আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৩)

বেয়ারাটি নীচে নেমে যাবার পরে-পরেই যিনি একতলা থেকে দোতলায় উঠে এলেন, বোঝা গেল যে, তিনিই পলাশডাঙা থানার ছোট-দারোগাবাবু। ভদ্রলোকের বয়েস মনে হল বছর পঞ্চাশেক হবে। গায়ের রং আবলুস কাঠের মতন কালো, মাথার সামনের দিকটায় চকচকে একটা টাক পড়েছে, বাদবাকি অংশের কাঁচাপাকা চুল একেবারে খুলির চামড়া ঘেঁষে ছাঁটা, বয়েসের তুলনায় চোখের চাউনি একটু বেশি রকমের ছটফটে ও সতর্ক, থ্যাবড়া নাক ও পুরু ঠোটের মধ্যবর্তী এলাকায় নুন-মেশানো গোলমরিচের মতন গোঁফ। ভদ্রলোক ইউনিফর্ম পরে আসেননি। পরনে ঢোলা ট্রাউজার্স ও হাফ-হাতা চকরাবকরা শার্ট। শরীরের মধ্যদেশ যে অতিমাত্রায় স্ফীত, কোমরে চওড়া বেল্ট বেঁধেও সেটা গোপন করা যায়নি। বিনি পয়াসায় রসগোল্লা খাওয়ার পরিণামে দারোগাবাবুদের কারও-কারও চেহারা বড্ড বেঢপ হয়ে যায়। এঁরও হয়েছে।

 

মানুষটির কথাবার্তা বলবার ধরন অবশ্য খুবই বিনীত। জোড়হস্তে নমস্কার করে বললেন, “এস. ডি. পি. ও. সাহেব আপনাদের কাছে যাকে নিয়ে আসতে বলেছিলেন, তাকে স্যার নিয়ে এসেছি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বসুন, বসুন। আপনিই বুঝি এখানকার থানার চার্জে আছেন?”

 

ভদ্রলোক বসলেন না। বললেন, “হ্যাঁ, স্যার। আমার নাম নীলমণি শিকদার। বড়-দারোগাবাবু ছুটিতে আছেন বলে আমাকেই আপাতত সব দেখতে হচ্ছে।”

 

“তা যাঁর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলুম, তাঁকে পাঠিয়ে দিলেই তো পারতেন। আপনি নিজে আবার কষ্ট করে তাঁকে নিয়ে আসতে গেলেন কেন?”

 

“সেই রকমই হুকুম আছে স্যার। লোকটা আসলে ওয়াচে আছে তো, কখন কোন ফাঁকে শটকান দেবে তার ঠিক কী, তাই বাড়ি ছেড়ে ওকে একা-একা কোথাও যেতে দেওয়া হচ্ছে না।”

 

“পালাবে বলে মনে হয়?”

 

“সে তো স্যার পালাতেই পারে। ফলে যদ্দুর সম্ভব হুঁশিয়ার থাকতে হয়। একটা কিছু হয়ে গেলে তো ঘোর মুশকিলে পড়ে যাব।”

 

“তখন চাকরি নিয়ে টানাটানি।”

 

“তা হয়তো হবে না, তবে প্রোমোশান তো আটকে যেতেই পারে। তাই একেবারে নিজেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।”

 

“বেশ করেছেন। তা তিনি এখন কোথায়?”

 

“তাকে একজন পাহারাদারের হেফাজতে একতলায় বসিয়ে রেখে এসেছি।…কিন্তু তারপরে কি আর আমার থাকার দরকার হবে?”

 

“আরে না না,” ভাদুড়িমশাই হৈসে বললেন, “আপনি ব্যস্ত মানুষ, কোথাও আটকে গেলে তো কাজেরই ক্ষতি, নাহক আপনাকে আমি আটকে রাখব কেন?”

 

নীলমণি শিকদার বললেন, “তেমন কোনও কাজ নয়, স্যার। আসলে যে খুনটা এখানে হয়ে গেল, তাই নিয়ে আমাদের ইনভেস্টিগেশন চলছে তো, সেই ব্যাপারে মিঃ সেনের সঙ্গে একবার দেখা করার দরকার ছিল।”

 

“তার মানে এখানকার চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার মিঃ কালীচরণ সেনের সঙ্গে?”

 

“হ্যাঁ, স্যার।”

 

“তা হলে তো আপনাকে আটকে রাখার কথাই ওঠে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাঁকে নিয়ে এসেছেন, তাঁকে উপরে আসতে বলে স্বচ্ছন্দে আপনি চলে যেতে পারেন।…আর হ্যাঁ, শুধু তিনিই যেন আসেন, পাহারাদারটিকে আর উপরে পাঠাবার দরকার নেই।”

 

নীলমণি শিকদার বললেন, “সে আপনি যা ভাল বোঝেন, স্যার। তবে কিনা লোকটাকে তো চোখে-চোখে রাখা দরকার, তাই বলছিলুম যে…”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আহা-হা, তার জন্যে তো আমিই রইলুম। কিচ্ছু ভয় নেই, আপনি নিশ্চিন্ত চিত্তে চলে যান।”

 

নীলমণি শিকদার নমস্কার করে বিদায় নিলেন। যাবার আগে বলে গেলেন, “দেখবেন স্যার, আমি আবার কোনও বিপদে না পড়ি।”

 

সত্যিই যে তিনি চলে গেছেন, একতলা থেকে একটা গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার ও গেস্ট হাউসের চৌহদ্দি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনে সেটা বোঝা গেল। তার মিনিট খানেক বাদে চায়ের ট্রে হাতে বেয়ারাটির পিছন পিছন যিনি দোতলায় উঠে এলেন, সপ্তমী পুজোর দিন কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে তাঁকে আমরা প্রথম দেখি। কালীচরণ সেনের চিঠি নিয়ে তিনিই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।

 

কিন্তু ইনিই কি সেই সুরেশ দাশ? এমনিতেই ইনি মাথায় খাটো রোগা-পাতলা মানুষ। কিন্তু এখন এঁকে আরও ছোটখাটো ও আর শীর্ণকায় দেখাচ্ছে। চুল উশকোখুশকো, চোখের কোলে কালি, গাল বসে গিয়ে বয়েস হঠাৎ বেড়ে গেছে,– ভদ্রলোককে চেনাই যাচ্ছিল না। তবে চেহারা যতই পাল্টে গিয়ে থাকুক, সুরেশ দাশের সেই হাত কচলাবার অভ্যাসটা দেখলুম যায়নি।

 

ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলুম না। বড় কষ্ট হচ্ছিল। সত্যি, মাত্র কয়েকটা দিনের মধ্যেই একটা মানুষের জীবনে কত অদল-বদল ঘটে যেতে পারে। সপ্তমী পুজোর দিনেও তো এঁর জীবনে কোনও সমস্যা আছে বলে মনে হয়নি। এমনকি, লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনেও ইনি নিশ্চয় একজন সুখী মানুষই ছিলেন। কিন্তু তারপরেই এসেছে ভাগ্যের মার। এমন মার, যার জন্যে ইনি একেবারেই তৈরি ছিলেন না। সেই অতর্কিত মারে এঁর জীবন একেবারে তছনছ হয়ে গেছে!

 

টেবিলের উপরে পেয়ালা, পিরিচ, চা, চিনি ও দুধের পট, একটা ছাঁকনি, গোটাকয়েক চামচ, আর সেইসঙ্গে এক প্লেট বিস্কুট সাজিয়ে রেখে বেয়ারাটি নীচে চলে যাওয়ার পরেও দু-এক মুহূর্ত ভাদুড়িমশাই কোনও কথা বললেন না। তারপর, হঠাৎ যেন মনে পড়েছে এইভাবে সুরেশ দাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ কী, আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন।”

 

সুরেশচন্দ্র বসলেন না। যে-রকম কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই রকম দাঁড়িয়ে থেকেই হাত কচলাতে লাগলেন।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বসুন, চা খান। রিল্যাক্স করুন। আপনি যদি এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, তা হলে তো কোনও কথাই হবে না। অথচ, কথা হওয়া দরকার। আমাদের তরফে যেমন কয়েকটা কথা আপনাকে বলবার আছে, তেমন আপনার তরফেও নিশ্চয় কিছু-না-কিছু জানাবার আছে।…নিন, বসুন। আমরা তো আর পুলিশ নই, তা হলে নাহক ভয় পাচ্ছেন কেন?”

 

সুরেশচন্দ্র সেই প্রথম দিনের মতোই একটা সোফার একেবারে কিনার ঘেঁষে বসলেন, আর তারপরেই হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।

 

ভাদুড়িমশাই সে-দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে দুটো পেয়ালায় লিকার ঢেলে, তাতে দুধ আর চিনি মিশিয়ে, একটা পেয়ালা নিজের জন্যে রেখে, পিরিচসুদ্ধ অন্য পেয়ালাটা সুরেশচন্দ্রের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “একেবারে হঠাৎই আপনি একটা আঘাত পেয়েছেন। কত বড় আঘাত, সেটা আমরা বুঝি না, তা নয়। বুঝি ঠিকই। তবে তার চেয়েও যেটা বেশি বুঝি, আর এই মুহূর্তে যা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা, সেটা এই যে, আপনি নিজেও একটা ভয়ঙ্কর রকমের বিপদের জালে জড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কাঁদলে তো হবে না। চুপ করে বসে থাকলেও হবে না। তাতে আপনার বিপদ আরও বেড়েই যাবে। পুলিশ তো, যদ্দুর যা বুঝতে পারছি, আপনাকেই খুনি ঠাউরে বসে আছে। তা-ই না?” সুরেশচন্দ্র বললেন, “শুধু পুলিশ কেন, যারা আমার কলিগ, যাদের সঙ্গে পাশাপাশি টেবিলে বসে কাজ করি, এমনকি যাদের কারও-কারও সঙ্গে একই বাড়িতে থাকি, তাদেরও সেই একই সন্দেহ। কিন্তু বিশ্বাস করুন স্যার, আমার কোনও দোষ নেই। কে যে রেখাকে খুন করল, আর কেনই বা করল, কিচ্ছু আমি জানি না।”

 

“আমারও তা-ই ধারণা,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা নইলে আর পুলিশের কথায় খুশি না হয়ে আপনাকে ডেকে পাঠাব কেন?…নিন, চা-বিস্কুট খান। তারপর যা বলি, মন দিয়ে শুনুন। যা জিজ্ঞেস করি, তার ঠিক-ঠিক জবাব দিন। কিন্তু তার আগে বোধহয় আপনার একটু স্থির হওয়া দরকার। নইলে তো ঠিকমতো কথাই বলতে পারবেন না।”

 

সুরেশচন্দ্রের কান্না ইতিমধ্যে একটু প্রশমিত হয়ে এসেছিল, কিন্তু কান্না থামার পরেও তার একটা প্রক্ষোভ তো ভিতরে-ভিতরে থেকেই যায়। সেই প্রক্ষোভে মাঝে-মাঝেই কেঁপে উঠছিল তাঁর শরীর। ভাদুড়িমশাই আবারও বললেন, “নিন, চা খান। চা খেয়ে একটু শান্ত হবার চেষ্টা করুন। নইলে তো কোনও কথাই হতে পারবে না। এদিকে খুব বেশি সময়ও তো আমাদের হাতে নেই। অথচ আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করবার রয়েছে। মন দিয়ে সেগুলি আপনাকে শুনতে হবে, তার জবাব দিতে হবে। নিন, স্থির হোন, স্থির হয়ে আমার কথাগুলো একটু শুনুন।”

 

সদানন্দবাবু নিজে তো চায়ের সঙ্গে দুধ-চিনি খানই না, আমাকেও খেতে দেন না। নিজের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, “যাচ্চলে, এ যে দেকচি বড্ড কড়া হয়ে গেচে। একটু গরম জল মিশিয়ে নিলে হত।”

 

বললুম, “থাক, আর গরম জল চেয়ে কাজ নেই, একটু বরং দুধ মিশিয়ে নিন।”

 

সদানন্দবাবু আমার কথার কোনও জবাব দিলেন না। নিজের চায়ে দুধ মিশিয়ে দুধের পটটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলুম, মাঝপথে আমার হাতটাকে আটকে দিয়ে সুরেশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভাদুড়িমশাই যখন ভরসা দিচ্চেন, তখন আর ভয় পাচ্ছেন কেন, ভয়ের কিছু নেই। তবে হ্যাঁ, মাতাটা ঠাণ্ডা রাকতে হবে, স্থির থাকতে হবে। একদম অস্থির হওয়া চলবে না।

 

সুরেশচন্দ্রকে গত দু’দিন ধরে পুলিশ বোধহয় জেরায় জেরায় জেরবার করে ছেড়েছে, কাল সকাল থেকে আজ এ-পর্যন্ত কারও কাছে তিনি নিশ্চয় এত সহৃদয় ব্যবহার পাননি, এত সহানুভূতিপূর্ণ কথাবার্তাও শোনেননি। বললেন, “কী জিজ্ঞেস করবেন, করুন। আমার তো লুকোবার কিছু নেই, যা জানি তা-ই বলব।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা-ই বলবেন, এবং শুধু সেইটুকুই বলবেন। কী জানেন, যারা মিথ্যে কথা বলে, তাদের কথার মধ্যে অনেক গরমিল থেকে যায়, একটা কথার সঙ্গে আর-একটা কথাকে ঠিকমতো মিলিয়ে তোলা যায় না। আপনার কথায় যদি তেমন কোনও গরমিল দেখতে পাই, তো আগেই বলে রাখি, আপনি মুশকিলে পড়বেন, পুলিশ আপনাকে ছাড়বে না,… আর হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে আমিও আপনাকে স্পষ্ট বলে দেব যে, আপনার জন্যে কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

 

সুরেশচন্দ্রের প্রাথমিক সংকোচ কেটে গিয়েছিল। সেই ভেঙে-পড়া বিহ্বল ভাবটাও আর দেখা যাচ্ছিল না। তার চেয়েও বড় কথা, নার্ভাসনেসের যা একেবারে অভ্রান্ত লক্ষণ, সেই হাত-কচলানি ও ইতিমধ্যে বন্ধ হয়েছিল। স্পষ্ট গলায় তিনি বললেন, “আমি তো সত্যিকথাই বলব, আমার কথায় তা হলে কোনও গরমিল থাকবে কেন?”

 

“বাঃ, তা হলে তো কথাই নেই। আমি তা হলে প্রশ্ন করি, কেমন?”

 

“করুন।”

 

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর প্যাকেটটাকে সুরেশচন্দ্রের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “চলে তো?”

 

“আজ্ঞে না,” লজ্জিত গলায় সুরেশচন্দ্র বললেন, “আগে খেতুন। তবে ছেড়ে দিয়েছি।”

 

“ছাড়া যায় তা হলে? বাঃ। আমি তো বিস্তর চেষ্টা করেও ছাড়তে পারছি না। তো আপনি কবে থেকে ছাড়লেন?”

 

“আজ্ঞে পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে।”

 

“কষ্ট হয় না? ওই যাকে উইথড্রয়াল সিমটম বলে আর কি।”

 

“আজ্ঞে প্রথম-প্রথম…এই ধরুন হপ্তা দুই-তিন হয়েছিল। তারপরে আর হয় না।”

 

“ছাড়লেন কেন? ডাক্তার ছেড়ে দিতে বলেছিল?”

 

“না, ঠিক তা নয়। মানে ওই পয়লা সেপ্টেম্বর থেকেই জগিং করছি কিনা, তখন থেকেই আর খাচ্ছি না।”

 

“জগিংটা কার পরামর্শে ধরলেন? ডাক্তারের?”

 

“আজ্ঞে না,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “আপনি কি দৈনিক বার্তাবহ পড়েন?”

 

“খুব-একট পড়া হয় না, তার কারণ আমি তো কলকাতায় থাকি না,আমাকে ব্যাঙ্গালোরে থাকতে হয়। তবে কলকাতায় এলে পড়ি ঠিকই। কিন্তু তার সঙ্গে আপনার জগিংয়ের কী সম্পর্ক?”

 

“বলছি স্যার। ফি রবিবার ওই কাগজখানাতে ‘নিজের চিকিৎসা নিজে করুন’ বলে একটা লেখা বার হয়।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “রাইট। অতি চমৎকার লেকা। মাতা ধরলে কী করবেন, সর্দিজ্বর হলে কী করবেন, বুক জ্বালা করলে কি চোঁয়া ঢেকুর উটলে কী করবেন,—সব বিষয়েই তাতে ভাল-ভাল সব অ্যাডভাইস থাকে।”

 

সুরেশচন্দ্র এতক্ষণ মুখ নিচু করে কথা বলছিলেন। এবারে মুখ তুলে সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ স্যার, খুব ভাল অ্যাডভাইস। তা অগস্ট মাসের শেষের দিকে এক রোববার তাতে পড়লুম যে, রোজ ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে কেউ যদি ঘন্টাখানেক জগিং করে, তো তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হবেই। অন্তত ছোটখাটো কোনও ব্যামো…এই ধরুন অজীর্ণ কি অগ্নিমান্দ্য কি গা ম্যাজম্যাজ করা, এ-সব আর তাকে ছুঁতেও পারবে না।”

 

“খুব খাঁটি কতাই লিকেচে।” সদানন্দবাবু বললেন, “আমি অবিশ্যি জগিং করি না, মর্নিং ওয়াক করি, তবে সেও ওই ঘড়ি ধরে এক ঘন্টা। আর তাতেও ওই একই উবগার।” বলেই পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে, ব্যায়ামবীরদের ভঙ্গিতে ডান হাত ভাঁজ করে, হাতখানাকে সুরেশচন্দ্রের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বাইসেপস টিপে দেকুন। টিপলেই বুঝতে পারবেন যে, একেবারে লোহার মতন শক্ত।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “উনি হাঁটেন, আমি দৌড়ই। আজ সকালেও দৌড়েছি। দৌড়তে দৌড়তে ওই যে গোটাকয়েক চারতলা বাড়ির একটা ক্লাস্টার রয়েছে না, ওইদিকেই গিয়েছিলুম।”

 

সুরেশচন্দ্রের মুখে এতক্ষণ একটুও হাসি ছিল না। এবারে মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ স্যার, আমাদের কোয়ার্টারের বারান্দা থেকে আমি আপনাকে দেখেছি।”

 

“তা আপনিও তো রোজ জগিং করেন?”

 

“রোজই যে করি, তা নয়। সকালের দিকে যে-দিন খুব বৃষ্টি-বাদলা হয়, সে-দিন আর বাড়ি থেকে বেরুনো হয় না।”

 

“এহে-হেহে, এটা মোটেই ভাল কাজ করেন না,” সদানন্দবাবু আক্ষেপের গলায় বললেন, “এ-সব জিনিস ধরলে আর ছাড়তে নেই। দরকার হলে ওয়াটারপ্রুফ পরে বেরুবেন। কিন্তু চালিয়ে যেতে হবে। ওটাই হচ্চে আসল কতা। নইলে তো জগিংয়ের গুণ নষ্ট হয়ে যাবে, মশাই।”

 

সুরেশচন্দ্র ম্লান গলায় বললেন, “আমি ত্বো বেরুতেই চাইতুম, কিন্তু রেখা কিছুতেই বেরুতে দিত না। বলত,’খবর্দার বেরুবে না। তোমার সর্দির ধাত, বৃষ্টিবাদলার মধ্যে বেরুলে নির্ঘাত জ্বরজারি বাধিয়ে বসবে।’ ফলে আর বেরুনো হত না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ-রকম ক’দিন হয়েছে?”

 

“এ-রকম মানে?”

 

“মানে সকালের দিকে বৃষ্টি-বাদলার জন্যে মাঝে-মাঝে জগিং বন্ধ থাকত বলছিলেন না? তা এ-রকম ক’দিন হয়েছে এর মধ্যে?”

 

সুরেশচন্দ্র একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “একেবারে কারেক্টলি সেটা বলতে পারব না, স্যার। তবে সাত-আট দিন তো হবেই। সেপ্টেম্বর মাসে তো প্রায় রোজই বৃষ্টি হত, সেটা সকালের দিকে হলেই আটকে যেতুম। তার উপরে আবার তিরিশে সেপ্টেম্বর রাতের গাড়ি ধরে কলকাতায় যেতে হয়েছিল। ফিরি তার পরদিন। সেও রাত্তিরের গাড়িতে। গাড়ি লেট করেছিল বলে দোসরা বেলা সাড়ে সাতটায় এখানে এসে পৌঁছই। ফলে ওই দুটো দিনও…মানে পয়লা আর দোসরা অক্টোবর…বাদ পড়ে গিয়েছিল। তবে তেসরা সকাল থেকে ফের ঘড়ি ধরে জগিং করতে শুরু করে দিই।”

 

“বাড়ি থেকে সাধারণত কখন বেরুতেন?”

 

“চেষ্টা তো করতুম সাড়ে পাঁচটায় বেরুতে। তবে পারা যেত না। ঘুম থেকে উঠে তৈরি হতে-হতে মিনিট দশ-পনেরো দেরি হয়ে যেত। এক-আধ দিন ছ’টাতেও বেরিয়েছি।”

 

নতুন করে আবার একটা সিগারেট ধরালেন ভাদুড়িমশাই। একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “কাল সকালে কখন বেরিয়েছিলেন?”

 

“পৌনে ছ’টায়। তবে কালও স্যার ঠিকমতো জগিং করতে পারিনি। আধঘন্টাটাক করেছিলুম।”

 

“কেন?”

 

“কাল স্যার অন্য একটা কাজ পড়ে গিয়েছিল। আপিসের কাজ।”

 

“আপিসের কাজ? লক্ষ্মীপুজোর দিনে? তাও অত সকালে?”

 

“হ্যাঁ স্যার। মিঃ নন্দী এখানকার চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার, আমার ওপরওয়ালা। তিনিও খুব আর্লি-রাইজার। মাঝে-মাঝেই সকালের দিকে তিনি আমাদের ডেকে পাঠান। তা আগের দিনই আপিসে তিনি আমাকে বলে রেখেছিলেন যে, পরদিন সকাল সাড়ে ছ’টায় তাঁর বাংলোতে গিয়ে আমি যেন তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করি। লেবার কনট্রাকটরের একটা আড়াই লাখ টাকার পেমেন্ট আটকে আছে, সেইটে নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের ভুরু দেখলুম কুঁচকে গেছে। বললেন, “বটে?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *