(২৪)
সুবীর নন্দীর সঙ্গে কথা শেষ করে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিলডিং থেকে বেরোতে বেরোতে প্রায় পৌনে ছ’টা বেজে যায়, গেস্ট হাউসে তাই ছ’টার আগে পৌঁছনো গেল না। পোর্টিকোর নীচে গাড়ি থেকে নেমে ভাদুড়িমশাই ড্রাইভারকে বললেন, “গাড়ি নিয়ে তোমাকে কি এখন আর কোথাও যেতে হবে রামপ্রসাদ?”
“নেহি হুজুর,” রামপ্রসাদ বলল, “আমার ডিউটি তো ইখানেই আছে। যবতক না আপনি ছোড়ে দিবেন, ইখানেই আমি থাকব।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে এখন ঘন্টা দুয়েকের জন্যে তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি। গাড়িটা যদি আটটা নাগাদ পাই, তা হলেই চলবে।”
“রাতকো কোথাও যাবার আছে হুজুর?”
“আমাদের কোথাও যাবার নেই। তবে আমাদের সঙ্গে একজন দেখা করতে আসবেন, কথা শেষ হয়ে গেলে তাঁকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে।”
“ঠিক হ্যায়, হুজুর। আট বাজে ম্যায় ফির আ জাউঙ্গা।”
গাড়ি নিয়ে রামপ্রসাদ বেরিয়ে গেল।
একতলায় চায়ের কথা বলে দিয়ে আমরা উপরে উঠেছিলুম, দোতলার ল্যান্ডিংয়ে পা রাখতে-না-রাখতেই ফোন বেজে উঠল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ঘরেই বাজছে। আপনারা বসুন, আমি কথা বলেই ফিরে আসছি।”
আমরা আর ঘরে ঢুকলুম না, বারান্দায় বসে ভাদুড়িমশাইয়ের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলুম। ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘর থেকে বেরোলেন তা প্রায় মিনিট পনেরো কুড়ি বাদে। বেরিয়ে, ধপ করে একটা সোফায় বসে পড়ে বললেন, “থ্যাঙ্ক গড, ঘুঁটিগুলো এবারে ঠিক-ঠিক জায়গায় বসে গেছে।”
বললুম, “কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
“কী করে বুঝবেন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝতে হলে সকলের সব কথা মন দিয়ে শুনতে হয়। তা কি আপনি শোনেন?”
“শোনেন না, কিচুই শোনেন না!” সদানন্দবাবু একগাল হেসে বললেন, “কিরণবাবু তো শুধু নদী আর পাহাড়ের বিউটি দেকেই দিন কাটাচ্চেন, কিছু শোনবার মতন সময় কোতায় ওঁর? আমি কিন্তু মশাই পরশু থেকে যে যা বলেচে, সব শুনিচি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে দূর দূর। আসল কথাটা আপনিও শোনেননি। মানে শুনেছেন ঠিকই কিন্তু কিরণবাবুর মতোই শুনেছেন, ফলে ওই কথাটার ভেতর থেকে যে আর-একটা কথাও বেরিয়ে আসছে, সেটা ধরতে পারেননি। এ-ব্যাপারে আপনারা দুজনেই সমান।”
সদানন্দ বললেন, “অ্যাঁ?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ, আপনারা একজনও পারেননি।”
“নীচে থেকে একজন বেয়ারা দোতলায় উঠে এসে সেন্টার টেবিলে চায়ের ট্রে নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে আবার নীচে নেমে গেল। পট থেকে দুটো পেয়ালায় লিকার ঢেলে নিয়ে, একটা পেয়ালা সদানন্দবাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে, অন্যটায় চুমুক দিয়ে বললুম, “ব্যাপার কী বলুন তো? রহস্যটা তা হলে পুরোপুরি ধরতে পারা গেছে, কেমন?”
“ধরতে আগেই পেরেছিলুম,” ভাদুড়িমশাই তাঁর চায়ে দুধ-চিনি মেশাতে-মেশাতে বললেন, “কিন্তু পুরোপুরি পারিনি। আরে মশাই, কেন খুন, সেটাই তো বুঝতে পারছিলুম না। এবারে সেটাও বোধ হয় পারা গেল।”
বোধ হয়’ বলছেন কেন?”
“ফর এ ভেরি সিম্পল রিজন।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ধরা যাক, ‘ক’ খুনি। তার খুন করার একটা স্পষ্ট মোটিভও রয়েছে। কিন্তু ‘গ’ ‘ঘ’ ‘ঙ’ ‘চ’ ‘ছ’ ইত্যাদিকে ছেড়ে দিয়ে ‘খ’-কেই সে তার ভিকটিম হিসেবে বেছে নিচ্ছে কেন, সেটা বুঝতে হলে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, ‘গ’ ‘ঘ’ ‘ঙ’ ‘চ’ কিংবা ‘ছ’ নয়, একমাত্র ‘খ’-কে খুন করলেই তার সেই মোটিভ চরিতার্থ হতে পারে। ‘বোধহয়’ বলছি কেন? না, মোটিভ একটা পেয়েছি ঠিকই…বাই দ্য ওয়ে, কৌশিকের কল্যাণেই সেটা পাওয়া গেল…কিন্তু মিসেস দাশের খুন হওয়ার সঙ্গে সেই মোটিভটাকে একটা কার্যকারণের সূত্রে এখনও গেঁথে তুলতে পারিনি।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “না, ওটা এখনও পারিনি। তবে মনে হচ্ছে যে, খানিক বাদেই পেরে যাব।”
সদানন্দবাবু বললেন, “খুনটা যে মিসেস মালহোত্রাই করেচেন, তাতে তো আর সন্দ নেই। তাঁর ওই হলদে চুল থেকেই সেটা পরিষ্কার হয়ে গেচে। কিন্তু তাঁর খুন করার মতলবটা…ওই যাকে আপনি মোটিভ বলচেন আর কি…সেটা কী হতে পারে বলুন দিকি?”
এবারে হোহো করে হেসে উঠলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “বাঃ, সবই আমাকে বলতে হবে? তার চেয়ে আপনারাও একটু ভাবুন না। তবে হ্যাঁ, শুধু মোটিভের কথা ভাবলে চলবে না কিন্তু, মিসেস মালহোত্রা ওই ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকে খুন করার সুযোগ পেলেন কীভাবে, সেটাও ভেবে দেখা চাই।”
ভাদুড়িমশাইয়ের কথা থেকে দুটো ব্যাপার বোঝা গেল। এক, আমাদের নিয়ে তিনি একটু মজা করতে চাইছেন। দুই, আপাতত তিনি যেটুকু বলেছেন, তার চেয়ে বেশি আর কিছু বলবেন না। প্রসঙ্গ পালটে তাই জিজ্ঞেস করলুম, “সুবীর নন্দীর সঙ্গে কথা বলে কী মনে হল?”
“একটাই কথা মনে হল। সেটা এই যে, মিসেস দাশের মুঠোর মধ্যে ভাগ্যিস ওই হলদে চুল পাওয়া গেছে, নয়তো খুনের দায় থেকে সুরেশবাবুকে বাঁচানো শক্ত হত।”
“তার মানে?”
“বলছি। ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট, খুনটা হয়েছে সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে আর সুরেশবাবু বলছেন, ওই সময়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তা হলে কোথায় ছিলেন? না সুবীর নন্দীর বাংলোয়। তা এই যে অ্যালিবাই, অর্থাৎ সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে না থাকা, একমাত্র সুবীর নন্দীই এটার সাক্ষী। ইন ফ্যাক্ট, একমাত্র তাঁরই সাক্ষ্য এই অ্যালিবাইকে একটা ইররেফুটেবল অর্থাৎ অকাট্য সত্য হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। কিন্তু সুবীর নন্দী কি আমার প্রশ্নের উত্তরে তেমন জোর দিয়ে বললেন যে, হ্যাঁ, সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সুরেশবাবু তাঁর বাংলোতেই ছিলেন বটে? ‘কই, তা তো তিনি বললেন না। সুরেশবাবু কটার সময় তাঁর বাংলোয় গিয়েছিলেন আর কতক্ষণ তাঁদের কথাবার্তা চলেছিল, এই দুটো প্রশ্নেরই উত্তরে তিনি বললেন যে, হলফ করে তাঁর পক্ষে সেটা বলা সম্ভব নয়। তা হলে? তো এইজন্যেই বলছিলুম যে, সুরেশবাবু যে খুনি নন, ভাগ্যিস তার প্রমাণ আমরা আগেই পেয়ে গেছি, নইলে সুবীর নন্দীর ওইরকম নড়বড়ে সাক্ষ্যের উপরে অ্যালিবাইটাকে দাঁড় করানো যেত না, সুরেশবাবুও বাঁচতেন না।”
“যাক, কে খুনি সেটা তো এখন জানা গেছে, আর তার মোটিভ কী ছিল, তারও তো হদিশ আপনি পেয়েছেন, কেমন?”
“মোটিভের হদিশ যে কৌশিকের কল্যাণে পেয়েছি, তা তো বললুমই। দুপুরে ডাক্তার দত্তের বাড়ি থেকে এখানে ফিরেই দুটো ফোন করেছিলুম না?”
বললুম, “হ্যাঁ, কৌশিককে আর শেখর ঘোষালকে।”
“রাইট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আগে কৌশিকের কথাটা শুনুন। ওকে ফোন করে একটা খবর জেনে দিতে বলেছিলুম। তা সেটা যে ও এত তাড়াতাড়ি জোগাড় করে উঠতে পারবে, তা ভাবিনি। কিন্তু পেরে গেছে। একটু আগে কৌশিক ওই যে কলকাতা থেকে রিং ব্যাক করল, ওটা করল খবরটা আমাকে জানিয়ে দেবার জন্যে। ব্যস, খুনির মোটিভের হদিশটাও তার ফলে পেয়ে গেলুম।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আর আমাদের দগ্ধে মারবেন না তো। মোটিভটা কী, দয়া করে সেটা বলুন দিকিনি।…নাকি সেটা বলতে কোনও অসুবিদে আছে?”
“অসুবিধে আবার কীসের! মোটিভ হচ্ছে নিজের পাস্ট লাইফের ঘটনার কথা গোপন করে রাখা। ঘটনাটা যে লজ্জাজনক, সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন?”
বললুম, “তা কেন পারব না? লজ্জাজনক যদি না-ই হবে তো মিসেস আশা মালহোত্রা সেটাকে চেপে রাখতে চাইবেন কেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমার তো মনে হয়, আশা মালহোত্রা আসলে অন্য কারও বউ, আগের হাজব্যান্ডকে ছেড়ে সঞ্জীব মালহোত্রার সঙ্গে পালিয়ে এয়েচে।”
“সে আর বিচিত্র কী!” আমি বললুম, “যে-রকমের খলিফা মহিলা, তাতে তো সেটা হতেই পারে। কিংবা ধরুন হাতটান…মানে ছিঁচকে চুরির ব্যামো আছে হয়তো, ও ব্যামো তো বড় ঘরের বউ-ঝিদেরও থাকে শুনেছি, তা কোথাও কোনও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে শপলিাটিং করতে গিয়ে হয়তো হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেসলেন। তার জন্য হয়তো মোটা জরিমানাও দিতে হয়ে থাকবে। তো সেটাকে এখন গোপন করতে চাইছেন।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনাদের ধারণা, মিসেস দাশ সেটা জেনে যান। আর তিনি যে জেনেছেন, মিসেস মালহোত্রা সেটা জানতে পারেন। ফলে তাঁর ভয় হয় যে, কথাটা মিসেস দাশ সবাইকে জানিয়ে দেবেন। ব্যাস, তা যাতে হতে না পারে, সেইজন্যেই মিসেস দাশকে তিনি খুন করেছেন। কেমন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা তো হতেই পারে।…কী মশাই, হাসচেন কেন?…পারে না?”
“একশো বার পারে,” ভাদুড়িমশাই হাসতে-হাসতেই বললেন, “কিন্তু একটু আগেই যা বলেছি, সেটা ভুলে যাচ্ছেন কেন? শুধু মোটিভ থাকলেই তো হয় না, খুন করার সুযোগও থাকা চাই। মিসেস মালহোত্রার কি সেটা ছিল? ছিল না।”
আমি বললুম, “মিসেস দাশের মুঠোর মধ্যে তা হলে হলদে চুল আর কাঁটা কোত্থেকে এল?”
ভাদুড়িমশাই বললেন,”সেটাই হচ্ছে কথা। ভাবুন, আর একটু ভাবুন।”
কিন্তু ভাববার আর সময় পাওয়া গেল না। একতলা থেকে একজন বেয়ারা এসে জানাল যে, এক ভদ্রমহিলা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “উপরে পাঠিয়ে দাও।” তারপর বেয়ারাটি আবার নীচে নেমে যাওয়ার পরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কে যে খুন করেছে, সে তো আমি জানিই। মোটিভটাও বোঝা হয়ে গেছে। কিন্তু সেই জন্যেই বেছে-বেছে মিসেস দাশকেই কেন খুন করা হল, সেটাও তো জানা চাই। তা মনে হচ্ছে, সেটাও এবারে জেনে যাব।”
সকালে সুরেশচন্দ্রের ফ্ল্যাটে যখন দেখা হয়, ভদ্রমহিলা তখনই জানিয়ে রেখেছিলেন যে, সন্ধে নাগাদ তিনি একবার গেস্ট হাউসে আসবেন। মীরা বসুকে দেখে তাই অবাক হলুম না। ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডেডবডি ওরা সময়মতোই রিলিজ করেছিল তো?”
মীরা বসু ম্লান হেসে বললেন, “কাকে সময়মতো বলে তা তো জানি না, তবে সুরেশ থানায় গিয়েছিল, সেখান থেকে মোটামুটি সন্ধে ছ’টার মধ্যেই সে এসে যায়। আমি যাতে শেষ দেখাটা দেখতে পারি,বোধ করি তারই জন্যে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। তবে না- আনলেই পারত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ-কথা কেন বলছেন? না-দেখলে একটা আক্ষেপ থেকে যেত না?”
মীরা বসু আবার হাসলেন। সেই ম্লান, বিষণ্ণ হাসি। বললেন, “মিঃ ভাদুড়ি, ছোটবোনের মরামুখ কেউ দেখতে চায় না। আমিও চাইনি। রেখা আমার চেয়ে অন্তত দশ বছরের ছোট। মাঝখানে একটা ভাই ছিল, যখন ক্লাশ এইটে পড়ত, টাইফয়েড হয়ে সে মারা যায়। যেমন তাকে, তেমনি এই বোনটাকে আমি কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। মায়ের কথা যদি বাদ দিই তো ভাই মারা যাবার পরে আপনজন বলতে এক রেখা ছাড়া আর কেউই আমার ছিল না। কিন্তু সে চলে গেল। ওর মৃত্যুর খবর পেয়ে আমার অবস্থা কী হয়েছিল, তা আপনার না-বুঝবার কথা নয়। কিন্তু তবু বলি, শ্মশানে নিয়ে যাবার আগে ওকে একবার শেষদেখা দেখব বলে আমি ছুটে আসিনি। আমি এসেছি সুরেশের কথা ভেবে। আমার যে ছোট ভাইয়ের কথা বলেছি, সুরেশ ছিল সেই রন্টুর বন্ধু। এক ইস্কুলে, একই ক্লাসে পড়ত। ওকে আমরা ছেলেবেলা থেকে চিনি। বড় নরম মনের ছেলে। রেখা তো গেছেই, কিন্তু যেভাবে গেল, আর তার পরেও যেভাবে ওকে হ্যারাস করা হচ্ছে, তাতে আমার ভয় হচ্ছে যে, এই ধাক্কাটা সুরেশ সামলাতে পারবে না, ভেঙে পড়বে।”
মীরা বসু যতক্ষণ কথা বলছিলেন, ভাদুড়িমশাই একটা কথাও বলেননি। মাথা নিচু করে একেবারে নির্বাক তিনি বসে ছিলেন। এবারে তিনি মুখ তুলে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, “এ-ব্যাপারে আমি কি কিছু সাহায্য করতে পারি? যদি আপনার মনে হয় যে, পারি, তা হলে বলুন। কোনও সংকোচ করবেন না।”
মীরা বসু বললেন, “মিঃ ভাদুড়ি, যে যা-ই মনে করুক, সুরেশকে আমি চিনি বলেই বলছি যে এ-কাজ ওর দ্বারা হতে পারে না। হবার কোনও কারণও ছিল না। দে ওয়্যার এ ভেরি হ্যাপি কাল তা হলে ওকে এই বিড়ম্বনা ভোগ করতে হবে কেন? একে তো এত বড় একটা শোকের ধাক্কাই ও সামলে উঠতে পারেনি, তার উপরে এই সন্দেহ, এই অবিশ্বাস। ও তো পাগল হয়ে যাবে। মিঃ ভাদুড়ি, আপনাকে আমি চিনি, সুরেশের কাছে যা শুনেছি, তাতেও মনে হল যে, একমাত্র আপনিই ওকে সন্দেহ করছেন না। মিঃ ভাদুড়ি, ইউ প্লিজ ডু সামথিং। সুরেশকে আপনি বাঁচান!”
“পুলিশ কি এখনও ওঁকে হ্যারাস করছে?”
“তা করছে না, কিন্তু পাড়াপড়শিরা ওকে এড়িয়ে চলছে, আপিসে না গেলেও রাস্তাঘাটে কলিগদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তারাও ওর সঙ্গে কথা বলে না। সকলেই এমন একটা ভাব করে যে, ও-ই খুনি! এটা কেন হবে?”
“মক্ষিকা ব্রণমিচ্ছন্তি!” ভাদুড়িমশাই তেতো হেসে বললেন, “অন্যের সম্পর্কে খারাপ কথাটা ভাবতেই বেশির ভাগ লোক ভালবাসে। কিন্তু ওটা নিয়ে তো কিছু করা যাবে না, যতক্ষণ না আসল খুনিকে ধরা হচ্ছে, এই দুর্ভোগ সুরেশবাবুর চলবেই।”
“কিন্তু আপনি কি তাকে খুঁজে বার করবেন না?”
মীরা বসুর গলায় এমন একটা কাতর অনুনয় ছিল যে, ভাদুড়িমশাই মুখ তুলে একেবারে সরাসরি তাঁর দিকে না তাকিয়ে পারলেন না। তারপর ফের মুখ নামিয়ে নিয়ে বললেন, “খুঁজতে হবে কেন, সে যে কে তা তো আমি জানিই।”
ভদ্রমহিলার মুখ দেখে মনে হল, কথাটা তিনি বিশ্বাসই করে উঠতে পারছেন না। ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। তারপর অস্ফুট গলায় বললেন, “তা-ই?”
সদানন্দবাবু এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি। কিন্তু এবারে আর মুখ না-খুলে পারলেন না। একগাল হেসে বললেন, “হ্যাঁ, তা-ই। খুনি কে, তা আমরা জেনে গেচি। আশা মালহোত্রাকে চেনেন?”
“না,” মীরা বসু বললেন, “এখানে এক ডাক্তার দত্ত ছাড়া কাউকেই আমি চিনি না। কে তিনি?”
“এখানকার ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জীব মালহোত্রার বউ। এই আশা মালহোত্রাই আপনার বোনকে খুন করেচে। ডেঞ্জারাস উয়োম্যান।”
“তা হলে তাকে ধরছেন না কেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ধরছি না, তার কারণ, ওটা আমার এই দুই বন্ধু সদানন্দবাবু আর কিরণবাবুর কথা, কিন্তু আমার কথা নয়।”
“সে কী মশাই,” সদানন্দবাবু বললেন, “আমি তো জানি এটা আপনারও কতা। তা নয়?”
মোটেই নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আশা মালহোত্রা যে খুনি এ তো শুধু আপনারা দুজনেই বলে যাচ্ছেন, আমি তো কখনও বলিনি।”
আমি হতভম্ব। বললুম, “তা হলে ওই হলদে চুল আর কাঁটা? ওগুলো কার?”
“ও-সব কথা এখন রাখুন তো,” বলে আমাদের দিক থেকে মীরা বসুর দিকে চোখ ফিরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বরং এঁর কথাটাই আগে শোনা যাক। আপনাকে তো আবার তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, কেমন?”
মীরা বসু বললেন, “আটটার মধ্যে ফিরলেই হবে। সুরেশ মনে হয় ন’টার আগে শ্মশান থেকে ফিরতে পারবে না।”
“সুরেশবাবুকে ও-বেলা কিছু খাওয়াতে পেরেছিলেন?”
“কিচ্ছু না। অনেক করে বলেছিলুম, কিন্তু পারিনি।” একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মীরা বসু বললেন, “কিছু ফলমূল আনিয়ে রেখেছি। ঘরে কিছুটা দুধ ছিল, তাও জ্বাল দিয়ে রাখব। দেখি এ-বেলা যদি মুখে কিছু তোলে।”
ভাদুড়িমশাই হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, “প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। তা হলে তো আর বেশিক্ষণ আপনি বসতে পারবেন না। যা বলতে এসেছেন, সেটা বলে ফেলুন। আপনি বোধহয় ডাক্তার দত্ত সম্পর্কে কিছু বলবেন, তাই না?”
মীরা বসু চমকে উঠে বললেন, “আপনি কী করে জানলেন?”
“কলকাতা থেকে একটু আগে একটা ফোন এসেছিল।” ভাদুড়িমশাই সামান্য হেসে বললেন, “ফোন যে করেছিল, সে জানাল যে, আজ থেকে বছর কুড়ি আগে ডাক্তার দত্ত কলকাতার একটা চেম্বারে বসতেন। চেম্বারটা শুনলুম ক্রিক রোতে। আর আপনারা তো থাকেন শশিভূষণ দে স্ট্রিটে। অর্থাৎ ক্রিক রো’র খুব কাছেই। তা-ই না?”
“হ্যাঁ।”
“তাই মনে হল যে, আপনি হয়তো ওঁকে চিনতেও পারেন। এমনকী, ওঁরই সম্পর্কে হয়তো কিছু জানাতে এসেছেন। জাস্ট আ গেস। সত্যি চেনেন নাকি?”
যেন হঠাৎই পালটে গেল মীরা বসুর চেহারা। মুখ রক্তশূন্য, দুই পাশে সোফার হাতল দুটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছেন, মনে হল তাঁর ভিতরে-ভিতরে যে একটা অলোড়ন চলছে, প্রাণপণে সেটাকে সামলে নেবার চেষ্টা করছেন তিনি। কয়েক মুহূর্ত তিনি কোনও কথাই বলতে পারলেন না, তারপর অস্ফুট গলায় বললেন, “শুধু চিনি বললে কম বলা হয়, মিঃ ভাদুড়ি। ওকে আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি। ও ডাক্তার নয়, ও একটা শয়তান। ডাক্তারির কিচ্ছুই ও জানে না। ভুলভাল ওষুধ দিয়ে আমার তেরো বছরের ভাইটাকে….রন্টুকে ওই মেরে ফেলেছিল!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “শান্ত হোন। কী হয়েছিল ধীরেসুস্থে বলুন। এই মার্ডার কেসটার পনেরো আনা হদিশ আমি জানি, এখন বাকি এক-আনাও জানা চাই। তা নইলে এই ব্যাপারটাকে আমি গুটিয়ে ফেলতে পারছি না। কী হয়েছিল বলুন।”
মীরা বসু অনেকটাই সামলে নিয়েছিলেন নিজেকে। বললেন, “রন্টুর টাইফয়েড হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিকে ও ইনফ্লুয়েঞ্জার ওষুধ দেয়। তাতে জ্বরের যখন রেমিশন হয় না, তখন বলে, টিউবারকুলার ইনফেকশন। চলতে থাকে তার ওষুধ। একুশ দিনের দিন রন্টু মারা যায়। পরে জানতে পারি, শুধু রন্টু নয়, একইভাবে আরও তিনজন রুগি ওর হাতে মারা পড়েছে। ব্যাপারটা নিয়ে পাড়ায় খুব হইচই হয়েছিল। পাড়ার ছেলেরা খেপে গিয়ে ওকে মারধর করেছিল একদিন। ওপরওয়ালারা এই নিয়ে একটা ইনকুয়েরি কমিটি বসিয়েছিলেন। কমিটি যে রিপোর্ট দেয়, তাতে ওর রেজিস্ট্রেশন ক্যানসেল হয়ে যায়। অথচ এখানে এসে শুনছি যে, ও নাকি এখানকার ডাক্তারবাবু। এটা কী করে হয়?”
ভাদুড়িমশাই স্থির হয়ে সব শুনে যাচ্ছিলেন। শেষ প্রশ্নটার কোনও উত্তর না দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বোন কি ওঁকে চিনতে পেরেছিলেন?”
“চিনতে পারার কথা নয়। রেখার বয়েস তো তখন মাত্র সাত-আট।” মীরা বসু বললেন, “গত কুড়ি বছরে ডাক্তার দত্তের চেহারাও তো কম পাল্টায়নি। তার উপরে আবার নিজেও অনেকটা পাল্টে নিয়েছে। যেমন ধরুন থুতনিতে দাড়ি রেখেছে, চুলের ফেরতাই পাল্টেছে। তা ছাড়াও একটা ব্যাপার দেখছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আগে ওর চোখের মণি ছিল কটা, এখন দেখছি কালো। এটা কী করে হল জানি না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না-জানার তো কিছু নেই, মণির রং যদি না-ই পাল্টানো যাবে, তবে আর কনট্যাক্ট লেন্স রয়েছে কী করতে?”
মীরা বসু বললেন, “আমি কিন্তু ওকে চিনতে পেরেছিলুম। দুর্গাপুজোর সময় দু’দিনের জন্যে এখানে এসেছিলুম তো, তখনই ওকে দেখে আমি চমকে যাই, মনে হয় যে, এই সেই লোক।”
“কথাটা কি আপনার বোনকে আপনি বলেছিলেন?”
“শুধু রেখাকেই বলেছিলুম, সুরেশকে বলিনি। রেখাও বোধহয় সুরেশকে কিছু বলেনি। তা নইলে আর আজই দুপুরবেলায় সুরেশকে যখন ব্যাপারটা জানাই, সুরেশ তখন চমকে উঠবে কেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুরেশবাবু যে আজকের আগে এ-ব্যাপারটা জানতেন না, এটা আপনি ঠিকই বলেছেন। জানলে নিশ্চয় গতকালও উনি আমার কাছে ডাক্তার দত্তের অত প্রশংসা করতেন না।”
নীচ থেকে একজন বেয়ারা এসে বললু, গাড়ি এসে গেছে।
ভাদুড়িমশাই একবার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন। তারপর মীরা দেবীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “থ্যাঙ্কস আ লট, যেটুকু বাকি ছিল, তাও জানা হয়ে গেল। চলুন, একটা গাড়ি পাওয়া গেছে, আপনাকে আপনাদের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসবে।”
ভদ্রমহিলাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ভাদুড়িমশাই উপরে উঠে এলেন। এসে বললেন, “এবারে খেতে যাব। কিন্তু তার আগে শেখর ঘোষালকে একটা ফোন করা দরকার। আপনারাও আসুন। তা হলে আর আড়ি পেতে কথা শুনতে হবে না।”
ভাদুড়িমশাইয়ের পিছন-পিছন আমরাও তাঁর ঘরে গিয়ে ঢুকলুম। রিসিভার তুলে ডায়াল ঘুরিয়ে অতঃপর ভাদুড়িমশাই যা বললেন, সেই একতরফা কথাগুলি এইরকম
“হ্যালো…কে?…মিঃ ঘোষাল?…আমি চারু ভাদুড়ি কথা বলছি…কী বললেন?…ভ্যান ব্রেকডাউন করিয়ে রাস্তা আটকে রেখেছেন বলে এখানকার লোকজন খুব খেপে গেছে?…মিঃ সেনের পার্সোনাল গাড়িও আটকে গিয়েছিল?…হাঃ হাঃ, ও গাড়িতে আমিই ছিলুম।…এনিওয়ে, রাস্তা আটকে রাখার আর দরকার নেই, ভ্যান দুটো তুলে নিন। আর হ্যাঁ, আজ আর আপনাকে আসতে হচ্ছে না, কাল সকাল আটটায় এসে আমাদের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করুন। তার আগে অবশ্য একটা কাজ আপনাকে করতে হবে। নীলমণি শিকদারকে জানিয়ে দিন, তিনি যেন আজ রাত্তিরেই ডাক্তার তারাপদ দত্তকে অ্যারেস্ট করেন।…হ্যাঁ, যে-প্রমাণের কথা বলেছি, সেটা ওর ঘরের মধ্যেই পাওয়া যাবে।…না না, কিচ্ছু ভাববেন না। জাস্ট গো অ্যাহেড।”
আমার মুখে কথা সরছিল না। সদানন্দবাবু হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন। অনেক কষ্টে হাঁ বুজিয়ে বললেন, “যাব্বাবা, সব যে উলটে গেল দেকচি!”
আমি বললুম, “কিন্তু ওই হলদে চুল আর কাঁটা? ওগুলো তবে কার?
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল সকালে সব বলব। এখন চলুন তো, খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া যাক। বাব্বা, দু’রাত্তির ঘুমোতেই পারিনি।”
