিন্তু চুপ করে থাকাটাও যেহেতু অভদ্রতা বলে গণ্য হবে, তাই বললুম, “হ্যাঁ, আপনি আপনার কী একটা প্রবলেমের কথা বলছিলেন।”

 

আশা মালহোত্রার সিগারেট খাওয়ার ধরন দেখলেই বোঝা যায় যে, তিনি একজন পাকা স্মোকার। সিগারেটে টান মেরেই যে ধোঁয়াটাকে ফুরফুর করে ছেড়ে দিলেন, তা নয়, সেটাকে বেশ কিছুক্ষণ মুখের মধ্যে রেখে তারপর আস্তে-আস্তে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “প্রবলেম তো আর কিছু না, রেখা মারা যাওয়ার ফলে কাস্টিং যে ফির পালটে গেল, সেইটা হল প্রবলেম।”

 

“কী রকম?”

 

“বলছি। মিসেস সেন তো হেলেনের রোল করবেন বলে ঠিক ছিল…”

 

“হ্যাঁ। সে তো একটু আগেই আপনি বললেন।”

 

“কিন্তু আপনারা আসার আগে আজ সামকো এখানে আমাদের ড্রামা সাব-কমিটির একটা মিটিং হয়ে গেল। তাতে ঠিক হল যে, মিসেস সেনকেই এখন ছায়ার রোলে নামতে হবে, কিউ কি মিসেস দাশ ইজ নট অ্যাভেইলেবল নাউ।”

 

“যাচ্চলে, তা হলে হেলেনের পার্টটা কে করবে?”

 

“ওঁরা বলছেন ওটা আমকে করতে হবে। তো আমার প্রবলেমটা কী, সেটা এখন বুঝলেন তো?”

 

“তা বুঝলুম। কিন্তু প্রবলেম তো দেখছি আপনার একার নয়, মিসেস সেনেরও। উনি তো শুনলুম গান গাইতে জানেন না। তা হলে নাটকের প্রায় গোড়াতেই ছায়ার মুখে ওই যে একটা গান রয়েছে, ওটা উনি গাইবেন কীভাবে?”

 

“ওটা নিয়ে ভাববেন না।” আশা মালহোত্রা বললেন, “সিনেমার মতন থিয়েটারেও তো আজকাল প্লেব্যাক চলছে। তো দুসরি কোই লেড়কিসে গানা গাইয়ে সেটা টেপ করে রাখা হবে। তারপর পিছনে সেটা টেপ-রেকর্ডারে চলবে আর সামনে দাঁড়িয়ে মিসেস সেন লিপ দিবেন, বাস।…বাট দেন দ্যাট ইজ হার প্রবলেম, এখন বোলেন যে, আমি কী করব? নাটকটা বাংলায় লিখা হয়েছে, আর আমি তো বাংলাই জানি না।”

 

ষোলো-আনা সত্যি কথা। বাংলা ইনি একেবারেই জানেন না। তবু ভদ্রতা করে বললুম, “না না, একেবারে যে জানেন না, তা তো নয়, অল্প-অল্প জানেন। ওরা যখন এত করে বলছে, আর হ্যাঁ…আপনিও যখন রাজি হয়ে গেছেন, তখন এই দিয়েই কাজ চালাতে হবে। তা ছাড়া আর উপায় কী। তবে হ্যাঁ, ভুলেও যেন আপনার কথার মধ্যে হিন্দি কি ইংরিজি ঢুকিয়ে দেবেন না।”

 

“সেটা কি আমি পারব?”

 

“পারতেই হবে।”

 

আশা মালহোত্রা আবার একটা সিগারেট ধরালেন। খুব চিন্তিতভাবে আস্তে-আস্তে দু-তিন কিস্তিতে তাঁর মুখের ধোঁয়াটুকু বার করে দিলেন। তারপর বললেন, “আই থিংক দ্যাটস আ গুড পিস অব অ্যাডভাইস। ঠিক আছে, আমি কোসিস করব। কিন্তু হাতে তো আর সময়ও নেই।”

 

“সত্যিই নেই। মাঝখানে তো কাল আর পরশু দুটো মাত্র দিন। এই দু’দিন তেড়ে রিহার্সাল দিন। আর হ্যাঁ, বাংলা পড়তে পারেন?”

 

“না।” আশা মালহোত্রা হাতের পাতা উলটে বললেন, “এই যে-রকম বলছি, সেইরকম বলতে পারি। বুঝতেও পারি। বার্ট আই কান্ট রিড অর রাইট ইট।”

 

“তা হলে এক কাজ করুন। রোলটা যখন আপনাকে করতেই হচ্ছে, তখন এমন কাউকে ধরুন, আপনার অংশটুকু যে আপনাকে বারবার পড়ে শোনাবে।”

 

“কিন্তু চন্দরগুপ্তার কহানিটা কী, সেটাই তো আমি জানি না।”

 

ভদ্রতা করাও ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠছিল। ভাবছিলুম যে, এরা কি উন্মাদ? তা নইলে এরা এমন একজনকে ‘চন্দ্রগুপ্ত’র একটা মেন রোলে নামিয়ে দিল কী করে, নাটকের কাহিনিটাই যার জানা নেই? মিসেস মালহোত্রা সম্পর্কে যে একটু অনুকম্পা বোধ করছিলুম না, তাও নয়। বললুম, “নাটকটা যাঁরা করছেন, তাঁদের কারও কাছ থেকে কাহিনিটা জেনে নিন, তারপর আপনার ডায়ালগের অংশগুলো বারবার শুনুন, তাতেই অনেকটা কাজ হবে। তা ছাড়া একজন প্রম্পটার তো থাকবেই, তা হলে আর ভয় কী।…ও,হ্যাঁ, আর একটা কথা মনে রাখুন।”

 

“কী?”

 

“উইংসের যে-দিকটাতে প্রম্পটার থাকবে, অ্যাক্টিংয়ের সময় সেদিক থেকে যেন খুব বেশি দূরে চলে যাবেন না। বড়জোর স্টেজের মাঝ বরাবর যেতে পারেন, তার চেয়ে বেশি দূরে গেলেই কিন্তু বিপদ।”

 

“কেন?”

 

“এটাও বুঝতে পারছেন না?” হেসে বললুম, “দূরে চলে গেলে প্রম্পটারের কথাই আপনি শুনতে পাবেন না যে। ওটা একমাত্র তারাই যেতে পারে, পার্ট যাদের মুখস্থ। আপনি কি আর পার্ট মুখস্থ করে ফেলতে পারবেন? সময় তো মাত্র দুটো দিন।”

 

আশা মালহোত্রা চুপ করে আমার কথাগুলি শূনলেন, শোনার পরেও চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “একটা রিকোয়েস্ট করব?”

 

“করুন।”

 

“কাল সুবহে আমাদের বাড়িতে একবার আসবেন? আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিব। আসবেন?”

 

“কেন?”

 

“চন্দরগুপ্তার কহানিটা আমাকে বলবেন। সির্ফ জিস্টটা বললেই আমি বুঝে নিব।”

 

এই রে। এখন কহানিটা বলতে বলছে, এর পরে না ডায়ালগগুলোও শোনাতে বলে। তা হলেই তো মরেছি। বললুম, “এখুনি তো কথা দিতে পারছি না। কালকের জন্যে মিঃ ভাদুড়ি কী প্রোগ্রাম করে রেখেছেন, তাও তো জানা নেই। ডিনার খেয়ে গেস্ট হাউসে ফিরে তাঁর সঙ্গে কথা বলি, তখন বুঝতে পারব যে, কাল সকালে ফ্রি আছি কি না।”

 

“ও-সব বুঝি না,” আশা মালহোত্রা তাঁর ডান চোখের ভুরু সামান্য তুলে আমাকে একটু নিরীক্ষণ করে নিয়ে বললেন, “আয়াম নট গোয়িং টু টেক নো ফর অ্যান আনসার। আপনাকে আসতেই হবে।” এ তো মহা মুশকিল পড়া গেল। ভদ্রমহিলাকে কীভাবে কাটিয়ে দেব ভাবছি, এমন সময় ড্রয়িং রুম থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন মিঃ মালহোত্রা। এসেই আশাকে দেখে বললেন, “আরে, ওদিকে সবাই তোমাকে ছুঁড়ছেন, আর তুমি কিনা এখানে।”

 

আশা মালহোত্রা ভিতরে চলে গেলেন। সঞ্জীব মালহোত্রা তাঁর হাতের গেলাশটাকে উঁচু করে ধরে বললেন, “আরে মিঃ চাটার্জি, আপনি তো দেখছি আপনার সেই কোকটাই এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন, অ্যান্ড দিস ইজ মাই ফোর্থ গ্লাস অব হুইস্কি। হোয়াট আ শেম!”

 

বললুম, “খিদে বাড়াচ্ছেন?”

 

“বাড়াব না?” সঞ্জীব মালহোত্রা বললেন, “মিসেস সেন ইজ অ্যাবাউট দ্য বেস্ট হোস্টেস দ্যাট আই হ্যাভ এভার সিন। তার উপরে আজ আবার শুনছি প্রনের মালাইকারি আর চিকেন মেরিল্যান্ড করেছেন। আপনিও খিদেটা একটু বাড়িয়ে নিলে পারতেন।”

 

বললুম, “শরীরটা ভাল নেই। ভাবছি ডক্টর ঘোষের কাছ থেকে…”

 

কথাটা শেষ করতে পারলুম না। সঞ্জীব মালহোত্রা বললেন, “ও, ফর হেভেন’স সেক, ডোন্ট গো টু দ্যাট ব্লাইটার গোকুলচন্দর ঘোষ। কিসসু জানে না। হর্স অব আ ডক্টর।…তিনটে দিন তো আছেন, ভাল করে রেস্ট নিন। শরীর ঠিক হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, গোকুল-ব্যাটা যা-ই বলুক, এখানকার জল খাবেন না।”

 

ভিতর থেকে বারান্দায় এসে বেয়ারা জানাল, ডিনার সার্ভ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *