(৫)
বুকানন কোম্পানির সিমেন্টের কারখানাটা তৈরি হয়ে গেলে পলাশডাঙার গুরুত্ব যে হুহু করে বেড়ে যাবে আর স্টেশনটাও এইরকম আধো-ঘুম, আধো-জাগরণের মধ্যে পড়ে থাকবে না, সেটা ঠিক। কিন্তু এখনকার কথা আলাদা। স্টেশনটা যেন ঝিমোচ্ছিল। ট্রেন থেকে যেমন আমরা, তেমন আরও দু’চারজন যাত্রী নামলেন, তাতে ঝিমুনির ভাবটা কেটে গিয়ে খানিকক্ষণের জন্য একটু সাড়া জাগল, হাতে একটা ঢাউস কেটলি ও কাঁধে একটা ভাঁড়ভর্তি ঝোলা নিয়ে খাকি রঙের-কোর্তা-পরা একজন মধ্যবয়সি লোক ‘গরম চা’ ‘গরম চা’ বলে সামনের দু’চারটি কামরার জানলার কাছে একটু ঘোরাঘুরি করল, মিনিট খানেক বাদে উপর্যুপরি ঘন্টা ও সিটি বাজল, আর তারপরে কষ্টেসৃষ্টে গা-ঝাড়া দিয়ে ট্রেনটা ধীরে-ধীরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে যেতেই সবকিছু আবার সেই আগের মতো ঠান্ডা।
প্ল্যাটফর্মে আলোও বিশেষ নেই। কাচের ঘেরাটোপে এখানে-ওখানে দু’চারটে বাল্ব জ্বলছে বটে, কিন্তু এতই মিটমিট করে জ্বলছে যে, ভাল করে কারও মুখটা পর্যন্ত দেখা যায় না। কালীচরণ সেনমশাইয়ের মুখখানাও আমি ভাল করে দেখতে পাইনি। স্পষ্ট করে শুধু এইটুকুই বুঝতে পেরেছিলুম যে, দোহারা চেহারার ভদ্রলোকটি বেশ লম্বা আর বেশ স্বাস্থ্যবানও বটেন। তা ছাড়া দেখেছিলুম কাটা দাগ আর আঁচিলটাও। পরনে ট্রাউজার্স আর টি-শার্ট। বয়স মোটামুটি বছর পঞ্চাশেক। তবে হঠাৎ দেখলে বোঝা যাবে না। হাঁটাচলায় আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ রয়েছে।
ট্রেন থেকে নেমে প্রাথমিক আলাপ-পরিচয়ের পালাটা খুব সংক্ষেপে শেষ হল। তার পরেই আমরা স্টেশনের বাইরে এসে জিপগাড়িতে উঠে পড়ি। বাইরে এরই মধ্যে অন্ধকার বেশ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে, জোনাকি ওড়াউড়ি করেছে। কাছাকাছি একটা একতলা বাড়িতে একটু আলো দেখা গেল। ওঠা বোধহয় স্টেশনমাস্টারের কোয়ার্টার্স। তা ছাড়া, এক এই জিপগাড়ির হেডলাইট ছাড়া, কোথাও কোনও আলো আমাদের চোখে পড়ল না।
অথচ আজ কোজাগরী পূর্ণিমার রাত। তাই আকাশে বেশ গোলগাল একটা চাঁদ উঠবার কথা। তা হলে সেটাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? আকাশটা কি এখানেও তা হলে মেঘে ভর্তি হয়ে আছে? বিচিত্র নয়। দুর্গাপুজোর কয়েকটা দিন ভালয় ভালয় কেটেছিল বটে, কিন্তু তার পরেই যেন সেই একই খেলা শুরু হয়ে যায়। বৃষ্টি আর বৃষ্টি। আজ সকালেও তো বৃষ্টির মধ্যেই আমরা কলকাতা ছেড়েছি। এখানেও কি সেই একই ব্যাপার? বৃষ্টি শুরু হয়নি বটে, কিন্তু আকাশ নিশ্চয় মেঘে ঢাকা, তা নইলে এতক্ষণে জ্যোৎস্নার বান ডাকত।
জিপের পিছনের সিটে বসে আছি আমি আর সদানন্দবাবু। সামনের সিটে কালীচরণ সেনের হাতে স্টিয়ারিং হুইল, তাঁর বাঁ পাশে ভাদুড়িমশাই। মাঝে-মাঝেই বেশ ঝাঁকুনি লাগছে। তাতে বুঝতে পারছি যে, পথটা সমতল নয়, উঁচুনিচু। একটু এবড়ো-খেবড়োও বটে। হেডলাইটের আলোয় দু’পাশে ঘন গাছপালা দেখে এটাও আন্দাজ করছি যে, পথটা একটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চলে গেছে। গাড়ির মধ্যে আমরা একেবারে চুপচাপ বসে আছি। কালীচরণ সেন ওই যে বলেছেন, অনুষ্ঠান হচ্ছে না, তার পরে আর একটা কথাও কারও মুখ থেকে বেরোয়নি। সদানন্দবাবু তো একেবারে কাঠ হয়ে বসে আছেন। ভাদুড়িমশাই-ই প্রথম মুখ খুললেন। বললেন, “পাশের লোকের অনুমতি না নিয়ে তো আজকাল কেউ সিগারেট খায় না, তাই জিজ্ঞেস করছি, একটা সিগারেট খাব?”
“স্বচ্ছন্দে।” কালীচরণ সেন বললেন, “প্যাসিভ স্মোকিংয়ের ভয় আমার নেই। আমি নিজেই বলতে গেলে চেন-স্মোকার। তবে হ্যাঁ, জঙ্গলের মধ্যে আমি সাধারণত স্মোক করি না, সিগারেটের স্টাব থেকে শুকনো শালপাতায় আগুন ধরে গেলেই তো সর্বনাশ, দেখতে-দেখতে গোটা জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে।”
“তা হলে তো না-খাওয়াই ভাল।”
“না না, খান। সপ্তমীর দিন থেকেই আবহাওয়াটা শুকনো যাচ্ছিল, তারপর কাল রাত্তিরে আর আজ সকালে বৃষ্টি হয়েছে তো, আকাশটাও কাল থেকে মেঘলা হয়ে আছে, গাছপালা আর মাটি এখনও শুকোয়নি, তাই ভয়ের কিছু নেই, স্বচ্ছন্দে খেতে পারেন। তবে কিনা সাবধানের মার নেই, স্টাবটা বাইরে ফেলবেন না, জুতোর তলায় পিষে দেবেন।”
ভাদুড়িমশাই সিগারেট ধরিয়ে দেশলাই কাঠিটাকে শূন্যে কয়েকবার নাড়িয়ে নিবিয়ে ফেললেন, তারপর একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “এবারে আর-একটা প্রশ্ন করি?”
“করুন। কিছু জানবার আছে?”
“আছে। অনুষ্ঠানই যখন হচ্ছে না, তখন আমরা কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি না কেন? রাত্তিরের দিকে কোনও ট্রেন নেই?”
“আরে না না,” কালীচরণ সেন বললেন, “ফিরে যাবেন কেন? রাত্তিরে যে কোনও ট্রেন নেই, তা অবশ্য বলছি না, রাত দেড়টা নাগাদ আছে, কিন্তু একে তো সেটাতে প্রায়ই ডাকাতি হয়, আর তা ছাড়া কখন যে সেটা কলকাতায় পৌঁছবে, তারও কিছু ঠিক নেই।”
“কিন্তু অনুষ্ঠান তো হচ্ছে না।”
“আজ হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে যে আদৌ হবে না, তা তো নয়।”
“কিন্তু আজই তো হবার কথা ছিল। তা হলে হল না কেন?”
“বাধ্য হয়ে পোস্টপোন করে দিলুম। তবে কিনা এত সব উদ্যোগ-আয়োজনের পরে…আর তা ছাড়া এখানকার ওয়ার্কাররাও অনেক দিন ধরে রিহার্সাল-টিহার্সাল দিয়েছে…তারা খুব আশা করে রয়েছে তো…একেবারে ড্রপ করে দেওয়াটাও ঠিক হবে না…তাই ভাবছি যে…”
“কী ভাবছেন?”
“ভাবছি যে…” কালীচরণ সেন যেন হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন, নিজেকে ফের সামলে নিয়ে বললেন, “না, মানে…আজ কাল আর পরশুর মধ্যে তো কিছু হওয়া সম্ভব নয়, একে তো আমাদের কলোনির লোকজনেরা এখনও ধাক্কাটা ঠিক সামলে উঠতে পারেনি, তার উপরে পুলিশি ঝামেলাও রয়েছে, তাই ভাবছিলুম যে, এই তিনটে দিন বাদ দিয়ে এগারো তারিখে ওটা করব।”
“দেখুন মিঃ সেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কথা হচ্ছিল আজকের অনুষ্ঠানটা হচ্ছে না কেন, তা-ই নিয়ে, বাট ইউ হ্যাভ বিন স্পিকিং ইন রিল্স। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কীসের ধাক্কা? পুলিশি ঝামেলার কথাই বা কোত্থেকে আসছে?”
একবারে হঠাৎই ব্রেক কষলেন কালীচরণ। বেশ একটু ঝাঁকুনি লাগল। টাল সামলাতে না পেরে সদানন্দবাবু আমার গায়ের উপরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। এই রকম আচমকা ব্রেক কষবার দরকার হলে যে-কোনও শিক্ষিত ড্রাইভারই সাধারণত দুঃখপ্রকাশ করেন। কিন্তু মিঃ সেন দেখলাম ‘সরিও বললেন না, আমাদের কারও চোট লেগেছ কি না তাও জানতে চাইলেন না। গাড়ির ইঞ্জিনটাকে একেবারে ‘কাট’ করে দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তার মানে? সমাদ্দার আপনাকে কিছু জানায়নি?”
গাড়ি এখন জঙ্গলের বাইরে একটা ফাঁকা মাঠের উপর দাড়িয়ে আছে। মাঠটা তত অন্ধকার নয়। ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে খানিকটা আলো এসে পড়েছে। তবে চাঁদের মুখ এখনও দেখা যাচ্ছে না। মেঘের একটা জায়গায় গোলাপি রঙের ছোপ ধরেছে, এই মাত্ৰ
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি কার কথা বলছেন, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
মিঃ সেন বললেন, “সমাদ্দার আমাদের পাবলিসিটি অফিসার। ক্যামাক স্ট্রিটে বুকানন ইন্ডিয়ার যে আপিস রয়েছে, সেইখানে বসে। আপনাকে সে আজ ফোন করেনি?”
“না তো।”
“হাওড়া থেকে ট্রেন ধরবার জন্যে বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছিলেন?”
“ট্রেন ছাড়বার ঠিক একঘন্টা আগে। অর্থাৎ সাড়ে দশটায়।”
“বুঝতে পেরেছি।” মিঃ সেন বললেন, “যেজন্যে আমাদের অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হল, সেটা জানিয়ে নরেন সমাদ্দারকে আজ ফোন করেছিলুম। লক্ষ্মীপূজো বলে কলকাতার আপিসও তো বন্ধ, তাই সমাদ্দারের বাড়ির নম্বরে এসটিডি করি। ফোন করে তাকে বলি, অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার কারণটা যেন আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। তবে, অন আওয়ার বিহাফ, এটাও যেন আপনাকে বলা হয় যে, আজ না হলেও দু’দিন বাদে তো অনুষ্ঠান হচ্ছেই, তাই আপনার আসার প্রোগ্রামটা কাইন্ডলি ক্যানসেল করবেন না।”
“সমাদ্দারকে আপনি কখন ফোন করেছিলেন?”
“দশটা থেকে লাইন পাবার চেষ্টা করছিলুম, তা পেতে-পেতে সওয়া দশটা হয়ে যায়। ব্যাপারটা ওকে বুঝিয়ে বলতে আরও মিনিট পাঁচেক লেগে থাকবে। কিন্তু তার পরেও তো আরও মিনিট দশেক সময় ওর হাতে ছিল। তার মধ্যে ও আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারল না কেন? মনে হচ্ছে আপনার লাইনটাও এনগেজড় ছিল, তাই কানেকশন পায়নি।”
“আপনি ঠিকই ধরেছেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাড়ি থেকে তো আমি সাড়ে দশটায় বেরোই, তা বেরোবার আগে ব্যাঙ্গালোরে আমাদের এক ক্লায়েন্টকে একটা ফোন করি। ভদ্রলোককে কয়েকটা ব্যাপারে কিছু বলবার ছিল। মিঃ সমাদ্দার তা হলে আর ওই সময়ে আমার লাইন পাবেন কী করে?”
“যদি পেত, তা হলে কি আপনার প্রোগ্রাম পালটাতেন?”
“পালটাতেও পারতুম। মানে আজ না এসে একেবারে অনুষ্ঠানের দিন আসতুম। আবার ইতিমধ্যে যদি কোনও জরুরি কাজ পড়ে যেত, তা হলে হয়তো একেবারেই আসতুম না।”
“তা হলে তো দেখছি সমাদ্দার যে আপনার লাইন পায়নি, তাতে ভালই হয়েছে…বাট অফ কোর্স আই নো ইউ আর অ্যান একস্ট্রিমলি বিজি ম্যান, তবু আশা করছি যে, এগারোই পর্যন্ত আপনি থেকে যেতে পারেন।”
“তা হয়তো পারব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যদি অবশ্য জরুরি কোনও কাজ না পড়ে যায়। … কিন্তু সে-কথা থাক, অনুষ্ঠান কেন বন্ধ রাখতে হল, আর হ্যাঁ…পুলিশি ঝামেলাই বা হচ্ছে কেন সেটা আগে বলুন তো। লেবার ট্রান্স্?”
“না না, সে সব কিছু নয়। পুজোর ঠিক আগে বাইরে থেকে কিছু লোক এসে ফের একটা ঝামেলা পাকাবার চেষ্টা করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা সামলে নিয়েছি। এটা একেবারেই অন্য ব্যাপার, আওয়ার ফ্যাক্টরি হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ ইট। ইটস আ গ্রুসাম মার্ডার।”
“খুন?” ভাদুড়ি মশাই বললেন, “কে খুন হল?”
“একজন হাউসওয়াইফ… আমাদেরই একজন ওয়ার্কারের স্ত্রী…” কালীচরণ সেন বললেন, “ভদ্রলোক আমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসে কাজ করেন…ক্লেরিক্যাল কাজ।”
হঠাৎই মেঘের আড়াল থেকে কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ একেবারে পূর্ণ মহিমায় বেরিয়ে এসেছে। মাঠের উপরে জ্যোৎস্নার বান ডেকেছে। আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। এই পরিবেশে খুনের চেয়ে বেখাপ্পা প্রসঙ্গ বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না।
ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ফের একটা সিগারেট ধরিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “খুনটা কখন হয়েছে, কিছু জানা গেল?”
“ডেডবডিটা প্রথম চোখে পড়ে সকাল আটটায়। ভদ্রমহিলা মেঝের উপরে কাত হয়ে পড়ে ছিলেন। উনি যে মারা গেছেন, ওঁর স্বামী সেটা বুঝতে পারেননি, ভেবেছিলেন যে, যে-কোনও কারণেই হোক, হঠাৎ হয়তো অজ্ঞান হয়ে গিয়ে থাকবেন।… বাই দ্য ওয়ে, ওঁর স্বামীকে আপনি দেখেছেন।”
অস্ফুট গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুরেশচন্দ্র দাশ?”
“রাইট। সুরেশচন্দ্র দাস। সুরেশ আমাদের এখানকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসে কাজ করে। ক্যাশ ডিপার্টমেন্টের ক্লার্ক। সপ্তমীর দিন ওই আমার চিঠি নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করেছিল।’
“ডাক্তার ডাকা হয়েছিল?”
“সঙ্গে-সঙ্গেই ডাকা হয়েছিল।” কালীচরণ সেন বললেন, “ইন ফ্যাক্ট আমাদের এখানকার মেডিক্যাল ইউনিটের যিনি জুনিয়র ডাক্তার, সেই তারাপদ দত্ত তো ওই একই বিল্ডিংয়ের তিনতলার কোয়ার্টার্সে থাকেন। তিনি তা এই ধরুন পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সুরেশের দোতলার ফ্ল্যাটে এসে যান। কিন্তু তারাপদর তখন আর কিছু করবার ছিল না। নিয়মরক্ষার জন্যে নাড়িটা অবশ্য একবার দেখতে হয়েছিল, তারপরেই হি প্রোনাউন্সড হার ডেড।”
“মৃত্যুটা কখন হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বললেন?”
“তারাপদ কিছু বলেনি, ওটা থানায় ফোন করে জেনেছি। ডেডবডি পরীক্ষা করে পুলিশের ডাক্তার রিপোর্ট দিয়েছেন যে, ভদ্রমহিলা মারা গেছেন সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে।”
“কজ অব ডেথ?”
“সাফোকেশন।” কালীচরণ সেন বললেন, “গলায় ফাঁস দিয়ে মারা হয়েছে।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি। গলায় ফাঁস যদি সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে লাগানো হয়ে থাকে, ডেডবডি সুরেশচন্দ্র এত দেরিতে দেখতে পেলেন কেন? আটটার আগেই ওটা তাঁর চোখে পড়া উচিত ছিল।”
“কী করে পড়বে?” কালীচরণ বললেন, “সুরেশ যদি বাড়িতে থাকত, তা হলে পড়ত নিশ্চয়, কিন্তু সে তো তখন বাড়িতেই ছিল না।”
“পুলিশের কাছে তিনি তা-ই বলেছেন?”
“শুধু পুলিশের কাছে কেন, তার চিৎকার শুনে অন্যান্য ফ্ল্যাটের থেকে তো লোকজন ছুটে এসেছিল, তাদের কাছেও বলেছে। ডাক্তারকেও বলেছে। তার কথা: পৌনে ছ’টা নাগাদ সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, ফিরতে ফিরতে আটটা বেজে যায়। ফিরে এসে ফ্ল্যাটের দরজার কড়া নাড়ে, কিন্তু ভিতর থেকে কেউ দরজা খুলে দেয় না। তখন দরজায় ধাক্কা মারে। সঙ্গে-সঙ্গে দরজা খুলে যায়। প্রথমটায় তার মনে হয়েছিল যে, তাঁর স্ত্রী হয়তো দরজাটাকে ভেজিয়ে রেখে অন্য কোনও ফ্ল্যাটে কারও সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছেন। কিন্তু ভিতরে শোবার ঘরে ঢুকে দ্যাখে এই কান্ড।”
“কিন্তু তাঁর স্ত্রী যে মারা গিয়েছেন, ভিতরে ঢুকেও সুরেশবাবু তা বুঝতে পারেননি, এই তো?”
“প্রথমটায় পারেনি। ভেবেছিল যে, অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।”
খোলা মাঠ। জ্যোৎস্নার জোর ক্রমেই বাড়ছে। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, আকাশ এখন অনেকটাই পরিষ্কার। জিপ থেকে নেমে এসেছি আমরা। মাঠের উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছে। ভাদুড়িমশাই ফের একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। জ্যোৎস্নার আলোয় দেখতে পাচ্ছি যে, তাঁর ভুরু কুঁচকে রয়েছে, মুখ গম্ভীর। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, “সুরেশবাবু তাঁর ফ্ল্যাট থেকে পৌনে ছ’টায় বেরিয়ে গিয়েছিলেন বললেন না?”
“হ্যাঁ।”
“অত সকালে কোথায় গিয়েছিলেন তিনি, সেটা জানিয়েছেন?”
“জগিং করতে বেরিয়েছিল।” কালীচরণ সেন বললেন, “বাতিক। কোথায় কোন কাগজে নাকি পড়েছে যে, ভোরবেলার ঘুম থেকে উঠে ঘন্টাখানেক জগিং করলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে। বাস, তার পর থেকেই এটা চালিয়ে যাচ্ছে। কী বলব মিঃ ভাদুড়ি আমার তো ভয় করে যে, যা রোগাপটকা মানুষ, এই করে না শেষে হিতে বিপরীত হয়।…এদিকে আবার পুলিশের যা ভাবগতিক, সেটাও আমার ভাল ঠেকছে না।”
“কেন? পুলিশ কি আপনাকে কিছু বলেছে?”
“নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি। তবে স্টেশনে আসার আগে এখানকার থানার অফিসার ইন চার্জকে টেলিফোন করেছিলুম। তখন তাঁর কথা শুনে মনে হল সুরেশকেই ওরা খুনি বলে সন্দেহ করছে।”
“আপনাদের ফ্যাক্টরিতে পৌঁছে সুরেশবাবুর সঙ্গে দু-একটা কথা বলা যাবে?”
“তা যাবে বই কী।” বলেই হঠাৎ মুখ তুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন মিঃ সেন। এক মুহূর্ত তাঁকে নিরীক্ষণ করলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো? আর ইউ টেকিং অ্যান ইন্টারেস্ট ইন দ্য ম্যাটার?”
এবার ভাদুড়িমশাই হাসলেন। “আমি একটা ঢেঁকি তো। স্বর্গে এসেছি, তবু দেখুন ধান না-ভেনে আমার উপায় নেই।
যদিও অক্টোবর মাস, তবু খোলা মাঠ বলেই বোধহয় আমার একটু শীত-শীত করছিল। বললুম, “আর দাঁড়িয়ে থাকতে ভাল লাগছে না, জিপে ওঠা যাক। কথা যা বলবার ফ্যাক্টরিতে গিয়ে বলবেন।”
